অধ্যায় ৩: মূল সিদ্ধান্ত

অধ্যায় ৩

মূল সিদ্ধান্ত

সমগ্র পৃথিবীতে আপনি যেদিকেই তাকান না কেন দেখতে পাবেন যে সমস্ত প্রাণী প্রতি মুহূর্তে কেবলমাত্র সুখী হতে চাইছে। প্রাকৃতিক এবং সাংস্কৃতিক উভয়দিকেই আপনি লক্ষ্য করবেন যে সমস্তপ্রকার প্রাণী কেবলমাত্র সুখের দিকেই অগ্রসর হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে সুখী হবার জন্যই তারা সমস্তরকম প্রয়াস করে চলেছে। মূলত সুখই হচ্ছে বিস্তার লাভ করার একমাত্র কারণ। এমনকি বৃক্ষ-বনস্পতিও এই একই কারণে বিস্তার লাভ করে চলেছে। তবে বনস্পতির ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক অবস্থায় হয়ে থাকে, কেননা তাদের মধ্যে সংবেদনশীলতা ন্যুনতম মাত্রায় থাকে। অর্থাৎ মুখ্য বিষয় হচ্ছে এই জগৎ উৎপত্তির মূল কারণ এটিই যে সকলে যেন সর্বদা আপন আপন সুখ উপভোগ করতে পারে। এছাড়া অন্য কোনো কারণ চোখে পড়ে না। প্রতিটি অবস্থায় সুখ উপভোগই হচ্ছে জীবের পরম লক্ষ্য। এমনটিই আমি দেখেছি এবং বুঝেছি। আপনিও আশা করি এমনটিই দেখেছেন। দেখা যাচ্ছে সুখী হতে চাওয়াই এই জগৎ সৃষ্টির মূল কারণ। সুতরাং এটিই হচ্ছে মূল তথ্য এবং সত্য। প্রথমত, ব্যবস্থা নির্মাণ করার সময়ও আমাদের এই তথ্য এবং এই সত্যকে সর্বদা মনে রাখতে হবে এই ভেবে যে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ এবং প্রতিটি অবস্থায় যেন সুখ উৎপন্ন হতে থাকে। এটি স্মরণ রাখতে হবে যে নতুন ব্যবস্থা আসার পরও যদি কোথাও কোনো দুঃখ দেখা দেয় তবে ব্যবস্থার মধ্যেই দোষ-ত্রুটি রয়েছে এমনটি ধরা হবে। তাই প্রথমে ব্যবস্থাকে ভাল করে পর্যবেক্ষণ করে নেওয়া উচিত। তারপর অন্যান্য বিষয় দেখা উচিত। একটি কথা তো পরিষ্কার সকলেই যেন সর্বদা সুখে থাকে। এই পৃথিবীতে মনুষ্য জাতির হিসেব কষলে দাঁড়ায় কয়েকশো কোটি এবং একজন মানুষ অপরজনের থেকে কোনো না কোনো দিক দিয়ে ভিন্ন। এমনকি অন্যান্য জীব জগতের দিকে তাকালেও দেখা যাবে সর্বত্র সমস্তকিছুর মধ্যেই ভিন্নতা রয়েছে। স্বভাবে ভিন্নতা, স্পর্শে ভিন্নতা, রং-রূপে ভিন্নতা, স্বাদে ভিন্নতা, গন্ধে ভিন্নতা ইত্যাদি। এ তো গেল প্রাকৃতিক ভিন্নতা। এরপর রয়েছে সাংস্কৃতিক ভিন্নতা যা আমরা নিজেরা তৈরি করে থাকি। তাহলে আমরা দেখলাম জগতে কত বড় মাত্রায় বিভিন্নতা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, আমরা সংখ্যায় বহু এবং বিভিন্ন। অর্থাৎ মূল সত্য এবং তথ্য হচ্ছে এই ‘বিভিন্নতা’। 

তৃতীয়ত, এত বিভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও একটি সত্য এই যে আমরা সকলেই একই তত্ত্বের বিভিন্ন রূপ। বৈজ্ঞানিকরাও বলেন যে এইসব হচ্ছে শক্তিরই রুপান্তর। এই দিয়েই আমরা সকলে তৈরি হয়েছি। আমরা সকলে একই মালার পুঁতিগুলির মত একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। আমরা সকলে একই আকাশের মধ্যে অবস্থান করি এবং একই বায়ুমণ্ডল থেকে শ্বাস গ্রহণ করি। আমরা সকলে একই সূর্য থেকে তাপ গ্রহণ করি। আমরা সকলে একই সমুদ্র থেকে জল গ্রহণ করি। আমরা সকলে একই পৃথিবীতে বসবাস করি। আমরা সকলে একই প্রাকৃতিক ব্যবস্থায় বসবাস করি। তাহলে আপনি বিভিন্ন পর্যায়ে দেখতে পাবেন যে আমরা সকলে কীভাবে একে অপরের সাথে সম্বন্ধযুক্ত। আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল এবং পৃথিবীর মধ্যে কোনো একটির ভারসাম্য বিঘ্নিত হলে আমাদের সকলের বিনাশ অনিবার্য। কেননা আমাদের শরীর এই পঞ্চতত্ব দিয়েই তৈরি হয়েছে এবং এই পঞ্চতত্ত্বের ভিত্তিতেই অবস্থান করে রয়েছে। এদের মধ্যে কোনো একটির ভারসাম্যহীনতা আমাদের বিনাশ করার জন্য যথেষ্ট। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখলে আমরা বুঝতে পারব যে একটি তত্ত্বই প্রসারিত হয়ে সম্পূর্ণ সংসারে রূপান্তরিত হয়েছে। যদি এই সংসারের সাথে কোনো একটি বিশাল বৃক্ষের তুলনা করা যায় তবে আমরা এমন করে বলতে পারি যে আমরা সকলে একটি বৃক্ষের শাখা প্রশাখা, পাতা, ফুল এবং বীজ। এমনটি মনে হবে যেন আমরা সকলে একে অপরের সাথে কোনো না কোনো দিক দিয়ে জুড়ে রয়েছি এবং যদি মূল শিকড়ের খোঁজ করা যায় তবে জানা যাবে যে আমরা সকলে মূলত একই। তাহলে এতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে মূল গোঁড়াতে আমরা সকলে এক এবং উপরের দিকে আমরা বিভিন্ন। যেহেতু মূল গোঁড়ায় আমরা সকলে এক তাহলে আমাদের সকলের মূল ইচ্ছে তো একই হবে। দ্বিতীয় কিছু তো হতে পারে না। আর সেই ইচ্ছেটি হচ্ছে সর্বদা সুখী অবস্থায় থাকা। এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে পূর্বেই বর্ণনা করা হয়েছে। এইভাবে তৃতীয় তথ্য এবং সত্য হচ্ছে মূল গোঁড়ায় অথবা আদিতে আমরা সকলে এক। কোনো একটি তত্ত্বই বহুত্বে বিস্তার লাভ করেছে। যেমনটি একটি বীজ থেকে প্রকাণ্ড বৃক্ষ উৎপন্ন হয়। অর্থাৎ ব্রহ্মই ব্রহ্মাণ্ডে রূপান্তরিত হয়েছে। স্রষ্টাই সৃষ্টিতে রূপান্তরিত হয়েছে। চতুর্থত, বহুত্ব এবং বিভিন্নতা থাকার কারণে আমাদের সকলের সুখ ও তার কারণও আলাদা আলাদা। এটি জরুরী নয় যে কোনো একপ্রকার বস্তু থেকে সকলে সমানভাবে সুখ উপভোগ করবে। তা থেকে কারোর দুঃখও অনুভব হতে পারে। আবার একই বস্তু থেকে কেউ সুখ-দুঃখ দুটোই অনুভব করতে পারে। এই বিষয়টিকে এভাবে বুঝে নিন যে যখন আমাদের ইচ্ছে অনুযায়ী জীবন অগ্রসর হয় এবং তা যদি প্রকৃতির বিপরীত না হয় তবে তা থেকে আমরা সুখ অনুভব করি। আমাদের ইচ্ছের বিপরীত এবং প্রকৃতির বিপরীত হলে তা থেকে আমরা দুঃখ অনুভব করি। তাহলে এই অনুচ্ছেদ থেকে যে তথ্য বেরিয়ে এল তা হচ্ছে আমাদের সুখ এই দুটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। ইচ্ছে অনুসারে এবং প্রকৃতি অনুসারে। উপরের আলোচনা থেকে যা কিছু যুক্তিপূর্ণ কথা বেরিয়ে এল তা এখানে আবার সংক্ষেপে উল্লেখ করছি। প্রথমত, আদিতে আমরা সকলে এক। দ্বিতীয়ত, উপরে আমরা অনেক এবং বিভিন্ন। তৃতীয়ত, আমাদের সকলের মূল ইচ্ছে এক এবং তা হচ্ছে সর্বদা সুখে থাকা। চতুর্থত, ইচ্ছে এবং প্রকৃতি অনুসারে জীবন-যাপন। এরপর আপনারা দেখতে পাবেন যে এইসব মূল তথ্যকেই আধার হিসেবে ধরে নিয়ে আমি এই নতুন ব্যবস্থাকে নির্মাণ করেছি। 


কোনও ব্যবস্থার প্রয়োজন আছে কি?

এবার নতুন ব্যবস্থাকে নিয়ে আসার পূর্বেই পর্যবেক্ষণ করে নিই যে সত্যিই আমাদের কোনো ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে কিনা। নাকি ব্যবস্থা ছাড়াই সবকিছু ঠিকঠাক থাকতে পারে। কেননা, আমি বহু মানুষকে এমনটি বলতে শুনেছি যে সকল দুঃখের মূল কারণই হচ্ছে এই ব্যবস্থা। তারা এও বলেন যে জগতে যদি কোনো ব্যবস্থা না থাকে তবে সকলেই সর্বাধিক সুখে থাকবে। এর অর্থ এই যে আমরা সকলে দু’ভাবে জীবন-যাপন করতে পারি। প্রথমত, একা একা। অর্থাৎ, না ভাই আমার কোনোপ্রকার ব্যবস্থার প্রয়োজন নেই। সকলে নিজেদের খেয়াল নিজেরা রাখুন এবং যার যেমনভাবে জীবন কাটাতে ইচ্ছে হয় কাটাতে পারেন। দ্বিতীয়ত, সকলে মিলে। অর্থাৎ ব্যবস্থা ছাড়া সুখী জীবন-যাপন করা সম্ভব নয়। এই দুটি সম্ভাবনাই তো হতে পারে। ব্যবস্থাবিহীন জীবন এবং ব্যবস্থাযুক্ত জীবন। দুটোকেই প্রথমে ভাল করে বুঝে নিই। তারপর সঠিক সিদ্ধান্ত নেব। ব্যবস্থাবিহীন সম্ভাবনাকে প্রথমে পর্যবেক্ষণ করে নিই। প্রথমেই যদি বুঝে যাই ব্যবস্থার প্রয়োজনই নেই তবে এ পথেই পা বাড়াব। আর যদি ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় তবে একটি সঠিক ব্যবস্থা নির্মাণ করে নিজেদের জীবন যাপনে পালন করব। পূর্বে আমার সাথে যেসব ব্যক্তির আলোচনা চলছিল তারা একথাই বলেছিল যে আমাদের দুঃখের উৎস হচ্ছে এই ব্যবস্থা; আমি তাদের প্রশ্ন করেছিলাম ধরুন যদি সমস্ত ব্যবস্থা সমাপ্ত করে দেওয়া যায় তবে আমাদের জীবন কেমন হবে? তাদের উত্তর ছিল তবে সকলে নিজেদের মত করে জীবন কাটাতে পারবে। এরপর আমি প্রশ্ন করি যদি কোনো পালোয়ান এসে কারোর সমস্ত সম্পদ ছিনিয়ে নেয় তবে কী হবে? তখন তো কোনো ব্যবস্থা থাকবে না যে কোথাও গিয়ে কেউ অভিযোগ দায়ের করবে। এমন করেই যদি কোনো বলশালী ব্যক্তি প্রতিদিন কোনো না কোনো দুর্বল ব্যক্তির কাছ থেকে সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে জীবন-যাপন করতে থাকে? এমন পরিস্থিতিতে কোনো দুর্বল ব্যক্তি সুখের সাথে জীবন-যাপন করতে পারবে? তাকে কি সর্বদা ভয়ে ভয়ে থাকতে হবে না এই ভেবে যে কখন সেই পালোয়ান এসে আবার সবকিছু ছিনিয়ে না নিয়ে যায়? তখন সেই ব্যক্তিরা উত্তরে বলেছিলেন হ্যাঁ ভয় তো থাকবে। এরপর আমি বলি, ধরে নিন সেই ব্যক্তি ৫০ জনকে বলে দিল তাদের আয়ের ১০ শতাংশ যেন প্রতি সপ্তাহে তার কাছে পৌঁছে যায়। তখন সেই ৫০ জন কি করবে? তারা কি রোজগারের ১০ শতাংশ পৌঁছে দেবে নাকি অন্য কোনো পদক্ষেপ নেবে? তখন তারা বলেন সেই ৫০ জন মিলে একটি দল বানিয়ে নেবে যেন কোনো পালোয়ান একা তাদের কাছ থেকে কিছু ছিনিয়ে নিতে না পারে। আমি বললাম তারা যে দল তৈরি করবে সেই দলের জন্য কিছু নিয়ম নীতিও কি তৈরি করবে? তারা বলেন হ্যাঁ তা তো বানাতেই হবে, নাহলে দলের সকলে নিজেদের মধ্যে কীভাবে সমন্বয় করবে। তখন আমি জানালাম দল তৈরি করা এবং নীতিনিয়ম প্রণয়ন করাকেই তো ব্যবস্থা বলে। একেই তো কোনো ব্যবস্থার প্রারম্ভকাল বলে। এরপর তারা বলেন আপনি এমন কিছু উপায় বলুন যাতে দলও না বানাতে হয় আবার নীতিনিয়মও যেন না থাকে। এমনকি পালোয়ানের সমস্যাও যেন সমাপ্ত হয়ে যায়। অনেক চিন্তা-ভাবনার পর এই সিদ্ধান্ত হল যে অন্যের সাহায্য ছাড়া একা পালোয়ানের সাথে লড়াই করার অর্থ মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানানো। আর যদি কারোর সাহায্য নেওয়া হয় তবে তো একটি ব্যবস্থার প্রারম্ভ হয়েই যাবে। চলুন এবার অন্য একটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে বোঝার চেষ্টা করি। যদিও এমনটি সম্ভব নয় তবুও ধরে নিই কেউ কাউকে কোনো উপদ্রব করবে না। তাহলে মানুষের জীবন-যাপন কেমন হবে? একজন একা নিজের চেষ্টায় কতটা সুখে থাকতে পারবে? তখন সকলে বলেন যে তারা চাষবাস করবে এবং জীবন-যাপন করবে। আমি বললাম সে তো একা রয়েছে। অর্থাৎ কোনো পশু ইত্যাদির সাহায্য সে নিতে পারবে না। সাথে সাথে তারা বলেন পশুর সাহায্য কেন নিতে পারবে না? তাহলে একা একা লাঙ্গল কীভাবে টানবে? এমন হলে তো কর্ম করা খুবই কঠিন হয়ে পড়বে। তারপর আমি বললাম আপনারা যদি পশুর সাহায্য নিতে পারেন তবে মানুষের সাহায্য নিতে বাধা দিচ্ছেন কেন? পশুর সাহায্যই নিন বা মানুষের সে তো একই কথা তাই না? যে কোনো সাহায্যই নিন না কেন সেখানে ব্যবস্থা এসেই যাবে। ওই ব্যক্তিকে সেইসব পশুর জন্যও তো সবরকম ব্যবস্থা করতে হবে? নাকি সাহায্য নিয়েই যাবে। তারপর জঙ্গলে পাঠিয়ে দেবে এই বলে, যখন প্রয়োজন হবে যেন চলে আসে। তখন তারা বলেন তবে তো একা একা কৃষিকর্ম করা কঠিন হয়ে পড়বে। উত্তরে আমি বলি সামান্য একটু কঠিনই তো হবে, এই ভেবে মেনে নিন যে কষ্টকর অবস্থার সাথেই নিজের জীবন মানিয়ে নেব। তারপর আমি বলি ওই জীবন যাপনে তো পরিবার থাকবে না, তাহলে পারিবারিক সুখ কীভাবে উপভোগ করবেন? খুব বড়জোর সম্ভোগ করতে পারবেন, কেননা পরিবার গঠন করলে তো পারিবারিক ব্যবস্থা প্রারম্ভ হয়ে যাবে এবং ধীরে ধীরে সামাজিক ব্যবস্থাও চলে আসবে। সম্ভোগ সুখের পর স্ত্রীকে বলে দিতে হবে আমি তৃপ্ত হয়েছি এখন তুমি চলে যাও? আবার যখন আমার ইচ্ছে জাগবে তোমাকে জানাব? দ্বিতীয়ত, সম্ভোগ সুখ উপভোগের জন্যও তো আমাদেরকে একে অপরের সহযোগিতা নিতেই হবে। এতেও তো ব্যবস্থা প্রারম্ভ হয়ে যায়। সুতরাং, তাৎপর্য এটিই দাঁড়ায় আমরা যদি কোনো জীবিত প্রাণীর দ্বারা সাহায্য নিয়ে থাকি তা মূলত ব্যবস্থাকেই প্রারম্ভ করে দেয়। ব্যবস্থা ছাড়া এ আর অন্য কি হতে পারে? এটিই তো মূলত ব্যবস্থা। একেই তো ব্যবস্থা বলা হয়। আমরা এমনটিও দেখেছি যে কারোর থেকে সাহায্য নিলে সেই কর্ম সহজ হয়ে যায়, নাহলে তো আমাদের জীবন-যাপন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। অন্যভাবে বললে— পরিপূর্ণ দুঃখের জীবন হয়ে উঠবে। সংঘর্ষের অপর নামই তো দুঃখ। আমরা দেখেছি যে মানুষ পরস্পরের সহযোগিতার মাধ্যমে কত অসম্ভবকে সহজ করে নিয়েছে। ক্রমানুযায়ী সুখসুবিধা প্রদান করার বহু বস্তু বিকশিত করে নিয়েছে। যা একা একা সম্পাদন করা অসম্ভব ছিল। তাহলে এমনটি ভাবা ঠিক নয় যে ব্যবস্থা থেকে সুখ উৎপন্ন হয় না। তবে এটি বলতে পারেন ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা থেকে দুঃখ উৎপন্ন হয় আর সঠিক ব্যবস্থা থেকে সুখ উৎপন্ন হয়। মিশ্র প্রকারের ব্যবস্থা থেকে সুখ-দুঃখ উভয়ই উৎপন্ন হয়। তাহলে প্রয়োজন রয়েছে একটি সঠিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার, নষ্ট করে দেবার নয়। যদিও তা সম্ভব নয় কারণ ব্যবস্থাকে নষ্ট করার জন্যও আরেকটি ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে।  তখন প্রশ্ন উদয় হয় কে ব্যবস্থাকে নষ্ট করবে এবং কীভাবে করবে? এই প্রশ্ন-উত্তরের মধ্য দিয়েই মূলত ব্যবস্থার উদয় হয়। যিনিই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চাইবেন তাকে কোনো একটি ব্যবস্থাকে সাথে নিয়েই খুঁজতে হবে। তাহলে সিদ্ধান্ত এটিই বেরিয়ে এল ব্যবস্থা ব্যতীত জীবনের কল্পনা করাও মানুষের মধ্যে অত্যন্ত ভয়ের সঞ্চার করবে। ব্যবস্থাবিহীন সম্ভাবনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত বলা যাবে না। প্রথমত, তা সম্ভব হবে না। দ্বিতীয়ত, কোনোভাবে সম্ভব হয়ে গেলেও তা অধিক দুঃখই প্রদান করবে। সুখের আশা তো ভুলেই যান।


সুখ-দুঃখ উভয়ই কি একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ?

এবার দ্বিতীয় বিকল্প নিয়ে আলোচনা করি। এমন একটি ব্যবস্থা কি তৈরি করা যেতে পারে যার দ্বারা শুধুমাত্র সুখই থাকবে, দুঃখ একেবারেই থাকবে না? যখন অনেকের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়েছিলাম তখন অধিকাংশ ব্যক্তি এটিই বলেছেন যে এমন কোনো ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব নয়। সুখের সাথে দুঃখ এসেই যাবে, তা আপনি যা ইচ্ছে করুন না কেন। সুখের সাথে দুঃখ কেন আসবে? যখন আমি তাদের কাছে এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর জানতে চাইলাম তখন তারা কোনো স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। শুধুমাত্র এটিই বারবার বলেছেন যে সাধু-সন্তরা তো এটিই বলেন যে সুখ-দুঃখ একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। একটি নিয়ে আসার চেষ্টা করলে আরেকটি আপনিই চলে আসে। তাকে আটকানো যায় না। তখন আমি প্রশ্ন করলাম সুখ চাইলে যদি দুঃখ চলে আসে তাহলে তো দুঃখ নিয়ে আসার চেষ্টা করলে সুখ আপনিই চলে আসবে? এই প্রশ্নের উত্তরে কিন্তু সকলে মৌন রইলেন। কেউ এটি বলেননি যে, হ্যাঁ এমনটিই তো হওয়া উচিত যদি সুখ-দুঃখ একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ হয়। তাদের মধ্যে একজন বলেন, এমনটি মূলত হয় না। তখন আমি জিজ্ঞেস করি তাহলে কীভাবে হয়? উত্তরে তিনি বলেন, দুঃখকে আহ্বান করলে দুঃখই আসে আবার সুখকে আহ্বান করলেও দুঃখ নিয়ে আসে। এরপর আমি বলি, তাহলে কেন বলছেন সুখ-দুঃখ দুটোই একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ? জবাবে তারা বলেন, তা তো জানিনা কিন্তু সাধু সন্তদের থেকে এমনটিই শুনে আসছি তাই বলেছি। এবার আপনার কথা অনুযায়ী তো মনে হচ্ছে এখনও অবধি তারা আধ্যাত্মিক বিষয়বস্তুরূপে যা কিছু বলেছেন সবই মিথ্যে এবং আপনি যা বলছেন তা আমরা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারছি। সাধু-সন্তরা দেখছি কিছুই বোঝেন না, তারা নিজেদের সম্পূর্ণ জীবন এই সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করেই অতিবাহিত করেছেন বলে সবকিছু ঠিকই বলছেন বলে আমরা মেনে নিই। আপনার কথা অনুযায়ী মনে হচ্ছে আধ্যাত্মিক বিষয়বস্তু হিসেবে তারা যা কিছু বলছেন সেসবের মধ্যে বহু গণ্ডগোল রয়েছে। আপনি কি আমাদের স্পষ্ট করে সবকিছু জানাবেন? আমি তখন বললাম, চেষ্টা করে দেখছি। আমার গবেষণা অনুযায়ী সাধু-সন্তদের কথা সত্য নয়। সুখ-দুঃখ একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ নয়। বরং দুটি ভিন্ন মুদ্রা এবং ভিন্ন ঘটনা। এবার বোঝার চেষ্টা করুন যে সুখ-দুঃখের ঘটনা মূলত কীভাবে ঘটে থাকে। মনে করুন একজন আপনাকে সম্মানজনক কিছু বললেন এবং অপরজন আপনাকে অপমানজনক কিছু বললেন। দুটি ঘটনাই আপনার সাথে ঘটল। প্রথম ঘটনা থেকে সুখ প্রাপ্তি হল এবং দ্বিতীয় ঘটনা থেকে দুঃখ প্রাপ্তি হল। এবার দেখুন সুখ-দুঃখ দুটি কিন্তু ভিন্ন-ভিন্ন ঘটনা থেকে আসছে। একটির সাথে অপরটির কোনো সম্পর্ক নেই। আরেকটি উদাহরণ থেকে বিষয়টিকে বুঝে নিই। ধরে নিন রসগোল্লা আপনার খুব পছন্দ। অর্থাৎ রসগোল্লা খেয়ে আপনি অনেক সুখ পেয়ে থাকেন। কিন্তু রসগোল্লা যদি আপনাকে ভরা পেটে খেতে দেওয়া হয় তবে কেমন হবে? রসগোল্লা খুব সুস্বাদু বলে খাবার সময় আপনি সুখ পেয়ে থাকেন কিন্তু পেটে জায়গা না থাকার ফলে ব্যথা অনুভূত হতে থাকে। সুতরাং পেটের জন্য দুঃখ অনুভব করে থাকেন। অর্থাৎ জিভ দ্বারা সুখ অনুভব হচ্ছে কিন্তু পেটের জন্য দুঃখ অনুভব হচ্ছে। দুটি ঘটনাই মোটামুটি একইসাথে ঘটছে। এবার যদি আমরা এই ঘটনাকে সঠিকভাবে পর্যালোচনা করি তাহলে বুঝতে পারব যে এটি একটি ঘটনা নয় বরং ভিন্ন-ভিন্ন ঘটনা। কেননা রসগোল্লা সুস্বাদু বলে সুখ দিচ্ছে এবং পেটে যেহেতু স্থান নেই সেই কারণে রসগোল্লা যাবার পর পেটকে অনেক প্রসারিত হতে হচ্ছে বলে ব্যথা অনুভব হচ্ছে অর্থাৎ দুঃখ উৎপন্ন হচ্ছে। তাহলে আমরা বুঝে গিয়েছি যে সুখ-দুঃখ দুটি ভিন্ন ঘটনার কারণে উৎপন্ন হচ্ছে। কেননা রসগোল্লা নিজে থেকে কোনো সুখও নয় আবার দুঃখও নয়। সে তো একটি বস্তু যা বিভিন্ন পরিস্থিতি অনুযায়ী আমাদের সুখ-দুঃখরূপে পরিণাম প্রদান করে থাকে। এইরকমের আরেকটি উদাহরণ নিচ্ছি। যেমন ধরুন রসগোল্লা আপনার খুব পছন্দ এবং আপনাকে ১০ কিলো রসগোল্লা খেতে দেওয়া হল। আপনি রসগোল্লা খেতে শুরু করলেন যা থেকে আপনি সুখ পেয়ে থাকেন। কিছুক্ষণ পর আপনার রসগোল্লা খেতে আর ইচ্ছে করবে না। অর্থাৎ খেতে চাইবেন না। তারপরও যদি বাধ্য করা হয় এই বলে যে অবশিষ্ট রসগোল্লা আপনাকে খেতেই হবে, যেহেতু রসগোল্লা আপনি খুব ভালবাসেন। এরপর যা হবে— একই বস্তু আপনাকে দুঃখ প্রদান করবে যা একসময় অবধি আপনাকে অনেক সুখ-সন্তুষ্টি প্রদান করছিল। এই ঘটনা অনুযায়ী মানুষ বলবে, দেখুন একই বস্তু আপনাকে কখনো সুখ আবার কখনো দুঃখ দিয়ে থাকে। সেইজন্য সুখ-দুঃখ একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। এখানে বোঝার চেষ্টা করি যে উক্ত ঘটনা অনুসারে কি তাই মনে হচ্ছে নাকি এর পেছনে অন্য কোনো অর্থ রয়েছে? যা ঘটেছে তা হল, যতক্ষণ রসগোল্লা খাবার ইচ্ছে ছিল ততক্ষণ সুখ আসছিল, এরপর একটি সময় পর যখন আর অতিরিক্ত রসগোল্লা খাবার ইচ্ছে থাকে না। যদি ইচ্ছে ব্যতীত কারোর চাপে আরও রসগোল্লা খেতে হয় তাতে দুঃখ উৎপন্ন হবে। এবার এই ঘটনার মাধ্যমে কিছু লোক বলবে দেখুন একই বস্তু কখনো সুখ কখনো দুঃখ দিয়ে থাকে। এইজন্য সুখ-দুঃখ একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। যদিও বাস্তবে এমনটি ঘটছে না। ঘটনা হচ্ছে যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার খাবার ইচ্ছে ছিল ততক্ষণ অবধি সুখ অনুভব হচ্ছিল। যখন ইচ্ছের বিপরীত কারোর চাপে বাধ্য হয়ে খেতে হয়েছিল তখন দুঃখ উৎপন্ন হচ্ছিল। তাহলে তো দুটিই ভিন্ন ঘটনা। একটিতে সে ইচ্ছে অনুযায়ী খাচ্ছিল এবং অপরটিতে সে ইচ্ছের বিপরীতে কারোর চাপে বাধ্য হয়ে খাচ্ছিল। তাই এখানে সুখের কারণ ভিন্ন এবং দুঃখের কারণও ভিন্ন। এমনটি তো দেখা যাচ্ছে না যে সুখ দুঃখের কারণ অথবা দুঃখ সুখের কারণ। সুখ-দুঃখ তো পরিণামমাত্র, একে অপরের কারণ তো নয়। কিছু মানুষ এমনও বলেন যে কোনো দুঃখের অনুভব ছাড়া আমরা সুখের অনুভব করতে পারব না। অর্থাৎ এই কথাকে অন্যভাবে বললে এমনটিই মনে হয়ে যে কোনো সুখ অনুভব করার জন্য দুঃখই হচ্ছে মূল আধার। উপরের আলোচনা থেকে আপনি চিশ্চয়ই বুঝে গিয়েছেন। দুঃখ ছাড়া আমরা সুখ অনুভব করতে পারব না একথা অত্যন্ত শিশুসুলভ। যা বাস্তবে ঘটছে তা হচ্ছে জ্ঞানেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে আপনি কোনোকিছু অনুভব করে থাকেন এবং যদি তা রুচিকর মনে হয় তবে তাকে আমরা সুখ বলে থাকি, যদি কষ্টকর মনে হলে দুঃখ বলে থাকি। উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক প্রথম ব্যক্তি রসগোল্লা খুব পছন্দ করেন এবং দ্বিতীয় ব্যক্তি পছন্দ করেন না। এবার দুজনকে একসাথে রসগোল্লা খেতে দেওয়া হলে তা থেকে একজন সুখ পাবে এবং অপরজন দুঃখ পাবে। এই উদাহরণ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে দুঃখ সুখের আধার নয় বরং রুচিকর অনুভবই হচ্ছে সুখের মূল আধার। প্রথমত, যখন আমরা কোনো ভোগের সংস্পর্শে এসে রুচিকর অনুভব করি তখন সুখ উপভোগ করি। এইজন্য নয় যে আমরা দুঃখ অনুভব করি বলে সুখ অনুভব করে থাকি। দ্বিতীয়ত, যখন আমরা কোনো ভোগের সংস্পর্শে এসে রুচিকর অনুভব করি না তখন দুঃখ অনুভব করি। যদি দুঃখ সুখ বয়ে আনত তবে তবে দরিদ্র মানুষ অধিক সুখী হতে পারত। কেননা দরিদ্র মানুষ সারা জীবন সর্বাধিক দুঃখ অনুভব করে থাকে। এমন নিয়মের সুফল তো তাদের ক্ষেত্রে দেখতে পাওয়া যায় না। অন্যদিকে বিত্তশালীদের কম সুখী হওয়া উচিত কেননা তাদের জীবনে তো গভীর দুঃখ থাকে না। সুতরাং সুখ অনুভব করার জন্য দুঃখকে অনুভব করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আমরা সরাসরি সুখ-দুঃখ দুটোই অনুভব করতে পারি। এর জন্য কেবলমাত্র অনুভব করার ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন, যা জন্মগতভাবে সকলের মধ্যে থাকেই। বিভিন্ন প্রকার অনুভবের জন্য আমাদের পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং অন্তঃকরণ চতুষ্টয়ই হচ্ছে মূল অঙ্গ। একটির অনুভব অন্যটির উপর নির্ভরশীল নয়। তবে হ্যাঁ, মানসিক দিক দিয়ে তুলনা করলে দেখা যাবে অনেক সময় কোনো দুঃখের পর যখন সুখ আসে তখন এমনটি মনে হয় যে এটি অনেক বড় সুখ। অন্যদিকে সুখ যখন কোনো সাধারণ পরিস্থিতিতে আসে তখন তাকে বড় সুখ বলে মনে হয় না। তাহলে বিষয়টি এমন শিশুদের ক্লাসে যেমন করে কালো বোর্ডের ব্যবহার হয়ে থাকে। যেন সাদা চকের লেখা সঠিকভাবে দেখা যায়। যদি সেই একই চক দিয়ে সাদা বোর্ডের উপর লেখা হয় তবে লেখা তো থাকবে কিন্তু আমাদের চোখ দিয়ে তা ঠিকমত দেখা যাবে না। তাহলে বৈপ্যরিত্যের কারণে কোনো অভিজ্ঞতা কম অথবা অধিক হতে পারে। তাহলেও কিন্তু কোনো ব্যক্তি চাইবে না কোনো কারণে তার জীবনে দুঃখ উৎপন্ন হোক। সামান্য থেকে সামান্যতম দুঃখও নিজের জীবনে থাকুক এমনটি কেউ পছন্দ করে না। এর থেকে বোঝা যায় মানুষ কেবলমাত্র সুখই চেয়ে থাকে। যখন কোনো এক ব্যক্তি আমায় বলেছিল, দেখুন সুখ অনুভবের জন্য জীবনে দুঃখ আসাটা অতি আবশ্যক, তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যখন আপনার সর্দি-কাশি হয় তখন কি আপনি চিকিৎসা করেন? তিনি সাথে সাথে বলেছিলেন, হ্যাঁ করি। আমি তখন উত্তর দিয়েছিলাম এই বলে যে, সে তো সাধারণ দুঃখ, কেন আপনি তার চিকিৎসা করেন? সেই দুঃখের সাথে জীবন-যাপন করলে তবে তো আপনার সুখ বেড়ে যাবে? তখন তিনি স্বীকার করে করেন যে, আমি সঠিক কথাই বলেছি। এর অর্থ এটিই যে আমাদের শুধুমাত্র মনে হয় যে সুখ বেড়ে গেছে। যেখানে আমরা সকলে জানি যে এটি কেবলমাত্র মনে হওয়া মাত্র বাস্তবিকতা নয়। সেইজন্য আমরা ছোটো খাটো দুঃখকেও সর্বদা দূর করার প্রয়াস করে থাকি। এতে অনেকবার সফলও হই। আবার কখনো কখনো তা সাধ্যের বাইরে হওয়ায় অসফলও হয়ে থাকি। তাহলে এই সিদ্ধান্তই বেরিয়ে এল যে সুখ-দুঃখ দুটোই ভিন্ন ঘটনা। এদের পরস্পরের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ এই দুটি একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ নয়। এত আলোচনার পরও যদি কেউ এই কথায় অনড় থাকেন যে তা একই মুদ্রার দু-পিঠ তাহলে আমাদেরকে সেই ব্যক্তির জীবনকে পর্যালোচনা করা উচিত এই জন্য যে— সেই ব্যক্তি নিজের জীবনে এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে জীবন-যাপন করছে কিনা। অর্থাৎ সেই ব্যক্তির নিজস্ব জীবনে কোনোপ্রকার সুখের ইচ্ছে থাকা একেবারেই উচিত নয়। এমনকি তাকে এমন কোনো কার্যকলাপ করতে যেন দেখা না যায় যার দ্বারা সুখ প্রাপ্তির কোনো সম্ভাবনা থাকে। এবার আপনি বলুন যার সুখী হবার ইচ্ছে নেই এবং দুঃখও চায় না তবে এই জগতে সে কেন জীবিত থাকবে? তার আত্মহত্যা করে ফেলা উচিত নয় কি? কেননা সুখ-দুঃখ ব্যতীত এই জগৎ সংসারে বেঁচে থাকার অন্য উদ্দেশ্য কি হতে পারে? উপরের সমস্ত আলোচনা থেকে এই সিদ্ধান্তই বেরিয়ে আসে যে ব্যবস্থা ছাড়া মানুষের সুখী জীবন-যাপন সম্ভব নয়। সর্বদাই আমাদের একটি সঠিক ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে। আর আমরা পরস্পরের সহযোগিতার মাধ্যমেই সর্বাধিক সুখী হতে পারি। যেখানে কোনোপ্রকার সহযোগিতা থাকবে না সেখানে বহু রকমের দুঃখ ভোগ করতে হবে। এর তাৎপর্য এটিই যে আমাদের এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন যেখানে স্বাভাবিকভাবেই সকলের জন্য সমস্তপ্রকার সহযোগিতা করা সম্ভব হবে। যেখানে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা থাকবে না। কেবলমাত্র প্রতিযোগিতা সম্ভবপর হবে। আপনি জেনে খুশি হবেন— যেমন ব্যবস্থার কথা আমি বলছি সেখানে এমনটিই রয়েছে। সেখানে কেবলমাত্র সহযোগিতার মাধ্যমে প্রতিযোগিতা করার সম্ভাবনা রয়েছে। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার না প্রয়োজন পড়বে এবং না কোনো সম্ভাবনা থাকবে। আসুন বুঝে নিই এমনটি কীভাবে সম্ভব হবে? উপরের আলোচনায় যা কিছু আমি আলোচনা করেছি এবং যে পরিণামে পৌঁছেছি, সেইসব তথ্যকেই সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে নিতে পারেন। সেই সকল পরিণামগুলিকে এখানে আবার একসাথে উল্লেখ করছি। প্রথমত, আদিতে আমরা সকলে এক। দ্বিতীয়ত, বাইরে আমরা সকলে অনেক এবং বিভিন্ন। তৃতীয়ত, আমাদের সকলের মূল ইচ্ছে এক তা হচ্ছে সর্বদা সুখে থাকা। চতুর্থত, সুখ নির্ভর করে ইচ্ছে অনুযায়ী এবং প্রকৃতি অনুযায়ী জীবন-যাপন করার উপর। পঞ্চমত, সিদ্ধান্ত এটিই নিশ্চিত হয়েছে যে একটি সঠিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই তা সম্ভব হতে পারে। আমি এই সকল তথ্যকেই ভিত্তি হিসেবে ধরে নিয়ে নতুন ব্যবস্থার নির্মাণ করেছি। 

***

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

ব্যবস্থাগত অসম্পূর্ণতা নাকি নেতৃত্বের ব্যর্থতা?