অধ্যায় ৬: ন্যায়শীল অর্থব্যবস্থা
ন্যায়শীল অর্থব্যবস্থা
এবার ন্যায়শীল অর্থব্যবস্থাকে কিছুটা বুঝে নিই। কারণ সমস্তকিছুর মূলে রয়েছে অর্থব্যবস্থা। যে কোনো দেশের সমস্ত কর্ম অর্থের উপর নির্ভরশীল থাকে। কোনো কার্যই অর্থ ছাড়া সম্পূর্ণ হতে পারে না। যদি অর্থব্যবস্থা ন্যায়শীল হয় তবে দেশের সমস্ত কর্মও ন্যায়পূর্ণভাবে সম্পন্ন হতে পারবে। নাহলে তা সঠিকভাবে সম্পন্ন হতে পারবে না অথবা সম্পন্নই হবে না। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ অথবা সমষ্টির কর্ম সেই প্রকার সম্পন্ন হবে যে প্রকার অর্থব্যবস্থা সেখানে থাকবে। সংবিধানে যা লেখা রয়েছে তা বাস্তবে রুপায়িত হতে পারবে কিনা তা অর্থব্যবস্থার উপরেই নির্ভর করে। যদি আমরা ব্যবস্থার অন্তর্গত প্রস্তাবনাগুলো পাঠ করি তবে জানতে পারব সংবিধান অনুযায়ী সকল জনগণের অধিকার সমান। কিন্তু বাস্তবে এমনটি রূপায়িত হয়েছে তা দেখা যায় না। আর্থিক পরিস্থিতি অনুযায়ী সমাজ ভিন্ন-ভিন্ন বর্গে বিভাজিত হয়ে গেছে যেখানে একেবারে নির্ধন থেকে বিরাট ধনী বর্গ পর্যন্ত দেখতে পাবেন। যেখানে নির্ধন ও ধনী বর্গের মধ্যে পার্থক্য কিন্তু সামান্য নয় বরং এই দুই বর্গের মধ্যে বিরাট পার্থক্য আমরা দেখতে পাব। দেখব যে মাত্র এক শতাংশেরও কম জনগণ ৭০ শতাংশ সম্পদের উপর দখল করে রয়েছে। আর তা সত্ত্বেও আমরা এমন ভূল বিধানকে সংবিধান বলে আসছি। যেখানে সমান বলে কিছুই দেখা যায় না। আবার এমনটিও নয় যে কোনো সরকার চেষ্টা করেনি। সকলেকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য সমস্ত সরকার সাধ্যমত চেষ্টাও করে থাকে। কিন্তু ভুল অর্থশাস্ত্রের কারণে তারা অধিকাংশ জনতাকে সন্তুষ্ট করতে পারে না। এই কারণেই সরকার বার বার বদলাতে থাকে এবং সমস্ত রাজনৈতিক দল জনতার আবেগকে কাজে লাগিয়ে দলে যুক্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু তারপরও অসন্তুষ্ট জনতাকে কোনো দল বেশিদিন ধরে রাখতে পারে না। কেননা প্রতিটি ব্যক্তি ভালোভাবে জীবন-যাপন করতে চায়। উপরের আলোচনা থেকে আমরা এটি বুঝতে পেরেছি যে কোনো কর্মকে ন্যায়শীলভাবে সম্পন্ন করার জন্য একটি ন্যায়শীল অর্থব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। ন্যায়শীল অর্থব্যবস্থা ছাড়া আর্থিক সমতা সম্ভব নয়। আর আর্থিক সমতার অভাবে অন্যান্য স্বাধীনতাও সম্ভব হতে পারে না। যে কারণে জনগণের একটি বড় অংশ অসন্তুষ্ট থাকে। তাই সব ধরনের অপরাধ ঘটতে থাকে। ছোট বড় যুদ্ধ চলতে থাকে। চূড়ান্ত প্রতিযোগিতাও অবিরত চলতে থাকে। নিরন্তর মানুষের ভেতরে এবং বাইরে অশান্তি লেগে থাকে। এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে নিরন্তর সন্দেহের চোখে দেখতে থাকে। মোট কথা নির্ধন বর্গ অত্যন্ত দুঃখে জীবন-যাপন করতে বাধ্য থাকে। অপরদিকে ধনী বর্গও অনেক প্রকার সমস্যার মধ্যে ঘিরে থাকে। সেইজন্য চলুন একটি ন্যায়শীল অর্থব্যবস্থা স্থাপন করার চেষ্টা করি। যার নির্মাণ আমি করে দিয়েছি। আপনারা সকলে এই পুস্তক অধ্যয়ন করলেই তা বুঝতে পারবেন। এখন এই ব্যবস্থাটিকে প্রতিষ্ঠিত করাই কেবলমাত্র অবশিষ্ট কর্ম হিসেবে রয়েছে যা নির্ভর করছে জনগণের উপর। যদি সমস্যাবিহীন সুখসম্পন্ন জীবন উপভোগ করতে হয় তবে এই নতুন ব্যবস্থাকে নিয়ে আসুন, অন্যথা যেমন আছেন তেমন থাকুন। সিদ্ধান্ত নেওয়াটা জনগণের উপর। তবে হ্যাঁ এখন আর বলতে পারবেন না কোনো সমাধান আমাদের কাছে নেই তাই কিছু করার নেই। আসুন এই ন্যায়শীল অর্থব্যবস্থাকে বুঝে নিই।
অর্থের পরিভাষা
যেসব বস্তু বা পরিষেবার মাধ্যমে আমরা সুখ অনুভব করি তাদের অর্থের শ্রেণীতে রাখব। আর যেসব বস্তু বা পরিষেবার মাধ্যমে দুঃখ অনুভব করি তাদের অনর্থের শ্রেণীতে রাখব।
জ্ঞান থেকে যে সুখ প্রাপ্তি হয় তা যেমন আমাদের কাছে অর্থ; তেমনি কর্ম থেকে যে সুখ পাওয়া যায়, ভোগ থেকে যে সুখ পাওয়া যায় এবং বিশ্রাম থেকে যে সুখ পাওয়া যায় সেটিও আমাদের
জন্য অর্থ। বিশ্রাম করার জন্য যে পরিবেশ ও পরিষেবার প্রয়োজন হয় যেখানে আমরা ভালোভাবে বিশ্রাম করতে পারব সেইরকম সুখসুবিধাও আমাদের জন্য অর্থ। আর এর বিপরীতে যা কিছু থেকে দুঃখ অনুভব হয় সেইসব আমাদের জন্য অনর্থ। এইবার প্রথম কথা হল এই ‘অর্থ’ নির্মাণের ব্যবস্থা কীভাবে করা যায় যা ন্যায়শীল হবে। অর্থাৎ অর্থের নির্মাণ হবে শুধুমাত্র সুখের জন্য। এমনটি নয় যেমন করে অতীতে রাজা-বাদশারা বলপূর্বক প্রাসাদ বা মহল ইত্যাদি নির্মাণ করাতো। ওইসব নির্মাণ অন্যায়পূর্ণ ছিল। এখন তো মূল কষ্টিপাথর আমাদের কাছে রয়েছে তা হল সুখ। যদি ওইসব নির্মাণ সকল মানুষের সুখের জন্য হতো তবে তাকে ন্যায়কারী নির্মাণ বলা যেত। এইজন্য আমাদের জানতে হবে কতপ্রকার পদার্থ বা পরিষেবা আমাদের কাজে লাগে যা থেকে আমরা সুখ পেয়ে থাকি এবং যাকে আমরা অর্থ বলতে পারি। এদের মোট চার প্রকারে ভাগ করা যেতে পারে। কৃষির মাধ্যমে প্রস্তুত করা বস্তু অথবা প্রদান করা পরিষেবা, শিল্পকর্মের মাধ্যমে প্রস্তুত করা বস্তু অথবা প্রদান করা পরিষেবা, প্রশাসনের মাধ্যমে প্রস্তুত করা বস্তু অথবা প্রদান করা পরিষেবা এবং নেতৃত্বের মাধ্যমে প্রস্তুত করা বস্তু অথবা প্রদান করা পরিষেবা। এই চার প্রকার অর্থকে সুখপূর্বক কীভাবে নির্মাণ করা যেতে পারে তা আমরা এই পুস্তুক থেকে জানব। দ্বিতীয় কথা যেটি জানব তা হল সুখপূর্ণভাবে অর্থের বণ্টন কীভাবে হবে যেন তা সকলের ইচ্ছে অনুযায়ী তাদের কাছে পৌঁছে যায়। এইসব বিষয়ও অর্থশাস্ত্রের অন্তর্গত। যা পরবর্তী অধ্যায়ে এই পুস্তক থেকে আপনারা জানতে পারবেন।
কৃষিক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছে ও যোগ্যতা অনুযায়ী যারা কর্ম করবে এবং যা কিছু উৎপাদন করবে তার সব তথ্য প্রশাসনের কাছে থাকবে। কেননা চাহিদা সংক্রান্ত সকল তথ্য সরকারের কম্পিউটারে থাকবে। কোন কোন বিভাগ থেকে সমাজের জন্য কোন বস্তুর কতটা চাহিদা রয়েছে এইসব তথ্যও সরকারের কাছে থাকবে। এইসব তথ্যের ভিত্তিতেই সরকার চাহিদা, নির্মাণ এবং বিতরণের কর্ম পরিচালনা করবে। এই নতুন ব্যবস্থায় সমস্ত রকমের চাহিদা সরকার সরাসরি জানতে পারবে। সরকার এই চাহিদার ভিত্তিতে নির্মাণ কর্ম সময়ের মধ্যে সমাপ্ত করবে। একইভাবে উৎপাদনশিল্পের ক্ষেত্রেও কোনো বস্তু ও পরিষেবা কোনো বিভাগ থেকে কতটা চাহিদা রয়েছে সেই মত সরকার বস্তু ও পরিষেবার নির্মাণ এবং বিতরণ করবে। সরকারের এই প্রকার নীতি থাকার ফলে কোনো বস্তু ও পরিষেবা কমও পড়বে না আবার প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্তও হবে না। সর্বদা সমতা বজায় থাকবে। কেননা চাহিদার আধারে বস্তু এবং পরিষেবা নির্মাণ করা হবে। মূল্যবৃদ্ধি নামক সমস্যা থেকে চিরকালীন মুক্তি মিলবে। কৃষিক্ষেত্রের জন্য চাষি ভাইদেরকে যেহেতু ঋতু বা পরিবেশের উপর নির্ভর করতে হয় তাই প্রয়োজনের অতিরিক্ত উৎপন্ন করা হবে। কেননা বর্তমানে দেখা যায় কোথাও খরা বা অন্য কোনো দুর্যোগ দেখা দিলে জরুরী ভিত্তিতে সমাধানের জন্য সরকারের কাছে কোনো সমাধান থাকে না। এই সমস্যাটির সমাধান হয়ে গেলে কৃষিক্ষেত্রে অধিক উৎপাদন করার প্রয়োজন পড়বে না। এইভাবে অন্যান্য বিভাগেও সরকার সমতা বজায় রাখতে পারবে। প্রথমে যে ব্যক্তি নিজের চাহিদা জানাবে তাকেই প্রথমে বিতরণ করা হবে। ধারাবাহিক নম্বরের ভিত্তিতে বিতরণ করা হবে। প্রশাসনিক সুখসুবিধা তো রাজনৈতিক ক্ষেত্রফলের ভিত্তিতে এমনিতে সকলে পেয়েই যাবে। যেমন— সড়ক, আবাস, বিদ্যুৎ, জল ইত্যাদি। শিক্ষণ-প্রশিক্ষণও সকলে তাদের রুচি ও ইচ্ছে অনুযায়ী পেয়ে যাবে। সংরক্ষণও সকলে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী পেয়ে যাবে। মূল সম্পদ বা প্রাকৃতিক সম্পদ যাই বলুন সে তো সকলের জন্য সমানভাবেই থাকবে। যার কোনো মূল্য নির্ধারণ করা থাকবে না। কেননা তার জন্য তো ভিন্নভাবে কেউ শ্রম ব্যয় করেনি। সকল প্রাকৃতিক সম্পদের উপর সকলের সমান অধিকার। সে মনুষ্য হোক বা অন্য জীবজন্তু। অর্থাৎ এইসবের তো কোনো মূল্য হয় না। কিন্তু কোনো মনুষ্য দ্বারা যখন কোনো বস্তু এবং পরিষেবা নির্মাণ করা হয় তখন সেখানে মনুষ্যের শ্রমের প্রয়োজন হয়। তার শক্তি ও সময় ব্যয় হয়। এতে প্রতিটি নির্মিত বস্তু ও পরিষেবার একটি মূল্য নির্ধারিত হয়ে যায়। এর অর্থ পরিশ্রমই হচ্ছে একমাত্র পূঁজি যার মাধ্যমে নির্মিত বস্তু বা পরিষেবার মূল্য নির্ধারিত হয়। এছাড়া অন্য কোনো কারণ নেই। তাৎপর্য এই দাঁড়াচ্ছে যে যদি আমরা কোনো বস্তু বা পরিষেবার মূল্য নির্ধারণ করার জন্য অন্য কোনো মাধ্যমের প্রয়োগ করি তাহলে তা অন্যায় হবে। কিন্তু এই নতুন ব্যবস্থায় তো শ্রমের মূল্যাংকন করার প্রয়োজনই পড়বে না। কারণ যার যখন যেমন প্রয়োজন নতুন ব্যবস্থার কাছে দাবী করতে পারবে এবং তা পেতে থাকবে। তাহলে শ্রমের মূল্যাংকন করার তো কোনো অর্থ থাকছে না। এই নতুন ব্যবস্থায় না তো কোনো অর্থ-মূল্যের স্থান রয়েছে না কোনো শ্রম-মূল্যের স্থান রয়েছে। যার যা প্রয়োজন সর্বদা তারা পেতেই থাকবে। এইভাবে সকলে সমানভাবে সুখী হয়ে যাবে। এই নতুন ব্যবস্থা তৈরি করার উদ্দেশ্যও তো তাই। আমরা বলতে পারি— যে ব্যবস্থা আমাদের জীবনের উদ্দেশ্যকে পূরণ করে দেয় সেই ব্যবস্থাকেই ন্যায়শীল ব্যবস্থা বলা যাবে। এবং সেই অর্থশাস্ত্রকেও ন্যায়শীল অর্থশাস্ত্র বলা যাবে। আজ অবধি যে সকল অর্থশাস্ত্র এসেছে তা মনুষ্য জীবনের লক্ষ্যকে পূরণ করতে পারেনি এবং তা করতে পারবে এমন কোনো আশাও দেখা যাচ্ছে না। তাহলে আজ পর্যন্ত যে অর্থশাস্ত্র চলে আসছে তাকে তো অন্যায়কারীই বলতে হবে। বরং একে বিধ্বংসী অর্থশাস্ত্র বলা উচিত। কারণ এর জন্য মানুষ একে অপরের শত্রু হয়ে উঠেছে। একজন আরেকজনকে বিনাশের কাজে লেগে রয়েছে।
ন্যায়শীল অর্থব্যবস্থার মুখ্য
বিষয়সমূহ
১. আর্থিক কর্মকাণ্ডের তিনটি বাস্তবিক স্বরূপ নির্ধারণ— চাহিদা (Demand), উৎপাদন (Production) এবং বিতরণ (Supply)।
2. এই তিনটি আর্থিক কর্মের ন্যায়শীল সঞ্চালন।
৩. আর্থিক নিয়মনীতি ও সিদ্ধান্তকে ন্যায়শীল পদ্ধতিতে নির্ধারণ করা।
৪. সরকারের মাধ্যমে মুদ্রার ব্যবহার কেবলমাত্র সরকারি গণনা করার কাজেই ব্যবহার করা হবে। জনগণের জন্য এর বিশেষ কিছু গুরুত্ব থাকবে না। জনগণের যা প্রয়োজন তা তারা পেয়ে যেতে থাকবে।
৫. জনগণের জন্য শিক্ষা, জীবিকা, সুখসুবিধা এবং সংরক্ষণ— এই চারটি অধিকার ন্যায়শীল ভাবে প্রতিষ্ঠা করা।
৬. সকলের জন্য ইচ্ছে অনুযায়ী শিক্ষা ও যোগ্যতা অনুযায়ী সকলের জন্য জীবিকা, প্রতিটি গ্রাম/নগরে সমস্ত সুখসুবিধা এবং পরিষেবা
প্রদান। সার্বিকভাবে সুরক্ষার সুনিশ্চিত ব্যবস্থা।
৭. রুচি অনুযায়ী জনগণের জন্য ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মোক্ষ এই চার পুরুষার্থের সিদ্ধি।
যে কোনো দেশের পক্ষে সঠিকভাবে জীবনযাপনের জন্য নিন্মলিখিত চারটি আধার আবশ্যক—
১. সম্পদ
২. সংস্কৃতি
৩. সভ্যতা
৪. সিদ্ধান্ত
সম্পদ তো প্রাকৃতিকভাবে সংসারের মধ্যেই রয়েছে। এই সম্পদের উপর সকলের সমান অধিকার রয়েছে। স্থুল শরীর নিয়ে জীবন নির্বাহ করার জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদির প্রয়োজনীয়তা সকলের সমানভাবে রয়েছে।
এরপর প্রয়োজন হয় সংস্কৃতির অর্থাৎ জ্ঞান-বিজ্ঞানের। যার দ্বারা সকলের ব্যক্তিত্ব নির্মিত হয়। কোনো এক অশিক্ষিত মানুষের কাছ থেকে আমরা এমন কিছু আশা করতে পারি না যার কাছে কোনো জ্ঞান নেই। উপরে এটি উল্লেখ করা হয়েছে যে আমরা একে অপরের সাহায্য নিয়েই সুখী জীবন উপভোগ করতে পারি। একা একা নয়। জীবন কী, কীভাবে কাটানো উচিত, কার প্রতি কেমন ব্যবহার করা উচিত ইত্যাদি শেখানোর জন্য কোনো একটি মাপদন্ডযুক্ত শিক্ষা পদ্ধতি প্রয়োজন। অর্থাৎ মানুষের জীবনকে সংস্কৃতির আধারে সংস্কারযুক্ত করাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। সকল মনুষ্য একে অপরের সাথে যেন সহজেই সহযোগিতা করতে পারে। এরজন্য সঠিক আধার হতে পারে শিক্ষা। এমন নয় যে কোনো মানুষ মন্দ হয়ে গেছে আর শিক্ষার মাধ্যমে তাকে শোধরাতে হবে। মানুষ প্রাকৃতিকভাবে ভালো হয়েই জন্মগ্রহণ করে থাকে। শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র এটিই হবে যে সেইসব নিয়মনীতি সম্পর্কে শিশুদের অবগত করানো যার আধারে সমাজে বসবাস করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো শিশুকে পথে চলাচলের নীতিনিয়ম না বলা হয় তবে পথে চলাফেরা করার সময় সে বুঝতে পারবে না তাকে কী করতে হবে। সে বিভ্রান্ত হবে অথবা নিজের মত করে চলার চেষ্টা করবে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটবে। এবং নিজের জন্য ও অন্যের জন্য দুঃখ বয়ে আনবে। এখানে শিক্ষা যেটি করবে তা হল তাকে পথে চলাফেরা করার নীতিনিয়ম সম্পর্কে অবগত করাবে এবং তার অভ্যাস করাবে। এখন আমরা বুঝে গিয়েছি যে শিক্ষা কাউকে শোধরানোর জন্য নয় বরং উপযোগী জ্ঞান প্রদান করার জন্য। শিক্ষার উদ্দেশ্য এটিই। এইভাবে সমস্ত ব্যবস্থার সকল নীতিনিয়ম ও উপযোগী জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে অবগত করানোই শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে নাকি কাউকে শোধরানো। সকলে নিজেকে শুধরে নিয়েই বসবাস করে। আর যাদের মন্দ হতে দেখা যাচ্ছে তা কেবলমাত্র ভুল ব্যবস্থার কারণে। অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের ফলে শরীর যেমন অসুস্থ্য হয় ঠিক সেইভাবে ভুল ব্যবস্থার কারণে ব্যক্তিত্বও বিকৃত হয়ে যায়। সম্পদ সকলের কাছে থাকলে সংস্কৃতি সকলের কাছে থাকলে সভ্যতার উদয় হয়। সভ্যতার অর্থ হচ্ছে সভ্যভাবে একে অপরের পূর্ণ সহযোগিতার মাধ্যমে একা অথবা পারিবারিক অথবা সামাজিকভাবে সুখী জীবন উপভোগ করা। সহজভাবে বললে সভ্য ব্যবহার করা, নিজের কর্মকে সহজভাবে পালন করা ইত্যাদি। সুতরাং সভ্যের তাৎপর্য হচ্ছে নীতিনিয়ম অনুসারে জীবন-যাপন। সভ্যতা ছাড়া বড় সুখসুবিধা উৎপন্ন করা যায় না। সভ্যতা ছাড়া আমরা কেবলমাত্র কৃষিনির্ভর জীবনযাপনের মধ্যেই রয়ে যাব। এর চাইতে অধিকতর সুখ নির্ভর করে সভ্যতা বিকাশের উপর। আমরা নিজের সাথে কেমন ব্যবহার করব, পরিবারের সাথে কেমন ব্যবহার করব, সমাজের সাথে কেমন ব্যবহার করব এবং সমষ্টির সাথে কেমন ব্যবহার করব— অর্থাৎ ব্যবহারই কোনো সভ্যতার অন্যতম ভিত্তি। আর সকলের শেষে রয়েছে সিদ্ধান্ত; যার অর্থ অন্তিমরূপে সিদ্ধ হয়ে গেছে। অর্থাৎ সকল প্রকার জ্ঞান-বিজ্ঞান অনুসারে জীবন-যাপন। আমাদের সম্পদ, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের সভ্যতার আধার তো মূলত সিদ্ধান্ত। জ্ঞান-বিজ্ঞানের মাধ্যমে বিকশিত সংস্কৃতিকেই সঠিক অর্থে সংস্কৃতি বলা যাবে। আর বর্তমানে জ্ঞান-বিজ্ঞান বিকাশের দ্বারা এটি প্রমাণিত হয়ে গেছে যে সংসারের সকল অনৈক্য একের মাধ্যমেই বিস্তার লাভ করেছে। একটি তত্ত্বই অনেকে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। আমরাও তো নিরন্তর সুখই পেতে চাই। তাহলে সিদ্ধান্ত এটিই যে আমরা সকলে এক থেকেই অনেক হয়েছি এবং আমাদের সকলের লক্ষ্যও এক। তা হচ্ছে সদা সুখী থাকা। তাই আমাদের নিজেদের সংস্কৃতিও এই সিদ্ধান্তের আধারেই তৈরি করে নেওয়া উচিত। যদি কারোর অন্য কোনো সিদ্ধান্ত ভালো লাগে তাহলে তিনি আগাম সম্মানীয় অতিথি হিসেবে আমার সাথে চিন্তন-মনন এবং আলোচনার জন্য আমন্ত্রিত। আর যদি সম্পূর্ণ আলোচনার পর এটি সিদ্ধ হয় উপরিউক্ত সিদ্ধান্ত ভুল তাহলে তৎক্ষণাৎ আমি এই সিদ্ধান্তকে ত্যাগ করব। যে নতুন সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসবে তাকে গ্রহণ করব। যদি উপরিউক্ত সিদ্ধান্ত সঠিক সিদ্ধ হয় তবে আপনাকেও তা সহজেই স্বীকার করে নেবার জন্য তৈরি থাকতে হবে। এমনটিই আশা থাকবে আপনার উপর। তারপরও আপনি স্বতন্ত্র যে স্বীকার করবেন কি করবেন না।
***


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন