মানবজীবন বিকাশের চার স্তর


অধ্যায় ১৩

 

মানবজীবন বিকাশের চার স্তর

তন, মন, প্রাণ ও আত্মাই হচ্ছে জীবনের চারটি স্তর। এই চারের সংযোগের মাধ্যমেই জৈবিক অস্তিত্ব প্রকট হয়। পদার্থ দ্বারা তন নির্মিত হয়। প্রকৃতি দ্বারা মন নির্মিত হয়। আলো দ্বারা প্রাণ নির্মিত হয়। অস্তিত্ব দ্বারা আত্মা নির্মিত হয়। তন, মন, প্রাণ ও আত্মার বিকাশই হচ্ছে মানব জীবনের সমগ্র বিকাশ।

 

 

১. তন = ক্রিয়াশক্তিই হচ্ছে তন।

২. মন = বাক্‌শক্তিই হচ্ছে মন।

৩. প্রাণ = ভাবশক্তিই হচ্ছে প্রাণ।

৪. আত্মা = চিত্তশক্তিই হচ্ছে আত্মা।

 

মানব জীবন বিকাশের লক্ষণ

 

১. শারীরিক বিকাশের লক্ষণ

মানুষের ভৌতিক অস্তিত্বকেই শরীর বলা হয়। অঙ্গ, ইন্দ্রিয়, অনুভূতি, বল ইত্যাদির সমুচিত বিকাশকেই শারীরিক বিকাশ বলা হয়। যার নিন্মলিখিত লক্ষণগুলি প্রকট হয়।

 

 

ক) অঙ্গ বিকাশ— পঞ্চ অঙ্গের বিকাশ।

খ) ইন্দ্রিয় বিকাশ— পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের বিকাশ।

গ) আবেগ বিকাশ— পঞ্চ আবেগের বিকাশ।

ঘ) বল বিকাশ— পঞ্চ বলের বিকাশ।

 

 

 

 

২. মানসিক বিকাশের লক্ষণ

 

মন, বুদ্ধি, চিত্ত ও অহংকারের মানবীয় অন্তঃকরণ চতুষ্টয়ের প্রকাশ অথবা পরিষ্কারকেই মানসিক বিকাশ বলা হয়। মননশক্তিই হচ্ছে মন। বোধশক্তিই হচ্ছে বুদ্ধি। স্মরণশক্তিই হচ্ছে চিত্ত। আত্মশক্তিই হচ্ছে অহংকার। এই চার লক্ষণ পরিষ্কার করাই হচ্ছে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।

 

 

ক) মননশক্তির বিকাশ— বিচারশীলতা, তর্কশীলতা, বাকপটুতার বিকাশ।

খ) বোধশক্তির বিকাশ— অর্থ, বিষয়-আশয় নির্ণয়ের বিকাশ।

গ) স্মরণশক্তির বিকাশ— গ্রহণশীলতা, বিষয়াসক্তি, বিলাসিতার বিকাশ।

ঘ) স্বভিমানের বিকাশ— জ্ঞান অর্জনের ইচ্ছে, কর্ম করার ইচ্ছে, ভোগ করার ইচ্ছে ইত্যাদি ঈশ্বরীয়তার বিকাশ।

 

৩. ভাবনাত্মক বিকাশের লক্ষণ

ভাবনাত্মক বিকাশই হচ্ছে প্রাণের বিকাশ। প্রাণশক্তিই ভাবতরঙ্গরূপে হৃদয়ের ভেতরে অনুভূত হয়।

 

 

ক) সংবেদনশক্তির বিকাশ— সরলতা, বিনম্রতা, উদারতা, দয়ালু ইত্যাদি ভাবশক্তির বিকাশ।

খ) শ্রদ্ধাশক্তির বিকাশ— স্বীকৃতি, আজ্ঞাকারী, অনুশাসনের বিকাশ।

গ) সংকল্পশক্তির বিকাশ— ব্রত, পণ, প্রতিজ্ঞা, শপথের বিকাশ।

ঘ) সংযোগশক্তির বিকাশ— একতা, বন্ধুতা, মিত্রতা, সহযোগিতার বিকাশ।

 

৪. চেতনাত্মক বিকাশের লক্ষণ

আত্মচেতনার সমুচিত বিকাশকেই আত্মিক বিকাশ বলা হয়। আত্মিক বিকাশের প্রভাবেই আত্মার মধ্যে ব্রহ্মত্ব, প্রত্যক্ষদর্শীতা, ঈশ্বরত্ব, চিদত্ত্বের উদয় হয়। যার লক্ষণ নিন্মলিখিত—

 

ক) ব্রহ্মত্ত্বের বিকাশ— সমদর্শিতা, সর্বব্যাপকতা, সর্বাত্মকতা, সর্বহিতকারিতার বিকাশ।

খ) প্রত্যক্ষদর্শীতার বিকাশ— নিষ্পক্ষ, নিরীক্ষণ, নির্লিপ্ততা, ন্যায়শীলতার বিকাশ।

গ) ঈশ্বরত্ত্বের বিকাশ— স্বাবলম্বিতা, স্ব-নিয়ন্ত্রণ, স্বতন্ত্রতা, সুস্থ্যতার বিকাশ।

ঘ) চিদত্ত্বের বিকাশ— একাগ্রতা, স্থিরতা, শূন্যতা, সমাধিতার বিকাশ।

 

 

 

মানবজীবন বিকাশের উপায়

 

১. শারীরিক বিকাশের উপায়

আহার বিহারই যে শারীরিক বিকাশের প্রধান উপায় তা জানা উচিত। পরিমিত আহার বিহারই হচ্ছে শারীরিক বিকাশের আধার। আহার বিহারের ভারসাম্য বিনষ্ট হলে শারীরিক বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং রুগ্নতা ঘিরে ধরে। আহার এবং খেলাধুলো হচ্ছে শারীরিক বিকাশের প্রমুখ উপায়।

 

২. মানসিক বিকাশের উপায়

শিক্ষাই হচ্ছে মানসিক বিকাশের প্রমুখ উপায়। মন, বুদ্ধি, চিত্ত এবং অহংকারের পরিচ্ছন্ন অবস্থাই হচ্ছে মানসিক বিকাশ। ভাষা, গনিত, সংজ্ঞান, দর্শন— এই চার বিষয়ে শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ দ্বারা মানুষের মানসিক বিকাশ অর্জন করা যায়।

 

৩. ভাবনাত্মক বিকাশের উপায়

সমুচিত সম্বন্ধ এবং ব্যবহারই হচ্ছে প্রাণ বিকাশের প্রমুখ উপায়। প্রেমপূর্ণ সম্বন্ধ এবং ব্যবহারকে আপন করে প্রাণ বিকাশের লক্ষ্যকে প্রাপ্ত করা যায়।

 

৪. চেতনাত্মক বিকাশের উপায়

সম্যক জ্ঞান এবং ধ্যানের আত্মিক বিকাশই হচ্ছে চেতনা বিকাশের প্রমুখ উপায়।

 

 

মানবজীবন বিকাশের লাভ

 

১. শারীরিক বিকাশের লাভ

শারীরিক বিকাশের প্রমুখ লাভ হচ্ছে ক্রিয়াশক্তি। ক্রিয়াশক্তির মূলে রয়েছে বল। কর্মসামর্থ্যই হচ্ছে বল। মানুষ কর্মশীল প্রাণী। কর্মই হচ্ছে মানব শরীরের বিশিষ্টতা।

 

২. মানসিক বিকাশের লাভ

মানসিক বিকাশের প্রমুখ লাভ হচ্ছে বাক্‌শক্তি। বাণীই হচ্ছে বাক্‌শক্তি। তর্কসামর্থ্যই হচ্ছে বাণী। মানুষের মধ্যে তর্ক করার ক্ষমতা থাকে। যৌক্তিকতাই হচ্ছে মানবীয় মনের বিশিষ্টতা। বিচার বিবেচনাই হচ্ছে তর্ক। কোনো বস্তুর পক্ষে বা বিপক্ষে চিন্তা করাকেই তর্ক বলা হয়। ভাল-মন্দ, ঠিক-ভুল, উচিত-অনুচিৎ, ন্যায়-অন্যায়, বরেণ্য-ত্যাজ্য, সৎ-অসতের নির্ণয় এই বাক্‌শক্তির দ্বারা হয়ে থাকে।

 

৩. ভাবনাত্মক বিকাশের লাভ

প্রাণিক বিকাশ হচ্ছে ভাবনাত্মক বিকাশের অভিপ্রায়। ভাবনাত্মক বিকাশের প্রমুখ লাভ হচ্ছে সংকল্পশক্তি। ব্রত, পণ, প্রতিজ্ঞা, শপথই হচ্ছে সংকল্পশক্তি। প্রাণই ভাবনাত্মক তরঙ্গরূপে ক্রিয়াশীল হয়ে থাকে। প্রাণের মধ্যে সংকল্পকে ধারণ করার ক্ষমতা থাকে। এই সংকল্পকেই পণ বলা হয়। প্রাণ দ্বারা এই সংকল্প বরেণ্য হবার কারণেই একে ব্রত বলা হয়।

 

৪. চেতনাত্মক বিকাশের লাভ

চেতনাত্মক বিকাশের প্রমুখ লাভ হচ্ছে বিবেকশীলতা। আত্মচেতনার বিকাশই হচ্ছে আত্মিক বিকাশ। বিস্তারিত জানার জন্য নিন্মে বর্ণনা করা হয়েছে।

 

 

 

শারীরিক ক্ষমতা এবং তা প্রাপ্তির উপায়

 

১. অঙ্গ, ইন্দ্রিয়, আবেগ, বল ইত্যাদি পরিছন্ন করুন। এইসব হচ্ছে শারীরিক ক্ষমতা। এই স্তরের ব্যক্তিদের ৬ ঘণ্টা অবিরত কর্ম করার শক্তি থাকে।

২. আহার, বিহার, ব্যায়াম এবং বিশ্রাম সমতা অনুযায়ী প্রয়োগ করলে শারীরিক ক্ষমতা বিকশিত হয়।

৩. সুপুষ্টতা এবং বলিষ্ঠতাই হচ্ছে শারীরিক ক্ষমতা।

৪. ক্রিয়াশীল হোন, শ্রমশক্তি বাড়ান।

৫. শরীর দ্বারাই শ্রম করা হয়। শ্রমশীলতায় শরীর সবল হয়।

৬. ক্রিয়াশক্তি দ্বারা কৃষি কর্ম হয়। বল ছাড়া কৃষিকর্ম সম্ভব নয়। সেইজন্য বলবান হোন।

৭. অন্ন, ফল, দুগ্ধ উৎপাদনই কৃষিকর্মের মূল উদ্দেশ্য।

৮. চাষবাস, উদ্যান এবং পশুপালনই হচ্ছে কৃষিকর্ম।

৯. ইন্দ্রিয়ের মহিমান্বিত অবস্থাই হচ্ছে শরীর। তাই কর্মেন্দ্রিয়কে মজবুত করুন।

১০. আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল, পৃথিবী হচ্ছে পঞ্চপদার্থ। পঞ্চপদার্থ দ্বারাই শরীর নির্মিত হয়।

১১. অন্ন মধ্যে পঞ্চ পদার্থ নিহিত রয়েছে। অন্ন দ্বারাই শরীর নির্মিত হয়। অন্নবান হোন, অতঃপর ভোগী হোন।

১২. অন্ন উপভোগের ফলে শরীরে পঞ্চতত্ত্বের পূরণ হয়ে থাকে। পুষ্টিগত উপাদানকেই অন্ন বলা হয়। অন্ন, ফল, দুগ্ধ ইত্যাদি হচ্ছে পুষ্টিগত উপাদান যা শরীরকে স্বাস্থ্যবান তৈরি করে। পরিমিত আহার উপভোগ করুন।

১৩. প্রাকৃতিকভাবেভাবে শারীরিক প্রেরণা থেকেই ক্ষুধা, পিপাশা, নিদ্রা ইত্যাদির অনুভূতি উৎপন্ন হয়ে থাকে। এইসব আবেগগুলির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখুন।

১৪. অন্ন দ্বারা ক্ষুধা শান্ত হয়। জল দ্বারা পিপাশা শান্ত হয়। বিশ্রাম দ্বারা ক্লান্তি দূর হয়। অন্ন, জল এবং বিশ্রামই হচ্ছে শরীরের প্রধান ভোগ। এই তিনের পরিমিত উপভোগ করুন।

১৫. শস্য উৎপাদন, উদ্যান এবং পশুপালন হচ্ছে কৃষিকর্ম। কৃষি কর্ম থেকেই অন্য উৎপন্ন হয়। কৃষিকাজের মাধ্যমে অন্ন উৎপাদন করুন। এর দ্বারা নিজের এবং অপরের শারীরিক বিকাশ করুন।

১৬. অন্ন উপভোগ না করে প্রাথমিক বলিষ্ঠতা অর্থাৎ শারীরিক পুষ্টতা পূর্ণ হয় না। বিভিন্ন প্রকার উপভোগের মাধ্যমেই ইন্দ্রিয়সমূহ সক্রিয় হয়।

১৭. উপভোগের মাধ্যমেই কর্মেন্দ্রিয় এবং জ্ঞানেন্দ্রিয় ক্রিয়াশীল হয়। ইন্দ্রিয়সমূহের ক্রিয়াশীলতা দ্বারা মন সক্রিয় হয়। ইন্দ্রিয়সমূহকে সক্রিয় না করে মানসিক বিকাশ সম্ভব নয়।

১৮. শারীরিক অবস্থাকে জয় করার জন্য মানসিক বিকাশ আবশ্যক। অতএবঃ উপভোগের মধ্যে সর্বদা সংলগ্ন থাকুন।

১৯. শরীরী উপভোগকে গুরুত্ব দিন। ইন্দ্রিয়সমূহ নিয়েই হচ্ছে শরীর। ইন্দ্রিয়সমূহ প্রয়োগের দ্বারা শরীরী উপভোগ হয়ে থাকে।

২০. শারীরিক প্রসন্নতার দ্বারা মনের বিকাশ দ্বার খুলে যায়। শরীরকে প্রসন্ন রাখুন। ইন্দ্রিয়সমূহকে প্রজ্বলিত রাখুন।

২১. যাদের শরীর পুষ্ট নয় তাদের মন বিকশিত হয় না। ইন্দ্রিয়সমূহের বিকাশ দ্বারাই মানসিক বিকাশের দরজা খুলে যায়। শরীর এবং ইন্দ্রিয়সমূহকে সক্রিয় রাখুন। শারীরিক মহিমার মূল উপাদান হচ্ছে অন্ন। অন্নবান হোন।

২২. অন্নই হচ্ছে পদার্থ। পদার্থই হচ্ছে শরীর।

২৩. অন্ন দ্বারা পৌষ্টিক উপাদানের পরিমিত উপভোগ করুন। নিজের ভোগসামর্থ্যের পৌষ্টিক উপাদানের উপভোগ কল্যাণকারী হয়ে থাকে।

২৪. পৌষ্টিক উপাদান দ্বারা ইন্দ্রিয় সমূহের উত্তম বিকাশ হয়। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুন্দর হয়। অনুভূতি শুদ্ধ হয়। বলশক্তি বৃদ্ধি হয়।

২৫. ক্ষুধা-পিপাশা হচ্ছে শরীরের মুখ্য অনুভূতি। ক্ষুধা-পিপাশাকে তৃপ্ত না করে শরীর পুষ্ট হতে পারে না। শারীরিক প্রয়োজনীয়তার অভিব্যক্তিই হচ্ছে ক্ষুধা পিপাশা। ক্ষুধা-পিপাশাকে অন্ন এবং জল দ্বারা তৃপ্ত করুন।

২৬. তামসিক অন্ন পরিত্যগ করুন। তামসিক অন্ন সেবনে শরীরে রোগ ব্যাধি বৃদ্ধি হয়। বাসি, উচ্ছিষ্ট, মলিন, দুষিত ইত্যাদি তামসিক অন্নের অন্তর্ভুক্ত।

২৭. অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, ইন্দ্রিয়সমূহ, অনুভূতি, বল ইত্যাদি বিকাশের দ্বারাই অন্তঃকরণ বিকাশের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। মন, বুদ্ধি, চিত্ত ও অহংকারই হচ্ছে অন্তঃকরণ।

২৮. ভাষা, গণিত, সংজ্ঞান, দর্শনের দ্বারা মন, বুদ্ধি, চিত্ত এবং অহংকার পরিশুদ্ধ হয়। অতঃপর নিজ ক্ষমতানুযায়ী এই চার বিষয়কে অধ্যয়ন করে মানবিক অন্তঃকরণ পরিশুদ্ধ করুন।

 

 

মানসিক ক্ষমতা এবং তা প্রাপ্তির উপায়

 

১. মন, বুদ্ধি, চিত্ত এবং অহংকারকে পরিচ্ছন্ন করুন। তর্ক, বোধ, স্মৃতি এবং স্বভিমানই হচ্ছে অন্তঃকরণ শুদ্ধিকরণের উপকরণ। এই স্তরের ব্যক্তিদের ১২ ঘণ্টা অবিরত কর্ম করার ক্ষমতা থাকে।

২. বোধসম্পন্ন হোন, কল্পনাশক্তি বাড়ান। এতে বাক্‌শক্তির উদয় হবে। বাক্‌শক্তির মাধ্যমেই মানসিক ক্ষমতা প্রখর হয়। আবার বোধশক্তিই হচ্ছে বুদ্ধি। কোনো বিষয় বোধের সামর্থ্যই হচ্ছে বুদ্ধি।

৩. বাণীর মাধ্যমেই তর্ক ব্যক্ত হয়। তার্কিক হোন, বাক্‌শক্তিকে উজ্জীবিত করুন। বাণীর মাধ্যমেই আদান-প্রদান হয়ে থাকে। বাকপটু হবার অভাস করুন।

৪. কোনো বিষয়ের সমষ্টিই হচ্ছে মন। ইন্দ্রিয় দ্বারা বিষয় বস্তু সেবনে মনের বিকাশ হয়। বিষয়বোধ বাড়ান, মানসিক ক্ষমতার জাগরণ ঘটবে।

৫. শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ এই হচ্ছে পঞ্চবিষয়।

৬. মানসিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা বিষয়াত্মক হয়ে থাকে। বিষয়বাসনাই মানসিক ব্যক্তিদের প্রধান লক্ষণ। বিষয়লিপ্সা জাগিয়ে তুলুন।

৭. শব্দবোধ, স্পর্শবোধ, রূপবোধ, রসবোধ ও গন্ধবোধের দ্বারাই মন প্রখর হয়। মনের প্রখরতা বাড়ানোর জন্য বিষয়কে উপভোগ করুন।

৮. কর্ণ দ্বারা শব্দ, ত্বক দ্বারা স্পর্শ, নেত্র দ্বারা রূপ, জিহ্বা দ্বারা রস ও নাসিকা দ্বারা গন্ধকে অনুভব করুন। বিষয়ের বিবিধ জ্ঞান বাড়ান।

৯. উৎপাদনশিল্প তিন প্রকারের— মৃদু, মধ্যম এবং উচ্চ। এই তিনটি উত্তরোত্তর উচ্চ কর্ম। নিজের যোগ্যতা ও রুচি অনুযায়ী উৎপাদনশিল্পকর্ম চয়ন করুন।

১০. বাণীর মাধ্যমেই আদান-প্রদান হয়। বাকপটুতা ছাড়া আদান-প্রদান সফল হয় না। বিচারশীলতা ছাড়া বাকপটুতা সিদ্ধ হয় না। ভাষাজ্ঞানকে প্রখর করে বাকপটু হোন।

১১. বাকপটুতার অর্থ হচ্ছে বিষয়বস্তুকে অন্যদের সামনে ভাল করে বিস্তৃতভাবে বোঝাতে পারা।

১২. বিষয়ভোগ থেকেই প্রাণ অলংকৃত হয়। প্রাণের জাগরণ থেকেই সংবেদনশীলতা বাড়ে। সংবেদনশীলতা থেকেই সম্বন্ধ বাড়ে। অতঃপর বিষয়ভোগের ত্যাগ না করে বরং তা সম্যকপূর্ণভাবে গ্রহণ করুন।

১৩. মনোরঞ্জক হোন। বিষয় হচ্ছে মন, বিষয়ভোগই হচ্ছে মনোরঞ্জন।

১৪. মনকে বিকশিত করার জন্য তনকে পুষ্ট বানান। সুপুষ্ট তনেই তো সুন্দর মনের বিকাশ হয়ে থাকে।

১৫. যাদের ইন্দ্রিয় বিকশিত নয় তাদের মনের যথোচিত বিকাশ হয় না। মনের বিকাশ ছাড়া বিষয়বোধ তৈরি হয় না। বিষয়বোধ ছাড়া মানসিক ক্ষমতা প্রাপ্তি হয় না।

১৬. সুখই হচ্ছে জীবনের অর্থ। সুখ বিষয় থেকে আসে। আর মন দ্বারা বিষয়ের জ্ঞান হয়ে থাকে। মনের সহায়তা দ্বারাই বিষয়ের অর্থবোধ তৈরি হয়। তাই মানসিক ক্ষমতাবান হোন।

১৭. নিষিদ্ধ বিষয় সেবনে মন কুণ্ঠিত হয়ে যায়। মনের বিষয়বোধ ক্ষীণ হয়ে যায়। মন কুণ্ঠিত হলে যোগ্যতার পতন ঘটতে থাকে।

১৮. তামসিক বিষয়ই নিষিদ্ধ বিষয়। কুশব্দ, কুস্পর্শ, কুরূপ, কুরস, কুগন্ধই হচ্ছে নিষিদ্ধ বিষয়। এসব থেকে দূরে থাকুন।

১৯. সুশব্দ, সুস্পর্শ, সুরূপ, সুরস, সুগন্ধই হচ্ছে প্রশস্ত বিষয়। এদের রমণ করুন। সুন্দর বিষয় রমণ করলে মন প্রতিভাবান হয়।

২০. বিষয়সেবনে মানসিক যোগ্যতা তৃতীয় চরণে প্রবেশ করে। নিন্ম, মধ্য, উচ্চ— এই তিন প্রকার মানসিক স্তর রয়েছে।

২১. উচ্চতম মানসিক অবস্থায় উপনীত হতে বিষয়ভোগে সংলগ্ন থাকুন।

২২. বিষয়ভোগ ছাড়া মনকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। বিষয়ভোগের প্রতি সর্বদা সজাগ থাকুন। বিষয়ের অভাব উৎপন্ন হতে দেবেন না। এরজন্য পর্যাপ্ত প্রয়াস করুন। ইচ্ছানুযায়ী ভোগের জন্য সর্বদা তৎপর থাকুন।

২৩. ক্ষমতানুযায়ী উপার্জন এবং ক্ষমতানুযায়ী উপভোগ সর্বদা কল্যাণকারী হয়ে থাকে। হিত এবং অহিতকে মাথায় রেখে বিষয়ভোগ করুন।

২৪. নিজ ক্ষমতার ন্যুনতম অথবা নিজ ক্ষমতার অধিক বিষয়ভোগ হাণিকারক। পরিমিত বিষয়ভোগ সর্বদা হিতকারী হয়। অতঃপর বিষয়ভোগে সামঞ্জস্য বজায় রাখুন।

২৫. উপভোগ ছাড়া উপার্জন ব্যর্থ।

২৬. বাসনাই মানসিক অবস্থার লক্ষ্য। বিষয়বাসনাই মানসিক স্তরের মনুষ্যের প্রধান লক্ষণ। বিষয়ের লালসা উৎপন্ন করুন। মানসিক ক্ষমতার বিকাশ হবে।

২৭. ভোগের মাধ্যমেই বাসনার পূর্তি হয়ে থাকে। বাসনা থেকেই মানসিক ক্ষমতার সিদ্ধি হয়।

২৮. বাসনার জাগরণ থেকেই বাসস্থান তৈরি হয়। সুন্দর আবাস থাকা মানসিক ক্ষমতার পরিচায়ক।

২৯. মানসিক ক্ষমতার বিকাশ থেকেই বিশ্ব গঠন হয়। মানসিক ক্ষমতা ছাড়া বিশ্ব থিতু হতে পারে না।

৩০. মনুষ্য বিকাশের জন্য মানসিক ক্ষমতার বিকাশ আবশ্যক। বসতির বিকাশ মানসিক ক্ষমতার প্রতিফলন।

৩১. মনুষ্যই বসতির নির্মাতা। বসবাসযোগ্য ভবনের নির্মাণ বিচক্ষণ মনুষ্যের লক্ষণ।

৩২. বাসনাকেন্দ্রই হচ্ছে আবাস। বাসস্থানকেই আবাস অথবা নিবাস বলা হয়।

৩৩. অধিষ্ঠানের ইচ্ছেই হচ্ছে বাসনা। রমণ হচ্ছে অধিষ্ঠান। রমণের আকাঙ্ক্ষাই হচ্ছে বাসনা। জগতে রমণকারীদেরই মনুষ্য বলা হয়। বাসনাকে বিকশিত করুন, মানসিক ক্ষমতা প্রাপ্তি হবে।

৩৪. বাসনা থেকেই বস্ত্রের বিকাশ হয়ে থাকে। সুন্দর বস্ত্র ব্যবহার করুন।

৩৫. বস্ত্র থেকে সৌন্দর্য বিকশিত হয়। সৌন্দর্য প্রাপ্তির জন্য সুন্দর বস্ত্রের সৃজন করুন এবং সংগ্রহ করুন।

৩৬. সময়ানুযায়ী বিভিন্ন প্রকার বস্ত্র ধারণ করে নিজ রূপের প্রতি অন্যান্য রূপবানদের আকর্ষণ করুন। এতে বাসনা বৃদ্ধি পাবে, মানসিক ক্ষমতার জাগরণ ঘটবে।

৩৭. বিবিধ রঙের এবং বিবিধ ঢঙের বস্ত্র ব্যবহার করুন।

৩৮. বিভিন্ন প্রকার সাহিত্য অধ্যয়ন করলে মানসিক বিকাশ হয়।

৩৯. প্রবেশ করা, জানা, গমন করা, ইচ্ছে হওয়া, চাওয়া, কামুক হওয়া, বিস্তৃত হওয়া, ব্যপক হওয়া, বিকশিত হওয়া, প্রসারিত হওয়াই মানসিক অবস্থা। যা জগৎকে থিতু করে রাখে।

৪০. নিজের শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধকে পরিশুদ্ধ করুন। এদের সুন্দর এবং মধুর করে তুলুন। মনের বিকাশ হবে, মন উচ্চতায় অবস্থান করবে।

৪১. নিজ সৌন্দর্য অভিবর্ধনের উপর বিশেষ ধ্যান কেন্দ্রীভূত করুন। নিজের চারপাশে সুন্দর পরিবেশ নির্মাণ করুন। সুন্দর বিষয়কে গ্রহণ করুন।

৪২. নিজের ত্বক, নিজের নখ, নিজের কেশ, নিজের বস্ত্র, নিজের ইন্দ্রিয় এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুপুষ্ট, সুন্দর, সুখময়, শুভ রাখুন এবং সমুন্নত রাখুন। মানসিক ক্ষমতা বৃদ্ধি হবে।

৪৩. বিষয়ভোগ এবং সাজসজ্জাতে অনাচার এবং অত্যাচার করবেন না। সম্যক আচার ব্যবহারই হচ্ছে সদাচার। সৌন্দর্য অভিবর্ধন, বিষয় অর্জন এবং বিষয়ভোগ সম্বন্ধীয় সমুচিত শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ গ্রহণ করুন।

৪৪. বিষয় উপার্জন এবং উপভোগ সম্পর্কিত সম্যক পুস্তকাবলী অধ্যয়ন করুন এবং সম্যক ব্যক্তিদের পরিচর্যা করে ক্ষমতাবোধ প্রাপ্তি করুন।

৪৫. বিষয়ের উপার্জন এবং উপভোগ নিয়ে যা কিছু জেনেছেন সেইসব অন্য কেউ জিজ্ঞেস করলে অবশ্যই বলুন এবং না জানা বিষয় নিয়ে অন্যের কাছে বিনম্রতার সাথে জিজ্ঞেস করুন।

৪৬. সকল বিষয়ের একটিই অয়ন তা হচ্ছে স্পর্শ। বিষয়ভোগ করার সময় অন্ততঃ সকল বিষয় একই অয়নে বিলীন হয়ে যায়। বিষয়ের স্পর্শ অয়নে বিলীন হয়েই সংবেদনশীলতা জাগ্রত হয়, যার ফলে সম্বন্ধের উদয় হয়। অতঃপর বিষয়পরায়ণ হোন।

৪৭. বিষয়সমূহ ত্যাগ করবেন না। বিষয় ত্যাগে মানবতার বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যায়। অবরুদ্ধ বিকাশ জগতে বিনাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

৪৮. সংস্পর্শ বিষয় থেকে শুদ্ধ প্রাণের জাগরণ হয়। জাগ্রত প্রাণ সংবেদনশীল হয়ে থাকে। সংস্পর্শ থেকে সম্পর্ক এবং সম্পর্ক থেকে সম্বন্ধ তৈরি হয়। সম্বন্ধ থেকে সভ্যতা উৎপন্ন হয়। বিষয়সেবন দ্বারা মানবীয় সভ্যতা প্রাপ্তি হয়। তাই বিষয়সেবী হোন।

৪৯. মনকে কুণ্ঠিত করবে এমন তামসিক বিষয় সেবন করবেন না। সাত্ত্বিক বিষয় সেবনেই মন প্রদীপ্ত হয়, প্রাণ জাগ্রত হয়।

৫০. যখন বিষয়ভোগ নিবৃত হতে থাকবে এবং সকল বিষয় একীভূত হয়ে সংস্পর্শে সমাহিত হতে থাকবে, তখনই সংবেদনশীলতা বা ভাবনাবস্থার লক্ষণ প্রকট হয়।

 

 

ভাবনাত্মক ক্ষমতা এবং তা প্রাপ্তির উপায়

 

১. প্রাণই হচ্ছে শক্তি। অর্থাৎ শক্তিশালী হোন।

২. প্রাণের ভেতর ধারণশক্তি রয়েছে, যাকে শ্রদ্ধা বলা হয়।

৩. প্রাণতরঙ্গই হচ্ছে ভাব, যাকে সংবেদনা বলা হয়।

৪. প্রাণে যা ধারণ করা হয় তাকে পণ বলা হয়। ব্রত বা সঙ্কল্পই হচ্ছে পণ।

৫. পণই হচ্ছে শপথ। পণই হচ্ছে প্রতিজ্ঞা।

৬. হঠকারী নয়, ব্রতচারী হোন। হঠতা হচ্ছে দুষ্টটা, ব্রত হচ্ছে বীরত্ব।

৭. বিবেকের সাথে বরণ করে নেওয়া সংকল্পই হচ্ছে ব্রত। অজ্ঞানতার সাথে গ্রহণ করা সংকল্পই হচ্ছে হঠকারিতা। সৎ বিবেক দ্বারা সৎব্রতী হোন, ভাবনাবস্থা প্রাপ্তি হবে।

৮. শূর নয় বীর হোন। দুঃসাহসই হচ্ছে অসুরত্ব। সৎসাহস হচ্ছে বীরত্ব।

৯. সৎজ্ঞানপূর্বক ধারণ করা ব্রত বীরত্বের লক্ষণ। মূর্খতাপূর্বক ধারণ করা হঠকারীতা অসুরতার লক্ষণ। সজ্জন হোন, বীর হোন।

১০. প্রাণই হচ্ছে ভাব। প্রাণই হচ্ছে বেদনা। প্রাণই হচ্ছে সূত্র। প্রাণই হচ্ছে সম্বন্ধ। প্রাণ জাগ্রত নাহলে সংবেদনশীল সম্বন্ধের উদয় হবে না। তাই প্রাণকে জাগ্রত করুন।

১১. প্রাণ হৃদয়ে নিবাস করে। হৃদয়ই হচ্ছে বৃক্ষ, বৃক্ষই হচ্ছে রক্ষক। আপন প্রাণকেন্দ্রের বিকাশ করুন।

১২. সংবেদনশীলতাই প্রাণকেন্দ্র বিকাশের লক্ষণ। ভাবপ্রবণই হচ্ছে সংবেদনশীলতা। হৃদয়কে সংবেদনশীল তৈরি করুন। ভাবপ্রবণ হোন, ভাবপ্রবণাবস্থা প্রাপ্তি হবে।

১৩. সরলতা, বিনম্রতা, উদারতা এবং দয়াই সংবেদনশীলতার পরিচায়ক।

১৪. একসমান বেদনার অনুভূতিই হচ্ছে সংবেদনা। পরপীড়ার অনুভূতিই হচ্ছে সংবেদনা। পরোপকার  এবং পরপীড়াকে অনুভব করুন, ভাবনাবস্থা প্রাপ্তি হবে।

১৫. বাসনা যখন সংবেদনায় পরিবর্তিত হয় তখন ভাবনাবস্থার উদয় হয়।

১৬. বিষয়াত্মকতাই বাসনা। সমবদ্ধতাই সংবেদনা। বাসনাতে বিষয়ত্ব এবং সংবেদনাতে আপনত্ব থাকে।

১৭. অধিষ্ঠানের ইচ্ছেই হচ্ছে বাসনা। অধিষ্ঠানের ভাবই হচ্ছে সংবেদনা। অন্যদের অধিষ্ঠান করে দিন। তাদের অধিকার রক্ষা করুন। এটিই হচ্ছে ভাবনাবস্থা।

১৮. পররক্ষক হোন, পরোপকারী হোন, পরহিতকারী হোন, পরসেবক হোন, পরপালক হোন, এটিই হচ্ছে ভাবনাবস্থা।

১৯. স্বহিত থেকে পরহিতে রূপান্তরই হচ্ছে ভাবনাবস্থা। স্বার্থকে পরমার্থে পরিবর্তনই হচ্ছে ভাবনাবস্থা। ‘স্ব’ কে পরের সাথে সম্মন্ধযুক্ত করুন, ভাবনাবস্থা প্রাপ্তি হবে।

২০. প্রাণই হচ্ছে সূত্র যা একজনের সাথে অপরজনকে জুড়ে রাখে। পারস্পরিক সম্মন্ধের অনুভূতিই হচ্ছে সংবেদনা। জাগ্রত প্রাণই সংবেদনশীলতা তৈরি করে। সম্মন্ধযুক্ত হোন। ভাবনাশীল হোন। পারস্পরিক সম্মন্ধকে বিকশিত করুন। বন্ধুত্বই হচ্ছে ভাবনাবস্থা।

২১. ব্রত, সংবেদনা, সংকল্প, শপথ, সম্বন্ধ, শ্রদ্ধা, সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা, সহকারিতা, সংঘবদ্ধতা, সহযোগিতাই ভাবনাবস্থার প্রমুখ লক্ষণ। এই লক্ষণসমূহকে বিকশিত করুন।

২২. জাগ্রত প্রাণেরই সুখ দুঃখ অনুভব হয়। সুখের অনুভবই হচ্ছে বেদনা। জাগ্রত প্রাণই সংবেদনশীল হয়ে থাকে।

২৩. প্রাণের কারণেই সকল জীবদের প্রাণী বলা হয়। জাগ্রত প্রাণের সংবেদনশীল মানুষদের সকল প্রাণীদের সাথে সম্বন্ধ অনুভব হয়। এটিই হচ্ছে প্রেম। প্রেমপূর্ণ হোন, ভাবনাবস্থা প্রাপ্তি হবে।

২৪. প্রেমই হচ্ছে ভাবনাবস্থা। সংবেদনশীলতাই হচ্ছে প্রেম। প্রেমকে বিকশিত করুন, ভাবনাবস্থা প্রাপ্তি হবে।

২৫. প্রাণ, অপান, বান, উদান এবং সমানই হচ্ছে পঞ্চপ্রাণের সমুচ্চয়। এই পঞ্চপ্রাণই দেহকে পালন করে থাকে। দেহ এবং দেশ একসমান। প্রাণবান ব্যক্তিই দেশকে পালন করে থাকে। জনগণ, সমাজ এবং রাষ্ট্রই হচ্ছেই দেশ। তাই সামাজিক হোন।

২৬. সংবেদনা দ্বারাই সেবা হয়ে থাকে। লোকপালনই হচ্ছে জনসেবা। সেবা প্রদানের জন্যই সেনা গঠন করা হয়। সেনাদেরই সৈনিক বলা হয়। সেবক অথবা সৈনিক সমার্থক শব্দ। সেবাভাবকে বিকশিত করুন। ভাবনাবস্থা প্রাপ্তি হবে।

২৭. জনসেবা দ্বারা প্রশাসনিক বিভাগের মাধ্যমে সেবকদের নিযুক্ত করা উচিত। সংবেদনশীল সেবাই হচ্ছে ভাবনাবস্থার ধর্ম।

২৮. সকল প্রাণীদের সুরক্ষা প্রদানকারীই হচ্ছে সেবক। প্রাণই হচ্ছে প্রাণীদের রক্ষক। সংরক্ষণের বিকাশ করুন।

২৯. প্রাণবান ব্যক্তিই প্রাণীদের রক্ষা করতে পারে। প্রাণই হচ্ছে সাহস, ধৈর্য, ধার্মিক, নিয়মশীলতা ও অনুশাসন। প্রাণবান হোন।

৩০. প্রাণের প্রিয় হচ্ছে যশ। যশই হচ্ছে কীর্তি। প্রাণ দ্বারাই সক্রিয়তা এবং সংবেদনা উৎপন্ন হয়। নিষ্ক্রিয় বস্তু প্রাণহীন হয়। সেইজন্য প্রাণই হচ্ছে কার্যপালক। কার্যপালক হোন, ভাবনাবস্থা প্রাপ্তি হবে।

৩১. নিয়মনীতি, নির্ণয়ই হচ্ছে কোনো সু-রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। সেইসবের পালন করার জন্য গঠিত নির্দিষ্ট বিভাগে সেবকদের নিযুক্ত করা উচিত। ভাবনাবস্থা প্রাপ্ত করুন, কার্যপালক হোন।

৩২. জনসেবাই হচ্ছে ভাবনাবস্থা। জনগণের সংরক্ষণই হচ্ছে ভাবনাবস্থা। ভাবনাবস্থা ছাড়া সেবকধর্ম পালন অসম্ভব। ভাবনাবস্থা প্রাপ্ত করুন।

৩৩. প্রশাসনিক কর্মই হচ্ছে সেবকের ধর্ম। জনগণের শিক্ষা, জীবিকা, সুবিধা, সংরক্ষন প্রদান করাই হচ্ছে প্রশাসন। ভাবনাবস্থা প্রাপ্ত করুন, দক্ষ প্রশাসক হোন।

৩৪. প্রশাসনের তিনটি ধর্ম— নিয়ম পালন, নীতি পালন এবং নির্ণয় পালন। এই তিন কর্মের জন্য প্রশাসনিক পদের সৃজন হয়। আপনার উত্তরদায়িত্ব পালন করুন। প্রশাসনই হচ্ছে রাজ্য। রাজ্যই হচ্ছে রক্ষণকর্ম। ভাবনাবস্থা প্রাপ্ত করুন।

৩৫. যাদের ইন্দ্রিয় ক্ষীণ, যাদের মন ক্ষীণ, তাদের প্রাণ বিকশিত হয় না। অতঃপর প্রাণের বিকাশ করার জন্য মন এবং ইন্দ্রিয় বিকাশ করুন। অর্থাৎ তন এবং মনকে বিকশিত করুন।

৩৬. যশই হচ্ছে সেবকের মহিমা। কীর্তি দ্বারাই সেবক মহিমামণ্ডিত হন। সৎকর্মী দ্বারা সুযশ এবং সুকীর্তি প্রাপ্তি হয়। দুষ্কর্ম দ্বারা অপযশ এবং অপকীর্তি প্রাপ্তি হয়। সৎকর্মী হোন।

৩৭. পদের অপহরণ কদাপি করবেন না। জনপদের অপহরণকারী জনতার মধ্যে কখনো সুযশ এবং সুকীর্তি প্রাপ্ত করতে পারে না।

৩৮. জনপদ, রাজ্যপদ এবং লোকপদে নিযুক্তির জন্য নিজেদের যথোচিৎ যোগ্যতার বিকাশ করুন। যোগ্যতা থেকেই পদের দায়িত্ব বহন করা যেতে পারে। অন্যথায় পদের গৌরব-গরিমা নষ্ট হয়ে যায়। তাই সুপাত্র হোন।

৩৯. যেসব মানুষ যশের উপভোগ করতে পারে না তারা সেবকপদ থেকে চ্যুত হয়ে যায়।

৪০. সৎভাব ধারণকারীরাই সংবেদনশীল হয়ে থাকে। অসৎভাব ধারণকারীরা কঠোর হয়ে থাকে। সৎভাব দ্বারা উত্থান, অসৎভাব দ্বারা পতন হয়। সৎভাব বিকশিত করুন, ভাবনাবস্থা প্রাপ্ত হবে।

৪১. সংস্পর্শ থেকেই সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। প্রাণীদের সাথে ব্যক্তির নিকট সম্বন্ধের মাধ্যমে সংস্পর্শ প্রাপ্তি হয়, সংবেদনশীলতা তৈরি হয়। সম্মন্ধের সংবর্ধন করুন, সংস্পর্শবান হোন।

৪২. সংস্পর্শ, সঙ্গম, সম্মন্ধ, সম্পর্ক এবং সম্ভোগ প্রাণের জাগরণে সহায়তাকারী হয়, যদি পারস্পরিক সহমতির ভিত্তিতে নির্মিত হয়। সহমত-সংস্পর্শবান্‌ হোন।

 

 

চেতনাত্মক ক্ষমতা এবং তা প্রাপ্তির উপায়

 

১. সকল প্রকার সুখ প্রাপ্তির জন্য এক তত্ত্ব থেকেই সম্পূর্ণ জগতের সৃষ্টি হয়েছে। এই সত্যের জ্ঞান এবং বোধ থেকে সত্য প্রাপ্তি হয়। সত্যকে পূর্ণরূপে জেনে নিয়ে তাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েই আত্মাবস্থা সিদ্ধ হয়ে থাকে।

২. আত্মাবস্থাই হচ্ছে বিবেক। আত্মিক বিকাশ করুন, তাতে বিবেক প্রাপ্তি হয়।

৩. চেতনার অবস্থাই হচ্ছে আত্মাবস্থা। চিত্তকে জাগ্রত করুন।

৪. ক্রিয়াকলাপ, বিচার, ভাবনার অধ্যক্ষ হচ্ছে বিবেক। বিবেকই হচ্ছে আত্মাবস্থার প্রমুখ লক্ষণ।

৫. প্রবৃত্তির সাক্ষী হচ্ছে বিবেক। যেসব প্রবৃত্তি নিজেকে অনুকূল রাখে তাই হচ্ছে বিবেকবান। বিবেকবানই হচ্ছে আত্মাবস্থা। বিবেকবান হোন, তাতে প্রত্যক্ষদর্শীতার বিকাশ হবে।

৬. সংস্কার হচ্ছে প্রবৃত্তি, স্বভাবই হচ্ছে প্রবৃত্তি এবং প্রকৃতিই হচ্ছে প্রবৃত্তি। প্রবৃত্তির উপর বিবেকের ইচ্ছানুযায়ী নিয়ন্ত্রণই হচ্ছে আত্মাবস্থা।

৭. প্রজ্ঞাই হচ্ছে বিবেক। জ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়াটাই হচ্ছে প্রজ্ঞতা। প্রজ্ঞায় প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিই হচ্ছে স্থিতপ্রজ্ঞ। প্রজ্ঞাবান হোন, বিবেকবান হোন। আত্মাবস্থা প্রাপ্তি হবে।

৮. সমদর্শীতাই হচ্ছে বিবেকশীলতা। সমদর্শীই সাক্ষীতে পরিবর্তিত হতে পারে। সঠিক পক্ষ অবলম্বনই হচ্ছে সমদর্শীতা। সমদর্শীই হোন। আত্মাবস্থা সিদ্ধ হবে।

৯. সঠিক পক্ষ নেওয়াই হচ্ছে ন্যায়শীলতা। ভ্রান্ত পক্ষকে সঙ্গ দেওয়া ন্যায়শীলতা হতে পারে না। ন্যায়শীলতা ছাড়া নিয়ম, নীতি, নির্ণয়, সম্যক হতে পারে না। ন্যায়শীল হোন। আত্মাবস্থা সিদ্ধ হবে।

১০. নিয়মই হচ্ছে বিধান, নীতি প্রণালীই হচ্ছে মন্ত্রণা এবং নির্ণয়ই হচ্ছে ন্যায়। নিয়ম, নীতি, নির্ণয়ই হচ্ছে নেতৃত্ব। সমদর্শী নয়নই হচ্ছে নেত্র। নেত্রবান হোন। নেতৃত্ব ক্ষমতা প্রাপ্তি হবে।

১১. জ্ঞানচক্ষুই হচ্ছে নয়ন। নয়নই হচ্ছে ন্য্যায়কারী নেত্র। সৎজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ন্যায়কারী নেত্র প্রাপ্তি হয় যা সমদর্শী এবং ন্যায়কারী হয়ে থাকে। জ্ঞানবান হোন, জ্ঞানচক্ষু উন্মুক্ত করুন। আত্মাবস্থা সিদ্ধ হবে।

১২. নেত্র থেকেই নেতৃত্ব তৈরি হয়। জননেতৃত্বের জন্য লোকনেত্র আবশ্যক। সার্বজনিকতাই হচ্ছে লোক। সর্বোত্তম নয়নই হচ্ছে ন্যায়কারী নেত্র। সর্বাত্মকতা প্রাপ্তি করুন, জ্ঞানচক্ষু উন্মুক্ত হতে থাকবে।

১৩. ইচ্ছের অধিপতিই হচ্ছে ঈশ্বর। নিজের ইচ্ছের অধিপতিই হচ্ছে ঈশ্বর। ইচ্ছেই হচ্ছে প্রকৃতি, অধিপতিই হচ্ছে ঈশ্বর। ঈশ্বরত্ব প্রাপ্তি করুন। আত্মাবস্থা সিদ্ধ হবে।

১৪. ইশ্‌ই হচ্ছে ইচ্ছে, বর হচ্ছে পতি। ইশ্‌যুক্ত বর হচ্ছে ঈশ্বর। ইচ্ছের অধিপতি হোন, ঈশ্বরত্ব প্রাপ্তি হবে।

১৫. অল্পশ্রেষ্ঠত্ব হচ্ছে শরীরী অবস্থা, অর্ধশ্রেষ্ঠত্ব হচ্ছে মানসিক অবস্থা, অধিশ্রেষ্ঠত্ব হচ্ছে ভাবনা অবস্থা, পূর্ণশ্রেষ্ঠত্ব হচ্ছে আত্মাবস্থা। ঈশ্বরীয়তার বৃদ্ধি করুন।

১৬. ব্যপকতা ছাড়া প্রত্যক্ষতা প্রাপ্ত হয় না। সংকীর্ণ অবস্থায় প্রত্যক্ষদর্শীতা উৎপন্ন হয় না। সর্ববব্যাপকতাতেই প্রত্যক্ষদর্শীতা উদিত হয়। আত্মসঙ্কোচ থেকে আত্মবিস্তারের পথে চলুন। আত্মাবান হোন।

১৭. উদাসীন অবস্থাই হচ্ছে আত্মাবস্থা। উত + আসীন মিলেই হয় উদাসীন। যার অর্থ হচ্ছে আজ্ঞাচক্রে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। এমন ব্যক্তিই আত্মাবস্থাযুক্ত হয়ে থাকে। আজ্ঞাচক্রই হচ্ছে তৃতীয় নেত্র। তৃতীয়নেত্রই হচ্ছে নায়ক। সৎ বা অসতের বিবেকই হচ্ছে তৃতীয় নেত্রের কার্য। নীর-ক্ষীরের বিবেকবান হংসতুল্য ব্যক্তিরই আত্মাবস্থা প্রাপ্তি হয়। বিবেকবান হোন, আত্মাবস্থা সিদ্ধ হবে।

১৮. শরীরী অবস্থা থেকে মানসিক অবস্থা, মানসিক অবস্থা থেকে ভাবনা অবস্থা এবং ভাবনা অবস্থা থেকে আত্মাবস্থা প্রকট হয়।

১৯. ক্ষুধা পিপাসা থেকে বাসনা, বাসনা থেকে সংবেদনা, সংবেদনা থেকে সৎবিবেকের জাগরণ ঘটে।

২০. তন থেকে ক্ষুধা পিপাসা, মন থেকে বাসনা, প্রাণ থেকে সংবেদনা, আত্মা থেকে সৎবিবেক প্রাপ্তি হয়।

২১. তন থেকে অন্নলিপ্সা, মন থেকে বিষয়লিপ্সা, প্রাণ থেকে যশলিপ্সা, আত্মা থেকে শ্রেয়লিপ্সা প্রাপ্তি হয়।

২২. চেতনসত্ত্বা সুখ উপভোগ করার জন্য বার বার এই সংসারে শরীর ধারণ করে। সুখ উপভোগই চেতনসত্ত্বার পরম লক্ষ্য।

২৩. আত্মাবস্থাতেই সঠিক প্রকার নেতা, বৈজ্ঞানিক, যোগী বা সন্ত হয়ে উঠতে পারে। আত্মাবস্থাকে বিকশিত করুন। লোকনায়ক, লোকবিজ্ঞানী, লোকউদ্ধারক বা লোকপথপ্রদর্শক হোন।

২৪. আত্মজ্ঞ ব্যক্তির সহজেই যোগ সিদ্ধ হয়ে যায়।

২৫. আত্মরঞ্জনই আত্মাবস্থার লক্ষণ। আত্মরঞ্জন করুন। আত্মাবস্থা প্রাপ্তি হবে।

২৬. শরীরী অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তির অন্ন যেমন প্রিয়, মানসিক অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তির বিষয় যেমন প্রিয়, ভাবনাবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তির যশ যেমন প্রিয় তেমনই আত্মাবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তির শ্রেয় হচ্ছে প্রিয়। প্রিয়তা প্রাপ্তি থেকে সুখ, সন্তুষ্টি, শান্তি এবং মোক্ষ গৃহীত হয়। তা নাহলে দুঃখ, অসন্তুষ্টি, অশান্তি এবং বন্ধনযুক্ত অবস্থা প্রাপ্তি হয়। এই হচ্ছে এই জগৎ সংসারের সারমর্ম। এছাড়া অন্য কিছু নয়।

 

***

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

একটি বিকল্প অর্থনীতি কেন জরুরী?