ULM প্রচারিত নতুন ব্যবস্থার সমীক্ষায় যে প্রশ্নগুলো বারংবার ফিরে আসে। পড়ুন একত্রে ৪৫টি প্রশ্ন এবং উত্তর
প্রশ্নোত্তরে
সম্পূর্ণ সমাধান
প্রথম বাংলা সংস্করণ ২৫ নভেম্বর ২০২১
সাক্ষাৎকার
প্রেমজীৎ সিরোহী
(দার্শনিক, বক্তা, লেখক এবং ULM সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা)
প্রশ্নকর্তা এবং সংকলক
অম্বরিশ মিশ্র
(ইংরিজি ভাষায় সম্পূর্ণ সমাধান পুস্তকের সহলেখক এবং অনুবাদক)
বাংলা অনুবাদক
মাধব রঞ্জন সরকার
(বাংলা ভাষায় সম্পূর্ণ সমাধান পুস্তকের অনুবাদক)
“একসাথে মিলেই আমরা সকল সুখ প্রাপ্ত করতে পারি। যদি একটি সঠিক এবং সম্পূর্ণ ব্যবস্থা থাকে”– প্রেমজীৎ সিরোহী
বিষয়সূচী
v সাধারণ প্রশ্নাবলী
v আর্থিক মডেল
· বর্তমান সময় অবধি যে আর্থিক নীতি
· নতুন অর্থশাস্ত্রে মুখ্য নীতির পরিবর্তন
v রাজনৈতিক মডেল
v দার্শনিক মডেল
v শিক্ষাগত মডেল
v গবেষণা ও অনুসন্ধান
v বর্তমান ব্যবস্থা থেকে নতুন ব্যবস্থায় স্থানান্তরকাল
v
পরিবেশ বিষয়ক প্রশ্ন এবং
সামাজিক মডেল
“মানুষকে সংশোধন করার প্রয়োজন নেই,
ব্যবস্থা জনগণের সুবিধা অনুযায়ী হওয়া উচিৎ” - প্রেমজীৎ সিরোহী
সাধারণ প্রশ্নাবলী/GENERAL QUESTIONS
১. সংক্ষেপে সম্পূর্ণ সমাধান কি?
সম্পূর্ণ সমাধান হচ্ছে সকলের সুখী এবং সমৃদ্ধশালী জীবনের জন্য এক নতুন ব্যবস্থা। সমগ্র বিশ্বে বসুধৈব কুটুম্বকম বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এটি একটি বিশ্বস্তরীয় কনসেপ্ট। সম্পূর্ণ সমাধানের অর্থ হচ্ছে সকলে যেন নিজেদের ইচ্ছে অনুযায়ী জীবন-যাপন করতে পারে এবং সকল আনন্দ উপভোগ করতে পারে। প্রত্যেক ব্যক্তি যেন পছন্দের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, পছন্দের জীবিকা সম্পাদন করতে পারে, পছন্দের বস্তু এবং পরিষেবা ব্যবহার করতে পারে। অর্থাৎ নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী সমস্ত সুখসুবিধা উপভোগ করতে পারে। এই ব্যবস্থায় প্রতিটি ব্যক্তি আর্থিক দিক দিয়ে স্বতন্ত্র থাকবে। সকলে বাস্তবিক গণতন্ত্র এবং সাম্যতা অনুভব করবে। সকলের জীবনে সমস্ত রকম সুরক্ষা, স্বতন্ত্রতা এবং শান্তি বজায় থাকবে। কোনো হিংসা, দূষণ, দুশ্চিন্তা ইত্যাদি থাকবে না এবং সমস্ত প্রকার সুখ নিরন্তর সকলের জন্য সর্বদা উপলব্ধ থাকবে।
এবার প্রশ্ন হল এতসব কিভাবে প্রাপ্ত হবে? এজন্য সম্পূর্ণ সমাধান নামে একটি নতুন ব্যবস্থা উপস্থাপন করা হয়েছে যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদ এবং মানব সম্পদের মেলবন্ধনে
সামাজিক সম্পদ নির্মাণের জন্য এক বিকেন্দ্রীভূত পরিকাঠামো সৃজন করা হয়েছে, কিন্তু ব্যবস্থার বাঁধনটিকে কেন্দ্রীভূত রাখা হয়েছে। সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রণালী সত্ত্বেও সেখানে বিভিন্নতা এবং একরূপতা দুইই স্থান পেয়েছে। বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা রেখেও এটিকে একেন্দ্রীভূত
প্রণালী দ্বারা প্রবন্ধন করা হয়েছে। এটি এমন এক প্রণালী
যেখানে ক্ষমতা সর্বদা নাগরিকের কাছে থাকবে এবং প্রবন্ধন বা প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে কেন্দ্রীভূত
রাখা হয়েছে। এই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে বর্তমানে যেসব
সমস্যাগুলির মুখোমুখি আমরা প্রতিদিন হয়ে চলেছি সেসব দূর হয়ে যাবে। এমনকি ভবিষ্যতেও কোনো সমস্যার উৎপত্তি হবে না। সুতরাং নতুন ব্যবস্থার
অর্থ হচ্ছে এক নতুন অর্থশাস্ত্র, নতুন রাজনৈতিক মডেল, নতুন সামাজিক মডেল,
নতুন শিক্ষা মডেল এবং নতুন পারিবারিক মডেল। সর্বোপরি সমস্ত মডেলের মূলে রয়েছে এক নতুন
দর্শন। উক্ত বিষয়গুলির সংযুক্ত রূপ হচ্ছে ‘সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থা’।
২. Universal Life Management (ULM) সংস্থার কার্য এবং লক্ষ্য কি?
ULM সংস্থার কাজ হচ্ছে সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থাকে সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এরপর সকলে যদি দাবী করে এই ব্যবস্থা আসুক তবে তা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কাজ করা। একই সাথে ULM সংস্থা এমন একটি বিশ্বয়কর ‘মুক্ত মঞ্চ’ বিকশিত করেছে যেখানে বিশ্বের সমস্ত মনীষীরা মানব কল্যানের জন্য সমাধানসূত্র এবং গবেষণামূলক তথ্য উপস্থাপন করতে পারে। এই আলোচনা থেকে জনগণ বৌদ্ধিক জ্ঞান আহরণ করুক এটিই মুক্ত মঞ্চের উদ্দেশ্য। এই মঞ্চে সমস্ত আলোচনা এই পদ্ধতি অনুযায়ী করা হয় যেন মানুষের মধ্যে স্পষ্টতা বিকশিত হয় এবং সকলে যেন একটি সঠিক ব্যবস্থার জন্য নিজেদের মতামত প্রদান করতে পারে।
এই সংস্থা ব্যবস্থা এবং জীবন দর্শন সম্পর্কিত গবেষণামূলক তথ্য সমাজের কাছে উপস্থাপন করে চলেছে যেন সকলকে সুখী করার জন্য একটি চিন্তাশীল নবজাগরণ ঘটে। এই গবেষণামূলক বিষয়গুলিকে পুস্তক, গবেষণাপত্র, সাক্ষাৎকার, অনলাইন কোর্স, ওয়ার্কশপ অথবা অনলাইন শিবির, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা, ফিল্ম বা ভিডিও, অডিও অথবা গল্পের মাধ্যমে ইত্যাদি মাধ্যমে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এইভাবে ULM সংস্থার কার্যপ্রণালী বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলিকে মোকাবিলার জন্য এক ব্যবস্থাগত সমাধানের পরম্পরাকে বিকশিত করে চলেছে। একইসাথে সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে যোগ্য নেতৃত্বকে উদ্দীপিত করার দায়িত্বও পালন করে চলেছে যেন সমাজ সঠিক পথে অগ্রসর হতে পারে।
৩. আপনার কেন মনে হয় বর্তমান ব্যবস্থাকে বদলানোর মত একটি বড় পদক্ষেপ নেবার প্রয়োজন রয়েছে?
আমি বর্তমান ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে বদলানোর প্রয়োজন এইজন্য মনে করি। কেননা আমি সমস্যার গভীরে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে দেখেছি এই সংসারে সকল বস্তু একে অপরের সাথে জুড়ে রয়েছে। কোনো একটি ব্যবস্থা অথবা কনসেপ্টের একটি থিম থাকে। তেমনি বর্তমান ব্যবস্থারও একটি থিম রয়েছে। আমরা যদি কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে বদলেও দিই তাহলেও অন্যস্থানে কোনো না কোনো দুষ্ট পরিণাম উৎপন্ন হতে শুরু করে। অর্থাৎ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। আমার রচিত ব্যবস্থার পরিবর্তন এই প্রকার থিম অনুযায়ী হবে না।
যদি কোনো কিছুর মূলে পরিবর্তন করি তবেই সম্পূর্ণ থিম বদলে যাবে। বর্তমানে যে কনসেপ্ট রয়েছে তা মূল স্থানে যথাযথ নেই। মূল বিষয়টিকে সঠিক করতে গেলে সম্পূর্ণ ব্যবস্থাকেই বদলাতে হবে। এছাড়া অন্য উপায় নেই। যদি মূল যায়গাটি সঠিক থাকে এবং উপর থেকে এক-আধ স্থানে অসঙ্গতি থাকে তবে এক-আধ স্থানে সংশোধন করা যেতে পারে। কিন্তু মূল স্থানে যদি অসঙ্গতি থাকে তবে তো সম্পূর্ণ বিষয়টিকেই বদলাতে হবে, তাই না?
৪. কোনো দেশে নেতৃত্ব করার জন্য সৎ মানুষের প্রয়োজন হয়। শেষ অবধি কিছু মানুষই মূলত নতুন ব্যবস্থাকে পরিচালনা করবে। তারা যদি সৎ এবং সঠিক না হন তবে তো নতুন ব্যবস্থাও সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারবে না।
নতুন ব্যবস্থায় সৎ মানুষের প্রয়োজন পড়বে না বরং সক্ষম ব্যক্তিদের প্রয়োজন হবে। যাদের উক্ত পদে কর্ম করার ক্ষমতা থাকবে কেবলমাত্র তাদেরকেই প্রয়োজন হবে। সৎ মানুষ বা অসৎ মানুষ বলে কিছু হয় না। খারাপ পরিস্থিতিতেই সৎ বা অসৎ নিয়ে কথা ওঠে। খারাপ ব্যবস্থাতেই অধিকতর খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হতে থাকে এবং ৯৯% মানুষ অসৎ হয়ে যায়। ১% মানুষ অবশিষ্ট থাকে যাদের সততা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বজায় থাকে। কিন্তু ওই ১%
মানুষ কখনই নেতৃত্ব পদে পৌঁছাতে পারে না। প্রথমত,
নির্বাচন নির্ভুলভাবে সম্পন্ন হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কোনো প্রকারে সম্পন্ন হয়ে গেলেও ৯৯% মানুষ নিজেদের লাভের জন্য অসৎ মানুষদের পাল্লায় পড়ে অসৎ পথই গ্রহণ করে। অর্থাৎ অসৎ ব্যক্তি অসৎ ব্যক্তিকে নির্বাচন করে। কেননা তারা মনে করে এতে অধিক লাভ হবে। খারাপ ব্যবস্থাতেই সৎ-অসতের বিষয়টি আসে,
ভাল ব্যবস্থায় তা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। সঠিক ব্যবস্থায় সক্ষমতার বিষয়টি প্রাসঙ্গিকতা পায়।
৫. সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ বিশেষত্ব কি?
সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থা ব্যক্তিকে পূর্ণ এবং পরম স্বাধীনতা প্রদান করে। এটিই মূল বিশেষত্ব। পরম স্বাধীনতার অর্থ হচ্ছে যে যেমনভাবে জীবন যাপন করতে চায়,
যেমন প্রকার সুখ পেতে চায় তেমনভাবেই সমস্ত কিছু এই ব্যবস্থায় সর্বদা উপলব্ধ থাকবে। সমস্ত ক্ষমতা সর্বদা জনগণের কাছে নিহিত থাকবে যা এই ব্যবস্থার সৌন্দর্য। মনুষ্য মূল অবস্থায় যেমন রয়েছে সেই অনুযায়ী এই ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। মানুষকে ব্যবস্থা অনুযায়ী মানিয়ে নেওয়ার মত কোনো প্রকার সংগ্রামের প্রয়োজন নেই।
৬. এমনতর ব্যবস্থায় বিত্তবান এবং শক্তিশালী ব্যক্তি দ্বারা কি প্রতিরোধ আসবে না?
তাদের দ্বারা কোনো প্রতিরোধ আসবে না। কেননা নতুন ব্যবস্থায় তাদের জীবন বর্তমান অবস্থার তুলনায় অধিক সুখদায়ী হয়ে যাবে। সেই কারণেই কোনো বিরোধ হবে না। ফলে নতুন ব্যবস্থাটিকে জেনে বুঝে নিলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে। বর্তমান ব্যবস্থায় সামান্য কিছু সুবিধা গ্রহণ করার জন্য মানুষকে বহু অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থাকে বুঝে নেবার পর আপনি দেখবেন এটি প্রতিটি ব্যক্তির জন্যই লাভকারী হবে, কোনো প্রকার লোকসান ছাড়াই।
আর্থিক মডেল/ECONOMICAL MODEL
৭. বর্তমান অর্থশাস্ত্রে যেসব মুখ্য সমস্যা আপনার চোখে পড়েছে সেগুলি কি কি?
বর্তমান অর্থশাস্ত্র কেবলমাত্র ১০%
মানুষকে entertain করে এবং ৯০%
মানুষকে সুবিধার বাইরে রাখে। অর্থাৎ বেশীরভাগ মানুষকে ক্রীতদাস, শ্রমিক, দরিদ্র ইত্যাদি বানিয়ে রাখে। এটি বর্তমান অর্থশাস্ত্রের সবচাইতে বড় অসুবিধা। এই অর্থশাস্ত্র কেবলমাত্র ১০%
মানুষের জন্য। এখানে ৯০%
মানুষকে ১০% মানুষ মিলে নিজেদের সম্পদ বানিয়ে রাখে। এটিই বর্তমান অর্থশাস্ত্রের সবচাইতে বড় দুর্বলতা। এটিকে দ্বিপাক্ষিক অসুবিধা বা খারাপ অর্থশাস্ত্র যাই বলুন না কেন।
৮. আর্থিক অসমতাকে কমিয়ে আনার জন্য বিত্তশালীদের উপর অধিক পরিমাণ কর আরোপ করাই তো সরল উপায়। এই উপায়ে সরকার দরিদ্রতা কমিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম চালাতে পারে এবং সামাজিক সুরক্ষা ইত্যাদি প্রদান করতে পারে?
এইসব কার্যক্রম তো সরকার একটি সীমা অবধি করেই চলেছে। এটি খুব একটা সঠিক উপায় নয়। এতে একটি বর্গের উপর বিভিন্ন রকম চাপ পড়ে। কেননা ব্যবস্থাই এমনভাবে তৈরি হয়েছে। প্রথমে আপনি কিছু মানুষকে বিত্তশালী হবার সুযোগ করে দিচ্ছেন, এরপর তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের প্রয়াস করছেন। এর ফলে তাদের উপর একপ্রকার মানসিক প্রভাব পড়ে। তাদের মনে হয় নিজেদের লভ্যাংশ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। তারা তখন এটিকে বন্ধ করার চেষ্টা করে এবং ক্ষতি পূরণ করার চেষ্টা করে। এর থেকেই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব এবং অসঙ্গতি তৈরি হয়। ফলে অধিক মুনাফার লোভে কালোবাজারি, দুর্নীতিসহ, মানি লন্ডারিং বা অবৈধ অর্থনৈতিক
কার্যক্রমসহ বিভিন্ন অপরাধ সংগঠিত হতে থাকে। সরকার নিয়মনীতি প্রণয়ন করে যত পরিমাণ অর্থ বিত্তশালীদের কাছ থেকে আদায় করার চেষ্টা করবে ততই সরকার এবং বিত্তশালীদের মধ্যে দন্ড অধিক বৃদ্ধি পাবে। যতগুলি রাজনৈতিক দল সরকার পরিচালনা করছে তাদেরকে নিজেদের দল চালানোর জন্য অর্থের প্রয়োজন হয় যা বিত্তশালীদের কাছ থেকে আসে। মোটকথা, দুপক্ষের মধ্যে একপ্রকার পরস্পরসম্বন্ধ তৈরি হয়। তেমন ঘটনাও বাস্তবে সম্ভব নয় যেখানে সরকার চাইলেই বিত্তশালীদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে গরীবদের দিয়ে দেবে।
দ্বিতীয়ত, বর্তমান অর্থশাস্ত্রের যে নিয়মনীতি রয়েছে তাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ বস্তু/পরিষেবা উৎপাদন হয় না যতটা হলে সকলের চাহিদা পূরণ হবে। সরকার ১০% বিত্তশালীদের কাছ থেকে অর্থ এনে গরীবদের বিলিয়ে দিলেও তা মরুভূমিতে এক বিন্দু জল ফেলার মতনই হবে। বিশেষ কিছু পরিবর্তন আসবে না। এর চাইতে ভাল একটি সঠিক ব্যবস্থা তৈরি করে নেওয়া যেখানে উৎপাদন ততটাই হবে যতটা বাস্তবে চাহিদা রয়েছে। যদি অর্থশাস্ত্রকে পরিবর্তন না করা হয় তবে টাকা সেই ১০% মানুষের মধ্যেই কেন্দ্রীভূত থেকে যাবে। এটিই বর্তমান অর্থশাস্ত্রের স্বভাব।
৯. ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম (UBI) নিয়ে আপনার বিচার বিবেচনা কি?
বর্তমান ব্যবস্থা
চলাকালীন সময়ে ‘ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম’ একটি ভাল পদক্ষেপ, যদি এটির সঠিক আর্থিক পরিকল্পনা করা
যায়। আপনি যদি বর্তমান ব্যবস্থাকে এবং বর্তমান অর্থনীতিকে
চলমান রেখে দেন, তবে ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম দ্বারা জীবনস্তর ধীরে ধীরে বর্তমানের
তুলনায় কিছুটা এগিয়ে যাবে। যদিও সেখানেও অসমতা-বিষমতা থাকবে, শোষণ-নিপীড়ন,
উঁচু-নিচু মনোভাব ইত্যাদি অসুবিধা থাকবে। তারপরও বলা যায় অপরাধ কিছুটা
কমে যাবে। মানুষ তুলনায় কিছুটা কম অসুস্থ্য হবে এবং জীবনস্তর বর্তমান
সময় থেকে কিছুটা ভাল হয়ে যাবে। এইসব দিক দিয়ে UBI ভাল।
বিঃদ্রঃ ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম হচ্ছে এমন একটি পরিকল্পনা যেখানে
সরকার প্রতি মাসে সকল নাগরিককে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থরাশি প্রদান করবে।
১০. আপনার নতুন অর্থশাস্ত্র সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বলুন?
নতুন অর্থশাস্ত্র থেকে আমি সেইসব কারণসমূহকে সরিয়ে দিয়েছি যা নেতিবাচকতা তৈরি করে এবং সেইসব কারণগুলিকে জুড়ে দিয়েছি যা ইতিবাচকতা তৈরি করে। নতুন ব্যবস্থায় লগ্নী বা বিনিয়োগ নেই, মুদ্রা বা অর্থ নেই, পরস্পরের মধ্যে বিনিময় বা লেনদেন নেই, এমনকি বস্তু/পরিষেবা অথবা শ্রমের মুল্যাংকনও রাখা হয়নি। এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই বরং সহযোগিতা রয়েছে। সংক্ষেপে বললে এই হচ্ছে নতুন ব্যবস্থার গুণধর্ম। এমন অর্থশাস্ত্র যা সবদিক দিয়ে সকলকে পরম স্বাধীনতা প্রদান করে। তা সে পছন্দের শিক্ষা নিয়ে হোক,
পছন্দের জীবিকা নিয়ে হোক বা সকল সুখসুবিধা উপভোগ করা নিয়েই হোক না কেন। এই ব্যবস্থা মানুষকে অসীম স্বতন্ত্রতা প্রদান করে। এখানে অসীম কথার অর্থ হচ্ছে আপনি যতটা চাইবেন ততটা। আপনি এটিকে বলতে পারেন ‘sky is the limit’ কনসেপ্টের উপর নির্মিত। নতুন অর্থশাস্ত্রকে বোঝার আগে বর্তমান অর্থশাস্ত্রকে বুঝতে হবে। বর্তমান অর্থশাস্ত্রের পরিধিকে চিনতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে বিশ্বশান্তি, পরিবেশের ভারসাম্য এবং মানব কল্যানের বাঞ্ছিত পরিণাম বর্তমান অর্থশাস্ত্র দ্বারা কেন সম্ভব নয়।
বর্তমান সময় অবধি অর্থশাস্ত্রের মুখ্য নীতি
বর্তমান অর্থ ব্যবস্থার নীতি হচ্ছে যতখানি মুদ্রা অথবা অর্থ আপনার কাছে রয়েছে বাজার থেকে আপনি ততখানিই চাহিদা বা ডিমান্ড করতে পারবেন। অর্থাৎ, আমাদের চাহিদা অর্থের উপর নির্ভর করছে। এর ফলে বাজার থেকে আমরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পূর্ণ ডিমান্ড করতে পারি না এবং বাজারে চাহিদাও অনেক কম থাকে। ডিমান্ড যখন কম থাকে তখন বাজার সেই কম ডিমান্ডের ভিত্তিতেই বস্তু/পরিষেবা নির্মাণ করে। অর্থাৎ বস্তু/পরিষেবার নির্মাণ কম হয়। যখন বাজারে বস্তু/পরিষেবা নির্মাণ কম হয় তখন কর্মসংস্থানও কম উৎপন্ন হয়। যখন কর্মসংস্থান কম উৎপন্ন হয় তখন বেকারত্ব অধিক উৎপন্ন হয়। কেননা বর্তমান সমাজে উপার্জন তো কর্মসংস্থান থেকেই তৈরি হয়। যার কাছে কোনো জীবিকা নেই তার আয়ও নেই। অর্থাৎ উপার্জনহীন মানুষ তো সমাজের ভিক্ষার উপরই নির্ভর করে বেঁচে থাকে। কেননা সে তো বাজার থেকে কিছু ডিমান্ড করতে পারে না। যার উপার্জন স্বল্প সেও বাজার থেকে পর্যাপ্ত মাত্রায় ডিমান্ড করতে পারবে না। যে সামান্য কিছু মানুষের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ রয়েছে তারাই কেবলমাত্র নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পূর্ণ ডিমান্ড করতে পারে। এমন প্রকার আর্থিক নীতির কারণেই বাজারে সর্বদা চাহিদার অভাব থেকে যায়। কেননা বেশিরভাগ মানুষের আয় কম, আয় কম হবার কারণ কর্মসংস্থানের অভাব। অর্থাৎ দেশ-দুনিয়ার একটি বড় অংশ সর্বদাই গরীব অবস্থায় থাকে। বর্তমান অর্থনীতির এই হচ্ছে মূল কাহিনী। অধিকাংশ মানুষ গরীব এবং অসহায় জীবন যাপনে বাধ্য হয়। যতদিন পর্যন্ত এই আর্থিক নীতি বদলাবে না ততদিন পর্যন্ত সকলের সুখী হবার কোনো সম্ভাবনা নেই।
একথা তো আপনিও জানেন
যে মানুষের কাছে যত পরিমাণ অর্থ রয়েছে তার সবটা তারা কেনাকাটাতে খরচ করে না, কিছু ভবিষ্যতের জন্য জমিয়েও রাখে। কেননা বর্তমান ব্যবস্থায়
সে নিজের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত মনে করে না। সরকারও এই ক্ষেত্রে খুব কম কাজ করেছে, যার ফলে মানুষ নিজেদেরকে সুরক্ষিত অনুভব করছে না। ধরুন সে যদি ভবিষ্যতের
জন্য অর্থ নাও জমায় তাহলেও মানুষের কাছে যতটা অর্থ থাকবে সে শুধু ততটুকুই বাজার থেকে
ডিমান্ড করতে পারবে। জীবনে কখনো সর্বাধিক ডিমান্ড করতেই পারবে না যতক্ষণ অবধি
তার কাছে পর্যাপ্ত অর্থ না আসে। এমনকি অতীতের ইতিহাস পড়েও এটি বলা যায় যে আজ পর্যন্ত
এমনটা হয়নি যে সকল নাগরিকের কাছে কেনাকাটা করার পর্যাপ্ত অর্থশক্তি এসেছে। আমরা নীচের ছবিটি দেখলে
তা সহজেই বুঝতে পারব। এই নীতিকে মনোযোগসহ পর্যবেক্ষণ করলে আপনি বুঝতে পারবেন
যে যতদিন অবধি আমাদের চাহিদা অর্থের উপর নির্ভর করবে ততদিন অবধি আমরা পর্যাপ্ত ডিমান্ড
করতে পারব না। বস্তু এবং পরিষেবার পর্যাপ্ত নির্মাণ হবে না। এমনকি পর্যাপ্ত আয়ও উৎপন্ন
হতে পারবে না। নীচের চিত্রটি দেখলে তা ভাল করে বুঝতে পারবেন।
যখন পর্যাপ্ত আয়
তৈরি হবে না তখন পর্যাপ্ত ডিমান্ডও উৎপন্ন হবে না। এই কুচক্র সর্বদা এমন করেই
বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকবে। এই চক্র অধিকাংশ মানুষকে গরীব এবং অসহায় বানিয়ে রাখবে। বাস্তবে তেমনই রেখে চলেছে। চলুন এই বিষয়টিকে আরেকবার
বুঝে নিই। অর্থ আসে কর্মসংস্থান থেকে, কর্মসংস্থান আসে নির্মাণ থেকে, নির্মাণ হয়
বস্তু এবং পরিষেবার পর্যাপ্ত ডিমান্ড থেকে, ডিমান্ড আসে পর্যাপ্ত
অর্থ থেকে। এবার আপনি বুঝে গিয়েছেন যে সবার কাছে তো পর্যাপ্ত অর্থ
থাকবেই না তার কারণ সবার কাছে তো কর্মসংস্থান নেই। সবার কাছে কর্মসংস্থান
এজন্য নেই কেননা বাজারে তো পর্যাপ্ত ডিমান্ড নেই। আরে ভাই বাজারে যদি ডিমান্ড
ন্যুনতম থাকে তবে বাজার ন্যুনতম উৎপাদন করবে। ন্যুনতম উৎপাদনের জন্য
ন্যুনতম কর্মসংস্থান উৎপন্ন হবে। ফলে ন্যুনতম রোজগার উৎপন্ন হবে। এই কুচক্র এভাবেই চলতে
থাকবে। যতদিন অবধি এই নীতি থাকবে, এই কুচক্র এইভাবে অধিকাংশ
মানুষকে গরীব বানিয়ে রাখবে। এই নীতির কারণে সকল মানুষ কখনই সমৃদ্ধ হতে পারবে না। এবার আশা করি বুঝে গিয়েছেন
যে যতদিন এই নীতি থাকবে ততদিন আমরা সকলে গরীব অবস্থাতেই থাকব। যে কজন মানুষ ভোগ্যবস্তু
এবং পরিষেবা নির্মাণ করে কেবলমাত্র তারাই অত্যধিক ধনী হন। তারা সমগ্র জনসংখ্যার কেবলমাত্র
১ শতাংশ। এই নীতি থাকলে অধিকাংশ মানুষের গরীব অবস্থা কেউ দূর করতে
পারবে না। তাই নতুন নীতিটিকে বুঝুন, যা আমি বর্তমান নীতি থেকে কিছুটা পরিবর্তন করে রচনা করেছি।
অর্থশাস্ত্রে মুখ্য নীতির পরিবর্তন
নতুন ব্যবস্থায় আমি মুদ্রা নীতির একটি পরিবর্তন করেছি। ডিমান্ড করার জন্য যে অর্থ অতি আবশ্যক ছিল তা সরিয়ে দিয়েছি। অর্থাৎ নতুন নীতি অনুযায়ী সবাই নিজ নিজ ডিমান্ড পর্যাপ্ত পরিমাণে করতে পারবে। ডিমান্ড করার জন্য এখন আর অর্থের প্রয়োজন থাকবে না। এতে আমাদের সমাজে সকল বস্তুর চাহিদা ১০০ শতাংশ হয়ে যাবে। এই ১০০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করার জন্য সরকারকে ১০০ শতাংশ বস্তু এবং পরিষেবা উৎপাদন করতে হবে। ১০০ শতাংশ উৎপাদনের কারনে ১০০ শতাংশ কর্মসংস্থান তৈরি হয়ে যাবে। ফলে ১০০ শতাংশ কর্মসংস্থান প্রদান করতে হবে। কেননা ১০০ শতাংশ ডিমান্ডকে পূরণ করার জন্য ১০০ শতাংশ কারখানা, মেশিন, বিদ্যুৎ, সড়ক, জল, মালবাহক গাড়ি এবং বহু বস্তু ও পরিষেবার প্রয়োজন হবে। এই সব প্রয়োজনের জন্য বহু মানুষের প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ সোজা কথায় বললে সরকারের কাছে ১০০ শতাংশ কর্মসংস্থান সর্বদা তৈরি হয়ে থাকবে। সকলের জন্য কর্মসংস্থান হবে। অন্য ভাবে বললে সবাই সমৃদ্ধ হবে। নীচের চিত্রটি দেখলে তা ভাল করে বুঝতে পারবেন।
এবার নিশ্চয়ই বুঝে
গিয়েছেন নতুন নীতির মাধ্যমে কি পরিবর্তন ঘটতে পারে। আমি শুধু আপনার চাহিদা
পূরণ করার ক্ষমতাকে অর্থের প্রয়োজন থেকে মুক্ত করে দিয়েছি। অর্থনীতির মধ্যে একটি ছোট
পরিবর্তন কতটা আশ্চর্যজনক পরিণাম দিতে পারে তা আমরা উপরের চিত্র থেকে ভাল করে বুঝে
নিতে পারি। মানুষ সত্যিকারের স্বাধীনতা তখনই অনুভব করবে যখন সকলে
সমানভাবে সমস্ত সুখসুবিধা উপভোগের জন্য স্বতন্ত্র হবে। মানুষ যা শিখতে চাইবে শিখতে
পারবে, যা করতে চাইবে করতে পারবে এবং যা ভোগ করতে চাইবে
ভোগ করতে পারবে। তখনই সঠিক অর্থে বলা যাবে আমরা স্বাধীন। অর্থাৎ যা করতে চাইছি করতে
পারছি। যেমন জীবন কাটাতে চাইছি তেমন জীবন-যাপনের
সুযোগ-সুবিধা পেয়ে যাচ্ছি। এরপর আমি মুদ্রার অর্থকেও
বদলে দিয়েছি। মুদ্রা সম্পর্কে আপনারা ‘সম্পূর্ণ সমাধান’ পুস্তক থেকে আরও বিস্তারিতভাবে
অধ্যয়ন করে নেবেন। সরকারের কাছে আপনার একটি ব্যংক একাউন্ট থাকবে। সরকার আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী
ডিমান্ড করার সীমা নির্ধারণ করতে থাকবে। যার মাধ্যমে সবাই ইচ্ছে অনুযায়ী যা কিছু বস্তু/পরিষেবা ভোগ করতে চাইবে তা পেতে থাকবে। শুধু একটি শর্ত থাকবে। শর্ত এটিই হবে যে আপনার
ইচ্ছে অনুযায়ী যে কর্ম আপনাকে প্রদান করা হবে তা সম্পাদন করতে হবে। যদি আপনার বয়স ২৫ থেকে
৫০ বছরের মধ্যে থাকে। যদি আপনি এই সহযোগিতা না করেন তবে এই নীতির লাভ থেকে
বঞ্চিত হবেন। যদি সহযোগিতা করতে থাকেন তবে আপনি যে কোনো সময় যে কোনো
সুবিধা সরকারের কাছ থেকে নিতে পারবেন এবং উপভোগ করতে পারবেন। একবার সামঞ্জস্য চলে এলে
আর্থিক সীমা রাখার প্রয়োজন পড়বে না। কর্মসংস্থানের গ্যারান্টি তো সরকারের তরফ থেকে থাকবেই। ধরুন সরকার যদি আপনাকে
কর্মসংস্থান প্রদান করতে না পারে তাহলেও ব্যবস্থার অন্তর্গত সমস্ত সুবিধা আপনি পেতে
থাকবেন। কোনো কিছু ডিমান্ড করার এবং গ্রহণ করার অধিকার আপনার থাকবে। অর্থাৎ সরকার আপনাকে সবকিছু
ডিমান্ড করবার এবং ব্যবহার করবার পূর্ণ অধিকার দেবে। এই নীতি দ্বারা সকলের প্রয়োজনীয়
ডিমান্ড এবং কর্মসংস্থানের সমাধান একসাথে হবে। সমাজে যেসব বস্তুর ঘাটতি
থাকবে সরকার সেইসব বস্তু ব্যক্তিগত স্তরে নয় বরং সামাজিক স্তরে গ্রহণ অথবা ব্যবহার
করার ব্যবস্থা করে দেবে। এর ফলে যে সব সম্পদের অভাব রয়েছে সেসব বস্তুও সকলে পর্যাপ্ত
পরিমানে ব্যবহার করতে পারবে। এই নীতির ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের অপপ্রয়োগও বন্ধ হবে। আসুন দেখে নিই কিভাবে তা
সম্ভব হবে। সরকার গঠনের পর সবার আগে প্রয়োজনীয় সরকারি পদে উপযুক্ত
ব্যক্তিদের নিযুক্তি হবে এবং একইসাথে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের একটি বড় পরিষদ নিযুক্ত
করা হবে যারা দ্রুত ইন্টারনেট ও সফটওয়্যারের মাধ্যমে একটি ওয়েবসাইট নির্মাণ করবে যেখানে
দেশের সকল নাগরিকের একটি একাউন্ট থাকবে। এই পোর্টাল থেকেই সকলে নিজেদের সমস্ত ডিমান্ড করতে পারবে এবং সমস্ত তথ্য পূরণ করতে পারবে। যেমন– নিজেদের যোগ্যতা,
কোন কাজে দক্ষতা রয়েছে, অন্য কি কাজ করার আগ্রহ
রয়েছে, কি যোগ্যতা রয়েছে ইত্যাদি। পূর্বে ট্রেনিং নিতে পারেননি
এমন কোনো কাজের ট্রেনিং নিতে চান কিনা বা শিখতে চান কিনা ইত্যাদি। অর্থাৎ নিজেদের পছন্দমত
সবকিছু সবাই শিখতে পারবে। সমস্ত ব্যবস্থা সরকার করবে। যারা ইন্টারনেটের ব্যবহার
জানেন না তাদের জন্য সরকার আশেপাশে কম্পিউটার অপারেটর নিযুক্ত করবে যাদের মাধ্যমে মানুষ
নিজেদের প্রয়োজনীয় ডিমান্ড করতে পারবে এবং প্রোফাইল বানাতে পারবে। যেমন তাদের একমাসে কত চাল,
আটা, ময়দা, চিনি,
দুধ, ঘি, কাপড়, তেল, মশলা, সব্জি, সকল প্রকার ফল, ডাল, শস্যদানা,
মিষ্টি, সুগন্ধি ইত্যাদি নিত্যদিনের বস্তু,
সাপ্তাহিক বস্তু এবং মাসিক বস্তুর প্রয়োজন হয়, সেসবের ডিমান্ড বা অর্ডার করতে পারবে। এছাড়াও মোটর সাইকেল, গাড়ি, মোবাইল, কম্পিউটার,
টিভি, ওয়াশিং মেশিন, সব ধরনের
ফার্নিচার, বসবাস করার ঘর ইত্যাদি সকল প্রয়োজনীয় বস্তুর অর্ডারও
অনলাইনে করতে পারবে। এছাড়াও অন্য সব তথ্য যেমন– এখনো অবধি তাদের কোন কোন
কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে, ভবিষ্যতে তারা কোন পেশায় কাজ করতে চায়
এবং কতটা দক্ষতা রয়েছে অথবা কতটা দক্ষতা অর্জন করতে চায় ইত্যাদি। বলার অর্থ এটিই যে, সফটওয়্যার তৈরি হবার পর কিছু দিনের মধ্যেই সমস্ত তথ্য সরকারের
কাছে চলে আসবে। অর্থাৎ একটি বোতাম টিপলেই সকলের সমস্ত ডিমান্ডসহ অন্য
সকল তথ্য সরকার দেখতে পারবে এবং ভবিষ্যতেও সকলের সব তথ্য সর্বদা সরকারের কাছে আসতে
থাকবে। সকল ডিমান্ড কত রয়েছে, কত মানব সম্পদ রয়েছে,
কত প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, কর্মসংস্থানের চাহিদা
কত রয়েছে ইত্যাদি। মোটকথা সরকারের কাছে হিসেব থাকবে যে কোন বস্তু কতটা মাত্রায়
প্রয়োজন। এছাড়া নানা প্রকার কর্মের জন্য কোন কোন বিভাগে কতজন রয়েছে
এবং কে কি কাজ করছে, কারা খালি বসে রয়েছে,
কোন কোন সম্পদ কতটা মাত্রায় মজুত রয়েছে ইত্যাদি। যে সব সম্পদ কম মাত্রায়
রয়েছে সেসবের বিকল্প কি হতে পারে ইত্যাদি সমস্ত তথ্য সরকারের কাছে থাকবে। মোট কথা সব তথ্য সরকার
জানতে পারবে। ওই সফটওয়্যারের মাধ্যমে একই সাথে কে কোন কর্ম সম্পাদনে
কুশল এবং সেসবের মধ্যে কোন কাজটি সে করতে চায়, তার জন্য
শিক্ষা বা ট্রেনিং কতটা আছে, এসবও জানা যাবে। যদি কোনো কারণে কেউ শিখতে
পারেনি এমন কোনো কাজ যা পেশা হিসেবে নির্বাচন করতে চেয়েছিল, সেসব বিষয়েও শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা সরকার করবে। ততদিন অবধি যে কাজ সে করতে
পারে তা চালিয়ে যেতে পারবে। এইভাবে সরকারের কাছে সমস্ত তথ্য থাকবে যে দেশে জনসংখ্যা
কত আছে এবং কোন কোন বয়সের কতজন রয়েছে, কোন কোন
বিষয়ে কতজন শিক্ষিত এবং প্রশিক্ষিত রয়েছে ইত্যাদি। নতুন ব্যবস্থায় সফটওয়্যারের
ইউজার ইন্টারফেস দেখতে কেমন হবে তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ নীচের চিত্রে উল্লেখ করা
হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ায় সরকার
মোট চাহিদা জানতে পারবে এবং তা পূরণ করার জন্য কতজন মানুষ, কত মেশিন, কত মালবাহন, কত কারখানা ইত্যাদি কোন কোন ক্ষেত্রে প্রয়োজন হবে যার মাধ্যমে সময়মত যেন সকলের
চাহিদা পূরণ করা যায়, তার হিসেব সরকার সহজেই করতে পারবে। সরকার সকলের অভাব পূরণ
করার জন্য সকলকে যোগ্যতা এবং পছন্দ অনুযায়ী নিযুক্ত করবে, যেন সর্বাধিক পাঁচ বছরের মধ্যে সকলের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়,
বিশেষ করে যাদের কাছে এখন কোনো প্রকারের অভাব রয়েছে। এরপর সবাই অবিরত নিজেদের
অর্ডার করতে থাকবে এবং একইরমভাবে সকলের চাহিদা পূরণ হতে থাকবে। পাঁচ বছর অবধিই চাহিদা
সর্বাধিক থাকবে, কেননা বর্তমান সময়ে অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যার
কাছে কিছুই নেই। তাই শুরুতে চাহিদা অধিক থাকবে এবং কাজও অধিক থাকবে। ধীরে ধীরে সকল চাহিদা স্বাভাবিক
হয়ে আসবে এবং ততদিনে আমাদের কাছে উন্নত পরিকাঠামোও নির্মাণ হয়ে যাবে। ফলে আনুমানিক পাঁচ বছর
পর সামঞ্জস্য চলে আসবে। এইভাবে সকলের চাহিদা খুব সহজেই পূরণ হতে থাকবে, ধীরে ধীরে কাজও অনেক কমে আসবে। বেশীরভাগ বস্তুর জন্য বাজারে
কোনো দোকানেরও প্রয়োজন থাকবে না। কেননা মানুষের অর্ডার অনুযায়ী সকল বস্তু উল্লেখিত ঠিকানায়
ক্যুরিয়ার ব্যবস্থার মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ার বন্দোবস্ত থাকবে। কেবলমাত্র সেই সব বস্তু
এবং পরিষেবার জন্যই দোকানের প্রয়োজন হবে যা সরাসরি ঘরে পৌঁছানো সম্ভব নয়। যেমন হোটেল, রেস্তোরাঁ, জিম, সেলুন,
বিউটি পার্লার, ক্লাব ইত্যাদি। এই ব্যবস্থায় রাস্তায় ভিড়ও
কম হবে এবং পার্কিং ব্যবস্থাও অচল হবে না। নতুন অর্থশাস্ত্রকে বিস্তৃতভাবে জানার জন্য ‘সম্পূর্ণ সমাধান’ পুস্তক অধ্যয়ন করতে পারেন।
১১. টাকা বা মুদ্রার ব্যপারে আপনার সিদ্ধান্ত কি?
টাকা অথবা মুদ্রার অর্থ এই যে এটি একধরণের মুল্যাংকন পদ্ধতি। কোনো বস্তু বা শ্রমের মুল্যাংকন করার সময় টাকার সাথে পরিচয় হয়। এছাড়া আলাদা করে মুদ্রার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। বার্টার সিস্টেমও একপ্রকার বিনিময় প্রথা যেখানে মুদ্রার বিনিময়ে বস্তু বিনিময় করা হয়। তাই বস্তু বিনিময় বলুন,
মুদ্রা বিনিময় বলুন,
বিনিয়োগ বলুন, পারিশ্রমিক বলুন বা ক্রয়-বিক্রয় বলুন না কেন সমস্ত কিছু বাজারেরই ক্রিয়াকলাপ। অন্যভাবে বললে আপনাকে বাজার ইত্যাদি চালাতে মুদ্রার প্রয়োজন হবে। তাই এই মুদ্রা সেইসব বস্তুকেও বিকেন্দ্রীকরণ করে দেয় যা মূলত কেন্দ্রীভূত থাকা উচিৎ। এটি ম্যানেজমেন্টকে decentralize করে দেয়। ম্যানেজমেন্টকে decentralize হয়ে থাকা ভাল নয়। এতে কেউ জানতেই পারে না যে কোথায় কতটা চাহিদা তৈরি হচ্ছে, কতটা পূরণ হচ্ছে, কে তৈরি করছে, কে বিক্রয় করছে,
কে কি করছে কিছুই জানতে পারা যায় না। যার ফলে ম্যানেজমেন্ট সঠিক পথে চালিত হতে পারে না। চাহিদা এবং পূর্তির একটি অপরিপক্ক ম্যানেজমেন্ট হিসেবেই রয়ে যায়। অর্থাৎ কোথাও ভীষণ রকম চাহিদা দেখা দিলে তবে সকলে জানতে পারে। চাহিদা বাড়ার পূর্বে বা চাহিদা বৃদ্ধির মুহূর্তে জানতে পারলে পূর্তি যথাসময়ে সম্ভব হয়। কোনো কিছুর চাহিদা কমে গেলে অথবা পূর্তি অত্যধিক বেড়ে গেলে মনে হয় হায় এমন ঘটনা কিভাবে ঘটে গেল? অর্থাৎ কিভাবে বেড়ে গেল অথবা কমে গেল? যখন বস্তু বাস্তবে কমে যায় তখন সমাধান খোঁজার কোন অর্থ থাকে না। অর্থাৎ post arrangement-এর কোন অর্থ নেই। সর্বদা pre-arrangement হওয়া উচিৎ। pre-arrangement-এর জন্য জরুরী হচ্ছে একটি centralized management থাকা।
মুদ্রা management কে decentralize করে দেয়। প্রথম ব্যক্তি জানতে পারে না দ্বিতীয় ব্যক্তি কি করছে। দ্বিতীয় ব্যক্তি বুঝতে পারে না তৃতীয় ব্যক্তি কি করছে। এমনকি সরকারও জানতে বুঝতে পারে না কে কি করছে। ফলে সরকার তাদের জন্য কোনো প্রকল্প তৈরি করতে পারে না। কোনো management-এর ব্যবস্থা করতে পারে না। এরপর বাকি সব উপর ওয়ালার ভরসায় চলতে থাকে,
যার পরিণাম আমরা দেখতে পারছি। কোনো কিছুর মূল্য অত্যধিক বৃদ্ধি পেয়ে গেলে সরকার জেগে ওঠে। তখন কিছু একটা ব্যবস্থা নেয় অথবা যোগান দেবার চেষ্টা করে। ততক্ষণে মানুষের যা লোকসান হবার তা হয়ে যায়। সকলে সমস্যায় পড়ে যায় এবং দুঃখী হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয়ত,
এতে অসমতা বাড়বে। কেননা যখন কোনো management থাকবে না তখন তো অসমতা বাড়বেই। যেসব চতুর ব্যক্তিরা পদে বসে রয়েছে তারাই বাজারের মধ্যে হেরফের করতে পারে। তারা নিজেদের মত বাজার নিয়ন্ত্রিত করে এবং বিপুল অর্থ এক যায়গায় সঞ্চয় করে নেয়। সোজা কোথায় বললে কাউকে আলাদা করে অর্থ জমতে দেওয়া উচিৎ নয়। তৃতীয়ত, শ্রমের মুল্যাংকন করলে যোগান অধিক থাকা ব্যক্তিদের শ্রম-মূল্য অত্যধিক কমে যায়। এরপর সামান্য আয় দিয়ে তারা জীবনের সকল সুখসুবিধা উপভোগ করতে পারে না। সমাজে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সংখ্যা মাত্র ১০% রয়েছে। ৯০%
মানুষই দুঃখ দুর্দশা ভোগ করে চলেছে। ১০%
মানুষই কেবলমাত্র সুখে রয়েছে। মুদ্রা থাকার ফলেই এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। সুতরাং মুদ্রার পরিণাম অত্যন্ত দুঃখদায়ী হিসেবে দেখা দিয়েছে এবং দুঃখের জীবন বাস্তবে কেউ চায় না। যেহেতু দুঃখ বা অসুবিধা কেউ চায় না এবং অধিক পূঁজির মালিকানাতেই যেহেতু সমস্ত সুখসুবিধা, সেবা-পরিষেবা, সংরক্ষণ ইত্যাদি অর্জন করার রাস্তা, তাই পূঁজির অধিকার দখলের জন্য মানুষের মধ্যে সংগ্রাম শুরু হয়ে যায়।
১২. অর্থ বা মুদ্রা ছাড়া নতুন আর্থিক প্রণালী কিভাবে কাজ করবে?
কাজ করবে কারণ টাকা জমিয়ে রাখা জীবনের উদ্দেশ্য নয়। জীবনের উদ্দেশ্য হছে সুখী হওয়া। আর আমরা সুখী হই আমাদের ঈপ্সিত জ্ঞান, কর্ম এবং ভোগের মাধ্যমে। যদি নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী জ্ঞান অর্জন করতে পারি, পছন্দ অনুযায়ী কর্ম অর্থাৎ জীবিকা পালন করতে পারি এবং পছন্দ অনুযায়ী ভোগ অর্থাৎ সুখসুবিধা উপভোগ করতে পারি তবেই আমরা সুখী হই। এটিই জীবনের উদ্দেশ্য আর এটিই সকলে চেয়ে থাকে। এসব সুবিধা সকলের জন্য প্রয়োজন,
আর এটি তখনই সম্ভব হবে যখন সকলের মান সমান হবে। আর মান সমান থাকার অর্থ হচ্ছে কারোর মুল্যাংকন যেন না হয়। যখন মুল্যাংকন হবে না এবং কারোর শ্রমের মূল্য নির্ধারিত হবে না তখন সকলের মান সমান হয়ে যাবে। সকলে সমানভাবে চাহিদার আবেদন করতে পারবে এবং সেইসব চাহিদা একটি কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার মাধ্যমে পূরণ হতে থাকবে। সুতরাং, যা কিছু প্রয়োজন তা গ্রহণ করে সকলে সুখী হতে পারবে। এটিই হচ্ছে মূল উদ্দেশ্য। আমি যে অর্থশাস্ত্র রচনা করেছি তাতে কোনো কিছুরই মুল্যাংকন রাখা হয়নি। কেননা বস্তুর মুল্যাংকন শ্রমের মুল্যাংকন থেকেই উৎপন্ন হয়। সেই কারণে নতুন অর্থশাস্ত্রে কোনো পারিশ্রমিক থাকবে না,
কোনো ব্যাংক থাকবে না এবং কোনো tax system থাকবে না। ফলে ভিন্ন ভিন্ন কাজের জন্য নানা প্রকারের ঝঞ্ঝাট এবং দৌড়ঝাঁপ সমাপ্ত হয়ে যাবে। সামান্য কাজেও অধিক সুখসুবিধা পাওয়া যাবে। নাগরিক যে কোনো ব্যবস্থায় এমন সুবিধাই আশা করে থাকে। যেমন ফলাফল এবং সুবিধা সকলে চেয়ে থাকে তা উপভোগ করার জন্য এটি একেবারে সঠিক ব্যবস্থা। বর্তমানে যে ব্যবস্থা চলমান রয়েছে তা সঠিক নয় কারণ এটি তেমন পরিণাম প্রদান করছে না যেমনটি মানুষ বাস্তবে চাইছে। মোটকথা বর্তমান ব্যবস্থা আমাদের জীবনের উদ্দেশ্যকে পূরণ করতে সক্ষম হয়নি।
১৩. সম্পদ একদিকে সীমিত এবং অপরদিকে মানবীয় ইচ্ছে অনন্ত, আপনি কিভাবে এই অভাব পূরণের বন্দোবস্ত করবেন?
বাস্তবে একথা সত্য নয়। জানিনা কবে কোথা থেকে এই ভুল ধারণা শুরু হয়েছে। ঐতিহাসিক গবেষণা করলেই এর উত্তর জানা যাবে। বর্তমান অর্থশাস্ত্র অভাবের নিয়মের উপর প্রতিষ্ঠিত। বলা যায় আজ অবধি যে অভাব চলে আসছে তা বর্তমান অর্থশাস্ত্র দ্বারা তৈরি পরিস্থিতির লক্ষণ। এতে উপরে উপরে মনে হয় এই অভাব স্বাভাবিক, ৯০ শতাংশ মানুষ গরীব এবং অসহায় অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছে,
তাদের ইচ্ছেগুলি পূরণ হচ্ছে না;
তাই মনে হয় সকলের ইচ্ছে পূরণের জন্য সম্পদ কম পড়বে। কিন্তু বাস্তবতা ঠিক তার উল্টো। যে প্রকার অর্থশাস্ত্র আমরা গ্রহণ করেছি তার কারণেই এই কৃত্রিম অভাব তৈরি হয়ে চলেছে যেখানে মানুষের সীমিত ইচ্ছেগুলিও পূরণ হতে পারে না।
আমি অনুসন্ধান করে এটিই বুঝতে পেরেছি যে সমস্ত সম্পদ একটি চক্রের মাধ্যমে ঘুরে চলেছে, বলতে পারেন বিভিন্ন চক্রের কারণেই সম্পদের অস্তিত্ব বজায় রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি যে জল বাষ্পে পরিণত হতে থাকে এবং বরফে পরিণত হতে থাকে। বরফ আবার জলে পরিণত হতে থাকে এবং আবার বাষ্পে পরিণত হতে থাকে। অর্থাৎ প্রতিনিয়ত একে অপরের মধ্যে পরিবর্তিত হতে থাকে। সব মিলিয়ে অর্থ এটিই দাঁড়ায় যে আমাদের যতটা জল প্রয়োজন তা সর্বদা উপলব্ধ রয়েছে, যতটা বরফ প্রয়োজন তা সর্বদা উপলব্ধ রয়েছে এবং যতটা বাষ্প প্রয়োজন তা সর্বদা উপলব্ধ রয়েছে। যেহেতু জল একটি অবস্থা থেকে অপর অবস্থায় পরিবর্তিত হয়ে চলেছে সেহেতু জলের মাত্রাও মোটামুটি ততটাই থাকে, কমে যায় যা না বা অতিরিক্ত হয়ে যায় না। একইভাবে অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে যতটুকু ভোজ্যবস্তু তৈরি করতে চাই এবং প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে যতটুকু বস্তুসামগ্রী তৈরি করতে চাই আমরা করে নিতে পারি। এটি পুরোপুরি আমাদের হাতে।
সুতরাং সকলের জীবন যাপনের স্তর উন্নত হোক, যেখানে যেমন জ্ঞান, কর্ম এবং ভোগের প্রয়োজন তা যেন পূরণ হয়ে যায়। আমার মনে হয় না এর জন্য প্রকৃতির মধ্যে কোনও অভাব রয়েছে। সঠিক ম্যানেজমেন্ট এবং বিজ্ঞানের সাহায্যে সকলের জন্য ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যদি কোথাও একটু আধটু অভাবও দেখা দেয় তাহলেও সঠিক ম্যানেজমেন্টের সাহায্যে সমস্ত সম্পদের সর্বাধিক ব্যবহার করা যেতে পারে। সেইসব সম্পদের বিতরণ এমন করা হবে যখন যার প্রয়োজন হবে তিনি পেয়ে যাবেন, তা কোনো একজনের অধীনে যেন না থাকে। কম মাত্রার বস্তুরও যেন সর্বাধিক ব্যবহার হয়। আজকাল OLA, UBER যেমনভাবে পরিষেবা দিয়ে থাকে। এই ধরণের পরিষেবার মাধ্যমে কম সংখ্যায় যানবাহন দ্বারা এবং কম সংখ্যায় মানব সম্পদ ব্যবহার করে অধিক মানুষকে পরিষেবা প্রদান করা সম্ভব। যদি ব্যাক্তিগত স্তরে যানবাহন প্রদান করা হয় তবে অধিকাংশ সময় পড়ে থাকবে, ফলে সম্পদের অপব্যায় হবে। সুতরাং এমন পদ্ধতি বের করা যেতে পারে যেখানে সীমিত সম্পদ প্রদান করেও সকলকে ঐশ্বর্যশালী অবস্থায় রাখা যেতে পারে,
অধিক availability করানো যেতে পারে,
অধিক সুখ উৎপন্ন করা যেতে পারে। সুতরাং এটি বলা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয় না যে সম্পদ কম রয়েছে এবং মানব ইচ্ছে অনন্ত ইত্যাদি ইত্যাদি। বস্তু পড়ে থাকবে ১/২ শতাংশ মানুষের কাছে, ব্যবহারও হবে না,
অপরদিকে অধিকাংশ মানুষ অসহায় অবস্থায় থাকবে, এটি অক্ষম ম্যানেজমেন্টের পরিচয় দেয়,
অভাবকে নয়।
অপরদিকে মানুষের ইচ্ছেও যে অধিক তাও কিন্তু নয়। সকলের জন্য ২৪ ঘণ্টা সময়ই রয়েছে। যেখানে সকলকে ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম,
৮-৯ ঘণ্টা জীবিকা এবং অন্যান্য কাজ সম্পাদন করতে হয়। এরপর যতটুকু সময় বেঁচে থাকে সেখানে কি করে অনন্ত ইচ্ছে থাকতে পারে। যতখানি অবসর সময় পায় তাতে কত ইচ্ছে করতে পারে যে সম্পদ কম পড়ে যাবে। একদিনে কেউই ১০-১২টির অধিক ইচ্ছে করতে পারবে না। আর তাও যদি পূরণ না হয় তবে ধিক্কার সেই ব্যবস্থাকে যে তারা মানুষের ইচ্ছে অনন্ত এরুপ বাক্য উপরে উপরে বলে দিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যায়। এরুপ দায়িত্বজ্ঞানহীনতাকে কোনও ম্যানেজমেন্ট বলা যায়? এরুপ ম্যানেজমেন্টকে কি শাস্ত্র বলা যায়? যেসব পুস্তককে আমরা অর্থশাস্ত্র এবং সমাজশাস্ত্র বলে আসছি বাস্তবে তো এইসব দরিদ্রতাকে বাঁচিয়ে রাখার পুস্তক এবং অসহায় অবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখার জ্ঞান হিসেবে পরিগণিত হয়। এইসব অজ্ঞানতা যা জ্ঞানরূপে উপস্থাপন করা হচ্ছে। বার বার বলা হচ্ছে ৯০ শতাংশ মানুষকে অভাবের মধ্যে জীবন যাপন করাটা নিশ্চিত, তাহলে কি করে এইসবকে শাস্ত্র বলা যায়?
সঠিক প্রকারের ব্যবস্থা সেটিই হবে যার মাধ্যমে সকলের জন্য সবকিছু সঠিকভাবে উপলব্ধ হবে এরুপ ম্যানেজমেন্টকে বলা হবে। পরিবর্তে এটি বলা তো অজ্ঞানতার পরিচয় দেয় যে মানব ইচ্ছে অনন্ত এবং সম্পদ সীমিত। বাস্তবে আমরা তো জানি ইচ্ছে তেমন অধিক নেই। আপনি কোনো ব্যাক্তিকে জিজ্ঞেস করুন তিনি দিনে কতগুলি ইচ্ছে করেন? ১০ থেকে ১২টির অধিক ইচ্ছে কেউই করে না। তার মধ্যেই ২৪ ঘণ্টা সমাপ্ত হয়ে যায়। আর ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী বিশেষ কয়েকটি ইচ্ছেই ঘুরপাক খেতে থাকে। সকল ব্যাক্তির আনুমানিক ৫০ থেকে ১০০টি ইচ্ছেই থাকে যা চক্রাকারে ঘুরে ফিরে আসতে থাকে। জীবন যাপন নিয়ে প্রতিটি ব্যাক্তির নিজস্ব জীবনশৈলী থাকে, নিজস্ব রুচি থাকে এবং সেসব অনন্ত হয় না। আমাদের জীবনে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ই ঘুরতে থাকে এবং যা অত্যধিক হয় না। কারোর পক্ষেই বহু বিষয়কে একসাথে সংলগ্ন রাখা সম্ভব নয়। এমনকি মানুষের পক্ষে তা বাস্তবিকও নয়।
১৪. যখন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা (Competition) থাকবে না তখন মানুষ নতুন গবেষণা অথবা আবিষ্কার কিভাবে করবে?
প্রথমত, নতুন আবিষ্কার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে হয় না। আবিষ্কার হবার মূল কারণ হচ্ছে আবশ্যকতা। এই কথাটি শুনে থাকবেন যে ‘আবশ্যকতাই হচ্ছে আবিস্কারের জননী’। সুতরাং এটি আবশ্যকতার উপর নির্ভর করছে। যখন আবশ্যকতা তৈরি হয় তখনই গবেষণা হয়।
দ্বিতীয়ত, যাদের অনুসন্ধানে রুচি রয়েছে, বৈজ্ঞানিক স্তরে যে সব ব্যাক্তি রয়েছেন, যারা গবেষণা করে আনন্দ পান তারা নিজেদের ক্ষমতা অনুযায়ী গবেষণা করতে থাকেন। সেইমত জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিতেও আধুনিকীকরণ হতে থাকে। তারা এমন কিছু দেখতে পান যার মাধ্যমে কল্যানকর কিছু ঘটবে, মানুষ অধিক সুখসুবিধা উপভোগ করবে ইত্যাদি। এইসব কারণে তারা নিজেদের কাজ স্বাভাবিকভাবেই করে যেতে থাকেন এবং নিত্য নতুন আবিষ্কার হতে থাকে।
তৃতীয়ত, মানুষের যখন কোনোকিছুর প্রয়োজন হয় তখন সে তা প্রকাশ করে। প্রকাশ করে বলেই সেই হিসেবে গবেষণার কাজ শুরু হয়। তাই গবেষণা প্রয়োজনীয়তার আধারে হতে থাকে এবং যারা গবেষণার কাজ করেন তাদের জ্ঞানের আধারে আধুনিকীকরণ (update) হতে থাকে। এর সাথে গবেষণার কোনো যোগাযোগ নেই। প্রতিযোগিতা উদ্যোগপতিদের মধ্যে হয়ে থাকে, যারা গবেষণার সাথে যুক্ত তারা নিজেদের কাজে লীন থাকেন। উদ্যোগপতিরা গবেষকদেরকে নিজেদের প্রয়োজনীয়তা জানিয়ে দেন এই বলে যে এমন কিছু তৈরি করে দিলে সমাজের পক্ষে ভাল হবে এবং সমাজ উপকৃত হলে আমাদের বস্তু অধিক বিক্রি হবে। বস্তুও অধিক বিক্রি হবে যখন মানুষের বাস্তবে প্রয়োজন হবে।
সুতরাং মূল সারাংশ এটিই যে মূলত প্রয়োজনীয়তার জন্যই আবিষ্কার হয়ে থাকে, প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য নয়। আপনি সেখানে সহযোগিতা করলেও প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতেই গবেষণা হতে থাকবে। প্রয়োজনীয়তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অথবা সহযোগিতার কোনো সম্পর্ক নেই। প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সহযোগিতা একই প্ল্যাটফর্ম যা নিজের মত করে কোনোকিছু করতে বলে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা চাপ প্রদান করার নেতিবাচক পদ্ধতি যা মানুষের মধ্যে ব্যাকুলতা এবং অসুবিধা সৃষ্টি করে। ফলে বস্তুর প্রাপ্যতা কমে যায়। প্রতিদ্বন্দ্বিতার উদ্দেশ্যই হচ্ছে কোনো বস্তুর উপস্থিতিকে কমিয়ে দেওয়া। যদি আপনি প্রাচুর্য তৈরি করে দেন তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আপনিই সমাপ্ত হয়ে যাবে। সুতরাং প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভ্রষ্ট ব্যবস্থার পরিণাম, সহযোগিতা সঠিক ব্যবস্থার পরিণাম। এর সাথে গবেষণার কোনো সম্পর্ক নেই।
১৫. পুঁজিবাদের উপর আপনার সিদ্ধান্ত কি?
সহজ কথায় পুঁজিবাদের অর্থ পুঁজিতে সমস্ত ক্ষমতা বিনিয়োগ করা। যখন পুরো শক্তি পুঁজিতে নিহিত
করা হবে তখন যার যত পুঁজি থাকবে, সে তত অধিক শক্তিশালী
হবে। তাই প্রতিটি মানুষ আরও শক্তিশালী হবার জন্য আরও অধিক পুঁজি নিজের কাছে রাখতে চাইবে। আর সমস্ত প্রতিযোগিতা, ক্ষমতার লড়াই, মারামারি, লুটপাট, অপরাধের জন্ম সেখানেই হবে যেখানে অভাব থাকবে। ফলে সমাজে অশান্তি, দুঃখ,
অনৈক্য ইত্যাদি বাড়তে শুরু করবে। এটি হচ্ছে পুঁজিবাদের নেতিবাচক
দিক। এর ইতিবাচক দিকও খুব কম রয়েছে। ইতিবাচক পক্ষটিকে বুঝতে
হলে রাজতন্ত্রের ভিত্তি থেকে দেখতে হবে, মনে হবে
কিছুটা ইতিবাচক। পুঁজিবাদ মানুষকে কিছুটা স্বাধীনতা দেয়, জনগণ তাদের
নিজের মতানুযায়ী সামান্য কিছু কর্ম করতে সক্ষম হয়, কারণ রাজতন্ত্রে রাজাই থাকে সর্বেসর্বা এবং ব্যবস্থা তার সিদ্ধান্তেই চালিত হয়। তাই রাজতন্ত্রের দিক থেকে পুঁজিবাদ কিছুটা ইতিবাচক কিন্তু
গণতন্ত্রের পরিপ্রেক্ষিতে পুঁজিবাদ সম্পূর্ণ নেতিবাচক।
১৬. সাম্যবাদের উপর আপনার সিদ্ধান্ত কি?
সাম্যবাদ শুধুমাত্র
একটি ধারণা মাত্র। এটি সম্পূর্ণরূপে কোথাও আসেনি। এটি যখনই এসেছে তা সমাজতন্ত্রের আকারে এসেছে। সাম্যবাদের অর্থ দাঁড়ায়– সমতাভিত্তিক শ্রেণীহীন সমাজ, অর্থাৎ সেখানে যে
সম্পদ রয়েছে তার উপর প্রত্যেকের সমান অধিকার থাকবে। সাম্যবাদ বলে কোনো
ব্যবস্থার প্রয়োজন নেই, সরকারের প্রয়োজন নেই, কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন নেই। যা একটি অসম্ভব বিষয়। কেননা একটি ব্যবস্থা এলে তো সেখানে ব্যবস্থাপনা
থাকবে,
কেন্দ্রীকরণ তো হবেই। কেন্দ্রীকরণ ছাড়া কোনো ব্যবস্থা সম্ভব নয়। যদি আপনি এটির পরিচালন ব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীভূত
করেন,
তবে তেমন হয়ে যাবে যেমন পূর্বে ছোটো ছোটো রাজ্য ছিল। ছোটো রাজ্যগুলিও তো নিজেদের মধ্যে এক একটি
ব্যবস্থা। এরপর সেই অংশে ব্যবস্থাপনা পুনরায় কেন্দ্রীকরণ
হয়ে যাবে। পূর্ণ বিকেন্দ্রীকরণের অর্থ এই যে, হয় আমরা
সকলে নিজের ব্যবস্থা নিজে করে নিই। যদিও তা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, এটি এমন একটি আকাশ কুসুম কল্পনা যা বলছে সমাজের সমস্ত সম্পদের
উপর সকলের সমান অধিকার, কিন্তু এই বিপুল উৎপাদন ব্যবস্থা এবং
ম্যানেজমেন্ট কীভাবে চিরস্থায়ী হবে তা স্পষ্ট করে বলছে না। সাম্যবাদ বলে দেয় অধিকার এবং কর্তব্যের মধ্যে সার্বিক সামঞ্জস্য
স্থাপিত হবে। কিন্তু কীভাবে হবে, তা স্পষ্ট হয় না। তাই এটি একটি ইউটোপিয়ান না ভাববাদী ধারণা হিসেবেই থেকে যায়। সুতরাং সাম্যবাদ আসতে পারাটা সম্ভব নয় এবং যতখানিই
আসবে তা সমাজতন্ত্রের আকারেই আসবে।
১৭. আপনার মডেল সাম্যবাদের দ্বিতীয় সংস্করণ নয় কি? নতুন মডেল সাম্যবাদ এবং পুঁজিবাদের থেকে কোথায় ভিন্ন?
সম্পূর্ণ সমাধান
ব্যবস্থা সাম্যবাদের দ্বিতীয় সংস্করণ নয় এমনকি প্রথম সংস্করণও নয়। প্রথমত, সাম্যবাদ
হল এমন একটি কনসেপ্ট যা প্রস্তাবিত করা হয়েছে বহুদিন কেটে গিয়েছে। এটি পৃথিবীর কোথাও প্রতিষ্ঠিত
হতে পারিনি। এটি কেবলমাত্র মানুষের স্বপ্নের ব্যাপার হিসেবে রয়ে গিয়েছে মাত্র। আজ
পর্যন্ত কোথাও বাস্তবের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি এবং আসাও সম্ভব নয়। যেভাবে সাম্যবাদ
বাস্তবের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব নয় তেমনি আদর্শসম্বলিত মুক্ত বাজারও সম্ভব
নয়। এটি কেবলই এক কল্পনা। বিশুদ্ধ পুঁজিবাদের অর্থ হচ্ছে একটি সম্পূর্ণ
অনিয়ন্ত্রিত বাজার। আর সম্পূর্ণ সমাধান হচ্ছে এক নতুন কনসেপ্ট, যা মূল থেকেই ভিন্ন। এখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে আর্থিক
ব্যবস্থাপনা ও শাসন ব্যবস্থাপনা কেমন হবে। সম্পূর্ণ সমাধান কোনো স্বপ্নময় উপস্থাপনা নয়। বরং স্পষ্ট করে বলে দেয়
কিভাবে আদর্শ অবস্থা প্রাপ্ত হবে। যা বোঝা খুবই সহজ। সুতরাং সম্পূর্ণ সমাধান একটি সম্ভাব্য মডেল, এর সাথে সাম্যবাদ, সমাজবাদ এবং পুঁজিবাদের
বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই।
মৌলিকভাবে
পার্থক্য এটিই যে সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থায় ম্যানেজমেন্ট 100% কেন্দ্রীকৃত এবং সমস্ত
প্রকার ক্ষমতা 100%
বিকেন্দ্রীকৃত। সমাজতন্ত্র এ ক্ষেত্রে একটি অদ্ভুত এবং অস্পষ্ট চিত্র উপস্থাপন
করে। সমাজবাদ উপস্থাপন করে যে সম্পদের
ব্যক্তি মালিকানা এবং বন্টনের ব্যবস্থা সমাজের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। সমাজতন্ত্র একটি অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং আদর্শিক ধারণা হিসেবে ব্যক্তিগত মালিকানা অধিকারের বিরোধিতা করে।
তার একটি মৌলিক প্রতিশ্রুতিও এটিই যে সম্পদের উৎপাদন ও বন্টন সমাজ অথবা রাষ্ট্রের
হাতে থাকতে হবে।
যদি আমরা সোশ্যালিস্ট
কমান্ড ইকোনমি (সেন্ট্রালি প্ল্যানড ইকোনমি) সম্পর্কে কথা বলি, তাহলে এতে ব্যবস্থাপনা এবং ক্ষমতা সরকারের তরফে কিছু ব্যক্তির হাতে চলে যায়
এবং জনগণের স্বাধীনতা লঙ্ঘিত হয়। এমনটি হওয়া সেই অর্থনীতির কাঠামোর মধ্যেই নিহিত রয়েছে। তাহলে তো এটি সমাজবাদ নয়। এটি একধরণের রাজতন্ত্রই
ছিল। যদি আমরা একক মালিকানা অর্থনীতি অথবা শুধুমাত্র মিশ্র অর্থনীতির কথা বলি তবে এতে
ক্ষমতা চলে যায় পুঁজিপতি এবং সরকারের হাতে। পাঁচ বছরে মাত্র একবার জনগণের হাতে ভোট
প্রদানের অধিকার থাকে। এতে জনগণের জীবনও পুঁজিপতি এবং সরকারের মিলিত উদ্যোগে চলে। অর্থসম্পদ কিছু ব্যক্তির
হাতেই জমা হতে থাকে। তাহলে তো এখানেও সমাজবাদ নামমাত্রই রইল। কোথায় দেখা যাচ্ছে
সমাজ প্রাথমিক অগ্রাধিকার পাচ্ছে? এতে কোথায় সমাজের ভাল হচ্ছে?
এটি ভিন্ন কথা
যে মিশ্র অর্থনীতির মডেল এক দিক থেকে কমান্ড অর্থনীতির চেয়ে ভালো এবং অন্যদিকে
সামন্তবাদ ও রাজতন্ত্রের কাঠামোর চেয়ে উত্তম। এই প্রকার মিশ্র অর্থনীতির
ব্যবস্থাপনায় কিছুটা কেন্দ্রীকরণ এবং কিছুটা বিকেন্দ্রীকরণ হয়ে থাকে। মিশ্র অর্থনীতির মডেল বলে যে রাষ্ট্র চাই কিন্তু পুরোপুরি চাই
না। সুতরাং এটি একটি মধ্যম স্তরের ব্যবস্থায় পরিণত হয়। ধরে নিন কিছুটা ভাল এবং কিছুটা
মন্দ। সেখানে বাজার থাকবে
এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণও থাকবে। এতে না সঠিকভাবে পুঁজিবাদ হয়ে উঠতে পারে না সমাজবাদ। কাউকে সঠিকভাবে দায়ী করতে পারে না। জানা যায় না কে কার
জন্য দায়ী, কে কি করছে এবং মনে হয় গাড়ি যেন ঈশ্বর ভরসায়
চলছে। এই ধরনের মডেলে বিভিন্ন গোষ্ঠী তৈরি হতে
থাকে এবং যখন তাদের স্বার্থ বিপরীতমুখী হয়ে একে অপরের সাথে সংঘর্ষে পরিণত হয় তখন আবার একই প্রতিযোগিতা, অশান্তি এবং সুখের
অপ্রাপ্তি দেখা দেয়। তাই এটিও সমাধান নয়। প্রকৃতপক্ষে এই সমস্ত মডেলগুলি এখনও পর্যন্ত কয়েকজন মানুষের বিলাসবহুল জীবন যাপনেরই সুযোগ
করে দিচ্ছে। সবাইকে দিতে হবে এমন ঘোষণাও তারা করছে না এবং তেমনভাবে ডিজাইনও করা হয়নি। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ
স্বচ্ছলতা পেলে এমন ব্যবস্থা কিসের জন্য? এটি
শুধুমাত্র একপ্রকার বাধ্যতামূলক জীবন প্রদান করবে, বাস্তবে যা দেখা যাচ্ছে। যেখানে সম্পূর্ণ সমাধানের ঘোষণা হল সকলেই সুখী হোক, এটি এমন এক ব্যবস্থা। সবাই যেন তাদের
কাঙ্খিত জীবন উপভোগ করতে পারে এমন ব্যবস্থা।
আরও একটি বিষয়
আছে যা থেকে আপনি জানতে পারবেন সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থা পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র এবং সাম্যবাদের সিদ্ধান্ত থেকে কোথায় আলাদা? সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদে সমাজ প্রথম, ব্যক্তি এবং পরিবারের
কল্যাণ গৌণ। পুঁজিবাদে ব্যক্তি প্রথম, নিজের
স্বার্থের জন্য কাজ করাটা উচিৎ বলে মনে করা হয়। যেখানে সম্পূর্ণ সমাধানে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং সমগ্র সমষ্টির জন্য উপযুক্ত স্থান
প্রদান করা হয়েছে, যেন মনুষ্য চারটি
স্তরেই সম্পূর্ণ সুখী হতে পারে। অর্থাৎ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এবং সমষ্টিগত স্তরে যেন নিজেকে সন্তুষ্ট মনে করে। ব্যবস্থা এলে কেউ ধনী
হবে না কেউ দরিদ্রও হবে না, সকলে নিজেদের পছন্দের জীবন যাপন
করবে। সেখানে এমন ধনী কেউ হবে না যেখানে ধনী হওয়ার পরও দুশ্চিন্তা করবে, অপরদিকে
কেউ দরিদ্র হয়েও চিন্তাগ্রস্ত থাকবে। যত ব্যবস্থা পূর্বে এসেছে কোনোটিই মানুষকে সুখী
করতে সক্ষম হয়নি। আপনি ‘সম্পূর্ণ সমাধান’ পুস্তক অধ্যয়ন করলেও বুঝতে পারবেন যে মূল থেকেই বড় পার্থক্য রয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবে সমস্ত দিকে পার্থক্য করে তোলে।
সাম্যবাদের
পূর্বপুরুষদেরও এই বক্তব্য যে সাম্যবাদ হল সমাজতন্ত্রের অগ্রসর পর্যায়। কিন্তু
এখানে আদর্শগতভাবে সমাজতন্ত্র থেকে সাম্যবাদে যাওয়ার পথে এক দীর্ঘ লাফ মেরে দেয়। এই বলে দেয় যে উৎপাদনের উপায় অনেক বেড়ে গিয়েছে। এটি
বলা হয় না যে মানুষের বিভিন্ন আকাঙ্ক্ষার জন্য, পরিবর্তনের
জন্য, ব্যবস্থাপনার জন্য কিভাবে পরিচালনা করা হবে। ফলে বিষয়টি স্পষ্ট হয় না। সাম্যবাদের দর্শনে জনগণের
আকাঙ্ক্ষার পূর্তি কেন্দ্রীভূত হয়। এটি এভাবেও জানা যেতে পারে যখন তারা দায়িত্ব ও
কর্তৃত্বের কথা বলে। যেখানে সমাজতন্ত্রে কর্তব্য ও অধিকারের বণ্টনকে 'প্রত্যেককে তার
সামর্থ্য অনুযায়ী, প্রত্যেককে কার্য সম্পাদন অনুযায়ী' সূত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করা হয়; সাম্যবাদে যেখানে
'প্রতি জনের ক্ষমতা অনুযায়ী, প্রতি জনের প্রয়োজন অনুযায়ী
প্রয়োগ করা হয়। তাহলে প্রয়োজনীয়তার অর্থ কি? এক কামরার ঘর, দুই জোড়া কাপড় আর সামান্য খাবার?
যেখানে
সম্পূর্ণ সমাধানের বক্তব্য হল- সকলের ইচ্ছে অনুযায়ী জীবন। সম্পূর্ণ সমাধানের কেন্দ্রে
রয়েছে মানুষের ইচ্ছে। তাই আক্ষরিক অর্থে মূল উৎস থেকেই পার্থক্য
রয়েছে। সম্পূর্ণ সমাধানে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভিন্ন, দর্শন ভিন্ন, পারিবারিক মডেল ভিন্ন, সামাজিক মডেল ভিন্ন, রাজনৈতিক মডেল ভিন্ন, এমনকি শিক্ষা মডেলও আলাদা। সুতরাং সবকিছু ভিন্ন।
১৮. যদি মানুষ আর্থিক দিক দিয়ে সুরক্ষিত থাকে তবে কেউ কাজ করবে কেন? ফলে গুণগত মান এবং দক্ষতা কিভাবে বজায় থাকবে?
প্রথমত, যেমনটি আমি বইতে উল্লেখ করেছি যে শুধুমাত্র শিশু, বয়স্ক এবং অসুস্থ ব্যক্তিরা
অর্থনৈতিকভাবে সুরক্ষিত। বাকিরা তখনই সুরক্ষিত হবে যখন তারা কোনো না কোনো কাজ
করবে। যারা ২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী সুস্থ মানুষ তারা যদি কর্মে
যোগদান না করে তবে আর্থিকভাবে সুরক্ষিত হবে না। সুতরাং প্রশ্নে যা বলা হয়েছে বিষয়টি তেমন নয়। আর্থিকভাবে সুরক্ষিত থাকার জন্য ব্যবস্থায় কোনো না কোনো কাজ সম্পাদন করা অনিবার্য।
গুণগত মান এবং
দক্ষতা সম্ভব হবে কারণ সবাই নিজেদের আগ্রহ এবং যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করতে থাকবে। যখন নতুন ব্যবস্থা
পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়ে যাবে তখন মানুষ তার
পছন্দ অনুযায়ীই জীবিকা পাবে। পছন্দের কাজ করতে সকলেরই ভাল লাগে। যখন কাজ করে আনন্দ হয় তখন প্রতিটি মানুষ তার সেরাটা
দেয়। ভেতর থেকে যখন সেরাটা বেরিয়ে আসবে তখন তার পছন্দের কর্ম গুণগত মানের বস্তু এবং
পরিষেবা হিসেবে রূপান্তরিত হবে।
দ্বিতীয়ত, ব্যক্তি তখন তার সামর্থ্য অনুযায়ী একটি গ্রহণযোগ্য উৎপাদন
লক্ষ্যে কার্য করতে সম্মত হবে। ব্যবস্থা তাকে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বাধ্য করবে না। সে
২ দিনের কাজ ১ ঘণ্টায় করুক বা ৬ ঘণ্টার মধ্যে করুক এটি তার ব্যাপার। ব্যবস্থা কোনো
ধরা-বাঁধা গতি নির্দিষ্ট করে দেবে না। সকলে আনুমানিক ৪/৫ ঘন্টা কাজ করবে। প্রতিটি কর্মীর আউটপুট নির্দিষ্ট থাকবে যা ধীরে সম্পাদন
করলেও অর্জন করা সম্ভব হবে। সকলে নিজেদের গতি অনুযায়ী কর্ম সম্পাদন করবে। ব্যবস্থা
দেখবে চূড়ান্ত আউটপুট এবং গুণগতমান সঠিক রয়েছে কিনা। আপনি কত দ্রুত বা কত ধীরে কর্ম করবেন তা নিয়ে কোনো সমস্যা
থাকবে না। শুধুমাত্র আপনার স্ব-স্বীকৃত এবং অনুমোদিত
লক্ষ্যমাত্রা পূর্বনির্ধারিত সময়ের
মধ্যে পূরণ করতে হবে। ফলে কেউ কারোর উপর পুলিশের মত নজরদারি রাখবে না। মানুষকে ভয়
ও লাঠির জোরে কাজ করাবে না। মানুষ তাদের নিজস্ব ইচ্ছে অনুযায়ী কাজ করতে থাকবে এবং
স্বাভাবিকভাবেই সেরাটুকু দিতে থাকবে। নির্দিষ্ট বিভাগ বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিটি কাজের গুণগত
মান যাচাই করতে থাকবে।
তৃতীয়ত জনগণের
প্রতিক্রিয়া ক্রমাগত আসতে থাকবে। ক্ষমতা এখানে বিকেন্দ্রীভূত এবং জনসাধারণ ওই বস্তু/পরিষেবা ব্যবহার করবে, যদি তা গুণগত মানের
না হয় তবে তাদের কাছ থেকেই চূড়ান্ত পর্যালোচনা চলে আসবে। যদি রিভিউ নেগেটিভ আসে তবে
সেই ব্যক্তি, টিম অথবা বিভাগ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। যিনি উৎপাদন করেছেন তাকে প্রশ্ন করা হবে
কি ঘটেছে,
মূল কারণ বিশ্লেষণের পর সেই সমস্যাটি সংশোধন করা হবে এবং
প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে যাতে অন্তিম ব্যবহারকারী সন্তুষ্ট হয় এবং একই সমস্যা
দ্বিতীয়বার না ঘটে। এতে গুণগতমান নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
১৯. কেউ ঝুঁকিপূর্ণ কর্ম অথবা হীন কর্ম করতে রাজী হবে কেন?
প্রথমত, নতুন ব্যবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ অথবা নিম্নমানের কাজ তো থাকবেই
না। নতুন অর্থনীতিতে কোনো বিনিয়োগ তো নেই যে ডুবে যাওয়ার ভয় থাকবে। এটি একেবারে শূন্য সংখ্যার
ঝুঁকিপূর্ণ এক অর্থব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় সকলের ইচ্ছে পূরণ হচ্ছে এবং সবকিছুর
মূল্য সমান থাকছে, তাই কোনো কাজকে নিকৃষ্ট হিসেবে
দেখা হবে না। দ্বিতীয়ত, নতুন ব্যবস্থায়
যন্ত্রপাতির বিপুল ব্যবহার থাকবে। তাই কোনো কাজ আর কঠিন থাকবে না। তৃতীয়ত, কোনো কাজে
যখন আমরা কঠিন অথবা অসুবিধা বোধ করি তা আমাদের রুচির উপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে। আপনাকে আপনার রুচি অনুযায়ী কাজ দেওয়া হলে তা সহজ হয়
এবং রুচির বাইরে হলে সমস্যা হয়। তাই এই কঠিন এবং সরলতা মনস্তাত্ত্বিক। নতুন ব্যবস্থায়
বাধ্যতামূলক এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ নেই। এটি পুরোপুরি ঝুঁকিবিহীন সমাধান যেখানে সকলে নিজেদের
রুচি,
ক্ষমতা, যোগ্যতা, মেধা ইত্যাদির ভিত্তিতে কোনো কাজ নির্বাচন করবে। তাই কেউ অসুবিধা অনুভব
করবে না। বর্তমান অর্থনীতিতে সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানিগুলো টাকা বাঁচানোর তাগিদে
অনেক ঝুঁকিপূর্ণ চাকরি তৈরি করে যেখানে কর্মরত
শ্রমিকদের নিরাপত্তার দিকে পুরোপুরি নজর দেওয়া হয় না। পর্যাপ্ত গবেষণা ও
প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয় না। কেননা তা সাশ্রয়ী হয় না। তারপর অর্থনৈতিক দিক থেকে বিশৃঙ্খলা
ও অসমতা থাকার ফলে অনেক রকম বিপদ তৈরি হয়ে যায়। নতুন ব্যবস্থায়
বাধ্যতামূলক কিছু থাকবেই না। প্রত্যেকটি কাজ সুচিন্তিত পরিকল্পনার মাধ্যমে করা হবে যেন ঝুঁকির সম্ভাবনা
প্রায় শূন্য থাকে। যদি ছোটো খাটো কিছু অসুবিধা থেকে যায় তবে বিজ্ঞানীরা অনুসন্ধান করে সরল প্রক্রিয়া খুঁজে বের করবেন এবং কর্মটি সহজ
করে দেবেন।
২০. আপনি চার প্রকারের মানব ব্যক্তিত্বর কথা বলে থাকেন। এই বর্গীকরণ এবং এর উপযোগিতা নিয়ে কিছু বলুন?
বোঝার
দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের চার প্রকার শ্রেণীবিভাগ করা হয়েছে। কেননা কর্মসংস্থানের
বর্গীকরণ করা হয়েছে। যেহেতু বিভিন্ন ধরনের কাজ রয়েছে এবং প্রতিটি কর্ম সম্পাদনের জন্য বিভিন্ন
যোগ্যতা,
ক্ষমতা, রুচি ইত্যাদির প্রয়োজন
রয়েছে। এই আধারের ভিত্তিতে আমাদের বুঝতে হবে কারা কোন কাজের যোগ্য, কার কি ক্ষমতা রয়েছে, কি রুচি রয়েছে ইত্যাদি বিষয় আমাদের বুঝতে হবে। এমনটি না হলে কোনো কর্ম নির্ধারিত
হতে পারবে না। কর্ম নির্ধারিত না হলে সেই কর্মে যে গুণাবলী থাকা উচিৎ
তা আসতে পারবে না। যদি গুণগত মান না পাওয়া যায় তবে উচ্চমানের ভোগ থেকেও আমরা বঞ্চিত
হব। সুতরাং মানুষ কত রকমের হয়ে থাকে এটি জানা জরুরী এবং শিক্ষা ব্যবস্থার পরিকল্পনাও
এই শ্রেণীবিভাগ অনুযায়ী করা উচিত। একইভাবে মানুষদের বোঝানো উচিত যে তারা কোন শ্রেণীবিভাগের অন্তর্গত, যেন পছন্দের জ্ঞান, পছন্দের জীবিকা, পছন্দের জীবন-যাপন, পছন্দের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, পছন্দের
সম্পর্ক ইত্যাদি নির্বাচন করাটা সহজ হয়। ব্যক্তি আপন রুচি অনুযায়ী যা নির্বাচন করবে তাতে সহযোগিতার
জন্যই এই শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে। যেন সকলে নিজেদের ব্যক্তিত্ব অনুসারে ইপ্সিত চাওয়া-পাওয়াগুলিতে সহজে পৌঁছাতে
পারে।
এটি পরিষ্কার হওয়া
প্রয়োজন যে এই শ্রেণীবিভাগের সাথে অসমতার কোনো সম্পর্ক নেই। এই শ্রেণীবিভাগের অর্থ এই নয় যে একজন
মানুষ মহান হন এবং অন্যজন নগণ্য হন। এটি নিখুঁত বিচার নয়। সমস্ত মানুষ সমান হন। এ কথার অর্থ এমনও নয় যে একজন মানুষ অন্য মানুষের সামনে
মাথা নত করে নমস্কার করবে। এমন কিছুই সেখানে নেই। ২৫ বছর বয়স হলে প্রতিটি মানুষ সমান। কোনো অর্থেই তাদের মধ্যে কেউ উচ্চ নয় বা নিকৃষ্টও নয়। তারা একে অপরের কাছে যেই হোন না কেন। এমনকি পিতা-পুত্র হলেও। ছেলে অথবা মেয়ে ২৫ বছর বয়স হলে তারা একেকটি স্বাধীন সত্তা। পিতা,
মাতা, ঠাকুরদা, ঠাকুরমা এমনকি অন্য কারোর সমকক্ষ হিসেবে তিনি একই মর্যাদা পাবেন। কেউ ইচ্ছে
করলে বয়স্কদের অভিবাদন করতেই পারেন, কিন্তু
সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থা অনুযায়ী সকলের অভিবাদন সমান হওয়া উচিত। আলাদাভাবে মাথা
নত করার কোনো প্রয়োজন হবে না। যেহেতু সমস্ত ক্ষেত্রে সকলের মধ্যে সমতা প্রদান করা হয়েছে এবং সেই কারণে নতুন ব্যবস্থায় সকলেই সমান নাগরিক। তাদের সকল অধিকার
সমান। যতদিন পর্যন্ত ২৫ বছর বয়স না হয় ততদিন অবধি এটি ধরা হবে এখনও সে অনেক বিষয়ে বিকশিত হয়ে ওঠেনি এবং সে এখনও পর্যন্ত অনেক কিছু বুঝতে পারবে না। তাদের নির্দেশ প্রদানের প্রয়োজন রয়েছে, তারা এমন
কিছু না করুক যেখানে নিজেকে এবং অন্যদের ভোগান্তি পোহাতে হয়।
সুতরাং তারা
যেমন যেমন বড় হবে তাদের স্বাধীনতাও সেইভাবে বৃদ্ধি পাবে
এবং নির্ভরতা কম হতে থাকবে। এই ব্যবস্থা এমন ভাবেই নির্মাণ করা হয়েছে। ২৫ বছর পর একজনের যেমন স্বাধীনতা থাকবে তেমনটি অন্য কারোর ক্ষেত্রেও থাকবে। অর্থাৎ সম্পূর্ণ স্বাধীনতা। সুতরাং নতুন ব্যবস্থায়
যে শ্রেণীবিভাগ রাখা হয়েছে তাকে এভাবেই বোঝা
উচিত। এটিকে প্রথমে মনুষ্যের স্বভাব এবং পরে ব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে বিভাজন করা হয়েছে। অধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন মানুষের মধ্যে
কোনো পার্থক্য নেই।
রাজনৈতিক মডেল/POLITICAL MODEL
২১. গণতন্ত্রের বর্তমান মডেল এবং গণতন্ত্রের নতুন মডেলের মধ্যে মুখ্য পার্থক্য কোথায়?
বর্তমানে যে
মডেল চলছে সেখানে ভোটাধিকারের ক্ষমতা ৫ বছরে একবার পাওয়া যায়। সেও মাত্র ৫ মিনিটের জন্য। নাগরিক সেখানে অন্য কাউকে প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত
করে দেয়। নিজের ক্ষমতা অন্য কারোর হাতে ন্যস্ত করে দেয়। বলা যায় সকল প্রকার ক্ষমতাই
অন্যের হাতে ন্যস্ত করে দেয়। একদিকে যেমন জনগণকে ম্যানেজমেন্ট করা এবং নীতিনিয়ম নির্ধারণ
করার ক্ষমতা, অন্যদিকে তারা নিজেদের পছন্দ/অপছন্দের
ক্ষমতাও ন্যস্ত করে দেয়। অর্থাৎ, কোনটা আমাদের জন্য
ভালো,
কোনটা খারাপ, আমাদের পছন্দ কিসে হবে কিসে হবে না সকল বিষয় আপনি জানেন। সবকিছু আপনিই নির্ধারণ
করুন। এভাবে দুই
ধরনের ক্ষমতাই আমরা অন্যের হাতে তুলে দেয়।
সম্পূর্ণ
সমাধান ব্যবস্থার রাজনৈতিক মডেলে সমস্ত ক্ষমতা ২৪ ঘন্টা জনগণের মধ্যে নিহিত থাকবে। কিভাবে থাকবে চলুন সেটি বুঝে নিই। দুরকম ক্ষমতা থাকবে, একটি হলো কর্মের প্রতিনিধিত্ব করা। নেতারা নীতি নির্ধারণ করবে। বলা যায় তারা নিয়মনীতি
প্রণয়ন করবে, কেননা তাদের সেই প্রকার জ্ঞান/বোধ থাকবে এবং তারা তেমন প্রকার কর্মে দক্ষ হবে। তাদের যে ধরণের জ্ঞান থাকবে, তারা সেই ধরণের বিশেষজ্ঞ। এই কর্ম তারা করবেন। এটিকে কোনোভাবেই
ক্ষমতা ক্ষমতা বলা যায় না। তাই তারা নিয়মনীতি নির্ধারণ করতে পারবে এবং নীতি-নিয়ম প্রণয়ন করতে পারবে। নীতিমালা প্রনয়নের পর ৩ মাস তা পাবলিক ফোরামে
রাখা থাকবে। পাবলিক ফোরামে যদি ৯০% ইতিবাচক
ভোট আসে তবে ধরে নেওয়া হবে জনগণ উক্ত নীতিকে
গ্রহণ করেছে। এরপর সেই নীতি প্রযোজ্য হবে। এমনকি সেই নীতি
প্রয়োগের পরও ভোট প্রদানের অধিকার সর্বদা খোলা থাকবে। যদি সেই নীতির কারণে কখনো কোনো
ক্ষতি হয় এবং ১০% নেতিবাচক ভোট আসে, তবে সেই নীতি বাতিল বলে গন্য হবে। এইভাবে সব ক্ষমতা সর্বদা জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকবে। যা বর্তমান ব্যবস্থায় নেই।
বর্তমান ব্যবস্থায়
নিজেদের ক্ষমতা অন্যের হাতে তুলে দিয়ে ৫ বছরের জন্য আমরা ক্ষমতাহীন হয়ে যাই। এরপর ওই সকল ব্যক্তিরাই আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করেন।
নীতিনিয়ম তারাই তৈরি করেন এবং প্রয়োগও তারাই করেন। এমনকি কিসে আমাদের পছন্দ হবে কিসে হবে না ইত্যাদি বিষয়ও তারা ঠিক করেন। এসব বিষয় নিয়ে তারা পাঁচ বছরেও একবার জিজ্ঞাসা করতে
আসেন না। সুতরাং সামগ্রিকভাবে আমাদের কাছে কোনো ক্ষমতাই থাকে না। বলা যায় আমরা নিজের হাত
নিজেরা কেটে ফেলি। যার ফলাফল আমরা বাস্তবে দেখছি। রাজনৈতিক দল এবং বিত্তশালীরা একত্রিত হয়ে জোট গঠন করে
ফেলে। তারা নিজস্ব সুবিধা অনুযায়ী নীতিমালা তৈরি করে এবং ঐশ্বর্যপূর্ণ জীবনযাপন করে।
নিজেদের বেতনও ২ লাখ থেকে ৫ লাখ পর্যন্ত করে রেখেছে। পাশাপাশি সমস্ত সুযোগ সুবিধা বিনামূল্যে ভোগ করে চলেছে। এবার আপনিই বলুন, যে দেশের নাগরিকের কাছে
চাকরি নেই, থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে
সীমাবদ্ধ, সেখানে নেতাদের বেতন ২ লাখ থেকে ৫ লাখ, সাথে অন্যান্য সুখসুবিধা
নেবার কি অধিকার রয়েছে? এই অধিকার তো জনগণ দেয়নি। তারা নিজেরা সংসদে গিয়ে
এই অধিকারের ব্যবস্থা করে নিয়েছে। এ তো ঠিক নয়, তাই না? তাহলে ঘরে যিনি অভিবাবক, ধরে নিন পিতা অথবা মাতা, তারা নিজেদের জন্য সমস্ত সুখসুবিধার বন্দোবস্ত করে নিচ্ছে, নিজেরা ফল, জুস,
মদ্যপান, আমোদ-প্রমোদ করছে, নিজেরা যেমনভাবে জীবন যাপন করতে চায় তেমনভাবে জীবন কাটাচ্ছে। অপরদিকে জনগণের সন্তানদের জন্য, স্ত্রীর জন্য, বৃদ্ধ পিতা-মাতার জন্য মাত্র দু-মুঠো চাল বা আধখানা রুটির যোগান– এটি কিসের ন্যায় হল? অর্থাৎ সরকার যদি কাউকে প্রতি কেজি দুই টাকা দরে চাল দেয় তাতেই বা কি লাভ হয়? এটি কোনো ব্যবস্থা হল? এটিকে আমরা প্রকৃত ন্যায় বলতে পারি? এটি কি গণতন্ত্র? নাকি গণতন্ত্রের নামে তামাশা? গণতন্ত্র তো নয় বরং এটি লুণ্ঠনতন্ত্রের মতো হয়ে গিয়েছে। এটি একরকম স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এটিকে দলীয় তন্ত্রও বলা যেতে পারে। এমন ব্যবস্থায় ক্ষমতা একটি
দলের হাতে থাকে। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর মানুষ একজনকে ভোট দিতে বদ্ধপরিকর থাকে। বলা যায় বাধ্য থাকে। কোনো দলকেই কেউ ভোট দিতে
চান না এমনটি কিন্তু হয় না। কোনো না কোনো দলকে দিতেই হবে। ব্যবস্থা এমন করেই তৈরি
করা হয়েছে। ক্ষমতা সর্বদা একটি দলের কাছেই থাকবে। যদি তাই হয় তবে তো এটি দলীয় ব্যবস্থা, গণতন্ত্র নয়। আমরা যে প্রস্তাব উপস্থাপন
করছি তা সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক, সেখানে ক্ষমতা ২৪
ঘণ্টাই জনগণের কাছে থাকবে। কোন পদাধিকারীকে রাখবে কি রাখবে না তা সর্বদা জনগণই নির্ধারণ করবে। এই ব্যবস্থায়
শেষ পর্যন্ত জনগণই নীতিনিয়ম কার্যকরী করার সিদ্ধান্ত নেবে। অর্থাৎ সেই নিয়ম তাদের
কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে কিনা তা জনগণই ঠিক করবে। একজন নেতার কাজ হবে দক্ষতা এবং জ্ঞানকে ব্যবহার করে জনস্বার্থে
নিজের সেরা প্রস্তাব উপস্থাপন করা।
২২. আপনার নতুন রাজনৈতিক মডেল সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বলুন?
নতুন রাজনৈতিক
মডেলে যারা নেতা হবার জন্য প্রার্থী হবেন তাদের পরীক্ষা হবে। অর্থাৎ নির্বাচনের পূর্বে
প্রার্থী বাছাই করার জন্য পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। যেভাবে আইএএস ইত্যাদি পরীক্ষা হয়ে
থাকে তেমনভাবে নেতৃত্ব পর্ষদের জন্যও পরীক্ষা
অনুষ্ঠিত হবে। প্রথমত, এই পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ
হবেন তারাই শুধুমাত্র প্রার্থী হিসেবে আবেদন করতে পারবেন, সকলে
নয়। মুক্ত ব্যবস্থা থাকলে তো যার সেই বিষয়ে জ্ঞান নেই সেও আবেদন করতে থাকবে।
এই পরীক্ষা কিসের
ভিত্তিতে নেতৃত্ব মণ্ডলীর যোগ্যতা যাচাই করবে, এর জন্য আপনাকে
প্রথমে মানুষের চেতনা এবং তার শ্রেণীবিভাগকে বুঝতে হবে, যা বিস্তারিতভাবে আমি সম্পূর্ণ সমাধান পুস্তকে বর্ণনা করেছি। দ্বিতীয়ত, এখানে একটি মুখ্য নির্বাচন কমিশন থাকবে যা সরকার গঠনের প্রক্রিয়াকে সম্পন্ন
করবে। এই ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। নির্বাচন
প্রক্রিয়া বুঝে নেবার পূর্বে আমাদের প্রশাসনিক ক্ষেত্রের বিভাজনকেও বুঝতে হবে। প্রায়
২ থেকে ৫ লক্ষ নাগরিকদের জন্য সমস্ত সুবিধাসম্পন্ন আবাসিক ক্ষেত্রকে নগরের সংজ্ঞা প্রদান
করা হয়েছে। ধীরে ধীরে সমগ্র ভারতে এইরকম নগর স্থাপন করা হবে। সমস্ত ক্ষেত্রে সুবিধা
এবং সংরক্ষণ একইরকম থাকবে। ২০টি নগর মিলে একটি ১টি জেলা বিবেচিত হবে। একইভাবে ২০টি জেলাকে নিয়ে
একটি রাজ্য হিসেবে বিবেচিত হবে এবং ২০টি রাজ্য মিলে একটি দেশ হিসেবে বিবেচিত হবে। একইভাবে
সব দেশ মিলে একটি বিশ্ব হিসেবে বিবেচিত হবে।
নগর পর্যায়ে নির্বাচনের
জন্য চেতনাত্মক স্তরের মানুষদের ক্ষমতায়ন করা হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ১০ জন যোগ্য আবেদনকারীকেই নির্বাচনের জন্য রাখা হবে। তাদের মধ্য থেকে জনগণ ৫ জন
নেতা নির্বাচন করবে। উদাহরণস্বরূপ– ২ লাখ পর্যন্ত জনসংখ্যার জন্য ১০ জন নেতার মধ্যে ৫ জন নির্বাচিত হবে। অর্থাৎ একটি নগরের জন্য ৫ জন নেতা। কেবলমাত্র নগর পর্যায়ের নেতারাই
জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবে। নির্বাচিত নেতাদের দ্বারা জেলা পর্যায়ের ৫ জন নেতা
নির্বাচিত হবে। এরপর জেলা স্তরের নেতাদের দ্বারা রাজ্য পর্যায়ের ৫
জন নেতা নির্বাচিত হবে। একইভাবে রাজ্য স্তরের নেতারা দেশের জন্য ৫ জন নেতাকে বেছে নেবেন। শেষে একইভাবে সব দেশের
নেতা মিলে বিশ্বের জন্য ৫ জন নেতা বাছাই করবেন। অথবা প্রতিটি দেশ থেকে
একজন নেতা বিশ্ব সরকারের জন্য নির্বাচিত হতে পারেন। প্রতিটি স্তরে ৫ জনের মধ্যে ১ জন প্রধান এবং ৪ জন সহকারী নেতা থাকবেন।
সাধারণত সকল
নেতার মেয়াদ ৫ বছরের হবে। এই প্রণালীতে নেতা নির্বাচন নীচে থেকে উপরের দিকে থাকবে এবং ব্যবস্থা উপর থেকে
নিচ পর্যন্ত থাকবে। অর্থাৎ মুখ্য সংবিধান বিশ্বস্তরের নেতাদের দ্বারা লিখিত বা সংশোধন
করা হবে। এই পদ্ধতি অনুযায়ী অন্যান্য স্তরের ব্যবস্থা পরিকল্পিত
হবে। বিশ্ব সরকার তার
স্তরের কাজ করবে এবং দেশগুলির সরকারকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে থাকবে এবং তাদের
কাজ পর্যবেক্ষণ করতে থাকবে। দেশের সরকার তার কার্যাবলীর পাশাপাশি রাজ্য
সরকারগুলিকে নির্দেশনা দেবে এবং তাদের কাজের পর্যবেক্ষণ করবে। একইভাবে নগর পর্যন্ত চলবে।
সুতরাং নির্বাচন হবে নিচ থেকে উপরে এবং শাসন হবে উপর থেকে নিচে। এতে সর্বদা ক্ষমতার
ভারসাম্য বজায় থাকবে। চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ সর্বদা জনগণের হাতেই নিহিত থাকবে।
নতুন
ব্যবস্থায় প্রতিটি মানুষ নিজ সুখের জন্য সর্বদা
সন্তুষ্টি রেটিং দিতে থাকবে। যদি ব্যবস্থার কারণে কখনো কেউ দুঃখ পান তবে তিনি রেটিং দ্বারা মতামত ব্যক্ত করতে
পারবেন। যা সকল নাগরিক যখন খুশি ইন্টারনেট থেকে দেখতে পারবে। এমন অবস্থায় সরকারকে অবিলম্বে সেই দুঃখের কারণ দূর
করতে হবে। এই মানদণ্ডের ভিত্তিতে সরকারের পদক্ষেপের অবস্থান বোঝা যাবে যে সরকার
কতটা সফল হয়েছে। এছাড়া নাগরিক ব্যবস্থার সাথে আদান প্রদান
করার সময়ই নিজেদের সন্তুষ্টি রেটিং প্রদান করতে পারবে। ০ থেকে ১০ অবধি স্কেল থাকবে যেখানে ৫ রেটিং হলে বোঝা যাবে আপনি সন্তুষ্ট। ৫ এর উপরে যত রেটিং আসবে তাতে জানা যাবে
সেই পণ্য বা পরিষেবা ব্যবহার করে আপনার প্রসন্নতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একইভাবে ৫ এর নিচে রেটিং
যতই নামবে তার অর্থ হবে আপনি অসন্তুষ্ট। যদি আপনি কোনো রেটিং প্রদান না করেন তবে আপনার দিক
থেকে ৫ ডিফল্ট রেটিং ধরে নেওয়া হবে। এই সন্তুষ্টি রেটিং থেকেই নেতা এবং তাদের সঙ্গে
কর্মরত ব্যক্তিদের পারফরম্যান্স রেটিং বের করা হবে। একইভাবে অন্যান্য কর্মচারীদের রেটিংও
বের করা হবে। এর জন্য একটি বিশেষ বিভাগ থাকবে যারা অ্যালগরিদম সিস্টেমের মাধ্যমে সন্তুষ্টি
রেটিং দ্বারা সমস্ত পদাধিকারী ব্যক্তির কর্মক্ষমতার রেটিং গণনা করবে। এর সাথে যুক্ত আনুষঙ্গিক নীতিনিয়ম, সিদ্ধান্ত এবং আউটপুটের ম্যাপিং প্রথমেই সুনির্দিষ্ট করে নেওয়া হবে। যদি পারফরম্যান্স
রেটিং নির্দিষ্ট স্তরের নিচে নেমে যায় তবে সেই নেতা, ম্যানেজমেন্ট এবং
নেতৃত্বমণ্ডলী সম্পর্কে প্রশ্ন চিহ্ন এসে যাবে। এই রেটিং-এর অবস্থান দেখেও নেতানেত্রী ব্যাপারটা গুছিয়ে না নিলে বড় ধরণের
প্রশ্ন উঠবে। সেই সমস্যা সমাধানের জন্য উচ্চ পর্যায়ের নেতারা অনুসন্ধান করবে যে কোথায় সমস্যা রয়েছে, কেন সমাধান হচ্ছে
না ইত্যাদি। নেতিবাচক কর্মক্ষমতায় উক্ত ব্যক্তি পদচ্যুত হয়ে যাবেন এবং সেই স্থানে উপযুক্ত দ্বিতীয়
ব্যক্তির প্রস্তাবনা পেশ করা হবে। সুতরাং যে পদাধিকারী ব্যক্তিরই নেতিবাচক
পারফরম্যান্স রেটিং আসবে তারা সকলেই প্রশ্নের
আওতায় আসবে। প্রশাসনিক ব্যবস্থাও এমনভাবে চলবে যেন জনগণের কাছেই ক্ষমতা থাকে।
জনসাধারণের সন্তুষ্টি রেটিং দ্বারা সমস্ত পদের নিয়ন্ত্রণ চলতে থাকবে।
২৩. আপনি বলছেন নেতাদের চয়ন হবে পরীক্ষা এবং নির্বাচনের মাধ্যমে। পরীক্ষা দ্বারা কোনো ব্যক্তির নেতৃত্ব ক্ষমতার বিচার করা কিভাবে সম্ভব?
এটি সম্ভব। উক্ত ব্যক্তির নেতৃত্ব
গুণাবলী আছে কিনা তা পরীক্ষা করা হবে। এজন্য পরীক্ষার মাধ্যমে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যাবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার
মাধ্যমে যে কারও সামর্থ্য নির্ণয় করা যায়, যেমন করে বর্তমানে অনেক ক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে। যেমন কেউ সফটওয়্যার তৈরি করতে পারে কিনা তা পরীক্ষা করতে তাকে সফটওয়্যার সংক্রান্ত
পরীক্ষা দিতে হয়। তাকে সফটওয়্যার সম্পর্কিত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হয়, কোড লেখানো হয়, এরপর ব্যবহারিক পরীক্ষা
নেওয়া হয়। যদি সেই কোড রান করে তাহলে বোঝা যায় সে কোডিং জানে। নেতৃত্বের পরীক্ষাও একইভাবে
হবে। এক্ষেত্রেও অনেক ধরনের প্রশ্ন থাকবে যার মধ্যে বিভিন্ন দৃশ্যকল্প উপস্থাপন করা
হবে এবং দেখা হবে পরীক্ষার্থী সেই পরিস্থিতিতে সমস্যাগুলি সমাধানের জন্য কি নীতি
তৈরি করে এবং কি সিদ্ধান্ত নেয়। দেখা হবে সেই ব্যক্তির জীবন দর্শন সম্পর্কে এবং ব্যবস্থার
বিভিন্ন মাত্রা সম্পর্কে কতটা বোধ আছে। নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলির
জ্ঞান থাকা অনিবার্য, দেখা হবে সেই বিষয়ে প্রার্থীর
মধ্যে কতটা দখল আছে, সেটা পরীক্ষা করে যাচাই করা হবে, যাতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় যে সেই ব্যক্তি নীতি নির্ধারণ করতে সক্ষম কিনা।
যদি সে ব্যক্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় তাহলে তিনি নির্বাচনে দাঁড়ানোর সনদ পাবেন।
২৪. আপনার কাছে নেতৃত্বের পরিভাষা কি?
যে কাজই হোক না
কেন, প্রতিটি কাজেরই একটা নিজস্ব ফ্রেম থাকে, একটা পরিধি
থাকে। এখানে পরিধির অর্থ হচ্ছে কি ধরনের রুচি থাকবে, কী ধরনের দক্ষতা থাকবে, কী ধরনের ব্যবস্থা থাকবে, কী কী বিষয়ে জ্ঞান প্রয়োজন হবে, কী ধরনের গবেষণা অবলম্বন করা হবে, কোন কোন মানুষের
ওপর সেই কাজের প্রভাব থাকবে ইত্যাদি। প্রতিটি ফ্রেম চালানোর জন্য নেতাদের প্রয়োজন
হবে এবং সেই ফ্রেমের অধীনে যে সমস্ত
ব্যবস্থা আসে সেই সমস্ত ব্যবস্থার বোধ থাকা এবং যাদের
নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা আছে তাকেই নেতা বলা হবে। তার জানা উচিত যে পরিবর্তনটি
কোথায় কার্যকর হবে। যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয় তা কোথায় উৎপন্ন হচ্ছে, কোথায় কি বিষয় যুক্ত আছে, সে দেখতে পাবে কি না পার্থক্যটা
সেরে যাবে, আর সেও জানতে পারবে কোন সমস্যাটা তার দক্ষতার
মধ্যে রয়েছে বা দক্ষতার বাইরে রয়েছে, এমনতর
ক্ষমতা থাকলে নীতি নেতৃত্ব দানের যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।
সেই পরিসীমার
মধ্যে তিনি দিশা নির্দেশ দিতে সক্ষম, দায়িত্ব
পালনে সক্ষম, সেই অবধি তিনি পরিচালনা করতে সক্ষম, কোনো সমস্যা দেখা দিতে দিলে তিনি সেই পরিসীমার সমস্যা
বুঝে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম এবং সেই পরিসীমার অবিলম্বে তার জন্য সঠিক পদক্ষেপ
নিতে সক্ষম হয়। এছাড়া যদি তিনি নিজের সাথে সম্পর্কিত মানুষজনদের সন্তুষ্ট করতে সক্ষম
হন তবে তিনি একজন প্রকৃত নেতা।
এসব তার ক্ষমতা, উপরোক্ত বিষয়গুলি হচ্ছে তার উপসর্গ। সর্বোপরি কাজের
পারফরম্যান্স দেখেই বাকি সব জানতে প্যারা যাবে। যদি তার পারফরম্যান্স সন্তোষজনক
হয় তবে সেই ব্যক্তি সেই কাজের জন্য যোগ্য। এমনও হতে পারে যে তিনি কোনোভাবে পরীক্ষায়
উত্তীর্ণ হয়ে গেলেন, যা কিছু করে, তবে তার পারফরম্যান্স দেখেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
হয়ে যাবে। সুতরাং এখানে ডাবল চেক রয়েছে। এক, যখন তিনি
পরীক্ষা দেবেন, দ্বিতীয়, কখন যখন তিনি কাজ করবেন এবং সেই কাজের পারফরম্যান্স রেটিং
আসবে।
২৫. আপনার মত অনুযায়ী স্বাধীনতা কি?
আমার মতে
স্বাধীনতার অর্থ হচ্ছে আপনি যেভাবে চান সেভাবে জীবন-যাপন করা। যদি আপনি পছন্দ অনুযায়ী জীবন-যাপন
করতে সক্ষম হন তাহলে এটি হবে আপনার পরম
স্বাধীনতা। স্বাধীনতার অর্থ হচ্ছে আমরা যেমন শিক্ষা গ্রহণ করতে চাই তা পেয়ে যাচ্ছি, যখন চাইছি তখনই পেয়ে যাচ্ছি, যতটা চাইছি তততাই পেয়ে
যাচ্ছি, যখন চাকরি বা জীবিকা চাইছি তখন পেয়ে যাচ্ছি, যতটা করতে চাইছি ততটা কাজ পেয়ে যাচ্ছি, যা সুখসুবিধা বা পণ্য/পরিষেবা চাইছি তা পেয়ে যাচ্ছি, যতটা চাইছি ততটাই পেয়ে যাচ্ছি, যখন চাইছি
তখন পেয়ে যাচ্ছি, সব মিলিয়ে আপনি যেমনভাবে জীবনযাপন
করতে চান যদি সেইরকম জীবন-যাপন করতে পারেন তাহলে এর অর্থ আপনি ১০০% স্বাধীন। স্বাধীনতা মানে সম্পূর্ণ স্বাচ্ছন্দ্য আপনার কাছে রয়েছে। অর্থাৎ sky is the limit, অর্থাৎ space is the
limit,
মানে যতটুকু পরিধি আপনার
চাই ততটুকু পরিধি আপনি জীবন-যাপনের জন্য পেয়ে যাচ্ছেন, তাহলে সেটাই হবে আপনার পরম স্বাধীনতা। এর চাইতে অধিক স্বাধীনতা কেউ চায় না এবং এর চাইতে অধিক স্বাধীনতাও বাস্তবে নেই।
থাকলেও তা আপনার কোনো কাজে আসবে না। যেমন ধরুন একজন মানুষ চারটি রুটি খায়, তবে সে যেন চারটি রুটি পেয়ে যায়, এটিই হবে
তার জন্য জরুরী স্বাধীনতা। আপনি যদি ২০টি রুটি রেখেও দেন তার কোনো অর্থ দাঁড়াচ্ছে না। স্বাধীনতার অর্থ পরম স্বাচ্ছন্দ্য অথবা পরম পরিধি। আপনি যতটা চান ততটা সুখী
হতে যা কিছু প্রয়োজন, যতটা পরিমাণে প্রয়োজন, ততটা যেন আপনি পেয়ে যান। যখন আপনি চাইছেন তখনই পেয়ে যাচ্ছেন তবেই
তা পরম স্বাধীনতা হবে। এই পরিমাণ স্বাধীনতাই প্রতিটি মানুষ চায়। এটিই তার ইচ্ছে।
২৬. আপনি এটি কিভাবে বলতে পারেন নতুন প্রণালীতে স্বৈরাচারী হবার কোনো সম্ভাবনা থাকবে না?
নতুন ব্যবস্থায়
স্বৈরশাসক হবার সুযোগ নেই। কারণ জনগণের দেওয়া সন্তুষ্টি রেটিং থেকে যে কারোর পারফরম্যান্স রেটিং বেরিয়ে আসবে। নেগেটিভ রেটিং হলে সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রশ্ন
উঠবে। নেতিবাচক পারফরম্যান্স থাকলে পদ চলে যাবে। তারপর জনগণও যে কোনো
সময় নেতিবাচক ভোট প্রদান করে যে কাউকে পদচ্যুত করতে পারে। এইভাবে মূল ক্ষমতা
জনগণের হাতে থাকবে। সুতরাং অত্যাচারী হওয়ার সুযোগ নেই। এমন ব্যবস্থায় কেউ কিভাবে স্বৈরাচারী হবে? পুলিশ বা অন্য পদাধিকারী সকলকেই ব্যবস্থার কাছে জবাবদিহি করতে হবে, কোনো নেতার কাছে নয়। প্রথমত, ক্ষমতাকে যেভাবে
২৪ ঘণ্টা জনগণের হাতে প্রদান করা হয়েছে সেখানে কেউ কোনো স্তরেই স্বৈরাচারী হতে পারবে না। বলা যায় এমনটি হবার সম্ভাবনাই
নেই। দ্বিতীয়ত, সকল কার্যক্রম অনলাইনে হবে। সবকিছুই
স্বচ্ছ হবে, সবই জনগণের সামনে রাখা থাকবে। নীতিপ্রণালী যখন প্রণয়ন
করা হবে তখন তা কেন করা হচ্ছে সেই সংক্রান্ত আলোচনা, কথোপকথন, গবেষণা, ইত্যাদি তথ্যসহ সকল রেকর্ডিং পাবলিক ফোরামে থাকবে। সেসব তথ্য যে কেউ যে কোনো সময়
দেখতে পারবে। সবকিছু অনলাইনে থাকবে। আলাদা করে কাউকে আর.টি.আই (R.T.I.) ফাইল করার প্রয়োজন হবে না। কোথাও কিছু আবরণ বা গোপনীয়তা
থাকবে না। ফলে সামান্যতম হিটলারী শাসনও কেউ চালাতে পারবে না। প্রথমত, এমন করার প্রয়োজন নেই; দ্বিতীয়ত,
কেউ চেষ্টা করলেও সম্ভব হবে না। যেখানে সামান্যতম অপরাধের সম্ভবনাই নেই সেখানে স্বৈরাচারী
অপরাধ তো গুরুতর অপরাধ। বলা যায় জঘন্য অপরাধ।
২৭. নতুন মডেলে কার্যপালিকা এবং বিধায়কদের কি ভূমিকা থাকবে, এটি কি বর্তমান মডেল থেকে ভিন্ন হবে?
এটি বর্তমান
মডেল থেকে ভিন্ন হবে। অর্থাৎ এখানে কার্যপালিকা এবং বিধায়ক/বিধায়িকার মত আলাদা কোনো বিভাজন নেই। ব্যবস্থা এমন রয়েছে যে
নেতারা নীতি নির্ধারক হবেন, ব্যবস্থার তত্ত্বাবধান করবেন এবং
শাসন ব্যবস্থাপনার কাজও করবেন। তাদের অধীনে বেশ কয়েকটি বিভাগ থাকবে যারা বিভিন্ন কাজের জন্য দায়ী থাকবে। নেতাদের
নির্বাচনী ক্ষেত্রে কমই যেতে হবে, কারণ বিভিন্ন বিভাগ
থেকে সমস্ত তথ্য তারা অনলাইনে পেয়ে যাবে। নির্বাচনী এলাকায় তো তারা অন্য লোকদের
পাঠাবেন যারা সবার পারফরমেন্স পর্যবেক্ষণ করবেন, সবকিছুর উপর নজর রাখবেন। অনলাইন সিস্টেমেও সমস্ত তথ্য ভিজ্যুয়ালাইজ হতে থাকবে। তাদের তদারকি করা এবং নীতি নির্ধারণ করা কার্যপালিকার কাজ হবে। প্রতিটি পদাধিকারী এবং বিভাগের নিজস্ব কাজ থাকবে।
প্রতিটি ইউনিট কিছু না কিছু উৎপাদন বা পরিষেবা প্রদান করবে। তাই সার্বিকভাবে
প্রশাসনের দায়িত্ব নেতৃবৃন্দের ওপর বর্তাবে এবং যে কোনো ব্যবহারিক সমস্যা দেখা
দিতে পারে সে সম্পর্কে তারা পূর্বেই সচেতন থাকবে। এতে যা হবে এমন কোনো নীতিনিয়ম তারা
তৈরি করবে না যা অব্যবহারিক হবে। কেননা প্রশাসনিক দায়িত্বও তাদের উপর থাকায় অবাস্তব
নিয়ম তারা তৈরি করবে না।
২৮. নতুন মডেলে ন্যায়পালিকার কি ভূমিকা থাকবে, এটি কি বর্তমান মডেল থেকে ভিন্ন হবে?
কিছু ক্ষেত্রে বর্তমান
মডেলের মতো এবং কিছু ক্ষেত্রে নতুন হবে। নতুন মডেলে বিচার বিভাগ একটি তত্ত্বাবধায়ক সংস্থারূপে থাকবে। নতুন মডেলে একে বলা হয়েছে সাংবিধানিক পরিষদ। যেমন বিধায়িকা (আইনসভা) এবং কার্যপালিকাকে (নির্বাহী) যৌথভাবে ‘নেতৃত্ব পরিষদ’ বলা হয়েছে তেমনি বিধায়িকাকে (আইনসভা) ‘সাংবিধানিক পরিষদ’ বলা হয়। এই বিভাগ পুরো নেতৃত্বের
তত্ত্বাবধান করবে। ব্যবস্থা ঠিকমতো চলছে কিনা এবং সঠিক আছে কিনা সেদিকে
নজর রাখবে, কোনো সমস্যা দেখা দিলে নেতৃত্ব
পরিষদের কাছে জবাবদিহি চাইবে, তাদের জিজ্ঞাসা
করবে,
তদন্ত শুরু করবে ইত্যাদি। সাংবিধানিক পরিষদ হল এক ধরণের অতিরিক্ত নেতৃত্ব, যখন নেতৃত্ব বিভাগ সমাধানে অসফল হচ্ছে তখন ব্যবহার করা হবে। কোথাও অসুবিধা হলে এবং
নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নিয়ন্ত্রণে না আসলে বিষয়টি সাংবিধানিক পরিষদের কাছে চলে যাবে। মুখ্যত এটি হবে একটি
মনিটরিং বিভাগ, যা সব দিক থেকে নিরীক্ষণ করেবে যে পুরো সিস্টেমের পারফরম্যান্স কেমন চলছে, কোনো ঘাটতি রয়েছে
কি না ইত্যাদি দিক দিয়ে এটি মূল্যায়নকারী সংস্থা হবে। এই বিভাগ প্রতি বছর বিভিন্ন প্যারামিটারের উপর
ভিত্তি করে তাদের রিপোর্ট দিতে থাকবে কোনো বিভাগের ফলাফল অনুকূল বা প্রতিকূল আসছে কিনা
তা জানাতে থাকবে। তারা জনসাধারণকে এইসব তথ্য জানাতে থাকবে। এই হচ্ছে এই বিভাগের কাজ। দ্বিতীয়ত, জরুরী
পরিস্থিতিতে মূল নেতৃত্ব অযোগ্য হলে বিষয়টি এই বিভাগে চলে যাবে। বলা যায় প্রধান
নেতৃত্বের সহকারী হিসেবে এটি একটি কমপ্লিমেন্টারি বিভাগ হবে। এই বিভাগ প্রতিটি নীতি, নিয়ম, সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত আউটপুট থেকে
পারফরম্যান্স ম্যাপিং করবে। আবার এই বিভাগ নাগরিক সন্তুষ্টি রেটিং থেকেও পারফরম্যান্স
রেটিং বের করবে। সুতরাং এই বিভাগ জনগণের কাছে এবং নেতাদেরকেও ফিডব্যাক দিতে থাকবে।
সব বিভাগ দুভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। প্রথমত, সেই ব্যবস্থায় জীবন যাপন করে জনগণের
কেমন অনুভব হচ্ছে সে সম্পর্কে, দ্বিতীয়ত, যারা কাজ করছেন তাদের পারফরম্যান্স কেমন ছিল তা। এই বিভাগ সামগ্রিকভাবে তটস্থ হয়ে পুরো
ব্যবস্থাকে তদারকি করতে থাকবে। যেহেতু ব্যবস্থার উদ্দেশ্য সমস্ত নাগরিককে সুখী করা, তাই নাগরিক কোন পণ্য এবং পরিষেবাতে কতটা কতটা সন্তুষ্ট, এমন রিপোর্ট তারা বের করতে থাকবে যাতে সংশ্লিষ্ট বিভাগ সংশোধন করতে পারে। সুতরাং এই বিভাগ এটিই
নিশ্চিত করবে যে গণতন্ত্রে সমন্বয় বজায় থাকুক এবং এখানে সমন্বয়ের অর্থ হচ্ছে বিভিন্ন
বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব যেন জনসাধারণের কাছে পৌঁছে যায়। নীতিনিয়ম, সিদ্ধান্ত ইত্যাদি যেন পাস হয় এবং জনগণের প্রতিক্রিয়া যেন সর্বদা সরকারের
কাছে পৌঁছাতে থাকে। এই প্রতিক্রিয়া বা সমন্বয়ের মাধ্যমে এমন এক ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে যার ফলে যে
কোনো সময় যে কারোর পদ চলে যেতে পারে।
২৯. নতুন ব্যবস্থায় কোন সিদ্ধান্ত কিভাবে গৃহীত হবে? সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কার কাছে থাকবে?
এই ব্যবস্থায়
প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নির্দিষ্ট পদে থাকা বিশেষজ্ঞরাই নেবেন। কিন্তু দ্বিতীয় অথবা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
জনগণ নেবে।
৩০. নতুন ব্যবস্থায় সরকারের কাজ কি?
সরকার সবকিছুই
দেখভাল করবে। যেমন– শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চাহিদা ও সরবরাহ, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, সার্বিক দিক দিয়ে সামাজিক কল্যাণসহ সব
ধরনের সুখসুবিধা। ব্যবস্থা সর্বদা খেয়াল রাখবে যে সকল নাগরিক ১০০% সন্তুষ্ট রয়েছে কিনা। সন্তুষ্ট না হলে তারা আপডেট
করবে,
সংশোধন করবে। এমনটি করতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত সন্তুষ্টি না আসে। যেহেতু এটি একটি
কেন্দ্রীভূত কাঠামো এবং সরকারই সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনা করবে তাই সরকারের চোখের
সামনেই সবকিছু ঘটতে থাকবে।
দার্শনিক মডেল/PHILOSOPHICAL MODEL
৩১. আপনার মত অনুযায়ী জীবনের উদ্দেশ্য কি?
জীবনের
উদ্দেশ্য হল সুখী হওয়া। অর্থাৎ সুখ লাভ করাই জীবনের উদ্দেশ্য।
৩২. আপনার মত অনুযায়ী মনুষ্য কি?
মানুষ এমন একটি
প্রাণী এবং এমন একটি অস্তিত্ব যে বিভিন্ন
উপায়ে সুখী হতে চায়। নানারকম জ্ঞান অর্জন করা, উপার্জন করা, ভোগ করা, আনন্দ উপভোগ করা, ইচ্ছে পূরণ করা ইত্যাদির
দ্বারা সে সুখী হয়ে চায়। এমনকি তার জীবন যাপনের মধ্যেও বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। সুতরাং মানুষ এমন একটি
সত্ত্বা যে জ্ঞান, কর্ম, ভোগ এবং বিশ্রামের ইচ্ছে পূরণের দ্বারা নিরন্তর সুখী হবার প্রয়াস করতে থাকে।
৩৩. আপনার মত অনুযায়ী সুখ এবং দুঃখ কি? সুখ কত প্রকারের হয়ে থাকে?
সুখের অর্থ হচ্ছে
আপনি কিছু আকাঙ্ক্ষা করেছেন এবং সেই আকাঙ্ক্ষা আপনার পূর্ণ হল। আপনার ইচ্ছে যদি উৎপন্ন
হতে থাকে এবং তা পূরণ হতে থাকে তবে এই ব্যাপারটিকে সুখ বলা হবে। আর যদি ইচ্ছে উৎপন্ন হতে থাকে কিন্তু পূরণ হতে না পারে
তবে এই ব্যাপারটিকে দুঃখ বলা হবে। এই হচ্ছে সুখ এবং দুঃখ। বিভিন্ন রকমের সুখ রয়েছে, যেমন জ্ঞানের সুখ, কর্মের সুখ, ভোগের সুখ এবং বিশ্রামের সুখ। এইভাবে বিভিন্ন বিষয়ে লিপ্ত হওয়াই আমাদের সুখ প্রদান
করে। একইভাবে অনেক প্রকার
দুঃখও রয়েছে। সুখকে বিভিন্নভাবে শ্রেণীবিভক্ত করা যেতে পারে। যেমন– ব্যক্তিগত সুখ, পারিবারিক সুখ, সামাজিক সুখ এবং সমষ্টিগত সুখ। আবার ব্যক্তিগত সুখকেও বিভাজন করা যেতে পারে। যেমন– শারীরিক সুখ, মানসিক সুখ, ভাবনাত্মক সুখ এবং চেতনাত্মক সুখ। ব্যক্তিগত
সুখের ভিত্তি সত্য। পারিবারিক সুখের ভিত্তি প্রেম। সামাজিক সুখের ভিত্তি ন্যায়। সমষ্টিগত সুখের ভিত্তি পুণ্য। এই চারটি সুখও আবার একে অপরের দ্বারা প্রভাবিত হয়। যদি
সমাজব্যবস্থা সঠিক হয় তবে পারিবারিক সুখ ও ব্যক্তিগত সুখে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। সেজন্য
আমাদের শুধুমাত্র সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থা নিয়েই কাজ করা উচিত।
৩৪. মানুষ কেন হীনতা এবং শ্রেষ্ঠতার ভাবনায় লিপ্ত হয়, এ বিষয়ে আপনার কি মনে হয়? একজন অপরজনের কাছ থেকে মান্যতাই বা কেন আশা করে থাকে?
পরিস্থিতি
অনুযায়ী এমন হয়ে যায়। কেননা বর্তমান পরিস্থিতি এমন অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছে যে মহান বলে প্রতিপন্ন হলে সমস্ত সুখসুবিধা
আপনার পক্ষে বইতে শুরু করে। অসচেতনভাবে আমরা ছোটবেলা থেকেই এই বিষয়টিকে বুঝতে পারি। আপনি যখন একটি পরিবেশে বাস করেন, পড়াশোনা করেন, বড় হতে থাকেন তখন ভেতর থেকে উপলব্ধি করতে পারেন যে
বিখ্যাত ব্যক্তিদের সব আছে, সমস্ত সুখসুবিধা আছে, তাই সব মানুষ উচ্চতর হতে চায়। অন্য ভাবে বললে শ্রেষ্ঠতর হতে চায়। যারা হতে পারে না তারা নিজেকে নিকৃষ্ট অনুভব
করে। এমনকি তারা বুঝতে পারে যে তাদের কাছে সমস্ত সুখের উপস্থিতি নেই। তারা হীনমন্য বোধ করে। সুতরাং এই
অবস্থার জন্ম হচ্ছে উৎকৃষ্টতা অথবা হীনমন্যতা থেকে। যদি সামগ্রিকভাবে বললে এই খারাপ অবস্থার
জন্য দায়ী হচ্ছে ব্যবস্থা। যা এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে যেখানে অল্পসংখ্যক মানুষ শ্রেষ্ঠত্বে পৌঁছাতে পারে
এবং নিজেকে মহান অনুভব করতে পারেন। আর বেশিরভাগ মানুষই হীনমন্যতা অনুভব করে। উভয় দিকেই জটিলতা এবং
অসুবিধা রয়েছে। শ্রেষ্ঠত্বে অন্য ধরনের সমস্যা আছে, আবার কিছু সুবিধাও আছে। আর হীনমন্যতায় রয়েছে
শুধুই সমস্যা। লাভের কোনো ব্যপারই এখানে নেই। তাই সকলে শ্রেষ্ঠ
হতে চায়। কেউ নিকৃষ্ট হতে চায় না। কারণ শ্রেষ্ঠত্বে অন্তত কিছু লাভ তো আছেই।
শিক্ষাগত মডেল/EDUCATIONAL
MODEL
৩৫. বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় আপনি কি কি ত্রুটি দেখতে পাচ্ছেন?
অনেক ধরনের ত্রুটি
রয়েছে। প্রথমত, অধিক পড়ার বোঝা। দ্বিতীয়ত, অল্প বয়স থেকেই লেখাপড়া শুরু হয়ে যাওয়া। তৃতীয়ত, উচ্চতর চাকরি পেতে পরিবারের সদস্যদের চাপ প্রদান। চতুর্থত, সকল শিশুর জন্য সমান স্তরে শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা
না পাওয়া। পঞ্চমত, তারা যে ধরনের শিক্ষা নিতে চায় তা গ্রহণ
করতে না পারা। তারা যে ধরনের জীবিকা পেতে চায় তেমন জীবিকা পায় না। সুতরাং বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার এই সমস্ত ত্রুটিই
মানুষের উপর বোঝার মত চেপে বসেছে এবং সঙ্কুচিত করে রেখেছে। আমার মনে হয় এই অসুবিধাগুলি মানুষকে প্রসারিত হতে দেয় না। সে দেখতে পায় শারীরিক দিক থেকে তো যুবা হয়ে উঠছে কিন্তু ভেতরে ভেতরে মনে হয় যেন মৃত। মর-মর হয়ে যেন জীবন যাপন করছে। এর অর্থ হচ্ছে সে আসলে সুখী নয়। শুরুর দিকে দুই-চার বছর মনে হয় জীবনে আনন্দ আছে,
সুখ আছে। কিন্তু যখনই সে স্কুলে যাওয়া শুরু করে তখন মনে হয় যেন শাস্তি শুরু হয়ে গিয়েছে। এরপর ২০-২৫ বছর বয়সে শিক্ষা সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত শাস্তি চলতে থাকে। একেবারে শুরু থেকেই যখন এমন অবস্থা তখন কিভাবে সে স্বাভাবিক মানসিকতার হয়ে উঠবে?
কিভাবে সুখী হবে?
কিভাবে ১৫০-২০০-৪০০ বছর অবধি জীবিত থাকবে? আদৌ কি সম্ভব? সুতরাং বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার এই প্রণালী শুধু বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ মানুষ বাস্তবে যেমন থাকতে পছন্দ করে তেমনভাবে থাকবে। যা হতে চায় তা হতে সাহায্য পাবে। এরপর ব্যবস্থা দ্বারা সেই ব্যক্তির কাছ থেকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী সহযোগিতা নেওয়া যাতে বিভিন্ন প্রকার ভোগ সামগ্রী, পরিষেবা ইত্যাদি উৎপন্ন হয়। যেন সকলে সুখী হতে পারে।
৩৬. আপনার মত অনুযায়ী শিক্ষার পরিভাষা কি?
শিক্ষা আমাদের অন্তঃকরণকে
শিষ্ট করে তোলে। সার্বিকভাবে শিক্ষাই আমাদের শিষ্ট করে তোলে। শিষ্ট দ্বারাই মানুষ সভ্য হয়ে উঠে। সভ্যের অর্থ হচ্ছে যে
সমাজ তৈরি হয়েছে তাতে যেন সে আচরণের যোগ্য হয়ে ওঠে। সভ্য হবার অর্থ এই নয়
যে মানুষ একটি নষ্ট প্রাণী, তাকে শিক্ষা দিয়ে সংশোধন করতে হবে। মানুষ স্বাভাবিকভাবে যেমন হওয়া উচিৎ তেমনই হয়ে থাকে। শিক্ষার লক্ষ্য কেবলমাত্র এটিই হওয়া উচিৎ যেন সে সমাজের
নীতিনিয়ম সম্পর্কে সচেতন হতে পারে, যেন সে
সামাজিক আচার ব্যবহারে সফল হতে পারে এবং সমাজে তার কর্ম কি হবে তা নির্বাচন করতে পারে,
যেন সমাজের উদ্দেশ্যে নিজের যোগদান দিতে পারে। এইজন্যই তো সমাজের রচনা
হয়েছে, যেন আমরা সকলে ইপ্সিত সুখ প্রাপ্ত করতে পারি। শিক্ষার মাধ্যমে আমরা জানতে
পারি যে কেন আমাদের কর্ম করা উচিৎ, কিভাবে
করা উচিৎ, কোনটি সঠিক এবং কোনটি ভুল। কার সাথে কেমন ব্যবহার করা
উচিৎ, সমাজে তার অবস্থান কী হবে, কার সাথে কিভাবে মোকাবিলা করবে, কিভাবে আচরণ করবে– এসব শিক্ষার মাধ্যমে
সহজে ও দ্রুত জানা যায়। এটিই শিক্ষার পরিভাষা। শিক্ষা আমাদের শেখায় যে কীভাবে সুখী হওয়া উচিত, কীভাবে জীবনের লক্ষ্যগুলি পূরণ করা যেতে পারে, কেমন ব্যবস্থা আমাদের প্রয়োজন, কিভাবে আমরা
সেই ব্যবস্থায় একে অপরের সাথে সহযোগিতার সাথে বসবাস করতে পারি ইত্যাদি বিষয় শেখানোর
জন্য শিক্ষার প্রয়োজন হয়। শিক্ষা আমাদের কোনো একটি পেশায়, কোনো একটি বিষয়ে আমাদের দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত করে
তোলে। শিক্ষার অর্থ এটি
কখনই হতে পারে না যে কেউ খারাপ মানুষ হয় এবং নৈতিকতা পাঠ করিয়ে করিয়ে তাকে ভাল
মানুষ তৈরি করতে হবে। অপরদিকে তাকে মূর্খ থেকে বিদ্বান হওয়ার জন্য জোর প্রদান
করতে হবে। দুটোই আসলে সঠিক পন্থা নয়।
উপসংহার এই যে মানব
জীবনের সার্বিক বিকাশের জন্য শিক্ষা অপরিহার্য। শিক্ষা আমাদের জন্য সঠিক অর্থে
সামাজিক হয়ে উঠতে সহায়তা করে। সামাজিক হওয়ার মাধ্যমেই সব ধরনের সুখের দরজা
খুলতে শুরু করে। কিভাবে সমাজের সকলকে সমৃদ্ধ করা যায়, সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করা যায়, কিভাবে
জ্ঞান-বিজ্ঞানের সন্ধান করা যায়, কিভাবে
সেই জ্ঞান ও বিজ্ঞানকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে প্রেরণ করা যায় যাতে আগামী প্রজন্ম
সহজে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে সেই জ্ঞান লাভ করতে পারে। কিভাবে আরও আবিষ্কারের
দিকে নিয়ে যেতে পারে এবং যা
আবিষ্কৃত হয়েছে তা জীবনের সুবিধার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে যেন আমরা অধিক সুখী
হতে পারি। পরিবার এবং সমাজ গঠনের উদ্দেশ্যও তো
তাই। এই কাঠামো তৈরি করার জন্যই শিক্ষার প্রয়োজন হয়।
৩৭. আপনার প্রস্তাবিত শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে কোথায় ভিন্ন?
নতুন
শিক্ষাব্যবস্থা শিশুদের রুচি অনুযায়ী হবে এবং খুবই সহজ সরল থাকবে। স্কুল দুই ঘণ্টার হবে। কোনো শিশুর আগ্রহ অধিক হলে তার জন্য আরও দুই ঘণ্টা
বাড়ানো যেতে পারে। সেই রকম শিশুদের জন্য তাদের রুচি অনুযায়ী অনুকূল ব্যবস্থা তৈরি
করা হবে। এই ধরণের শিক্ষার জন্য বিভিন্ন রকম উদ্ভাবনী
শিক্ষা পদ্ধতি বিদ্যমান থাকবে যা শিশুদের আগ্রহের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হবে।
শিশুরা যে বিষয়ই শিখুক না কেন সবার স্বীকৃতি সমান হবে। তারা যে বিষয়ে যতটা গভীরে
যেতে চায় তার জন্য সম্পূর্ণ প্লাটফর্ম থাকবে। ফলে যে অবধি তারা যেতে যায় যেতে পারবে। যতটা শিখতে চায় শিখতে পারবে। না শিখতে চাইলে শিখবে না। এমনভাবেই শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা হবে। শিক্ষা হতে হবে শিক্ষার্থীর ইচ্ছানুযায়ী। তাতে শিক্ষা গ্রহণকারীও সুখী হবে, এমনকি শিক্ষা প্রদানকারীও সুখী হবে। এটিই হচ্ছে নতুন শিক্ষা
ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। যেখানে কেউ কোনো প্রকার চাপে থাকবে না। বলা যায় খেলতে খেলতে শেখানো পড়ানো চলতে থাকবে।
শিক্ষা দুই
ধরনের হবে– সাধারণ ও জীবিকানির্ভর। ১৫ বছরের সাধারণ পাঠ্যক্রম থাকবে। যা সকলের জন্য অনিবার্য
থাকবে। কোনো শিক্ষার্থীকে কখনোই অনুত্তীর্ণ করানো হবে না। যে যত নম্বর আনবে, সেই সব নম্বরের ভিত্তিতেই পরবর্তী ক্লাসে প্রবেশ করানো হবে। সাধারণ পাঠ্যক্রমে
মাত্র চারটি বিষয় পড়ানো হবে। ভাষা, গণিত, সংজ্ঞান এবং দর্শন। যা সকল শিশুর ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটাবে। ভাষা মনের বিকাশ ঘটাবে, গণিত বুদ্ধির বিকাশ ঘটাবে, সংজ্ঞান চিত্ত বা বোধশক্তির
বিকাশ ঘটাবে, দর্শন অহংকারের বিকাশ ঘটাবে। অন্তঃকরণ বিকাশের দ্বারাই
মনুষ্য সঠিক ও অন্যায়ের জ্ঞান লাভ করে। কখন কি করতে হবে তার জ্ঞান শুধুমাত্র
শিক্ষার মাধ্যমেই তৈরি হয়। আচার-আচরণ কেমন হওয়া উচিত এসবই মানুষ শিক্ষার
মাধ্যমে জানতে পারে। সাধারণ শিক্ষা অর্জনের পর চার ধরনের ব্যক্তিত্বের
উদ্ভব হবে। শারীরিক অবস্থা (Physical
quotient), মানসিক অবস্থা (Intelligence quotient), ভাবনা অবস্থা (Emotional quotient) এবং চেতনা অবস্থা. (Conciousness quotient)।
সাধারণত জন্মের পর ৫ বছর পূর্ণ হলে ৬ তম বছরে শিশু প্রথমবারের মতো বিদ্যালয়ে
নিবন্ধিত হবে এবং প্রথম কক্ষে প্রবেশ করবে। ২০ বছর বয়সের মধ্যে প্রতিটি শিশু সাধারণ শিক্ষা
সম্পন্ন করবে। অতঃপর বিদ্যালয় দ্বারা সমস্ত শিশুর যোগ্যতা নির্ধারণ করা হবে। তারপর শিক্ষার্থীর পছন্দ বা রুচি অনুযায়ী কোনো একটি
বিষয়ে জীবিকার প্রশিক্ষণ আগামী ৫ বছরের জন্য প্রদান
করা হবে। তাকে মহাবিদ্যালয় বলা হবে। যার ভিত্তিতে সকলকে একটি জীবিকা প্রদান করা হবে।
জীবিকাভিত্তিক প্রশিক্ষণের পর শুধুমাত্র
যোগ্য শিক্ষার্থীরাই তাদের ইচ্ছানুযায়ী অনুসন্ধান-গবেষণা চালিয়ে যেতে পারবে। এটির নাম হবে বিশ্ববিদ্যালয়। যা হবে তাদের কর্মসংস্থান।
পাঁচ বর্ষীয়
প্রশিক্ষণ বিধানের অন্তর্গত চার ধরনের ব্যক্তিত্বের জন্য চার ধরনের প্রশিক্ষণ
থাকবে।
১. কৃষি শিক্ষা
২. উৎপাদনশিল্পকর্ম
শিক্ষা
৩. প্রশাসনিক শিক্ষা
4. নেতৃত্ব শিক্ষা
গবেষণা-অনুসন্ধান বিধান/RESEARCH AND DEVELOPMENT
বিশ্ববিদ্যালয়ের
অন্তর্গত গবেষণা বিভাগ থাকবে। সমস্ত ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণার কাজ চলতে থাকবে। গবেষণারত ব্যক্তিদের বৈজ্ঞানিকের উপাধি দ্বারা জানা
যাবে। গবেষণা শিক্ষায় তিনটি বিভাগে থাকবে। যেমনটি আপনার শরীর,
মন এবং প্রাণ রয়েছে, একইভাবে সমষ্টিতেও পদার্থ, প্রকৃতি এবং প্রাণ রয়েছে। পদার্থ সম্পর্কিত জ্ঞান-বিজ্ঞান গবেষণার জন্য আধিভৌতিক বিজ্ঞান,
প্রকৃতি সম্পর্কিত জ্ঞান-বিজ্ঞান গবেষণার জন্য আধিদৈবিক বিজ্ঞান
এবং প্রাণ সম্পর্কিত জ্ঞান-বিজ্ঞান গবেষণার জন্য আধ্যাত্মিক
বিজ্ঞান। আধিভৌতিক শিক্ষা, আধিদৈবিক
শিক্ষা, আধ্যাত্মিক শিক্ষা– এই তিন ধরনের গবেষণা অনুসন্ধান শিক্ষা হয়ে থাকে।
আধিভৌতিক শিক্ষার
অধীনে চার ধরনের জীবিকা শিক্ষা থাকবে– কৃষি,
উৎপাদনশিল্পকর্ম, প্রশাসন এবং নেতৃত্বমূলক বা গবেষণামূলক কাজ। সমগ্র
প্রকৃতির অধ্যয়ন ও গবেষণামূলক কাজ আধিদৈবিক শিক্ষার পরিসরে আসে। প্রাণের অধ্যয়ন ও গবেষণার কাজ আধ্যাত্মিক শিক্ষার অন্তর্গত
থাকবে। সংক্ষেপে এই হল সম্পূর্ণ
সমাধান ব্যবস্থার শিক্ষা কাঠামো।
স্থানান্তরকাল/TRANSITION PERIOD
৩৮. বর্তমান ব্যবস্থা থেকে নতুন ব্যবস্থায় কিভাবে যাব?
এইসব খুবই
মসৃণভাবে ঘটবে। কাউকে কোনো প্রকার অসুবিধা না করেই। সর্বপ্রথমে আমরা এই ব্যবস্থার জ্ঞানকে জনগণের কাছে উপস্থাপন করছি যেন তারা
ভালোভাবে বুঝে নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে যে এই ব্যবস্থাকে আনা উচিৎ কি উচিৎ নয়। একইসাথে ‘মুক্ত মঞ্চ’ নামে একটি কর্মসূচি পরিচালনা করা
হচ্ছে এবং অন্যান্য মাধ্যমেও এই সমাধান সূত্রকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। নতুন ব্যবস্থা সম্পর্কে সমস্ত দৃষ্টিকোণ থেকেই বার্তা
প্রেরণ করা হচ্ছে এবং পরস্পরের সাথে কথোপকথন চলছে। সার্ভে করার পর যদি দেখা
যায় জনসাধারণ এর সাথে রয়েছে এবং জনগণ যদি মনে করে এই ব্যবস্থাকে আনা উচিত তবে বিষয়টি সাংবিধানিকভাবে এগিয়ে যাবে যেন নতুন ব্যবস্থা বর্তমান সরকার বা
নতুন সরকার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ বিদ্যমান ব্যবস্থা দ্বারা নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হোক। সংখ্যাগরিষ্ঠরা চাইলে এটি
নির্বাচনের মুখ্য বিষয় হয়ে উঠবে এবং সমাজ আগে তৎপর হবে। সমাজ পূর্ব হতেই প্রস্তুত
হয়ে যাবে। কেননা এই বিষয়ে সমাজে অনেক আলোচনা হয়ে যাবে এবং মানুষের
মানসিকতাও তৈরি হয়ে যাবে। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে ‘সম্পূর্ণ সমাধান’ পুস্তক হিন্দি, ইংরিজি, রাশিয়ান এবং বাংলা ভাষায় উপলব্ধ হয়ে গিয়েছে। যেখানে ধাপে ধাপে বর্ণনা
করা রয়েছে কিভাবে এবং কোনো প্রকার ঝামেলা ছাড়া সাংবিধানিকভাবে বিদ্যমান ব্যবস্থা
নতুন ব্যবস্থায় স্থানান্তরিত হবে, কোনো বিপ্লব বা
সংঘাত ছাড়াই। আপনি পুস্তকটি অধ্যয়ন করে জেনে নিতে পারবেন। নতুন ব্যবস্থা শুরু হলে প্রথমে
কয়েকটি নিয়মে পরিবর্তন আসবে এবং একটি স্থানান্তরণ প্রক্রিয়া চলবে, বর্তমান সময়ের বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা থেকে কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থায়। সেজন্য সফটওয়্যার ইত্যাদি তৈরি হবে, পরিকাঠামো ইত্যাদির ব্লু-প্রিন্ট ইত্যাদি তৈরি
হবে। ২ থেকে ৩ বছরের একটি রূপান্তর পর্ব চলবে। কেন্দ্রীকরণের পর শুরুতেই সকলের পারিশ্রমিক সমান হয়ে
যাবে। অর্থাৎ সকলের শ্রমের মূল্যায়ন একসমান হয়ে যাবে। এইভাবে পর্যায়ক্রমে নতুন ব্যবস্থা স্থাপিত হতে থাকবে
এবং প্রতিটি দিন সকলের জন্য সর্বাধিক সুখ প্রদানকারী হয়ে উঠবে। ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে নতুন ব্যবস্থা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত
হয়ে যাবে।
৩৯. মুক্ত মঞ্চের (Open Forum) রূপরেখা কি রয়েছে এবং কিভাবে তা কাজ করবে?
মুক্ত মঞ্চের নাম থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট হয় যায়। যারা মনে করেন তাদের কাছে এমন কিছু বক্তব্য আছে অথবা
নিজস্ব কিছু আবিষ্কার আছে যার দ্বারা সমাজকে বর্তমানের চেয়ে অধিক সুখী করতে পারে, অথবা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ বা পুরনো কোনো পুস্তক রয়েছে যেখানে তিনি কোনো না কোনো সমাধান খুঁজে পেয়েছেন, অথবা উন্নত কোনো টেকনোলজি আছে এমন কিছু দাবী করেন তাহলে তাদের সকলকে খোলা আমন্ত্রণ। সমাজের কল্যাণে জনগণের কাছে তিনি তার বক্তব্য
উপস্থাপন করতে চাইছেন এমন কিছু জানতে পারলে আমরাও আমন্ত্রণপত্র পাঠাব। মুক্ত মঞ্চে
প্রশ্ন উপস্থাপন করা হবে যে তাদের সমাধান সমাজকে কিভাবে সুখী করবে। যদি তারা নিজেদের
সমাধানকে প্রত্যক্ষ প্রমাণসহ প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন তবে তা সামাজিকভাবে গ্রহণ করে নেওয়া হবে। যদি না হয় তাহলে প্রশ্ন চিহ্ন জুড়ে দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে। যদি এমন হয় যে সেই সমাধান সম্পূর্ণ
অকেজো তাহলে একটি অকেজো সংজ্ঞা লাগিয়ে দেওয়া
হবে। যদি তারা এটি প্রমাণিত না করতে পারেন তাহলে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন বসিয়ে দেওয়া
হবে যেন পরিবর্তী কোনো সময় এসে দাবি প্রমাণ করতে চাইলে প্রমাণ করতে পারবেন। কোনো যুক্তি
প্রমাণিত হলেই স্বীকৃতি পেয়ে যাবে। যুক্তি যাচাই করার জন্য আপনাকে আপনার দাবির সাথে তর্ক করতে হবে এবং প্রমাণসহ বক্তব্য
উপস্থাপন করতে হবে। সকলে সব বিষয়ে পারদর্শী হয় না তাই সকলে গভীরভাবে প্রশ্নও উত্থাপন করতে পারে না যা কারণে সমাজে সর্বদা বিভ্রান্তির অবস্থা তৈরি হয়। কেননা একমাত্র বিশেষজ্ঞরাই সমাধান দিতে পারেন এবং সঠিকভাবে
বিশ্লেষণ করতে পারেন। সেইজন্য মুক্ত মঞ্চ সকল বিশেষজ্ঞকে এক স্থানে একত্রিত করার দায়িত্ব পালন করছে। যারা যে বিষয় বোঝেন
তারা তা উপস্থাপন করবেন এবং যখন প্রশ্ন-উত্তর পর্ব
চলবে তখন মানুষ সহজেই সমাধানের দিকটি সহজেই বুঝতে পারবে। প্রশ্ন-উত্তর পর্বের পর একরকম জ্ঞানের স্থিরতা এসে যাবে এবং মানুষ বুঝতে পারবে যে
নতুন ব্যবস্থার বিষয়টি তাদের কাজে আসবে কি না। যদি এটি তাদের সুখ বৃদ্ধি করবে মনে হলে
তারা এটিকে সমর্থন করবে, অন্যথায় প্রত্যাখ্যান
করবে। এইভাবে সমাজ যে ভিন্ন ভিন্ন সমাধান চালু রয়েছে সেসব সম্পর্কে তারা একটি
সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারবে এবং সমাজ বিভ্রান্তির কবল থেকে মুক্ত হতে পারবে। বলা যায় একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশ
নির্ধারিত হবে।
৪০. যদি কোনো একটি রাষ্ট্র এই ব্যবস্থাকে গ্রহণ করে তবে সেই রাষ্ট্র অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে ব্যবসায়িক লেনদেন কিভাবে বজায় রাখবে?
যতদিন না এই
ব্যবস্থা সব রাষ্ট্রে না আসে অথবা যে সব দেশে আসবে না সেই রাষ্ট্রগুলির সাথে একই রকম লেনদেন চলবে যেমনটি বর্তমানে চলছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক মুদ্রা বা hard currencies ব্যবহার করতে পারবে। অথবা বহিঃপ্রবাহের জন্য একটি সম্পূর্ণ সমাধান
ব্যবস্থার মুদ্রাও উপস্থাপন করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে যার মূল্য থাকবে। ব্যবসা বাণিজ্য আজকের মতোই চলবে। নতুন ব্যবস্থা এবং বর্তমান
ব্যবস্থার মধ্যে প্রয়োজন অনুসারে সমস্ত ব্যবসায়িক লেনদেন চলতে থাকবে।
৪১. যদি বিদেশি পর্যটক সেই দেশে ভ্রমনে আসে যে দেশ নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তবে তারা অর্থের লেনদেন ছাড়া বস্তুসামগ্রী কিভাবে কিনবে?
যখন তারা
সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থায় প্রবেশ করবে তখন তাদের ডলার বা কোনো আন্তর্জাতিক হার্ড কারেন্সি জমা করতে হবে। বদলে তারা
একটি ডেবিট কার্ড পাবে এবং তারা নিজেদের মোবাইলে সরকার দ্বারা প্রদত্ত অ্যাপ্লিকেশন ডাউনলোড করতে পারবে, অথবা সরকার দ্বারা জারি করা কোনো গ্যাজেট প্রাপ্ত হবে যেখানে বস্তু/পরিষেবার আন্তর্জাতিক মূল্য বসানো থাকবে, যার মাধ্যমে
লেনদেন করতে পারবে। উক্ত কার্ড দিয়ে যা কিছু সুখসুবিধা, সেবা-পরিষেবা, খাওয়া
দাওয়া, থাকা, ভ্রমণ, কেনাকাটাসহ সমস্ত কিছুর মূল্য সেই কার্ড থেকে কাটা হবে। নিজের দেশে ফেরত যাবার
সময় অবশিষ্ট মুদ্রা ফেরত পেয়ে যাবে। টাকা সমাপ্ত হয়ে গেলে নিজের দেশ থেকে উক্ত কার্ডে টাকা
ট্রান্সফার করতে পারবে। সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থায় কোনো সীমান্ত সমস্যা থাকবে
না। ফলে কতদিন পর্যন্ত থাকবে এ নিয়ে সমস্যা থাকবে না এবং ভিসার জন্যও কোনো প্রকার সংগ্রাম
করতে হবে না। লাইন দিয়ে মোটা অর্থও খরচ করতে হবে না। সরাসরি নতুন ব্যবস্থার
দেশে আসুন, নিজের কার্ড তৈরি করুন, নিজ দেশের একাউন্ট থেকে অর্থ ট্রান্সফার করে নিন এবং যতদিন আপনি চান নতুন ব্যবস্থার
সুখ উপভোগ করুন।
সামাজিক মডেল/SOCIAL MODEL
৪২. এই ব্যবস্থার দ্বারা পরিবারিক হিংসা কিভাবে বন্ধ হবে?
এই ব্যবস্থায়
পরিবারের সকলেই আর্থিকভাবে ব্যবস্থার উপর নির্ভর করবে। শিশু, বৃদ্ধ, যুবক, স্বামী, স্ত্রী সকলে ব্যবস্থার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সমস্ত বস্তু/সেবা-পরিষেবা অর্ডার করতে পারবে। কেউই একে অপরের উপর বোঝা হয়ে থাকবে না। ফলে
সমস্ত সম্বন্ধ প্রেমের আধারেই তৈরি হবে। প্রথমত, একসাথে থাকার জন্য কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না। দ্বিতীয়ত, কেউ
সহিংসতার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়ে যাবে। তার উপর উপযুক্ত
শাস্তি প্রদান করা হবে, এমনকি ব্যবস্থা থেকে বরখাস্তও হতে পারে। একে তো এমন হিংসা কেউ করবে না, যদি করে বসে তবে তা শাস্তিযোগ্য হবে।
৪৩. এই ব্যবস্থা জলবায়ু পরিবর্তন এবং দূষণকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে?
এই ব্যবস্থায় দূষণ
সৃষ্টিই হবে না। তাই বন্ধ করার প্রশ্নই নেই। নতুন ব্যবস্থায় সমস্ত প্রক্রিয়া এমনভাবে ব্যবস্থিত
করা হয়েছে–কোনো স্থান, প্রকৃতি, মনুষ্য জীবন অথবা অন্যান্য জীব জন্তুদের যেন হানি না পৌঁছায়। এখানে পরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা শহুরে ব্যবস্থা থাকবে। প্রতিটি শহরে ২ থেকে ৫ লাখের মধ্যে হবে। কম ঘনত্ব থাকার
কারণে দূষণ উৎপন্ন হবে না। সমস্ত বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করার ব্যবস্থা থাকবে। জলের জন্যও
কোনো অসুবিধা হবে না। প্রচুর মাত্রায় খাল বিছানো থাকবে, প্রচুর বন থাকবে। গাছপালা অধিক থাকায় বাতাসও শুদ্ধ থাকবে। অনিয়ন্ত্রিত
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘটবে না। পশু-পক্ষীরাও
স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারবে। এতে জৈবিক বৈচিত্র্য অব্যাহত থাকবে, অর্থাৎ
ইকো-সিস্টেম স্থিতিশীল থাকবে। এই সব বিজ্ঞানীদের তত্ত্বাবধানে থাকবে।
৪৪. নতুন ব্যবস্থায় ধার্মিক উন্মত্ততা এবং সংঘাত কিভাবে বন্ধ হবে?
এর জন্য নতুন
ব্যবস্থায় একটি ছোট নিয়ম থাকবে। নিয়ম এটিই হবে যে সকলেই ধর্মীয় বিশ্বাস পালনে স্বাধীন
থাকবে। শুধুমাত্র একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে আপনার বিশ্বাস পালন যেন কারোর কোনো সমস্যা উৎপন্ন
না করে। একজনের বিশ্বাসের সাথে
অপরজনের বিশ্বাসের মিল না থাকার কথা বলছি না, জীবনের
বাস্তবতায় যদি কোনো অসুবিধা সৃষ্টি করে তবে তাকে অপরাধ বলা হবে। প্রথমত, ধর্মীয় বিশ্বাস পালনে যদি কোনো ব্যক্তি কোথাও শোরগোল করে,
রাস্তা অবরোধ করে অথবা মিছিল বের করে তবে তা অপরাধ হিসেবে ধরা হবে এবং
দণ্ডনীয় হবে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করে দেওয়া
হবে, বসতি অঞ্চল থেকে দূরে, সেখানে তারা জমায়েত হয়ে নিজেদের ধর্মীয় কার্যক্রম পালন করতে পারবে। এরপর সমাজে ফিরে এসে শান্তিপূর্ণভাবে
বসবাস করতে হবে। দ্বিতীয়ত কথা হচ্ছে আপনি আপনার বিশ্বাসকে অন্যের উপর আরোপিত
করতে পারবেন না। কেউ স্বেচ্ছায় আপনার সাথে যেতে চাইলে যাবে, যেতে না চাইলে যাবে না। যদি আপনি কারোর সাথে জবরদস্তি করেন তবে এটি অপরাধ হিসেবে
গণ্য হবে এবং শাস্তিযোগ্য হবে। তৃতীয়ত, আপনি এটিকে
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখুন যে মানুষ কেন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে চায়? কারণ তাদের বর্তমান জীবনে অনেক প্রকারের দুঃখ রয়েছে, জীবনে বিভিন্ন ধরনের সুখের অভাব রয়েছে, তাই তারা এইসব
আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একটু সুখী হবার চেষ্টা করে, কোথাও একসাথে জড় হয়, দু-চারজন মিলে কিছুটা সময় হাসি খুশি ভাব নিয়ে কথা বলে। এই বিষয়গুলোর জন্যই কিছুটা
গুরুত্ব রয়েছে। মানুষ দুঃখী হলে মন্দির, মসজিদ, চার্চ বা অন্যান্য দেবালয়ে গিয়ে ঈশ্বর, পরমাত্মা, আল্লার সামনে কাকুতি মিনতি করে, এতে সাময়িক দুঃখ কিছুটা দূর হয়, কিছুটা মানসিক শক্তি পাওয়া যায় এই ভেবে কেউ তো আছে যিনি আমাদের দেখছেন, এছাড়া স্বর্গের গল্প, নরকের গল্প, এখানে না হলে সেখানে
গিয়ে সুখী হব ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কল্পনা করতে থাকে। এইসব বিশ্বাস এইটুকুই সাহায্য করে। যখন নতুন ব্যবস্থা এসে
যাবে এবং সবাই সব দিক দিয়ে সুখী হবে, আমার মনে হয় না
পরমাত্মার কাছে কেউ কিছু চাইতে যাবে। তখন এইসব বিশ্বাস এবং আচার-অনুষ্ঠানগুলোর কোনো অর্থ অবশিষ্ট
থাকবে না। এটি আপনি বাস্তবে দেখতেই পান যে অত্যন্ত বিত্তশালী পরিবারগুলি
থেকে কেউ এসব পালন করে না। নতুন ব্যবস্থাতেও এসব ধীরে
ধীরে বেমানান হয়ে যাবে। বর্তমানে যা কিছু রয়েছে সেসবকে এভাবেই রেখে দেওয়া যেতে পারে। কারোর ক্ষতি না করে কিছু
টিকে থাকলে সমস্যা কি? এরপরও ব্যবস্থা তাদের সম্পূর্ণ সুযোগ প্রদান করবে এই
ভেবে যে সমাজের উপকারী এমন কোনো জ্ঞান থাকলে তারা যেন মুক্ত মঞ্চে এসে প্রমাণিত করেন, এরপর তা আর মান্যতা হিসেবে থাকবে না বরং তথ্য হিসেবে প্রকাশিত
হবে। যতদিন পর্যন্ত বিষয়টি প্রমাণিত না হয়, ততদিন পর্যন্ত এইসব বিশ্বাস ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে থাকবে।
৪৫. নতুন ব্যবস্থা বর্ণ প্রথাকে কিভাবে সম্বোধন করবে?
প্রথমে দেখা
যাক কেন সমাজে বর্ণবাদ সৃষ্টি হয়েছে। বর্ণবাদ থাকার দুটি কারণ রয়েছে। একটি হল অসমতা, যেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্যই মুখ্য কারণ। যেখানে বিত্তশালীদের সাথে জীবনযাত্রার মান, শিক্ষা, উঠা-বসা, থাকা,
খাওয়া, পরিচ্ছন্নতা, ঐশ্বর্যময়তা ইত্যাদি মেলে না। যখন কেউ আলাদা স্তরের জীবন-যাপন করছে, তখন তারা একে অপরের সাথে কিভাবে আচরণ করবে, কিভাবে সম্বন্ধ
রাখবে?
যখন তারা একইরকম জীবনযাপন করে না তখন দুপক্ষের মধ্যে মিল থাকে
না। সমান জীবনস্তর থাকলে আচরণ সমান হবে। উঁচু-নিচুর মধ্যে কোনো সম্পর্কই ঠিকঠাক কাজ করে না। কোনো
না কোনোভাবে অপছন্দ এসেই যায়। পরে এইসব বিষয়ই ঐতিহ্যের মধ্যে প্রবেশ করে সামাজিক
কাঠামোতে রূপ নেয়। কিন্তু অর্থনৈতিক সমতা এসে গেলে এইসব সমস্যা থাকবে না। যখন
সবাই সমান শিক্ষা এবং সমান সুখসুবিধা পাবে তখন এইসবের কোনো মূল্য অবশিষ্ট থাকবে
না। নতুন ব্যবস্থায় আপনাকে জিজ্ঞাসা করা হবে না তোমার ধর্ম কি, তোমার জাত কি, তোমার বর্ণ কি। তাই ধীরে ধীরে আপনা থেকেই এই বিষয়টি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। যে জিনিসের কোনো
প্রাসঙ্গিকতা থাকে না তা আপনই বিলুপ্ত হয়ে যায়, টিকে থাকে না। এভাবেই ধীরে ধীরে এইসব কুপ্রথা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। যারা এসব রাখতে চাইবে, তারা রাখতে পারে। এতে কোনো পার্থক্য আসবে না। কেননা মানুষ যেভাবে জীবন যাপন করতে চায়
সেভাবে সকলে করতে পারবে। এরপরও যদি কেউ নিজেকে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, কায়স্থ বা SC/ST/OBC’র ছাপ লাগিয়ে চালিয়ে যেতে যায় অথবা এইসব অপ্রয়োজনীয় শব্দ ব্যবহার করতে পছন্দ করে নিজের জন্য বলবে।
সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থার সংক্ষিপ্তসার
‘সম্পূর্ণ সমাধান’ একটি নতুন বিশ্ব
ব্যবস্থা, যা বাস্তবায়নের পর কোনো সমস্যা উৎপন্নই হবে না।
যেমন— আর্থিক অসমতা, বেকারত্ব, দরিদ্রতা, শোষণ, দমন, উৎপীড়ন, ভবিষ্যৎ
নিয়ে নিরাপত্তাহীনতা, অরাজকতা, দুর্নীতি,
অশান্তি, যুদ্ধ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা,
ভয়, ঈর্ষা, দাসত্ব,
বন্ধন, পরনির্ভরশীলতা, অপহরণ,
ধর্ষণ ইত্যাদি।
১. সরকারিভাবে
সকলের ইচ্ছানুযায়ী শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষা,
গবেষণা এবং নিশ্চিত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা।
২. প্রয়োজনীয়
সমস্ত সুখসুবিধা এবং সংরক্ষণ প্রাপ্তির ব্যবস্থা।
২. অর্থ ছাড়াই সরকারিভাবে সকলের জন্য সকল বস্তু এবং পরিষেবা প্রাপ্তির ব্যবস্থা।
৩. সরকার
নিয়ন্ত্রণের অধিকার সর্বদা জনগণের কাছে নিহিত থাকার ক্ষমতা।
প্রেমজীৎ সিরোহী মহাশয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
মূল হিন্দি পুস্তক সম্পূর্ণ সমাধানের রচয়িতা দিল্লী
নিবাসী প্রেমজীৎ সিরোহী একজন বক্তা, লেখক,
দার্শনিক এবং ULM (UNIVERSAL LIFE MANAGEMENT) সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা। বর্তমান বিশ্বের মুখোমুখি চ্যালেঞ্জগুলির সমাধান প্রদানে এই সংস্থা একটি থিংকট্যাঙ্ক হিসেবে কাজ করে চলেছে। সিরোহী মহাশয় তাঁর প্রথম পুস্তক ‘সম্পূর্ণ সমাধান’– এক নতুন সামাজিক রাজনৈতিক অর্থব্যবস্থার মাধ্যমে মানব জীবনের সকল সমস্যাগুলি সমাধানের জন্য একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থাকে উপস্থাপন করেছেন। যেখানে সকল মানুষ সমানরূপে সুখী হতে পারবে। তিনি বক্তারূপে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন মঞ্চে প্রত্যেকের কাছে এই সমাধানকে পৌঁছে দেওয়ার অভিযানও শুরু করেছেন। তাঁর বক্তব্যগুলিতে অর্থশাস্ত্র, রাজনীতিশাস্ত্র, সমাজশাস্ত্র, দর্শনশাস্ত্র এবং মনোবিজ্ঞানের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলীর সমাবেশ রয়েছে। মনুষ্য জীবনের চ্যালেঞ্জগুলির কেন্দ্রে রয়েছে ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থানির্ভর সমাধান প্রদানে তিনি বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তাঁর কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে এক নতুন অর্থব্যবস্থা, যার দ্বারা সকল মানুষ নিজেদের ঈপ্সিত জীবন-যাপন করতে পারবে এবং সামাজিক সুখসুবিধাগুলির জন্য ন্যায়পূর্ণ উৎপাদন এবং বিতরণ সম্ভবপর হবে। মানব চেতনা সম্পর্কে তাঁর সুগভীর বোধ রয়েছে। তিনি ধ্যান, আধ্যাত্ম ইত্যাদি বিষয়ের পথপ্রদর্শকও বটে। তিনি আত্মজ্ঞানে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের নিয়েও একটি কার্যক্রম বিকশিত করেছেন। যেন তারা স্বয়ং উপলব্ধি করতে পারে– আমরা কে, কেন বা কিরূপে কর্ম সম্পাদন করে থাকি এবং এই জগতে আমরা কেন এসেছি। তাঁর বিষয়বস্তু এবং সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন মৌলিক ও অসামান্য, অপরদিকে তা একাডেমিক পরম্পরায় অনুপলব্ধ। ইতিমধ্যে
‘সম্পূর্ণ সমাধান’ পুস্তকটি চারটি ভাষায় উপলব্ধ
হয়ে গিয়েছে। আরও কিছু ভাষায় অনুবাদের কাজ চলছে। তাঁর দ্বিতীয় পুস্তকের নাম ‘সম্পূর্ণ জীবন দর্শন’, যেখানে তিনি এক নতুন দর্শনের সাথে পরিচয় করিয়েছেন। লেখকের আগামী পুস্তকের নাম ‘এক দার্শনিকের জীবনযাত্রা’।
Universal Life
Management (ULM) – All be equally happy
সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থা
সকলের সুখী জীবনের জন্য এক নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থব্যবস্থা
সম্পূর্ণ সমাধান ফ্রি E-BOOK ডাউনলোড করুন/‘Sampurna Samadhan’ FREE E-BOOk Download
Link (Hindi, English, Russian and Bengali):
বাংলা ব্লগ ওয়েবসাইট:
https://ulmbangla.blogspot.com/
English Website:
http://universallifemanagement.org/
হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ লিংক
https://chat.whatsapp.com/LM80rMc35wq4iCeTunhO2o
টেলিগ্রাম গ্রুপ লিংক
https://t.me/+mbH6zRruJBlhYWFl
বাংলা ফেসবুক পেজ
https://www.facebook.com/সম্পূর্ণ-সমাধান-106139834749271/
হোয়াটসএপ গ্রুপ
https://chat.whatsapp.com/EoVUi2MS8L77NPtK9fgbr9
বাংলা ইউটিউব চ্যানেল
https://youtube.com/channel/UCz5uy_BQaQUYLJQg-PN7ERw
Universal
Life Management (ULM)
YouTube
https://youtube.com/channel/UCfOiDZxI7BkObjJe1qwxCqg
Twitter
https://twitter.com/univ_life_mgmt?s=08
Facebook
https://www.facebook.com/ulmteam2020/
http://www.universallifemanagement.org
LinkedIn
https://www.linkedin.com/in/premjeet-sirohi-b676621ab
উন্মুক্ত আলোচনার জন্য যোগাযোগ:
প্রেমজীৎ সিরোহী : 90133
83424
সুকান্ত প্রধান : 70010
79159
মাধব
রঞ্জন সরকার : 98309 25502
***













Great work
উত্তরমুছুন