অধ্যায় ২: অর্থশাস্ত্রের মুখ্য নীতি
অধ্যায় ২
অর্থশাস্ত্রের মুখ্য নীতি
একটি নতুন অর্থশাস্ত্রের
বহু নীতিসমূহের মধ্যে একটি মুখ্য নীতি আমি নিন্মে বর্ণনা করছি, যার মাধ্যমে এই কঠিন বিষয়টি
অতি সহজেই বুঝে নিতে পারবেন। অধিক জানার জন্য আমরা পরবর্তী অধ্যায়গুলি থেকে বিস্তারিতভাবে
বুঝে নেব। বর্তমান অর্থব্যবস্থায় নীতি এমন রয়েছে যে যতখানি মুদ্রা
অথবা অর্থ আপনার কাছে রয়েছে আপনি বাজার থেকে ততখানিই চাহিদা বা ডিমান্ড করতে পারবেন। অর্থাৎ চাহিদা আমাদের অর্থের
উপর নির্ভর করছে। এতে বাজার থেকে আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পূর্ণ ডিমান্ড
করতে পারি না। এর ফলে বাজারেও চাহিদা অনেক কম থাকে। ডিমান্ড যখন কম থাকে তখন
বাজার সেই সামান্য ডিমান্ডের ভিত্তিতেই বস্তু নির্মাণ করে। অর্থাৎ বস্তু নির্মাণ কম
হয়। বাজারে যখন বস্তু নির্মাণ কম হয় তখন কর্মসংস্থানও কম উৎপন্ন হয়। যখন কর্মসংস্থান কম উৎপন্ন
হয় তখন সমাজে বেকারত্ব অধিক উৎপন্ন হয়। কেননা বর্তমান সমাজে উপার্জন তো কর্মসংস্থানের ভিত্তিতেই তৈরি হয়। যার কাছে কোনো কর্ম নেই
তার কাছে আয়ও নেই। অর্থাৎ উপার্জনহীন মানুষ সমাজের ভিক্ষার উপরই নির্ভর
করে বেঁচে থাকে। কেননা সে তো বাজার থেকে কিছুই ডিমান্ড করতে পারে না। আবার যার উপার্জন কম সেও
বাজার থেকে পর্যাপ্ত মাত্রায় ডিমান্ড করতে পারে না। সামান্য কিছু মানুষ আছে
যাদের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ রয়েছে, তারাই কেবলমাত্র নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পূর্ণ ডিমান্ড করতে পারে। এই প্রকার আর্থিক নীতির
কারণেই বাজারে সর্বদা চাহিদার অভাব থেকে যায়। কেননা অধিকাংশ মানুষের
আয় কম। আয় কম হবার কারণ কর্মসংস্থানের অভাব। এই কারণে দেশ-দুনিয়ার একটি বড় অংশ সর্বদা দরিদ্র অবস্থায় থাকে। বর্তমান সময়ের অর্থশাস্ত্রীয়
নীতির এই হচ্ছে মূল কাহিনী। যার ফলে অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র এবং অসহায় জীবন-যাপনে বাধ্য হয়। যতদিন অবধি এই আর্থিক নীতি
বদলাবে না ততদিন অবধি সকলের সুখী হবার কোনো সম্ভাবনা নেই।
একথা তো আপনিও জানেন যে মানুষের কাছে যত পরিমাণ অর্থ রয়েছে তার সবটা তারা কেনাকাটাতে
খরচ করে না। কিছু ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ও করে রাখে। কেননা বর্তমান ব্যবস্থায়
সে নিজের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত মনে করে না। সরকারও এই ক্ষেত্রে সামান্যই উন্নতিসাধন করেছে, যার ফলে মানুষ নিজেদেরকে
সুরক্ষিত অনুভব করছে না। ধরুন কেউ যদি ভবিষ্যতের জন্য অর্থ সঞ্চয় না করে তাহলেও
তো মানুষের কাছে যতটা অর্থ থাকবে সে শুধুমাত্র ততটুকুই বাজার থেকে ডিমান্ড করতে পারবে। ততক্ষণ অবধি সে কখনো সর্বাধিক
ডিমান্ড করতে পারবে না যতক্ষণ অবধি তার কাছে পর্যাপ্ত অর্থ না আসে। এমনকি অতীতের ইতিহাস অধ্যয়ন
করেও এটি বলা যায় যে আজ পর্যন্ত এমনটি হয়নি যে সকল নাগরিকের কাছে কেনাকাটা করার পর্যাপ্ত
অর্থশক্তি এসেছে। আমরা নীচের ছবিটি দেখলে বিষয়টি সহজেই বুঝতে পারব। এই নীতিটিকে মনোযোগসহ পর্যবেক্ষণ
করলে আপনি বুঝতে পারবেন— যতক্ষণ অবধি আমাদের চাহিদা অর্থের উপর নির্ভর করবে ততক্ষণ অবধি আমরা পর্যাপ্ত
ডিমান্ড করতে পারব না। ফলে বস্তু এবং পরিষেবার পর্যাপ্ত নির্মাণ হবে না, এমনকি পর্যাপ্ত আয়ও উৎপন্ন হতে পারবে না।
অর্থশাস্ত্রে মুদ্রা নীতির
পরিবর্তন
নতুন ব্যবস্থায় আমি মুদ্রা নীতির একটি পরিবর্তন করেছি। ডিমান্ড বা চাহিদার জন্য যে মুদ্রা বা অর্থ অতি আবশ্যক ছিল তা আমি সরিয়ে দিয়েছি। অর্থাৎ এবার এই নতুন নীতি অনুযায়ী সকলে নিজ নিজ চাহিদা পর্যাপ্ত পরিমাণে করতে পারবে। চাহিদার জন্য এখন আর অর্থের প্রয়োজন থাকবে না। দেখুন এতে আমাদের সমাজে সকল বস্তুর চাহিদা ১০০ শতাংশ হয়ে যাবে। এবার এই ১০০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করার জন্য সরকারকে ১০০ শতাংশ বস্তু এবং পরিষেবা উৎপাদন করতে হবে। ১০০ শতাংশ উৎপাদনের কারণে ১০০ শতাংশ কর্মসংস্থান তৈরি হয়ে যাবে। যার ফলে সরকারকে ১০০ শতাংশ কর্মসংস্থান প্রদান করতে হবে। কেননা ১০০ শতাংশ ডিমান্ড পূরণ করার জন্য ১০০ শতাংশ কারখানা, মেশিন, বিদ্যুৎ, সড়ক, জল, মালবাহক গাড়ি, বহু রকমের বস্তু এবং পরিষেবার প্রয়োজন হবে। আর এতসব কর্ম সম্পাদনের জন্য বহু মানুষেরও প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ সহজভাবে বললে সরকারের কাছে ১০০ শতাংশ কর্মসংস্থান সর্বদা তৈরি হয়ে থাকবে। তাহলে বিষয়টির অর্থ এই দাঁড়ায় যে সকলের জন্য কর্মসংস্থান সুনিশ্চিত হবে। অন্যভাবে বললে সকলে সমৃদ্ধ হবে। নীচের চিত্রটি দেখলে ভাল করে বুঝতে পারবেন।
এবার নিশ্চয়ই দেখে নিয়েছেন যে নতুন নীতির মাধ্যমে কি পরিবর্তন হতে পারে। আমি শুধুমাত্র আপনার চাহিদা
পূরণ করার ক্ষমতাকে অর্থের প্রয়োজন থেকে মুক্ত করে দিয়েছি। অর্থনীতির মধ্যে একটি ছোট
পরিবর্তন কতটা আশ্চর্যজনক পরিণাম দিতে পারে তা আমরা উপরের চিত্র থেকে ভাল করে বুঝে
নিতে পারি। মানুষ সত্যিকারের স্বাধীনতা তখনই অনুভব করবে যখন সকলে
সমানভাবে সমস্ত সুখসুবিধা উপভোগের জন্য স্বতন্ত্র হবে। মানুষ যা শিখতে চাইবে শিখতে
পারবে, যা করতে চাইবে করতে পারবে এবং যা ভোগ করতে চাইবে ভোগ করতে পারবে। তখনই সঠিক অর্থে বলা যাবে
আমরা স্বাধীন। অর্থাৎ যা করতে চাইছি করতে পারছি। যেভাবে জীবন কাটাতে চাইছি
কাটাতে পারছি। যেমন জীবন-যাপনের সুযোগ-সুবিধা চাইছি তেমনটি পেয়ে যাচ্ছি। এরপর নতুন ব্যবস্থায় আমি মুদ্রার অর্থকেও বদলে দিয়েছি। মুদ্রা সম্পর্কে আপনারা
অবশ্যই পরবর্তী অধ্যায়ে বিস্তারিতভাবে অধ্যয়ন করে নেবেন। সরকারের কাছে আপনার একটি
ব্যাংক একাউন্ট থাকবে। সরকার আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী ডিমান্ড করবার সীমা নির্ধারণ
করতে থাকবে। যার মাধ্যমে সকলে নিজেদের ইচ্ছে অনুযায়ী যা কিছু বস্তু
অথবা পরিষেবা ভোগ করতে চাইবে সেইসব সুবিধা পেতে থাকবে। শুধুমাত্র একটি শর্ত থাকবে। শর্ত এটিই হবে— আপনার ইচ্ছে অনুযায়ী যে কর্ম আপনাকে
প্রদান করা হবে তা সম্পাদন করতে হবে, যদি আপনার বয়স ২৫ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে থাকে। আপনি যদি এই সহযোগিতা না
করেন তবে এই নীতির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। যদি সহযোগিতা করতে থাকেন তবে যে কোনো সময় যে কোনো সুবিধা
আপনি সরকারের কাছ থেকে নিতে পারবেন এবং উপভোগ করতে পারবেন। একবার সামঞ্জস্য চলে এলে
আর আর্থিক সীমা রাখার প্রয়োজন পড়বে না। কর্মসংস্থানের গ্যারান্টি তো সরকারের তরফ থেকে থাকবেই। ধরুন—সরকার যদি আপনাকে কর্মসংস্থান দিতে
না পারে তাহলেও এই ব্যবস্থার অন্তর্গত সমস্ত সুখসুবিধা আপনি পেতে থাকবেন। অর্থাৎ কোনোকিছু ডিমান্ড
করার এবং গ্রহণ করার অধিকার আপনার থাকবে। কর্মসংস্থানের গ্যারান্টি প্রদানের পর কোনো কারণে তা
প্রদান করতে না পারলেও সরকার আপনাকে সবকিছু ডিমান্ড করবার এবং ব্যবহার করবার পূর্ণ
অধিকার দেবে। এই নীতি দ্বারা সকলের প্রয়োজনীয় ডিমান্ড এবং কর্মসংস্থানের
সমাধান একসাথে পূরণ হবে। সমাজে যেসব বস্তুর ঘাটতি থাকবে সরকার সেইসব বস্তু ব্যক্তিগত
স্তরে নয় বরং সামাজিক স্তরে গ্রহণ অথবা ব্যবহার করার ব্যবস্থা করে দেবে। এতে যে লাভ হবে তা হচ্ছে
এই— যেসব সম্পদের অভাব রয়েছে সেইসব বস্তুও সকলে পর্যাপ্ত পরিমানে ব্যবহার করতে পারবে। এই নীতির ফলে প্রাকৃতিক
সম্পদের অপপ্রয়োগও বন্ধ হবে। আসুন দেখি কীভাবে তা সম্ভব হবে। সরকার গঠনের পর সর্বপ্রথমে
প্রয়োজনীয় সরকারি পদে উপযুক্ত ব্যক্তিদের নিযুক্তি হবে। একইসাথে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের
একটি বড় পরিষদও নিযুক্ত করা হবে যারা দ্রুত ইন্টারনেট এবং সফটওয়্যারের মাধ্যমে একটি
ওয়েবসাইট নির্মাণ করবে। যেখানে দেশের সকল নাগরিকের একটি একাউন্ট থাকবে যেখান
থেকে সকলে নিজেদের সমস্ত ডিমান্ড করতে পারবে। এবং নিজেদের সমস্ত তথ্য
পূরণ করতে পারবে। যেমন— যোগ্যতা, কোন কাজে দক্ষতা রয়েছে, কি ধরণের কাজে আগ্রহ রয়েছে, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পূর্বে ট্রেনিং নিতে পারেনি এমন কোনো কাজের ট্রেনিং বর্তমানে
নিতে চায় বা শিখতে চায় ইত্যাদি। অর্থাৎ নিজেদের পছন্দমত সবকিছু সকলে শিখতে পারবে। সমস্ত ব্যবস্থা সরকার করবে। যারা ইন্টারনেটের ব্যবহার
জানে না তাদের জন্য সরকার আশেপাশে কম্পিউটার অপারেটর নিযুক্ত করবে, যাদের মাধ্যমে মানুষ প্রয়োজনীয়
বস্তুর ডিমান্ড করতে পারবে এবং নিজেদের প্রোফাইল বানাতে পারবে। যেমন— তাদের একমাসে কত পরিমাণ চাল, আটা, ময়দা, চিনি, দুধ, ঘি, কাপড়, তেল, মশলা, সব্জি, ফল, ডাল, শস্যদানা, মিষ্টি, সুগন্ধি ইত্যাদি নিত্যদিনের
বস্তুসহ সাপ্তাহিক বস্তু এবং মাসিক বস্তুর প্রয়োজন হয় সেসবের ডিমান্ড বা অর্ডার করতে
পারবে। এছাড়াও মোটর সাইকেল, গাড়ি, মোবাইল, কম্পিউটার, টিভি, ওয়াশিং মেশিন, সব ধরনের ফার্নিচার, বসবাস করার ঘর ইত্যাদি সকল প্রয়োজনীয় বস্তুর অর্ডারও অনলাইনে করতে পারবে। এরপর অবশিষ্ট সব তথ্য যেমন— এখনো অবধি কোন কোন কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে, কতটা দক্ষতা রয়েছে, ভবিষ্যতে কে কোন পেশায় কর্ম করতে চায় এবং দক্ষতা অর্জন
করতে চায় ইত্যাদি। একথা বলার অর্থ এটিই যে—সফটওয়্যার তৈরি হবার পর কিছু দিনের মধ্যেই সমস্ত তথ্য সরকারের কাছে চলে আসবে। অর্থাৎ একটি বোতাম টিপলেই
সকলের সমস্ত ডিমান্ডসহ সকল তথ্য সরকার দেখতে পারবে। এইভাবে ভবিষ্যতেও সকলের
সব তথ্য সর্বদা সরকারের কাছে আসতে থাকবে। সকলের সমস্ত চাহিদা, কত মানব সম্পদ রয়েছে, কর্মসংস্থানের চাহিদা কত রয়েছে, কত প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে
ইত্যাদি। মোটকথা সরকারের কাছে হিসেব থাকবে কোন বস্তু কতটা মাত্রায়
প্রয়োজন। এছাড়াও বিভিন্ন কর্মের জন্য কোন বিভাগে কতজন রয়েছে এবং
কে কি ধরণের কর্ম করছে, কারা খালি বসে রয়েছে, কোন সম্পদ কতটা মাত্রায় মজুত রয়েছে এবং যেসব সম্পদ স্বল্প মাত্রায় রয়েছে সেসবের
বিকল্প কি হতে পারে ইত্যাদি সমস্ত তথ্য সরকারের কাছে থাকবে। মোটকথা সব তথ্য সরকার জানতে
পারবে। ওই সফটওয়্যারের মাধ্যমে কে কোন কর্ম সম্পাদনে কুশল অথবা কোন কর্মটি সে করতে চায়, তার জন্য শিক্ষা বা ট্রেনিং
কতটা আছে, এইসব তথ্যও জানা যাবে। কোনো না কোনো কারণে শেখা হয়নি এমন কিছু কর্ম যা পূর্বে
শিখতে চেয়েছিল এবং পেশা হিসেবে নির্বাচন করতে চেয়েছিল এমনসব বিষয়েও সরকার শিক্ষা প্রদানের
ব্যবস্থা করবে। ততদিন অবধি যে কর্ম সে করতে পারে তা চালিয়ে যেতে পারবে। এইভাবে দেশে জনসংখ্যা কত
আছে এবং কোন বয়সের নাগরিক কতজন রয়েছে, কোন বিষয়ে কতজন শিক্ষিত এবং প্রশিক্ষিত রয়েছে এমন সব তথ্য সরকারের কাছে থাকবে। অনলাইন সফটওয়্যারের ইউজার
ইন্টারফেস দেখতে কেমন হবে তা পরবর্তী পৃষ্ঠায় প্রদান করা হয়েছে। এইভাবে সরকার সর্বমোট চাহিদা জানতে পারবে
এবং তা পূরণ করার জন্য কতজন মানুষ, কত মেশিন, মালবাহক গাড়ী, কারখানা ইত্যাদি কোন কোন ক্ষেত্রে প্রয়োজন হবে যার মাধ্যমে সময়মত যেন সকলের চাহিদা
পূরণ করা যায় তার হিসেব সরকার সহজেই করতে পারবে। সরকার সকলের অভাব পূরণ
করার জন্য সকলকে তাদের যোগ্যতা এবং পছন্দ অনুযায়ী নিযুক্ত করবে যেন সর্বাধিক পাঁচ বছরের
মধ্যে সকলের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়। বিশেষ করে যাদের বর্তমানে অধিক অভাব রয়েছে। এরপর সকলে অবিরত নিজেদের
অর্ডার করতে থাকবে এবং একইরমভাবে সকলের চাহিদাও অবিরত পূরণ হতে থাকবে। কেবলমাত্র পাঁচ বছর অবধি
সর্বাধিক চাহিদা থাকবে কেননা বর্তমান সময়ে অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যার কাছে কিছুই নেই। তাই শুরুতে চাহিদা এবং
কর্ম অধিক পরিমাণে থাকবে। ধীরে ধীরে সকলের চাহিদা স্বাভাবিক হয়ে আসবে এবং ততদিনে
আমাদের কাছে উন্নত পরিকাঠামোও নির্মিত হয়ে যাবে। আনুমানিক পাঁচ বছর পর সামঞ্জস্য
চলে আসবে। তখন সকলের চাহিদা অতি সহজেই পূরণ হতে থাকবে এবং কর্মও
অনেক কমে আসবে। সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থায় নগরীয় জীবনযাপনের ব্যবস্থা
থাকবে এবং সকলকেই আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন
বাড়ি সরকারের তরফ থেকে প্রদান করা হবে। বেশীরভাগ বস্তুর জন্যই কোনো বাজার বা দোকানের প্রয়োজন
থাকবে না। কেননা অর্ডার অনুযায়ী সকল বস্তু উল্লেখিত ঠিকানায় ক্যুরিয়ার
ব্যবস্থার মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ার বন্দোবস্ত থাকবে। কেবলমাত্র সেইসব বস্তু
এবং পরিষেবার জন্যই দোকানের প্রয়োজন হবে যা সরাসরি ঘরে পৌঁছানো সম্ভব নয়। যেমন হোটেল, রেস্তোরাঁ, জিম, সেলুন, বিউটি পার্লার ইত্যাদি। এতে পথে ভিড়ও কম হবে এবং
পার্কিং ব্যবস্থাও অচল হবে না।
আমাদের ইচ্ছেগুলি কি অনন্ত?
বিভিন্ন মানুষের
সাথে আলোচনা করে আমি বুঝেছি যে, মোটামুটি সকলেই এমনটি মনে করেন যে ‘মানুষের ইচ্ছেগুলি হচ্ছে অনন্ত এবং প্রাকৃতিক সম্পদ হচ্ছে
সীমিত’। বহুকাল পূর্ব হতেই এই মতবাদ
চলে আসছে। তাহলে আসুন প্রথমে এই দুটি বিষয়ে অনুসন্ধান করি যে মূলত
একথা সত্য কিনা অথবা এটি কোনো বিশেষ পরিস্থিতির উপর নেওয়া সিদ্ধান্ত কিনা। অবশ্যই এই বিষয়ে বিচার
বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে। আমি এই দুটি সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুসন্ধান করে যা পেয়েছি
তা হচ্ছে সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করা হয়েছে কোনো বিশেষ পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে। কিন্তু প্রকৃত সত্য উঠে
এসেছে ঠিক তার বিপরীত মেরু থেকে। অর্থাৎ মানুষের ইচ্ছে অনন্ত নয় এবং অধিকাংশ প্রাকৃতিক
সম্পদও সীমিত নয়। আমি যে সমস্যাগুলি খুঁজে পেয়েছি তা উৎপন্ন হচ্ছে কেবলমাত্র
সঠিক ব্যবস্থা না থাকার কারণে। যদি সঠিক ব্যবস্থা না থাকে তবে অসীম সম্পদও স্বল্প মনে
হবে এবং সামান্য ইচ্ছেও অনন্ত বলে অনুভব হবে। আর যদি ব্যবস্থা সঠিক হয়
তবে সীমিত সম্পদও পর্যাপ্ত হয়ে যাবে এবং অনন্ত ইচ্ছেও সামান্য মনে হবে। ব্যবস্থা সঠিক হলে আমাদের
কাছে যতটুকু প্রাকৃতিক সম্পদ এবং মানব সম্পদ রয়েছে সেসবের উপযুক্ত ব্যবহার হতে পারবে। মন্দ ব্যবস্থায় সর্বদা
সবকিছুর শুধুমাত্র অভাবই দেখা দেয় এবং সঠিক ব্যবস্থায় সবকিছু পর্যাপ্ত হয়ে যায়। এবার চলুন দেখি এই সিদ্ধান্তে
আমি কীভাবে উপনীত হয়েছি তার উপর চিন্তন-মনন করি।
প্রথমে অনন্ত ইচ্ছেগুলি নিয়ে আলোচনা করি। সর্বপ্রথম যখন আমি নিজের
প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এটি জানার চেষ্টা করেছি যে আমার নিজের ইচ্ছেগুলি কি অনন্ত? যে উত্তর পেয়েছি তাতে সর্বমোট
১০০টির আশেপাশে ইচ্ছে আমি মনে করতে পেরেছি এবং লিখতে পেরেছি। এই ইচ্ছেগুলি আমি বেশ কিছুদিন ধরে স্মরণ
করে করে লিপিবদ্ধ করতে পেরেছি। মোটামুটি ২৫টি ইচ্ছে আমি খুব তাড়াতাড়িই লিখে ফেলেছিলাম
কিন্তু এর অধিক আমি মনে করতে পারছিলাম না। ইচ্ছের সংখ্যা ৪০টির উপরে পৌঁছাতে অনেক সময় লেগেছিল। তারপর বেশ কিছু দিনের চেষ্টায়
আমি ১০০টির কাছাকাছি ইচ্ছে লিখতে পেরেছিলাম। পরে আমি ভাবলাম— হয়তো আমার ইচ্ছে কমে গিয়েছে। কেননা ততদিনে আমি প্রচুর মাত্রায় ধ্যান, সাধনা ইত্যাদি করেছিলাম। তাই আমি বিভিন্ন প্রকার
মানুষদেরকে তাদের ইচ্ছের তালিকা তৈরি করতে বলেছিলাম। পরে এই দেখে আশ্চর্য হয়েছি
যে তারা ১০০টির কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারেনি। তাদের মধ্যে অধিকাংশ তো কেবলমাত্র ৪০টি অবধিই পৌঁছাতে
পেরেছিল। আরেকটি কথা আপনাদের বলে রাখি যে, তারা সকলে এটিই বিশ্বাস
করত যে মানুষের ইচ্ছে হচ্ছে অনন্ত। এরপর কিছুকাল পর যখন আমি তাদের সাথে পুনরায় দেখা করি
তখন সকলের বক্তব্য এই ছিল যে— ওই অভিজ্ঞতা তাদের সকলকে অবাক করে দিয়েছে
এই ভেবে যে আমাদের ইচ্ছেগুলি তো মূলত অনেক সীমিত। আর এটি সত্যিই এক অদ্ভুত
অবস্থা যে আমরা সেইসব সামান্য ইচ্ছেও পূরণ করতে পারিনা। এর কারণ সম্পর্কে
আপনার ধারণা সঠিক, এটি পুরোপুরি ব্যবস্থা সম্পর্কিত সমস্যা। বাস্তবে আমরা সকলে নিজেদের
অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রভাবিত হই। যে বিষয় নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা যতটা গভীর হয় তার দ্বারা
আমরা ততটাই অধিক প্রভাবিত হই। আর আমাদের অধিকাংশ সিদ্ধান্ত নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই
নির্বাচন করে থাকি। কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় নিজের মন ও বুদ্ধিকেও সামিল
করা উচিত এবং যে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পূর্বে অন্যের সাথেও যথেষ্ট চিন্তন-মনন করে
নেওয়া উচিত। এই চিন্তন-মনন প্রক্রিয়ার সাথে আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা
এবং যা কিছু আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি সেইসব বিষয়কে সামিল করা উচিত। অভিজ্ঞতা যেহেতু নিজের
ব্যক্তিগত ব্যপার তাই তার ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত ভুলও তো হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে আমরা সকলে
নিজেদের অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে সূর্য পূর্বদিকে উদিত হয় এবং পশ্চিম দিকে অস্ত যায়। অর্থাৎ মনে হয় যে আমাদের
পৃথিবী হচ্ছে স্থির এবং সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরে চলেছে। কিন্তু আপনারা সকলে জানেন
যে সত্য হচ্ছে ঠিক তার বিপরীত। তা হচ্ছে সূর্য স্থির এবং পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরে
চলেছে। একইভাবে আমরা নিজেদের জীবনেও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি যা পরে
ভুল হিসেবে পরিগণিত হয়। এই কারণে কেবলমাত্র অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত
যে সর্বদা সঠিক হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। সেইজন্য চিন্তন-মননের সাথে অধিকতর তথ্য, খবরাখবর, অভিজ্ঞতা ইত্যাদির সাহায্য নেওয়া উচিত। এতে যেটি হবে আপনার নেওয়া সিদ্ধান্ত সঠিক হবার সম্ভাবনা
অনেকগুণ বেড়ে যাবে। আর আপনার জীবনও সর্বাধিক সুখী হতে পারবে।
চিন্তন-মনন করার প্রক্রিয়া
বাস্তবে চিন্তন-মননের প্রক্রিয়া কি তা আমাদের বোঝা
উচিত। তবেই এর মহত্ত্ব এবং উপযোগিতাকে আমরা নিজেদের সমগ্র জীবনে কাজে লাগাতে পারব। বর্তমানে আমি মানুষকে নিজেদের
মধ্যে চিন্তন-মনন করতে দেখে এটিই বুঝেছি যে অধিকাংশ মানুষ জানেই না কীভাবে চিন্তন-মনন
করা উচিত এবং কেন করা উচিত। সেইজন্য অধিকাংশ মানুষের মধ্যে চিন্তন-মনন করার সময়ই
দ্বন্দ্ব বেধে যায়। এখন তো বেশীরভাগ মানুষ এটিই ভেবে নিয়েছে যে চিন্তন-মনন
হচ্ছে একটি ব্যর্থ প্রক্রিয়া, এতে শুধুমাত্রই ঝগড়া-বিবাদ হয়। তারপরও চিন্তন-মননের প্রক্রিয়া ছাড়া আবার কেউ চলতেও পারে না। কেননা এটি ছাড়া কোনো কর্ম
হয় না। যদি চিন্তন-মননের সাহায্য না নেওয়া হয় তবে যতটুকু ছোটখাটো সিদ্ধান্ত আমরা নিয়ে থাকি সেটুকুও
নিতে পারব না। আবার, এতে জীবনও কিছুটা সহজ হয়। নাহলে তো অধিক নরক যন্ত্রণা ভুগতে হতো। আপনি নিউজ চ্যানেলে নিশ্চয়ই
দেখেছেন যে সেখানে চিন্তন-মনন করার সময় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দ্বন্দ্ব লেগে থাকে এবং তারা
কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছে এমনটি দেখা যায় না। যদিও সেখানে সময় অনেক কম
থাকে। আসুন বুঝে নিই ভুলটি মূলত কোথায় হচ্ছে। আমার বিবেচনা অনুযায়ী চিন্তন-মনন করার পূর্বে উদ্দেশ্যকে
নিশ্চিত করে নেওয়া উচিত এবং তার নিয়মাবলী সঠিক করে নেওয়া উচিত। চিন্তন-মনন করার সময় সর্বদা
একথা মনে রাখা উচিত যে— আমরা নিয়ম ভঙ্গ করছি কিনা অথবা উদ্দেশ্য
থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি কিনা। এমন অনেক বিষয় যা আমরা জানিই না। যেমন— এই মানব জীবনের উদ্দেশ্য কি। যতক্ষণ আমরা আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য কি তা না জানব
অথবা জানলেও ভিন্নভাবে জানব ততক্ষণ অবধি আমরা সঠিক গতিপথে ধাবিত হতে পারব না। যেমন— কেউ কেউ বলে থাকেন জীবনের উদ্দেশ্য মোক্ষলাভ করা। এমনকি মোক্ষলাভেরও আবার
বিভিন্ন বিভাগ রয়েছে। কেউ বলেন নির্বাণ, কেউ বলেন পরমাত্মায় বিলীন হয়ে যাওয়া, কেউ বলেন ভক্তি করা, কেউ বলেন পূজা করা, কেউ বলেন নামাজ বা প্রার্থনা
করা, কেউ বলেন এইসব বাজে কথা
জীবনের কোনো উদ্দেশ্যই নেই ইত্যাদি। এবার ভাবুন যে সমাজে এত ভিন্ন-ভিন্ন উদ্দেশ্য ঘুরে বেড়াচ্ছে
সেখানে মানুষ কীভাবে একটি নির্দিষ্ট সীমারেখায় চিন্তন-মনন করতে পারবে? প্রথমে তো জীবনের উদ্দেশ্য
কি তা ঠিক করা উচিত। শেষ পর্যন্ত আমরা সকলেই তো মানুষ, তাহলে আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য
ভিন্ন-ভিন্ন কি করে হয়? আমাদের মধ্যে ভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু সকলের অন্তিম ইচ্ছে আলাদা কি করে হবে? এই বিষয়ে আমি আমার দ্বিতীয়
পুস্তক ‘সম্পূর্ণ জীবন দর্শনে’ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি। এই পুস্তকে আমি তা নিয়ে
সংক্ষেপে আলোচনা করছি। এখানে আমি সকলের জীবনের অন্তিম উদ্দেশ্য যা রেখেছি তা
হচ্ছে আমরা যেন আমাদের সম্পূর্ণ জীবন সর্বদা সুখী হয়ে কাটাতে পারি।
এতে যদি কারোর কোনো ভিন্নমত থাকে, যদিও তা থাকবেই, সেইজন্য আমি এই বিষয়ে চিন্তন-মনন করতে চাইব। যারা এই বিষয়ে আমার সাথে
চিন্তন-মনন করতে চাইবেন তাদের জন্য সর্বদা আমার তরফ থেকে আমন্ত্রণ রইল। কোনো একটি চিন্তন-মননকে যাচাই করবার জন্য জীবনের উদ্দেশ্যই
হচ্ছে মূল মাপকাঠি। উদ্দেশ্য থেকেই দিকদর্শন নির্ধারিত হয়।
প্রাকৃতিক সম্পদ
কি সীমিত?
এই পৃথিবীর মানুষ
১০০ বছর পূর্বেও বলত যে প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত। যেখানে
সেই সময়েও বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল ১৫০ কোটি। সেইসময়
জীবন-যাপনের স্তরও অনেক নিন্মমানের ছিল। সেইসময়
কোনো কারিগরি প্রযুক্তি তো ছিল না যেখানে মানুষ অধিক পরিমাণে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার
করতে পারবে। এখন যেখানে বিশ্বের জনসংখ্যা ৮০০ কোটির কাছাকাছি
পৌঁছে গিয়েছে এবং মানুষের জীবনযাপনের মান সেই সময়ের তুলনায় বহুগুণ অধিক সমৃদ্ধশালী
হয়েছে সেখানে মানুষ কিন্তু এখনও বলতে থাকে যে সমস্ত সম্পদ সীমিত। জনসংখ্যা
যেখানে পূর্বের তুলনায় ৫ গুণ বেড়েছে। মাঝে ‘সবুজ বিপ্লব’ ও ‘শ্বেত বিপ্লব’ হয়েছে, যার ফলে
পূর্বে জনসংখ্যা কম থাকা সত্ত্বেও যে পরিমাণ অভাব ছিল এখন জনসংখ্যা অধিক হবার পরও ততটা
অভাব দেখা যায় না। প্রতি বছর যেখানে বিভিন্ন দেশ নিজেদের চাল, গম ইত্যাদি
ফসল সমুদ্রে ফেলে দেয় এই ভেবে যে বাজারে যেন সেই ফসলের মূল্য কমে না যায় এবং কৃষকদের
যেন লোকসান না হয়। এখন তো অনেক নতুন নতুন বস্তু উৎপাদন হচ্ছে। এবং অনেক
বস্তুই অতিরিক্ত উৎপাদন হচ্ছে যা পূর্বে হতোই না। এমন অনেক
প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে যা এখনও অবধি ব্যবহারই হয়নি। বর্তমানে
বিজ্ঞান যেখানে উন্নত হয়েছে সেখানে অনেক সম্পদ তো সরাসরি তৈরি করে নেওয়া যেতে পারে। ভবিষ্যতে
এমনও হতে পারে যে কোনো বৃক্ষের জিনের ভেতর কিছু পরিবর্তন করে এমন কোনো বৃক্ষ তৈরি করা
যাবে যার কাঠ হবে লোহার মত শক্ত এবং তা দিয়ে এমন সব কর্ম করা যাবে যা লোহা দিয়ে করা
যায়। এ তো গেল সর্বোত্তম বিজ্ঞান বিকাশের কথা। আরেকটি
দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যেতে পারে যে বর্তমানে প্রতিটি বস্তু অনবরত অন্য কোনো বস্তুতে
বদলে যাচ্ছে। আপনি তো জানেন এই জগতে প্রতিটি বস্তু একটি
চক্রে আবর্তিত হয়ে রয়েছে এবং এর বাইরে তার কোনো অস্তিত্বই নেই। জলকে আমরা
উদাহরণ হিসেবে নিতে পারি। এই উদাহরণটি সকলে
অতি সহজেই বুঝতে পারবে। কেননা এই বিষয়ে
সকলেরই অভিজ্ঞতা রয়েছে। চলুন জলচক্রকে বোঝার
চেষ্টা করি। আমরা জানি যে জল তরল, গ্যাস এবং
কঠিনরূপে পাওয়া যায়। অর্থাৎ জল অবিরত
তরল থেকে বাষ্পে পরিণত হচ্ছে, বাষ্প থেকে বরফে
পরিণত হচ্ছে এবং বরফ থেকে আবার তরলে পরিণত হয়ে চলেছে। সরাসরি
দেখলে জল পাহাড় থেকে নদী হয়ে সমুদ্রে পতিত হচ্ছে এবং অবিরত বয়ে চলেছে। সমুদ্রে
অধিক তাপমাত্রার কারণে জল অবিরত বাষ্পে রূপান্তরিত হচ্ছে এবং কম তাপমাত্রার কারণে বাষ্প
অবিরত বরফে রূপান্তরিত হচ্ছে। এবার দেখুন
জল আপনি ব্যবহার করুন বা না করুন তা অবিরত সমুদ্রের দিকে বইতেই থাকবে। আপনি যদি
সমুদ্রে না গিয়ে নিজে পরীক্ষা করে দেখতে চান তাহলেও তা মাঝ পথে বাষ্প হয়েই যাবে। কেননা আপনি
তাকে মাঝপথেই ব্যবহার করে নিচ্ছেন এবং বাষ্পে পরিণত হবার যে প্রক্রিয়া সমুদ্রে গিয়ে
হতো তা মাঝপথেই সম্পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। পার্থক্য
শুধুমাত্র এটিই হবে যে এখানে পরীক্ষা করার সময় বাষ্পে পরিণত হবে আর সমুদ্রে পরীক্ষা
না করেই বাষ্প হয়ে যাবে। দুটি অবস্থাতেই
জলের বাষ্পে রূপান্তরিত হওয়া নিশ্চিত হয়ে রয়েছে যা আপনি বন্ধ করতে পারবেন না। আপনার পরীক্ষা
করা বা না করায় বিশেষ কিছু পরিবর্তন হবে না। সামান্য
পার্থক্য যেটুকু হবে তাও স্থান পরিবর্তন করার কারণে। যদি আপনি
মাঝ পথে ব্যবহার করে ফেলেন তাহলে জল সেখানেই বাষ্প হয়ে যাবে। যদি ব্যবহার
না করেন তাহলে সমুদ্রে গিয়ে বাষ্প হয়ে যাবে। তাহলে বোঝা
গেল যে শুধুমাত্র স্থান পরিবর্তনের পার্থক্য আসবে। যদি আপনি
মাঝপথে ব্যবহার করে ফেলেন তাহলে সমুদ্রে কিছুটা জল কমে যাবে কেননা আপনি তাকে মাঝপথেই
বাষ্পে রূপান্তরিত করে দিচ্ছেন। পৃথিবীর
ক্ষেত্রে যেটি হবে, আপনার পরীক্ষার জন্য সমুদ্রের জলস্তরে তেমন
কোনো প্রভাব পড়বে না। একইভাবে আপনি অন্যান্য
খনিজ পদার্থ অথবা ধাতুর ক্ষেত্রেও বুঝে নিতে পারেন। যদি আপনি
তা ব্যবহার অথবা পরীক্ষা না করেন তাহলেও তা পরবর্তী বস্তুতে রূপান্তরিত হবেই যা স্বাভাবিকভাবে
হয়েই চলেছে। যদি আপনি ব্যবহার করে ফেলেন তাহলেও তা পরবর্তী
বস্তুতে রূপান্তরিত হয়েই যাবে। তাহলে আপনি
ব্যবহার করুন বা না করুন সকল বস্তু নিজ নিজ বলয়ে অবিরত পরিবর্তিত হয়েই চলেছে। আবার যারা
ঈশ্বরকে মানেন এবং বিশ্বাস করেন তারা এইভাবে বুঝে নিতে পারেন যে এই বিরাট জগতে ঈশ্বর
কি কোনো বস্তু স্বল্প পরিমানে তৈরি করতে পারে? অথবা কোনোকিছুর
অভাব রাখতে পারে? এখন আমাদের কাছে যে বিজ্ঞান রয়েছে তা কি
নিশ্চিত হয়ে বলতে পারে সে জগতের সমস্ত সম্পদ সম্পর্কে চূড়ান্তভাবে জেনে নিয়েছে, কোন সম্পদ
কতটা পরিমানে রয়েছে এবং কোথায় কোথায় রয়েছে? এটি তো
আপনি আমি দুজনেই জানি যে বিজ্ঞানের এই জবাব ‘না’ হবে। সে এটিই
বলবে এখন সমস্ত তথ্য তার কাছে নেই। কেননা বিজ্ঞান
সর্বদা বর্তমান সময়ের নিরিখেই বলবে, ভাই আজ অবধি আমাদের
কাছে যে তথ্য রয়েছে তাতে এমনটিই হয়ে থাকে এবং সেই হিসেবেই সিদ্ধান্ত প্রদান করে থাকে। সুতরাং
বিজ্ঞান তার মতে ঠিকই বলছে। বিজ্ঞানকে
এভাবেই কর্ম করা উচিত। আমাদের ব্যবস্থাতেও
বিজ্ঞান যদি বলে যে এই প্রকার সম্পদ স্বল্প পরিমাণে রয়েছে তবে ব্যবস্থাও সেই সিদ্ধান্তকে
গম্ভীরভাবে নেবে এবং ততটুকু সম্পদকে কীভাবে সকলের জন্য ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে বিবেচনা
করবে এবং কর্ম সম্পাদন করবে। অথবা অন্য
কোনো বিকল্প থাকলে তাকে কাজে লাগাবে। এবার অন্য
একটি উদাহরণ থেকে বোঝার চেষ্টা করি। কিছুক্ষণের
জন্য মেনে নিচ্ছি সম্পদ সীমিত অবস্থায় রয়েছে। এবং এও
মেনে নিচ্ছি যে সম্পদ শুধুমাত্র আগামী ১,০০০ বছর অবধিই চলবে। তবে তো
ভাই আমাদেরকে ১,০০০ বছর অবধি ভালভাবে কাটানো উচিত। যখন সম্পদ
সমাপ্ত হয়ে যাবে তখন তো আমরাও সকলে সমাপ্ত হয়ে যাব। এতে আর
সমস্যা কীসের? দুঃখের সাথে ১০,০০০ বছর
বাঁচার চাইতে ১,০০০ বছর সুখের সাথে কাটানো ভাল। কিছু মানুষ
আবার বলতে থাকে ১,০০০ বছর পর কোনোপ্রকার সম্পদ ছাড়া সকলে কীভাবে
বাঁচবে? এবার আপনি ভাবুন এখন তো সম্পদ রয়েছে, তবুও অধিকাংশ
জনগণ সম্পদ ব্যবহার না করে দুঃখের সাথে এই চিন্তায় জীবন কাটাচ্ছে যে আজ থেকে ১,০০০ বছর
পর তাদের প্রজন্ম কীভাবে বাঁচবে? অবাক বিষয় নয় কি? যারা এখন
বেঁচে রয়েছে তাদের নিয়ে ভাবছে না, ভাবছে তাদের নিয়ে
যারা আজ থেকে ১,০০০ বছর পরে জন্ম নেবে! আরে ভাই
যারা বর্তমানে বেঁচে রয়েছে তাদের নিয়ে ভাবা উচিত নাকি যারা এখন নেই তাদের নিয়ে? যদি আমরা
১,০০০ বছর অবধি সুখের সাথে কাটাতে পারি তবে কেন তেমন ব্যবস্থা
নির্মাণ করব না? ১,০০০ বছর
পর কি হবে তা কেউ জানে? তবে আজকের বিজ্ঞান
কিন্তু বলছে— আগামী কয়েক হাজার বছর অবধি আমাদের কাছে পর্যাপ্ত সম্পদ
মজুদ রয়েছে।
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ
সঠিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা
করে প্রয়োজন হলে জনসংখ্যাও তো কমিয়ে নেওয়া যায় তাই না? সঠিক ব্যবস্থা
থাকলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা একেবারেই সহজ হয়ে যাবে। তারপর ততটাই
জনসংখ্যার ভারসাম্য রাখা যেতে পারে যেন কারোর জন্য কোনো সম্পদেরই অভাব না হয়।
যদিও মনোবৈজ্ঞানিক
দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে জানা যায় দুঃখী মানুষই অধিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি করে থাকে। অধিকাংশ
ক্ষেত্রে আপনি দেখেই থাকবেন যে ধনীরা অধিক সন্তান নেন না। এবার যদি
সকলের জীবনস্তর উন্নত করে দেওয়া যায় তবে জনসংখ্যা আপনিই নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। আবার, অন্য উপায়েও
জনসংখ্যা শীঘ্রই নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। এতে আবার
কীসের বিরোধীতা? উন্নত দেশগুলিতে জনসংখ্যা তো অত দ্রুত বাড়ছে
না যতটা দরিদ্র দেশগুলিতে বেড়ে চলেছে। যদি আপনি
ইন্টারনেট থেকে ১৯৫০ থেকে ২০১০ সাল অবধি জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দেখতে চান তাহলে আপনি
পাবেন যে আমেরিকায় বৃদ্ধির হার দিগুণের কম হয়েছে, কিন্তু
ভারত এবং চীনে এই হার আড়াই গুণ বেড়েছে। এমনকি দ্রুত
বেড়েই চলেছে। যেখানে ভারত এবং চীনের তুলনায় আমেরিকায় সম্পদ
অধিক পরিমাণে রয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির
সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে শিক্ষার অভাব এবং ভবিষ্যতের জন্য নিরাপত্তাজনিত অনভিজ্ঞতা। এমনকি কিছু
ক্ষেত্রে ধর্মীয় কুসংস্কারও জনসংখ্যা বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে রয়েছে এবং তা মেনে চলাকে
আপনি অশিক্ষার অন্তর্গত বলতে পারেন। এই বিষয়ে
উপরের গ্রাফটি দেখে নিতে পারেন।
উপরের গ্রাফটিতে আমরা দেখছি যে উন্নত দেশগুলির জনসংখ্যা অনেক কমেছে যেখানে অন্যান্য
দেশগুলির জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনেকগুণ বেড়েছে। অবশ্য এর
পেছনে অন্য পরিস্থিতিও বিদ্যমান রয়েছে। যেমন— যাদের অধিক সন্তান নেই তারা নিজেদের দুর্বল এবং অসহায়
মনে করে এই ভেবে যে প্রবীণ বয়সে তাদের মুখাগ্নি কে করবে, বংশরক্ষা
কে করবে, বৃদ্ধাবস্থায় কে দেখাশোনা করবে ইত্যাদি।
সেই কারণে অনেক সময় না চাইলেও ছেলের আশা করতে করতে পরপর কন্যাসন্তানের জন্ম হতে থাকে। এইসব
ছাড়াও বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে যা জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে কম বেশি সহায়তা করে। এইসব কারণগুলিকে
আপনি ভবিষ্যতের প্রতি নিরাপত্তাহীনতার কারণ হিসেবেই ধরে নিতে পারেন। কিন্তু
সঠিক ব্যবস্থায় উপযুক্ত শিক্ষা এবং সুরক্ষিত ভবিষ্যতের ভাবনা তৈরি হয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই
জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দ্রুত হ্রাস পাবে। জনসংখ্যা
বৃদ্ধির হার যদি আরও দ্রুত কমাতে হয় তবে প্রয়োজন হলে আইন প্রণয়ন করে তা হ্রাস করা
সম্ভব। একথা মেনে নিচ্ছি যেমন ব্যবস্থার কথা আমি
বলছি তাতে প্রাকৃতিক সম্পদ অধিক ব্যয় হবে। যদিও নতুন
ব্যবস্থায় স্বাভাবিকভাবে কোথায় কতটা সম্পদ ব্যবহার হবে ইত্যাদি পরিচালনার জন্য প্রাকৃতিক
সম্পদ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ থাকবে। চলুন ধরে
নিচ্ছি কেউ নিয়ন্ত্রণ করবে না। তাহলে আমি
আপনাদের কাছে জানতে চাই বর্তমান সময়েই বা নিয়ন্ত্রণ কোথায়? বর্তমান
সময়ে কি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার হচ্ছে না? এমনকি পাশাপাশি
ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে কোনো পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে না। নতুন ব্যবস্থায়
যেটি হবে তা হল যেসব সম্পদ কম পরিমানে রয়েছে এমনসব বস্তু সকলে সামাজিক স্তরে ব্যবহার
করতে পারবে। উদাহরণ হিসেবে মোটর সাইকেল এবং মোটরগাড়িকে
নিচ্ছি। মেনে নিচ্ছি জনসংখ্যা অনুপাতে সকলের জন্য
সাইকেল, গাড়ি ইত্যাদি মোটরযান তৈরি করতে যত পরিমাণ
লোহা এবং অ্যালুমিনিয়াম প্রয়োজন হবে তা আমাদের কাছে নেই। এই ক্ষেত্রে
নতুন ব্যবস্থায় যে নিয়ম থাকবে তা হল সরকার এই দুটি বস্তু ব্যক্তিগত মালিকানায় না দিয়ে
সামাজিকভাবে প্রদান করবে। এখানে সামাজিকভাবে
ব্যবহারের অর্থ হচ্ছে— ধরুন কোনো এক অঞ্চলে
বা গ্রামে ৫০ হাজার মানুষ বসবাস করে যারা এই দুটি বাহন ব্যবহার করবে, সেক্ষেত্রে
নতুন ব্যবস্থায় কিছু সার্বজনিক স্থান তৈরি করা হবে যেখানে সব মিলিয়ে ১০ হাজার মোটর
সাইকেল এবং ১০ হাজার গাড়ি রাখা থাকবে। এই বিভাগকে
কম্পিউটারের মাধ্যমে অনলাইনে যুক্ত করে দেওয়া হবে। যার যখন
প্রয়োজন হবে তৎক্ষণাৎ অনলাইনে বুকিং করে নিয়ে যাবে এবং কর্মশেষে আবার সেখানে জমা করে
দেবে। এইভাবে সকলে এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে। এই পদ্ধতি
ব্যবহার করে পরিমাণে কম রয়েছে এমন বস্তুগুলির সর্বাধিক ব্যবহার করা যেতে পারে। এমনভাবে
আরও অনেক বস্তুর ক্ষেত্রে এই নিয়ম কাজে লাগানো যেতে পারে। আবার এমনটিও
জরুরী নয় যে সমস্ত গাড়ি লোহা দিয়েই তৈরি করতে হবে। এই ক্ষেত্রে
যেখানে সম্ভব হবে সেখানে কাঠের ব্যবহার করা যেতে পারে। এমনকি
বাড়ির দরজা, জানালা ইত্যাদি স্থানে লোহার পরিবর্তে কাঠের
অধিক প্রয়োগ করা যেতে পারে এবং বিভিন্ন আসবাবপত্রও লোহার পরিবর্তে কাঠের তৈরি করা যেতে
পারে। তাহলে মূল ভাবনাটা হচ্ছে সঠিক ব্যবস্থা নিয়ে। সম্পদ কত
পরিমাণে রয়েছে তা নিয়ে কান্নাকাটি করা নয়। যে কোনো
সমস্যা সঠিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই নির্ভুল করা যেতে পারে। সেইজন্য
পুরো খেলাটা হচ্ছে ম্যানেজমেন্ট এবং ব্যবস্থা নিয়ে। এবার অন্য
একটি বিষয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করছি। বর্তমান
সময়ের পুঁজিবাদেও কি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে? যে কর্ম কাঠ দিয়ে
সম্পন্ন করা সম্ভব সেখানে লোহা এবং অন্যান্য ধাতু ব্যবহার করা হচ্ছে? বিদ্যুতের
ক্ষেত্রেও যেখানে অন্য সম্পদ ব্যবহার করে কর্ম হতে পারে সেখানে কয়লা এবং পেট্রোল-ডিজেল ব্যবহার
করা হচ্ছে। যা পরিবেশ দূষণের কারণ হয়ে উঠেছে। জঙ্গলে
যে কোনো সময় আগুন লেগে যাচ্ছে তার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। আপনি নিজে
দেখুন সঠিক ব্যবস্থা না থাকলে আপনি এইসব সমস্যার কোনো উপায় বের করতে পারবেন না। পুঁজিবাদী
ব্যবস্থায় সর্বদা সরকার এবং ব্যক্তির মধ্যে একপ্রকার সংঘাত থেকেই যায়। এই সমস্যাকে
সমাপ্ত করাও যায় না। এমনকি পুঁজিবাদের
ক্ষেত্রেই নয় বরং যে কোনো ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে দেখবেন যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের
জন্য একাধিক কেন্দ্র রয়েছে সেখানে সংঘাত থাকাটা স্বাভাবিক। এই সমস্যাকে
মেটানোও সম্ভব নয়। উদাহরণ হিসেবে ধরে নিন কোনো সংস্থায় সিদ্ধান্ত
গ্রহণের জন্য যদি একাধিক স্বাধীন কেন্দ্র তৈরি করে দেওয়া যায় তবে কি সেই সংস্থা সঠিকভাবে
কার্য সম্পাদন করতে পারবে? সকলের উত্তর এটিই
হবে যে, করতে পারবে না। কেননা একটি
কেন্দ্র যা সিদ্ধান্ত নেবে অপর কেন্দ্র ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেবে। দ্বিতীয়ত, যাদের নিচু
স্তরে কর্ম করতে হয় তারা বুঝতেই পারবে না কাদের সিদ্ধান্তকে কর্মপ্রক্রিয়ায় ব্যবহার
করবে? এর থেকে আমরা বুঝতেই পারছি যে ব্যবস্থা একেন্দ্রীকরণ
হওয়াই উচিত। আরেকটি বিষয় হচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদের উপর
কি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু মানুষেরই আজীবন অধিকার থাকবে? তারা সম্পদ
যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করলে কোনো সমস্যা নেই এবং তাদের কারণে প্রাকৃতিক সম্পদ কমেও যায়
না। কিন্তু যখনই সকলের জন্য প্রয়োগের কথা আসে তখনই মানুষ
চেঁচামেচি করতে থাকে এই বলে যে প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত; সম্পদ কম
কম ব্যবহার কর, বিন্দু-বিন্দু
জল বাঁচাও ইত্যাদি ইত্যাদি। বাস্তবে
দেখা যায় ধনীরা কখনো জল বাঁচায় না। এই উপদেশ
কেবলমাত্র গরীবের জন্যই বরাদ্দ। আর, অবিরত চেঁচামেচি
করছে যেসব বৈজ্ঞানিক, সরকারি উচ্চপদে কর্মরত ব্যক্তি, ব্যবসায়ী
এবং কিছু সামাজিক সংগঠন তারা কিন্তু নিজেরা সমস্ত সুখসুবিধা ভোগ করছে। যখনই সকলকে
দেবার প্রশ্ন উঠছে তখনই তারা চেঁচামেচি করতে থাকে এই বলে যে সম্পদ কম রয়েছে। প্রিয়
বন্ধুরা, হয় এইসব সকলের জন্য করা হোক নাহলে কারোর
জন্যই নয়। কমপক্ষে তারা ন্যায় বিচারের মত তো কথা বলুক! বাস্তবে
সমস্ত দেশ সর্বাধিক সম্পদ ব্যবহার করেই চলেছে। কে কার
কথায় থেমে রয়েছে? যত বিকশিত দেশ রয়েছে
কেউ কি তাদের থামিয়ে রেখেছে? তারা তো অন্য দেশের
সম্পদও ভোগ-দখল করে নিচ্ছে। কেবলমাত্র
প্রাকৃতিক সম্পদই নয় মানব সম্পদও ভোগ করে চলেছে। এটি কি
তারা সঠিক কর্ম করছে? যারা পরিবেশ দূষণের মিটিং করছে তারা কি সমস্ত
সম্পদ ব্যবহার করছে না? নিঃসন্দেহে করছে। তাহলে এটি
কি শুধুমাত্র দরিদ্রদের দায়িত্ব সম্পদ যেন সমাপ্ত না হয়? ধনীদের
কি কোনো দায়িত্ব নেই? আর যুদ্ধ সামগ্রীর ক্ষেত্রে কি প্রাকৃতিক
সম্পদের ব্যবহার হয় না? যা সঠিক ব্যবস্থার
মাধ্যমে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। যুদ্ধ সামগ্রীর
ক্ষেত্রে তো প্রাকৃতিক সম্পদ এবং মানব সম্পদের ১০০ শতাংশ অপপ্রয়োগই হচ্ছে। যা থেকে
কোনো সুখসুবিধা প্রাপ্তি হয় না। তাহলে সঠিক
ব্যবস্থা এনে কমপক্ষে যুদ্ধ সামগ্রী তৈরি করা তো বন্ধ করা যেতে পারে, তাই নয়
কি? এর বদলে সেইসব সম্পদকে মানুষের সুখসুবিধার
প্রয়োজনে কাজে লাগানো যেতে পারে। তাই ব্যবস্থাই
হচ্ছে মুখ্য সমস্যা, প্রাকৃতিক সম্পদের সীমিত হওয়াটা নয়। ১৯৬০ সালের
পূর্বে যখন ‘সবুজ বিপ্লব’ এবং ‘শ্বেত বিপ্লব’ ঘটেনি, যখন নালা
তৈরি হয়নি, যখন ভারতে বিদ্যুতের সুবিধাও ছিল নামমাত্র; সেইসময়
এমনটি মনে হয়েছিল, যে হারে জনসংখ্যা বেড়ে চলেছে সেই হিসেবে
মানুষের জন্য উৎপাদন বৃদ্ধির কোনো আশা নেই। তখন এমনটি
ভাবা হয়েছিল যে ভারতের অবস্থা খুবই করুণ হতে চলেছে। পরিস্থিতি
অনুযায়ী তারা তখন সঠিক অনুমানই করেছিল। যদি ‘সবুজ বিপ্লব’ এবং ‘শ্বেত বিপ্লব’ না হতো তবে ভারতকে
খুবই সমস্যার মধ্যে পড়তে হতো। কিন্তু
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে বর্তমান বিশ্বে ভারতের অর্থনীতি উন্নয়নশীল। সুতরাং
সমস্যা হচ্ছে সঠিক ব্যবস্থা না থাকার জন্য, সীমিত সম্পদের
জন্য নয়। প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত থাকার সমস্যা থাকলেও
তা খুবই স্বল্প। এছাড়াও অনেক কারণ রয়েছে যার ফলে খুবই বিপজ্জনক
অবস্থা তৈরি হয়েছে। আপনি দেখে থাকবেন যে একজন অপরজনের কারণে
নিরাপত্তাহীন মনে করে, একটি পরিবার অপর একটি পরিবারের কাছে নিরাপত্তাহীন
মনে করে, এক সমাজ অন্য সমাজের কাছে নিরাপত্তাহীন মনে
করে। এক রাজ্য অন্য রাজ্যের কাছে নিরাপত্তাহীন মনে করে। এইভাবে
এক দেশ অন্য দেশের কাছে নিরাপত্তাহীন মনে করে। এই নিরাপত্তাহীনতার
কারণেই সমস্ত দেশ কত যুদ্ধ-সামগ্রী তৈরি করে
বসে রয়েছে। ভারত প্রত্যেক বছর মোট সম্পদের একটি বিরাট
অংশ কেবলমাত্র সেনাবাহিনী এবং পুলিশের জন্য ব্যয় করে থাকে। যা কিনা
শুধুমাত্র বাধ্য হয়ে করতে হয়। এটি কি
ভাল নয় যে সম্পূর্ণ বিশ্বে এমন এক ব্যবস্থা আসুক যার ফলে নিরাপত্তাহীনতার ভাবনা উদয়ই
হবে না? এবং যে সম্পদ নিরাপত্তার জন্য ব্যয় হচ্ছে
তা মানুষের জীবন-যাপনের স্তরকে উন্নত করার কাজে ব্যবহার হোক? এর জন্য
অবশ্যই একটি কর্ম করতে হবে। সর্বপ্রথমে
এমন একটি বিশ্বব্যবস্থার পরিকাঠামো নির্মাণ করতে হবে যেন একটি বিশ্ব সরকার গঠনের সম্ভাবনা
তৈরি হয়। যদিও এই কর্মটি আমি সম্পূর্ণ করে দিয়েছি। এবার শুধুমাত্র
একটিই কর্ম অবশিষ্ট রয়েছে তা হল এই বিষয়টিকে সমস্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সকলে যেন
একসাথে বসে নিজেদের মধ্যে চিন্তন-মনন করতে পারে এই ভেবে যে, এমনি করে
সকলে একে অপরের সাথে লড়াই করে থাকতে চায় নাকি একে অপরের সাথে সুখ উপভোগ করে কাটাতে
চায়। যদি সুখী হয়ে থাকতে চায় তবে এই ব্যবস্থাকে আপন করে নিক। নাহলে দ্রুত
যুদ্ধ ঘোষণা করুক এবং একজন অপরজনকে হত্যা করে ফেলুক। এরপর না
কেউ বেঁচে থাকবে, না কোনো সমস্যা থাকবে। সকলের যা
পছন্দ হয় সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিক।
সন্ত্রাসবাদের ফলেও একটি গভীর সমস্যা তৈরি হয়ে রয়েছে। এর মূল
কারণ খোঁজার চেষ্টা করলে আপনি যা পাবেন তা হচ্ছে ‘সুখসুবিধার অসম বণ্টন’ যা অপর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে। পর্যাপ্ত
সুখসুবিধা না থাকার কারণে সকলে অধিকতর ক্ষেত্রে সুবিধাগুলিকে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়
করে রাখতে চায়। এটিও এক বিরাট সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। একদিকে
এমনিতেই জনসংখ্যা অনুপাতে সুখসুবিধা পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই অপরদিকে ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে
রাখার কারণে অধিক স্বল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার ফলে
অধিকাংশ মানুষ বর্তমান-অতীত-ভবিষ্যৎ
মিলিয়ে সর্বদাই দুঃখী জীবন অতিবাহিত করে এবং সুখসুবিধার টানাটানি, চুরি, ছিনতাই
ইত্যাদি অপরাধের পথে চলতে শুরু করে। ফলে অন্যান্য
বহু সমস্যা উৎপন্ন হতে শুরু করে। যাদের দেখে
আমরা সাধারণত বলে থাকি, এরা তো অসাধু হয়ে
গিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন অবস্থা দেখতে দেখতে এমনই
মনে হয় যে কিছু মানুষ ভাল হয় এবং কিছু মানুষ মন্দ হয়। এরপর মানুষকে
শোধরানোর আয়োজন শুরু হয় একথা না জেনেই যে সর্বপ্রথমে কারণের নিবারণ করা উচিত, ফলাফলের
তো আর নিবারণ করা সম্ভব নয়। মানুষ ফলাফলের
কারণে মন্দ হয় না। এই বিষয়ে একবার গভীরভাবে চিন্তন-মনন
করার প্রয়োজন রয়েছে। একে অপরের প্রতি
অভিযোগ করে কোনো সমাধানে আসা সম্ভব নয় বরং এতে শুধুমাত্র যুদ্ধের পরিস্থিতিই তৈরি হবে। এরপর আপনি
যেভাবে ইচ্ছে দেখতে পারেন অথবা ভাবতে পারেন। আমি বলব
ব্যবস্থা সঠিক না করা ছাড়া অন্য কোনো সমাধান নেই। সকল সমস্যা
সমাধানের জন্য সঠিক ব্যবস্থাই হচ্ছে একমাত্র উপায়। এই জগতে
কেবলমাত্র একটিই সমস্যা রয়েছে তা হচ্ছে সঠিক ব্যবস্থা না থাকা।
আর্থিক সমতা
এই বিষয়টিকে যে
কারণে ভাল করে বুঝে নেবার প্রয়োজন রয়েছে তা হল যতদিন সমাজে সকলের মধ্যে ‘আর্থিক সামঞ্জস্য’ না আসবে ততদিন অবধি অন্যান্য সমতাগুলির কোনো গুরুত্ব
থাকবে না। এবং সেসব বাস্তব ক্ষেত্রে পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠাও
পাবে না। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি ভারতে নিজেদের অভিব্যক্তি
প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে এবং এমনটি সংবিধানেই উল্লেখিত রয়েছে। এমনকি
সকল নেতা-নেত্রীদেরকেও প্রতিদিন বলতে শোনা যায় যে আমাদের দেশে
নিজেদের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। সাধারণ
দৃষ্টিতে দেখলে মনে হবে যে স্বাধীনতা তো
রয়েছে; কিন্তু
বাস্তবিক দিক দিয়ে দেখতে চাইলে নিজেকে প্রশ্ন করুন, সত্যিই
কি আমার মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে? তবেই আপনি জানতে
পারবেন যে তা নেই। এখানে যাদের কাছে অধিক সম্পদ রয়েছে তাদেরকেই
অধিক স্বাধীন হিসেবে দেখতে পাওয়া যায়। আর যাদের
কাছে কিছুই নেই তারা না কিছু বলতে পারে না কিছু করতে পারে। তারা যদি
কিছু বলার প্রচেষ্টাও করে তবে সরকারই সর্বপ্রথমে তাদের জেলের ভেতর আবন্ধ করে রাখে। এমনকি বন্দীদশার
পূর্বেই যা ঘটবে তা হচ্ছে যাদের কাছে সম্পদ রয়েছে তারা ওদের মুখ খুলতেই দেবে না। পুলিশ প্রশাসনও
অধিকাংশ ক্ষেত্রে অর্থবানদের কথাই শুনবে। এইসব আমরা
স্বাভাবিক বিষয় বলেই জানি। এক্ষেত্রে
আপনি আর্থিক সমতা ছাড়া কিছুই করতে পারবেন না। এবং ততদিন
অবধি এই অবস্থা এমনিই থাকবে। আপনি যতই
কড়া আইন প্রণয়ন করুণ না কেন। দেখুন আইন
প্রণয়নকারীরা তো মানুষই হবেন তাই না? যেহেতু অর্থের মাধ্যমেই
সকল সুখসুবিধা উপভোগ করা যায় সেখানে পুলিশ কেন অর্থবানদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করে
নিজেরা বিত্তশালী হতে চাইবে না? কেন তারা সকল সুখসুবিধা
উপভোগ করতে চাইবে না? আপনিই বলুন কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি কি নির্ধন
হয়ে জীবন কাটাতে চাইবে? তাদের আপনি যতই
বোঝানোর চেষ্টা করুন না কেন তোমার দরিদ্রতার কারণ হচ্ছে তোমার পূর্বজন্মের ফল, সরকার এইজন্য
দায়ী নয় ইত্যাদি। বাস্তবে আপনি এই বিষয়টি দেখে নিতে পারেন
যে আর্থিক সমতা ছাড়া অন্যান্য সমতাগুলির কোনো গুরুত্ব থাকে না। আর্থিক
সমতার ভিত্তিতেই অবশিষ্ট সমতাগুলি গুরুত্ব এবং মূল্য বহন করে। আপনি যদি
অন্যান্য সমতাগুলি সকলকে প্রদান করে আর্থিক দিকটি বাদ রাখেন তাহলে দেখতে পাবেন যে আর্থিক
সামঞ্জস্য ছাড়া অবশিষ্ট ক্ষেত্রে কোনো সমতা বাস্তবে রুপায়িত হবে না। যদি আর্থিক
সমতা থাকে তবেই অন্য সকল সমতা বাস্তুব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাহলে জীবনে
আর্থিক সমতাই প্রথম এবং প্রধান। সর্বপ্রথমে
এই বিষয়েই কথা বলা উচিত। ধনবান ব্যক্তি নিজ
স্বাধীনতায় যে কোনো পেশায় প্রবেশ করতে পারে, কিন্তু
একজন দরিদ্র ব্যক্তির কাছে কি সেই স্বাধীনতা রয়েছে? সে কি নিজের
ইচ্ছেমত যে কোনো পেশা নির্বাচন করতে পারে? আপনি বলবেন
সংবিধানে তো উল্লেখ রয়েছে। বাস্তব ক্ষেত্রে
বিত্তশালী ব্যক্তিদের মত ইচ্ছে অনুযায়ী যে কোনো পেশা নির্বাচন করার স্বাধীনতা দরিদ্রদের
কাছে রয়েছে? আপনি এবার বলবেন নেই। আশা করি
এটুকু আপনি বুঝে গিয়েছেন যে আর্থিক সমতা ছাড়া অন্য কোনো সমতা বাস্তবে রূপায়িত করা সম্ভব
নয়। আপনি সংবিধানে যতই লিখুন না কেন, যতই সকাল-সন্ধ্যা
ঐক্যতার সঙ্গীত শোনান না কেন। সংগঠন করুন, কবিতা শোনান, ধর্মঘট
করুন, উপদেশ দিন, মানে যা
ইচ্ছে করুন এতে কোনো সমাধান আসবে না। শুধুমাত্র
আর্থিক সমতা প্রদান করে দিন, দেখবেন অন্য সমতাগুলি
আপনিই প্রতিষ্ঠিত হতে থাকবে। অন্যান্য
সমতাগুলি হচ্ছে আর্থিক সমতারই পরিণাম। অন্যান্য
সমতাগুলি উৎপন্ন হবার মূল শর্তই হচ্ছে আর্থিক সমতা। বলতে
গেলে অবশিষ্ট সব সমতাগুলির জননী হচ্ছে আর্থিক সমতা। আর্থিক
স্বাধীনতাই সকল স্বাধীনতাগুলিকে জন্ম দেয় এবং সক্রিয় রাখে। আর্থিক
স্বাধীনতা না থাকার অর্থ হচ্ছে অবশিষ্ট সব স্বাধীনতা নষ্ট হয়ে যাওয়া। আসুন এবার
এই বিষয়টিকে সর্বাগ্রে রেখে আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যাই। যেন আর্থিক
সমতা বা একতা চলে আসে। উদাহরণস্বরূপ ধরে
নিন বর্তমান সময়ে জীবন-যাপনের সকল সুখসুবিধাসমেত
একজন ব্যক্তির ২০ লাখ টাকায় হয়ে যায়। তাহলে প্রতিটি
ব্যক্তির জন্য ২০ লাখ টাকা অবধি সীমা সরকার নির্ধারণ করে দেবে। এই সীমা
অনুযায়ী মানুষ প্রয়োজনীয় বস্তু অর্ডার করতে থাকবে। সরকার তা
উৎপাদন করতে থাকবে এবং পৌঁছে দিতে থাকবে। এর ফলে
সকল মানুষের জীবনস্তর সমান থাকবে। জীবনযাপনের
সমস্তরকম সুখ উপভোগের জন্য প্রথমে অর্থ উপার্জন করে নিই তারপর ভোগ করব– এমনতর অপেক্ষার
কি প্রয়োজন? বন্ধুরা, উপরে উল্লেখিত
ব্যবস্থাকে যদি আমরা গ্রহণ করে নিই তাহলে কোনোপ্রকার অপেক্ষা ছাড়াই আমরা সমস্ত রকমের
ঈপ্সিত সুখ উপভোগ করতে পারব। সকল প্রকার
আরামদায়ক জীবন প্রথম দিন থেকেই উপভোগ করতে পারব। এতে আমাদের
কাছে অর্থ থাকুক বা না থাকুক। অর্থাৎ
আপনার কাছে অর্থ আছে কি নেই তার জন্য সুখ উপভোগের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য আসবে না। অবিরত আপনার
ইচ্ছেপূরণ হতে থাকবে। অর্থাৎ আপনি সর্বদা
সুখী অবস্থায় থাকবেন। এই প্রকার
নীতির ফলে সকলেই সমস্তরকমের সুখসুবিধা সর্বদা পেতে থাকবে। ক্রমিক
নম্বরের ভিত্তিতে সকলের অর্ডার অনুযায়ী ভোগ বিষয়ক বস্তু এবং পরিষেবা তাদের ঠিকানায়
পৌঁছে যেতে থাকবে।
এমন ব্যবস্থা শুরু হবার পর আর কাউকে ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হবে না। কেননা তার
বর্তমান এবং অতীত সুখময় হয়েই থাকবে। সকলের বর্তমান
সুখময় হলে অতীত অর্থাৎ সকল স্মৃতি সুখময় হবে এবং যখন তাদের সকল স্মৃতি সুখময় হবে তখন
ভবিষ্যতেও তারা সুখের কল্পনাই করবে। কেননা অতীতের
মন্দ স্মৃতির কারণেই ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা হয়। যার ফলে
মানুষ সর্বদা দুশ্চিন্তায় থাকে। বর্তমানে
যদি তার কাছে সুখ থেকেও থাকে ভবিষ্যতের প্রতি দুশ্চিন্তার কারণে তা সঠিকভাবে ভোগ করতে
পারে না। মানুষ ভবিষ্যতের চিন্তা করবে নাকি বর্তমান
সময়ের সুখ উপভোগ করবে? কেননা বেঁচে থাকতে হবে তো বর্তমান সময়কে
কেন্দ্র করেই তাই না? আবার ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা বর্তমান সময়কে
নিয়েই তো ঘিরে রয়েছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তাগ্রস্ত
ব্যক্তি বর্তমান সময়েও সঠিকভাবে জীবন-যাপন করতে পারে না। তাই নতুন
ব্যবস্থা এলে ভবিষ্যতের জন্য আর দুশ্চিন্তা উৎপন্নই হবে না। যার ফলে
সকলে বর্তমান সময়ে সুখের সাথে জীবন-যাপন করতে থাকবে। এরপর কাউকে
বর্তমান সময়ে সুখী হয়ে জীবন-যাপন করার জন্য ধ্যান, সাধনা, সমাধি ইত্যাদির
প্রয়োজন পড়বে না। ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কবলে পড়ে মানুষ
সর্বদা ভাবতে থাকে অর্থ এইভাবে রোজগার করব নাকি অন্যভাবে রোজগার করব; তার জন্য
আইন ভঙ্গ করতেও বাধ্য হয়ে যায় এবং অপরাধী হয়ে যায়। এরপর দুর্দশাগ্রস্ত
হবার এক অনন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়। অনেক সময়
মানুষ আত্মহত্যা পর্যন্ত করে ফেলে। অথবা তথাকথিত
আধ্যাত্মিক পথে চলাচলের চেষ্টা করতে থাকে। নানা প্রতিকূলতার
মধ্যে ত্যাগ, তপস্যা, স্বর্গ
লাভের কল্পনা, এই সাধনা সেই সাধনা, এই ধর্ম
সেই ধর্ম ইত্যাদি পথে জীবন-যাপন করার চেষ্টা করতে থাকে। যেখানে
সে অধিক হতাশার সম্মুখীন হয়। সমস্যা
যেখানে বাইরের জগতে রয়েছে সেখানে সমাধানের চেষ্টা করছে ভেতরে। এতে সফলতা
অর্জন করা সম্ভব নয়। বর্তমান সময়ের নির্বোধ
আধাত্ম বলছে বাহ্যিক জগতে তো আমরা কিছু করতে পারব না। তার কারণ
বাহ্যিক জগতে কি করব তা তো মূলত বুঝতে পারা যাচ্ছে না। কিন্তু
অভ্যন্তরীণ জগতে কিছু একটি করে কমপক্ষে আশার তো সঞ্চার হবে এই ভেবে যে হয়তো বা এই জীবনে
নয় পরবর্তী কোনো জীবনে যদি সমাধান পেয়ে যাই। এই জগতে
না হোক স্বর্গ, বৈকুণ্ঠ, জান্নাত
ইত্যাদির আশা তো উৎপন্ন হয়ই তাই না? সুতরাং নতুন ব্যবস্থা
প্রতিষ্ঠিত হলে আর কাউকে তার পরিবারের ভরণ পোষণের দুশ্চিন্তায় আত্মহত্যা করতে হবে না। কাউকে চুরি
করার জন্য বাধ্য হতে হবে না অথবা কারোর সন্তানকে অপহরণের জন্য ভাবতে হবে না। এমনকি
সন্তান অপহরণ নিয়ে যাদের ভয় রয়েছে সেই ভয়ও দূর হয়ে যাবে। অন্য কিছু
চুরি হবার আশঙ্কাও অর্থহীন হয়ে যাবে। আবার সুখসুবিধা
নিয়েও তো মানুষ একে অপরের সাথে লড়াই-সংঘাত করে থাকে। এসবেরও
কোনো প্রয়োজন থাকবে না। তাহলে লড়াই, দাঙ্গা, সংঘাতের
ভয়ও আমাদের জীবন থেকে পাকাপাকিভাবে বিদায় নেবে। সকলের জীবনে
সুখ-শান্তি বজায় থাকবে। কাউকে কোনো
মিথ্যে কথা বলতে হবে না। নিজের সুখ-শান্তির
জন্য কোনো পূজা করতে হবে না, কোনো ধ্যান করতে
হবে না, দরজার উপরে লেবু-লঙ্কা ইত্যাদি
ঝোলাতে হবে না, নামাজ পড়তে হবে না, মন্দির, মসজিদ, গির্জা, গুরুদ্বারে
গিয়ে প্রার্থনা বা উপাসনা করতে হবে না। এরপর সমাজে
আপনি কোনো ভিখিরিও খুঁজে পাবেন না। কাউকে দান-দক্ষিণা
দেবার বা নেবার প্রয়োজন পড়বে না। সকলে নিজের
পায়ে দাঁড়াবে। এমনকি সমাজের সকল মানুষ সে শিশু হোক বা বৃদ্ধ, স্ত্রী
হোক বা পুরুষ, সকলেই স্বাবলম্বী হবে এবং সকলের জীবন-যাপনের
স্তর সমান থাকবে। কেউ কারোর উপর ঋণী থাকবে না। কারোরই
কোনোপ্রকার আর্থিক সাহায্যের প্রয়োজন হবে না। যার ফলে
সকলের জীবনে স্বাভাবিকভাবে সত্যতা থাকবে, প্রেম থাকবে, ন্যায় থাকবে, পুণ্যতা
থাকবে। এমনকি লড়াই বা দাঙ্গারও কোনো প্রয়োজন থাকবে
না। সকলে তখন সত্য কথাই বলবে কেননা মিথ্যে বলার কোনো কারণ
বা অর্থ আর থাকবে না। সকলে নিজেদের মধ্যে
প্রেমপূর্ণ মনোভাবই বজায় রাখবে কেননা কাউকে হিংসা করার তো কোনো কারণ থাকবে না। আর কাউকে
বলে দিতে হবে না সর্বদা সত্য কথা বল, সকলেকে প্রেম কর, দীন-দুঃখীকে
দয়া কর ইত্যাদি। এরপর সকলে আপনিই নৈতিকতার সাথে জীবন-যাপন
করতে থাকবে কেননা যেসব কারণে মানুষ অনৈতিক জীবন-যাপন করে
সেইসব কারণ তো আর উৎপন্নই হবে না। সকলে মূলত
মানুষ হিসেবে ভালই হয়। কোনো কারণে বাধ্য
হয়ে বা ফেঁসে গিয়ে অথবা পরম্পরাগতভাবে ভুল কর্ম করে থাকে। যদি আপনি
মনোযোগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন তাহলে দেখবেন যে জগতের সমস্ত সন্ত্রাসবাদ এবং সকল প্রকার
অনৈতিক পথ বেছে নেবার অথবা একে অপরকে দুঃখী করার কারণ হচ্ছে মানুষের কাছে সুখী হবার
জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ নেই। মানুষকে সেইসব সম্পদ
অপরের কাছে থেকে লুণ্ঠন করে দুঃখ দেবার বিভিন্ন প্রক্রিয়া গ্রহণ করতে হয়। দুঃখী এবং
দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের কাছ থেকে আপনি আর কিই বা আশা করতে পারেন। মানুষ যেখানে
স্বয়ং অসুখী সেখানে কীভাবে সে অন্যের উপর পুষ্পবৃষ্টি করবে? তা করতে
পারে না। যার কাছে দুঃখ থাকবে সে তো অন্যকে দুঃখই
ভাগ করে দেবে। সুখ ভাগ করে দেবার জন্য প্রথমে নিজের কাছে
সুখ থাকা তো জরুরী। নতুন সরকার যেখানে সমস্তরকম ব্যবস্থা সহজভাবে
সকলের জন্য প্রদান করে দেবে যেমনটি আমি উপরে বর্ণনা করেছি। সেখানে
কাউকে দুঃখ দেবার আর কোনো কারণ থাকবে না। একথা আপনারা
সহজেই বুঝে নিতে পারেন।
মানুষ কি ভাল অথবা মন্দ হয়?
যদি আমরা নিজের
ভেতরে উঁকি দিই তাহলে দেখব যে কখন আমরা অপরকে দুঃখ দিয়েছি বা দুঃখ দেবার কথা ভেবেছি। যখন সোজা
পথে সুখ আসে না তখনই কেবলমাত্র আমরা বাঁকা পথ ধরে নিয়েছি। একটি কথা
আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন যে ‘সোজা আঙ্গুলে
ঘি না উঠলে আঙ্গুল বাঁকা করে নিতে হয়’। এর অর্থ
হচ্ছে প্রথমে মানুষ সোজা আঙ্গুলে ঘি বের করার চেষ্টা করে। অর্থাৎ
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী চলার চেষ্টা করে। কিন্তু
তাতে যদি সফল না হয় তখন সংবিধানের বিপরীত পথ ধরে নেয়। সমাজে এইসব
বিষয়কে আমরা বিভিন্ন অপরাধের নামে জেনে থাকি। যে কোনো
দেশে এবং যে কোনো কালে মানুষ এভাবেই জীবন কাটিয়ে এসেছে। প্রথমে
মানুষ সংবিধান অনুযায়ী জীবন কাটানোর সাধ্যমত চেষ্টা করে। এমনকি
সংবিধানে যদি কোনো কঠোর নিয়মও থাকে তাহলেও মানুষ প্রথমে সেইমত চলাচলের চেষ্টা করে থাকে। সেখানে
তাকে অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতারও সম্মুখীন হতে হয়। তারপরও
মানুষ চেষ্টা করে যায়। যখন অসম্ভব মনে
হয় তখন অপরাধের পথ গ্রহণ করে সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে যায়। বর্তমান
ব্যবস্থায় এছাড়া অন্য কোনো উপায়ও নেই। যেখানে
১,০০০ মানুষের সুখ প্রয়োজন সেখানে সুখ রয়েছে কেবলমাত্র ১০ জন মানুষের
জন্য। যেখানে ১,০০০ মানুষের জন্য
কর্মসংস্থান প্রয়োজন সেখানে কর্মসংস্থান রয়েছে কেবলমাত্র ১০ জন মানুষের জন্য। সরকার ১০
জনকে তো কর্মসংস্থান দিয়েছে কিন্ত অবশিষ্ট ৯৯০ জনকে ছেড়ে দিয়েছে তাদের নিজেদের পরিস্থিতির
উপর। একবারও খেয়াল করেনি যে কোন বাড়িতে চাল আছে কোন বাড়িতে
নেই। অথবা কারোর বাড়িতে কোনো শিশু অসুস্থ্য রয়েছে কিনা, কারোর পিতামাতা
কোথাও অসহায় অবস্থায় পড়ে রয়েছে কিনা ইত্যাদি। দুর্দশায়
জর্জরিত মানুষ তারপরও যেমন তেমন করে দরিদ্রতার সাথে মানিয়ে চলার চেষ্টা করে। কিন্তু
দরিদ্র অবস্থায়, অসহায় অবস্থায় কে কতদিন আর সৎ হয়ে থাকতে
পারে? প্রেমপূর্ণ মনোভাব নিয়ে চলতে পারে? সততা বজায়
রেখে চলতে পারে? হয়তো বা হাতে গোনা কিছু মানুষ জর্জরিত অবস্থাতেও
অন্যকে প্রতারণা করে না। যদিও বেশীরভাগ মানুষ
অসহায় অবস্থায় একটা সময় পর ভুল পথ ধরে নিতে বাধ্য হয়। এরপর আমরা
আবার তাদেরকেই দোষারোপ করে থাকি। এটি তো
কোনো সুবিচার হল না। কয়েকজন লোক মিলে
তো সমাজ তৈরি হয় না। সমাজ সকলে মিলে
তৈরি হয়। সেখানে শক্তিশালীরা থাকে, দুর্বলরা
থাকে, শিশুরা থাকে, মহিলারা
থাকে। বলার অর্থ হচ্ছে বিভিন্ন প্রকারের মানুষজন থাকে। তাই সঠিক
ব্যবস্থাই হচ্ছে একমাত্র বিকল্প উপায়। ত্রুটিপূর্ণ
ব্যবস্থায় সকলের কাছে নৈতিকতা আশা করা উচিত নয়। ইতিহাসেও
এই প্রকার অভিজ্ঞতার প্রমাণ রয়েছে। নৈতিকতাকে
‘একটি সঠিক ব্যবস্থার পরিণাম’ হিসেবে বুঝে নেওয়া উচিত। অথবা সঠিক
ব্যবস্থার মাপকাঠি হিসেবে বুঝে নেওয়া উচিত। যদি সমস্ত
সততা বা নৈতিকতা মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে সঞ্চারিত হয় তাহলে বুঝতে হবে ব্যবস্থা
সঠিক রয়েছে। নাহলে বুঝতে হবে ব্যবস্থায় কোথাও না কোথাও
ত্রুটি রয়েছে। তাই প্রথমে ব্যবস্থাকেই সঠিক করে নেওয়া উচিত। যখনই ব্যবস্থা
সঠিক হয়ে যাবে তার পরিণামস্বরূপ নৈতিকতাও আপনিই চলে আসবে। কেননা নৈতিকতা
বা অনৈতিকতা কোনো না কোনো ব্যবস্থারই পরিণাম। তাকে জোর
করে নিয়ে আসতে হয় না। সে আনন্দের সাথে
আপনিই চলে আসে। বর্তমান ব্যবস্থায় এটি নিশ্চিত যে ৯৯০ জন
সুখ থেকে সর্বদা বঞ্চিতই থাকবে।
১০ জন সম্পদশালীর মধ্যে নিজের নম্বর চলে আসবে এমনটি অসম্ভবই মনে হয় সকলের কাছে। আর যদি
এসেও যায় তবে অবশিষ্ট ৯৯০ জন থেকে সর্বদা ভয়ে ভয়ে থাকতে হবে এই ভেবে— যে কোনো সময় তারা দল বেঁধে আমার সম্পদ লুণ্ঠন করে নিতে
পারে। এবার বন্ধুরা বুঝে নিন যে, কোনোকিছু
পেয়ে গেলেও তা চলে যাবার ভয় সর্বদা থেকেই যায়। কঠোর পরিশ্রমের
পর, অসৎ পথে অথবা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে যে
১০ জন যা কিছু সুখসুবিধা পেয়েছে, সমাজের চোখে এইসব
সফল মানুষও তাদের অর্জিত সুখসুবিধা ঠিকমত উপভোগ করতে পারে না। কেননা তারা
এই ভেবে সর্বদা দুশ্চিন্তায় থাকে যে কি জানি এই সুখসুবিধা কতদিন আমাদের কাছে থাকবে। কবে কেউ
এসে এইসব ছিনিয়ে নিয়ে চলে যাবে কে জানে। কেননা বহু
মানুষ লুণ্ঠনের চেষ্টায় লেগে রয়েছে। কি জানি
কখন তারা সফল হয়ে যায়। আত্মীয় বন্ধুদের
উপরও সর্বদা সন্দেহ লেগেই থাকে এই ভেবে যে, কি জানি
কে কখন প্রতারণা করে ফেলে। এই কারণে
তাদের সাথেও সম্পর্ক এক সন্দেহজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলে। ফলে যেটুকু
সুখসুবিধা তাদের কাছে থাকে সেটুকুও ভয়ে ভয়ে উপভোগ করে। এমন অবস্থায়
মানুষ অনেক সময় বলে থাকে যে সুখ নিজের সাথে দুঃখও বয়ে নিয়ে আসে। যদিও একথা
সত্য নয়। শুধুমাত্র ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার কারণে এইসব
ঘটে চলেছে। এইভাবে কেউ কখনো সুখী হতে পারে না। আরেকটি
কথা হচ্ছে কিছু মানুষ ভালভাবে কাটাবে এবং অবশিষ্ট সকলে দিনহীনভাবে কাতরাতে থাকবে এমনটিও
তো কারোর ভাল লাগবে না। শেষপর্যন্ত আমরা
সকলে তো মানুষ তাই না? জন্ম থেকে কোনো মানুষ অসৎ হয় না। পরিস্থিতিই
মানুষকে বাধিত করে অসৎ পথে ঠেলে দেয়। যদিও একথা
সত্য যে কিছু মানুষ প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও অনৈতিক পথ গ্রহণ করে না। তারা সমস্ত
দুঃখ সহ্য করে চলে। বাস্তবে সামান্য কিছু মানুষই এমনভাবে চলতে
পারে। এটি নিশ্চিত যে তাদেরকে অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য
করতে হয় যা তারা চায় না। এমনকি তাদের পরিবারের
সদস্যরাও এমন কষ্টের জীবন চায় না। নীতিবান
মানুষদের বাড়ি গিয়ে দেখলে জানা যাবে তাদের পরিবার কত না দুঃখে রয়েছে। তাদের
নিজেদের আত্মীয় পরিজনরাও এইসব নীতিবান মানুষদের তিরস্কার করতে থাকে। যদিও এইসব
স্বল্প মানুষদের দ্বারা জগৎ চলে না। তাহলে তো
ঈশ্বর অল্প কিছু মানুষদের তৈরি করেই থেমে যেত। এখানে সকলকে
নিয়েই ভাবতে হবে। অধিকাংশই তো সাধারণ মানুষ যারা পরিস্থিতির
ভিত্তিতে সোজা অথবা বাঁকা পথ গ্রহণ করে থাকে।
সিদ্ধান্ত
উপরোক্ত আলোচনা
থেকে এই সিদ্ধান্তই বেরিয়ে আসে যে সমস্তপ্রকার সুখ উপভোগ করার জন্য যদি কোনো সহজ পথ
আমাদের কাছে থাকতো তাহলে কেউ কখনো অনৈতিক পথ নির্বাচন করতো না। কারোর কিছু
হারানোর ভয়ও থাকতো না এবং আমাদের সকলের কাছে সমস্তরকম সুখসুবিধা থাকতো। আমরা সকলে
একে অপরের সাথে সম্পূর্ণরূপে সুখী জীবন উপভোগ করতাম। আপনাদের
এই বন্ধু এমন একটি নীতি এবং এমন একটি ব্যবস্থা অনুসন্ধান করে নিয়েছে যার দ্বারা সকল
সুখসুবিধা সকলের জন্য সমানভাবে গ্রহণীয় হবে। এবার শুধুমাত্র
একটিই কর্ম অবশিষ্ট রয়ে যায় তা হল দ্রুত এই ব্যবস্থাকে সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং
সকলে মিলে তা সরকারি স্তরে প্রতিষ্ঠিত করা। বর্তমানে
যেহেতু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা রয়েছে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমরা জানি জনগণ যে নীতিকে
চাইবে তাই প্রতিষ্ঠিত হবে। তাকে কেউ
বাধা দেবে না। এই নতুন ব্যবস্থানীতি ছাড়াও ভবিষ্যতে আমি
যেসব নীতিপ্রণালী রচনা করব সেসবের প্রতিও যদি কোনো প্রশ্ন উদয় হয়, যেমন— এটি কি করে সম্ভব হবে, এটি তো
অসম্ভব, এটির তো এইস্থানে সমস্যা রয়েছে তবে এমন ব্যক্তিবর্গের
প্রতি আমার সবিনয় অনুরোধ আপনারা প্রথমে আমার সাথে আলোচনা করুন কোথায় সমস্যা রয়েছে। যদি কোনো
ভ্রান্তি বেরিয়ে আসে তবে প্রথমে তা সঠিক করে নিয়ে তারপর সমাজের কাছে উপস্থাপন করা হবে। আপনার এই
মূল্যবান সাহায্য এবং সংযুক্তি সমাজের সুখের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাই ভুল
বের করে পাশ কাটিয়ে চলে যাবেন না বরং আমার সাথে বসে তার প্রকৃত সমাধান খুঁজে পেতে সাহায্য
করুন। যিনি ভুল বের করতে পারেন তিনি সমাধানও বের করতে পারেন। এই ব্যবস্থাকে
যে দেশ গ্রহণ করবে সেই দেশ ৫ বছরের মধ্যে সকল প্রকার সুখসুবিধা দ্বারা পরিপূর্ণ হবে। সেই দেশের
সকল নাগরিক সমস্তপ্রকার সুখের অধিকারী হবে এবং অবিরত সকল প্রকার সুখ পেতে থাকবে। সকলে শিক্ষিত
হবে, সকলের কর্মসংস্থান হবে, সকলের কাছে
সমস্ত রকমের সুখসুবিধাযুক্ত বড় বাড়ি থাকবে, সকল প্রকার
নিরাপত্তা থাকবে। এইভাবে সমস্ত জগৎ এই ব্যবস্থাকে গ্রহণ করে
সকল প্রকার সুখসুবিধা সহজেই উপভোগ করতে পারবে। সুখসুবিধা
পেতে আর অর্থের প্রয়োজন থাকবে না। এই ব্যবস্থা
চলে আসার পর আপনার কাছে অর্থ না থাকলেও আপনি দ্রুত সবকিছু পেয়ে যাবেন। আমি যেসব
নীতিপ্রণালী এই পুস্তকে উল্লেখ করেছি সেসবের ভিত্তি কি তা বোঝার জন্য এই জগৎ সম্পর্কে
প্রথমে জানতে হবে। এই জগৎ কি এবং কেন তৈরি হয়েছে এসব বুঝতে
হবে। পরবর্তী অধ্যায়ে যা কিছু লিখব সেসব শুধুমাত্র বিষয়টিকে
পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বোঝার জন্য রয়েছে। ফলে কেউ
ভুল বুঝবেন না। এই বিষয় নিয়ে এমন কোনো অর্থ করে বসবেন না
যে ইনি আমার ধর্মমত অনুসারে বলছে কি বলছে না— এসব কথায় জড়াবেন না। এটি কেবলমাত্র
ব্যবস্থাকে বোঝার জন্য রয়েছে অন্য কোনো বিষয় নিয়ে নয়। আসুন এবার
এই জগৎকে বোঝার চেষ্টা করি যে এই জগৎ কী এবং কেন নির্মিত হয়েছে। আমি এটিকে
মূল সিদ্ধান্ত বা মূল স্তম্ভ এইজন্যই বলছি কারণ এই ব্যবস্থাসহ সকল নীতিপ্রণালী প্রণয়ন
করার সময় এই উদ্দেশ্যকে ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে ধরে নিয়েই এগিয়ে গিয়েছি। আসুন এবার
সকলে মিলে তা বোঝার চেষ্টা করি।
***

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন