যিনি শহীদ হয়েছেন ক্ষতি হয়েছে তাঁরই

দু-দেশের কথাই বলছি।

যে-কোনও 'মৃত্যু' আন্দোলনে হোক কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যু তো মৃত্যুই। প্রাণের বিকল্প বলে কিছু হয় না। যার প্রাণ যায় ক্ষতি আসলে তাঁরই। এরপর সন্তান হারানো মায়েদের জীবন হয়ে ওঠে চরম বেদনার। মৃত্যু নিয়ে রাজনৈতিক ব্যবসায়ী এবং ধর্মীয় ব্যবসায়ীরা ফুলে ফেঁপে ওঠে। বাস্তবতা হচ্ছে মানুষ এখন ব্যক্তিস্বার্থ নিয়ে চরম সচেতন। স্বাধীনতার সেই যুগ আর এই যুগের মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ।

যে-কোনও আন্দোলন শুরু হয় একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে, এরপর পরিস্থিতি অনুযায়ী তা ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মত। কখনো কখনো মৃত্যুর সঠিক হিসেব পাওয়া যায় না।

দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা-প্রতিহিংসা এক ভয়ানক ব্যাধি। দেখা গিয়েছে সরকার একশ্রেণীকে সুযোগসুবিধা প্রদান করলে অপর শ্রেণীকে বঞ্চিত করতে বাধ্য হয়। এমনতর পৃষ্ঠপোষকতা সব দলের সরকারেই দেখা যায়। উল্টোদিকে পছন্দের রাজনৈতিক দল কিংবা নেতা-নেত্রী ক্ষমতাসীন হলেও যে একইপ্রকার সমস্যা পুনরায় উৎপন্ন হয় না তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। রাজনৈতিক দল এবং নেতা-নেত্রীর বদল হতে থাকে মাত্র। আন্দোলন-হত্যা-মৃত্যু-সংঘর্ষের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকে। একটি রাস্তার গর্তও তখনই সারাই করা হয় যতক্ষণ না কেউ মৃত্যুবরণ করে, অবরোধ না হয়। 

সময়ের সাথে প্রয়োজনীয় সংস্কার আবশ্যক। যেমন অনগ্রসর শিক্ষার্থী কিংবা পরিবারের জন্য কোটার আবশ্যকতা রয়েছে। এ তো গেল একটি দিক। অপরদিকে সুরক্ষিত সরকারি চাকরির আসনসংখ্যা সীমিত। মেধাবী শিক্ষার্থী যত অধিকই থাকুক না কেন সীমিতসংখ্যক শূন্যপদ দখলের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা-দুর্নীতি-পৃষ্ঠপোষকতা রয়ে যাবে বলেই বোঝা যায়। এই সমস্যার সমাধান কীভাবে সম্ভব?

সমস্যার মূল কারণ কোথায়, সমাধান কীভাবে সম্ভব হবে সে বিষয়ে সমাজকে আরো খানিকটা ভেবে দেখতে হবে। অসম্পূর্ণ আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাপনা নাকি চলমান সংবিধানিক ব্যবস্থা নাকি দুর্নীতিপরায়ণ নেতা-নেত্রী? নাকি কারণ নিহিত রয়েছে অন্য কোথাও?

এরপর রয়েছে জনসংখ্যার আধিক্য। বিরাট জনসংখ্যার শিক্ষা, জীবিকা, সুখসুবিধা, সুরক্ষার জন্য বিরাট অংকের বাজেট প্রয়োজন। চলমান আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় এই অভাবপূরণ কীভাবে সম্ভব? জনগণের প্রয়োজন এবং রাজস্বের হিসেবে আকাশ পাতাল তফাৎ। 

নতুন কোনও রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলেই যে সমস্যা মিটে যাবে সে বিষয়েও কি জনগণ নিশ্চিত? কিংবা পুনরায় একই দল ক্ষমতায় ফিরলে সমস্যা মিটবে? রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রসঙ্গে আলোচনা উঠলে ধর্মের বিষয় আপনিই এসে পড়ে। দু-দেশের সরকারকেই কন্ট্রোল করে ধর্মীয় সমাজ। দু-দেশেই বহু ধর্মপ্রাণ মানুষ ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র নির্মাণের পক্ষে। এ নিয়ে দু-দেশেই গোপন পরিকল্পনা চলে। প্রশ্ন হচ্ছে ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ কিংবা ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা হলে বিরাট জনসংখ্যার জন্য শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুখসুবিধা, সুরক্ষার বন্দোবস্ত কীভাবে সম্ভব হবে? একই ধর্মের মানুষের বসবাস হলে হত্যা, হিংসা, প্রতিহিংসা নির্মূল হয়ে যাবে? এ প্রশ্ন বারংবার এসে পড়ে। যাঁদের কাছে উত্তর রয়েছে লাইভ আলোচনায় আসতে পারেন। বহু মানুষের সংশয় দূর হবে।

মুক্তির উদ্দেশ্যে দীর্ঘ আন্দোলন করে, সংগ্রাম-সংঘর্ষ করে একপ্রকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তখন মুক্তির লক্ষ্যপূরণই ছিল একমাত্র উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য পূরণও হয়েছিল। একইসাথে দেশ বিভাজনও হল। হত্যা-হিংসার বন্যা বইল। এরপরও জনতার আশা ছিল দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা-নেত্রীরা স্বাধীন দেশের নাগরিকের জন্য শিক্ষা-জীবিকা-সামাজিক সুখসুবিধা-সুরক্ষার বন্দোবস্ত করে দেবে। পুনরায় আন্দোলন-হত্যা-হিংসা ঘটবে না। নেতা-নেত্রীগণ উক্ত সময়ের নিরিখে জ্ঞান-বোধ-পরিস্থিতি অনুযায়ী যতখানি সম্ভব প্রচেষ্টা করেছেন। বহু নীতিবান নেতা-নেত্রী এসেছেন, প্রচেষ্টা করেছেন। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গিয়েছে। দেখা গিয়েছে ব্যবস্থা আশানুরূপ ফলাফল প্রদানে বারংবার ব্যর্থ হয়েছে, হয়ে চলেছে। সরকার বারংবার বদল হলেও যৎসামান্য মানুষই সুখসুবিধা পেয়ে এসেছে। অর্থাৎ অনুপাত একই রয়েছে। বরাবরের মতই সিংহভাগ মানুষকে অসহায়-অনিশ্চয়তাকে নিত্যসঙ্গী করে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। জীবিকার তাগিদে মাতৃভূমি ছেড়ে ভিন্নদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হতে হচ্ছে। অভিযোগ, আন্দোলন, সংগ্রাম-সংঘর্ষ একইপ্রকার চলমান রয়েছে। উন্নয়ন একেবারেই যে হয়নি তা বলা যায় না। যতখানি হয়েছে তা বিপুল জনগণের তুলনায় যৎসামান্য। অধিকাংশ উন্নয়নে অর্থব্যয় তো যথেষ্ট হয়েছে কিন্তু তা জনগণের কাজে লাগছে না। যতখানি রাজস্ব আদায় হয় তাতে বিপুল জনসংখ্যার সুখসুবিধার বন্দোবস্ত বাস্তবিক সম্ভব হয় না সেকথা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। তার উপর দুর্নীতির ফলে উন্নয়নের বরাদ্দ তলানিতে গিয়ে পৌঁছায়। কী প্রকার অর্থনৈতিক কাঠামো, কী প্রকার সংবিধান, কি প্রকার ব্যবস্থাপনা, কী প্রকার নেতা-নেত্রী, কী প্রকার রাজনৈতিক কাঠামো নির্মিত হলে সকল নাগরিকের সুখসুবিধা-সুরক্ষার জন্য আর্থিক ঘাটতি হবে না, দুর্নীতির প্রয়োজন পড়বে না, এমনকি কেউ দুর্নীতি করতেও পারবে না। এটিই মূল প্রশ্ন।

অর্থাৎ, আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা একইপ্রকার রেখে যতবারই রাজনৈতিক দল কিংবা নেতা-নেত্রীর বদল ঘটুক না কেন সমস্যা যেখানে ছিল সেখানেই থাকবে। সমস্যার শিরোনাম বদলে বদলে যাবে মাত্র। অতীত-বর্তমান মিলিয়ে ভাবতে বসলে মৃত্যুগুলো শুধুমাত্র বেদনাই দিতে থাকে। পঞ্চবর্ষ আসে যায় পেছনে থাকা নায়ক-নায়িকারা সুখসুবিধা গুছিয়ে নেয়, সুযোগ বুঝে রং বদলে ফেলে, দেশের বায়ু তপ্ত অনুভূত হলে আন্তর্জাতিক উড়ান ধরে নেয়। 

নতুন ইস্যু নিয়ে নতুন আন্দোলন প্রারম্ভ হয়। নতুন নায়ক-নায়িকার উদয় হয়। নতুন-নতুন নাম শহীদ স্বারকে লিপিবদ্ধ হয়। আর কতদিন...

***


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

ব্যবস্থাগত অসম্পূর্ণতা নাকি নেতৃত্বের ব্যর্থতা?