এ জীবন লইয়া কী করিব?


"এ জীবন লইয়া কী করিব?"

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এই প্রশ্ন সারাজীবন আমাদের পিছু ছাড়ে না। তাড়িয়ে বেড়ায়।


ভাবি সত্যিই তো, এ জীবন লইয়া আমি কী করিব?


নিটশে বলেছিলেন:


"আজ এবং চিরকাল মানুষ দুটি শ্রেণীতে পড়ে: দাস এবং মুক্ত মানুষ। যার নিজের জন্য দিনের দুই-তৃতীয়াংশ সময় থাকে না সে গোলাম। তা সে যেই হোক না কেন: রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, কর্মকর্তা কিংবা স্কলার।"


সত্যিই তো আমাদের নিজের জন্য দিনের দুই-তৃতীয়াংশ তো অনেক দূরের কথা, দু-দণ্ড সময়ও থাকে না। আমাদের সময় ইতিমধ্যেই সর্বদা কাজের সময় হয়ে যায়। আমাদের কত কাজ! দেশের কাজ, দশের কাজ, নিজের কাজ, পড়ার কাজ, লেখার কাজ, গৃহসজ্জা ও গৃহকর্মের কাজ, মেডিটেশন ও মোটিভেট হওয়ার কাজ, খাওয়া, রাজনীতি, ঘুমানো, আড্ডা, মোবাইল ও ইন্টারনেট... তরবেতর এমনতর হাজার হাজার  কাজ।


আমাদের কাজের সময় ঘড়ির টিকটিক শব্দের অনুশাসনে বন্দী। সভ্যতার সবথেকে বড়ো প্রহসন বুঝি আমাদের এই  কিছু-না-কিছু করে ফেলার প্রবণতা। হাতে একঘন্টা সময় আছে তো ল্যাপটপে অর্ধেক লিখে রাখা প্রবন্ধটা শেষ করে ফেলি, হাতে কয়েক মিনিট সময় আছে তো মেলে একটা চিঠির উত্তর লিখে ফেলি, হাতে কয়েক সেকেণ্ড সময়? কুছ পরোয়া নেহি! মেসেঞ্জারটা তে চেক করা যায় বা ফেসবুকটা একবার ব্রাউজ হয়ে যায়।


আমরা ভুলতে বসেছি কাজের শিকড় আসলে অকাজে, অপচয়ে ও কিছু না-করায়।

যেমনটি রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন। যেমন জীবনানন্দ বুঝেছিলেন।


একটা রোগ দেখা দিয়েছে সম্প্রতি। ফোমো (FOMO)। Fear of Missing Out। বাংলায় বলা যায়, "এই বুঝি হারিয়ে গেলাম"। কেমন সেই রোগ?


এই বুঝি কোনও খবর, ঘটনা, মজা, হুলুস্থুলু, গুজব, মারদাঙ্গা, কেচ্ছা ঘটে যাচ্ছে যার সাক্ষী আমি হতে পারলাম না। তাই নেট থেকে, মোবাইল থেকে যন্ত্র থেকে বাইরে থাকা চলবে না। কেউ প্রশ্ন করেছে ফেসবুকে এক্ষুনি তার উত্তর দিতে হবে।কোনও বিতর্ক চলছে তো এখনই মতামত রাখতে হবে। মদ্যপান বা ধূম্রপান থেকে কম নয় সেই নেশা।পুলক-শিহরণ-আমোদের এই খেলা।


আপনি ১৫ দিন এসবের বাইরে থেকে দেখুন।তারপর ফিরে আসুন। দেখবেন, যেমন চলছিল তেমনই চলছে সবকিছু। ইতরবিশেষ কোনও পরিবর্তন হয়নি। আমাদের ধারণা ও ভাবনা সর্বেসর্ব ভুল। আমরা অপরিহার্য নই এই কর্মযজ্ঞে।


আসলে আমরা কেউ ভালো নেই। ফেসবুকে পাঁচ হাজার বন্ধু ও এক লক্ষ ফলোয়ার অথচ দেখবেন একান্তে কথা বলার মতো একজনও মানুষ নেই।


'টাইম' পত্রিকা কোনও একটি প্রচ্ছদে এক কিশোরীর ছবি ছাপিয়েছিল। যাকে দেখলেই বোঝা যায় যে সে ভালো নেই। আসলে ঝড়! তথ্যসমুদ্রের ক্ষমাহীন ঝড়ে সে টালমাতাল। ছবি, শব্দ, চলচ্ছবি, বার্তা, সংলাপ সব মিলিয়ে তার কোমল মস্তিষ্কের ওপর দিয়ে যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে।


কম্বোডিয়ার এক অজপাড়াগাঁ। পাড়ার মেয়েরা সাইকেল চালিয়ে দূরের বাজারে গিয়ে বেচাকেনা করে ফিরে আসে। তাদের ঘরে জল নেই বিদ্যুৎ নেই, কাঠের উনুনে রান্না হয়। একজন শহুরে মানুষ তাদের প্রশ্ন করে, এই যে তোমারা বাজারে যাও আবার ফিরে আসো, প্রায় ১০ কিলোমিটার রাস্তা, তা বাপু তোমাদের কত সময় লাগে?


ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল মেয়েগুলি। এমন প্রশ্ন যে তারা কস্মিনকালে শোনেনি। সময় কি আবার মাপা যায় নাকি! সময় তো তাদের কাছে বহমান নদীর মতো, এক আঁজলা জল তুলে নিলেই হল! নদীর বা জলের কি মাপ হয়? -তাঁরা উত্তর দিল। এ-কথা তো ভেবে দেখিনি কখনও।


অকাজের সময় আমাদের জীবন থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। অকাজের সময় কী? অকাজের সময় নিষ্ক্রিয় ও সক্রিয়, এই দুই ধরনের হতে পারে।নিষ্ক্রিয় মানে মন চিন্তাশূন্য, কল্পনাশূন্য, ধ্যানী। আর সক্রিয় মানে তাড়াহীন, উদ্দেশ্যহীন, লক্ষ্যহীন ঘুরে বেড়ানো। ধরুন একটা পাখি বা একটা নদী বা একটা গাছের পেছনে।


লেখাটি সংগৃহীত। আবদুল মাজেদ: linhkin

***


সমীক্ষা:

পূর্বের পণ্ডিত ব্যক্তিরা তৎকালীন বোধ, অবস্থ-ব্যবস্থা অনুযায়ী বুঝেছেন, ব্যখ্যা প্রদান করেছেন। সমাজের উদ্দেশ্যে কোনও জ্ঞান বা উপদেশ সঠিক কিনা কীভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব? যদি উক্ত পন্থা শতকরা 90 ভাগ মানুষের কাজে আসে। 90 ভাগ মানুষ যদি স্বাভাবিকভাবে জীবনে প্রয়োগ করে। নাহলে তাকে সামাজিক জ্ঞান বা সমাধান সূত্র বলে মান্যতা দেওয়া যায় না। এমনকি এটি দেখে নেওয়া, যিনি সমাধান সূত্র প্রদান করেছেন তিনি উক্ত নির্দেশ পালন করতে পেরেছেন কিনা। আরো খুলে বললে যিনি বর্তমান সময়ে উক্ত জ্ঞানকে যথার্থ বলে বিবেচিত করছেন তিনি নিজ জীবনে পালন করছেন কিনা। যাচাই করবার এই হচ্ছে উপযুক্ত পন্থা।


এমনও হতে পারে উক্ত জ্ঞান সেই সময়ের নিরিখে কাজের ছিল। বর্তমানে চেতনা-জ্ঞানবিজ্ঞান-অভিজ্ঞতা অধিক বিকশিত হয়েছে, অধিক পরীক্ষিত হয়েছে। পূর্বের জ্ঞান কাজের হলে ফলাফল থেকেই বোঝা যেতো। উক্ত জ্ঞান বর্তমান সময়ের নিরিখে কাজে আসছে কিনা এই মাপকাঠিতেও যাচাই করে নেওয়া যায়।


মানুষের মনকে ইচ্ছেকে কন্ট্রোল করবার আমি আপনি কে?


অপরজনের পক্ষে কোনটা কাজের সময়, কোনটা অকাজের সময় ইত্যাদি নির্ধারণ করবার আমি আপনি কে?


একজন মানুষকে সুস্থ্যভাবে বেঁচে থাকতে হাজারটা প্রয়োজন পূরণ করতে হয়। নানা দিকের নানা দায়িত্ব পালন করতে হয। সংঘর্ষ করতে হয়। বেঁচে থাকার এই কণ্টকময় গতিপথে হিংসা-প্রতিহিংসা করতে হয়, ধর্ষণ করতে হয়, হত্যা করতে হয়, ক্ষমতাবান হতে হয়, শোষণ করতে হয়। শোষিত হতে হয়। এতশত বিষম পরিস্থিতির মধ্যে মানুষ উপদেশ মেনে নিয়ম মেনে গতিবিধি কীভাবে নির্ধারণ করবে?


পূর্বের পণ্ডিতগণ প্রচেষ্টা করেছেন, প্রয়োগ করেছেন, সমস্যার মূল কারণ শনাক্তকরণ এবং নিবারণ সূত্র বিষয়ে স্পষ্টতা প্রদান করতে পারেননি। কিংবা বলা যায় তাঁদের সমাধান সূত্র আশানুরূপ ফলাফল প্রদান করতে পারেনি। জ্ঞানবিজ্ঞান গবেষণার অগ্রগতির এভাবেই হয়ে থাকে। এতে পূর্বের কেউ ছোটো হয়ে যান না কিংবা অপমানিত হন না, ভবিষ্যতেও কেউ ছোটো হবেন না, অপমানিত হবেন না। বিষয়টি ব্যক্তিকেন্দ্রীক শ্রদ্ধা-অশ্রদ্ধার নয় সামাজিক সমস্যার কারণ-নিবারণ বিষয়ক।


কীভাবে কোন সমাধান সূত্রের মাধ্যমে কী প্রকার ব্যবস্থারপনা নির্মিত হলে শ্রেণী-ধর্ম-সংস্কৃতি নির্বিশেষে সকলের শিক্ষণ, প্রশিক্ষণ, জীবিকা, সুখসুবিধা সুরক্ষার সুনিশ্চিত বন্দোবস্ত সম্ভব হবে এই উদ্দেশ্যে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করা মূল দায়িত্ব। একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ ব্যবস্থাই প্রতিটি মানুষকে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা-স্বতন্ত্রতা-সুরক্ষা প্রদান করতে পারে। রাষ্ট্রে প্রাকৃতিক সম্পদ বিদ্যমান, কর্ম সম্পাদনার জন্য মানব সম্পদ বিদ্যমান, দ্রুত অধিক সংখ্যক বস্তু-পরিষেবা নির্মাণের উদ্দেশ্যে উন্নত প্রযুক্তি বিদ্যমান। দলমত নির্বিশেষে সম্মিলিত উদ্যোগ + মতামত বিনিময় + সমীক্ষা-পর্যালোচনা = সিদ্ধান্ত = নতুন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ।


ফিরে আসি মূল প্রসঙ্গে।


"এ জীবন লইয়া কী করিব?"


জীবনের মূল উদ্দেশ্য সুখী হওয়া। মানুষ জ্ঞান অর্জন করে সুখী হতে চায়, কর্ম সম্পাদন করে সুখী হতে চায়, বস্তু-পরিষেবা-সম্বন্ধ-সুরক্ষা ভোগ করে সুখী হতে চায়, বিশ্রামের মাধ্যমে সুখী হতে চায়। সুখ উপভোগ জীবনের মূল এবং অন্তিম উদ্দেশ্য। এই সিদ্ধান্ত সঠিক কিনা নিজের নিত্যদিনের জীবনের সাথে যাচাই করে মিলিয়ে নিন।


মানুষ যেমনভাবে জীবন উপভোগ করতে চায়, জীবন অতিবাহিত করতে চায় যেন করতে পারে। কাউকেই যেন অপরের উপর আর্থিক নির্ভরশীল না থাকতে হয়। যা ব্যক্তিগত উদ্যোগ, সংস্থাগত উদ্যোগ কিংবা উপদেশ-motivation -এর মাধ্যমে সম্ভব নয়। সম্মিলিত উদ্যোগে পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাই স্থায়ী পদক্ষেপ।


মতামত জানাতে ভুলবেন না। আলোচনায় আগ্রহী বন্ধুদের স্বাগত।


আমাদের সমস্ত কন্টেন্ট, আর্টিকেল, অডিও-ভিডিও কপিরাইট বিহীন। ভালো লাগলে কপি বা শেয়ার করতে ভুলবেন না।


যোগাযোগ- 9830925502 

***

#system #systemchange #economics #politics #SocialSystem #socialjustice #family #happiness #philosophy #highlight #follower #everyone #discussion #togetherness #employment #life #aimoflife #fbpost2024 #trendingpost #fbpost

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

বিকল্প অর্থনীতি দ্বারা সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রের নির্মাণ কীভাবে সম্ভব?