অনুবাদক প্রসঙ্গ

 

মাধব রঞ্জন সরকার

কোচবিহার জেলার গ্রামে নিন্মবিত্ত পরিবারে জন্ম। আলিপুরদুয়ার কলেজ থেকে কলাবিভাগে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন এবং কলকাতায় চলে আসেন। কলকাতায় আত্মীয়-পরিচিত কেউ ছিল না বলে এমনতর সিদ্ধান্তে কারোর সম্মতি ছিল না। ব্যয় করবার মত অতিরিক্ত অর্থও পিতার কাছে ছিল না। সেইসময় সেনাবিভাগে কর্মরত এক বন্ধুর কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের শেষ প্রান্ত তথা উত্তরে আলিপুরদুয়ার জেলা ও পূর্বে আসাম সীমান্তের কোণে অবস্থিত এক গ্রাম থেকে কেন কলকাতা শহরে আসবার সিদ্ধান্ত সুনিশ্চিত করে রেখেছিলেন এবং শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্য-নাটক-সিনেমার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন তার পেছনে নিশ্চয়ই সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। আয়ের উৎস ও পরিবারের কর্তা হিসেবে পিতার কর্তৃত্ব, অর্থনৈতিক টানাপড়েন, কলহ, পরনির্ভরশীলতা ইত্যাদি অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পারিবারিক জীবনের অন্তর্দ্বন্দ্বকে অল্প বয়সেই অনুভব করেছেন। গ্রামের অন্যান্য পরিবারেও একই সমস্যা দেখেছেন এবং সমাধান প্রদানে সমাজের ব্যর্থতাও দেখেছেন। অল্প বয়সেই তিনি অনুভব করতে পেরেছিলেন একটি পরিবারের সমস্যা শুধুমাত্র সেই পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তার ব্যাপ্তি ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্র থেকে বিশ্বের সাথে সম্পর্কযুক্ত। তিনি দেখেছেন গ্রামের ক্ষমতাবান ব্যক্তি, গ্রামপ্রধান, গ্রামপঞ্চায়েত থেকে শুরু করে থানা-পুলিশ পর্যন্ত সাধারণ কলহ কিংবা সামাজিক সমস্যার সমাধান প্রদানে বারংবার ব্যর্থ হয়েছে। এই উপলব্ধির কারণেই হয়তো সমাজের প্রতি ভাবনা প্রখরতা লাভ করেছিল এবং আজীবন স্বতন্ত্র জীবনযাপন করবেন এমনতর সিদ্ধান্তকে সুনির্দিষ্ট করে রেখেছিলেন। স্বাধীন জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষাই হয়তো শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। হয়তো টিভি-সিনেমায়-কাগজে শিল্পীদের দেখে ধারণা করেছিলেন তাঁরা স্বাধীন মনভাবাপন্ন হন, প্রভূত সম্মান পান এবং আনন্দময় জীবনযাপন উপভোগ করেন। স্থির করেন নিজেকে তৈরি করতে হবে। নৈতিক হতে হবে। মানবিক হতে হবে। সফলতা অর্জন করতে হবে এবং সমাজের জন্য কিছু করতে হবে।

কাজের সন্ধানে অজানা শহরের নানা প্রান্তে ছোটাছুটির পর অবশেষে একটি কনসালট্যান্সি ফার্মের সাহায্যে এক মিনারেল ওয়াটারের কোম্পানিতে শ্রমিকের কাজে যোগ দিয়ে কর্ম জীবনের পথ চলা শুরু করেন। তারপর একের পর এক ইন্টারভিউ দিতে থাকেন। অপেক্ষাকৃত ভাল চাকরি পান এবং একটি বড় থিয়েটার গ্রুপে যুক্ত হন। থিয়েটারের নানা কাজকর্ম, অভিনয়, রাষ্ট্রীয় নাট্য উৎসবে অংশগ্রহণ, বাংলাদেশ ভ্রমন ইত্যাদি অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এরপর সেক্টর ফাইভের একটি বহুজাতিক সংস্থায় চাকরি পান। এই সময়কালে মায়ের মৃত্যু হয়। মায়ের অকস্মাৎ মৃত্যুর ঘটনাটিই মূলত তাঁর জীবনে-মননে গভীর প্রভাব ফেলে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনের গতানুগতিক ভাবনা ত্যাগ করে অভ্যন্তরীণ জীবনের প্রশ্নগুলি উদয় হতে শুরু করে। এমনই ভেঙ্গে পড়েন যে, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা কিংবা পেশাগত সফলতা অর্জনের যে স্বপ্ন নিয়ে কলকাতায় এসেছিলেন তা অর্থহীন হয়ে পড়ে। এই গভীর বেদনা থেকেই তাঁর মনে ব্যক্তিগত সফলতার আকাঙ্ক্ষা এবং উদ্যমে প্রশ্নচিহ্ন চলে আসে। পরবর্তী সমস্ত কর্মে, গতিবিধিতে, জীবন-সংগ্রামে তিনি অভ্যন্তরীণ প্রশ্নসমূহের উত্তর সন্ধানের প্রয়াসই করেছেন। সংস্কৃতিমনস্ক হওয়ায় পছন্দের কর্মসমূহের প্রতি মনোযোগী হবার প্রচেষ্টা করেন। চলচ্চিত্র বিষয়ক একটি সরকারি কোর্স করেন। ছোটোখাটো কিছু কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। বন্ধুদের জন্য স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের বেশ কয়েকটি চিত্রনাট্য রচনা করে দেন। পরিচালক হবার প্রস্তুতি নেন। উত্তরবঙ্গকেন্দ্রীক একটি চিত্রনাট্য রচনা করেন এবং কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে অডিশন নেন। কয়েকটি গ্রুপ থিয়েটার থেকে অভিনেতা নির্বাচিত করেন এবং লোকেশন সুনির্দিষ্ট করেন। অবশেষে অসফল হন এবং আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। এই সময় এক বন্ধু হঠাৎ নেটওয়ার্ক মার্কেটিং ব্যবসায় যুক্ত করান। বোঝান স্বল্প ব্যায়ে অল্প সময়ে নিজের এবং বহু মানুষের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তৈরি হবে। সব ছেড়ে বছর কয়েক মনোযোগ দিয়ে কাজ করেন। কিছুটা সফলতাও পান। কাজের সূত্রে দেশের বিভিন্ন প্রদেশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। দ্বিতীয়বার বাংলাদেশ ভ্রমণ করেন। এরপর শিঙ্গাপুর ভ্রমন করেন। এই কাজের সুবাদে সমাজের নানা শ্রেণীর মানুষের সাথে মেলামেশার অভিজ্ঞতা হয় এবং তাদের অর্থনৈতিক সমস্যার দিকটি বিশেষভাবে অনুভব করেন। এইপ্রকার পেশা যে সিংহভাগ সদস্যদের উপার্জন প্রদানে ব্যর্থ তা উপলব্ধি করেন। সম্মান এবং আর্থিক ক্ষতি জেনেও ওই সংস্থা ত্যাগ করেন। এরপর ব্যবসা প্রারম্ভ করলেও অবশেষে স্তব্ধ করে দেন। অন্তরে কিছু একটা অসঙ্গতি উললব্ধি করেন। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আর্থিক সমৃদ্ধির প্রতিও উৎসাহের অভাব বোধ করেন। যেন বুদ্ধের সিদ্ধান্তই সঠিক বলে মনে হয়। নিরন্তর সংঘর্ষ এবং দুঃখভোগই অন্তিম সত্য। জীবনকে উদ্দেশ্যহীন এবং সমাধানহীন মনে হতে থাকে। সব ছেড়ে সন্যাসি হবেন মনঃস্থির করেন। কয়েকটি আধ্যাত্মিক সংস্থায় যাতায়াত শুরু করলেও অন্তরে অসামঞ্জস্য অনুভব করছিলেন। মনের গভীরে কোথাও যেন এক আত্মবিশ্বাস সুপ্ত অবস্থায় ভেসে চলেছে এই ভেবে যে, সমস্ত প্রশ্নের সঠিক উত্তর কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই খুঁজে পাবেন। শেষ পর্যন্ত সন্যাসি হবার সিদ্ধান্ত পরিত্যাগ করেন। ঘুরতে ঘুরতে কিছু স্বদেশপ্রেমিক মানুষের সাথে পরিচয় হয়। নতুনভাবে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বদেশী বস্তুর প্রচার-প্রসারে লিপ্ত হন। বিভিন্ন রাজ্যের সদস্যদের মিলিত উদ্যোগে একটি সংস্থা নির্মাণ করেন এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পুনরায় বড় টিম তৈরি করেন। কাজও শুরু হয়। ‘স্বদেশী চিকিৎসা এবং স্বদেশী ব্যবস্থা’ নামে একটি পুস্তক সম্পাদনা করেন। যদিও পরে বিভিন্ন কারণে প্রোজেক্টটি থেমে যায়। অন্যতম কারণ ছিল করোনা সংক্রমণ। বাণিজ্য-জীবিকা সবই প্রায় স্তব্ধ হয়ে যায়। তিনিও বিশ্রাম এবং অধ্যয়নের অবসর পান। এই সময়কালেই একটি বিশেষ ঘটনা ঘটে। ‘সম্পূর্ণ সমাধান’ এবং ‘সম্পূর্ণ জীবন দর্শন’ পুস্তক দুটির সাথে পরিচিত হন। যেন এক নিমেষে পুস্তক দুটির অধ্যয়ন সমাপ্ত করেন এবং স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়েন। দীর্ঘ সময় ব্যাপী যে প্রশ্নগুলিকে জমিয়ে রেখেছিলেন অবশেষে সেসবের উত্তর খুঁজে পান। জীবন দর্শন সম্পর্কে স্পষ্টতা পান। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ক্ষেত্রেই নয় বরং সকলের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যার মূল কারণ এবং স্থায়ী সমাধান সম্পর্কে সুনিশ্চিত হন। যেমনটি তিনি চেয়েছিলেন। এই প্রথম তিনি উপলব্ধি করেন সততা, নৈতিকতা, মানবিকতা কিংবা ব্যক্তিগত অপারদর্শিতার অভাব নয় মূল কারণ ব্যবস্থাগত। উত্তর খুঁজে পেয়ে থেমে থাকেননি বরং মানুষের সাথে আলোচনা-পর্যালোচনাও করে চলেছেন। যেন সকলে চিন্তন-মনন-সমীক্ষা করে স্থায়ী সমাধান সম্পর্কে স্পষ্ট হতে পারেন এবং একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন। তিনি স্ব-উদ্যোগে পুস্তক দুটি অনুবাদ করেন এবং প্রকাশিত করেন। ‘সম্পূর্ণ সমাধান’ পুস্তকে পেয়েছেন বহির্জগতের ব্যবস্থা বিষয়ক স্পষ্টতা এবং ‘সম্পূর্ণ জীবন দর্শন’ পুস্তকে পেয়েছেন অভ্যন্তরীণ জগতের স্পষ্টতা। বর্তমানে তিনি ULM Bangla ইউটিউব চ্যানেলের কন্টেন্ট নির্মাণ, লাইভ অনুষ্ঠান পরিচালনা, ব্যবস্থাকেন্দ্রিক সমাধান সংক্রান্ত আলোচনা, নতুন ব্যবস্থার প্রচার, অধ্যয়ন, আর্টিকেল রচনা, অডিও-ভিডিও নির্মাণ ইত্যাদি কাজে নিযুক্ত রয়েছেন। একইসাথে ‘নতুন দর্শনের রূপরেখা’ শীর্ষক একটি সংক্ষিপ্ত এবং সরল পুস্তকের সম্পাদনা প্রারম্ভ করেছেন। 


কার্ত্তিক, ১৪২৯      

কলকাতা- ৭০০০৪১         মাধব রঞ্জন সরকার


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

ব্যবস্থাগত অসম্পূর্ণতা নাকি নেতৃত্বের ব্যর্থতা?