অর্থনৈতিক সংস্কার ব্যতীত সকল সংস্কার বৃথা
সমাজ ব্যবস্থা পরিচালনার মূল মাধ্যম অর্থ। সমাজে অর্থনৈতিক শোষণ চলমান থাকলে সামাজিক শোষণ, ধর্মীয় শোষণ, রাজনৈতিক শোষণ, পারিবারিক শোষণ সহ অন্যান্য শোষণসমূহ টিকে থাকবে। ধর্ম-বর্ণ একাধিক থাকুক সমস্যা নেই। অর্থনৈতিক বৈষম্য যদি চলমান থাকে তবে হিংসা-তফাৎ-শঠতা থেকেই যাবে। সাম, দাম, দণ্ড, ভেদ যে পথেই হোক না কেন। (সামের অর্থ প্রশংসা বা ধূর্ত, দামের অর্থ মূল্য বা উৎকোচ, দন্ড বা শাস্তির অর্থ ক্ষমতার ব্যবহার বা ভয় এবং ভেদ বা বৈষম্যের অর্থ মৃত্যু বা ধ্বংস)। সে পন্থা পরিবারের সাথে হতে পারে, স্ব-ধর্মের সাথে হতে পারে কিংবা হতে পারে ভিন্ন ধর্মের সাথে।
জ্ঞান-বিজ্ঞান-যোগাযোগ কিংবা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা লাভের সুযোগসুবিধায় জগত যত অগ্রসর হচ্ছে মানুষ নিজ অধিকার বিষয়ে তত সচেতন হচ্ছে। জীবনযাপন সুরক্ষিত করতে অর্থ-সম্পদ প্রয়োজন। কারণ মানুষ সুখসুবিধা উপভোগ করতে চায়। সুখসুবিধা থেকে সুখ আসে। সুখী হওয়াই জীবনের মূল উদ্দেশ্য। এই সিদ্ধান্তকে নস্যাৎ করবার অর্থ জীবনের বাস্তবতাকে অস্বীকার করা। ভিন্ন রাজ্যে কিংবা ভিন্ন দেশে-মহাদেশে পাড়ি জমানোর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ কী? সে দেশ স্ব-ধর্ম পালন করুক কিংবা না করুক সকলে নিজের জন্য, পরিবারের জন্য সুখসুবিধা উপভোগ করতেই যাচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা লাভের সুযোগ কম রয়েছে বলে মানুষের মধ্যে মৌলবাদ-বৈষম্য-হিংসা বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। বাস্তব তথ্য বলছে উন্নত দেশসমূহ যেমন সৌদী আরব, ইসরাইল, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া সহ অন্যান্য দেশ ধর্মীয় মৌলবাদ থেকে দ্রুত সরে যাচ্ছে, বলা যায় সরে গিয়েছে। বিশ্বাস গ্রহণ-বর্জন, পালন কিংবা না-পালনের স্বাধীনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটিই কাম্য হওয়া উচিত।
অর্থ-সম্পদ-সুরক্ষা সহ নারী-পুরুষের সম্বন্ধসুখ সকলেই উপভোগ করতে চায়। হুর-পরী-অপ্সরা ইত্যাদি শব্দাবলী বিনা কারণে সৃষ্টি করা হয়নি। এ জীবনে সেসব ভোগের সুযোগ সিংহভাগ মানুষের প্রায় নেই। থাকলেও সামান্য মানুষের কুক্ষিগত। ফলে অপর জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষাই ভরসা। সিংহভাগ মানুষের কাছে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা কিংবা ধর্মীয় স্বাধীনতা নেই। রাষ্ট্র কিংবা বিশ্বের সকল সম্পদে সকল শ্রেণীর সমান অধিকার। একথা লিখে দিলেই অধিকার কুক্ষিগত হয়ে যায় না। মার্ক্স দর্শন অনুযায়ী ক্ষমতা ছিনিয়ে কিংবা সম্পদ বণ্টন করে সমাধান হয় না। সম্ভব হয়ও নি হবেও না। রক্তিম বিপ্লব দ্বারা সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করা যায় না। আপনি বিশ্বাস করুন কিংবা বর্জন করুন সে দায়িত্ব আপনার। এক্ষেত্রে মার্ক্সের সমাধান অসম্পূর্ণ বলেই মনে হয়েছে। অনেকে বলবেন মহামানবের নেতিবাচক সমীক্ষা? সাম্যবাদী হয়ে আপনি যদি কাউকে মহামানব ভূষিত করে বসে থাকেন এবং তিনি ত্রুটিহীন হবেন বলে ধরে নেন সে দায় আপনার। অর্থনীতি যেখানে সকল সমস্যার প্রাথমিক ধারক বাহক সেখানে অর্থনৈতিক সংস্কার ব্যতীত অন্য সমাধান কাজে আসবে না। কী-প্রকার অর্থনীতির সৃজন হলে সকলের জন্য সুখ-সুবিধা-সুরক্ষা নিত্যদিন বৃদ্ধি পাবে, সুনিশ্চিত হবে তেমন অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মাণ করতে হবে। এটি বুঝতে অর্থশাস্ত্রে ডিগ্রী লাগে না। সাধারণ জীবন দর্শনই যথেষ্ট। তবে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপযোগী অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মাণে দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক এবং অর্থবিদের মেলবন্ধন জরুরী। পুনরায় স্পষ্ট করে দিই, অর্থনৈতিক সংস্কার ব্যতীত সকল টোটকা বৃথা। ত্যাগ, সাধনা, মোক্ষ, নির্বাণ, অন্ধভক্তি কিংবা অন্ধশ্রদ্ধা, আদেশ, উপদেশ, মেনে নেওয়া মানিয়ে নেওয়া দ্বারা পেট ভরে না, পেট না ভরলে মনও ভরে না। নতুন বিকল্প অর্থনীতি বিষয়ে বলা যায় যদি সকল কর্মের মান-মূল্যায়ন সমান হয়ে যায় তবে চলমান তথাকথিত অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা গৌণ হয়ে যায়। মুদ্রা থাকা বা না থাকা একসমান হয়ে দাঁড়ায়। এইরূপ অর্থনৈতিক কাঠামোকে মুদ্রাবিহীন অর্থনীতিই বলা চলে। এ বিষয়ে অধিক আলোচনা পর্যালোচনা করলে বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয় যে মুদ্রাবিহীন অর্থনীতিই হতে চলেছে আগামী মুক্তির স্থায়ী ভবিষ্যৎ।
বিশদ আলোচনা-পর্যালোচনায় আগ্রহী সকলে স্বাগত।
***

Like, comment share
উত্তরমুছুন