মনুষ্যের বর্গীকরণ


অধ্যায় ১২

 

মনুষ্যের বর্গীকরণ

সকল মনুষ্যের পরীক্ষা করে সেই ফলাফলের ভিত্তিতে তাদের চার প্রকারে শ্রেণীবিভক্ত করা যেতে পারে এদের সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে নিন্মে বর্ণনা করেছি আমি এই কারণে মনুষ্যের বর্গীকরণ করেছি যেন নিজেদের মধ্যে ব্যবহারিক সম্পর্ক আরও সহজ ও সরল হয় এটি অধ্যয়ন করে অতি সহজেই জেনে যাবেন যে আপনি কোন প্রকারের মানুষ এবং অন্য মানুষের সাথে আপনার কি প্রকারের ব্যবহার করা উচিত যা বুঝে নিলে আপনার এবং অপরের মধ্যে সর্বাধিক সুখ অবস্থান করবে। আসুন তা জানার চেষ্টা করি এই বিষয়টি বুঝে নেওয়া অত্যন্ত্য জরুরী কারণ এটির প্রয়োজন রয়েছে। মানব সমাজে কর্মের নির্ধারণ এবং সেইসব কর্ম থেকে উৎপন্ন ভোগ বিতরণের জন্য মানুষের প্রকারভেদ করা পরম আবশ্যক কেননা সকল মানুষ প্রাকৃতিকভাবে এবং সাংস্কৃতিক প্রভেদের কারণে ভিন্ন-ভিন্ন হয়ে থাকে প্রতিটি কর্ম সম্পাদনের জন্য একপ্রকার বিশেষ যোগ্যতা, ক্ষমতা, কুশলতা এবং পছন্দের প্রয়োজন হয় যেন সেইসব কর্মকে সমাজের জন্য সঠিকভাবে সম্পন্ন করা যায় এবং ত্রুটির সম্ভাবনাও যেন ন্যুনতম থাকে মানুষ মুখ্যত চার প্রকারের হয়। এমনকি চার প্রকারের যোগ্যতাগুলিও ক্রমানুযায়ী হয়ে থাকে এই যোগ্যতাগুলি হচ্ছে শারীরিক, মানসিক, ভাবনাত্মক এবং চেতনাত্মক ক্ষমতামানব সমাজ তা থেকে চার প্রকারের শক্তি প্রাপ্ত করে থাকে ক্রিয়াশক্তি, বিচারশক্তি, ভাবনাশক্তি এবং চিত্তশক্তি এই চার প্রকার শক্তির বিশেষ গুণাবলী রয়েছে বল, বানী, সংবেদনা এবং বিবেক কর্মের জন্য এদের চার প্রকারের সামর্থ্য উৎপন্ন হয়ে থাকে ফলে সমাজে চার প্রকারের কর্ম সম্পাদিত হয় যেমন কৃষি, উৎপাদনশিল্প, প্রশাসন এবং নেতৃত্ব বল থেকে কৃষি, বানী থেকে উৎপাদনশিল্প, সংবেদনা থেকে প্রশাসনিক পরিষেবা এবং বিবেক থেকে নেতৃত্ব চার প্রকারের ক্ষমতার মাধ্যমে চার প্রকারের কর্ম সফলতার সাথে সম্পন্ন হয়ে থাকে যার মাধ্যমে সমাজ পূর্ণ সুখ প্রাপ্ত করতে পারে চার প্রকারের যোগ্যতায় প্রবেশাধিকারের ক্ষমতা সকল মনুষ্যের মধ্যেই থাকে জন্মের সময় কেবলমাত্র শরীরী অবস্থা প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ শরীরের জন্ম হয় কিন্তু যে কোনো মানুষ নিজের রুচি অনুযায়ী এবং নিজের প্রয়াস দ্বারা যে কোনো যোগ্যতা প্রাপ্ত করতে পারে শরীরী অবস্থা থেকে মনের অবস্থা, মনের অবস্থা থেকে ভাবনা অবস্থা এবং ভাবনা অবস্থা থেকে চেতনা অবস্থায় প্রবেশ সম্ভব সমস্ত যোগ্যতার মান এবং মূল্য সমান হবে শারীরিক বিকাশ হলে বল প্রাপ্ত হয় মনের বিকাশ হলে বানী প্রাপ্ত হয় ভাবনার বিকাশ হলে সংবেদনা প্রাপ্ত হয় এবং চেতনার বিকাশ হলে বিবেক প্রাপ্ত হয় এর অর্থ এই নয় যে এসবের মধ্যে কোনোটি ছোট রয়েছে অথবা কোনোটি বড় রয়েছে সকল স্তরের সুখ প্রাপ্তির জন্য সকল স্তরের কর্ম সম্পাদিত হওয়া আবশ্যক এর জন্য সকল স্তরের যোগ্যতা থাকা আবশ্যক এর তাৎপর্য এই যে সকলের কোনো না কোনো কর্মের যোগ্যতা থাকা উচিত তবেই সকলে একে অপরের সহায়তায় সকল প্রকারের ভোগ নির্মাণ করতে পারবে এর ফলে না কেউ মহান হবে, না কেউ তুচ্ছ হবেসমাজে যেন সকল প্রকার সুখ উৎপন্ন হতে পারে সেই প্রয়োজনে মনুষ্যের এই বর্গীকরণ অন্য কোনো অর্থ ভাবা উচিত নয় এই জগতে প্রতিটি মানুষ আপন বৈশিষ্টে অদ্বিতীয় একজনের সাথে অপর মানুষের তুলনা করার কোনো অর্থ নেই উদাহরণ হিসেবে আমরা যদি একজন দোকানদার এবং একজন গ্রাহককে ধরে নিই এই ভেবে যে এদের পরস্পরের মধ্যে ব্যবহার কখন সুখদায়ি হবে? তখনই হবে যখন এদের বর্গীকরণ হবে অর্থাৎ সকলের একটি পরিচয় হবে যখন কোনো বর্গীকরণ হবে না তখন কোনো পরিচয়ও থাকবে না বর্গীকরণ বা পরিচয় ছাড়া কে কোন জিনিস বিক্রি করবে এবং কে কোন জিনিস কিনবে তা জানতে পারা যাবে না যখন পরস্পরের কাছে কোনো পরিচয় থাকবে না তখন আমাদের কতই না সময় একে অপরকে খোঁজার জন্য ব্যয় হয়ে যাবে এবং প্রতিবার খুঁজতে হবে কিছু মানুষ যখন তার আশেপাশে থাকবে এবং দোকানদার হিসেবে জানবে তখনই তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে খোঁজার জন্য তার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলে লোকজন যেন বলতে পারে হ্যাঁ এখানে একজন বিক্রেতা থাকে বিক্রেতাও তখনই বিক্রি করতে পারবে যখন সে অন্য স্থান থেকে প্রথমে কিছু কিনে আনবে তাহলে সব মিলিয়ে যদি আপনি লক্ষ্য করেন এবং বোঝার চেষ্টা করেন যে একটি পরিচয় ছাড়া সঠিক ব্যবহার করা শুধুমাত্র কঠিন নয় অসম্ভবও বটে এবার দ্বিতীয় উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারবেন ধরুন যদি জানা না থাকে আমাদের সমাজে ডাক্তারবাবু মূলত কে ভাবুন একজন রোগীর কতই না অসুবিধে হবে একে তো সে অসুখের কারণে কষ্টে রয়েছে, অপরদিকে এই অবস্থায় যদি খুঁজে বেড়াতে হয় যে ডাক্তারবাবুকে কোথায় থাকেন তবে তো ভীষণ অসুবিধে হবে। সুতরাং আমাদের বুঝতে হবে মানুষের বর্গীকরণ কোন প্রয়োজনে করা হচ্ছে এই ধরণের বর্গীকরণের যে প্রয়োজন রয়েছে তা বুঝে নেওয়া উচিত এটিকে অন্য কোনো অর্থে ধরা উচিত নয় এইসব বিষয় বোঝার জন্যই তো শিক্ষা এবং সংস্কৃতির প্রয়োজন যেন সকলে সঠিকভাবে একটি কথার সমান অর্থ বুঝতে পারে নিজের মত করে নয় তাহলে এখন আপনাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে যে নতুন ব্যবস্থায় আমি কেন মানুষের বর্গীকরণ করেছি এটি নিজেদের সকল প্রকার ব্যবহারকে পূর্ণরূপে স্পষ্ট এবং সহজ করে দেয় আমাদের জীবনের যে লক্ষ্য রয়েছে তা অর্জন করতে সহজ করে তোলে এর অর্থ কাউকে মহান অথবা কাউকে তুচ্ছ বানানো নয় এখানে কেউ তুচ্ছও নয় মহানও নয় সকলে যখন একই তত্ত্ব থেকে অনেক হয়েছে তবে তো সকলে সমান তাই না? আপনার নিজের ভেতর দেখলে কি মনে হয় আপনার মধ্যে কোনোকিছুর অভাব রয়েছে? অথবা অন্য কারোর ভেতর কিছু অধিক রয়েছে? অথবা আমার কাছে কি অন্যের চাইতে অধিক কিছু রয়েছে? তা কিন্তু নয় সকলের আমি এক সমান তবে একথা সত্য আমরা একসমান হয়েও বিভিন্নতা রেখেছি যেমন আমাদের পছন্দ-অপছন্দ ভিন্ন, গঠন ভিন্ন, নাম ভিন্ন, কর্মের রুচি ভিন্ন এমনকি সমাজের মধ্যে আমাদের উপযোগিতাও ভিন্ন-ভিন্ন আপনাদের বুঝতে হবে যে এই বিভিন্নতার প্রয়োজনও রয়েছে আমাদের মধ্যে যদি বিভিন্নতা না থাকতো তাহলে আমরা বিভিন্ন প্রকার বস্তু অথবা পরিষেবা তৈরি করতে পারতাম না এবং সেসব ভোগ করতে পারতাম না এমনকি বিভিন্নভাবে সুখীও হতে পারতাম না আমাদের বিভিন্নতার কারণে নানা প্রকার সুখসুবিধার সম্ভাবনা বেড়ে যায় যা আমাদের সুখকে বহুগুন বাড়িয়ে দেয় তাহলে বিভিন্নতা নিতান্তই ভালো বিষয় মন্দ কিছু নয় এবার আমরা স্পষ্টভাবে বুঝে গিয়েছি যে মনুষ্যের বর্গীকরণের প্রয়োজনীয়তা মূলত কোথায় রয়েছে সমাজের সুখসুবিধার ভিত্তিতে আমি মনুষ্যকে চার ভাগে বিভাজিত করেছি সাধারণত সমাজে আমরা চার প্রকারের মানুষ দেখে থাকিআমি নিন্মে তাদেরকে শব্দের মাধ্যমে ব্যখ্যা করেছি

 

 

. শারীরিক স্তরের মনুষ্য (Physical Quotient— PQ)

. মানসিক স্তরের মনুষ্য (Intelligence Quotient— IQ)

. ভাবনাত্মক স্তরের মনুষ্য (Emotional Quotient— EQ)

. চেতনাত্মক স্তরের মনুষ্য (Consciousness Quotient— CQ)

 

শারীরিক স্তর

শারীরিক স্তরের ব্যক্তিদের সম্পূর্ণ শিক্ষা প্রাপ্তির পরও মানসিক স্তরের বিকাশ নিন্ম স্তরেই থাকে অর্থাৎ শিক্ষায় রুচি কম থাকে তাদের শারীরিক বিকাশই শুধুমাত্র সঠিকভাবে হয়ে থাকে যা মুলত আহার বিহারের মাধ্যমেই পূরণ হয়ে যায় এইসব ব্যক্তিরা কেবলমাত্র শারীরিক শ্রম সম্পর্কিত কর্মই করতে পারে যেমন কৃষিক্ষেত্রের অন্তর্গত কর্ম তাদের ইচ্ছেও মুলত খাবার, নিদ্রা ইত্যাদি নির্ভর হয়ে থাকে শারীরিক মনোরঞ্জন এবং শারীরিক প্রয়োজন মেটানোই এদের মূল ইচ্ছে হয়ে থাকে। এদের খাবার দাবারও অধিক পরিমাণে প্রয়োজন হয়। চাট, পকোড়া, ভাজাভুজি বা হাল্কা খাবারে এদের বিশেষ রুচি থাকে না শারীরিক স্তরের ব্যক্তিরা কেবলমাত্র নিজের জন্যই বাঁচে এদের বিয়েও মূলত পিতা-মাতার ইচ্ছেতেই সম্পন্ন হয়ে থাকে পরিবার সম্বন্ধে গভীর অর্থ এরা জানে না এরা খুব সাদা সিধে হয় এবং এদের ব্যবহারও খুব সাধারণ হয়ে থাকেএদের দেখে মনে হবে যেন এরা সংসার থেকে সন্যাস নিয়ে নিয়েছে না এরা অধিক বিষয়ভোগী হয়, না বাকপটু হয়, না এদের বিশেষ কোনো বন্ধুবান্ধব আপনি দেখতে পাবেন অর্থাৎ বিভিন্ন প্রকার সম্পর্কের প্রতি এদের বিশেষ রুচি থাকে না এদের দেখে এমন মনে হবে যেন কোনোপ্রকার মোহ নেই, কোনোপ্রকার বাসনা নেই বাইরে থেকে মনে হবে এদের সাথে যেন অন্য কারোর কোনোপ্রকার লেনদেন নেই এরা শান্তভাবে শুধুমাত্র নিজের নির্দিষ্ট কর্ম করতে থাকে এবং শারীরিক মনোরঞ্জন অবধিই সীমিত থাকে এই স্তরের ব্যক্তিরা ৬ ঘণ্টা অবধি অবিরত কর্ম করতে পারে এর অতিরিক্ত হলে অসুবিধে অনুভব করে থাকে

 

মানসিক স্তর

এই স্তরের ব্যক্তিদের সম্পূর্ণ শিক্ষা প্রাপ্তির পর মানসিক স্তরের বিকাশ ঘটে এরা কেবলমাত্র উৎপাদনশিল্প সম্পর্কিত কর্ম করতে পছন্দ করে এবং এই প্রকার কর্মেরই তারা যোগ্য হয়। এদের বানীর বিকাশ হয়ে থাকে, ফলে এরা কল্পনাপ্রবণ হয় এরা যে কোনো বস্তুর আকার প্রকারের সঠিক কল্পনা করে নিতে পারে এইজন্য এরা বিভিন্ন প্রকারের বস্তু তৈরি করতে সক্ষম হয় এদের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার শিল্পকলার বিকাশ ঘটে থাকে যদিও তা গভীর অবধি পৌঁছায় না এরা বিভিন্ন প্রকার ভোজন পছন্দ করে নানারকম কাপড় পরিধান করে এটিরও খেয়াল রাখে যেন নিজেকে এবং অপরকে সুন্দর দেখায় এই প্রসঙ্গে একটি কথা বলা প্রয়োজন যে ভোগ বিলাসকে নেতিবাচক বা ভুল ভাবা উচিত নয় কেননা ভোগ বিলাশের জীবনকে পূর্ণরূপে উপভোগ করার পরই পরবর্তী স্তরের বিকাশ সম্ভব হয় ভোগ্য বস্তুকে উপভোগ করার পরই তার ভেতর সংবেদনশীলতার বিকাশ ঘটে সংবেদনশীলতা বিকাশের কারণে সে অন্যের সুখ-দুঃখকে গভীরভাবে বুঝতে পারে অন্যকে নিয়ে ভাবতে পারে, অন্যের জন্য বাঁচতে পারে মানসিক স্তরের ব্যক্তিরা পরিবারের জন্যই বাঁচে কোনো একটি ভোগ থেকে দ্রুত মন ভরে গেলে অন্য কোনো ভোগের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণ চলে আসে এই জগৎ সংসারও পরিবর্তনশীল নিয়মের কারণেই এক থেকে বহুত্বে রূপান্তরিত হতে সক্ষম হয়েছে এই নিয়মের কারণেই সংসার স্থির রয়েছে এই নিয়ম সরিয়ে দিলে সমস্ত জগত-সংসার সমাপ্ত হয়ে যাবে একইভাবে আমাদের ইন্দ্রিয়ও সেই একই পরিবর্তনের নিয়ম অনুসারে তৈরি হয়েছে এবং স্থির রয়েছে এই নিয়মের কারণেই পছন্দ অনুযায়ী ভোগের পরিবর্তন ঘটে থাকে এবং মানুষ এক ভোগ থেকে অন্য ভোগে যাওয়া-আসা করে কেউ যদি হঠকারী হয়ে কোনো একটি ভোগের সাথে দীর্ঘ সময় অবধি থাকার চেষ্টা করে তবে কিছু সময়ের মধ্যেই উক্ত বিষয় সম্পর্কিত ইন্দ্রিয় ওই ভোগের সাথে একাত্ম হয়ে যায় যার কারণে সেই ইন্দ্রিয়ের ওই প্রকার ভোগ থেকে সুখ উপভোগ করার ক্ষমতা কমে যায় অথবা বন্ধ হয়ে যায় তাহলে সমস্ত জীবন সুখী থাকতে চাইলে আমাদের একে অপরকে স্বাধীনতা দিতেই হবে তাই ভোগ-বিলাসকে নেতিবাচকভাবে দেখা বন্ধ করতে হবেতা না হলে আমরা একে অপরকে দুঃখী করে তুলব এবং নিজেরাও দুঃখী হব অবশিষ্ট সব ভোগের প্রতিও এমনটি ভাবা উচিত মানসিক স্তরের ব্যক্তিরা নিজ স্বভাবেই ভোগ বিলাসী হয়ে থাকে ভোগের প্রতি এদের প্রবল আকর্ষণ থাকে যার ফলে ভোগের জন্য এরা যা খুশি করে ফেলে এদের জীবন হয় পারিবারিক স্তরের অর্থাৎ পরিবারের অন্য সদস্যদের সুখ-দুঃখের কারণে এরা নিজেরাও সুখী-দুঃখী হয়ে থাকে অন্যভাবে বলতে গেলে এদের সংবেদনশীলতা পরিবারের সদস্য অবধিই সীমিত থাকে মনোরঞ্জনই হচ্ছে এদের প্রিয় ইচ্ছে এরা ১২ ঘণ্টা অবধি অবিরত কর্ম করতে পারে এর অতিরিক্ত হলে এদের অসুবিধে হয়

 

ভাবনাত্মক স্তর

এই স্তরের ব্যক্তিদের শিক্ষা প্রাপ্তির পর মানসিক স্তরের সাথে সাথে ভাবনারও বিকাশ ঘটে অর্থাৎ ভাবের সাথে সম্বন্ধ তৈরি হয় এরা সাহসী হন বদনাম এবং মৃত্যুর মধ্যে যদি কোনো একটিকে নির্বাচন করতে হয় তবে এরা মৃত্যুকেই নির্বাচন করে এরা জেনে বুঝে এমন কর্ম কখনও করে না যা বদনামের কারণ হয় এরা না জেনে ভুল করতে পারে জেনে কখনও নয়এরা নিজের ভুল বুঝতে পেরে সাথে সাথে ক্ষমা চেয়ে নেয় এবং অনুশোচনাও করে আনন্দের সাথেএরা যে প্রকার চরিত্র ধারণ করে তাকে পূর্ণরূপে পালন করার চেষ্টা করে পূর্বের দুটি স্তরের ব্যক্তিদের কাছে চরিত্র থাকে না চরিত্র কেবলমাত্র ভাবনা স্তর থেকেই প্রারম্ভ হয় এখানে চরিত্রের তাৎপর্য হচ্ছে যেসব মানুষ ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক লাভ-ক্ষতির জন্য নৈতিকতা বিসর্জন দেয় না পূর্বের দুই প্রকার ব্যক্তিরা ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক লাভ-ক্ষতির ভিত্তিতে জীবন-যাপন করে পরের দু-প্রকার মানুষ পারিবারিক অথবা ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির আধারে নয় বরং সমাজ এবং সমষ্টির লাভ-ক্ষতির আধারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সেইজন্য এরা যা বলে মৃত্যু অবধি তাই করে যায় যে শপথ গ্রহণ করে তা স্বপ্নেও লঙ্ঘন করে না ভাবনাপ্রবণ হবার কারণে এরা একে অপরের সুখ-দুঃখ ঠিকমত বুঝতে পারে অন্যের দুঃখ এরা সহ্য করতে পারে না অন্যের দুঃখ দূর করার জন্য এরা সবকিছু করার জন্য তৎপর থাকে এরা অত্যন্ত সংবেদনশীল হয় এবং যে কোনো কথায় অনড় থাকার ক্ষমতা রাখে এরা প্রশাসন সম্পর্কিত কর্মই করতে চায় এবং তার যোগ্যতাও রাখে এদের ভোগবিলাসের প্রবৃত্তি মানসিক অবস্থার মানুষদের তুলনায় কিছু কম মাত্রায় থাকে এরা তখনই সুখে থাকতে পারে যখন তাদের নিজ অঞ্চলের মানুষ সুখে জীবন-যাপন করে এমন প্রকারের ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী প্রশাসনিক পদে নিযুক্ত করা উচিত এরা দুর্নীতিপরায়ণ হয় না, কেননা এতে বদনাম হয় আর এটি সকলেই জানে যে দুর্নীতির মাধ্যমে ধীরে ধীরে সকলের সুখ সমাপ্ত হয়ে যায়, যা এরা কখনই চায় না এরা সমাজের জন্যই বাঁচে এরা সামাজিক সম্পর্ককে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে স্বভাবে এরা সমাজপ্রেমী হয় এরা সমাজের জন্য জীবন কাটাতে অধিক সুখ অনুভব করে অনুশাসন এদের প্রিয় এরা আত্মিক স্তরের মানুষদের দ্বারা প্রভাবিত হয়, অতঃপর তাদের শাসন স্বেচ্ছায় স্বীকার করে নেয় শাসন বলতে সমাজের নিয়ম নীতিকেই বোঝায় ভাবরঞ্জন এদের প্রিয় হয়ে থাকে এরা ১৮ ঘণ্টা অবধি অবিরত কর্ম করতে পারে তার চেয়ে অতিরিক্ত হলে অসুবিধে অনুভব করে

 

চেতনাত্মক স্তর

এই স্তরের মানুষের সম্পূর্ণ শিক্ষা প্রাপ্তির পর মানসিক স্তর এবং ভাবনাত্মক স্তরের সাথে আত্মিক স্তরেরও বিকাশ ঘটে থাকে এমন ব্যক্তিরা ঠিক এবং ভুলকে পূর্ণরূপে জানতে সক্ষম হয় তথা সঠিকভাবে কার্য সম্পাদন করতে পারে কেবলমাত্র এই স্তরের ব্যক্তিরাই সঠিক নীতির নির্মাণ করতে পারে কেননা এরা যে কোনো সমস্যার মুল কারণ জেনে সেই সমস্যার উপযুক্ত সমাধান করতে পারে যেহেতু এরা সমস্ত সমষ্টির জন্য বাঁচে সেইজন্য কেবলমাত্র সঠিকের পক্ষ নেয় না পরিবারের পক্ষ নেয়, না কোনো সমাজের পক্ষ নেয় এরা সকলের মধ্যে নিজেকে দেখতে পায় এবং নিজের মধ্যে সকলকে দেখতে পায় নিজেদের ভেতরে বিবেক জাগ্রত থাকার কারণে এরা সবকিছুই পরিস্কারভাবে দেখতে পারে এবং জানতে পারে দূরদর্শী হবার ফলে সঠিক নীতিসমূহের খোঁজ করতে পারে এবং সকলের হিত ভেবে নীতিনিয়ম তৈরি করতে পারে কেবলমাত্র এদের ভেতরেই নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা থাকে এদের জীবন সাধারণত খুবই সরল প্রকৃতির হয় আত্মরঞ্জন এদের প্রিয় এরা স্বয়ং অথবা আপনার মধ্যে সন্তুষ্ট থাকে এদের নিজস্ব কোনো স্বভাব থাকে না প্রয়োজন অনুযায়ী এরা কোনো একটি ভাবকে ধারণ করার ক্ষমতা রাখে কেননা সকল ভাবের মধ্যেই এদের নিয়ন্ত্রন থাকে সর্বদা সমষ্টির হিত ভেবে এরা কর্ম করে যখন সমষ্টি পরিপূর্ণ সমৃদ্ধশালী হয় তখন এরা সকল স্বাস্থ্যবর্ধক ভোগ থেকে সুখ প্রাপ্ত করে এরা ২৪ ঘণ্টা অবধি অবিরত কর্ম করতে পারে ২৪ ঘণ্টা ধরে কর্ম করতে এদের কোনো অসুবিধে হয় না

 

মানব জীবন বিকাশের যাত্রা

সৃষ্টির উৎপত্তি এক পরম সত্যের ক্রমিক বিকাশ মাত্র এই পরম তত্ত্বই হচ্ছে সম্পূর্ণ জগতের অভিব্যক্তির আধার এই পরমতত্ত্বই হচ্ছে প্রাণ এই প্রাণ প্রকৃতিকে ধারণ করে প্রকৃতি অনুসারে পদার্থে অর্থাৎ সংসারে রূপান্তরিত হয় আলো হচ্ছে প্রাণ ইচ্ছে হচ্ছে প্রকৃতি অস্তিত্ব হচ্ছে পদার্থ পদার্থ পাঁচ প্রকারের হয় আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল এবং পৃথিবী এই পঞ্চ পদার্থকেই পঞ্চতত্ব বলা হয় এই পঞ্চতত্ব থেকেই সকল বস্তু নির্মিত হয়েছে জগতের প্রত্যেকটি সৃষ্টিতেই এই পঞ্চতত্ত্বের সমাবেশ রয়েছে এই শরীরে যা কিছু স্থূল তত্ত্ব রয়েছে তা হচ্ছে পৃথিবী, যা কিছু দ্রব্য তত্ত্ব রয়েছে তা হচ্ছে জল, শরীরে যে তাপ রয়েছে তা হচ্ছে অগ্নি, যা কিছু বল-শক্তি রয়েছে তা হচ্ছে বায়ু এবং শরীরে যে শূন্য ভাগ রয়েছে তা হচ্ছে আকাশ সৃষ্টির প্রতিটি অংশ নির্মাণে এই পঞ্চতত্ত্বের মূল সামগ্রী সংযুক্ত হয় পঞ্চতত্ত্ব দ্বারা নির্মিত এই শরীর চার মাত্রিক কেননা এতে আদি, মধ্য, অন্ত এবং এই তিনের দ্বারা মিলিত অস্তিত্ব সংযুক্ত রয়েছে অন্য ভাষায় বললে জন্ম, জীবন, মৃত্যু এবং এই তিনের মিলিত আধারকেই ক্রমশ চার মাত্রিক বলা হয়ে থাকে যে কোনো সৃষ্টির অভিব্যক্তি এই চার স্তরের সাথে সংযুক্ত রয়েছে যা লম্বা, চওড়া, মোটা এবং এই তিনের সংযুক্ত স্তরে সমাহিতএই চার স্তরের আধারেই জীবনচেতনা চার স্তরীয় হয়ে থাকে জাগ্রত, স্বপ্ন, সুষুপ্তি এবং তুরীয় এই চার স্তর থেকেই চার প্রকার শক্তির উদয় হয় ক্রিয়াশক্তি, বাক্শক্তি, ভাবশক্তি এবং চিত্তশক্তি এই চার প্রকার শক্তির বিকাশকেই মানব জীবনের সমগ্র বিকাশ বলা হয় শরীরে ক্রিয়াশক্তি, মনে বাক্শক্তি, প্রাণে ভাবশক্তি ও আত্মায় চিত্তশক্তি সমাহিত থাকে শরীর থেকে কর্ম, মন থেকে বাণী, প্রাণ থেকে সংকল্প এবং আত্মা থেকে সাক্ষীর উদয় হয়ে থাকে এটিই মানবজীবন বিকাশের পরিণাম মানব জীবন বিকশিত হবার কারণেই যোগ্য সিদ্ধ হয় এই চার স্তর উত্তরোত্তর উচ্চ যোগ্যতার স্তরে অগ্রসর হয় শারীরিক ক্ষমতা দ্বারা কৃষিকর্ম, মানসিক ক্ষমতা দ্বারা উৎপাদনশিল্প কর্ম, ভাবনাত্মক ক্ষমতা দ্বারা প্রশাসনিক কর্ম এবং চেতনাত্মক ক্ষমতা দ্বারা নেতৃত্ব কর্ম সম্ভব হয় এই ক্ষমতাসমূহের দ্বারাই শরীরী অবস্থা, মানসিক অবস্থা, ভাবনা অবস্থা এবং চেতনা অবস্থা নির্ধারিত হয় যার মধ্যে যেমন ক্ষমতা বিকশিত হবে সে তেমন কর্ম সম্পাদন করবে একটি কথা মনে রাখতে হবে কোনো নির্দিষ্ট অবস্থার বিকাশ ঘটানো আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য নয় ক্রিয়া শক্তির মাধ্যমে কৃষি কর্ম, বাক্শক্তির মাধ্যমে উৎপাদনশিল্প কর্ম, সংকল্প শক্তির মাধ্যমে প্রশাসনিক কর্ম এবং বিবেক শক্তির মাধ্যমে নেতৃত্ব কর্ম সম্পাদিত হয় মানবজীবন বিকাশ যাত্রার বিস্তৃত পরিচয় পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে

 

***

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

ব্যবস্থাগত অসম্পূর্ণতা নাকি নেতৃত্বের ব্যর্থতা?