কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?
কিউবার আর্থিক অবস্থা বর্তমানে তার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে দেশটির জিডিপি (GDP) ক্রমাগত সংকুচিত হয়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি চরম আকার ধারণ করেছে।
কিউবার উদাহরণ বর্তমান সময়ের নিরিখে আলোচনা-সমীক্ষার জন্য অত্যন্ত্য গুরুত্বপূর্ণ। জানিনা এই বিষয়ে সত্যিকারের আগ্রহী কতজন আছেন। কম্যুনিস্ট পার্টির নীতি কোথায়-কীভাবে-কেন ব্যর্থ এই পর্যালোচনা খুবই জরুরী। কারণ কিউবায় এখনও একদলীয় কম্যুনিস্ট সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। বর্তমান কিউবায় কিউবান কমিউনিস্ট পার্টি (Communist Party of Cuba - PCC) ক্ষমতায় রয়েছে। এটি একটি মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী দল এবং দেশের সংবিধান অনুযায়ী এটিই একমাত্র বৈধ রাজনৈতিক দল। বর্তমানে পার্টির নেতৃত্ব দিচ্ছেন মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল (Miguel Díaz-Canel), যিনিই কিউবার রাষ্ট্রপতি। অনেকে কিউবার অবনতির পেছনে মার্কিন আধিপত্যের কারণকে মূল কারণ বলে চিহ্নিত করলেও মূল কারণ তা কিন্তু নয়। এই বিষয়ে আলোচনা হয় খুবই কম। বাস্তবতা হচ্ছে কিউবার সরকার মার্কিন আধিপত্যকে গ্রহণই করেনি। পুঁজির আধিপত্য গ্রহণ করেনি এ তো ভাল সিধান্ত। তবে এখানেই কথা শেষ নয়। বিকল্প নীতি দ্বারা সমৃদ্ধ-সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে কিনা সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে। এখানেই উঠে আসে হাজারো প্রশ্ন। বর্তমানে কিউবায় পুঁজির সুবিধা যৎসামান্য থাকলেও জনতা বা রাষ্ট্র পুঁজির আধিপত্য গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ সরকার নিজ বিজ্ঞানসম্মত তত্ত্বের পলিসি দ্বারা অর্থনীতি পরিচালিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। পূর্বে ঠিক যেমনটি রাশিয়া ও চীনের ক্ষেত্রে হয়েছে। রাশিয়া-চীনের ইতিহাসে তো এখন ফিরে যাওয়া সম্ভব নয় সেই কারণে কিউবা বর্তমান সময়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিউবা সরকার মার্কস প্রদত্ত অর্থনীতি-রাজনীতি প্রতিষ্ঠার বিস্তর সময় পেয়েছে ও প্রয়োগও করেছে। নাকি মার্কসীয় নীতিগুলো প্রয়োগ করেই এই ফলাফল। এই অভিযোগ স্বাভাবিক কারণ অন্যান্য রাষ্ট্রেও যে অসফল হয়েছে। এবার বিপরীতে এই প্রশ্নও উঠে আসবে পুঁজির ও মার্কসীয় অর্থনীতির বিকল্প কী হতে পারে। সম্মিলিত উদ্যোগে এই আলচনাও জরুরী। বরং বৈরিতা ভুলে গিয়ে বিকল্প নীতি কি হতে পারে- সমীক্ষা পরবর্তী সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার উদ্দেশ্য সমাজের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত।
সংক্ষেপে কিউবার রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে খানিকটা চোখ বুলিয়ে নিলে সামগ্রিক সমীক্ষায় সুবিধা হবে। কিউবার ইতিহাস দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের এক জটিল সংমিশ্রণ। নিচে এর প্রধান পর্যায়গুলো তুলে ধরা হলো:
১. ঔপনিবেশিক আমল ও স্বাধীনতা (১৪৯২–১৯০২)
- স্পেনীয় শাসন:
১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আগমনের পর থেকে কিউবা দীর্ঘ সময় স্পেনের উপনিবেশ ছিল।
- স্বাধীনতা যুদ্ধ:
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে জোসে মার্তির নেতৃত্বে কিউবানরা স্পেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে। ১৮৯৮ সালের স্পেনীয়-মার্কিনী যুদ্ধের পর স্পেন কিউবা ছেড়ে চলে যায় এবং ১৯০২ সালে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন হয়।
- মার্কিন প্রভাব:
স্বাধীনতার পর 'প্লাট সংশোধনী'র (Platt Amendment) মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবার রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অধিকার পায় এবং দেশটিতে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে।
২. স্বৈরাচার ও রাজনৈতিক অস্থিরতা (১৯০২–১৯৫৯)
- ফালজেন্সিও বাতিস্তার শাসন:
১৯৩৩ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাতিস্তা ক্ষমতায় আসেন। ১৯৪০ সালে একটি প্রগতিশীল সংবিধান প্রণীত হলেও ১৯৫২ সালে তিনি পুনরায় জোরপূর্বক ক্ষমতা দখল করে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। তার শাসনামল দুর্নীতি ও দমনের জন্য পরিচিত ছিল।
৩. কিউবান বিপ্লব ও সমাজতন্ত্র (১৯৫৯–বর্তমান)
- ফিদেল কাস্ত্রোর উত্থান:
১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি ফিদেল কাস্ত্রো, চে গুয়েভারা এবং তাদের অনুসারীদের সশস্ত্র বিদ্রোহের ফলে বাতিস্তা সরকারের পতন ঘটে।
- সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা:
১৯৬১ সালে কিউবাকে একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং এটি এশিয়ার বাইরে বিশ্বের একমাত্র কমিউনিস্ট দেশ হিসেবে পরিচিতি পায়। কিউবান কমিউনিস্ট পার্টি (PCC) দেশের একমাত্র বৈধ রাজনৈতিক দল।
- পরবর্তী নেতৃত্ব:
দীর্ঘ সময় ফিদেল কাস্ত্রো শাসনের পর ২০০৮ সালে তার ভাই রাউল কাস্ত্রো দায়িত্ব নেন। ২০২১ সালে রাউল কাস্ত্রোর পদত্যাগের পর মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল বর্তমানে দেশের প্রেসিডেন্ট এবং কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত আছেন।
বর্তমানে কিউবার জনগণ সরকারের উপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত, যেহেতু বিকল্প রাজনৈতিক দল কিংবা সংগঠন নেই সেহেতু তারা তেমন কিছু করতেও পারছে না অনাহারে-অর্ধাহারে অসুস্থ্য হয়ে মৃত্যুবরণ করা ছাড়া। জানিনা সরকারের পলিসি বিষয়ে আলোচনায় সত্যিকারের আগ্রহী কেউ আছেন কিনা। এ কাজ সকলের পক্ষে সম্ভবও নয়। এটি মজাদার বিষয় নয় ঠিকই কিন্তু একটি রাষ্ট্রের উন্নতি-অবনতির পেছনে যে সরকারের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পলিসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তা অস্বীকার করবার উপায় নেই। বহু মানুষ সৎ নেতৃত্ব, অসৎ নেতৃত্ব, এই দল ভাল নয় ওই দল ভাল এইসব গোলমালের মধ্যে ফেঁসে থাকে। মূল কারণ হচ্ছে রাষ্ট্রের অবস্থা-ব্যবস্থার নিরিখে যথাযথ পলিসি প্রণয়ন ও প্রয়োগ। সঠিক পলিসি যে দলের সরকারই প্রয়োগ করুক না কেন ফলাফল সঠিকই আসবে। এক্ষেত্রে নেতৃত্ব বা দল মূল বাধা নয়। প্রয়োজনে যে কোনো নীতি যে কোনো সময় সংশোধন বা আপডেট করে নেওয়ার সক্ষমতা সরকারের থাকা উচিত। গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি পুনরায় সংক্ষেপে উল্লেখ করছি। এরপরও মন্তব্যে, ফোনে বা সাক্ষাতে আলোচনা-সমীক্ষায় সকলে স্বাগত।
কিউবার বর্তমান গভীর অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে সরকারের অভ্যন্তরীণ নীতিই প্রধানত দায়ী বলে মনে করা হয়। সরকারের কেন্দ্রীয় পরিকল্পিত অর্থনীতি, অদক্ষ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, উৎপাদন ঘাটতি, এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট— এসবই কিউবার ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থার জন্য দায়ী।
সংকটের পেছনে সরকারের দায়ী মুখ্য নীতিসমূহ:
কিউবার
বর্তমান ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতি সরাসরি দায়ী বলে মনে করেন অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক। যদিও কিউবা সরকার প্রায়ই এই সংকটের জন্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধকে দায়ী করে, তবে অভ্যন্তরীণ ভুল নীতিগুলো এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।কিউবার বর্তমান সংকটে সরকারের যে নীতিগুলো দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়:
- ভুল মুদ্রানীতি ও সংস্কারের উদ্দেশ্যে ভুল নীতি:
২০২১ সালে সরকার "অর্ডেনামিয়েন্তো" (Ordering Task) নামক একটি মুদ্রানীতি সংস্কার শুরু করে, যার লক্ষ্য ছিল দুই ধরণের মুদ্রার অবসান ঘটানো। তবে এই পরিকল্পনাটি ব্যর্থ হয় এবং এর ফলে কিউবার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। সরকার একাধিক মুদ্রার বদলে একক মুদ্রা (পেসো) চালুর চেষ্টা এবং জ্বালানি ও বিদ্যুতের ওপর থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার করার ফলে দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বী হয়েছে। ভুল মুদ্রানীতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাউল কাস্ত্রোর আমল থেকে শুরু হওয়া সংস্কারগুলো ধীরগতির হওয়ায় তা অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে পারেনি। ২০২৪ সালের শুরুতে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম এক ধাক্কায় প্রায় ৫০০% বাড়ানো হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।
- কেন্দ্রীভূত পরিকল্পনা ও অদক্ষতা:
- কৃষি ও জ্বালানি খাতে অবহেলা:
- উৎপাদন খাতের ধস (বিশেষ করে চিনি শিল্প):
একসময় বিশ্বের শীর্ষ চিনি উৎপাদনকারী দেশ হলেও কিউবার চিনি শিল্পে বর্তমানে ব্যাপক ধস নেমেছে। ১৯৮০-এর দশকে যেখানে ৮ মিলিয়ন টন চিনি উৎপাদিত হতো, ২০২৪-২৫ মৌসুমে তা কমে মাত্র ১,৫০,০০০ টনে নেমে এসেছে, যা গত ১০০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এছাড়া সারের অভাব ও আধুনিক যন্ত্রপাতির সংকটে কৃষি উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।
- সংস্কারের ধীরগতি ও অনমনীয়তা:
- আমদানিনির্ভরতা ও উৎপাদন ঘাটতি:
সরকার কৃষি ও উৎপাদন শিল্পে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছে, ফলে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চরম সংকট তৈরি হয়েছে।
- পর্যটন ও বৈদেশিক আয়ের পতন:
কোভিড-১৯ মহামারি এবং পরবর্তী সময়ে পর্যটন ও চিকিৎসকদের বিদেশ থেকে আয়ের বড় উৎস কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে ঠেকেছে।
- ব্যাপক অভিবাসন ও দক্ষ জনশক্তির অভাব:
অন্যান্য গৌণ কারণ:
- মার্কিন নিষেধাজ্ঞা:
কিউবার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা দেশটির জন্য বাইরে থেকে সরঞ্জাম ও বিনিয়োগ আনা কঠিন করে তুলেছে।
- ভেনেজুয়েলার সহায়তায় ঘাটতি:
কিউবার জ্বালানি সরবরাহকারী প্রধান দেশ ভেনেজুয়েলা নিজস্ব সংকটে পড়ায় কিউবার জ্বালানি আমদানি কমে গেছে।
মূলত রাজনৈতিক কাঠামোগত দুর্বলতা এবং ভুল অর্থনৈতিক নীতির সমন্বয়েই যে কিউবার এই নজিরবিহীন সংকট এ বিষয়ে তথ্য-প্রমাণের অবশিষ্ট কিছু নেই।
কিউবার বর্তমান আর্থিক অবস্থার প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
তীব্র জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট:
২০২৫ সাল থেকে কিউবায় জ্বালানির অভাবে বারবার ব্যাপক লোডশেডিং বা 'ব্ল্যাকআউট' দেখা দিচ্ছে। ভেনেজুয়েলা থেকে তেল সরবরাহ কমে যাওয়ায় এই সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে।
দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি ও খাদ্য ঘাটতি:
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা অনেক কমে গেছে। মুদ্রাস্ফীতি এতটাই বেড়েছে যে স্থানীয় মুদ্রার (পেসো) মান অনেক নিচে নেমে গেছে।
পর্যটন খাতের ধস:
করোনা মহামারির পর থেকে কিউবার আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস পর্যটন খাত এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি, যা দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারে টান ফেলেছে।
উৎপাদন হ্রাস:
একসময় বিশ্বের শীর্ষ চিনি উৎপাদনকারী দেশ হলেও বর্তমানে দেশটির চিনি শিল্পে ব্যাপক ধস নেমেছে। ১৯৮০-এর দশকে যেখানে ৮ মিলিয়ন টন চিনি উৎপাদিত হতো, ২০২৫ সালে তা কমে মাত্র ২০০,০০০ টনে নেমে এসেছে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা:
কয়েক দশক ধরে চলা মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ কিউবার বহির্বাণিজ্য এবং বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
জনসংখ্যার অভিবাসন:
অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে বিপুল সংখ্যক কিউবান নাগরিক দেশ ছেড়ে অন্য দেশে চলে যাচ্ছেন, যা দেশটির ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সামগ্রিকভাবে, কিউবার অর্থনীতি বর্তমানে একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের মধ্যে রয়েছে, যা দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে।
কিউবার বর্তমান সংকটের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দুটি খাত— চিকিৎসা সেবা ও কৃষি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
১. চিকিৎসা সেবা (Healthcare System)
কিউবা একসময় তার উন্নত চিকিৎসা সেবার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিল, কিন্তু বর্তমানে এই খাতটি প্রায় ভেঙে পড়ার মুখে।
•ওষুধের তীব্র অভাব:
সরকারি ফার্মেসিগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিক এবং ব্যথানাশক ওষুধের মতো সাধারণ ওষুধও পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ কালোবাজার থেকে অতিরিক্ত দামে ওষুধ কিনতে বাধ্য হচ্ছে।
•হাসপাতালের বেহাল দশা:
জ্বালানি সংকটের কারণে হাসপাতালেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকে না, ফলে জরুরি অপারেশন ও ডায়ালাইসিস সেবা ব্যাহত হচ্ছে [১.৪.৫]। অনেক সময় রোগীদের অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় গজ বা ব্যান্ডেজ নিজেদেরই নিয়ে আসতে হয়।
•জ্বালানি সংকট ও অ্যাম্বুলেন্স:
তেলের অভাবে অ্যাম্বুলেন্স সেবা চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে, যা জরুরি রোগীদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
•চিকিৎসা সরঞ্জাম:
ক্যান্সার রোগীদের রেডিয়েশন বা কেমোথেরাপির জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকেজো হয়ে পড়ছে।
২. কৃষি ও চিনি শিল্প (Agriculture & Sugar Industry)
কিউবার অর্থনীতিতে কৃষিখাত বর্তমানে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে।
•চিনি শিল্পের ধস:
কিউবা এক সময় বিশ্বের প্রধান চিনি উৎপাদনকারী দেশ ছিল। কিন্তু ২০২৪-২৫ মৌসুমে চিনি উৎপাদন কমে ২,০০,০০০ টনেরও নিচে (প্রায় ১,৫০,০০০ টন) নেমে এসেছে, যা গত ১০০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অথচ ১৯২০-এর দশকে এখানে কয়েক মিলিয়ন টন চিনি উৎপাদিত হতো ।
•খাদ্য নিরাপত্তা ও আমদানিনির্ভরতা:
কিউবা তার প্রয়োজনীয় খাবারের প্রায় ৮০% আমদানি করে। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে আমদানিতে টান পড়ায় রেশনের দোকানগুলোতেও এখন নিয়মিত খাবার পাওয়া যাচ্ছে না।
•উৎপাদনে বাধা:
সারের অভাব, আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির সংকট এবং জ্বালানি না থাকায় চাষাবাদ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে ধান ও ভুট্টার মতো প্রধান ফসলের উৎপাদন বহুলাংশে কমে গেছে।
•খাদ্য সংকট:
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ৪০% মানুষ বর্তমানে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
বর্তমানে The United Nations (UN) এবং World Food Programme (WFP) কিউবার এই মানবিক সংকট মোকাবিলায় সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
কিউবার সরকার এই সংকট মোকাবিলায় কিছু কঠিন পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে আন্তর্জাতিক সাহায্য পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা বেশ কিছু বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো:
১. কিউবা সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ (Government Measures)
সরকার অর্থনীতি সচল করতে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বড় পরিবর্তন এনেছে:
•বেসরকারীকরণ ও ক্ষুদ্র ব্যবসা:
২০২১ সাল থেকে সরকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যক্তিগত ব্যবসা (MSMEs) খোলার অনুমতি দিয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ১০,০০০-এর বেশি বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, যা গত ৬০ বছরের মধ্যে একটি বড় পরিবর্তন।
•ভর্তুকি প্রত্যাহার ও মূল্যবৃদ্ধি:
জ্বালানি ও বিদ্যুতের ওপর থেকে দীর্ঘদিনের সরকারি ভর্তুকি কমিয়ে আনা হয়েছে। ২০২৪ সালের শুরুতে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম এক ধাক্কায় প্রায় ৫০০% বাড়ানো হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের জন্য।
•মুদ্রা সংস্কার:
সরকার একাধিক মুদ্রার বদলে একটি একক মুদ্রা (পেসো) চালুর চেষ্টা করছে, যদিও এর ফলে বাজারে মুদ্রাস্ফীতি বা জিনিসের দাম বহুগুণ বেড়ে গেছে।
•বিদেশি বিনিয়োগে উৎসাহ:
পর্যটন ও কৃষি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ টানতে সরকার নতুন কিছু আইন শিথিল করেছে।
২. আন্তর্জাতিক সাহায্য (International Aid)
কিউবার বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশ কিছু দেশ ও সংস্থা এগিয়ে এসেছে:
•রাশিয়া ও চীন:
এই দুটি দেশ কিউবার প্রধান বন্ধু। রাশিয়া সম্প্রতি কিউবাকে প্রচুর পরিমাণে তেল ও গম পাঠিয়ে সাহায্য করেছে। চীন কিউবার অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র মেরামতে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে।
•মেক্সিকো ও কলম্বিয়া:
ল্যাটিন আমেরিকার এই দেশগুলো নিয়মিতভাবে কিউবাকে জ্বালানি তেল এবং খাদ্য সহায়তা পাঠিয়ে পাশে দাঁড়াচ্ছে।
•জাতিসংঘ ও ডব্লিউএফপি (WFP):
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কিউবা সরকার 'ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম' (WFP)-এর কাছে দুধ ও অন্যান্য খাদ্য সহায়তার জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছে। বর্তমানে তারা শিশুদের জন্য গুঁড়ো দুধ সরবরাহ করছে।
•ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU):
ইইউ কিউবার কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়নের জন্য কয়েক মিলিয়ন ইউরো অনুদান এবং কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে।
৩. প্রধান বাধা: মার্কিন নিষেধাজ্ঞা (US Embargo)
কিউবা সরকারের মতে, মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ বা 'এমবারগো' হলো তাদের উন্নতির পথে প্রধান বাধা। এর ফলে কিউবা আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিতে পারে না এবং অনেক দেশ তাদের সাথে ব্যবসা করতে ভয় পায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, কিউবার অব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক কাঠামোর কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।
কিউবার বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা সাধারণ মানুষের জীবনকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এর ফলে দেশটিতে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অভিবাসন সংকট তৈরি হয়েছে।
১. সাধারণ মানুষের বর্তমান জীবনযাত্রা (Daily Life)
কিউবার মানুষের দৈনন্দিন জীবন এখন টিকে থাকার এক কঠিন লড়াই:
•রেশনিং ও লাইন:
চাল, ডাল বা তেলের মতো সাধারণ পণ্য পেতে মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। অনেক সময় দীর্ঘ অপেক্ষার পরও রেশনের দোকান থেকে খালি হাতে ফিরতে হয়।
•বিদ্যুৎ ও জ্বালানি:
দিনে ১০ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং এখন নিয়মিত ঘটনা। এর ফলে ফ্রিজে রাখা খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং রান্নার জন্য মানুষ এখন কাঠের চুলা ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে।
•কালোবাজার (Black Market):
সরকারি দোকানে পণ্য না থাকায় মানুষ 'ব্ল্যাক মার্কেট' বা কালোবাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যেখানে জিনিসের দাম সাধারণ আয়ের তুলনায় ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি।
২. দেশ ছাড়ার প্রবণতা (The Great Migration)
আর্থিক সংকটের কারণে গত দুই বছরে কিউবা থেকে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ দেশ ছেড়েছেন:
•রেকর্ড অভিবাসন:
২০২১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫ লাখেরও বেশি কিউবান নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছেন। এটি কিউবার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ।
•তরুণ প্রজন্মের অভাব:
যারা দেশ ছাড়ছেন তাদের বেশিরভাগই তরুণ এবং শিক্ষিত (ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা শিক্ষক)। এর ফলে দেশটিতে দক্ষ জনশক্তির অভাব দেখা দিচ্ছে এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।
•বিপজ্জনক পথ:
অনেকে নৌকায় করে সমুদ্রপথে ফ্লোরিডায় যাওয়ার চেষ্টা করেন, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আবার অনেকে মধ্য আমেরিকার দেশগুলো হয়ে মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার চেষ্টা করেন।
•নিকারাগুয়া রুট:
নিকারাগুয়া কিউবানদের জন্য 'ভিসা-ফ্রি' প্রবেশাধিকার দেওয়ার পর থেকে এটি অভিবাসনের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে।
৩. রেমিট্যান্সের গুরুত্ব
•যারা বিদেশে চলে গেছেন, তাদের পাঠানো ডলার বা ইউরো এখন কিউবায় থাকা তাদের পরিবারের টিকে থাকার প্রধান উৎস। কিউবার অর্থনীতি এখন অনেকাংশেই এই প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভর করছে।
•এই বড় ধরনের জনসংখ্যা হ্রাস কিউবার ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিউবার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বেশ জটিল মোড় নিয়েছে। নিচে এর প্রধান দিকগুলো তুলে ধরা হলো:
১. বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি (Political Landscape)
•নেতৃত্বের পরিবর্তন:
ফিদেল ও রাউল কাস্ত্রোর দীর্ঘ শাসনের পর এখন দেশটির নেতৃত্বে রয়েছেন মিগুয়েল ডিয়াজ-কানেল। যদিও তিনি কাস্ত্রো পরিবারের বাইরের প্রথম প্রেসিডেন্ট, তবুও কিউবার কমিউনিস্ট পার্টি (PCC) এখনো দেশের সব ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে।
•জনবিক্ষোভ ও কঠোর অবস্থান:
২০২১ সালের জুলাই মাসে কিউবায় ঐতিহাসিক এক বিশাল বিক্ষোভ হয়, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে প্রথম। সরকার এই বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করে এবং শত শত মানুষকে কারাদণ্ড দেয়। বর্তমানে বিরোধী মত প্রকাশের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।
•নতুন সংবিধান ও সংস্কার:
২০১৯ সালের নতুন সংবিধান অনুযায়ী ব্যক্তিগত সম্পত্তির স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রীর পদ পুনরায় চালু করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিকভাবে দেশটি এখনো একদলীয় সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই রয়েছে।
২. ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা (Future Outlook)
কিউবার ভবিষ্যৎ মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে:
•অর্থনৈতিক উদারীকরণ:
সরকার বাধ্য হয়ে ধীরে ধীরে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ ছাড়ছে। যদি বেসরকারি খাতকে (MSMEs) আরও বেশি সুযোগ দেওয়া হয় এবং বিদেশি বিনিয়োগ সহজ করা হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
•যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক:
২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল কিউবার ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা (Embargo) শিথিল করে, তবে কিউবার পর্যটন ও বাণিজ্যিক খাত দ্রুত প্রাণ ফিরে পাবে।
•চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা:
কিউবা বর্তমানে কৌশলগতভাবে চীন ও রাশিয়ার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ভবিষ্যতে এই দেশগুলোর কাছ থেকে বড় ধরনের বিনিয়োগ বা জ্বালানি সহায়তা পাওয়া কিউবার টিকে থাকার জন্য চাবিকাঠি হতে পারে।
•সামাজিক পরিবর্তন:
ইন্টারনেটের প্রসারের ফলে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বাড়ছে। ভবিষ্যতে এই জনচাপ সরকারকে আরও বড় কোনো সংস্কার বা পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, কিউবা এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। হয় তাকে কঠোর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে ধীরগতির অর্থনৈতিক সংস্কার চালিয়ে যেতে হবে, অথবা বড় কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
মতামতে সকলে স্বাগত।
***
ইউনিভার্সাল লাইফ ম্যানেজমেন্ট (ULM) সংস্থার প্রস্তাবিত 'সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থা' (The Complete Solution System) হলো ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এবং বৈশ্বিক পর্যায়ের সকল সমস্যার মূল থেকে সমাধানের একটি সামগ্রিক কাঠামো। এটি মূলত একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মডেল যা মানুষের বর্তমানের ৯৯% সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে চায়। এই ব্যবস্থাটি ছয়টি প্রধান অঙ্গ— অর্থনীতি, শিক্ষা, রাজনীতি, পরিবার, সমাজ এবং দর্শনের সমন্বয়ে গঠিত।
এই ব্যবস্থাটির কাঠামো কেমন এবং কীভাবে কাজ করবে সে বিষয়ে সমস্ত তথ্য "সম্পূর্ণ সমাধান" পুস্তক ছাড়াও একাধিক আর্টিকেলে ও ভিডিওতে করা হয়েছে। আলোচনা-সমীক্ষার জন্য সকলে স্বাগত। কাগজের পেপারব্যাক পুস্তক অ্যামাজন ও ফ্লিপকার্ট-এ উপলব্ধ রয়েছে। পিডিএফ কপি বিনামূল্যে সকলের জন্য রয়েছে।
যোগাযোগ- 9830925502
***





মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন