সমাজব্যবস্থার চ্যালেঞ্জসমূহ এবং সমাধানের নতুন দৃষ্টিকোণ
সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থা
নতুন সামাজিক
রাজনৈতিক অর্থব্যবস্থা
রচনা– প্রেমজীৎ সিরোহী
সংকলন– অম্বরিশ মিশ্র
অনুবাদ– মাধব রঞ্জন সরকার
তাহলে সমাধান কী? আমরা কি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে
পারি না যা স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক এবং শান্তি সৃষ্টি করবে? আমরা সকলেই তো মানুষ এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছেই এই সমস্যা কবলিত শৃঙ্খলকে
পরিবর্তন করার ক্ষমতা রয়েছে। অবশেষে এইসমস্ত সমস্যাগুলি মানব অস্তিত্বকে প্রবলভাবে
প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমরা কীভাবে মানব জাতিকে জীবনযাপনের
পক্ষে উপযুক্ত এবং উপভোগ্য করে তুলুব, এটিই আমাদের
মৌলিক সমস্যা। যদি এই ব্যবস্থা সমস্ত নাগরিককে তাদের ইচ্ছেমত
জীবনযাপন করতে সহায়তা করে এবং তা যদি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থা হিসেবে গঠিত
হয়, তবে তাকে একটি সফল ব্যবস্থা বলা যাবে। যদি সম্পদের ব্যবস্থাপনা অনুচিত হয় এবং মানুষ ইচ্ছে অনুযায়ী জীবনযাপন থেকে বঞ্চিত হয়, তবে তাকে একটি ব্যর্থ ব্যবস্থা বলা হবে।
মৌলিকভাবে, এর অর্থ হচ্ছে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক উভয় ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করতে হবে। এখানে আর্থিক এবং রাজনৈতিক কাঠামোর মূল তাৎপর্য হচ্ছে আমরা কীভাবে সম্পদ উৎপাদন ও বণ্টন করব। যদি আমরা সমাজের সম্পদের সৃজন এবং বণ্টনকে গণতান্ত্রিক করতে পারি তাহলে আমরা মানবিক সমন্বয় সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান করতে পেরেছি এমনটি বলতে পারব। সুখী জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলির অন্যায়পূর্ণ বন্টন সমস্তরকম সমস্যার দিকে ধাবিত করে। যেমন– প্রতিস্পর্ধা, হিংসা, ঈর্ষা, লোভ, অন্যায়, অসদাচরণ, দুর্নীতি, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ইত্যাদি। আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষাগত কাঠামোর একটি প্রতিস্পর্ধামূলক আধার রয়েছে, যা মানুষকে উন্নত জীবনের আশা দেখিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ব্যবস্থা শুধুমাত্র কিছু মানুষকেই বিত্তশালী করতে সক্ষম হয়েছে। তিন ভাগ জনসংখ্যার সম্মিলিত সম্পদের চেয়েও ওই স্বল্প মানুষের সম্পদ অধিক। যদি আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো ভালো মানুষ এই সম্পদ ত্যাগ করেও দেন, তৎক্ষণাৎ কেউ না কেউ তা ধরে নিতে এবং পরিচালনা করতে উদগ্রীব হয়ে উঠবে। কেননা অর্থনীতির মূল কাঠামোই হচ্ছে এমনতর। অর্থনৈতিক কাঠামোই যদি অগণতান্ত্রিক হয় তাহলে কীভাবে আমরা জীবনের জন্য উন্নত কিছুর আশা করতে পারি? যদি নীতি ও সিদ্ধান্ত সকল নাগরিকের কল্যাণের জন্য না হয়, তাহলে আমরা কীভাবে আন্তরিকভাবে সৌহার্দপূর্ণ সহযোগিতার আশা করতে পারি? জীবন যদি ক্রমাগত সংঘর্ষ, হুমকি এবং নিরাপত্তাহীনতায় পূর্ণ হয় তবে এমন জীবনের অর্থ কী? যদি সমষ্টিক অস্তিত্ব বিক্ষিপ্ত অবস্থায় থাকে তাহলে কীভাবে একজনের ব্যক্তিগত জীবন সম্পূর্ণরূপে প্রস্ফুটিত হতে পারবে অথবা সফল হতে পারবে? জীবনের জন্য পরম সুখ অন্বেষণের জন্য বৃহৎ পরিসরে সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। সহযোগিতার প্রতিষ্ঠা কেবলমাত্র একটি সুচিন্তিত, সম্পূর্ণ ব্যবস্থাতেই সম্ভব।
প্রস্তাবিত ফলাফল
১. জীবন আপনার ইচ্ছে অনুযায়ী হবে
বর্তমান যুগে ব্যক্তি নিজের সময় অথবা অন্যভাবে বললে নিজের জীবন উৎসর্গ করে দেয়। চাকরির বাইরেও তারা অতিরিক্ত শ্রম প্রদান করে। ব্যক্তি
নিজের এবং পরিবারের জন্য কিছু সুখসুবিধা প্রদানের জন্য এমনটি করে থাকে। আমরা বর্তমানে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের জন্য কর্ম করছি।
বর্তমান ব্যবস্থার প্রণালী এমনই নেতিবাচক যে অর্থ কেবলমাত্র কয়েকজনের জন্যই উৎপন্ন
হয়ে চলেছে, একটি সঠিক ব্যবস্থা থাকলে তা অন্তিম
নাগরিক পর্যন্ত বিস্তার লাভ করতে পারত। এইজন্য আপনি কঠোর
পরিশ্রম করলেও যে বিত্তশালী হবেন তার কোনো গ্যারান্টি নেই। কেননা বর্তমান ব্যবস্থা
অনুযায়ী কেবলমাত্র কিছু মানুষই ধনী হয়ে উঠতে পারে। আবার, বিত্তশালী হয়ে গেলেও যে আপনি বিত্তশালী হয়েই থাকবেন তারও কোনো
নিশ্চয়তা নেই। এমনতর অবস্থা জীবনকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে এবং দুশ্চিন্তায়
ভরিয়ে দেয়।
বর্তমানে কিছু বিত্তশালী
মানুষ অনেক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা সত্ত্বেও তারা নিরাপত্তাহীনতা, অনিশ্চয়তা, দূষণ এবং অত্যধিক মানসিক চাপ নিয়ে কর্ম করে
চলে, কেননা পেছনে বহুসংখ্যক বঞ্চিত অবস্থায় রয়েছে। এমন কিছু উপাদান যা মানুষের
জীবনকে পরিপূর্ণ করে তোলে, আনন্দ এবং তৃপ্তি নিয়ে
আসে, তা সম্পন্ন এবং বিত্তশালীদের কাছেও অনুপলব্ধ।
তারাও জীবনকে সম্পূর্ণরূপে উপভোগ করতে পারছে না। এমনকি কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা (প্রতিষ্ঠিত
জ্ঞান),
কাঙ্ক্ষিত জীবিকা (কর্ম), কাঙ্ক্ষিত বস্তু/পরিষেবা (ভোগ) এবং কাঙ্খিত বিশ্রাম (আরাম) সর্বাধিক বিত্তশালীদের কাছেও সম্পূর্ণ উপলব্ধ নয়।
সুখ সৃষ্টির
জন্য মানুষের সাহচর্য দ্বারা সম্মিলিত সহযোগিতার প্রয়োজন হয়, এটি শুধুমাত্র একটি দক্ষ ব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্ভব। কিন্তু
বর্তমান অর্থনীতিতে আমরা প্রতিযোগিতা করছি বলে এই ধরনের সহযোগিতা সম্ভব হয়ে উঠছে না। এই বৈরিতা বৈশ্বিক,
সামাজিক, পারিবারিক, ব্যক্তিগতসহ বলা যায় প্রতিটি স্তরে উপস্থিত।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থা
অনুযায়ী ব্যক্তি পছন্দের শিক্ষা, পছন্দের জীবিকা, প্রয়োজন অনুযায়ী বস্তু/পরিষেবা গ্রহণ করতে
সক্ষম হবে। এইসকল সুবিধা গ্রহণের জন্য কোনো প্রকার অর্থের
প্রয়োজন হবে না। প্রবন্ধন এমনভাবে হবে যেন একজনের কর্ম অপরজনের জন্য উপভোগের
বিষয় হয়ে ওঠে। সেইজন্য এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সকলকে সকলের জন্য সুখসুবিধা নির্মাণ করার সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হবে। ব্যক্তি স্বয়ং নিজের রুচি অনুযায়ী সেইসব সুখসুবিধা
উপভোগ করতে পারবে। কোনো ব্যক্তিকে ইচ্ছের অতিরিক্ত শ্রম প্রদান করতে হবে না।
২. সকল ব্যক্তি আর্থিকরূপে স্বতন্ত্র হবে
সকল পরিস্থিতিতে
ব্যক্তি সিস্টেম থেকে শুধুমাত্র সুবিধাই গ্রহণ করতে থাকবে, সমাজের স্বার্থে তাকে কোনোপ্রকার ত্যাগ স্বীকার করতে হবে না। ব্যবস্থার কাঠামো এমন
হবে জনস্বার্থ পূরণ আপনিই হয়ে যাবে। জনস্বার্থই এই ব্যবস্থার উপাধি।
৩. সার্বজনীন গণতন্ত্র এবং সমতার অনুভব
সুতরাং প্রস্তাবিত সমাধান এক বৌদ্ধিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে এবং ব্যক্তিগত পছন্দ অনুসারে অধিকার এবং দায়িত্ব প্রদান করতে সক্ষম হবে। সকল নাগরিকের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সুযোগ-সুবিধা, সেবা/পরিষেবা এবং নিরাপত্তা প্রাপ্ত হবে।
৪. সকল প্রকার নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং শান্তি
নতুন ব্যবস্থায়
মানুষের মধ্যে কোনো ধরনের নেতিবাচকতা উৎপন্ন হবে না, যা বর্তমানে সম্পদের অনুপযুক্ত প্রবন্ধনের কারণে ঘটে চলেছে। এই নেতিবাচকতার কারণে প্রত্যেকেই নিজের জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করছে যা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের রূপ নিয়ে
থাকে। যখন সকলে সুখসুবিধার লাভ নিতে থাকবে তখন ভবিষ্যতের জন্য নিরাপত্তার অনুভূতি আপনিই
গড়ে উঠবে। পরস্পরের মধ্যে সত্য, ভালবাসা, সহযোগিতা, উষ্ণতা ও পারস্পরিক আস্থার ইতিবাচক ভাবনা
তৈরি হবে। জনগণ সরকার এবং রাষ্ট্রের মধ্যে আস্থা উৎপন্ন করতে সক্ষম হবে। অতঃপর এই সংবেদনশীল
কাঠামো প্রকৃত গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে, যেন জীবনের আনন্দ সকলেই উপভোগ করতে পারে।
এটি কীভাবে সম্ভব তা পরবর্তী নিবন্ধগুলোতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। প্রথমে বর্তমান অর্থনীতির সীমাবদ্ধতাকে জেনে নেওয়া জরুরী। আমাদের বুঝতে হবে বিশ্বশান্তি, পরিবেশগত স্থিরতা এবং মানবজাতির কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া দ্বারা সম্ভব নয়। চলুন পরবর্তী প্রবন্ধে বিস্তারিত জেনে নিই।
***
মূল হিন্দি পুস্তক সম্পূর্ণ সমাধানের রচয়িতা দিল্লী নিবাসী দার্শনিক প্রেমজীৎ সিরোহী একজন লেখক, বক্তা এবং ULM (UNIVERSAL LIFE MANAGEMENT) সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা। বর্তমান বিশ্বের মুখোমুখি চ্যালেঞ্জগুলির সমাধান প্রদানে এই সংস্থা একটি থিংকট্যাঙ্ক হিসেবে কাজ করে চলেছে। সিরোহী মহাশয় তাঁর প্রথম পুস্তক ‘সম্পূর্ণ সমাধান’– এক নতুন সামাজিক রাজনৈতিক অর্থব্যবস্থার মাধ্যমে মানব জীবনের সকল সমস্যাগুলি সমাধানের জন্য একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থাকে উপস্থাপন করেছেন। যেখানে সকল মানুষ সমানরূপে সুখী হতে পারবে। তিনি বক্তারূপে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন মঞ্চে প্রত্যেকের কাছে এই সমাধানকে পৌঁছে দেওয়ার অভিযানও শুরু করেছেন। তাঁর বক্তব্যগুলিতে অর্থশাস্ত্র, রাজনীতিশাস্ত্র, সমাজশাস্ত্র, দর্শনশাস্ত্র এবং মনোবিজ্ঞানের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলীর সমাবেশ রয়েছে। মনুষ্য জীবনের চ্যালেঞ্জগুলির কেন্দ্রে রয়েছে ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থানির্ভর সমাধান প্রদানে তিনি বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তাঁর কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে এক নতুন অর্থব্যবস্থা, যার দ্বারা সকল মানুষ নিজেদের ঈপ্সিত জীবন-যাপন করতে পারবে এবং সামাজিক সুখসুবিধাগুলির জন্য ন্যায়পূর্ণ উৎপাদন এবং বিতরণ সম্ভবপর হবে। মানব চেতনা সম্পর্কে তাঁর সুগভীর বোধ রয়েছে। তিনি ধ্যান, আধ্যাত্ম ইত্যাদি বিষয়ের পথপ্রদর্শকও বটে। তিনি আত্মজ্ঞানে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের নিয়েও একটি কার্যক্রম বিকশিত করেছেন। যেন তারা স্বয়ং উপলব্ধি করতে পারে– আমরা কে, কেন বা কিরূপে কর্ম সম্পাদন করে থাকি এবং এই জগতে আমরা কেন এসেছি। তাঁর বিষয়বস্তু এবং সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন মৌলিক ও অসামান্য, অপরদিকে তা একাডেমিক পরম্পরায় অনুপলব্ধ। ইতিমধ্যে ‘সম্পূর্ণ সমাধান’ পুস্তকটি চারটি ভাষায় উপলব্ধ হয়ে গিয়েছে। আরও কিছু ভাষায় অনুবাদের কাজ চলছে। তাঁর দ্বিতীয় পুস্তকের নাম ‘সম্পূর্ণ জীবন দর্শন - সুখী জীবনের অজ্ঞাত সুত্র’, যেখানে তিনি এক নতুন দর্শনের সাথে পরিচয় করিয়েছেন। লেখকের আগামী পুস্তকের নাম ‘এক দার্শনিকের জীবনযাত্রা’।
***
ইতিমধ্যে ‘সম্পূর্ণ সমাধান’ পুস্তক হিন্দি থেকে ইংরেজি, রাশিয়ান, বাংলা, মারাঠি, গুজরাতি সহ একাধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। অন্যান্য ভাষায় অনুবাদের কাজ চলছে। সকলের অধ্যয়নের সুবিধার্থে এই পুস্তকের E-BOOK/PDF COPY বিনামুল্যে প্রদান করা হয়েছে। একইসাথে কাগজের পুস্তক Amazon এবং Flipkart–এ উপলব্ধ রয়েছে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন