সমুচিত অর্থশাস্ত্র


অধ্যায় ১০

 

সমুচিত অর্থশাস্ত্র

অর্থশাস্ত্রের অর্থ

জীবনের সমস্ত লক্ষ্য পূরণ করার জন্য আমরা সকলে যা কিছু কর্ম করি সেই সমস্ত কর্মগুলির মধ্যে বিভাজন এবং কর্মগুলির পরিণামস্বরূপ যা কিছু ফলাফল অথবা ভোগ উৎপন্ন হয় তাদের বিভাজন করার জন্য যেসব নীতিনিয়ম নির্ধারণ করা হয়ে থাকে তাকেই অর্থশাস্ত্র নামে জানা যায় অর্থশাস্ত্রের অর্থ এর চেয়ে অতিরিক্ত বলে কিছু হয় না অর্থশাস্ত্রকে এখন এতটাই কঠিন বানানো হয়েছে যে সাধারণ মানুষ এটিকে বুঝতেই পারবে না অর্থশাস্ত্রকে যেখানে অনেক সরল হওয়া উচিত ছিল যদি অর্থশাস্ত্র সরল না হয় তবে তো সকলে বুঝতে পারবে না আর যদি সকলে বুঝতেই না পারে তবে পালন করবে কীভাবে? যখন পালন করা হবে না তখন প্রত্যাশিত পরিণাম কীভাবে আসবে? যখন প্রত্যাশিত পরিণাম আসবে না তখন এমন অর্থশাস্ত্রের অর্থ কি? যেখানে অর্থশাস্ত্রই হচ্ছে কোনো ব্যবস্থার মূল ভিত্তি যে সমাজের অর্থশাস্ত্র যেমন হয় সেই সমাজের আর্থিক পরিস্থিতিও সেইরূপ হয় যদি সমাজের আর্থিক অবস্থা সঠিক না থাকে তবে সকলে সম্পূর্ণরূপে সুখী কেমন করে হবে তাই না? এর অর্থ হবে যে সেই সমাজ অর্থশাস্ত্র নয় বরং অনর্থশাস্ত্রকে গ্রহণ করে নিয়েছে এবার নীচে দেখবেন যে কতটা সরলভাবে আমি এই বিষয়ের বর্ণনা করব এতই সরলভাবে যে আপনি তা সহজেই বুঝে যাবেন এমনকি পালন করাও ততটাই সহজ হয়ে যাবে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার এমনটি বলতে থাকে যে আমাদের কাছে অধিক কর্মসংস্থান নেই তাই এ বছর আমরা অল্প কিছু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব কারণ বেতন প্রদানের জন্য আমাদের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ নেই ইত্যাদি বিষয় আপনি শুনে থাকবেন অর্থের অভাবের কারণে সরকার কর্মসংস্থান উৎপন্ন করতে পারছে না আর কর্মসংস্থান উৎপন্ন না করতে পারার অর্থ হচ্ছে সরকার সেই সকল অত্যাবশ্যক কর্মগুলি সম্পাদন করতে পারছে না যার ফলস্বরূপ সকলে সমস্তরকম সামাজিক সুখসুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অর্থাৎ সমাজ দুঃখপূর্ণ জীবন অতিবাহিত করছে আর সকল সমস্যা কেবলমাত্র এইজন্য দেখা দিয়েছে যে সকল সরকার যে অর্থশাস্ত্রকে গ্রহণ করেছে তা অর্থশাস্ত্রই নয় বরং অনর্থশাস্ত্র তা নাহলে অর্থশাস্ত্রের মধ্যে আবার অর্থের অভাব কি করে হয়? অর্থশাস্ত্রই যখন ভুল তখন সেই অর্থশাস্ত্র অনুসারে সরকার যেসব নীতিপ্রণালী নির্মাণ করবে তাতে ক্ষতিকারক ফলাফলই উৎপন্ন হয়ে থাকবে যার কারণে সরকারের কাছে সবকিছুরই অভাব অনুভব হতে থাকে নিন্মে আপনি বুঝতে পারবেন যে কর্মসংস্থান আমাদের কাছে এত অধিক পরিমাণে রয়েছে যে তা সম্পাদনের জন্য মানুষের অভাব হয়ে যাবে আসুন প্রথমে তা বুঝে নিই যে কর্মসংস্থান এবং পেশা বলতে এখানে কি বোঝানো হয়েছে একে কি ভিন্নভাবে উৎপন্ন করতে হবে? অথবা এটি কি মনুষ্য জন্মের সাথে সাথে আপনিই উৎপন্ন হতে থাকবে? কর্ম যেহেতু মানুষের জন্যই প্রদান করা হয়ে থাকে এবং মানুষেরই উপভোগের প্রয়োজন হয় তাই উপভোগের প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্যই কর্ম উৎপন্ন হয়ে থাকে এইজন্য যত মানুষ হবে ততই ভোগের প্রয়োজন হবে আর যত ভোগের আবশ্যক হবে ততই কর্ম সম্পাদনের আবশ্যক হবে জনসংখ্যা, ভোগ ও কর্মের মধ্যে এটিই হচ্ছে মূল চক্র এই চক্র অনুসারে সমাজে কর্ম কখনও অধিক হবে না অভাবও হবে না অর্থাৎ যত মানুষ তত কর্ম এবার এই কর্ম কি তাকে বুঝে নিই

 

কর্মের পরিভাষা

জীবনের পরম উদ্দেশ্য হচ্ছে সর্বদা সুখী অবস্থাকে উপভোগ করা অথবা এক কথায় বললে তা হচ্ছে সুখ ভোগ করা অর্থাৎ সকল প্রকার ইপ্সিত ভোগের নিরন্তর পূর্তি সকল প্রকার ভোগ উৎপাদন করতে হয় প্রকৃতি থেকে তা সরাসরি উৎপন্ন হয় না এইসব ভোগ উৎপাদন করার জন্য আমরা যে শ্রম করি তাকেই কর্ম বলা হয় আর এই কর্ম পরস্পর মনুষ্য দ্বারা নিজের জন্য এবং অপরের জন্য সম্পাদন করা হয়ে থাকে জনসংখ্যার ভিত্তিতে কর্মের উৎপত্তি স্বয়ং হতে থাকে অর্থাৎ যত মানুষ তত কর্ম, যত কর্ম তত ভোগ, যত ভোগ তত সুখ এইজন্য না কর্মের অভাব হবে না ভোগের আর এর থেকেই সকলের জীবনের পরম উদ্দেশ্য পূরণ হতে থাকবে একটি উদাহরণ দিয়ে বুঝে নিই যতদিন ঘরে একজন ব্যক্তি ছিল ততদিন অবধি ততটুকুই কর্মের প্রয়োজন ছিল এরপর সেই ব্যক্তির বিবাহের পর দুটো ব্যক্তি হল এবার দুটো ব্যক্তির জন্য কর্মও বেড়ে গেল এবং সেই কর্ম সম্পাদন করার ব্যক্তিও বেড়ে গেল তাহলে প্রথমে একজন ব্যক্তি ছিল এবং একজনের কর্ম ছিল এরপর দুজন ব্যক্তি হল তাই দুজনের কর্ম উপস্থিত হল এরপরে একজন সন্তানের জন্ম হলে কর্মও বেড়ে যাবে এইভাবে জনসংখ্যার ভিত্তিতে কর্মের কম বেশী হয়ে থাকে জনসংখ্যা কম হলে কম কর্ম এবং জনসংখ্যা অধিক হলে অধিক কর্ম

 

এই সকল কর্ম এবং ভোগের মধ্যে পরস্পর বিভাজন কীভাবে হবে যেন সকলেই তাদের কর্ম এবং ভোগ ন্যায়পূর্ণভাবে পেতে থাকে, এই বিষয়টি অধ্যয়নের জন্যই অর্থশাস্ত্রের প্রয়োজন হয় আসুন এবার এই অর্থশাস্ত্রকে অধ্যয়ন করি

 

জ্ঞান, কর্ম এবং ভোগ কী?

জ্ঞান, কর্ম ও ভোগকে এইভাবে বুঝে নিন যে আমাদের জীবনে এদের প্রয়োজনীয়তা কী? গুরুত্বই বা কি? আমাদের শরীরে পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয় রয়েছে যাদের মাধ্যমে আমরা কোনো বিষয়ের ভোগকে অনুভব করতে পারি যেমন কানের দ্বারা বিভিন্ন প্রকার সংগীত শ্রবণ এবং অপরের কথা শুনে তা ভোগ করতে পারি ত্বকের দ্বারা বভিন্ন প্রকার স্পর্শ ভোগ করতে পারি চোখের দ্বারা বিভিন্ন প্রকারের রং, রূপ, দৃশ্য ইত্যাদি ভোগ করতে পারি জিভ দ্বারা আমরা বিভিন্ন প্রকার স্বাদ ভোগ করতে পারি এইভাবে নাসিকা দ্বারা আমরা বিভিন্ন প্রকার সুগন্ধকে ভোগ করতে পারি এভাবে আমরা বুঝে নিতে পারি যে নিজেদের এই পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সহস্র প্রকারের ভোগকে উপভোগ করে সেই বিষয় সম্পর্কিত সুখ প্রাপ্ত করে সুখী হতে পারি তবে এমন মানুষের সাথেও আমার দেখা হয়েছে যারা বলেন সুখী হবার জন্য কোনো ভোগের প্রয়োজন নেই কিন্তু আমি যখন তাদের জীবনকে নিরীক্ষণ করেছি পেয়েছি যে অজ্ঞানতার বশে তারা এইসকল মিথ্যে কথা বলছে বিভিন্ন প্রকার ভোগ প্রাপ্তির জন্য আমি তাদের দিনরাত অনেক প্রয়াস করতে দেখেছি এও দেখেছি যে কখনও অসফল হলে তারা দুঃখও পাচ্ছে আমি যখন তাদের জীবন নিয়ে আমার গবেষণা সম্পর্কে জানালাম তারা নিরুত্তর হয়ে গেলেন কিছু বলতে পারলেন না কিছু ব্যক্তি স্বীকারও করলেন তারা বললেন এমন তো আমরা কথার কথা হিসেবে বলে থাকি কিছু ভোগ না করে কেউ কখনো সুখী হতে পারে কি? যদি আমরা সমাজকে এমন করে না বলি তবে সকলে ভোগের পেছনে নিরন্তর ছুটতে থাকবে, আমাদেরকেও দান-দক্ষিণা ইত্যাদি দেবে না এই প্রকারের অনেক কথা তারা বলতে থাকে এভাবে যদি কেউ বলে ভোগ না করে আমরা সুখী থাকতে পারি তবে কোন কারণে তারা অসত্য কথা বলতে থাকে? মূলত তারা পরমাত্মার সৃষ্টির বিরুদ্ধেই কথা বলার প্রয়াস করে থাকে যে সময় আমাদের এইসব ভোগের প্রয়োজন হবে সেইসময় তাদের উৎপাদনও তো করতে হবে কারণ প্রকৃতি থেকে তো আমরা সকল ভোগ প্রাপ্ত করতে পারব না সেই সকল ভোগ উৎপন্ন করতে আমাদের সকলকে পরিশ্রম করতে হবে না? আমরা কী পরিশ্রম করব, কীভাবে পরিশ্রম করব এইসব জানার জন্য জ্ঞানের প্রয়োজন হবে এই প্রকারে কিছুটা চিন্তন-মনন করে আমরা সকলে বুঝে গিয়েছি যে জ্ঞান, কর্ম ও ভোগের আধারের উপরই সমগ্র প্রক্রিয়া পরিবেষ্টিত রয়েছে যদি ভোগের মাধ্যমে আমরা সুখ ভোগ করি তবে তো কর্মের প্রয়োজন নেই আর যদি কর্মের প্রয়োজন না থাকে তবে জ্ঞান অর্জনের কারণ কী? পশুরা যেমন জ্ঞান-বিজ্ঞান ছাড়া এবং কর্ম ছাড়া বেঁচে থাকে তেমন করে প্রকৃতি দ্বারা প্রদান করা ভোগকে উপভোগ করে নিরাপত্তাবিহীন জীবন কাটাতে হবে আমার বোধ অনুযায়ী কেউই এমনভাবে জীবন কাটাতে চাইবে না তার পরও যদি কিছু ব্যক্তি প্রাকৃতিকভাবেভাবে জীবন-যাপন করতে চায় তবে করতে পারে সে ব্যবস্থা তো শুরু থেকেই সহজলভ্য রয়েছে তার জন্য তো ভিন্নভাবে কোনো কর্ম বা জ্ঞানের প্রয়োজন হয় না কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তো সকল সুখসুবিধাযুক্ত জীবন উপভোগ করতে চায় এর জন্য তো কর্ম এবং জ্ঞানের প্রয়োজন হবে তাদের জন্য সকল সুখসুবিধাযুক্ত একটি সঠিক ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে

 

আরও একটি কথা হচ্ছে জগতে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী এবং সেই অনুযায়ী পালন করা ব্যক্তিরা এটিই বলে প্রচার করে যে ভোগী হবে না ত্যাগী হও এখন তাদের কথা অনুযায়ী যদি সকলে ত্যাগী হতে শুরু করে তাহলে তো ভোগ নির্মাণ করার প্রয়োজনীয়তাই থাকবে না আর যদি ভোগ নির্মাণ করার প্রয়োজনই না থাকে তবে তো কোনো কর্মেরও প্রয়োজন থাকবে না, কোনো জ্ঞান অর্জন করার প্রয়োজন থাকবে না অর্থাৎ কোনোপ্রকার কর্মসংস্থানের প্রয়োজন পড়বে না তাহলে তো সরকারের কাছে কর্মসংস্থানের দাবী জানানোই উচিত নয় এরপর তো সরকারের কোনো দায়িত্ব থাকে না এই ভেবে যে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারল কি পারল না এবং সকলের জন্য ভোগের ব্যবস্থা করতে পারল কিনা ইত্যাদি এরপর আমাদের এটি বলাও বন্ধ করে দেওয়া উচিত যে সরকার আমাদের চাকরি দিচ্ছে না সরকারের কাছে তো চাকরির জন্য খালি পদ তখনই আসবে যখন সরকারের তরফ থেকে কোনো কর্ম করার প্রয়োজন হবে বা কোনো গবেষণা করার প্রয়োজন হবে আর যদি সরকার কোনো কর্ম করে তবে তা থেকে তো ভোগই উৎপন্ন হবে যা আবার আপনারা কেউই উপভোগ করতে চান না কেননা ভোগ করলে তো আমরা পাপী হয়ে যাব চারিদিকে তো ত্যাগেরই শোরগোল চলছে যে সবকিছু ত্যাগ কর যখন সবকিছু ত্যাগই করতে হবে তাহলে তো কর্ম বা জ্ঞানের কোনো প্রয়োজন নেই অর্থাৎ কর্মসংস্থানের কোনো প্রয়োজন নেই তাহলে সরকার কোনো কর্ম করে কী করবে? সুতরাং প্রথমে সকলেকে মিলে এটি ঠিক করতে হবে যে ভোগ করতে হবে না ত্যাগ করতে হবে সহজভাবে বললে আপনারা যদি সকলে ভোগী হতে চান তবেই অধিক কর্ম এবং জ্ঞান অর্জন করার প্রয়োজন হবে তাহলেই অধিক কর্মসংস্থান উৎপন্ন হবে তবেই সরকার আপনাদের সকলকে কর্ম অর্থাৎ জীবিকা প্রদান করতে পারবে। এর অর্থ পরিষ্কার যে আপনারা যতজন ভোগী হবার জন্য তৈরি আছেন সরকার কেবলমাত্র ততজনকেই রোজগার প্রদান করতে পারে তার অধিক দিতে পারবে না তাহলে এর অর্থ স্পষ্ট যে অধিক ভোগের অর্থ হচ্ছে অধিক কর্ম এবং অধিক জ্ঞানের অর্থ হচ্ছে অধিক কর্মসংস্থান অর্থাৎ অধিক সুখ কম ভোগ মানে কম কর্ম এবং কম জ্ঞান, যার অর্থ হচ্ছে কম কর্মসংস্থান অর্থাৎ কম সুখ এবং অধিক দুঃখ কোন বিষয়টিকে জীবনের আধার হিসেবে গ্রহণ করবেন সেই সিদ্ধান্ত আপনাদেরকেই নিতে হবে যদি কম ভোগকে জীবনের আধার হিসেবে গ্রহণ করেন তাহলে আপনি কোনোকিছুর মাধ্যমে অধিক সুখের দাবী করতে পারবেন না যদি আপনি অধিক ভোগকে জীবনের আধার হিসেবে গ্রহণ করেন তাহলে সরকারের কাছ থেকে অধিক সুখের দাবী করতে পারবেন তাহলে মূল কথা এই যে আমাদের প্রথমে পর্যাপ্ত ভোগী হওয়া উচিত এর মধ্যেই জীবনের সমস্ত সুখ লুকিয়ে রয়েছে তাই ভোগ ত্যাগ করার প্রচার-প্রসারকে আমাদের এখন বন্ধ করা উচিত সকল ধর্মের গুরুদের কাছে বিনম্র নিবেদন করা উচিত যে এখন আপনারা ত্যাগ করার জ্ঞান প্রদান করা বন্ধ করুন এবং সমাজকে ভোগী হবার জ্ঞান প্রদান করা শুরু করুন ত্যাগের জ্ঞান থেকে দরিদ্রতা, অশিক্ষা, অজ্ঞানী, অপরাধ, দুঃখ, অশান্তি, অসন্তুষ্টির জীবন গঠিত হয় এবং ভোগের জ্ঞান থেকে সমৃদ্ধি, শিক্ষা, জ্ঞান, সুখ, শান্তি, সন্তুষ্টির জীবন গঠিত হয় এখন আপনার যেমন জীবন চাই সেই হিসেবে আপনি জীবনের আদর্শ তৈরি করুন অর্থাৎ ভোগ অথবা ত্যাগ যেমন চাইছেন সেই অনুযায়ী আদর্শ তৈরি করুন সেইমত ফলাফল আপনি এবং আপনার সমাজের অন্যান্যরা পেতে থাকবে সিদ্ধান্ত আপনার হাতে এই ভোগ, জ্ঞান এবং কর্মকে বাস্তবায়িত করার জন্যই কোনো ব্যবস্থা এবং অর্থশাস্ত্রের প্রয়োজন হয় আরও একটি কথা যে আমাদের দর্শনশাস্ত্রকেও এজন্য উপযুক্ত করতে হবে দর্শনশাস্ত্রকে সঠিক না করে সঠিক অর্থশাস্ত্রের কোনো অর্থ দাঁড়ায় না তাই দর্শনশাস্ত্র বাস্তবিক হওয়া উচিত দর্শনশাস্ত্রকে এমন কপোল কল্পিত হওয়া উচিত নয় যার কোনো বাস্তবিক আধার নেই দর্শনশাস্ত্রের আধার অপার্থিব হওয়া উচিত নয় অপার্থিবের অর্থ হচ্ছে দেখে মনে হবে সুখ কিন্তু বাস্তবে মিলবে দুঃখ তার বাস্তবিক অর্থ এমন হওয়া উচিত যা দেখে মনেও হবে সুখ এবং মিলবেও সুখ স্বর্গ, বৈকুণ্ঠ, জান্নাত ইত্যাদি সব কপোল কল্পনা যার কোনোরূপ বাস্তবিক ভিত্তি নেই আর আশ্চর্যের বিষয় যে বর্তমান দর্শন যে সুখকে পরিত্যাজ্য বলছে স্বর্গ, বৈকুণ্ঠ, জান্নাত ইত্যাদি কাল্পনিক স্থানে সেই সুখকেই আবার মহান বলছে! যে সুখ স্বর্গের মহান প্রতীক জগতের জন্য কেন তারা সেই সুখকে তুচ্ছ বলেন? তাদের কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে উল্টে নাস্তিক বলে উপহাস করেন? তারা বলেন যে আপনার মধ্যে শ্রদ্ধা নেই আপনি হচ্ছেন ভোগী পুরুষ যেন সমস্ত শ্রদ্ধা এই সকল ব্যক্তিরা নিজেদের কাছে একত্রিত করে রেখেছে এখানে ভোগী হওয়া পাপ কিন্তু স্বর্গ, বৈকুণ্ঠ, জান্নাত ইত্যাদি স্থানে ভোগী হওয়া পুণ্য এটি এদের কেমন দু-মুখো মাপদন্ড? একদিকে তারা ব্রহ্মচর্য পালনের কথা বলেন অপরদিকে স্বর্গে বা জান্নাতে বহু অপ্সরা বা হুর এদের চাই এসব উক্ত ব্যক্তিদের এবং আমাদের দর্শনের বিপরীত মাপদন্ড নয় কি? এখানে কেউ সুখের সন্ধান করলে বা সুখের দাবী করলে তারা তুচ্ছ প্রাণী যদি বৈকুণ্ঠে বা জান্নাতে সুখ খোঁজে, আর তার জন্য উপাসনা-প্রার্থনা করে তবে তা হবে মহান! ধর্মগ্রন্থ এবং ধর্ম-জ্ঞানীদের এটি দু-মুখো চরিত্র নয় কি? আসুন এবার আমাদের জীবনে যতপ্রকার সুখ রয়েছে তাদের বোঝার চেষ্টা করি

 

. শারীরিক সুখ

. মানসিক সুখ

. ভাবনাত্মক সুখ

. আত্মিক সুখ

 

তালিকায় অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলির মধ্যে কিছু অতিআবশ্যক বিষয়ের উল্লেখ আছে যাদের ছাড়া জীবনের কল্পনা করা যায় না এইসবকে আমরা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদির নামে জানি আসুন আমরা এবার দেখে নিই যে আমাদের ভোগ সামগ্রী কত প্রকার হয়ে থাকে আমাদের কাছে পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয় রয়েছে যাদের মাধ্যমে নানা প্রকার ভোগ থেকে সুখ উপভোগ করি সেগুলি হল কান, ত্বক, চোখ, জিহ্বা এবং নাক কান দ্বারা আমরা বিভিন্ন প্রকার ধ্বনি শুনতে পাই যেমন শব্দ, সংগীত, কথাবার্তা ইত্যাদি ত্বক দ্বারা আমরা বিভিন্ন প্রকার স্পর্শের সুখ প্রাপ্ত করি যেমন কোমল স্পর্শ থেকে কঠিন স্পর্শ ইত্যাদি চোখ দ্বারা আমরা বিভিন্ন প্রকার সৌন্দর্য সুখ প্রাপ্ত করি যেখানে বিভিন্ন রকমের আকার ও রঙের মেলবন্ধন থাকে জিহ্বা দ্বারা আমরা বিভিন্ন প্রকার স্বাদের সুখ প্রাপ্ত করি যেখানে সকল প্রকার ভোজন, পানীয়, ফল-ফুল ইত্যাদি থাকে এবং নাকের মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন প্রকার গন্ধের সুখ প্রাপ্ত করি যেখানে সকল প্রকার ঘ্রান, সৌরভ ইত্যাদি থাকে যদিও সকল পদার্থের মধ্যে সবরকম বিশেষত্ব থাকে যেমন ভোজনের মধ্যে শব্দ থাকে, রূপ থাকে, স্বাদ থাকে এবং সুগন্ধও থাকে ভোজনের সাথে আমাদের সম্বন্ধ হচ্ছে স্বাদ এবং স্বাস্থ্যের সাথে একইভাবে অবশিষ্ট বিষয়গুলিকেও বুঝে নেওয়া উচিত তাহলে এই ভাবে আমরা সকল পদার্থ থেকে আমাদের ইপ্সিত সুখ প্রাপ্ত করতে পারি এছাড়া কর্মের মধ্যেও নিজস্ব সুখ রয়েছে, জ্ঞান প্রাপ্তির মধ্যেও ভিন্ন সুখ রয়েছে এখন এই সমস্ত ভোগ আবার চার প্রকারের হয়ে থাকে কেননা সমাজে মানুষের মধ্যেও চার প্রকার শ্রেণী রয়েছে সেগুলি হচ্ছে শরীর, মন, ভাবনা এবং আত্মা

 

. শারীরিক স্তরের ভোগ

. মানসিক স্তরের ভোগ

. ভাবনাত্মক স্তরের ভোগ

. চেতনাত্মক স্তরের ভোগ

 

শারীরিক স্তরের ভোগ আমাদেরকে শারীরিক স্তরে সুখ প্রদান করে মানসিক স্তরের ভোগ আমাদেরকে মানসিক স্তরে সুখ প্রদান করে ভাবনাত্মক স্তরের ভোগ আমাদেরকে ভাবনা স্তরে সুখ প্রদান করে আর আত্মিক স্তরের ভোগ আমাদেরকে আত্মার স্তরে সুখ প্রদান করে এই চার প্রকার সুখের মাধ্যমে আমাদের শরীর, মন, ভাবনা বা প্রাণ, আত্মা সুখী এবং সুস্থ্য থাকে আমাদের এই চারপ্রকার সুখেরই প্রয়োজন হয় তবে এদের মধ্যে কোনো এক প্রকার মুখ্য সুখ রয়েছে যা সকলের জন্য থাকে এবং অবশিষ্ট সুখ দ্বিতীয় ও তৃতীয় পদক্ষেপে থাকে যেমন শারীরিক অবস্থাবিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য শারীরিক সুখ হচ্ছে প্রমুখ এবং অবশিষ্ট সুখগুলি দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে থাকবে এইভাবে অবশিষ্ট অবস্থার ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে একইভাবে বুঝে নেওয়া উচিত সবগুলি সুখকে বোঝার জন্য আমি একটি উদাহরণের সাহায্য নিচ্ছি যেন অবশিষ্টরাও বুঝে নিতে পারে উদাহরণ হিসেবে ভোজনকেই নিচ্ছি যারা শারীরিক স্তরের মানুষ তাদের জন্য উচিত মাত্রায় ভোজন গ্রহণ করা জরুরী পেট যেন সঠিক মাত্রায় ভরে এটি তাদের প্রথম উদ্দেশ্য থাকে ভোজন সুস্বাদু হলে আরও ভাল তবে মাত্রা যেন পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে তাদের জন্য ভোজনের মাত্রা পর্যাপ্ত হওয়া উচিত, নাহলে তারা ভোজন থেকে তৃপ্ত হবে না অর্থাৎ কম মাত্রার ভোজন থেকে তারা পূর্ণ সুখের অনুভব করতে পারবে না ভোজন যতই সুন্দর হোক না কেন, যতই সুস্বাদু হোক না কেন অথবা যতই স্বাস্থ্যকর হোক না কেন তাহলে পরিমাণ এদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

 

যারা মানসিক স্তরের মানুষ হবেন তারা স্বাদ অনুভব করার জন্য ভোজন গ্রহণ করেন ভোজন মাত্রায় কম হলেও চলবে কিন্তু সুস্বাদু হতে হবে ভোজন পর্যাপ্ত মাত্রায় রয়েছে কিন্তু সুস্বাদু নয় তবে সেই ভোজন থেকে তারা পূর্ণ তৃপ্তি পাবে না ভোজন যতই স্বাস্থ্যকর হোক না কেন, যতই সুন্দর হোক না কেন, যতই সুস্বাদু হোক না কেন তা হবে মূল্যহীন এদের জন্য স্বাদ হচ্ছে প্রাথমিক শর্ত

 

ভাবনাত্মক স্তরের মানুষ যারা হন তারা সুন্দরের প্রতি অধিক মনোযোগ দেন একবেলা ভোজন কম মাত্রায় হলেও চলবে, কম সুস্বাদু হলেও চলবে কিন্তু সুন্দর হতে হবে যদি ভোজন সুস্বাদু হয়, মাত্রাও পর্যাপ্ত এবং স্বাস্থ্যকরও হয় কিন্তু সুন্দর যদি না হয় তবে সেই ভোজন থেকে পূর্ণ তৃপ্তি অনুভব করবে না তাহলে ভোজন এদের জন্য সুন্দর হওয়া জরুরী

 

চেতনাত্মক স্তরের মানুষ যারা হবেন তাদের জন্য ভোজন স্বাস্থ্যবর্ধক হওয়া জরুরী একবেলা কম মাত্রায় হলেও চলবে, কম সুস্বাদু হলেও চলবে, সুন্দর না হলেও চলবে কিন্তু যদি স্বাস্থ্যবর্ধক না হয় অথবা যদি বাধ্য হয়ে গ্রহণ করতে হয় তবে তা থেকে তাদের তৃপ্তি অনুভব হবে না তাহলে এদের জন্য ভোজনের স্বাস্থ্যবর্ধক হওয়া প্রাথমিক শর্ত তারপর সুন্দরতা, তারপর স্বাদ এবং তারপর পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ

 

তাহলে আমরা বুঝতে পারছি যে চার স্তরের মানুষের জন্য খাদ্যের প্রয়োজন ভিন্ন-ভিন্ন হয়ে থাকে একইভাবে সকল প্রকার ভোগের ক্ষেত্রেও এমনভাবেই বুঝে নেওয়া উচিত কিন্তু সঠিক ব্যবস্থায় ভোজনের সকল গুণ আপনিই এসে যাবে কেননা প্রতিটি বস্তু এবং পরিষেবা সকলের জন্য উচ্চ গুণমানসম্পন্ন এবং বিশুদ্ধ হবে উপরে কেবলমাত্র বিভিন্ন প্রকার মানুষকে বোঝার জন্য আমি ওইসব আলোচনা করেছি যেন বিভিন্ন প্রকার মানুষের দৃষ্টিকোণ আমরা বুঝতে পারি, যেন এটিও বুঝতে পারি যে কীভাবে একইরকম ভোগ থেকে সকলে ভিন্ন-ভিন্ন প্রকারের সুখ অনুভব করে একইভাবে কর্ম এবং জ্ঞানের ক্ষেত্রেও বুঝে নেওয়া উচিত সকলেই নিজেদের অবস্থা অনুযায়ী কোনো না কোনো কর্মে নিযুক্ত হতে চায় যার মাধ্যমে তারা কর্ম করার সুখ প্রাপ্ত করবে যেমন শারীরিক অবস্থার ব্যক্তিরা কৃষি সম্পর্কিত কর্ম করতে চায়, মানসিক অবস্থার ব্যক্তিরা উৎপাদনশিল্প সম্পর্কিত কর্ম করতে চায়, ভাবনাত্মক স্তরের ব্যক্তিরা প্রশাসনিক কর্ম করতে চায় এবং একইভাবে চেতনাত্মক স্তরের ব্যক্তিরা নেতৃত্ব সম্পর্কিত ও গবেষণামূলক কর্ম করতে চায় আর আমরা সকলেই নিজেদের অবস্থা এবং ইচ্ছানুযায়ী কোনো না কোনো জ্ঞান প্রাপ্ত করতে চাই তাহলে ভোগ, কর্ম এবং জ্ঞানের মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন প্রকার সুখ প্রাপ্ত করে থাকি অথবা করতে চাই

 

সত্যিই কি বেকারত্ব বলে কিছু হয়?

সরকার যেমন বলে থাকে আমাদের কাছে কর্মসংস্থান নেই, ভবিষ্যতে আমরা কর্মসংস্থান তৈরি করব এবার দেখে নিই যে সমাজে কর্মসংস্থান কম থাকে নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে এটি বোঝার জন্য উদাহরণ হিসেবে আমরা ধরে নিই এইসময় পৃথিবীতে কেবলমাত্র ১০,০০০ মানুষ রয়েছে ধরুন ৬ জন মিলে একটি পরিবার এই হিসেব মতে ১০,০০০ মানুষ মিলে আনুমানিক ১৬৬৬টি পরিবার তৈরি হয় একটি পরিবারের অর্থ হচ্ছে ২ জন প্রবীণ মাতা পিতা, ২ জন যুবা মাতা পিতা এবং ২ জন ছেলেমেয়ে এবার প্রতি পরিবার পিছু ১ জনের কর্মসংস্থান অর্থাৎ কমপক্ষে ১৬৬৬ জনকে কর্ম অথবা জীবিকা প্রদান করতে হবে তাদের মাধ্যমে ১০,০০০ মানুষের ভোগের নির্মাণ এবং বিতরণ করতে হবে এইভাবে বর্তমান জনসংখ্যাকেও একই অনুপাতে হিসেব করে নিতে হবে আসুন বুঝে নিই এই বিভাজন কীভাবে নির্ধারিত হবে

 

সর্বপ্রথমে জরুরী বস্তু হচ্ছে খাদ্য অর্থাৎ ভোজনকে নিয়ে আলোচনা করি বিভিন্ন প্রকারের ভোজনের অন্তর্গত সম্ভবত ১০ বা ততোধিক প্রকারের শস্য এবং ডাল, ২০ বা ততোধিক প্রকারের সব্জি, ১০ বা ততোধিক প্রকারের তৈল জাতীয় শস্য, ২০ বা ততোধিক প্রকারের মশলা, ২৫ বা ততোধিক প্রকারের ফল ইত্যাদি রয়েছে সব মিলিয়ে ৮৫ বা তার অধিক প্রকারের বস্তু কেবলমাত্র ভোজনের জন্য প্রয়োজন অর্থাৎ যদি ১ জন মানুষ কেবলমাত্র ১টি করে বস্তু উৎপাদন করে তবে ৮৫ জন মানুষকে আমরা কর্ম প্রদান করলাম এ তো গেল কেবলমাত্র ভোজন উৎপাদন এবার এই সকল বস্তুকে বাজারে বিক্রির জন্য মানুষের প্রয়োজন হবে ১টি বস্তু ১ জন মানুষ বিক্রি করলে ৮৫ জন মানুষ প্রয়োজন এ তো গেল উৎপাদন এবং উৎপাদিত বস্তুকে বাজারে নিয়ে আসা এবার আসুন এইসব উৎপাদিত ফসল মিলিয়ে যেসব বস্তু তৈরি হয় সেই বিষয়ে যেমন তেল, মশলা, আলুর চিপস, পাঁপড়, বড়ি, স্যান্ডউইচ ইত্যাদি এইসব বস্তু মিলিয়ে ১০০ বা তারও অধিক হতে পারে তাহলে এখানে ২৭০ জনের বেশী মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়ে গেল। এ তো গেল শুধুমাত্র খাদ্যবস্তু সম্পর্কিত কর্মসংস্থান চাষ-আবাদ করার জন্য যেসব সার, জল, ট্রাক্টর, বীজ, অন্যান্য মেশিনাদি নিয়ে কমপক্ষে আরও ১০০ জনের অধিক কর্মীর প্রয়োজন হবে তাহলে সর্বমোট ৩৭০ জনের কর্মসংস্থান তৈরি হয়ে গেল

 

এবার দ্বিতীয় কর্মে আসি যেমন যেমন জামাকাপড় বিষয়ক কাপড় প্রস্তুতকারক, দোকান অবধি কাপড় পৌঁছানো, বিক্রি করা, সেলাই করা, পরিষ্কার করা, ইস্ত্রি করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে এবার আপনি দেখতে পাচ্ছেন যে কেবলমাত্র একটি কর্ম সম্পূর্ণরূপে সম্পাদন করার জন্যই ২০ জনের বেশী লোকের প্রয়োজন হয় বাজারে এই প্রকার ১০০ বা ততোধিক প্রোডাক্ট রয়েছে তাহলে এই হিসেবে ১০০ প্রোডাক্টের জন্য ২০ জন হলে অবশিষ্ট সব কাজের জন্য মোট ২০০০ জন লোক প্রয়োজনএছাড়াও বাজারে ৫০টির অধিক পরিষেবা ক্ষেত্র রয়েছে যেমন স্বাস্থ্য, সেলুন, বিউটি পার্লার, মনোরঞ্জন ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকারের সাধন

 

এবার আপনি হিসেব মিলিয়ে দেখুন ১০,০০০ জন মানুষের জন্য ৩০০০ জনেরও বেশী লোকের প্রয়োজন যেখানে কেবলমাত্র ১৬৬৬ পরিবারকেই কর্ম বিতরণ করা হচ্ছে এই ভাবে দেখলে আপনি বুঝে যাবেন যে বিভিন্ন প্রকার কর্মের বিতরণ করা কতটা সহজ প্রথমে মানুষকে তাদের যোগ্যতা গ্রহণ করার পূর্ণ সুযোগ দেওয়া এরপর যাদের যেমন প্রকার যোগ্যতা বিকশিত হবে সেইমত তাদের পছন্দ অনুযায়ী সেই প্রকার কর্ম বিতরণ করে দেওয়া সে যেন আনন্দের সাথে সেই কর্মকে সঠিকভাবে সম্পাদন করতে পারে এর পাশাপাশি আমাদের আরও অনেক সুখসুবিধার প্রয়োজন হয়ে থাকে যেমন শিক্ষা, খেলা, আবাস, সড়ক, বিদ্যুৎ, জল, যাতায়াত, ডাক, ব্যাংক, সুরক্ষা, হাসপাতাল, পার্ক ইত্যাদিএইসব কর্ম সম্পাদন করার জন্যও বহুসংখ্যক লোকের প্রয়োজন হবে এখানেও ২০০টির বেশী লোকের সর্বদা প্রয়োজন হবে

 

উপরে আমরা যেভাবে হিসেব করেছিলাম তাতে ১০,০০০ নাগরিক রয়েছে যেখানে কেবলমাত্র ১৬৬৬ লোককেই রোজগার প্রদান করার কথা ছিল এবার আপনি বুঝতে পারছেন যে আমাদের কাছে ৪০০০ জনের বেশী কর্মসংস্থান রয়েছে হতে পারে আমি কোথাও একটু অধিক বলে দিয়েছি তাহলেও তো মোট ১৬৬৬ জন লোকের কর্মসংস্থান নিশ্চিতভাবেই হয়ে যাবে কর্মসংস্থান যতটা থাকবে তা সকলের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া প্রয়োজন এমনটি করা উচিত নয় যে কিছু লোককে অনেক কাজের সুযোগ দিয়ে দেওয়া হল এবং কিছু লোক কর্মসংস্থানের প্রতীক্ষাতেই জীবন কাটিয়ে দিল এমন হলে অবশিষ্টদের সাথে অন্যায় করা হবে না? তাহলে সরকার কেন বারবার বলছে তাদের কাছে কর্মসংস্থান নেই? এর অর্থ এই যে সরকারের কাছে কোনো সঠিক নীতি নেই অথবা সঠিক ম্যানেজমেন্ট নেই যার কারণে সমস্ত ক্ষেত্রে পারদর্শিতার অভাব পরিলক্ষিত হয় এবার চলুন প্রথমে আমরা আমাদের নীতিসমূহকে সঠিক করে নিই সংক্ষেপে বললে এটিই হচ্ছে অর্থশাস্ত্র এখন শুধুমাত্র এটিকে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন এখনো অবধি বিশ্বব্যাপী যতগুলি অর্থশাস্ত্র রয়েছে তাদের কোনোটিই ন্যায়ের আধারে সঠিক বা বাস্তবিক নয় তাহলে এইসব সরিয়ে এমন একটি অর্থশাস্ত্রের সৃজন করি যা প্রতিটি দৃষ্টিকোণ থেকে বাস্তবিক পথে সঠিক হবে মুখ্যত মানুষ তিনপ্রকার সুখ কামনা করে জ্ঞান, কর্ম এবং ভোগ কিছু মানুষ জ্ঞানের মধ্যে অধিক সুখ পায় যেমন বৈজ্ঞানিক বা অন্য কোনো গবেষণায় অধ্যয়নরত অথবা অধ্যাপনার সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা তারা কোনোকিছু জেনে বা গবেষণা করে সুখ পেয়ে থাকে এবং দীর্ঘ সময় সেই কাজে লিপ্ত থাকে সেইসব কাজের প্রতি তাদের গভীর রুচি থাকে এইভাবে কিছু ব্যক্তি কর্মের মধ্যে সুখ পেয়ে থাকে। এই শ্রেণীর ব্যক্তিরা নিজেদের পছন্দ ও যোগ্যতা অনুযায়ী দীর্ঘ সময় অবধি আনন্দের সাথে কর্ম করতে পছন্দ করবে এবং করে যেতেও চাইবে এইভাবে সকলে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকার ভোগকে উপভোগ করে থাকে।

 

তাহলে এর অর্থ এটিই জ্ঞান অর্জন করাতেও সুখ রয়েছে, কর্মের মধ্যেও সুখ রয়েছে এবং ভোগের মধ্যেও সুখ রয়েছে এইভাবে জ্ঞান, কর্ম এবং ভোগ এই তিনটি বিষয়ের মধ্যেই অপার সুখ রয়েছে, যদি তা আমাদের রুচি অনুসারে হয় আর যদি তা আমাদের পছন্দের বিপরীত হয় তবে দুঃখ প্রাপ্তি হবে শিক্ষার্থীরা সাধারণত ২৫ বছর বয়স অবধি নিজের পছন্দ বা রুচি অনুযায়ী শিক্ষণ-প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কোনো না কোনো কর্ম অথবা গবেষণা করার রুচি অর্জন করে ফেলে সেই রুচি বা পছন্দের ভিত্তিতে সরকার তাদের কোনো গবেষণা অথবা কর্ম করার ব্যবস্থা প্রদান করে দেবেই ফলে আপনার পছন্দমত কর্মের পারদর্শিতা বা জ্ঞান অর্জন করার সুযোগ আপনি পেয়েই যাবেন তাহলে তো সবদিক দিয়ে আপনার জীবন সুখী হয়েই যাবে অর্থাৎ আপনি সর্বদা সমৃদ্ধশালী জীবন-যাপন করতে থাকবেন

 

মুদ্রার সঠিক স্বরূপ

যে ব্যবস্থা আমি দিতে চলেছি তাতে মুদ্রার প্রয়োজন কেবলমাত্র সরকার এবং মানুষের মধ্যে গণনার জন্যই ব্যবহার হবে একজন ব্যক্তির সাথে অপর কোনো ব্যক্তি মুদ্রা নিয়ে কোনো লেনদেন করতে পারবে না এছাড়া সরকার আপন ব্যবস্থার অভ্যন্তরে যেখানে সম্পদ বিষয়ক গননার প্রয়োজন হবে সেখানেই কেবলমাত্র মুদ্রা প্রয়োগ করবে যখনই কোনো ব্যক্তি সরকারের কাছে কোনো বস্তুর দাবী করবে সরকার সেই দাবিকে নির্দিষ্ট বিভাগে প্রেরণ করবে সেই বিভাগ ওই বস্তু নির্মাণ করবে, এরপর বিতরণ বিভাগ ওই বস্তু ব্যক্তির ঠিকানায় পাঠিয়ে দেবে যখন ওই বস্তু সেই ব্যক্তির কাছে পৌঁছে যাবে তখন আপনা-আপনি ওই বস্তুর সমান মুদ্রা সেই ব্যক্তির একাউন্ট থেকে কেটে যাবে সরকার এই প্রকার মুদ্রাই জারী করবে এমনটি করলে কখনোই মুদ্রার অভাব পড়বে না, মুদ্রা অধিক হবে না অথবা মুদ্রাস্ফীতি ঘটবে না এই নীতির ফলে সরকারের কাছে কখনোই অর্থসঙ্কট আসবে না প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ সর্বদা মজুত থাকবে মুদ্রাস্ফীতি বা মুদ্রাসঙ্কট তো কখনোই আসবে না মুদ্রা আমাদের জীবনে এইজন্য এসেছে যেন আমরা লেনদেন প্রক্রিয়াকে সরল করতে পারি মুদ্রা এইজন্য আসেনি যাতে আমরা ঋণ দিয়ে সুদ নিতে পারি অথবা অর্থের মাধ্যমে অর্থের মুনাফা করতে পারি লেনদেন ছাড়া মুদ্রার অন্য কোনো প্রয়োগ সমাজে অন্যায়কেই প্রভাবিত করতে থাকে যার ফলে সমাজে অপরাধমূলক ঘটনা ঘটতে থাকে এবং ফলস্বরূপ অবিরত দুঃখের প্রাপ্তি হতে থাকে একসময় সেই দুঃখ সমাজের অভিন্ন অঙ্গ হয়ে যায় এইভাবে সমাজে অপরাধের জন্ম হতে থাকে এবং নিরন্তর সেই অপরাধ চলতে থাকে এইজন্য মুদ্রার প্রয়োগ কেবলমাত্র গণনা করার কাজে ব্যবহার করা উচিত এই নতুন ব্যবস্থায় মুদ্রার স্বরূপ এবং প্রয়োগ কেবলমাত্র এইজন্যই করা হবে আর এই প্রকার প্রয়োগ তখনই সম্ভব যখন তা সরকার ও জনগণের মধ্যে হবে এবং সরকার দ্বারা পরিচালিত হবে, ব্যক্তি দ্বারা নয় মুদ্রা যদি জনগণের মধ্যে সঞ্চালিত হয় তবে তা থেকে অন্যায়কারী প্রতিফলনই সামনে আসবে সম্পূর্ণ সমাজ লাভ ও ক্ষতির ভিত্তিতে চালিত হবে অর্থাৎ অর্থের প্রয়োগ ভুল পথে হবে এবং সমাজে দুঃখ উৎপন্ন করবে এইজন্য সরকারই কেবলমাত্র মুদ্রার প্রয়োগ করবে অন্য কোনো ব্যক্তি স্বয়ং মুদ্রার প্রয়োগ করতে পারবে না যদিও তার কোনো প্রয়োজনও পড়বে না কারণ ব্যক্তির যা

 


প্রয়োজন তা সরকারের কাছে দাবী করবে এবং সরকার সেই বস্তু বা পরিষেবা উপলব্ধ করে দেবে সরকার প্রতি বছর জনগণের একাউন্টে নির্দিষ্ট অংকের অর্থ জমা করে দেবে এরপর সকলে সেই পরিমাণ অর্থের মাধ্যমে নিজের ইচ্ছানুযায়ী বস্তু ও পরিষেবা গ্রহণ করে সুখ প্রাপ্ত করতে পারবে ব্যক্তি যখন ইচ্ছে তার একাউন্টের বিবরণ দেখতে পারবে সে নিজে থেকে অন্য কাউকে অর্থ ট্রান্সফার করতে পারবে না বা প্রদান করতে পারবে না সকলের একাউন্ট সরকার পরিচালিত করবে প্রত্যেক বছর আপনার খরচ না হওয়া অর্থের সাথে নতুন বছরের অর্থরাশি যুক্ত হয়ে যাবে এভাবেই আপনার একাউন্ট সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত হতে থাকবে উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক অর্থরাশির সীমা ১ লাখ টাকা এক বছরের জন্য প্রদান করা হল এবং আপনি বর্তমান বছরে ৯০ হাজার টাকা খরচ করলেন পরের বছর সরকার আবার আপনাকে ১ লক্ষ টাকা প্রদান করবে খরচ করার জন্য আপনার একাউন্টে তখন ১ লাখ ১০ হাজার টাকা থাকবে কিন্তু এই অর্থ কেবলমাত্র সরকারের কাছে কিছু কেনাকাটা করার জন্য ব্যবহার করতে পারবেন জনগণ নিজেদের মধ্যে কোনো লেনদেন করতে পারবে না এমনটি এইজন্য করা হয়েছে যে সরকার যদি জনগণকে মুদ্রা লেনদেন করার স্বাধীনতা দিয়ে দেয় তবে সরকার কখনো জানতে পারবে না যে কোনো বস্তু অথবা পরিষেবার কতটা চাহিদা রয়েছে কেননা জনগণ নিজেদের মধ্যেই লেনদেন করে নেবে এবং সরকারের কাছে তা জানার কোনো উপায় থাকবে না সরকার যদি সকলের চাহিদা জানতে না পারে তাহলে পূরণ করার ব্যবস্থাও করতে পারবে না তাহলে তো জনগণকে স্বয়ং নিজেদেরকে নিজেদের ব্যবস্থা করতে হবে, আর তা করে ওঠা কখনোই সম্ভব হবে না বর্তমান ব্যবস্থায় এমনটিই হয়ে চলেছে এমন অবস্থায় বস্তুর মূল্য চাহিদা পূরণের আধারে চলতে থাকবে মানুষ অধিক লাভের আশায় কিছু না কিছু হেরফের করতে থাকবে, যার ফলে কিছু বস্তুর মূল্য এতই বেড়ে যাবে যে স্বল্প আয়ের মানুষ তা কিনতেই পারবে না এবং কিছু বস্তুর মূল্য এতই কমে যাবে যে লগ্নি করা অর্থই ফেরত আসবে না ফলস্বরূপ সমাজে ভয়ঙ্করভাবে আর্থিক বৈষম্যই দেখা দেবে। উপরে আমরা বুঝে নিয়েছি যে আর্থিক বৈষম্যই হচ্ছে সমাজের সকল দুর্দশার কারণ অধিক আয়ের লোভে সকল খাদ্য পদার্থে ভেজাল মেশানো শুরু হবে সকল প্রকার বস্তু এবং পরিষেবার গুণগত মান নিন্মমুখী হয়ে যাবে সকল প্রকার দূষণ বাড়তে থাকবে এবং সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না কেননা কোথায় কোন ব্যক্তি কি তৈরি করছে এবং কে কোন বস্তু কিনছে সরকার জানতে পারবে না ফলে আবার মুদ্রাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এরপর তা মাধ্যম নয় সাধন হয়ে উঠবে অধিক থেকে ততোধিক মুদ্রা উপার্জন করার জন্য একে অপরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, সমস্ত ব্যবহার নকল হয়ে উঠবে, প্রেমভাব থাকবে না ইত্যাদি ইত্যাদি এককথায় বললে বর্তমান সময়ের অবস্থাই ফিরে আসবে তাহলে বোঝা গেল যে মুদ্রাকে স্বতন্ত্র করে দিলে সবকিছু অনিয়মিত এবং অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যায় যেমনটি বর্তমানে ঘটছে মুদ্রা ব্যবহারের স্বতন্ত্রতা সমাজে সকল প্রকার দুর্নীতি ক্রমাগত উৎপন্ন করতে থাকবে সরকার তা ঠেকানোর যতই চেষ্টা করুক না কেন তা করতে পারবে না কেননা যাদের সরকার দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য নিযুক্ত করবে তারাও আর্থিক বৈষম্যের কারণে দুর্নীতি করতে বাধ্য হয়ে যাবে আবার সরকারেরও তো পরবর্তী নির্বাচনে লড়াই করার জন্য অর্থের প্রয়োজন হবে সেটি দুর্নীতি থেকেই সম্ভব সকলে তো সমৃদ্ধশালী জীবন-যাপন করতে চায় এতে কিছুমাত্র ভুল নেই যে মানুষ কেন সমৃদ্ধশালী জীবন-যাপন করতে চায় তার জন্য যথাসম্ভব প্রয়াস সে করতে থাকে তাহলে আমরা বুঝতে পারছি যে মুদ্রাকে স্বতন্ত্র করে দিলে তার পরিণাম কি ভয়ানক হতে পারে আর সেইসব আমরা আমাদের আভিজ্ঞতা থেকে স্বাভাবিকভাবেই জানি আর্থিক বৈষম্য তখনই হবে যখন মুদ্রাকে সমাজ সঞ্চালন করবে, ব্যক্তি দ্বারা নয় এখানে সমাজের অর্থ বলতে আমি সরকারকে বুঝিয়েছি ব্যবস্থা তৈরি করার জন্য এবং ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য সমাজই তো সরকারকে নিযুক্ত করবে কোনো ব্যক্তির যা কিছু প্রয়োজন হবে সে নিজের প্রোফাইল থেকে সরকারের কাছে অনলাইনে অর্ডার করবে এবং সেই অর্ডার আপনিই নির্দিষ্ট বিভাগে চলে যাবে নির্দিষ্ট বিভাগ সেই বস্তু প্রস্তুত করে বিতরণ বিভাগে পাঠিয়ে দেবে বিতরণ বিভাগ অর্ডার-কর্তার ঠিকানায় পৌঁছে দেবে এইভাবে সকলে সরকারের কাছে বস্তু এবং পরিষেবা অর্ডার করতে পারবে এবং প্রাপ্ত করতে থাকবে যদি কেউ কোনো পুরনো বস্তু বিক্রি করতে চায় তবে তা সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারবে এবং কেউ কোনো পুরনো বস্তু কিনতে চাইলে সে সরকারের কাছ থেকে কিনতেও পারবে সরকার এইসব বস্তুর মূল্য অনলাইনে উল্লেখ করে দেবে যার প্রয়োজন হবে তার জন্য সে সরকারের কাছে অর্ডার করতে পারবে এইভাবেই পুরনো বস্তুকেও মানুষ ক্রয়-বিক্রয় করতে পারবে এই প্রকারে সরকার মুদ্রা সঞ্চালনের পাশাপাশি আর্থিক সমতা বজায় রাখবে অনেকে আবার এমনটি বলেন যে মুদ্রাই হচ্ছে সকল সমস্যার উৎস মূলত বিষয়টি এমন নয় লেনদেনকে সহজ সরল করার জন্য মুদ্রা হচ্ছে একটি মাধ্যম মাত্র বিষয়টি এমনঅনেকেই বলেন সব্জি কাটার ছুরিই হচ্ছে সকল সমস্যার কারণ কেননা ছুরি দিয়ে বারবার হাত কেটে যায় কিন্তু ছুরিকে যদি আপনি জীবন থেকে সরিয়ে দেন তবে অধিক অসুবিধেয় পড়বেন তখন সব্জি কাটা বা খাবার তৈরি করতে অনেক সমস্যা হবে এবং সময় অধিক লাগবে যেটি করতে হবে তা হচ্ছে ছুরি আমাদের কাছে থাকবে, তাকে এমনভাবে তৈরি করা যেন অসাবধান হলেও যেন আহত করতে না পারে একইরকমভাবে আমি মুদ্রাকে রেখেছি, কিন্তু তার স্বরূপ এবং সঞ্চালন এমন করে দিয়েছি যেন তা থেকে সমাজের শুধুমাত্র লাভই হয় কোনোরূপ ক্ষতি ছাড়াই। বর্তমান ব্যবস্থায় মুদ্রার প্রচলন বন্ধ করে দিলে বস্তুর বিনিময় অনেক কঠিন হয়ে যাবে এবং বস্তু বিনিময়ের গতিও রুদ্ধ হয়ে পড়বে যার ফলে মানুষ সময়মত প্রয়োজনীয় বস্তু প্রাপ্ত করতে পারবে না ও সুখী হতে পারবে না এই অসুবিধের ফলে দুঃখই উৎপন্ন হবে এর উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণও থাকবে না কেননা সরকার জানতেই পারবে না যে মানুষ নিজেদের মধ্যে কি এবং কতটা লেনদেন করছে আবার বস্তুর উৎপাদন বা যোগান জনগণের হাতেই দিতে হবে ফলে ব্যবস্থা সঠিকভাবে চালিত হতে পারবে না আবার নতুন করে আর্থিক বৈষম্য তৈরি হবে এবং বর্তমান সময়ের মতই সকল সমস্যা উৎপন্ন হয়ে যাবে সমাজ বর্তমান সময় থেকে ১০০ বছর পেছনে চলে যাবে সরকার সঠিকভাবে চালিত হতে পারবে না বড় রকমের গবেষণা করতে পারবে না সামাজিক সুখসুবিধা সীমিত হয়ে পড়বে এভাবে বুঝে নিন যে রাজাদের সময়ে যে সামাজিক অবস্থা ছিল তেমন অবস্থা বর্তমান সময়ে চলে আসবে এইজন্য মুদ্রাকে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে কোনো লাভ হবে না উল্টে সমস্ত উন্নয়নের গতি শিথিল হয়ে পড়বে সরকারকে যদি নিয়ন্ত্রণ করতেই হয় তবে তো মুদ্রা সঞ্চালনও নিয়ন্ত্রণ করে দেওয়া যায়, যেন মুদ্রার লাভ সকলে পেতে পারে এবং তা থেকে যেন কোনো দুঃখ উৎপন্ন না হয় তাই এটিই হচ্ছে সঠিক পদ্ধতি কারণ এতে মুদ্রাও থাকবে এবং তা কেউ অপপ্রয়োগও করতে পারবে না

 

মুদ্রা থেকে যেন সমাজের লাভই হয় আর সেই পদ্ধতি কি তা আমি উপরে বুঝিয়ে দিয়েছি কারোর কাছে এর চাইতেও উত্তম পদ্ধতি থাকলে দয়া করে আমায় জানাবেন এই ব্যবস্থায় সকল বস্তু এবং পরিষেবার মাপদণ্ড একই প্রকার করা হবে বর্তমান ব্যবস্থার মত নয় তাই নতুন ব্যবস্থায় যে কোনো বস্তুর মূল্য সর্বদা একইরকম থাকবে চাহিদা এবং পূর্তির আধারে তা নির্ণয় করা হবে না

 

নতুন ব্যবস্থায় মূল্যবৃদ্ধির মত কোনো বিষয় থাকবেই না সকলের জীবনস্তর একসমান থাকবে। সমাজ যখন পুরনো ব্যবস্থা থেকে নতুন ব্যবস্থায় প্রবেশ করবে তখন পুরনো অভিজ্ঞতার কারণে মানুষ অনাবশ্যক বস্তুর দাবী করতে চাইবে ফলে তখন একটি বড় সমস্যা উৎপন্ন হবে এই অসুবিধে থেকে মুক্ত হবার জন্য অর্ডার বা চাহিদা পূরণের উপর ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য নিয়ন্ত্রণ রাখার প্রয়োজন পড়বে সেই সময়কালে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী কিছু প্রাপ্তির জন্য অর্থের প্রয়োজন পড়বে এর ফলে সরকার আপনাকে প্রথমেই পর্যাপ্ত পরিমাণে অর্থরাশি প্রদান করে দেবে বছরের মাঝে কোনো সময় যদি সরকারের মনে হয় অর্থের পরিমাণ বাড়ানো প্রয়োজন তবে তা বাড়াতেও পারবে যখন সমাজের মধ্যে একরকম সমতা চলে আসবে তখন সম্ভবত অর্থের কোনো সীমা নির্ধারণের প্রয়োজন পড়বে না যার যেমন বস্তু অথবা পরিষেবা প্রয়োজন হবে তা গ্রহণ করতে থাকবে এবং সুখী জীবন উপভোগ করতে থাকবে তখন এই প্রকার নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন থাকবে না কেননা সমস্ত বস্তু এবং পরিষেবা বিনামূল্যেই সকলে পেতে থাকবে

 

বস্তু এবং পরিষেবার মূল্য গণনা

একথা সর্বদা মনে রাখতে হবে বস্তু বা পরিষেবার মূল্য কখনোই ডিমান্ড এবং সাপ্লাইয়ের উপর নির্ধারিত হওয়া উচিত নয় বস্তু এবং পরিষেবার মূল্য সর্বদা একটি ন্যায়কারী মাপদন্ডের মাধ্যমে নির্ণয় করা উচিত যেমন ধরা যাক ১ ঘণ্টা শ্রমের মূল্য ১ মুদ্রার সমান এবার কোনো বস্তু নির্মিত হতে এবং আপনার কাছে পৌঁছাতে যত ঘণ্টা সময় লাগবে তা হিসেব করতে হবে ধরে নেওয়া যাক একটি বস্তু ২ ঘণ্টা শ্রমের বিনিময়ে তৈরি হল এবং বিতরণ হল তাহলে সেই বস্তুর মূল্য ২ মুদ্রা হল সামাজিক সুখসুবিধা তো আমরা সকলে বিনামুল্যেই পাব আবার সকল প্রকার শ্রমের মূল্য নির্ধারণ করা কখনোই সম্ভব নয় যেমন বৌদ্ধিক শ্রমের মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয় যদিও নতুন ব্যবস্থায় সকল প্রকার শ্রমের মূল্য সমান থাকবে সেইজন্য এমন সব বস্তু এবং পরিষেবার মূল্য নির্ধারণ সেই শ্রমের ভিত্তিতেই হবে যেসব বস্তুর মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব হবে যার পদ্ধতি এমনতর হবে যে ধরুন একজন কাঠমিস্ত্রি একটি চেয়ার ১ ঘণ্টায় তৈরি করবে এই হিসেব আসবে সপ্তাহে ৫ দিন কাজের ভিত্তিতে তাহলে ৫ ঘণ্টায় সে প্রতিদিন ৫টি চেয়ার তৈরি করে ফেলবে এইভাবে সে একমাসে ১০০টি (দিনে ৫ ঘণ্টা শ্রম × সপ্তাহে ৫ দিন = সপ্তাহে ২৫ ঘণ্টা × ৪ সপ্তাহ) চেয়ার তৈরি করে নেবে তাহলে এইভাবে সেই কাঠমিস্ত্রির বেতন হল প্রতিমাসে ১০০ মুদ্রা এবার এই পদ্ধতিকে আধার করে সকলের বেতন হবে প্রতিমাসে ১০০ মুদ্রা যারা সড়ক, জল, বিদ্যুৎ ইত্যাদি বিভাগে কর্মরত থাকবেন তাদের বেতনও প্রতিমাসে ১০০ মুদ্রা ধরা হবে এবার ধরে নিই সরকারি কাজে ১০০০ জন ব্যক্তি কর্ম করছে তাহলে প্রতি মাসে সকলের বেতন হবে ১,০০,০০০ মুদ্রা অর্থাৎ প্রতি মাসে সরকারের মোট খরচ হবে ১,০০,০০০ মুদ্রা সরকার এই খরচকে সেইসব বস্তু এবং পরিষেবার সাথে সামানভাবে জুড়ে দেবে ধরে নেওয়া যাক ১,০০,০০০ মুদ্রার জন্য সেই পরিমাণ শ্রমের বিনিময়ে বস্তু ও পরিষেবার নির্মাণ হল এই হিসেব অনুযায়ী উৎপাদিত বস্তু এবং পরিষেবার মূল্য হবে ১,০০,০০০ (পরিমাপযোগ্য শ্রম) + ,০০,০০০ (অপরিমাপযোগ্য শ্রম), অর্থাৎ ২,০০,০০০ মুদ্রা এবার ২ প্রকার শ্রমের বিনিময়ে নির্মিত এবং বিতরণযোগ্য চেয়ারের অন্তিম মূল্য হবে ৪ মুদ্রা (উৎপাদন শ্রম + অন্যান্য পরিষেবাজনিত শ্রম)এইভাবে বস্তু ও পরিষেবার অন্তিম মূল্য নির্ধারিত হতে থাকবে এই ব্যবস্থায় কাউকেই বেতন প্রদান করা হবে না ব্যবস্থাকে সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য অবশ্যই সঠিকভাবে সমস্তকিছুর গণনা হবে যখন সরকার কোনো কাজের প্ল্যানিং করবে তখন সরকারের অভ্যন্তরীণ বিভাগে এই প্রকার হিসেব সহায়ক হবে এই মূল্য নির্ধারণের সহায়তা নিয়েই সরকার কোনো বস্তুর অনাবশ্যক নির্মাণকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে প্রযুক্তি, মেশিন ইত্যাদির দ্বারা যা কিছু অন্তিম অবস্থায় প্রয়োগ হবে সেই সমস্ত ক্ষেত্রেও এই নিয়ম মেনে চলা হবে এই প্রক্রিয়ায় কোথাও কোনো সমস্যা হলে ওই হিসেবের দ্বারা সহজেই তা জানা যাবে এবং তৎক্ষণাৎ সমাধান করা যাবে তাহলে আমরা এবার নতুন ব্যবস্থায় মুদ্রার প্রয়োগ বুঝে নিয়েছি সবশেষে আমি এটিই বলতে চাই যে মুদ্রার প্রয়োগ এইসব বিষয় মাথায় রেখেই করা হবে যেন সকলের জীবন-যাপন সহজ হয়, আরামদায়ক হয়, স্পষ্টতা ও পারদর্শিতা বৃদ্ধি পায় এবং সব মিলিয়ে যেন সুখ বৃদ্ধি পায় কোনোপ্রকার দুঃখ যেন উৎপন্ন না হয় এই মুদ্রাকে নিয়ে পরেও যদি কোনো সমস্যা উৎপন্ন হয় তার সমাধানও এই উপায়েই করা হবে আর আপনার জ্ঞান অনুযায়ী যদি এর থেকে অন্য কোনো ভাল উপায় থাকে কিংবা যদি ভবিষ্যতেও আসে তবে তা আমি স্বীকার করে নেব এই ব্যবস্থায় সরকারকে কোনোপ্রকার ট্যাক্স ইত্যাদি আদায় করতে হবে না তাই ট্যাক্স তোলার জন্য কোনো বিভাগও খুলতে হবে না মানুষের জন্য পুলিশ ব্যবহার করতে হবে না কারণ কেউ টাকা নিয়ে পালিয়ে যাবে না ফলে কাউকে তল্লাসি করতে হবে না সবকিছু অত্যন্ত সহজ হয়ে যাবে প্রাকৃতিকভাবে সম্পদ তো সকলের জন্য সমানভাবে বিনামূল্যেই রয়েছে নতুন অর্থশাস্ত্র খুবই সরল হবে এবং সহজেই সকলে বুঝতে পারবে

 

পারিমাণ রাশির গণনা

এই ব্যবস্থায় পরিমাণ রাশি সকলের জন্য সমান থাকবে সরকার দ্বারা সকলের একাউন্টে সমান অর্থরাশি প্রতি বছরের পয়লা তারিখে প্রদান করা হবে শিশুদের জন্য অর্থরাশি তাদের বয়স অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে ২৫ বছর থেকে ৫০ বছর বয়সীরা জীবিকা নির্বাহ করবে কেউ চাইলে তার কার্যকাল কমিয়ে নিতে পারেন, তাহলে সরকার তার জন্য সেই অনুযায়ী অর্থরাশির সীমা নির্ধারণ করে দেবে উদাহরণস্বরূপ ধরে নিন সরকার প্রতিদিন ৫ ঘণ্টা কাজের সাধারণ সময় নির্ধারণ করে দিল যদি কাজের জন্য সপ্তাহে ৫ দিন নির্ধারিত হয় তবে এই হিসেবে একজনকে মাসে ২০ দিন কর্ম করতে হবে অর্থাৎ মাসে ১০০ ঘণ্টা কর্ম করতে হবে যদি কোনো ব্যক্তি দিনে ৩ ঘণ্টা কর্ম করতে চান সরকারও সেই হিসেবে অর্থরাশির পরিমাণ নির্ধারণ করে দেবে। উদাহরণ হিসেবে ধরে নিন সরকার প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ১ লক্ষ অর্থরাশি নির্ধারণ করে দিল ঐ বছরের জন্য তাহলে এই হিসেব অনুযায়ী সরকার ৩ ঘণ্টা কাজের জন্য ৬০০০০ অর্থরাশি অবধি সীমা নির্ধারণ করে দেবে এবার সেই ব্যক্তি এই অর্থরাশির সীমা অবধি সুবিধা নিতে পারবে যদিও আমার অনুসন্ধান অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবে এমন কোনো ব্যক্তি নেই যিনি নির্ধারিত সময় অবধি কর্ম করতে চাইবেন না যেহেতু বর্তমান সময়ের ব্যবস্থা সঠিক নেই তাই বেশীরভাগ মানুষ বাধ্য হয়ে অস্বাভাবিক জীবন-যাপন করছে এর ফলে অনেকেই বিভিন্ন কারণে কর্ম করতে চান না অথবা পছন্দের কর্ম পাননা বলে কাজে ফাঁকি দেন এবং সমাজের উপরই নির্ভরশীল থাকতে চান যখন এই ভুল ব্যবস্থা থেকে সঠিক ব্যবস্থায় পরিবর্তিত হতে থাকবে সেইসময়ও এই ধরণের সমস্যা আসতে পারে শুরুতে কিছুটা দায়িত্ব সকলেকে নিতে হবে হয় আমরা সরকারকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করব অথবা নিজেদের সহযোগিতার ভিত্তিতেই সরকারের কাছে আশা রাখব। যখনই নতুন ব্যবস্থা পূর্ণরূপে স্থাপিত হয়ে যাবে তখন কি করার প্রয়োজন পড়বে সে বিষয়ে সরকার বিচার বিবেচনা করবে সরকার দেখবে এই কথার অর্থ হচ্ছে জনগণই দেখবে এই ব্যবস্থায় জনগণই অন্তিম সিদ্ধান্ত নেবে কখনো কোনো বস্তুর অভাব হবে না তার কারণ অর্ডার বা চাহিদা জনগণের কাছ থেকে প্রথমেই নিয়ে নেওয়া হবে অর্ডার গ্রহণ করার পরেই তো কোনো বস্তু নির্মিত হবে, ফলে অনাবশ্যক গুদামঘর তৈরির প্রয়োজনও থাকবে না প্রায় সমস্ত বস্তু সরাসরি তাদের আবাসিক স্থানে পৌঁছে দেওয়া হবে বড় কোনো বাজারের প্রয়োজনও থাকবে না মানুষের উপর কাজের ভারও কম থাকবে কেননা সকলেই নিজেদের প্রস্তাবিত কর্ম করবে এবং কেউই কোনো অনাবশ্যক কর্ম করবে না এতে মানুষ অবসর সময়ে অন্য কোনো ব্যক্তিগত অথবা পারিবারিক সুখ উপভোগ করতে পারবে সকল বস্তু এবং পরিষেবার মূল্য মোটামুটি স্থায়ী থাকবে তাহলে মূল্যবৃদ্ধি বা মূল্যহ্রাসের অবস্থা কখনো হবে না বার বার বেতন কখনোই বাড়াতে হবে না দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধির জন্য বা অন্য কোনো সংকটে ভর্তুকি দিতে হবে না কৃষকগণ কখনো বলবে না যে আমরা ফসলের সঠিক মূল্য পাচ্ছি না গ্রাহকগণও কখনো মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ করবে না সবকিছুর সামঞ্জস্য বা ভারসাম্য বজায় থাকবে এর অর্থ হচ্ছে একবার যা চূড়ান্ত হয়ে যাবে বারবার তা বদলানোর প্রয়োজন পড়বে না এখন যেমন সরকার ও জনগণ পরস্পরের মধ্যে চোর পুলিশের খেলা খেলতে থাকে এবং ব্যবস্থার অজুহাত দিয়ে সকলেই একে অপরকে দোষারোপ করতে থাকে এইসব অভিযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে এমনকি প্রয়োজনও আর থাকবে না কেননা মন্দ ব্যবস্থাতেই জনগণকে চোর সাজতে বাধ্য হতে হয় তাই সরকারকে বাধ্য হয়ে পুলিশ রাখতে হয় এবং অনাবশ্যক খরচ বাড়তে থাকে, যার প্রভাব গ্রাহকের উপর পড়ে সেইজন্য আসুন আমরা সকলে প্রথমে ব্যবস্থাকেই সঠিক করে নিই যেখানে সকলের মান একসমান থাকবে এই পুস্তকে আমি তাই উপস্থাপন করার প্রচেষ্টা করেছি এখানে আমি যা কিছু সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করেছি তা আমার দ্বিতীয় পুস্তক সম্পূর্ণ জীবন দর্শনে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি। ওই পুস্তকে আপনি এই ব্যবস্থা রচনার পেছনের কারণসমূহকে বিস্তারিতভাবে বুঝতে পারবেন কিন্তু এই পুস্তকে আমি ব্যবস্থার মধ্যেই কেন্দ্রীভূত থেকেছি।

 

শাসনের স্বরূপ

এই জগতে শাসনের চার প্রকার রূপ রয়েছে

. ব্যক্তিগত

. বংশগত

. দলগত

. সমষ্টিগত

 

ব্যক্তিগত শাসনের অর্থ হচ্ছে যখন কোনো ব্যক্তি দ্বারা শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয় অর্থাৎ ব্যক্তি যদি জ্ঞানী হয় তবে ব্যবস্থা কিছুটা ঠিকঠাক চলে, কিন্তু ব্যক্তি যদি অজ্ঞানী হয় তবে ব্যবস্থাকে নরকে পরিণত করে অতীতে গোষ্ঠীগুলির মধ্যে বেশীরভাগ ব্যক্তিগত ব্যবস্থা থাকত সর্দার কিছুটা দুর্বল হলেই অন্য কোনো ব্যক্তি এসে তার যায়গায় সর্দার বনে যেত তখন শারীরিক শক্তিকেই সর্দার হবার যোগ্যতা হিসেবে ধরা হতোব্যক্তিগত শাসনে শিক্ষাকে কোনো গুরুত্বই দেওয়া হতো না যার ফলে তখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের উদয় সম্ভব হয়নি। সাধারণ কৃষি ও পশু শিকারের উপরেই সকলের জীবন-জীবিকা নির্ভর করত। সমস্ত সিদ্ধান্ত কেবলমাত্র বলশক্তি দ্বারা নির্ধারিত হতো বাজার নামক কোনো ব্যবস্থা ছিল না জীবন সকল দিক থেকে সুরক্ষাবিহীন অবস্থায় ছিল। তখন জন্মের হার অনেক বেশী হবার পরও জনসংখ্যা কখনো অধিক হতে পারত না কারণ মৃত্যুর হার অনেক বেশী ছিল কোনোপ্রকার সামাজিক সুখসুবিধা ছিল না অর্থাৎ মানুষের জীবন মোটামুটি জংলী পশুদের মতই ছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সকলে প্রকৃতির উপরই নির্ভরশীল ছিল

 

বংশগত শাসনে একই পরিবারের সদস্য শাসন করতে থাকে যতক্ষণ না তাকে কেউ বলপূর্বক সরিয়ে না দেয় পরিণাম এখানে ব্যক্তিগত জীবনের মতই হয়, তবে কিছুটা উদারতার সম্ভাবনা থাকে কেননা রাজা নিজের ভাবমূর্তি ভাল বানিয়ে রাখতে চায় যেন প্রজা তার বংশধরদের সহজেই স্বীকার করে নিতে পারে এর থেকে খুব ভিন্ন কিছু হয় না রাজকার্যের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের কিছু সাধারণ শিক্ষা প্রদান করা প্রারম্ভ হয় যেন রাজকার্য কিছুটা সঠিকভাবে চলতে পারে রাজ্যের সীমানার ব্যপ্তিও কিছুটা অধিক হয়ে থাকে যা সাংগঠনিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই পরিচালিত হয় ছোটখাটো বাজার উৎপন্ন হতে শুরু করে সাংগঠনিকভাবে কার্য পরিচালনার ফলে কিছুটা উন্নয়নও প্রারম্ভ হয়ে যায় উন্নয়নকেই বাজার নামে সকলে জানে মানুষ কিছুটা বৈষয়িক হতে শুরু করে এবং পূর্বের তুলনায় কিছুটা অধিক সুখী হতে শুরু করে নিশ্চিতভাবে ব্যক্তিগত শাসনের তুলনায় বংশগত শাসনে কিছুটা অধিক সুখ থাকে মানুষের সুরক্ষাও অনেকটা বেড়ে যায় এবং সুখসুবিধাও বৃদ্ধি পেতে শুরু করে জীবন-যাপন কিছুটা প্রকৃতির স্তর থেকে উপরে উঠতে শুরু করে কিছুটা শিক্ষার প্রসারে মানুষ চিন্তন-মনন করতে শুরু করে চিন্তন-মনন করার একটি শ্রেণী উৎপন্ন হতেও শুরু করে এরপর জনগণ গণতান্ত্রিক শাসনের দাবী তুলতে শুরু করে ধীরে ধীরে গণতন্ত্রাতিক শাসন ব্যবস্থা আসতে শুরু করে কিন্তু বাস্তবে তা প্রকৃত গণতান্ত্রিক হয় না বরং তাকে আমরা দলতান্ত্রিক শাসন বলতে পারি কেননা এতে প্রকৃত জনতার শাসন না হয়ে দলের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় দলগত শাসনে অনেক দল তৈরি হয়ে যায় তারা জনগণ দ্বারা নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে শাসন করতে শুরু করে কখনো কখনো দলগত শাসনকে গণতান্ত্রিক শাসন বলে ভ্রমও হয়ে যায় এতে প্রজা হয়ে যায় জনগণ। শাসন বংশগত থেকে বেরিয়ে কোনো একটি দলের অধীন হয়ে যায় কিন্তু মনোযোগ দিয়ে দেখলে দলতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও উপরোক্ত দুটি বিষয় লুকিয়ে থাকে

 
দলতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও কোনো একটি মুখ্য দল থাকে এবং তা দলতন্ত্র/বংশগত দু-প্রকারের হতে পারে দলকে যেহেতু জনগণ নির্বাচন করে সেই কারণে জনগণের বিপরীত কোনো পরিণাম আসে তেমন কার্য দল সরাসরি করে না কিন্তু বিপক্ষ ও অন্যান্য দল থেকে নিরাপত্তাহীনতার কারণে নিজের দলকে শক্তিশালী এবং অন্য দলকে দুর্বল করার জন্য নৈতিক/অনৈতিক দু-উপায়ই অবলম্বন করে থাকে যেন অন্য কোনো দল ক্ষমতায় না আসতে পারে এক দল অন্য দলকে নিচু দেখানোর জন্য যথাসম্ভব প্রয়াস করতে থাকে প্রথমদিকে দু-ধরনের শাসন (গোষ্ঠীতন্ত্র, রাজতন্ত্র) থেকে জনতা বিশেষ কিছু সুবিধা পায় না কিন্তু দলতান্ত্রিক শাসনে দলগুলির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে জনগণের সুখসুবিধাও বাড়তে থাকে শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশেষ সংশোধন হতে শুরু করে প্রযুক্তি এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও উন্নতি হতে শুরু করে শিক্ষার প্রভাবে মানুষের চিন্তন-মননের ক্ষমতাও বাড়তে শুরু করে কিছুকাল পর যখন মূল প্রসঙ্গগুলি সামনে চলে আসে তখন দলতান্ত্রিক শাসনের ত্রুটিগুলিও প্রকাশিত হতে থাকে দেখা যায় সমস্ত দল নিজেদেরকেই শক্তিশালী করার কাজে লিপ্ত থাকে এর ফলে জনতার সুবিধা তলানিতে নামতে থাকে একটি সময় আসে যখন দলতান্ত্রিক শাসনের দ্বারা যতটুকু উন্নয়ন হবার তা হয়ে যায় এরপর আর উন্নয়নের গতি অগ্রসর হতে দেখা যায় না কেননা যে কোনো শাসনকালে উন্নয়নের একটি সীমা থাকে সেই পরিধির অধিক বিকাশ করা সম্ভব হয় না উদাহরণস্বরূপ কোনো কম্পিউটারের অপারেটিং সিস্টেম এবং হার্ডওয়ার সিস্টেম কতটা সীমা অবধি সফটওয়্যারকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারবে তার একটি নিজস্ব ক্ষমতা থাকে এর অধিক ডাটা প্রসেস করতে চাইলে আপনাকে অপারেটিং সিস্টেম এবং হার্ডওয়ার সিস্টেমকে অধিক আপডেট করে নিতে হয় তবেই আপনি অধিক এবং জটিল কর্ম সরলভাবে সম্পাদন করতে পারবেন তখন আর পুরনো সিস্টেম দিয়ে কর্ম করা সম্ভব হয় না একইভাবে শাসন ব্যবস্থাকেও অধিক বিকশিত করতে হয় তবেই আমরা বৃহৎ স্তরে উন্নয়ন করতে সক্ষম হতে পারব আমরা তো সকলে অধিক সুখসুবিধাই চাইযেন অধিক থেকে অধিকতর সুখী হতে পারি যেমনভাবে অধিক সুবিধাসম্পন্ন নতুন কোনো বস্তু বাজারে আসতেই বিচার বিবেচনা না করে নিজেদের ক্ষমতা অনুযায়ী সাথে সাথে তা কিনে নিই এবং ব্যবহার করে সুখী হইঅন্যকেও বলি সেই বস্তুটি ভাল, আপনিও কিনুন এবং সুবিধা উপভোগ করুন এইভাবে কেউ যদি আমাদের সুখী এবং সমৃদ্ধশালী শাসন ব্যবস্থা প্রদান করে তাহলে সেই ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য জরুরী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয় কি? সকলেকে নিজেদের ক্ষমতা অনুযায়ী সহযোগিতা করা উচিত নয় কি? বর্তমান সময়ে দলতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চলছে এবং তা চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছে উন্নয়ন প্রায় রুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে দেখা যাচ্ছে দলের অধিকাংশ নেতা ভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছে দলতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এর চাইতে অধিক বিকাশের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না

বর্তমানে নিশ্চিতভাবেই প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সময় এসে গিয়েছে আমি যে প্রকার ব্যবস্থাকে লিপিবদ্ধ করেছি তা নিয়ে আপনারা সকলে বিচার বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন যদি আপনাদের মনে হয় এই ব্যবস্থা সঠিক তাহলে আপনার ক্ষমতানুযায়ী নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য সহযোগিতা করুন আমরা সুখী জীবন-যাপনের জন্য যেন অধিক বিলম্ব না করি। প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় কোনো দল থাকে না সেখানে সর্বপ্রথমে আপনার যোগ্যতা প্রাধান্য পাবে এরপর সেই যোগ্যতার আধারে আপনাকে কর্ম সম্পাদন করার সুযোগ দেওয়া হবে অধিকার সকলের সমান হবে সেখানে কেউ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে না, কেউ জীবিকা থেকে বঞ্চিত হবে না, কেউ সুযোগ-সুবিধা থাকে বঞ্চিত হবে না, কেউ সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে না প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা যখন চরম অবস্থায় পৌঁছাবে তখন যার যে বস্তু বা পরিষেবার ইচ্ছে হবে তা সহজেই উপলব্ধ হয়ে যাবে ফলে দুঃখ নামক শব্দ কেবলমাত্র পুস্তকেই রয়ে যাবে জীবনে কোনো সংঘর্ষ আর দেখা যাবে না ৬ থেকে ২০ বছর বয়স অবধি সকল শিশুর জন্য সমান শিক্ষা ব্যবস্থা থাকবে। শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করার জন্য পূর্ণ শিক্ষা মিলবে কোনো পরীক্ষায় কাউকেই অনুত্তীর্ণ করা হবে না। সাধারণ প্রণালীতে ভাষা, গণিত, সংজ্ঞান এবং দর্শন এই চার প্রকার পাঠ্যক্রম থাকবে শিক্ষা অবশ্যই সকলের জন্য সমান থাকবে যে শিশু নিজের ব্যক্তিত্বকে যতটা বিকশিত করতে পারবে তাকে তার যোগ্যতা এবং ইচ্ছে অনুযায়ী কোনো একটি কর্ম সম্পাদনের জন্য ৫ বছরের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। যখন তারা ২৫ বছরের মধ্যে পূর্ণ শিক্ষিত এবং পূর্ণ প্রশিক্ষিত হয়ে উঠবে তখন বিদ্যালয়ের অন্তিম দিনেই পছন্দের চাকরি প্রদান করা হবে। যেন পরের দিন থেকেই তারা রোজগারের আনন্দ উপভোগ করতে পারে সকল সুখসুবিধা সকলের জন্য সমানভাবে বিকশিত করা হবে সকল বিভাগ এমনভাবে বিকশিত হবে যেন ব্যক্তিকে এক স্থান থেকে অপর স্থানে জীবিকার জন্য ছোটাছুটি করতে না হয় সকল স্থানেই সমান জীবিকা এবং সমান সুখসুবিধার ব্যবস্থা থাকবে। ফলে একই স্থানে জনসংখ্যার ঘনত্ব অধিক হবে না। সকলে সমুচিতভাবে সকল প্রকার সুযোগসুবিধা এবং সুরক্ষা পেতে থাকবে এইভাবে জীবনের এমন কোনো দিক অসম্পূর্ণ থাকবে না যার সমাধান হবে না আমি এইপ্রকার এক প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকেই লিখেছি। এরপর অন্য কোনো শাসন ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে না শাসন ব্যবস্থায় এটি হবে অন্তিম প্রকার ব্যবস্থা আমার জ্ঞান অনুযায়ী যা কিছু উপরে বর্ণনা করেছি তাতে আপনারা বুঝে গিয়েছেন যে সকলকে সুখী করা কোনো কঠিন কর্ম নয় এটি কেবলমাত্র নীতি-প্রণালীর ব্যপার নীতি-প্রণালী যত সঠিক হবে সুখ ততই বাড়তে থাকবে এবং জীবনযাপন সহজ হতে থাকবে নীতি-প্রণালী যদি পূর্ণরূপে সঠিক হয় তবে পূর্ণ এবং সর্বাধিক সুখ সহজভাবে আসতে থাকবে সঠিক নীতির ফলে পরিশ্রম কম হতে থাকবে, সবকিছু সহজ হতে থাকবে এবং জ্ঞান-কর্ম-ভোগ অধিক উৎপন্ন হতে থাকবে। এইসকল কারণের ফলে সুখ অধিক থেকে অধিকতর প্রাপ্ত হতে থাকবে। যা সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থা এবং আমাদের জীবনেরও পরম উদ্দেশ্য

 ***

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

ব্যবস্থাগত অসম্পূর্ণতা নাকি নেতৃত্বের ব্যর্থতা?