সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থা সম্পর্কিত বিশেষ প্রশ্নোত্তর

 

অধ্যায় ১৪

 'সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থা' সম্পর্কিত বিশেষ প্রশ্নোত্তর

 

 প্রশ্ন ১।। মানুষ কি ব্যবস্থা ছাড়া চলতে পারবে না? কোনো ব্যবস্থা কি মানুষের স্বাধীনতা, স্বতন্ত্রতা, আত্মনির্ভরতা ইত্যাদিকে হনন করবে না?

 উত্তর।। মানুষ ব্যবস্থা ছাড়াও চলতে পারে কিন্তু ব্যবস্থাবিহীন অবস্থায় তার জীবন পরম দুঃখে ভরে যাবে যা কোনো মানুষ চায় না সেইজন্য মানুষ ব্যবস্থা ছাড়া থাকতে পারে না তার ভেতর অন্তঃকরণ জাগ্রত থাকার কারণে নিজের দুঃখের কারণ অনুসন্ধান এবং নিবারণ করার জন্য অবিরত প্রয়াস করতে থাকে আর যা কিছু কারণ সে খুঁজে পায় তা সমাধান করে দেখে নেয় যদি সমাধান হয়ে যায় তাহলে নিজের জীবনে তা ব্যবহার করার চেষ্টা করে যতদিন পর্যন্ত তার থেকে উত্তম সমাধান খুঁজে না পায় একেই তো ব্যবস্থা বলে এইভাবে সে অবিরত বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য দুঃখ নিবারণ করার কারণ অনুসন্ধান করতে থাকে এবং সেসব প্রয়োগ করে দেখতে চায় এইভাবে ব্যবস্থাগত বিকাশ চলতে থাকে এতেই আমরা বুঝতে পারি যে মানুষ ব্যবস্থা ছাড়া থাকতে চায় না অন্তঃকরণে স্বাভাবিক চেতনা থাকার ফলে ব্যবস্থা ছাড়া সুখী জীবন-যাপন সম্ভব নয় এরপরও যদি কেউ ব্যবস্থা ছাড়া জীবন-যাপন করে দেখতে চায় তাহলে সে বুঝতে পারবে আমি যা বলছি তাই-ই সঠিক ব্যবস্থা বিহীন জীবন-যাপন হলে আমরা কীভাবে দুঃখে জর্জরিত হতে থাকব আসুন এই বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে দেখে নিই যদি আমরা প্রকৃতিকে অধ্যয়ন করি তবে দেখতে পাব এখানে এমন কিছুই পাওয়া যায় না যাদের আমরা সরাসরি প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারি যদি আহার সামগ্রিকে বাদ দিয়ে ধরা হয় আহারের মধ্যেও ফল, ফুল, পাতা ইত্যাদি খুব একটা সুস্বাদু নয়, এটি ঠিক যে এদের সাহায্যে বেঁচে থাকা যেতে পারে কিন্তু জীবনের উদ্দেশ্য তো শুধুমাত্র বেঁচে থাকা নয় আমরা সকলে নানা প্রকারের সুখ উপভোগ করতে চাই যা সরাসরি প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত করতে পারি না তাদের সৃজন করে নিতে হয় সেজন্য কর্ম, জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ইত্যাদি বিকশিত করে নিতে হয় এইভাবে একটি শৃঙ্খলার নির্মাণ হয়ে যায় জ্ঞান, কর্ম এবং ভোগ জ্ঞান ছাড়া কর্মের সার্থকতা নেই জ্ঞানকে বাদ দিয়ে যদি কোনো কর্ম করা হয় তবে তার পরিণাম ভাল অথবা মন্দ যা কিছু আসতে পারে অর্থাৎ সুখও আসতে পারে অথবা দুঃখও আসতে পারে এইজন্য প্রথমে জ্ঞান অর্জন করার প্রয়োজন হয় যার ফলে আমরা জানতে পারি কীভাবে কর্ম সম্পাদন করলে নিশ্চিতভাবেই আমাদের ঈপ্সিত ফল দেবে, যা ভোগ করে সুখী হতে পারব এইভাবে আমরা দেখতে পাই যে জ্ঞান ছাড়া কর্মের কোনো সার্থকতা থাকে না এবং কর্ম ছাড়া কোনো ভোগ নির্মাণ হয় না আর ভোগ ব্যতীত আমরা সুখী হতে পারব না অর্থাৎ জ্ঞান, কর্ম এবং ভোগ অনুযায়ী আমাদের ব্যবস্থা তৈরি করে নিতে হবে কেননা ব্যবস্থা না থাকলে যা কিছু আমরা অনুসন্ধান করব তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া সম্ভব নয় তা না হলে সকলকে সেই জ্ঞান বারবার অনুসন্ধান করতে হবে বারবার যেন খুঁজতে না হয় সেইজন্য শিক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় একইভাবে কর্মের বিভাজনের জন্য কর্মসংস্থান বিতরণের ব্যবস্থা করতে হয় এরপর কর্মসংস্থানের ফলাফল অনুযায়ী যে ভোগের নির্মাণ হয় তা বিতরণের ব্যবস্থা করা হয় আশা করি আমরা বুঝে গিয়েছি যে মানুষের কেন ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় আমরা ব্যবস্থা ছাড়া ঈপ্সিত জীবন-যাপন করতে পারব না ব্যবস্থা ছাড়া কোনোপ্রকার সুখসুবিধা উৎপাদন করা শুধু কঠিন নয় অসম্ভবও বটে সুখসুবিধা ছাড়া জীবনে কোনোপ্রকার আত্মনির্ভরতা, স্বতন্ত্রতা অথবা স্বাধীনতা ফলিত হয় না যখন জীবনের উদ্দেশ্যই পূরণ হবে না তখন ব্যবস্থাকে বাদ দিয়ে নিজস্বতা, স্বতন্ত্রতা, আত্মনির্ভরতা ইত্যাদির প্রশ্নই বা ওঠে কি করে? আমরা প্রথমে এইসব শব্দগুলিকে বোঝার চেষ্টা করি নিজস্বতার অর্থ হচ্ছে ব্যক্তিগত স্তরে স্বাধীনতা অর্থাৎ মানুষ কি খেতে চায়, কি পরিধান করতে চায়, কি শিখতে চায়, কি কর্ম করতে চায়, কীভাবে চলতে চায় ইত্যাদি ক্রিয়াকলাপসমূহ যা সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিদের উপর সরাসরি কোনো প্রভাব ফেলে না প্রতিটি ব্যক্তি তার নিজের জীবনে কারোর থেকে কোনো প্রকারের অবরোধ চায় না দ্বিতীয় শব্দ হচ্ছে স্বাধীনতা এর অর্থ হচ্ছে সমস্ত স্তরে আপনার সবকিছু  করার অধিকার আছে যা থেকে নিজে সুখী হওয়া যায় অন্য কাউকে দুঃখ না দিয়ে এইসব বিষয়গুলি নিজস্বতার মধ্যে পড়ে এবার তৃতীয় শব্দ হচ্ছে আত্মনির্ভরতা এর অর্থ হচ্ছে কোনো ঝামেলা ছাড়াই আমরা যখনই কিছু চাইব সময়মত পেয়ে যাব এমনটি হলে আমরা আত্মনির্ভরতা অনুভব করি চলুন এবার দেখা যাক ব্যবস্থা ছাড়া এসব সম্ভব হবে কিনা

 হিন্দিতে একটি প্রচলিত কথা আছে যে নাঙ্গা নাহায়েগা কেয়া অউর নিচোড়েগা কেয়া, (যে নিঃস্ব তার কাছ থেকে আর কি সাহায্য পাব) প্রথমত ব্যবস্থা ছাড়া সমাজে কোনো সুখসুবিধা উৎপন্ন হয় না যা আপনি ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করতে পারেন দ্বিতীয়তসামান্য কিছু সুখসুবিধা নিজের ক্ষমতায় অর্জন করলেও অন্য কোনো ব্যক্তি বা সমষ্টি এসে সেই সুখসুবিধাকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে পারে কেননা যখন কোনো ব্যবস্থাই থাকবে না তখন তাদের কে বাধা দেবে এবং তারা কীসের ভয়ে ছিনিয়ে নিতে আসবে না? দলগত গোষ্ঠী বা তার পূর্বের কথা আমি বলছি যেখানে মানুষ জঙ্গলে একা অথবা খুব ছোট দলের মধ্যে বসবাস করত যদিও ছোট দলের কথা উল্লেখ করার অর্থও হচ্ছে একটি ব্যবস্থাকে স্বীকার করে নেওয়া কেননা যখন মানুষ অধিক সংখ্যায় দলবদ্ধ অবস্থায় থাকে তখন কোনো নীতিনিয়ম ছাড়া তা জীবন-যাপন সম্ভব হয় না ধরে নিই উক্ত দলে বিশেষ কোনো নীতিনিয়ম প্রয়োগ হয়নি কিন্তু ইতিহাসে আপনারা পড়েছেন যে পূর্বে একটি দল অন্য দলের সবকিছু ছিনিয়ে নিত অথবা ক্রীতদাস বানিয়ে নিত তাহলে আমরা এই সিদ্ধান্তে এলাম যে ব্যবস্থা ছাড়া কোনো নিজস্বতা, স্বাধীনতা, আত্মনির্ভরতা সম্ভব নয় এবার দেখি যে এইসব ব্যবস্থার অধীনস্থ হবার সম্ভাবনা রয়েছে কিনা ব্যবস্থা তো দু-প্রকারেরই হয় পর্যাপ্ত বা সঠিক ব্যবস্থা এবং অপর্যাপ্ত বা ভ্রষ্ট ব্যবস্থা তাহলে মন্দ অথবা অপর্যাপ্ত ব্যবস্থায় তো সকল স্বাধীনতা একটি সীমা অবধি থাকে এবং সেই সীমার পর মনে হবে যেন কোনো স্বাধীনতাই নেই যেমন বর্তমান সময়ে চলমান ব্যবস্থা একটি অসম্পূর্ণ অথবা ভ্রষ্ট ব্যবস্থার মধ্যে একটি

 এবার একটি উদাহরণ থেকে বোঝার চেষ্টা করি। বর্তমান ব্যবস্থার সংবিধানে লেখা রয়েছে যে শিক্ষা গ্রহণে সকলের সমান অধিকার রয়েছে কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে কি সকলে সেই অধিকার পাচ্ছে? আমরা সকলে জানি যে পাওয়া যাচ্ছে না তাহলে আসুন বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করিপ্রথমত সংবিধানে যখন লেখা রয়েছে তবে বাস্তবিক ক্ষেত্রে তেমনটি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না কেন? এর প্রথম কারণ হিসেবে দেখা যায় যে বাস্তবে সরকার পর্যাপ্ত সংখ্যায় বিদ্যালয় স্থাপনই করেনি যেখানে সকলে শিক্ষার সমান অধিকার পেতে পারে দ্বিতীয়ত সকলের তো সুনিশ্চিত কোনো রোজগার নেই যার মাধ্যমে তারা প্রাইভেট স্কুল থেকে এই অধিকার প্রাপ্ত করতে সক্ষম হবে এবার সরকারকে জিজ্ঞেস করুন তারা কেন পর্যাপ্ত বিদ্যালয়, শিক্ষক ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে পারছে না? এক্ষেত্রে সরকার বলবে তাদের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ নেই যার দ্বারা সরকার সকল সুখসুবিধার বন্দোবস্ত করতে পারে এতে তো তাহলে সংবিধানের অক্ষমতাই প্রকাশ পায় অর্থ এই দাঁড়ায় যে সকল সুখসুবিধা অর্থের দ্বারাই প্রাপ্তি হয় তাহলে আপনি বলুন যতদিন অবধি সমস্ত জনগণ আর্থিক দিক দিয়ে একসমান না হবে ততদিন অবধি একসমান অধিকার কীভাবে প্রাপ্ত হবে? তৃতীয়ত সরকার যখন বলছে অর্থের মাধ্যমেই সম্ভব হবে, সরকার তবে এমন নীতি কেন প্রণয়ন করছে না যার মাধ্যমে অর্থের যেন অভাব না হয়? বর্তমান সমাজে তো ধনী এবং দরিদ্র দুইই বিদ্যমান রয়েছে আর্থিক অসমানতার কারণে কখনই কোনো অধিকার সমানভাবে সকলের জন্য উপযোগী হতে পারবে না অপরদিকে সংবিধানেও এমন কোনো বিধান নেই যার দ্বারা সুনিশ্চিত করা যায় যে সকল নাগরিক আর্থিকভাবে একসমান হতে পারে সংবিধান তো বলছে সকলের একসমান শিক্ষা পাওয়া উচিত কিন্তু এটি তো বলতে পারছে না এই সুবিধা পাবে কীভাবে এবং কীভাবে এই সুবিধা সকলের মধ্যে বিতরণ করা হবে যেন সকলে সমানভাবে তা গ্রহণ করতে পারে এইজন্য আমি একে অসম্পূর্ণ সংবিধান বা অসম্পূর্ণ ব্যবস্থা বা বিষমবিধান বলছি যা একদিকে বলছে সকলের সবকিছু তে সমান অধিকার থাকবে কিন্তু অপরদিকে এটি বলছে না কীভাবে তা সম্ভব হবে যেভাবে পাওয়া যাবে বলছে সেভাবে বাস্তবে পাওয়া যাচ্ছে না অর্থাৎ উল্টো হয়ে যাচ্ছে সমতার উৎপন্ন হচ্ছে না বিষম অবস্থা উৎপন্ন হচ্ছে এই কারণে আমি এটিকে ভ্রষ্ট ব্যবস্থা বলছি এইজন্য সকলে তাদের নিজস্বতা, স্বাধীনতা, আত্মনির্ভরতা ইত্যাদি একটি নির্দিষ্ট সীমা অবধিই গ্রহণ করতে পারছেএই সীমাও আবার সকলের জন্য একসমান নয় এবার কথা হচ্ছে এই নিজস্বতা, স্বাধীনতা, আত্মনির্ভরতা ইত্যাদি কি একটি সঠিক ব্যবস্থায় প্রাপ্ত করা যেতে পারে? অথবা তা কি শুধুমাত্রই এক কল্পনা? হতে পারে অসম্পূর্ণ ব্যবস্থায় সামান্য কিছু ব্যক্তি কিছু অধিকার পাচ্ছে যদি সামান্য কিছু ব্যক্তি পেতে পারে তবে সকলে নয় কেন? উপরে আপনি তো সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থা অধ্যয়ন করে দেখেছেন যেখানে বলা হয়েছে বাস্তবিক ক্ষেত্রে সকল অধিকার এবং সুখসুবিধা সকলের জন্য সমানভাবে রয়েছে কীভাবে সকলে আর্থিকভাবে একসমান হবে তারও ব্যবহারিক সমাধান প্রদান করা হয়েছে এবার আমরা বুঝে গিয়েছি কোনো ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হল সকলের জন্য সকল প্রকার অধিকার প্রদান করা এবার এটি ভিন্ন বিষয় যে কোন ব্যবস্থা কতটা অধিকার কতজনের মধ্যে কতটা সীমা অবধি সহজলভ্য করাতে পারে কোনো ব্যবস্থা ছাড়া তা অসম্ভব


 প্রশ্ন ২ ।। ব্যবস্থা যাচাই করার মাপকাঠি কি হওয়া উচিত?

 উত্তর ।। যেমনটি আমরা উপরে আলোচনা করেছি যে জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে সকল প্রকার ঈপ্সিত সুখ ভোগ করা এবং সে জন্যই ব্যবস্থার প্রয়োজনআর সুখই হবে ব্যবস্থাকে যাচাই করার মাপকাঠি আমরা যা কিছু করব সেইসব থেকে যদি সার্বিকভাবে সুখ উৎপন্ন হতে থাকে তবে তাকে আমরা একটি সম্পূর্ণ ব্যবস্থা বলব নাহলে আমরা তাকে একটি অসম্পূর্ণ ব্যবস্থাই বলব অসম্পূর্ণ ব্যবস্থাকে ততদিন অবধি সংশোধন করে যেতে হবে যতদিন উদ্দেশ্য পূরণ না হয় তাহলে কোনোকিছুর উদ্দেশ্যই হচ্ছে সেই বিষয়কে যাচাই করার সঠিক মাপকাঠি তাই সুখের মাপকাঠি হবে সঠিককে জানা, একইসঙ্গে ভ্রান্তিকে জানা যদি কোনোকিছু করে আমাদের উদ্দেশ্য পূরণ হয় তাহলে সঠিক আছে বলা হবে অন্যথায় ভ্রান্ত বলা হবে


  প্রশ্ন ৩ ।। ব্যবস্থার মূল আধার কী?

 উত্তর ।। ব্যবস্থার মূল আধার হচ্ছে যেখান থেকে কোনো ব্যবস্থা প্রারম্ভ হয় জীবনের পরম উদ্দেশ্য কী এটি জানার পরই ব্যবস্থা প্রারম্ভ হয় এবার পরম উদ্দেশ্য তো আমরা জেনে গিয়েছি তা হল জীবনের সকল প্রকার ঈপ্সিত সুখ প্রাপ্ত করা এটিও জেনে গিয়েছি যে তিন প্রকার সুখ জ্ঞান, কর্ম এবং ভোগের মাধ্যমেই প্রাপ্তি করা সম্ভব তাহলে জ্ঞান, কর্ম এবং ভোগ মানুষের ইচ্ছে অনুযায়ী বিতরণ করতে হবে জ্ঞান প্রথমে দর্শন দ্বারা প্রাপ্ত হয় নির্মাণ এবং বিতরণের কর্মও অর্থশাস্ত্র মাধ্যমে খুবই সরলভাবে সম্পাদন করা সম্ভব তাই অর্থশাস্ত্রকে অবশ্যই সঠিক হতে হবে তবেই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য নির্মাণ এবং বিতরণ সম্ভব হবে। এই প্রকার অর্থশাস্ত্র সম্পর্কে আপনি পূর্বেই অধ্যয়ন করে নিয়েছেন সব মিলিয়ে বলতে পারেন দর্শন শাস্ত্র এবং অর্থশাস্ত্র থেকেই এটি প্রারম্ভ করা যেতে পারে সঠিক দর্শনশাস্ত্র এবং সঠিক অর্থশাস্ত্র ছাড়া তা সম্ভব নয় সংবিধানে বা পুস্তকে যতই আমরা মধুর ভাষায় নিয়মনীতি লিখে দিই না কেন সঠিক অর্থশাস্ত্রই বাস্তব জীবনে আমাদের সকল সুখসুবিধার নির্মাণ করতে পারে এবং যথোচিত বিতরণ করতে পারে তাহলে আমরা বলতে পারি কোনো ব্যবস্থার মূল ভিত হচ্ছে তার অর্থশাস্ত্র এরপর আসে দর্শনশাস্ত্র। যেখানে দর্শনশাস্ত্র এবং অর্থশাস্ত্র এই দুটি দিক সঠিক রয়েছে সেখানে আমাদের ঈপ্সিত জীবনের প্রাপ্তি স্বাভাবিকভাবে সম্ভব হয়ে যাবে। এই দুটিই হচ্ছে মূল বিষয় অথবা বলা যায় মূল দর্শন কেননা যেমন দর্শন হবে তেমন প্রকারের অর্থশাস্ত্র তৈরি হবে


 প্রশ্ন ৪ ।। কোনো ব্যবস্থায় দর্শনশাস্ত্রের গুরুত্ব কী? মানুষের ব্যবহারিক জীবনে দর্শনশাস্ত্রের উপযোগিতাই বা কোথায়?

 উত্তর ।। যে কোনো ব্যবস্থায় জীবন দর্শনের স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জীবনের পরম উদ্দেশ্য কী এই কথা জীবন দর্শন ছাড়া জানা সম্ভব নয় জীবন দর্শনই নিশ্চিত করে দেয় যে আমাদের জীবনের পরম উদ্দেশ্য কী? অথবা কোনো উদ্দেশ্য আছে কী নেই, যদি থাকে তাহলে তা কী? জীবন দর্শনের অধ্যয়ন ছাড়া ব্যবস্থা সম্পর্কে ভাবনা সম্ভব নয় সঠিক পথই যখন না জানব তখন কোনদিকে অগ্রসর হব? একটি সঠিক জীবন দর্শন থাকলে এটিকে আরও সহজ সরলভাবে বোঝা সম্ভব যে আমরা কেমন জীবন-যাপন করছি এবং তার কি পরিণাম আসবে অর্থাৎ পরিণাম সম্পর্কে শুরু থেকেই জানতে পারা যায় ফলে আমাদের যেমন পরিণাম পাবার ইচ্ছে তেমন জীবন-যাপন আমরা উপভোগ করতে পারি এবং সেইমত ফলাফল প্রাপ্ত করতে পারি এতে জীবনে এক নিশ্চয়তা থাকে জীবনের দিশাকে নিশ্চিত করার জন্যই জীবন দর্শনের স্থান সর্ব প্রথমে রয়েছে আমরা শুনেছি যে ধর্মগ্রন্থগুলিতে সকল দুঃখের মূল কারণ সম্পর্কে নিশ্চিৎ করে কিছু উল্লেখ করা হয়নি অর্থাৎ মূল কারণ আজ্ঞাত রয়েছে জীবন দর্শন এই অজ্ঞানকেই প্রকাশিত করে দেয় অন্যভাবে বলতে গেলেযদি কোনো সমাজ দুঃখী অবস্থায় থাকে তবে তার অর্থ ধরে নিতে পারি যে সেই সমাজের কাছে সঠিক জীবন দর্শনের অভাব রয়েছে যেমন দর্শনশাস্ত্র হবে তেমন দিশা হবে, যেমন দিশা হবে তেমনই দশা হবে সেইজন্য যে কোনো অবস্থার জন্য দর্শনশাস্ত্রই হচ্ছে মূল আধার সঠিক দর্শনশাস্ত্র থাকলে পরিস্থিতি সঠিক হবে, ভ্রষ্ট দর্শনশাস্ত্র হলে পরিস্থিতি ভ্রষ্ট হবে জীবনের দশাই হচ্ছে মূল কষ্টিপাথর এটি জানার জন্য সর্বপ্রথমে দেখতে হবে আমাদের কাছে যে দর্শনশাস্ত্র রয়েছে তা সঠিক না ভ্রষ্ট


  প্রশ্ন ।। বর্তমান অর্থব্যবস্থা অথবা পুঁজিবাদে কী দোষ রয়েছে?

 উত্তর ।। পুঁজিবাদের দোষ তো উন্মোচিত হয়েই গিয়েছে সেখানে আর্থিক অসমানতাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় দোষ যার ফলে অবশিষ্ট সব দোষগুলি আপনিই চলে আসে। এই আর্থিক অসমানতার কারণে সমগ্র সমাজ নির্ধন এবং ধনবান এই দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যায় নির্ধন নিজের ইচ্ছেমত বস্তু বাজার থেকে ক্রয় করতে পারে না, যার ফলে বাজারে সর্বদাই চাহিদার অভাব তৈরি হয় চাহিদার অভাবের কারণে নির্মাণেও অভাব থেকে যায় যার পরিণামস্বরূপ প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান উৎপন্ন হতে পারে না সমাজে বেকারত্ব তৈরি হতে থাকে বেকারত্বের কারণে শ্রমের মূল্য কমে যায় ফলে নির্ধন অধিক নির্ধন, ধনবান অধিক ধনবান হয়ে যায় এমনকি ধনীদের সংখ্যাও হ্রাস পেতে থাকে এবং নির্ধনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে আপনি বর্তমান সময়েও দেখছেন যে ৮০ শতাংশ সম্পদের উপর কেবলমাত্র ১ শতাংশ লোকের দখলদারি রয়েছেঅবশিষ্ট ৯৯ শতাংশ মানুষ কেবলমাত্র ২০ শতাংশ সম্পদ নিয়ে কোনো প্রকারে জীবন-যাপন করছে আমরা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখছি যে পুঁজিবাদে না দরিদ্ররা সুখী রয়েছে না ধনীরা দরিদ্রদের একরকম দুঃখ রয়েছে এবং ধনীদের আরেকরকম দুঃখ রয়েছে যেমনটি পুঁজিবাদের নাম থেকেই আপনি বুঝতে পারছেন যে এই প্রকার ব্যবস্থায় যার কাছে অধিক পূঁজি রয়েছে তিনিই যে কোনো সীমা অবধি ইচ্ছেমত যা খুশি করার স্বাধীনতা পেয়ে থাকেন কোনোকিছু কিনতে চাইলে পূঁজির প্রয়োজন, কোনো কর্ম করতে চাইলে পূঁজির প্রয়োজন, কোনো বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে চাইলে পূঁজির প্রয়োজন, চিকিৎসা করাতে চাইলেও পূঁজির প্রয়োজন হয় যাদের কাছে পূঁজি নেই তাদের কাছে কোনোকিছু করার স্বাধীনতাও নেই না তারা কিছু কিনতে পারেন, না কিছু করতে পারেন, না কিছু শিখতে পারেন, না সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে পারেন কোনো প্রকারে কিছু একটা শিখে নিলেও তারা আয়ের পথ তৈরি করতে পারে না তারা সামান্য কিছু আয়ের ব্যবস্থাই শুধুমাত্র করতে পারেন এবং সেই সামান্য আয় দিয়ে সামান্য কিছু ভোগ্য বস্তু ক্রয় করে কোনোরকমভাবে জীবিত থাকেন তারা যেন মানুষ নন মেশিন কর্ম করার জন্য যেন তাদের সামান্য কিছু রসদ যোগান হলেই হল ফলে মেশিন এবং সামান্য উপার্জনকারী মানুষদের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে, কেননা দুজনের জীবনের পার্থক্য ভিন্নভাবে বোঝা যায় না বর্তমান সময়ে পুঁজিবাদ ব্যবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা এক চরম সীমায় উপনীত হয়ে রয়েছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যাদের হাতে পূঁজি রয়েছে তাদের হাতেই সমস্ত সম্পদের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় কেবলমাত্র প্রাকৃতিকভাবে সম্পদই নয় মানব সম্পদের নিয়ন্ত্রণও সামান্য কিছু মানুষের হাতে চলে যায় তারাই নিজেদের ইচ্ছেমত সবকিছু  ব্যবহার করে যাদের কাছে পূঁজি কম থাকে অথবা থাকে না তারা কোনো না কোনো দুর্নীতির পথ খুঁজতে শুরু করে যার কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অপরাধের সৃজন হতে থাকে ধীরে ধীরে এই অপরাধ সামগ্রিক রূপ ধারণ করে নেয় ফলে তারা সমাজবিরোধী হতে শুরু করে সমাজের পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর হতে থাকে অবশেষে দুর্নীতি এবং অপরাধ সমাজের এক অভিন্ন অঙ্গ হয়ে যায় যখন তা অতি মাত্রায় বৃদ্ধি পায় তখন মানুষ এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে যেন কোনোভাবে অপরাধ কিছুটা কমানো যেতে পারে কিন্তু সমাপ্ত করতে পারে না এইভাবেই জীবন চলতে থাকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সঠিক চাহিদা কখনই জানা যায় না, কেননা কার কাছে কতটা পূঁজি রয়েছে এবং সেই পুঁজিকে সে কোন মনোভাব নিয়ে খরচ করতে চায় তা জানতে পারা যায় না যে কারণে একটি ধারণার ভিত্তিতে অনুমান করে নেওয়া হয় এবং উৎপাদন করা হয় এরপর আঞ্চলিক ব্যবসায়ীরাও অনুমানের ভিত্তিতেই বস্তু এনে গুদাম ঘর ভরে নেয় বস্তুসামগ্রী দোকানে ভরে রেখে গ্রাহকের জন্য প্রতীক্ষা করতে থাকে কখনো তো দোকানদার সারা দিন দোকানে বসে থাকা সত্ত্বেও কোনো গ্রাহক আসে না। এইভাবে অনেক ব্যবসায়ী কিছু মাস পর নিজের জমানো সকল পূঁজি দোকানের ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ইত্যাদিতে খরচ করে ফেলে এবং বিপুল ক্ষতির ভারে হতাশ হয়ে ব্যবসা ছেড়ে দেয় এইভাবে আপনারা কত মানুষকে নিজেদের পূঁজি হারাতে দেখেছেন যেমন আমরা প্রায়ই খবর শুনি যে অমুক স্থানে কৃষক আত্মহত্যা করেছে কৃষক তার সমস্ত পূঁজি নিজের চাষের কাজে খরচ করে ফেলে তারপর বিভিন্ন কারণে তাদের লোকসান হয়ে যায় যেমন খরা দেখা দেয়, বন্যা এসে যায়, ফসলে পোকা ধরে যায় অথবা বাজারে ফসলের উচিত মূল্য পাওয়া যায় না ইত্যাদি ইত্যাদি তারপর আর কোনো পূঁজি কৃষকের কাছে থাকে না এই দুশ্চিন্তায় তারা আত্মহত্যাই একমাত্র পথ হিসেবে দেখতে পায় কোনো পূঁজি ছাড়া কীভাবে তারা পরিবারের দায়িত্ব পালন করবে? মানুষ একসময় চুরি, ডাকাতি, ঠকবাজি, দুর্নীতি, অপহরণ ইত্যাদির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের উপায় বের করেই নেয়। এতে সমাজে আরও সমস্যার জন্ম দিতে থাকে সরকার নিজের সম্পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করেও তা বন্ধ করতে পারে না এদের নাহয় ছেড়েই দিলাম নির্বাচিত পদে আসীন ব্যক্তিরাও নিজেকে দুর্নীতি করা থেকে বিরত রাখতে পারে না কেননা তাদেরও তো প্রতি ৫ বছর পর পর নির্বাচনে দাঁড়াতে হয় এবং মোটা অঙ্কের অর্থ খরচ করতে হয় সেই অর্থ আইনি পথে ফেরত পাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে যাদের থেকেই অর্থ নিচ্ছে নিজেদের লাভের জন্যই নিচ্ছে কারণ সরকারকে নীতিনিয়ম তৈরি করতে হয় যদিও তার পরিণাম এই দাঁড়ায় যে ধনবানরা অধিক ধনবান হয়ে যায় আর নির্ধন হয়ে যায় আরও নিঃস্ব এই দুষ্ট চক্র আপন গতিতে আবর্তিত হতেই থাকে মানুষ বদলে যায় সরকার বদলে যায়, ব্যবস্থা কিন্তু বদলায় না কেননা অর্থশাস্ত্র যে বদলায় না ভ্রষ্ট পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার কারণেই এমনটি চলতে থাকে যে নতুন অর্থশাস্ত্র আমি উপরে বর্ণনা করেছি তা তো আপনি অধ্যয়ন করে নিয়েছেন ফলে আপনি বুঝে গিয়েছেন যে কেবলমাত্র সঠিক অর্থশাস্ত্রই হচ্ছে সঠিক ব্যবস্থার মূল ভিত সঠিক অর্থশাস্ত্রের কারণেই সম্পদ নির্মাণ ও বিতরণ সঠিকভাবে সম্পাদন হতে পারে পুঁজিবাদের দোষ নিয়ে বহু পুস্তক রচিত হয়েছে যা অধ্যয়ন করে আপনি তার ত্রুটি সম্পর্কে গভীরভাবে জেনে নিতে পারেন জগতে এখনও পর্যন্ত এমনতর অর্থশাস্ত্র বিদ্যমান রয়েছে, কেননা এখনও পর্যন্ত সঠিক অর্থশাস্ত্র কেউ সৃজন করেনি আমি কিন্তু একটি সঠিক অর্থশাস্ত্রের সৃজন করে দিয়েছি এবার এই ভ্রষ্ট পুঁজিবাদের প্রভাবে নির্মিত অর্থশাস্ত্র থেকে মুক্তি মিলবে এবং সুখী জীবনের প্রাপ্তি হবে


  প্রশ্ন ৬ ।। আপনি সকলকে সমান আয়ের শ্রেণীতে কেন রেখেছেন?

 উত্তর ।। ন্যায় অনুসারে সম্পূর্ণ সমাজে আয়ের একটিই মাপদন্ড থাকা উচিত কেননা আয়ই আমাদের জীবনের মূল্যকে বাস্তবে রূপ দিতে সাহায্য করে কোনো ব্যক্তির আয় কম হলে তার জীবনের মূল্যও অপেক্ষাকৃত হীন হয়ে থাকে। অসমান আয়ের ফলে সকল প্রকার সমস্যা উৎপন্ন হয়, ফলে সকলেই বিভিন্ন দুঃখে জর্জরিত থাকে এছাড়া আমরা যদি অন্য কোনো ব্যবস্থার বন্দোবস্ত করে দিই তাহলেও স্বল্প বা অধিক আয়ের কারণে আর্থিক অসাম্যই সৃষ্টি হবে। অধিক মাত্রায় অপরাধ উৎপন্ন হবে এবং জীবন দুঃখে জর্জরিত হয়ে পড়বে যা কেউ চায় না এইজন্য নতুন ব্যবস্থায় সকলকে সমান আয়ের শ্রেণীতে রাখা হয়েছে কারোর কাছে এর চাইতে উৎকৃষ্ট কোনো উপায় থাকলে আপনাকে স্বাগত এবং আমায় অবশ্যই সেই বিষয়ে অবগত করাবেন


 প্রশ্ন ৭ ।। যারা সাধারণ কর্ম করবে তাদেরকেও তো সমপরিমাণ আয় প্রদান করা হবেতাহলে যে সকল ব্যক্তিরা অত্যন্ত্য কঠিন পরিশ্রম করবে তাদের সাথে কি অন্যায় করা হবে না?

 উত্তর ।। উপরে আপনি নিশ্চয়ই অধ্যয়ন করে নিয়েছেন যে আর্থিক অসমতার কারণেই মূলত সমাজে নানা প্রকারের অপরাধ উৎপন্ন হতে থাকে যার পরিণামস্বরূপ দরিদ্রতা, দাসত্ব, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দুর্নীতি, চুরি এবং সকল প্রকার অপরাধের জন্ম হতে থাকে ফলে আমাদের জীবন নানা প্রকার দুঃখে জর্জরিত হয়ে যায় জীবনের দুঃখদায়ী পরিস্থিতি কেউ চায় না এই কারণেই নতুন ব্যবস্থায় সকলের আয়কে একসমান রাখা হয়েছে ফলে সকলে আর্থিক দিক দিয়ে সমানরূপে সমৃদ্ধশালী হতে পারবে এবং সকলের জীবনের মূল্যও সমান হবে সকলের জন্য সমস্ত সুখসুবিধা সমানরূপে উপলব্ধ হবে ফলে যার যেমন সুখসুবিধা প্রয়োজন তিনি তা গ্রহণ করে সুখী হতে পারবেন এবং সমাজে সহযোগিতা, সত্য, প্রেম, ন্যায়, পুণ্য ইত্যাদি স্বাভাবিকভাবে উৎপন্ন হতে থাকবে পরিণামস্বরূপ সমস্তরকম ভৌতিক, দৈবিক এবং আধ্যাত্মিক সুখের প্রাপ্তি হতে থাকবে জীবনের পরম উদ্দেশ্যও তাই এবং আমরা সকলেই তাইই চাই বর্তমান ব্যবস্থায় অসমান আয় থাকার কারণে ৯০% মানুষ উচ্চ মূল্যের বস্তু এবং সুখসুবিধা কখনোই সমানভাবে উপভোগ করতে পারবে না নতুন ব্যবস্থায় সমান আয় এবং সমান সুখসুবিধার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ব্যবস্থাকে সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য এই মূল্যাংকন বা মুদ্রা গণনার সাথে কোনোপ্রকার ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকবে না যাদের যা কিছু প্রয়োজন হবে তা তো সামঞ্জস্যরূপে সকলে পেতেই থাকবে এই প্রকার গণনা থাকার কারণে কেউ ব্যক্তিগতভাবে সুখসুবিধার অপব্যবহার করতে পারবে না একসমান আয় অথবা সুখসুবিধার গণনা কেবলমাত্র সরকারের হিসেব নিকেশের জন্যই থাকবে ব্যক্তিগতভাবে এই হিসেব নিকেশের বিশেষ গুরুত্ব থাকবে না এটি কেবলমাত্র ব্যবস্থাকে সহজ-সরল, স্পষ্ট এবং অপব্যবহারমুক্ত করবে আমাদের সকলের জীবনে সমস্ত সুখসুবিধার গুরুত্ব তো সমানই থাকে কোনো ব্যক্তি কখনোই এমনটি চাইবেন না তার জীবনে কোনোপ্রকার সুখসুবিধার অভাব থাকুক এবং ফলস্বরূপ কোনো দুঃখ বয়ে চলুক তাহলে গুরুত্বের দিক দিয়ে সমস্ত কর্মসংস্থান সমান হবে কেননা আমরা এমনটি কখনোই বলতে পারি না আমাদের জীবনে খাদ্যের গুরুত্ব অধিক নাকি আবাসের, বস্ত্রের গুরুত্ব অধিক নাকি অন্য কোনো বস্তু অথবা পরিষেবার কেননা সবকিছু  থেকেই আমরা সুখ পেয়ে থাকি এতে তো অন্য কারোর সাথে কোনো প্রকারের অন্যায় করা হচ্ছে না সকলেই চায় তাদের জীবন সুখী হোক যদি এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তা সম্ভব হয় তবে আমরা কি করে বলব এতে কারোর সাথে কোনো অন্যায় করা হচ্ছে? কেননা তারা নিজেদের ইচ্ছে অনুযায়ী কর্মসংস্থান পাচ্ছে তবে তো প্রকৃতপক্ষে ন্যায় বিচারই করা হলএকই কর্মসংস্থান কারোর পক্ষে সহজ আবার কারোর পক্ষে কঠিন হতে পারে ইঞ্জিনিয়ারিং কারোর পক্ষে অত্যন্ত কঠিন কর্ম হতে পারে আবার কারোর পক্ষে তা বাঁ হাতের খেল অর্থাৎ খুবই সহজ হতে পারে যখন সকলেই তাদের জীবনের সকল প্রকার সুখসুবিধা সমান হারে পেতে থাকবে তাহলে খামোখা কেউ এমনটি কেন মনে করবে তার সাথে কোনোপ্রকার অন্যায় করা হচ্ছে? বরং অন্যায় তো বর্তমান ব্যবস্থায় করা হচ্ছে, কারণ পৃথিবীতে বিপুল ধনসম্পদ থাকার পরও এমন জীবন উপভোগ করা যাচ্ছে না যেখানে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সুখী বলা যাবে বলতে পারা যাবে সকলের জীবনে তৃপ্তি বা সন্তুষ্টি রয়েছে এই আন্যায় যুগ যুগ ধরে চলে আসছে যা এখনও হয়ে চলছে


 প্রশ্ন ৮ ।। এটি এমন এক ব্যবস্থা যা সকলকে সমস্তকিছু অতি সহজেই প্রদান করবে এমন ব্যবস্থায় মানুষ অলস হয়ে পড়বে না তো? মানুষ কঠিন পরিশ্রম কেন করতে চাইবে?

 উত্তর ।। প্রথমত এই ব্যবস্থায় যে ব্যক্তি নিজের উচিত কর্ম সম্পাদন করবে না সেই ব্যক্তি এই ব্যবস্থা থেকে কোনোপ্রকার সুখসুবিধা প্রাপ্ত করতে পারবে না নতুন ব্যবস্থায় এই শর্ত থাকার ফলে কারোর অলস হবার কোনো সুযোগ নেই দ্বিতীয়ত সকলেই তাদের প্রথম অথবা দ্বিতীয় পছন্দ অনুযায়ী কর্ম অথবা জীবিকা পেয়ে যাবে, সেটিও প্রতিদিন মোটামুটি ৫ ঘণ্টা সময়ের জন্যসপ্তাহে ৫ দিন কর্ম করতে হবে। যেখানে নিজেদের দ্বারা নির্বাচিত কর্ম সম্পাদনের ফলে সকলেই সুখ প্রাপ্তি করবে। যেমন ভোগ থেকে সুখ পাওয়া যায় তেমনি কর্ম এবং জ্ঞান অর্জনেরও নিজস্ব সুখ রয়েছে, যদি সেই কর্ম আমাদের পছন্দের হয় এই কারণে জীবনে আলস্যতার ভাব থাকবে না তৃতীয়ত সেইসময় সকলে এই ব্যপারে অবগত থাকবে যে তারা যদি নিজেদের কর্ম সঠিকভাবে সম্পাদন না করে তবে সকলের প্রয়োজনীয় বস্তু-পরিষেবা তৈরি হবে না, নিজেরাও সুখসুবিধা গ্রহণ করতে পারবে না যা সকলে পেতে চায় এই কারণেও মানুষ নিজেদের কাজে অলসতা দেখাবে না আরেকটি কথা নিজের তরফ থেকে বলতে চাই আমি অধ্যয়ন এবং উপলব্ধি দ্বারা বুঝেছি যে জগতে কোনো মানুষই অলস হয় না ভ্রষ্ট ব্যবস্থার কারণেই আমাদের জীবনে অলসতা উৎপন্ন হয় উদাহরণ হিসেবে ধরে নিন আপনার রসগোল্লা পছন্দ নয় কিন্তু রসমালাই পছন্দ এবার যদি আপনাকে রসগোল্লা খেতে দেওয়া হয় তাহলে আপনি কি রসগোল্লা খাবেন? এর উত্তরে নিশ্চয়ই বলবেন, আমি খাবোনা তাহলে কি এই কথাকে আমরা এভাবে কখনও বলব আপনি রসগোল্লার ক্ষেত্রে খুব অলস? অবশ্যই তা বলব না কিন্তু যদি আপনাকে রসমালাই খেতে দেওয়া হয় তবে কি আপনাকে জোর করে বলে দিতে হবে, ভাই রসমালাই খেয়ে নিন। তা বলতে হবে না বরং আপনি আনন্দের সাথে রসমালাই খেয়ে নেবেন তৎসহ আমাকে ধন্যবাদও জানাবেন এরপর এই উদাহরণ অনুযায়ী আপনি কি বলবেন, রসমালাই খাবার বেলায় আপনি কিন্তু অত্যন্ত কর্মঠ। একথা বলবেন না মুখ্য কথা হচ্ছে পছন্দ নিয়ে, অলসতা নিয়ে নয় যদি কোনো ব্যবস্থা আমাদের পছন্দের কর্ম প্রদান করে এবং তাও আবার সমান পারিশ্রমিকের সাথে করে তবে তো অলসতার কোনো প্রশ্নই উদয় হয় না অলসতা কেবলমাত্র অপছন্দের কাজের ক্ষেত্রেই তৈরি হয় আর স্বভাববশত কোনো মানুষই অলস হয় না সকল মানুষ সুখ পেতে চায় এবং পছন্দের কর্ম সম্পাদন করতে চায়। কর্মেরও নিজস্ব সুখ রয়েছে যা সকলেই গ্রহণ করতে চায় কোনো কর্মই কঠিন অথবা সহজ হয় না কথা হচ্ছে পছন্দ, যোগ্যতা, সক্ষমতা ইত্যাদি বিষয়গুলি সঠিক রয়েছে কিনা তা দেখা একই কর্ম কারোর জন্য কঠিন হতে পারে আবার কারোর জন্য সহজ হতে পারে যে কাজের প্রতি আমাদের ভেতরে রুচি, যোগ্যতা, সক্ষমতা থাকে সেই কর্ম সম্পাদন করা সহজ হয়ে যায় এবং সুখ প্রদানকারী হয়ে যায়। এর বিপরীতে একই কর্ম কঠিন হয়ে যায় এবং দুঃখ প্রদানকারী হয়ে যায় তাই নতুন ব্যবস্থায় সমস্তকিছু সরলই থাকবে


 প্রশ্ন ৯ ।। মানুষ অতিমাত্রায় সুখী হলে নিজেদের সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলবে না?

 উত্তর ।। আসুন প্রথমে বুঝে নিই সংবেদনশীলতার অর্থ কি একটি উদাহরণ থেকে বোঝার চেষ্টা করি চলুন ক্ষুধাকে উদাহরণ হিসেবে ধরে নিই আমরা জানি কোনো মানুষ নিজের ক্ষুধার প্রতি যেমন সংবেদনশীল হয় তেমনি ভোজন গ্রহণ করার সময়ও সংবেদনশীল থাকে এই ভেবে যে ভোজন সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর কিনা, প্রয়োজনীয় মাত্রায় রয়েছে কিনা ইত্যাদি এই হচ্ছে ব্যক্তিগত সংবেদনশীলতা এবার দ্বিতীয় সংবেদনশীলতা হচ্ছে অন্যদের সম্পর্কে জানা তারা ক্ষুধার্ত রয়েছে কিনা, যে ভোজন পরিবেশন করা হচ্ছে তাতে সকলে সুখী অথবা দুঃখী হচ্ছে কিনা ইত্যাদি। কোন পরিস্থিতিতে কারা কেমন অনুভব করছে ইত্যাদি বিষয়ে জেনে নেওয়াকেই সংবেদনশীলতা বলা হয় আর এটি সুখ-দুঃখ দুদিক থেকেই হয়ে থাকে কেবলমাত্র দুঃখের ক্ষেত্রেই হয় এমনটি নয় যেমন আপনার চোখ যদি সুস্থ্য থাকে তাহলে আপনি সকল প্রকার দৃশ্য ততটাই স্পষ্টভাবে দেখতে পাবেন ওই দৃশ্য সুখ প্রদানকারী হোক বা দুঃখপ্রদানকারী হোক তাহলে আমরা বুঝলাম যে সুখ-দুঃখের সাথে সংবেদনশীলতার কোনো সম্পর্ক নেই বরং দেখতে হবে আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুস্থ্য রয়েছে কিনা, যার মাধ্যমে আমরা কোনোকিছুর জ্ঞান অনুভব করি সঠিক ব্যবস্থায় তো আপনি সর্বাধিক সুস্থ্য অবস্থায় থাকবেন আমরা তো জানি সুখী মানুষই অধিক সুস্থ্য এবং অধিক সংবেদনশীল হয় নতুন ব্যবস্থায় সকলে অধিক স্বাস্থ্যবান হবে এবং পরিণামস্বরূপ সংবেদনশীলতাও বাড়বে অসুস্থ্য ব্যক্তি নিজের প্রতি সঠিকভাবে সংবেদনশীল হতে পারে না কেননা তার কোনো না কোনো অঙ্গ সঠিকভাবে কার্য করতে পারে না যেমন জ্বর হলে মানুষের জিহ্বার স্বাদে সংবেদনশীলতা থাকে না তখন সে ব্যঞ্জনের সঠিক স্বাদ সম্পর্কে কিছু বলতে পারে না সুখ-দুঃখের সাথে নয়, বরং বাহ্যিক স্বাস্থ্য এবং অন্তঃকরণ বিকাশের সাথে সংবেদনশীলতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে মানুষ নিজের এই অন্তঃকরণ এবং বহিঃকরণের মাধ্যমে বিষয়কে ধারণ করে সুখ অথবা দুঃখকে অনুভব করে তাহলে সংবেদনশীলতা আমাদের করণের উপর আশ্রিত রয়েছে, সুখ-দুঃখের উপর নয় যেমন ছোট শিশুর অন্তঃকরণের বিকাশ না হবার কারণে তারা অন্যদের প্রতি সংবেদনশীল হয় না তারা কেবলমাত্র নিজেদের প্রতি সংবেদনশীল থাকে এবং বাহ্যকরণই শুধুমাত্র কর্মশীল থাকে উপরে আপনি অধ্যয়ন করে নিয়েছেন যে অন্তঃকরণ বিকাশের জন্য শিক্ষাই হচ্ছে মূল ভিত্তি যে মানুষ অন্যের সুখ থেকে যত সুখী হয় এবং অন্যের দুঃখ থেকে যত দুঃখী হয় তাকে ততটাই সংবেদনশীল বলা হবে তাই সুখ-দুঃখ হচ্ছে সংবেদনশীলতার মাপকাঠি, কোনো করণসমূহের মাপকাঠি নয় এমনটি নয় যে মানুষ সুখে কম সংবেদনশীল এবং দুঃখে অধিক সংবেদনশীল হয় বরং মানুষ অন্যের সুখ-দুঃখ কতটা গভীরভাবে অনুভব করে তার উপরই সেই ব্যক্তির সংবেদনশীলতার গভীরতা বোঝা যাবে


 প্রশ্ন ১০ ।। কেবলমাত্র সুখ থাকলে আমাদের জীবন নীরস হয়ে পড়বে না? মানুষ সবকিছু পেয়ে গেলে আগামী ভবিষ্যতের জন্য কেনই বা আগ্রহী হবে এবং কীসেরই বা আশা করবে?

 উত্তর ।। প্রথমে এটি বুঝতে হবে যে নীরস মূলত কী এবং কোন কারণে আমাদের ভেতর নীরসতা উৎপন্ন হয় যখন কোনো ভোগ আমাদের সুখ প্রদান করে না তখন আমরা উক্ত ভোগের প্রতি নীরস হয়ে যাই অর্থাৎ সেই ভোগকে পুনরায় উপভোগ করার ইচ্ছে হয় না এই অবস্থাকেই নীরস হওয়া বলে নীরস হবার অর্থ হচ্ছে যখন কোনো বিষয় থেকে রস উৎপন্ন হয় না রস অর্থাৎ সুখ যখন কোনো বিষয় থেকে সুখ প্রাপ্তি হচ্ছে না তখন আমাদের সেই বিষয়ে অরুচি আসে। যদি একই ঘটনা ভোগের ক্ষেত্রে ঘটে অর্থাৎ জীবনের কোনো জ্ঞান, কর্ম এবং ভোগ থেকে রস না আসে বা সুখ উৎপন্ন না হয় তবে এমন অবস্থা নিয়ে আমরা বেঁচে থাকতেই চাইব না আর এমনটি হলে সেইসময় আমাদের চেতনাও সমাপ্ত হয়ে যাবে তখন আমরা বর্তমান শরীর নিয়ে জীবিত থাকব না ইচ্ছে ব্যতীত কোনো চেতনা সম্ভব নয় নিদ্রা থেকে আমরা এইজন্য জেগে যাই কেননা আমাদের ভেতর ইচ্ছে রয়েছে যদি কোনো ইচ্ছে না থাকে তবে আমাদের দেহে কোনো ব্যক্তিত্ব বা প্রাণ থাকবে না শরীর নির্জীব হয়ে যাবে, অর্থাৎ ব্যক্তিত্বহীন হয়ে পড়বে বলতে পারেন মৃত হয়ে যাবে, সজীব অবস্থায় থাকবে না প্রাণ বা ব্যক্তিত্বই এই শরীরকে দিকনির্দেশ দিয়ে থাকে যাকে কেন্দ্র করে শরীরের চেতন এবং অচেতন প্রক্রিয়াগুলি চলতে থাকে যখন আমাদের ভেতর কোনো ইচ্ছে উৎপন্ন হবে না তখন আমরা চেতন বা অচেতন অবস্থা নিয়ে বেঁচে থেকে কি করব? যখন আমরা শরীরের মধ্যেই থাকব না তখন আমাদের ভেতরে পরবর্তী প্রশ্বাস প্রবেশ করবে কেন? কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রিয়াশীল হবেই বা কেন? কোনো প্রকারের গতিবিধি কেন ঘটবে? অর্থাৎ আমাদের মৃত্যু ঘটবে যদি তাই হয় তবে সমস্যা কোথায়? জীবনের উদ্দেশ্য ছিল যে আমরা নিজেদের সকল প্রকার ঈপ্সিত সুখ প্রাপ্ত করব এবং তা করে নিয়েছি, এবার যদি আর কোনো ইচ্ছে উৎপন্ন না হয় তবে ইচ্ছেহীন অবস্থায় চলে যাব অর্থাৎ দীর্ঘ বিশ্রামে চলে যাব যতদিন আমাদের ভেতরে পুনরায় কোনো সুখের ইচ্ছে উদয় না হয় ধরুন আমরা আহার গ্রহণ করছি এবং আহার গ্রহণের প্রক্রিয়া ততক্ষণ অবধি চলতে থাকে যতক্ষণ অবধি আহার আমাদের সুখ দিতে থাকে যখনই সুখ সমাপ্ত হয়ে যায় আমরা আহার গ্রহণ করা বন্ধ করে দিই পরবর্তী সময়ের অপেক্ষা করি। একইভাবে আমরা যখন সুখ থেকে বিমুখ হয়ে যাই তখন ঘুমের মতই দীর্ঘ বিশ্রামে চলে যাই এতে আমাদের কোনো দুঃখ হয় না বরং এইসব আনন্দের সাথেই চলতে থাকে আমরা যখন নিজেদের ভোজন সমাপ্ত করে পরবর্তী সময়ের জন্য স্থগিত করে দিই তখন কি এই প্রক্রিয়ায় আমাদের কোনো দুঃখ হয়? কোনো দুঃখ হয় না যদি আপনি বলতে চান দুঃখ আমাদের জীবনে রস উৎপন্ন করে তবে চলুন এবার এটিও পর্যবেক্ষণ করে দেখে নিই আমাদের জীবনে কি দুঃখের কারণে রস উৎপন্ন হয় অথবা উৎপন্ন হবার কি কোনো কারণ রয়েছে? আসুন রস উৎপন্ন হবার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি জেনে নিই এবং বোঝার চেষ্টা করি এখানে আমি স্বাদের উদাহরণ নিচ্ছি সর্বপ্রথমে আমাদের কিছু খাবার ইচ্ছে জাগ্রত হয় এবং তারপর কিছু সুস্বাদু খাবারের খোঁজ করতে শুরু করি তখন বিভিন্ন ব্যঞ্জনের স্বাদ গ্রহণ করি যে ব্যঞ্জন থেকে আমরা ঈপ্সিত সুখ পেয়ে যাই সেই খাবার আমরা স্বীকার করে নিই অথবা বলতে পারেন তা থেকে আমরা রস বা সুখ পেয়ে থাকি। তাহলে এখানে দেখতে পাবেন যে সুখ অথবা রস একই বিষয় কেননা সুখই হচ্ছে জীবনের রস সুখ প্রাপ্তিই হচ্ছে জীবনের লক্ষ্য দুঃখের সময়ও কি এমনটি হয়? আপনি বলবেন যে হয় না দুঃখের প্রতি পর্যবেক্ষণ করে দেখুন যে দুঃখ কখন আসে খিদে পেলে যখন আমাদের কিছু খেতে ইচ্ছে হয় তখনই আমরা কিছু খাবারের খোঁজ করি স্বাদ পরখ করে দেখি যে কোন খাবারটা আমরা খেতে চাই কিন্তু আমরা যদি খাবারের জন্য কিছুই না পাই যা গ্রহণ করে আমরা সুখী বা সন্তুষ্ট হব তখনই আমরা দুঃখী হই অথবা আমাদের কাছে যদি খাবার জন্য কিছুই না থাকে তবে দুঃখী হই তখন কি আমরা বলি এই দুঃখ থেকে রস উপভোগ করেছি অথবা দুঃখের কারণে কি সুখ বেড়ে যাবে? এমনটি কখনোই বলি না তাহলে উপরের উদাহরণ থেকে বুঝে গিয়েছি যে ইচ্ছে অনুযায়ী আমরা যখন অগ্রসর হই তখন তা থেকে সুখ-সন্তুষ্টি অথবা বলতে পারেন রস গ্রহণ করতে থাকি দুঃখের অবস্থাই তো নীরসতা উৎপন্ন করে যে ভোগ থেকে দুঃখ উৎপন্ন হয়, ভবিষ্যতে সেই ভোগের প্রতি আমাদের ভেতরে ইচ্ছে উৎপন্ন হয় না বরং তা থেকে সরে যাবার ইচ্ছেই তৈরি হয় ইচ্ছে অনুযায়ী অগ্রসর হবার জন্য রসের সাথে সুখের সরাসরি সম্বন্ধ রয়েছেদুঃখের প্রতি নয় উদাহরণস্বরূপ যদি আপনি সুখের ইচ্ছে নিয়ে কোনো কর্ম বারবার শুরু করেন এবং পরিণাম যদি ইচ্ছে অনুযায়ী না আসে তখন সেই কর্ম থেকে আপনার রস হারিয়ে যেতে থাকে এবং নীরসতা অনুভব করেন এরপর ওই কর্ম বন্ধ করে দেন যেমন ব্যবসা থেকে যখন আমাদের আয় হয় না বরং ক্ষতি হতে থাকে তখন আমরা সেই ব্যবসা বন্ধ করে দিই কারণ আমরা বুঝে যাই তা থেকে আমাদের ইচ্ছে পূরণ হবে না একইভাবে সেই ব্যবসা থেকে যদি লাভ হতে থাকে তবে তার প্রতি আমাদের আগ্রহ বাড়ে এবার আমরা বুঝে গিয়েছি যে জীবনের রস সুখের জন্য বাড়তে থাকে এবং দুঃখের জন্য কমতে থাকে তাই আপনি সুখকে রস এবং দুঃখকে নীরস বলতে পারেন

 ভবিষ্যতে যেন অধিক সুখ পাওয়া যায় তার প্রতি মানুষের আশা থাকে এটি ততদিন অবধি থাকবে যতদিন অবধি আমরা সন্তুষ্টির স্তরে উপনীত না হব। প্রতিটি মানুষের সন্তুষ্টির স্তর ভিন্ন হয়ে থাকে। এমন কোনো সমস্যা নতুন ব্যবস্থায় থাকবে না যা থেকে অসন্তুষ্টি উৎপন্ন হয় জীবনে দুঃখ থাকলে ভয় হয় এই ভেবে যে ভবিষ্যতে আবার না দুঃখ চলে আসে দুঃখ থেকে বর্তমান এবং ভবিষ্যতে ভয়েরই সৃষ্টি করে কোনোপ্রকার রসের নয়


 প্রশ্ন ১১ ।। সাধু-সন্তরা বলেন যে সুখ-দুঃখ একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ যদি সুখ পেতে চান তবে দুঃখও সাথে থাকবে এই প্রসঙ্গে আপনি কি বলবেন? কেননা একথা যদি সত্যি হয় তবে তো আপনার ব্যবস্থায় দুঃখ সর্বদা থেকেই যাবে?

 উত্তর ।। যদি একথা সত্যি হয় তবে তো সুখের সাথে দুঃখ সর্বদা বিরাজ করবেই সুখ যতটা গভীর হবে দুঃখও ততটা গভীর হবে কিন্তু আমার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী একথা সত্য নয় সুখ-দুঃখ একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠও নয় বরং সুখ-দুঃখ দুটো আলাদা আলাদা মুদ্রা চলুন বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করি আসুন বুঝে নিই সুখ-দুঃখ আমাদের কাছে কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসে উদাহরণ হিসেবে দুটি ঘটনাকে ধরে নিই। ধরুন এক ব্যক্তি আপনাকে সম্মানজনক কিছু বলল, একইসাথে অপর ব্যক্তি অসম্মানজনক কিছু বলল দুটি ঘটনাই আপনার সাথে হল প্রথম ঘটনা থেকে আপনাকে সুখ প্রাপ্তি হল এবং দ্বিতীয় ঘটনা থেকে আপনার দুঃখ প্রাপ্তি হল এখানে দুটি ঘটনাই তো আলাদা আলাদাআরেকটি উদাহরণ নিচ্ছি ধরে নিন আপনি রসগোল্লা খেতে খুব পছন্দ করেন অর্থাৎ রসগোল্লা থেকে আপনি অনেক সুখ উপভোগ করেন কিন্তু যদি রসগোল্লা আপনাকে ভরপেট খেতে দেওয়া হয় তখন কি করবেন? রসগোল্লা খাবার সময় তো আপনি অনেক সুখ পাচ্ছেন এবং সুস্বাদু অনুভব করছেন কিন্তু পেটে স্থান না থাকার কারণে পেটে ব্যথা অনুভব হচ্ছে অর্থাৎ পেটের জন্য কষ্ট অনুভব হচ্ছে এর অর্থ জিভ থেকে সুখ অনুভব করছেন এবং পেট থেকে দুঃখ অনুভব করছেন এখানে দুটি ঘটনাই মোটামুটি সাথে সাথে ঘটছে যদি আমরা এই ঘটনাটিকে সঠিকভাবে পর্যালোচনা করি তবে জানব যে এটি একটি ঘটনা নয় বরং দুটি আলাদা আলাদা ঘটনা কেননা রসগোল্লা সুস্বাদু সেইজন্যই তো সুখ অনুভব হচ্ছে, যেহেতু পেটে অতিরিক্ত স্থান নেই তাই রসগোল্লা প্রবেশ করার পর পেটকে প্রসারিত হতে হচ্ছে এবং ব্যথার কারণে দুঃখ উৎপন্ন হচ্ছে তাহলে আমরা বুঝে গিয়েছি যে এখানে সুখ-দুঃখ দুটি আলাদা ঘটনার কারণে ঘটছে কেননা রসগোল্লা নিজে কোনো সুখও নয় এবং দুঃখও নয় এটি একটি খাদ্যবস্তু যা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সুখ-দুঃখরূপে পরিণাম প্রদান করে থাকে স্পষ্ট করে বোঝার জন্য আরও একটি উদাহরণ নিচ্ছি ধরুন আপনার রসগোল্লা অধিক পছন্দ এবং আপনাকে ১০ কিলো রসগোল্লা খেতে দেওয়া হল আপনি রসগোল্লা খেতে আরম্ভ করে দিলেন যা থেকে আপনি সুখ অনুভব করেন কিছুক্ষণ পর আর আপনার রসগোল্লা খেতে ইচ্ছে হয় না এবং আপনি আর রসগোল্লা খেতে চান না কিন্তু আপনাকে যদি অবশিষ্ট সমস্ত রসগোল্লা খেতে বাধ্য করা হয় তাহলে ওই রসগল্লাই আপনাকে দুঃখ দিতে শুরু করবে যা একসময় যা আপনাকে সুখ-সন্তুষ্টি দিয়ে আসছিল এবার অনেকে বলবেন দেখুন একই বস্তু কখনো সুখ দেয় আবার কখনো দুঃখ দেয় তাই সুখ-দুঃখ একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ তাহলে যতক্ষণ অবধি রসগোল্লা খাবার ইচ্ছে হচ্ছিল ততক্ষণ পর্যন্ত সুখ প্রদান করছিল এবং যখন ইচ্ছে ব্যতিরেকে অন্যের চাপে বাধ্য হয়ে খেতে হচ্ছিল তখন দুঃখ অনুভব হচ্ছিল তাহলে দুটি ঘটনা এখানে আলাদা আলাদা একটিতে নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী ছিল এবং অন্যটিতে ইচ্ছের বিপরীতে অন্যের চাপে বাধ্য করা হয়েছিল। তাই এখানে সুখের কারণ আলাদা এবং দুঃখের কারণও আলাদা এমনটি তো দেখা যাচ্ছে না যে এখানে সুখ-দুঃখের কারণ বা দুঃখ সুখের কারণ সুখ-দুঃখ তো পরিণামমাত্র একে অপরের কারণ নয় কিছু মানুষ বলেন যে দুঃখের অনুভব ছাড়া আমরা কোনো সুখের অনুভব করতে পারি না অর্থাৎ অন্যভাবে বলতে হয় যে দুঃখই হচ্ছে মূল ভিত্তি কোনোপ্রকার সুখ অনুভব করার জন্য উপরের আলোচনা থেকে আপনি নিশ্চয়ই বুঝে গিয়েছেন কোনো দুঃখের অনুভব ছাড়া আমরা সুখ অনুভব করতে পারব না, একথা অত্যন্ত শিশুসুলভ হবে বাস্তবতা হচ্ছে আমরা নিজেদের জ্ঞানেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে কোনোকিছু অনুভব করিযদি এই অনুভব আমাদের ইচ্ছে অনুযায়ী হয় তবে তা থেকে আমরা সুখ অনুভব করিযদি ইচ্ছের বিপরীত হয় তবে তা থেকে আমরা দুঃখ অনুভব করি এই উদাহরণ থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে দুঃখ সুখের ভিত্তি নয় বরং ভাল লাগাই অনুভব করাই হচ্ছে সুখের আধার কোনো ভোগের নিকট এলে আমাদের ভাল লাগা অনুভব হয় এবং তখন আমরা সুখ অনুভব করি এইজন্য তো নয় যে আমরা দুঃখ অনুভব করছি বলে সুখ অনুভূত হচ্ছে যদি এমনটি হতো তাহলে দরিদ্র মানুষ সর্বাধিক সুখী অনুভব করত কেননা দরিদ্র মানুষ তো সারাজীবন অত্যধিক দুঃখ অনুভব করে থাকে একথা সত্য হলে দরিদ্র হবার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত এবং প্রতিটি মানুষ নানা কৌশলে দরিদ্র হবার জন্য চেষ্টা করত এইভাবে সর্বদা সুখী হবার প্রয়াস করত কিন্তু এমনটি হতে দেখা যায় না আর ধনীদের তো কম সুখী হওয়া উচিত কেননা তাদের জীবনে তো গভীর কোনো দুঃখ থাকে না আরেকটি উদাহরণ থেকে বুঝে নিই যে ইতিহাসে গৌতম বুদ্ধ যিনি ৩০ বছর বয়স অবধি কোনোপ্রকার দুঃখ অনুভব করেননি তাঁর জীবন অত্যন্ত সুখের ছিল তাঁর পিতা এমন ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন যার কারণে ৩০ বছর অবধি কোনোপ্রকার দুঃখ অনুভব হয়নি এমনটি তাঁর পিতা এইজন্য করেছিলেন কেননা তাঁর সাধু হয়ে চলে যাবার ভয় ছিল তাঁর পিতা চাননি যে পুত্র সাধু হয়ে যাক তাহলে এই উদাহরণ থেকেও আমরা বুঝতে পারলাম যে সুখের অনুভব করার জন্য দুঃখের অনুভব করা বাধ্যতামূলক নয় আমরা সরাসরি সুখ অথবা দুঃখ অনুভব করতে পারি সেইজন্য আমাদের কেবলমাত্র অনুভব করার ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন যা জন্ম থেকেই আমাদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন প্রকারের অনুভব করার জন্য পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং অন্তঃকরণ চতুষ্টয়ই হচ্ছে মূল অঙ্গ এইসকল অঙ্গ যাদের সুস্থ্য রয়েছে তারা যে কোনো প্রকারের বিষয়বস্তু অনুভব করতে পারেন


 প্রশ্ন ১২ ।। পরিবর্তনশীলতাই হচ্ছে সংসারের নিয়ম সেইজন্য সাধু-সন্তরা বলে থাকেন পরিবর্তনশীল সংসারে সুখী হওয়া সম্ভব নয় যদি এই বাক্য সত্য হয় তবে কোনো ব্যবস্থা থেকেই তো সুখ প্রাপ্তি সম্ভব হবে না তাহলে আপনি কীভাবে বলছেন আপনার ব্যবস্থায় সকলেই সুখে থাকবে?

 উত্তর ।। বন্ধুরা, আমার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী এই ধারণা অসত্য আসুন তা বোঝার প্রয়াস করি পরিবর্তনশীলতার অর্থ হচ্ছে এই জগৎ সংসারে সমস্তকিছুই সর্বদা পরিবর্তিত হয়ে চলেছে এখানে কোনো বস্তু অথবা পরিস্থিতি একরকম থাকে না বরং নিরন্তর পরিবর্তিত হতে থাকে উদাহরণস্বরূপ জল যেমন বাষ্পে রূপান্তরিত হয় তেমনি জল আবার বরফে রূপান্তরিত হয় বরফ আবার জলে রূপান্তরিত হয় এটি জলচক্রের বৃত্ত এইভাবেই প্রতিটি বস্তু কোনো না কোনো ছোট অথবা বড় বৃত্তে নিরন্তর পরিবর্তিত হয়ে চলেছে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমস্ত জগৎ সংসারের অস্তিত্ব চলতে থাকে এবং পরিবর্তিত হতে থাকে অস্তিত্ব এবং পরিবর্তন দুটোই একসাথে চলতে থাকে যদি এই পরিবর্তনশীলতার নিয়ম জগৎ সংসারে না থাকতো তবে এই সংসারের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যেতো এই জগৎ যে আদিতত্ত্ব দিয়ে তৈরি হয়েছে এই নিয়মের অভাব থাকলে তাতে কোনো গতিবিধিই হবে না অর্থাৎ আদিতত্ত্ব সর্বদা এক অবস্থায় থেকে যাবে এবং কখনোই তা রূপান্তরিত হয়ে সংসারে পরিবর্তিত হতে পারতো না তাই এই নিয়ম তো সংসারেই সীমাবদ্ধ নয় বরং তা আদিতত্ত্বের মধ্যেই ছিল এবং আদিতত্ত্বে বিদ্যমান থাকার কারণেই এই নিয়ম আমরা সংসারের মধ্যে সর্বত্র অনুভব করি এই নিয়মের ফলেই সংসারে এত বিভিন্নতা উৎপন্ন হতে পেরেছে। সকল পদার্থের সৃষ্টি সম্ভব হয় অন্যভাবে বলতে গেলে সকল প্রকার সুখ উপভোগের উপকরণ উৎপাদন সম্ভব হয় যদি পরিবর্তনশীলতার এই নিয়ম আদিতত্ত্বে না থাকতো তবে তো কোনো সৃষ্টিই সম্ভব হতো না আর সেই আদিতত্ত্বের অস্তিত্বও কোনো প্রয়োজনে আসতো না তা সর্বদাই আদিতত্ত্বরূপেই থাকতো, পরিবর্তিত হতে পারতো না। এমনটি নাহলে তার কোনো মহিমাও থাকতো না বা কোনো মহত্ত্বও থাকতো না অর্থাৎ কিছুই থাকতো না পরিবর্তনশীলতা হচ্ছে আদিতত্ত্বের এক বৃহৎ ভিত্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ গুণাবলীএই আদিতত্ত্বকে আত্মা বা পরমাত্মা নামেও জানি অর্থাৎ এই গুণাবলী বা পরিবর্তনশীলতার নিয়ম পরমাত্মার মধ্যেই নিহিত রয়েছে এইজন্য সংসারের উৎপত্তির মধ্যেও এই নিয়মের সর্বাধিক গুরুত্ব রয়েছে এত আলোচনার মাধ্যমে আমরা বুঝে গিয়েছি যে পরিবর্তনশীলতা কোনো দুঃখ অথবা সুখের জন্য উত্তরদায়ী নয় এ তো কেবলমাত্র একটি পদার্থকে রূপান্তরিত করার জন্য বিভিন্ন প্রকার পদার্থকে উৎপন্ন করতে সহায়ক এবং চক্রাকার নিয়মের মাধ্যমে সকল পদার্থ কোনো না কোনো রূপে আমরা সর্বদা প্রাপ্ত করতে থাকি উদাহরণ হিসেবে দেখেছি যে, জল'কে আমরা তিনটি রূপে সর্বদাই প্রাপ্ত করে থাকি এবং তিনটি রূপই সর্বদা পরিবর্তিত হতে থাকে তাহলে এই পরিবর্তনশীলতা পরমাত্মার অথবা প্রকৃতির একটি সুখ প্রদানকারী সৎগুণ কোনো দুঃখ প্রদানকারী অসৎগুণ নয় তাই পরিবর্তনশীলতার গুণাবলী কোনোপ্রকার দুঃখের জন্য দায়ী নয় কীভাবে আমাদের জীবনে সুখ-দুঃখ উৎপন্ন হয়ে থাকে তা আপনি উপরে জেনে-বুঝেই নিয়েছেন আরও বিস্তারিতভাবে বোঝার জন্য আমার দ্বিতীয় পুস্তক সম্পূর্ণ জীবন দর্শন - সুখী জীবনের অজ্ঞাত সূত্র অধ্যয়ন করুন


  প্রশ্ন ১৩ ।। সমাজবাদ এবং সাম্যবাদের দর্শনকে দেখতে তো আদর্শবান ব্যবস্থা বলে মনে হয় কিন্তু বাস্তবে তা অসফল কেন? এর পেছনে কি কারণ রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

 উত্তর ।। শুধুমাত্র সমাজবাদ এবং সাম্যবাদই নয় বরং অন্য সকল ব্যবস্থাতেও এটি স্পষ্ট করে উল্লেখ করা রয়েছে যে সকলের জন্য সমস্তকিছু সমানভাবে প্রাপ্তি হওয়া উচিত চারিদিকে সুখ আর সুখই তো থাকা উচিত দুঃখ যেন কোথাও না থাকে সকলে রামরাজ্যের আশা করে, কিন্তু তখন তো সেখানে একজন রাজাকে কেন্দ্র করে রাজতন্ত্র ছিল অথবা সকলে কোনো এক স্বর্গের আশা করে থাকে যেখানে সকলে সমস্তরকম সুখ অতি সহজেই উপভোগ করতে পারবে কোনোপ্রকার দুঃখ ছাড়াই তারা সমস্তরকমের বাদকে এইজন্য নিয়ে এসেছেন যেন সর্বত্রই সুখ বিরাজ করে কিন্তু যখনই এই সুখময় অবস্থাকে নিয়ে আসার জন্য কোনো সংবিধান প্রণয়ণ করা হয়েছে, সেই সংবিধানের মাধ্যমে তেমন অবস্থা আজ অবধি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি সেইজন্যই ওইসকল ব্যবস্থা অসফল হয়েছে কিন্তু এমনটিও নয় যে সেইসব থেকে একেবারে কিছুই প্রাপ্তি হয়নি অনেক বিভাগের অবস্থা পূর্বের তুলনায় ভাল হয়েছে আবার অনেক বিভাগের অবস্থা মন্দও হয়েছে আজ অবধি অনেক প্রকার ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হয়েছে কিন্তু এখনও পর্যন্ত তেমন সন্তুষ্টিমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি যা আমরা সকলে চাইছি আমার বোধ অনুযায়ী ওইসকল ব্যবস্থা অসফল হবার সবচেয়ে বড় এবং মূল কারণ হচ্ছে যে সমস্তরকম উপাদানের মূল অবস্থা সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তন-মনন  বা আলোচনা করা হয়নি মানুষকে তারা ভেতর থেকে বুঝতে পারেনি যাদের জন্য আমরা এই ব্যবস্থা নিয়ে আসতে চলেছি এমনকি এই সংসারকেও ভেতর থেকে বোঝার চেষ্টা হয়নি যার মধ্যে এই ব্যবস্থা বিরাজ করবে জীবনের উদ্দেশ্য কি এই বিষয়ের উপর প্রথম থেকেই চিন্তা-ভাবনা চলে আসছিল কিন্তু এমন একটি সিদ্ধান্তে আশা সম্ভব হয়নি যা নিয়ে সকলে একমত হতে পারে আপনারা অতীতে দেখেছেন যে বারবার ব্যবস্থা পরিবর্তিত হবার সময় বহু লড়াই হয়েছে কেননা সকলে সেই সিদ্ধান্তে একমত ছিলেন না ওই সকল ব্যবস্থা সমস্ত মানুষকে ভাল এবং মন্দ এই দুটি ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে যার পরিণামে আমরা সারাক্ষণ নিজেদের ভাল এবং অন্যদের মন্দ ভেবে লড়াই করে এসেছি আর এই সমাজবাদী ব্যবস্থাতেও তো মানুষকে বলা হয়েছিল যে এই ব্যবস্থা এলে আপনার সমস্ত দুঃখ দূর হয়ে যাবে এবং আপনি সবকিছু  পাবেন যা এখন কেবলমাত্র ধনবান ব্যক্তিরা ভোগ করে আসছে কিন্তু রাশিয়ার মানুষ দেখেছে যে ৩০-৪০ বছরেও এমন কিছুই বাস্তবে সম্ভব হয়নি ভাল দিন পেতে তারা আর কতদিন অপেক্ষা করবে? এখনও আর্থিক দিক দিয়ে সমাজ বহু শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে রয়েছে দরিদ্র এখনও দরিদ্র রয়েছে এবং তাদের শোষণও অব্যাহত রয়েছে একটি ছোট্ট কক্ষে বহু শ্রমিকদের রাখা হতো তাদের কাছে কোনো স্বাধীনতা ছিল না নিজেদের কোনো সমস্যা আলোচনা করার জন্য কোথাও কোনো স্বতন্ত্র স্থান ছিল না ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে কেউ কোনো আলোচনা করলে তাকে হত্যা করা হতো এমনই ভয়ানক ব্যবস্থা হিসেবে সমাজবাদ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল নামমাত্র সমাজবাদ ছিল একটি গোষ্ঠীই শাসন করছিল সমাজবাদের মত প্রকৃতঅর্থে কিছুই ছিল না আর শাসকবর্গ এমন ভাবেই ব্যবহার করে আসছিল যেমনটি রাজারা করতো তারা ধনীদের মতই সমস্ত সুখসুবিধা ভোগ করত যেখানে অন্যদের সেই সুখসুবিধা গ্রহণের অধিকার ছিল না বলা হয়েছিল যে শ্রমিকদেরই শাসন ব্যবস্থা তৈরি হবে এবং তারাই শাসন করবে কিন্তু বাস্তবে এমনটি হয়নি এখনও অবধি কিছু ব্যক্তিরাই শাসনভারের দায়িত্বে রয়েছে এবং রাজাদের মতই শাসন চালিয়ে যাচ্ছে মানুষ ভেবেছিল যে সমাজবাদ ব্যবস্থার অর্থ হচ্ছে আমাদের নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে কিন্তু এমন কিছু বাস্তবে ঘটেনি এবং সেই ব্যবস্থা অসফল হয়ে গিয়েছে বরং মানুষের পুঁজিবাদ ব্যবস্থাকে অধিক উপযুক্ত বলে মনে হয়েছে এতে স্বাধীনতাও অধিক রয়েছে বলে মনে হয়েছে সেইজন্য রাশিয়াতে আবারও ধীরে ধীরে পুঁজিবাদ প্রবেশ করতে থাকে আমি এখন এইসব সমস্যার মূল কারণ খুঁজে নিয়ে স্থায়ী সমাধান তৈরি করে দিয়েছি সেটিও একেবারে সমস্ত সুখসুবিধাযুক্ত ব্যবস্থা যা আমরা সকলে চাইছি তা প্রতিষ্ঠিত না হবার ক্ষেত্রে আর কোনো বাধা থাকবে না আপনি কেবলমাত্র একবার পড়েই এই ব্যবস্থাকে বুঝে নিতে পারবেন যে এই নতুন ব্যবস্থায় ঈপ্সিত পরিণাম অতি সহজেই বাস্তবায়িত হবে এই ব্যবস্থা মানুষকে ভাল বা মন্দে বিভাজিত করবে না সেই কারণে এই ব্যবস্থা কোনো মানুষেরই বিপক্ষে যাবে না এই ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠিত হলে সকলে সহজেই একমত হয়ে যাবে এতে সকলেই উপকৃত হবে এই ব্যবস্থা থেকে কোনো মানুষেরই ক্ষতির সম্ভাবনা নেই এটি বোঝাও অত্যন্ত সহজ নিজস্ব বোধ অনুযায়ী সকলেই এই ব্যবস্থাকে বুঝে নিতে পারবেন এই ব্যবস্থা চলে এলে সমৃদ্ধির দিক দিয়ে সকল মানুষের মধ্যে সামঞ্জস্য এসে যাবে সকলের জন্য সমস্ত রকমের স্বাধীনতা সমানভাবে থাকবে। সকলের জীবনযাপনের স্তর একসমান এবং উচ্চ গুণসম্পন্ন হবে একটি স্বতন্ত্র বিভাগ থাকবে যেখানে সকলে নিজেদের মতামত জানাতে পারবে যদি কারোর কাছে আরও ভাল সমাধান থাকে সেসবও তারা জানাতে পারবে এমনকি সেইসব তথ্য সকলে যে কোনো সময় অনলাইনে দেখেও নিতে পারবে প্রশাসনিক কর্তারা কি করছে, কি করতে যাচ্ছে এবং কেন করছে ইত্যাদি সমস্তরকম কার্যপ্রণালী অনলাইনে সকলে দেখতে পারবে এই ব্যবস্থায় সর্বশেষে জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে আর এই অধিকার কেবলমাত্র নির্বাচনের সময়ই নয় বরং নির্বাচনের পরও সর্বদা জনগণের কাছেই থাকবে এই নতুন ব্যবস্থায় সকলের মান-মর্যাদা একসমান থাকবে সকল প্রকার কর্মেরও মূল্যাংকনও একসমান থাকবে। জীবনযাপনের স্তর সমান থাকবে সকল প্রকার স্বাধীনতা সকলের জন্য সর্বদা সমানরূপে থাকবে ইত্যাদি ইত্যাদি


 প্রশ্ন ১৪ ।। নতুন ব্যবস্থায় সঠিক বা ভুলের নির্ধারণ কীভাবে হবে? নৈতিকতা এবং অনৈতিকতা কীরূপে থাকবে? কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে কাউকে স্বেচ্ছামৃত্যু অথবা প্রাণদণ্ড প্রদান করা কি উচিত?

 উত্তর ।। যে ব্যবস্থার মাধ্যমে সকলের জন্য সুখ উৎপন্ন হয় তাকে সঠিক বলা হবে এবং যে ব্যবস্থার মাধ্যমে সকলের জন্য দুঃখ উৎপন্ন হয় সেই ব্যবস্থাকে ভুল বলা হবে তাই সঠিক এবং ভুল নির্ধারিত হয় সুখ-দুঃখের অনুভব থেকে সুতরাং সুখী হবার অর্থ হচ্ছে সঠিক এবং দুঃখী হবার অর্থ হচ্ছে ভুল আমরা সকলে সুখী হতে চাই অর্থাৎ আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে সুখ প্রাপ্তি করা যা ঘটছে তা ঠিক না ভুল তা জানার জন্য সুখই হচ্ছে একমাত্র মাপকাঠি নৈতিক শব্দের অর্থ হচ্ছে নীতিনিয়ম জীবনকে সুখী করার জন্যই অর্থাৎ উদ্দেশ্য পূরণের কথাকে মাথায় রেখেই নীতিনিয়ম প্রণয়ন করা হয়আমরা জেনেছি যে জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে সুখী হওয়া তাই নৈতিক এবং অনৈতিকতার নির্ধারণও জীবনের উদ্দেশ্য কী তার ভিত্তিতেই তৈরি হবে যা করলে সুখ উৎপন্ন হয় তা নৈতিক এবং যা করলে দুঃখ উৎপন্ন হয় তা অনৈতিক যেসব করলে আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য পূরণ হবে সেসব নৈতিক হবে এবং অবশিষ্ট সব অনৈতিক হবে

 যদি কেউ কোনো কারণবশতঃ এমন কোনো মানসিক রোগগ্রস্ত হয়ে অন্যদের হত্যা করতে থাকে, যদি তার চিকিৎসা উপলব্ধ না থাকে তবে তাকে মৃত্যুদণ্ড বা মৃত্যু প্রদান করা যেতে পারে যদি এমন কোনো পরিস্থিতি চলে আসে যে আপনি সামনের ব্যক্তিকে হত্যা না করলে সে আপনাকে হত্যা করবে তবে আত্মরক্ষার জন্য আপনি বিশেষ ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমূহকে মৃত্যু প্রদান করতে পারেন কিন্তু ব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে এইসব ঘটনাকে পর্যালোচনা এবং অনুসন্ধান করা হবে দেখতে হবে ব্যবস্থার কোনো দুর্বলতার কারণে এমন ঘটনা ঘটছে কিনা যদি কোনো কারণ দেখা যায় তবে তাকে তৎক্ষণাৎ সংশোধন করা উচিত, নাহলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে থাকবে আর আমার বোধ অনুযায়ী ৯৯ শতাংশেরও অধিক এই সম্ভাবনা রয়েছে যে কোনো দুর্ঘটনার পেছনে ব্যবস্থাই দায়ী থাকে কেননা মানুষ স্বভাববশত সুখপ্রেমী হয়ে থাকে এমনকি সে স্বপ্নেও এমন কোনো কর্ম জেনে বুঝে করে না যার ফলে তাকে দুঃখ পেতে হয় হয় সে না জেনে করে অথবা মন্দ ব্যবস্থার কারণে এমন কিছু করতে বাধ্য হয় তাই কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ব্যবস্থার দুর্বলতার উপর উচ্চস্তরের অনুসন্ধান হওয়া উচিত


 প্রশ্ন ১৫ ।। আমরা কীভাবে বুঝতে পারব যে কোনো ব্যবস্থা সফল হচ্ছে কিনা? অথবা ব্যবস্থা সফল হবার মাপকাঠি কী?

 

উত্তর ।। যদি আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য সহজ সরলভাবে নিরন্তর প্রাপ্ত হতে থাকে তবে আমরা বলতে পারি সেই ব্যবস্থা সফল হয়েছে অন্যথায় তা অসফল বলে ধরা হবে তেমন নাহলে সংশোধনের প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া উচিত অর্থাৎ আমাদের সকলের ব্যক্তিগত সুখ, পারিবারিক সুখ, সামাজিক সুখ এবং সমষ্টিগত সুখ যদি অবিরত প্রাপ্ত হতে থাকে তবে নিশ্চিতভাবে বলা হবে যে সেই ব্যবস্থা সফল হয়েছে আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য অবিরত প্রাপ্ত হতে থাকলে এটিই হবে কোনো সঠিক ব্যবস্থার মাপকাঠি অর্থাৎ উদ্দেশ্য পূরণই হবে মাপকাঠি


 প্রশ্ন ১৬ ।। আমরা জানি আদর্শ ব্যবস্থা বলে কিছু হয় না সবকিছুরই নিজস্ব লাভ-ক্ষতি রয়েছে এখনও পর্যন্ত বহু ব্যবস্থা এসেছে এবং অসফলও হয়েছে আপনার রচিত ব্যবস্থায় কী এমন রয়েছে যে তা সফল হবেই?

 উত্তর ।। আমার পর্যালোচনা কিছুটা ভিন্ন। জীবনে লাভ-ক্ষতির বিষয়টি তিন প্রকারের হয়ে থাকে এমন কিছু থাকে যা থেকে কেবলমাত্র লাভই হয় এমন কিছু থাকে যা থেকে কেবলমাত্র ক্ষতিই হয় আবার এমন অনেক বিষয় থাকে যা থেকে লাভ এবং ক্ষতি দুটিই হয় আমরা সকাল থেকে সন্ধ্যে এই তিন প্রকারের বিষয়ই অনুভব করে থাকি এই কথাটিকে যদি ব্যবস্থার নিরিখে বিচার করতে হয় তবে বলা যেতে পারে যে ব্যবস্থাও এই তিন প্রকারের হতে পারে যার মাধ্যমে সর্বদা লাভ হবে, আবার এমনও হতে পারে যা থেকে সর্বদা ক্ষতিই হবে অথবা এমনও হতে পারে যা থেকে লাভ এবং ক্ষতি দুটিই হবেসাধারণতঃ পূর্ণরূপে ক্ষতি হবে এমন ব্যবস্থা কেউ চাইবে না কেননা ক্ষতি আমরা কেউ চাই না তাই দুই প্রকারের ব্যবস্থারই প্রয়োগ হয়ে থাকে মানুষ মূলত নিজেদের লাভের কথা ভেবেই ক্রিয়া করে তাতে অন্য কারোর জন্য ক্ষতিকর হলেও যদিও কেউ অন্যের ক্ষতি চায় না কিন্তু যখন দেখতে পায় তার কাছে অন্য কোনো বিকল্প নেই যার মাধ্যমে সবদিক দিয়ে শুধুমাত্র লাভই হবে এবং অন্যের কোনো ক্ষতি হবে না তখন সে বাধ্য হয়ে এমন কিছু বিকল্পকে চয়ন করে যার ফলে নিজের তো লাভ হয় কিন্তু অন্যের ক্ষতি হয়ে যায়। যদি সে এমন কোনো বিকল্প পেয়ে যায় যার মাধ্যমে শুধুমাত্র লাভই হয় এবং অন্য কারোর কোনো ক্ষতি হয় না তবে তো সে সঠিক বিকল্পই চয়ন করবে এমন ব্যবস্থা হতে পারে যার মাধ্যমে সকলের লাভ হবে, আবার এমন ব্যবস্থাও হতে পারে যার মাধ্যমে সকলের সর্বাধিক লাভ হবে কারোর কোনোপ্রকার ক্ষতি হবে না যে ব্যবস্থা আমি লিখেছি তা এই শ্রেণীরই অন্তর্গত যার মাধ্যমে সকলের সর্বাধিক লাভ হবে এবং কারোর কোনো ক্ষতি হবে না আপনারা সকলে এই ব্যবস্থা অধ্যয়ন করে সহজেই বুঝতে পারবেন যে নতুন ব্যবস্থায় এমনই সম্ভবনা রয়েছে। একবার এই ব্যবস্থা সম্পর্কে অবগত হয়ে গেলে বুঝে যাবেন যে এমনটি হওয়া কঠিন কিছু নয় যতদিন পর্যন্ত মোবাইল ফোনের আবিষ্কার হয়নি ততদিন আমরা দূরে থেকেও একে অপরের সাথে কথা বলতে পারব এমনটি ভাবা শুধুমাত্র কঠিন ছিল না বরং অসম্ভব ছিল কিন্তু আবিষ্কার হবার পর এই খবর সকলের কাছে দ্রুত পৌঁছে গিয়েছে এবং এখন আমরা অতি সহজেই একে অপরের সাথে কথা বলতে পারছি তাহলে বিষয়টিকে শুধুমাত্র জেনে বুঝে নেওয়ার অপেক্ষা ছাড়া অন্য কিছু নয় যতদিন অবধি আদর্শ কোনো ব্যবস্থা সম্পর্কে আমরা অবগত না হই ততদিন পর্যন্ত এমনই মনে হবে যে আদর্শ ব্যবস্থা বলে কিছু হয় না যদিও সংসারে এমন অনেক কিছু রয়েছে যার আদর্শ রূপকে আমরা অনুভবও করে থাকি আমরা অনেক সময় খাবার এতটাই সুস্বাদু পেয়ে যাই তখন মনে হয় এর চাইতে আর অধিক সুস্বাদু খাবার হতে পারে না। অনেক সময় আবহাওয়া বা তাপমাত্রা এতটাই মনোরম হয়ে যায় যে মনে হয় যদি এমন তাপমাত্রা পুরো বছর থাকে তবে খুব ভাল হয় কখনও সুন্দর পরিবেশ দেখে মনে হয় যে এর থেকে ভাল দৃশ্য হতে পারে না যেখানে আমাদের কাছে এখন কোনো সঠিক ব্যবস্থা নেই তবুও অনেক সময় আদর্শসম্বলিত কোনো ঘটনা আমাদের জীবনে ঘটে যায় যখনই সঠিক ব্যবস্থা আমাদের জীবনে চলে আসবে তখন সবকিছু  আদর্শসম্বলিতভাবেই আমাদের সকলের জীবনে সর্বদা ঘটতে থাকবে এবার ভাবুন যদি আপনার জীবন সর্বদা আপনার ইচ্ছে অনুযায়ী চলতে থাকে তবে কি তা কোনো ব্যবস্থার মধ্যে আদর্শ অবস্থা হবে না? নিশ্চিতভাবে হবে আর এটি সকলের জীবনে হতে চলেছে


 প্রশ্ন ১৭ ।। কোনটি সঠিক এবং কোনটি ভুল তা বোঝার জন্য প্রতিটি মানুষের নিজস্ব বোধ রয়েছে তাহলে এমন অবস্থায় সকল মানুষ কীভাবে একটি ব্যবস্থার জন্য সহমত পোষণ করবে?

 উত্তর ।। একথা অবশ্যই সত্য যে সকলের নিজস্ব বোধ রয়েছে কিন্তু সকল প্রকার বোধেরও তো একটি কাঠামো রয়েছে যেমন আমরা ফুটবল খেলায় দেখে থাকি সকলে নিজের নিজের যায়গায় দাঁড়িয়ে খেলে থাকে। আলাদা যায়গায় দাঁড়িয়ে খেললেও মূলত সকলে খেলার নিয়ম মেনেই খেলে থাকে তেমনি একটি ব্যবস্থায় সকলের আলাদা অবস্থান থাকে সকলের নিজস্ব পছন্দ থাকে সকলের নিজের পছন্দ অনুযায়ী কর্মও থাকে। যার জন্য ভিন্ন-ভিন্ন বোধেরও প্রয়োজন হয় যেমন স্বাভাবিকভাবে ভোজনের ক্ষেত্রে সকলের বিভিন্ন স্বাদের খাবার পছন্দ তেমনি ব্যবস্থাতেও সকলের জন্য সবকিছু  সহজলভ্য থাকবে যার যা কিছু প্রয়োজন তা পূরণ করে নিতে পারবে তাই বিভিন্ন প্রকারের বোধ থাকলেও কোনো একটি ব্যবস্থার জন্য সকলেই একমত হতে পারে যদি সেই ব্যবস্থায় নিজেদের পছন্দের জীবন-যাপন তারা পেয়ে যায় অথবা যেমন জীবন তারা কাটাতে চায় উদাহরণস্বরূপ, বাজারে যদি এমন কোনো বস্তু আসে যা সকলের সামর্থ্যের মধ্যে হয় এবং সকলের জীবনকেও সরল করে দেয় তখন এমন বস্তুর প্রতি সহজেই সকলে আকৃষ্ট হয়ে যায় এবং তা ভোগ করতে শুরু করে অথবা সরকার যখন এমন কোনো নিয়ম প্রণয়ন করে যা অধিকাংশ মানুষের কল্যান করবে তখন সেই নিয়মের প্রতি সকলে একমত হয়ে যায় তাই এই নতুন ব্যবস্থাও সকলের কল্যানের কথাই বলছে এবং সম্পূর্ণ পরিকাঠামো এমন করেই তৈরি করা হয়েছে তাই মানুষ সহমত না হবার কোনো কারণ চোখে পড়ে না তবে হ্যাঁ যতদিন মানুষ সম্পূর্ণরূপে এই ব্যবস্থাকে জেনে বুঝে না নেবে ততদিন পর্যন্ত ছোটোখাটো অসম্মতি দেখা দিতে পারে। সম্পূর্ণরূপে বুঝে গেলে অতি সহজেই সকলের সম্মতি চলে আসবে এখন হোক বা পরে হোক সকলকে বুঝে নিতেই হবে


 প্রশ্ন ১৮ ।। মৃত্যু কি মানুষের জন্য সর্বদা সমস্যা হয়েই থাকবে? মানুষ কি কখনও অমর হতে পারবে না?

 উত্তর ।। মানুষ জীবিত থাকতে চায় কেননা নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী সে সমস্তরকম সুখ উপভোগ করতে চায় সে এটি অনুভব করে যে বর্তমানে ৫০ থেকে ৮০ বছর অবধি যে গড় আয়ু সে পায় তাতে তার সমস্ত ইচ্ছে পূরণ হয় না এবার বিষয়টিকে এইভাবে দেখার চেষ্টা করি যদি কেউ এমন জীবন পায় যেখানে তার জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু অবধি সুখী জীবন পায় তাহলে কি তার আয়ু স্বাভাবিকভাবে অধিক হয়ে যাবে না? তখন কি সে অনুভব করবে না জীবনের সমস্ত ইচ্ছে পূর্ণ হয়ে গেছে এবার দীর্ঘ ঘুমে চলে যাই অর্থাৎ মৃত্যুকে কি সে নিজের ইচ্ছেয় বরণ করে নেবে না? দ্বিতীয় কথা হচ্ছে দুঃখ, চিন্তা, অশুদ্ধ খাবার ইত্যাদির কারণে আমাদের স্বাভাবিক আয়ু কমে যায় যদি এমন ব্যবস্থা চলে আসে যেখানে জীবনের সকল প্রকার দুঃখ, চিন্তা ইত্যাদি উৎপন্নই না হয় এবং খাবারদাবারও শুদ্ধ হয়ে যায় অর্থাৎ সমস্ত প্রকারের সন্তুষ্টি জীবনে অনুভব করা যায় তবে স্বাভাবিকভাবে প্রত্যেকের গড় আয়ু বেড়ে যাবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে মানুষ ১৫০ থেকে ২০০ বছর অবধি গড় আয়ু প্রাপ্ত করতে পারে কিন্তু আমার অনুমান জীবনে যদি কোনো দুঃখ না উৎপন্ন হয় এবং সর্বদা সুখই থাকে তবে মানুষের গড় আয়ু ৪০০ বছর অবধি সহজেই প্রাপ্তি হবে ২০০ বছর থেকে ৪০০ বছরের জীবনে নিশ্চিতভাবেই মানুষ এমনটি আর অনুভব করবে না যে তার কোনো ইচ্ছে অপূর্ণ রয়ে গেছেতারপর স্বেচ্ছা মৃত্যু বরণেও কোনো সমস্যা থাকবে না। এমনটি আমার মনে হয়

 তৃতীয় কথাটি বিজ্ঞান বিষয়কবর্তমানে অথবা আগামীকাল বিজ্ঞান এমন অবস্থায় পৌঁছে যাবে যেখানে মৃত্যুর সকল কারণ জেনে নিয়ে এমন সুবিধা প্রদান করে দিতে পারে যে যার যতদিন পর্যন্ত জীবিত থাকার ইচ্ছে সে ততদিন অবধি জীবিত থাকতে পারে তাও একেবারে যৌবন অবস্থায় আর যখন এই জীবনের উপর বিরক্ত বা একঘেয়েমি চলে আসবে তখন সে ইচ্ছামৃত্যু নিতে পারে আমার অনুমান এই যে নতুন ব্যবস্থা চলে এলে বিজ্ঞানীরা শীঘ্রই এটি আবিষ্কার করতে সক্ষম হতে পারবে কেননা নতুন ব্যবস্থায় বিজ্ঞানীরাও সঠিক পথে গবেষণা করবে অস্ত্রশস্ত্র তৈরির জন্য আর গবেষণা করবে না আর নতুন ব্যবস্থায় তো বিজ্ঞানীদের সংখ্যাও বর্তমান সময়ের তুলনায় অনেকগুণ বেড়ে যাবে উপকরণও বর্তমান সময়ের তুলনায় অধিক উপলভ্য হবে এরপর একদিন মানুষ অমরত্ত্ব প্রাপ্তি করবে


 প্রশ্ন ১৯ ।। পারস্পরিক সম্বন্ধের মধ্যে সমস্যাগুলির সমাধান এই নতুন ব্যবস্থায় কীরূপে হবে?

 উত্তর ।। উপরে সম্পূর্ণ পুস্তক অধ্যয়ন করার পর এই বিষয়ে আপনি নিশ্চয়ই বুঝে গিয়েছেন বর্তমান সময়ে মানুষের মধ্যে ভাল সম্পর্ক না থাকার দুটি মুখ্য কারণ রয়েছে প্রথমটি হচ্ছে পরিবারের সকল সদস্য আর্থিকভাবে স্বনির্ভর নয় এবং দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে সম্পর্ক সম্পর্কে সঠিক শিক্ষার অভাব আসুন এবার একে একে তা বোঝার চেষ্টা করি আমরা যদি নিজেদের পরিবারকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি তবে দেখব যে পরিবারের মধ্যে যখনই কোনো বিবাদ হয় সেখানে আপনি মূলত অর্থ সম্পদকেই মূল কারণ হিসেবে পাবেন আর এমনটি হবার কারণ হচ্ছে পুরো পরিবার অর্থের জন্য বিশেষত একজনের উপর নির্ভরশীল থাকে যার যা কিছুর প্রয়োজন হয় তার জন্য সেই ব্যক্তির কাছে সকলে দাবী করে যদি সেই ব্যক্তির কাছে পর্যাপ্ত অর্থ থাকে তবে তো ঠিক আছে নাহলে তৎক্ষণাৎ সেখানে মনোমালিন্য শুরু হয়ে যায় এই নতুন ব্যবস্থায় সমস্তকিছুই সরকারের উপর নির্ভর করবে সকলে নিজেদের চাহিদা সরাসরি সরকারের কাছে দাবী করবে এমনকি সকলের চাহিদা পূরণও হয়ে যাবে তাই এমন অবস্থায় সম্পর্কের মধ্যে তো অর্থ প্রবেশ করবে না ফলে সম্পর্কের মধ্যে বাস্তবিকতা বজায় থাকবে তারপর থেকে আমাদের সম্বন্ধ কেবলমাত্র প্রেমপূর্ণ ভিত্তিতেই তৈরি হবে যেখানে প্রেমের অনুভব থাকবে এবং যতদিন প্রেম থাকবে ততদিন সম্পর্ক টিকে থাকবে তা নাহলে সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবে বিচ্ছেদ হয়ে যাবে। নতুন ব্যবস্থায় সম্পর্ক প্রেম বিনিময়ের জন্যই তৈরি হবে অর্থের জন্য নয় প্রেম হচ্ছে এমনই অনুভব যা একজনের কাছ থেকে না পেলে অন্যজনের কাছ থেকে পেয়ে যাবে কিন্তু অর্থের বেলায় এমনটি হয় না যে একজনের কাছে না পেলে তা অন্যজনের কাছে পাওয়া যাবে এইজন্য বেশীরভাগ সম্পর্কের ক্ষেত্রে অর্থই মূল সমস্যা হিসেবে দেখা দেয় নতুন ব্যবস্থায় এই সমস্যার সুরাহা হয়ে যাবে এইবার সম্পর্কগুলি কেবলমাত্র প্রেমকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠবে প্রেম না থাকলে সম্পর্কও তৈরি হবে না ইচ্ছের বিপরীতে বা অনাবশ্যক সম্পর্কের ভার আর থাকবে না দ্বিতীয়ত, শিক্ষার মাধ্যমে সম্পর্ক কি, কেন এবং কীভাবে জীবন্ত রাখতে হয় অথবা কীভাবে পালন করতে হয় এই সম্পর্কে জ্ঞান সুস্পষ্টভাবে প্রদান করা হবে অর্থ এবং জ্ঞান সঠিকভাবে থাকলে সম্পর্ক নিয়ে কখনই কোনো প্রকারের সমস্যা উৎপন্নই হবে না


 প্রশ্ন ২০ ।। আপনার কি মনে হয় না কোনো ব্যবস্থাকে বদলানোর জন্য মানুষকেও সংশোধন করা প্রয়োজন? অর্থাৎ মানুষ নিজেদের ত্রুটিমুক্ত না করলে যতই সঠিক ব্যবস্থা আসুক না কেন তা অসফল হবেই? সুতরাং মানুষকে প্রথমে সংশোধন না করলে আপনার ব্যবস্থা কীভাবে সফল হবে?

 উত্তর ।। যে কোনো ব্যবস্থা মূলত মানুষের জন্যই তৈরি হয়। মানুষের স্বভাব কেমন এবং কত প্রকার হয়ে থাকে ইত্যাদি আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত জানব না ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা তৈরি করা বা প্রতিষ্ঠিত করার কোনো অর্থ থাকে না এবার জেনে নিই মানুষ কেমন প্রকৃতির হয় আমরা যদি মানুষকে পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখতে পাব যে সকলেই নিজেদের মত করে সুখী হতে চায় এই সুখ প্রাপ্তির জন্যই তাকে জীবনভর নানারকম প্রচেষ্টা করতে দেখা যায় এবার বলুন এতে কী ভুল রয়েছে? কিছু মানুষ বলে থাকেন অবশ্যই মানুষের সংশোধন প্রয়োজন নিজের এবং পরিজনের জন্য সুখের প্রচেষ্টা করাটা কি ভুল কর্ম? আপনি বলবেন, মেনে নিলাম আপনার এই কথায় কোনো ভুল নেইকিন্তু মানুষ যে ব্যবস্থার নিয়ম অনুযায়ী জীবনযাপন করে না এটি কি ভুল নয়? তাহলে আসুন এই বিষয়টিকে বুঝে নিই যদি আমরা এমন মানুষদের জীবনকে পর্যালোচনা করি তাহলে দেখব যাদের আমরা এই ভেবে মন্দ বলে থাকি যে তারা ব্যবস্থা অনুযায়ী জীবনযাপন করে না; সেক্ষেত্রে আমাদের বুঝে নিতে হবে সকলেই প্রথমে ব্যবস্থা অনুযায়ী জীবনযাপনের জন্য সার্বিকভাবে প্রচেষ্টা করে থাকে কিন্তু অসফল হয় যখন তারা ব্যবস্থা অনুযায়ী জীবনযাপনের চেষ্টা করে নিরাশ হয়ে যায় তখন তারা নিয়মবহির্ভূত কর্মের মাধ্যমে সুখী হবার এবং নিজেদের পরিবার পরিচালনার প্রচেষ্টা করে যাকে আমরা অনৈতিক বা ব্যবস্থার বিপরীত কর্ম বলে মনে করি। অন্যভাবে বললে এদের অপরাধী বলা হয় এই কারণেই আমরা তাদের মন্দ মানুষ বলে থাকি এবং সংশোধনের প্রয়োজন বোধ করি। এ নিয়ে শুধুমাত্র আলোচনাই চলছে না বরং বহু মানুষ, বহু সংস্থা এবং বর্তমান সময়ের ব্যবস্থাও বহু প্রয়াস করে চলেছে সেইসব মানুষদের শুধরে নেবার জন্য যদিও সকলেই অসফল হচ্ছে কারোর মধ্যে কোনো সংশোধন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না নিজের এবং পরিবারের জন্য সুখ চাওয়া এবং নিজের যোগ্যতা, ক্ষমতা ইত্যাদির মাধ্যমে প্রয়াস করা কি কোনো ভুল কর্ম? তা যদি ভুল না হয় তবে তাদেরকে কীসের জন্য সংশোধন করতে হবে? কোনো ব্যবস্থাও তো এই উদ্দেশ্য নিয়েই স্থাপন করা হয় যেন সকলে সুখে জীবনযাপন করতে পারে ব্যবস্থা সামান্য কিছু মানুষের সুখের জন্য তো নয়। এখনো অবধি ব্যবস্থার বিপরীতে না গিয়েও অন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা প্রণয়ন করা যায়নি যার মাধ্যমে সকলে সুখে জীবন কাটাতে পারেতাহলে এতে মানুষের দোষ কোথায়? কেন তারা নিজেদের পরিবারকে সর্বদা দুঃখী অবস্থাতেই দেখতে থাকবে? এমনকি দিনের পর দিন অধিক দুঃখী হতে থাকবে? এইজন্য কি তারা নিজেদেরকে, সমাজকে অথবা পূর্বজন্মের পাপকে দোষ দিতে থাকবে? অথবা এই জগতে জন্মগ্রহণ করাকে দোষ দিতে থাকবে? প্রতিটি মানুষ সুখসুবিধা উপভোগ করে বেঁচে থাকতে চায় যাদের তারা ভালবাসে তাদেরকেও সুখী দেখতে চায় আমার পর্যবেক্ষণও এটিই বলে যে মানুষের মধ্যে কোনো ভুল নেই তাদের সবকিছু ঠিকঠাক রয়েছে। অসম্পূর্ণব্যবস্থার কারণে তাদের এমনটি করতে বাধ্য হতে হয় এমনটি তারা নিজেরাও করতে চায় না তাই সকল মানুষ মূলত সঠিকই রয়েছে তাদের জন্য ভিন্নভাবে কিছু করার প্রয়োজন নেই কে জানে না যে, চুরি করা অসৎ কর্ম? সকলেই জানে তারপরও তো করে থাকে তারা না জেনে করে তা কিন্তু নয় এইজন্য করে কেননা চুরি করতে তারা বাধ্য হয় সংশোধন করার অর্থও তো এটিই হবে যে, তারা জানে না চুরি করা অসৎ কর্ম তাই তাদের উপদেশ দিয়ে জ্ঞানবর্ধন করতে হবে যেন তারা পুনরায় অসৎ কর্ম না করে কিন্তু এই জ্ঞান তো সকলের কাছে প্রথম থেকেই রয়েছে তাহলে আবার কীসের সংশোধন? বন্ধুরা, প্রয়োজন শুধুমাত্র এমন একটি ব্যবস্থা স্থাপন করা যেন নিজের এবং প্রিয়জনদের সুখের জন্য কাউকেই কোনোপ্রকার অসৎ পথ অবলম্বন করতে বাধ্য না হতে হয় অর্থাৎ সকলের জন্য যেন সমস্তরকম সুখ স্বাভাবিকভাবে আসতে থাকে তাই এই নতুন ব্যবস্থা খুব সহজেই সফল হয়ে যাবে এবং মানুষকে শোধরানোর বৃথা প্রচেষ্টা করতে হবে না কেননা কেউই মন্দ নয় তবে হ্যাঁ, কেউ রোগগ্রস্ত হলে অবশ্যই চিকিৎসা করানো প্রয়োজন


 প্রশ্ন ২১ ।। আপনার ব্যবস্থায় কেবলমাত্র ভৌতিক সুখসুবিধার কথাই বলা হচ্ছে কিন্তু কিছু মানুষের কাছে শুরু থেকেই তা রয়েছে আমরা এটিও দেখছি যে তারাও সমস্ত দিক দিয়ে সুখী নয় তাহলে নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবার পরও কি মানুষ পূর্ণরূপে সুখী হতে পারবে? এই বিষয়ে আপনি কি বলবেন?

 উত্তর ।। এই সংসার ভৌতিক এবং আধ্যাত্মিক জগৎ হিসেবে বিভক্ত নয় এটি তো মানুষ বোঝানোর দৃষ্টিকোণ থেকে সংসারকে শ্রেণীবিভক্ত করে থাকে তার কারণ হচ্ছে শ্রেণীবিভক্ত করে কিছু বোঝানো এবং সেই অনুযায়ী পরিচালনা করা সহজ হয়ে যায় উদাহরণস্বরূপ পৃথিবীর কোথাও পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশ বলে কিছু হয় না কিন্তু ব্যবস্থাগত দৃষ্টিকোণ থেকে এইভাবে শ্রেণীবিভক্ত করলে সেখানকার ব্যবস্থা পরিচালনা করা সহজ হয়ে যায় এইসব শ্রেণীবিভাগ কাল্পনিক হয় এবং সুবিধার জন্য করা হয় তার আলাদা কোনো অর্থ ভাবা উচিত নয় যদি আলাদা কোনো অর্থ করা হয় তবে অনাবশ্যক সমস্যা উৎপন্ন হতে শুরু করে যেমন দেশের শ্রেণীবিভাগ তৈরি করে মানুষ এর সাথে আমার দেশ তোমার দেশ ভেবে নিয়ে আবেগের সাথে জুড়ে গিয়েছে আর এখন এটিকেই দেশপ্রেম এবং দেশদ্রোহী হিসেবে দেখা হচ্ছে যেখানে জগতের শ্রেণীবিভাগ ব্যবস্থাগত দৃষ্টিকোণ থেকে করা উচিত অর্থাৎ কাল্পনিকরূপে করা উচিত ভাবনাত্মকরূপে নয় আমাদের বুঝে নিতে হবে কোনটি কাল্পনিকরূপে এবং কোনটি বাস্তবিকরূপে বা ভাবনাত্মকরূপে নেওয়া উচিত ভাবনাত্মকরূপের অর্থ হচ্ছে যে বস্তু বাস্তবিক জগতে রয়েছে কাল্পনিক জগতে নয় তাই বাস্তবিক বলুন বা ভাবরূপ বলুন তা একই কথা যেমন নতুন ব্যবস্থা এখন কাল্পনিকরূপে রয়েছে এই কল্পনার উদ্দেশ্য হচ্ছে আমরা সকলে কীভাবে সুখী জীবন পেতে পারি ঠিক একইভাবে ভৌতিক জগৎ বা আধ্যাত্মিক জগতের কল্পনা করা হয় যেন বাস্তবিক জীবনকে সম্পূর্ণরূপে আমরা জানতে পারি এবং সেইরূপ ব্যবস্থা তৈরি করে সুখী জীবন উপভোগ করতে পারি নাহলে বাস্তবিকরূপে অথবা ভাবনারূপে কোনোকিছু ভৌতিক অথবা আধ্যাত্মিক হয় না যা কল্পনা তাকে কাল্পনিকরূপেই নেওয়া উচিত আর যে উদ্দেশ্য নিয়ে তার কল্পনা করা হয়েছে সেই উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে তাকে বোঝা উচিত এমনটি না করার ফলে বহু সমস্যা আমাদের জীবনে আসতে থাকে আসুন এবার বুঝে নিই যে বিষয়টি মূলত কীভাবে ঘটে সমস্ত জগৎ সংসারে সবকিছুই রয়েছে ভেতরে-বাইরে-মাঝে সর্বত্র সংসারের যেটি বাইরের অংশ তা সংবেদনশীলরূপে আমাদের ভেতরে প্রবেশ করে যার মাধ্যমে আমরা সুখ-দুঃখকে অনুভব করে থাকি সংসারের অভ্যন্তরীণ অংশ হচ্ছে স্বয়ং আমরা অথবা আমাদের চেতনা যা সমস্তকিছুর জন্য ইচ্ছে প্রকাশ করে সুখ-দুঃখকে অনুভব করে এমনকি এইসব নিয়ে চিন্তাও করে, আবার হিসেব নিকেশ করে এবং সেই ভিত্তিতেই সংসারের বাইরের অংশে ক্রিয়াকলাপ করে থাকে তাহলে ভেতর থেকে বাইরে একই জীবন বিস্তৃত হয়ে রয়েছে যার একটি অভিমুখ ভেতরে শুরু হয়েছে এবং অন্যটি বাইরের জগতে বিস্তার লাভ করেছে আর মাঝের যে অংশ রয়েছে তা হচ্ছে শরীর বাইরে কোনো ঘটনার সাথে যদি আমরা সম্পর্কযুক্ত থাকি তবে আমাদের ভেতরে তার প্রভাব পড়ে যার কারণে আমরা সুখী অথবা দুঃখী হই অন্যভাবে বললে আমাদের ভেতরে যে প্রভাব পড়ে যার মধ্যে আমরা শান্তি, অশান্তি, সন্তুষ্টি, সুখ, দুঃখ, ভয়, লোভ, চিন্তা, প্রেম, ঈর্ষা ইত্যাদি যতরকমের ভাব আমরা অনুভব করে থাকি; বাইরেও সেইসব বিষয় নানারকম অবস্থায় থাকে যার কারণে আমাদের ভেতরে ভাল এবং মন্দ ভাব উৎপন্ন হয় অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝতে গেলে সংসারে বাইরের অংশকে ভৌতিক বা জড় এবং সংসারের ভেতরের অংশকে আধ্যাত্মিক বা আত্মিক বলে থাকি মধ্যবর্তী অবস্থানেও কিছু থাকে যাকে আমরা আধিদৈবিক বা মানসিক বলে থাকি সুতরাং এইসব শ্রেণীবিভাগ এইজন্য করা হয়েছে কারণ এমনভাবে নামকরণ করলে আমরা তা সহজেই বুঝতে পারি এবং এতে আমাদের পরস্পরের মধ্যে ব্যবহারও সরল হয়ে যায় যেহেতু সুখ-দুঃখের অবস্থা বাইরের পরিস্থিতির কারণে ঘটে সেহেতু আমাদের বুঝতে হবে সুখ-দুঃখ কীভাবে ঘটে থাকে এরপর আমাদের নিজেদের ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করে নিতে হবে যেন সমস্ত পরিস্থিতিতে সকলের জন্য শুধুমাত্র সুখই উৎপন্ন হয় এমন একটি ব্যবস্থা এতদিন সকলের কল্পনায় ছিল সৌভাগ্য এই যে সেই কল্পনাগুলির একত্রিত রূপায়ণ আমি করে দিয়েছি এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করে দিয়েছি যার মাধ্যমে সকলের জীবনে সর্বদা সুখ প্রদানকারী পরিস্থিতিই উৎপন্ন করবে এতদিন পর্যন্ত আমরা দুঃখ থেকে মুক্ত হতে যত রকম আধ্যাত্মিক কার্যকলাপ করেছি সেসবের কোনো প্রয়োজন থাকবে না এই সকল আধ্যাত্মিক কার্যকলাপ করে আমরা কেবলমাত্র নিজেদের দুঃখকে কিছুটা লাঘব করতে পারি যেমনভাবে আমরা কোনো দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা করিয়ে কোনোরকমভাবে বেঁচে থাকি এর চেয়ে অধিক লাভ কখনও কারোর হয়নি বর্তমান ব্যবস্থায় আমরা দেখছি মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ ভৌতিক সুখসুবিধা ভোগ করছেতারা বাস্তবে কিন্তু পূর্ণরূপে সুখ উপভোগ করতে পারছে না। আবার যারা ভৌতিক সুখ থেকে বঞ্চিত তারাও তো সমস্ত সুখসুবিধা ভোগ করতে চায়। বর্তমানে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থার কারণে ভৌতিক সুখ উপভোগকারীরাও নিজেদের সুখ হারানোর ভয়ে দুশ্চিন্তা এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেঅনেক সময় প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং প্রতিযোগিতার চাপে আত্মহত্যাও করে ফেলে। আমার রচিত নতুন ব্যবস্থায় সকলেই নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী সমস্তরকম সুখ উপভোগ করতে পারবে। অর্থাৎ সকলেই সমৃদ্ধশালী জীবন উপভোগ করবে। সুখী জীবনযাপনের জন্য কারোরই কোনোরূপ দুশ্চিন্তা বা নিরাপত্তাহীনতার অসুখে ভুগতে হবে না। অসমান ব্যবস্থার কারণেই তারা ভৌতিক সুখসুবিধা সত্ত্বেও সুখী জীবন উপভোগ করতে পারছে না। অপরদিকে তারা যদি আধ্যাত্মিকভাবে সুখ অনুভব করতে পারতো তাহলে ভিন্নভাবে কোনো ধ্যান-তপস্যা করার প্রয়োজন হতো না এইসব আধ্যাত্মিক ক্রিয়াকলাপ ওইসব বিষয়ের জন্য নয় জীবনে এসবের অন্য উপযোগিতা রয়েছে এ বিষয়ে কেউ চাইলে আমার সাথে ভিন্নভাবে আলোচনা করতে পারেন অথবা আমার দ্বিতীয় পুস্তক সম্পূর্ণ জীবন দর্শন অধ্যয়ন করতে পারেন যেখানে আমি বিস্তারিতভাবে এইসব বিষয়ের ব্যখ্যা করেছি।


 প্রশ্ন ২২ ।। আপনার রচিত নতুন ব্যবস্থায় সকলেই তো সমান হয়ে যাবে তাহলে ধনবান এবং বলবান ব্যক্তিরা নতুন ব্যবস্থাকে বাস্তবায়িত হতে দেবে কেন? তারা তো সাম্যবস্থা চান না বরং মহান হয়ে থাকতে চান এই বিষয়ে আপনি কী ভেবেছেন?

 উত্তর ।। আমার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী কোনো মানুষই মহান অথবা হীন হতে চান না বর্তমান ব্যবস্থায় মানুষ এইজন্য মহান হতে চান কেননা তাদের এমনটি মনে হয় যে সুখী হবার জন্য জীবনে যা কিছু প্রয়োজন মহান নাহলে তা পাওয়া যাবে না এমনকি জন্মের পর থেকেই চারপাশের পরিস্থিতি দেখে এমনটিই অনুভব করে সে দেখতে পায় মানুষ যখন মহান হয়ে যায় তার কাছে জীবনের সর্বাধিক সুখসুবিধাগুলি চলে আসে এইজন্য মানুষ নিজের চেয়ে মহান ব্যক্তিদের পূজা করতে থাকে এবং তাদের কৃপা প্রার্থনা করে। যেমন মানুষ মন্দিরে গিয়ে কত আশা ভরা নয়নে ভগবানের মূর্তির প্রতি চেয়ে থাকে এবং প্রার্থনা করতে থাকে, হে মহান পরমাত্মা আমাকেও মহান কর, যেন আমি বৈভবশালী হতে পারি এবং সুখী জীবন উপভোগ করতে পারি যদি আমরা মানুষকে তার মূল স্বভাব অনুযায়ী দেখি যেমনটি আমি এই পুস্তকে বর্ণনা করেছি তা হচ্ছে আমাদের স্বভাব শুধুমাত্র সুখী জীবন উপভোগ করা তাই সুখী হবার জন্য যা কিছু করার প্রয়োজন হবে আমরা তা করব যদি মহান হবার প্রয়োজন হয় তবে তার জন্য প্রচেষ্টা করব যদি চুরি করতে হয় তবে তাই করব কারোর ক্ষতি করে যদি সুখ পাওয়া যায় তবে সেটিও করব সে আমাদের নিজের ভাই, বন্ধু, আত্মীয় যে কেউ হোন না কেন আত্মিক দিক দিয়ে আমরা সকলেই তো ভাই-বন্ধু আমরা একে অপরের সাথে যেসব ভাল অথবা মন্দ ব্যবহার করি সেসব নিজেদের ভাই-বন্ধুদের সাথেও করে থাকিআর এটি কি প্রকার মহানুভবতা যে আমরা একে অপরের সম্মান হরণ করে চলেছি? অপরের সুখসুবিধাগুলি ছিনিয়ে নিয়ে নিজেদের সুখের জন্য ব্যবহার করছি? একে মহানুভবতা নয় বরং হীনতাই বলা চলে। এইসব নিন্ম স্তরের কর্মও তো আমরা নিজেদের সুখসুবিধার জন্যই করে চলেছি তাই না? যদি আমরা এই সমস্ত সুখসুবিধা অতি সহজেই পেয়ে যাই এবং তার জন্য যদি মহান অথবা নিন্ম স্তরে নামার প্রয়োজন না পড়ে তবে কার মাথায় মহান হবার ভাবনা জাগ্রত হবে? কারোরই হবে না মানুষ কখনই অনাবশ্যক কর্ম করে না আমার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী মানুষ প্রয়োজন ব্যতিরেকে কোনোকিছুই করে না মানুষ সকল সৎ এবং অসৎ কর্ম প্রয়োজন হলে তবেই করে থাকে এইজন্য যারা বর্তমানে কোনো মহান পদে আসীন রয়েছেন অথবা যারা কোনো নিন্ম পদে আসীন রয়েছেন তারা যখন শুনবেন এবং বুঝবেন যে এমন কোনো ব্যবস্থা রয়েছে যা প্রতিষ্ঠিত হলে সকলের সকল প্রকার সুখসুবিধা সহজেই প্রাপ্তি হয়ে যাবে, তখন তারা অত্যন্ত সুখ অনুভব করবেন এই ভেবে এবার আর মারামারি হানাহানি করতে হবে না আমাদের হয়তো অনুভব নেই যে মহান পদে আসীন হতে এবং সেই পদ বহাল রাখতে কত কিছুই না করতে হয়? কতই না বলিদান দিতে হয়? অর্থাৎ বহু প্রকারের দুঃখ ভোগ করতে হয় কখনও কখনও প্রাণ নিতেও হয় এবং প্রাণ দিতেও হয় সারা জীবন ভয়ে ভয়ে থাকতে হয় এই ভেবে, জানি না কবে কেউ এসে আমার পদ না ছিনিয়ে নেয় ধনবান এবং বলবান উভয় মানুষের একই অবস্থা এটিও এক প্রকারের মহানুভবতাই বটে! কেউ এসে আমাদের সম্পদ যেন চুরি না করে এই ভয় নিয়ে সর্বদা থাকতে হয় আর বাহুবলও তো সর্বদা সমান  থাকে না শরীর নিয়ে তো ভয় অধিক থাকে এই ভেবে যে, না জানি কবে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে অথবা অসুস্থ্য হয়ে পড়ে, তখন যে কেউ এসে প্রতিশোধ নিতে পারে এইসব দুশ্চিন্তা ভয় তৈরি করে এরপরও তারা লোভ সামলাতে পারে না এবং নিজেদের সম্পূর্ণ মনোযোগ সুরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োগ করে। এই বিষয়ে একটু চিন্তা-ভাবনা করে দেখুন যদি সকলের কাছে তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী সমস্ত সুখসুবিধা চলে আসে তাহলে কেন প্রধানমন্ত্রী বা সেইরূপ কোনো উচ্চপদাধিকারী ব্যক্তির জন্য সুরক্ষার প্রয়োজন পড়বে? তাহলে কেনই বা কেউ অপরের উপর আক্রমণ করবে? কেনই বা কাউকে ঠকাবে, অপমান করবে, শোষণ করবে, চুরি-ছিনতাই করবে, কাউকে নিচু দেখানোর চেষ্টা করবে, কারোর প্রতি ঈর্ষা করবে, কারোর সন্তান অপহরণ করবে, দুর্নীতি করবে, অপরাধ করবে, নিজের ধন সম্পদ নিয়ে অপরের সাথে লড়াই করবে? অথবা কেনই বা সুখসুবিধার জন্য কেউ নিজের মান-মর্যাদা নিয়ে গর্ব অনুভব করবে?

 এবার ভেবে দেখুন যদি আপনার কাছে সকল সুখসুবিধা থাকে তাহলে কেন আপনি আপনজনদের অথবা অপরজনদের দুঃখ দিতে চাইবেন? আপনার উত্তর এটিই হবে কেন আমরা অপরের ক্ষতি চাইব? সুতরাং এমনভাবেই অন্য সব বিষয় সম্পর্কে বুঝে নিতে পারেন এইসব হচ্ছে ভ্রষ্ট এবং অসম্পূর্ণ ব্যবস্থার কারণে চারিদিকে শুধুই হানাহানি আজকাল আবার বন্দুক থাকার ফলে শারীরিক বলের তেমন প্রয়োজনই পড়ে না। এমন সুখে কি লাভ যা নিজের জন্য দুঃখ বয়ে আনবে আমরা সমস্তপ্রকার সুখ এমনভাবে চাই যেন সাথে কোনো দুঃখ না আসে এইসব বিষয় নতুন ব্যবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই সম্ভব হয়ে যাবে নতুন ব্যবস্থায় সকল প্রকার সুখ কোনো প্রকারের দুঃখ ছাড়াই আসবে তাই নতুন ব্যবস্থাকে সকল মানুষ সহজে স্বীকার করে নেবে এবং নিজেদের ক্ষমতা অনুযায়ী সকলে মিলে সহযোগিতাও করবে


 প্রশ্ন ২৩ ।। অণু-পরমাণুর পূর্বে চেতনা কীভাবে থাকতে পারে? যদি থাকে তাহলে আপনি তা কীভাবে নিশ্চিত হয়ে বলছেন?

 উত্তর ।। প্রথমে বুঝতে হবে চেতনার সাথে আমাদের কীসের সম্পর্ক? আমরা যখন বলি চেতন এবং অচেতন দুইই তো বাস্তবে রয়েছে। তখন এর মাধ্যমে আমরা কী বুঝি? চেতনার অর্থ হচ্ছে যা ইচ্ছে প্রকাশ করে এবং বিভিন্ন বিষয় অনুভব করে। সেইসব বিষয়কে সুখ-দুঃখ অনুযায়ী মূল্যায়ন করে এবং পছন্দ-অপছন্দ ইত্যাদি নির্বাচন করে চেতনার বিশেষ অর্থ হচ্ছে সে ইচ্ছে অনুভব করতে পারে এইজন্য একে ঈশ্বরও বলা হয় ঈশ্বরের অর্থ হচ্ছে যে ইচ্ছেকে ধারণ করতে পারে এবং ইচ্ছে অনুভব করতে পারে অণু-পরমাণু বা পদার্থ তো ইচ্ছে উৎপন্ন করতে পারে না তবে এটি ঠিক যে কোনো ইচ্ছে প্রকাশকারী সচেতন অণু আপন ইচ্ছে অনুযায়ী অবশ্যই চালিত হতে পারে যেমন আমরা প্রতিদিন নানারকম চেতন-অচেতন বস্তুকে উদ্দেশ্য অনুযায়ী বা নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী চালনা করতে থাকি এই কথাকে অবশ্য অন্যভাবেও বোঝা যেতে পারে যেমন বিজ্ঞান অথবা কিছু নাস্তিক দর্শন এমনটি বলে থাকে যে আদিতে কেবলমাত্র পদার্থই ছিল, কিন্তু কোনো চেতনা ছিল না আর আস্তিক দর্শন বলছে পরমাত্মা অথবা ব্রহ্ম পদার্থের পূর্ব থেকেই রয়েছে অর্থাৎ চেতনা প্রথমে এবং পদার্থ পরে এসেছে। এখানে দুটির সম্ভাবনাই রয়েছে আদিতে হয় পদার্থ ছিল নাহলে চেতনা ছিল তৃতীয় কোনো সম্ভাবনা থাকতে পারে না এটিকে এবার যুক্তি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি মেনে নিচ্ছি প্রথমে পদার্থ ছিল কোনো চেতনা ছিল না তাহলে প্রশ্ন উঠবে সেখানে প্রথম গতিবিধি কীভাবে উৎপন্ন হল? কেননা গতিবিধি ছাড়া তো জগতের রচনা সম্ভব নয় এবার যদি আপনি বলেন সেই পদার্থের মধ্যে গতি ছিল তাহলে প্রশ্ন ওঠে সেই অণু বা পদার্থ থেকে ইচ্ছে উৎপাদনকারী চেতনা বা জীব কীভাবে উৎপন্ন হতে পারে? সর্বত্র পদার্থ বা জড় বস্তুই তো থাকা উচিত ছিল চেতনা থেকে জড় বস্তুর জন্ম হতে পারে কেননা চেতনা জড় বস্তুতে পরিণত হবার ইচ্ছে করলে সে জড় হতে পারে কিন্তু জড় বস্তু তো কিছু হবার ইচ্ছে করতে পারে না উদাহরণস্বরূপ ধরে নিই আমি এবং আপনি জেগেও থাকতে পারি অথবা ঘুমিয়েও থাকতে পারি এখানে জেগে থাকার অর্থ হচ্ছে চেতনার অবস্থা এবং ঘুমিয়ে থাকার অর্থ হচ্ছে অচেতন অবস্থা অচেতনের অর্থ হচ্ছে জড় অর্থাৎ তখন আমরা কোনো ইচ্ছে করতে পারি না এবং পূর্বের ইচ্ছে অনুযায়ী কোনো গতিবিধিও করতে পারি না আমরা নিদ্রারূপে বিশ্রাম নিতে থাকি বিশ্রামের অর্থ হচ্ছে আমরা কিছুর ইচ্ছে করছি না অর্থাৎ কিছুই করছি না। অণু তো জড় এইবার আপনিই বলুন মূল বা আদিতে জড় ছিল না চেতনা ছিল? চেতনা জড় অবস্থাতেও থাকতে পারে অথবা চেতন অবস্থাতেও থাকতে পারে কিন্তু জড় যেহেতু ইচ্ছে করতে পারে না সেইজন্য সে কখনই নিজ অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে না অর্থাৎ জড় কখনই চেতন হতে পারে না সে সর্বদা জড় অবস্থাতেই থাকবে এবার প্রশ্ন উঠে আসে যে অণু বা পদার্থ যেহেতু জড় সেহেতু সে নিজের অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে না তাহলে জড় বস্তু থেকে সংসার কীভাবে সৃষ্টি হতে পারে? কীভাবে সেই জড় থেকে দ্বিতীয় কোনো স্তর উৎপন্ন হতে পারে? সেখানে কোনো প্রকারের গতিবিধিই বা কীভাবে উৎপন্ন হতে পারে? সে প্রারম্ভে যে অবস্থায় থাকবে সর্বদা সেই অবস্থাতেই থাকতে হবে কেননা তার মধ্যে অবস্থা পরিবর্তনের কোনো ইচ্ছে তো থাকতে পারে না যার দ্বারা সে নিজের অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে আর এটিও বোঝা প্রয়োজন যে চেতনার মধ্যে একটি উদ্দেশ্য থাকে এবং একটি দিকনির্দেশ থাকে সেক্ষেত্রে ইচ্ছেই হচ্ছে তার দিকনির্দেশ বলতে পারেন এটিই তার উদ্দেশ্য কোনোপ্রকার গতিবিধির জন্য কারোর একটি দিকনির্দেশ থাকা অত্যন্ত আবশ্যক লক্ষ্য ছাড়া কোনো গতিবিধিই সম্ভব নয় এটি তো আপনি বুঝতে পেরেছেন অর্থাৎ উদ্দেশ্য ছাড়া কোনো গতিবিধির সম্ভাবনা থাকতে পারে না আর উদ্দেশ্য কেবলমাত্র চেতনাতেই থাকতে পারে জড় বস্তুর উদ্দেশ্য থাকার কোনো সম্ভাবনা থাকতে পারে না তাহলে আমরা নিরন্তর গতিশীল সংসারকে দেখে বলতে পারি যে প্রারম্ভে চেতনাই থেকে থাকবে কোনো জড় নয় এই সংসারকে যদি আপনি পর্যালোচনা করেন তাহলে পাবেন যে এখানে সবই চক্রাকারে অস্তিত্বরহিত অবস্থায় অবস্থান করছে এটি নিরন্তর পরিবর্তনশীল অবস্থায় রয়েছে এবং তিন অবস্থাতেই অবস্থান করে যার কারণে আমরা তাকে যে অবস্থায় যতটা ব্যবহার করতে পারি তা করে নিতে পারি আর আমাদের ব্যবহারের সময়ও তা অবিরত পরিবর্তনশীল অবস্থাতেই থাকে কিন্তু তা সত্ত্বেও আমাদের উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে যায় তার পরিবর্তনশীলতা আমাদের উদ্দেশ্য পূরণ হবার পথে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না এই পরিবর্তনশীলতার কারণেই জগৎ সঠিকভাবে অবস্থান করে থাকে যদি চেতনার মধ্যে পরিবর্তনশীলতার গুণাগুণ না থাকতো, অর্থাৎ অন্যভাবে বললে যদি প্রারম্ভে জড় বা অচেতন থাকতো তবে এই সংসার সৃষ্টিই হতো না কেননা পরিবর্তনশীলতা কেবলমাত্র চেতনাতেই সম্ভব, কোনো জড় বস্তুতে নয় যদি কারোর মনে হয় এই পরিবর্তনশীলতা জড় অথবা অচেতন বস্তুতে সম্ভব হতে পারে তবে সে অন্যভাবে এটিই বলার চেষ্টা করছে যে জড় মূলত অচেতন নয় বরং চেতনা তাহলে এইভাবে প্রারম্ভে চেতনাই থাকতে পারে জড় নয় জড়তা চেতনারই একটি ঈপ্সিত অবস্থা যার মাধ্যমে সে প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের মধ্যেই তাকে উৎপন্ন করে নেয় আর প্রয়োজন পূরণ হবার পর তাকে বিলীন করে দেয় অর্থাৎ অবস্থার পরিবর্তন করে নেয় আপনি বলছেন যে আমি তা নিশ্চিতভাবে কীভাবে জানতে পারলাম? যখন আমি সাধনার সময় নিজের ভেতরে অধ্যয়ন করেছি তখন এইসব বিষয় আমার নিজ অনুভবের মাধ্যমে এসেছে ফলে আমি এইসব নিশ্চিতভাবে জানতে পেরেছি এবং সেই কারণে আপনাদেরও গভীরভাবে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। কেননা কোনো ব্যক্তি গবেষণা ছাড়া কোনো বিষয়কে গভীরভাবে বুঝতে পারে না এবং বোঝাতেও পারে না তবে একবার কিছু একটা আবিষ্কার হয়ে গেলে এবং তার সঠিক ব্যাখ্যা করে দিলে অবশিষ্টদের জন্য বুঝে নেওয়া সহজ হয়ে যায় কিন্তু প্রথমবার আবিষ্কার না করে এবং অনুভব না করে অথবা না বুঝে কখনই কারোর পক্ষে কিছু বোঝানো সম্ভব হবে না এইসব তথ্যকে আমি বহুবার অনুভব করেছি এবং নিজে বুঝেছি কীভাবে অন্যকে বোঝাতে পারব এর উপর চিন্তন-মননও করেছি এইজন্য আমি বলতে পারি যা বলছি তা নিশ্চিতভাবে জেনে-বুঝেই বলছি যদি কারোর প্রয়োজন হয় তবে নানা উদাহরণ সহযোগে আমি সেসব অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যাও করতে পারি আমার কথাগুলোকে আপনি যে দৃষ্টিকোণ থেকেই বোঝার চেষ্টা করুন না কেন সঠিকই পাবেন এই ব্যাখ্যাগুলি আপনার সকল দৃষ্টিকোণ থেকেই যুক্তিযুক্ত মনে হবে, যা আপনাকে সকল প্রকার দর্শন বিষয়ক প্রশ্নের সন্তুষ্টিপূর্ণ উত্তর প্রদান করবে


 প্রশ্ন ২৪ ।। ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মোক্ষ সম্বন্ধে আপনার কী বক্তব্য?

 উত্তর ।। আমার পূর্বে এ বিষয়ে বহু মানুষ বলেছেন এবং লিখেছেন আমি নিজেও যা কিছু অধ্যয়ন করেছি এবং শুনেছি তাতে কখনও সন্তুষ্ট হইনি পরে যখন এইসব বিষয়ে গবেষণা করি তখন যে অর্থ বেরিয়ে আসে তা আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাইব ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মোক্ষ আমাদের জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি সবকিছু  বলে দিচ্ছে বলছে ধর্ম দিয়ে জীবনের প্রারম্ভ হওয়া উচিত এবং মোক্ষ দিয়ে তার সমাপ্তি হওয়া উচিত এর মাঝখানে রয়েছে অর্থ এবং কাম এখানে ধর্মের তাৎপর্য হচ্ছে ধারণ করার যোগ্য যা কিছু ধারণ করার যোগ্য তাকেই ধর্ম বলা হয় এবার আমরা কীভাবে জানব যে কি ধারণ করার যোগ্য এবং কি ধারণ করার যোগ্য নয় এর উত্তরও এই বাক্যের মধ্যেই রয়েছে এবং তা হচ্ছে যা কিছু ধারণ করলে মোক্ষ প্রাপ্তি হয় তা ধর্ম হবে এবং যা কিছু ধারণ করলে বন্ধনে আবদ্ধ হই সেইসব অধর্ম হবে এই কারণে ধর্মের মাপকাঠি হবে মোক্ষ অর্থাৎ যে প্রকারের জীবন আমাদের মোক্ষ প্রদান করবে সেটি হবে ধর্ম এবং যে প্রকারের জীবন আমাদের বন্ধন প্রদান করবে তা হবে অধর্ম এখানে আরেকটি কথা মাথায় রাখা উচিত যে এইসব জীবিত থাকাকালীন অবস্থার কথা বলা হচ্ছে মৃত্যুর পরের কথা এখানে বলা হচ্ছে না যদি মোক্ষের তাৎপর্য মৃত্যুর পরের অবস্থা নিয়ে হতো তবে তা থেকে আমরা এটি কখনই জানতে পারতাম না যে কোনটি ধারণ করলে মোক্ষ প্রাপ্তি হয় অথবা কোনটি ধারণ করলে বন্ধন প্রাপ্তি হয় যেখানে বন্ধন থাকবে সেখানেই মোক্ষের কথা বলা যায় দুটোই একই স্তরের কথা এমনটি হতেই পারে না যে বন্ধন তো এই সংসারের মধ্যে প্রাপ্তি হয়েই যাচ্ছে এবং মোক্ষ অন্য কোনো সংসারে অথবা সংসারের ওপারে অন্য কোনো জগতে পাওয়া যাবে যদি অন্য কোনো জগতের কথা হতো তবে তো আমরা জানতে পারতাম না ধর্ম মূলত কী তাহলে এর থেকে আমরা বুঝতে পারছি উপরে যে চার বিষয়ের কথা বলা হয়েছে তা জীবনের সাথে সম্পর্কযুক্ত, মৃত্যুর সাথে নয় আমার গবেষণা অনুযায়ী মোক্ষের তাৎপর্য হচ্ছে জীবনের সন্তুষ্টি প্রদানকারী চরম অবস্থা অর্থাৎ আমরা অনুভব করব যা কিছু জ্ঞান আমরা গ্রহণ করতে চাইছি তা গ্রহণ করতে পারছি যে কর্ম আমরা করতে চাইছি তা করতে পারছি যা কিছু ভোগ করতে চাইছি তা ভোগ করতে পারছিযখন বিশ্রাম করতে চাইছি তা করতে পারছি যখন এমন জীবন মিলবে তখনই কেবলমাত্র সন্তুষ্টি উৎপন্ন হবে যদি এই অবস্থা আমাদের জীবনে সর্বদা বজায় থাকে তবে এমন অবস্থাকে মোক্ষ বলা হবে যদি এমন অবস্থা আমাদের জীবনে না আসে তবে তাকে বন্ধন নামে জানা উচিত বন্ধনের তাৎপর্য এটিই হবে যা কিছু জ্ঞান আমরা গ্রহণ করতে চাইছি তা গ্রহণ করতে পারছি না, যে কর্ম আমরা করতে চাইছি তা করতে পারছি না, যা কিছু ভোগ করতে চাইছি তা ভোগ করতে পারছি না, যখন বিশ্রাম করতে চাইছি তা করতে পারছি না তাই বন্ধনের অবস্থা কোনো মানুষই চায় না কোনো মানুষই চায় না তার কামনার পূর্তি না হোক সকলেই চায় তাদের কামনার পূর্তি নিরন্তর হতে থাকুক এই অবস্থাকেই মোক্ষ বলা উচিত সুতরাং জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে মোক্ষ প্রাপ্তি অর্থাৎ সর্বদা সুখী অবস্থায় থাকা এবার যখন জীবনের উদ্দেশ্য নির্ধারণ হয়ে গেছে তখন এ প্রশ্নই উঠে আসছে যে এই অবস্থা কীভাবে প্রাপ্ত করা যাবে এ বিষয়টিকে বোঝার জন্য মানুষ ধর্ম দিয়ে প্রারম্ভ করেছে ধর্মের অর্থ বুঝতে চাইলে সর্বপ্রথমে আমাদের এই বিষয়টিকে জানতে হবে যে আমাদের জীবনের লক্ষ্য কী এবং তা পাবার জন্য কী ধারণ করা উচিত এবং কী উচিত নয় সঠিক শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ৫ থেকে ২০ বছর বয়স অবধি সকল শিক্ষার্থীদের প্রকৃত ধর্ম শিক্ষায় শিক্ষিত করানো উচিত যার মাধ্যমে সকল শিক্ষার্থীর শিক্ষা গ্রহণের সময় কালেই প্রকৃত ধর্ম সম্বন্ধে যেন সঠিক বোধ তৈরি হয়ে যায়

 এরপর আসে অর্থ অর্থ কী এবং এর উৎপত্তি কীভাবে হয়? এখানে অর্থের তাৎপর্য হবে যেসব বস্তু এবং পরিষেবা উপভোগ করলে আমাদের সার্বিকভাবে সুখ প্রাপ্তি হয় সেইসব বস্তু এবং পরিষেবাসমূহকেই অর্থ বলা হয় আর যা থেকে আমাদের দুঃখ প্রাপ্তি হয় তাকে অনর্থ বলা হয় এরপর আসে কাম কামের তাৎপর্য হচ্ছে আমাদের ইচ্ছে, কামনা, বাসনা ইতাদি এই সংসারে সকল মানুষের কামনা ভিন্ন-ভিন্ন হয়ে থাকে এইজন্য অর্থও আলাদা হয়ে থাকে একজন একটি বস্তু থেকে সুখ পেয়ে থাকলে অপরজন অন্য বস্তু থেকে দুঃখ পেয়ে থাকে আবার কখনও একই বস্তু থেকে সুখ কখনও একই বস্তু থেকে দুঃখ পেয়ে থাকে আমাদের কীসের থেকে সুখ আসবে তা ঠিক হবে আমাদের কামনা বাসনা কী রয়েছে তার উপর কামনার পূর্তি থেকে আমরা সুখী হই এবং কামনার অপূর্তি থেকে আমরা দুঃখী হই জ্ঞানের আধারে আমাদের কামনা উৎপন্ন হয় কিন্তু পূর্তি হয় অর্থের আধারে। এখানেই মোক্ষের বিষয় আসে। যদি আমাদের কামনা অবিরত পূর্তি হতে থাকে তবে মোক্ষের অবস্থা উৎপন্ন হয় নীচের বাক্যগুলিকে দেখলে আপনি জীবন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবেন। জীবনের চরম লক্ষ্য হচ্ছে মোক্ষ প্রাপ্তি। যার জন্য আমাদের কিছু ধারণ করতে হবে। আমরা যা ধারণ করব তা থেকে যদি মোক্ষ প্রাপ্তি হয় তবে তা হবে ধর্ম ধর্ম কী হবে তার কষ্টিপাথর হবে মোক্ষ মোক্ষ প্রাপ্তি হয় কামের দ্বারা যদি আপনি জীবিত থাকেন এবং কামনাও না থাকে তাহলে আপনার জীবিত থাকার কোনো তাৎপর্য থাকে না তাই মোক্ষ নির্ভর করে আমাদের কামনার নিরন্তর পূর্তি হচ্ছে কিনা তার উপর কেবলমাত্র অর্থের দ্বারাই কামনার পূর্তি হতে পারে অর্থের প্রাপ্তি সম্ভব হবে ধর্মের দ্বারা ধর্মের অর্থ হচ্ছে আমরা যেন মোক্ষ প্রাপ্তি করতে পারি এবার আমরা বুঝে নিতে পারি যে ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মোক্ষ এই চার বিষয় কীভাবে একে অপরের সাথে সম্পর্কিত এবং একে অপরের ওপর নির্ভরশীল কীভাবে তা মানুষের জীবনকে এক সঠিক দিকনির্দেশ প্রদান করে


 প্রশ্ন ২৫ ।। আপনার নতুন ব্যবস্থা আসার পর কারোর কোনো দুঃখ থাকবে না তাহলে তো কর্ম-ফলের সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হয়ে যাবে? যে সকল জীব পূর্ব জন্মে পাপ করে এসেছে সেই পাপের দন্ড কীভাবে মিলবে?

 উত্তর ।। আমার গবেষণা অনুযায়ী এমনটি কিন্তু হয় না এই সংসারে প্রকৃতি দ্বারা কোনো দন্ড বিধান তৈরি করা হয়নি এই সংসারের রচনা কেবলমাত্র সকল প্রকার সুখ প্রাপ্তির জন্যই হয়েছে যখন আদি চেতন সত্ত্বা অথবা ঈশ্বর একা ছিল তখন তার ভেতরেই সুখী হবার বাসনা ছিল। সেই আদি চেতন সত্ত্বাই রূপান্তরিত হয়ে এই সংসারে পরিণত হয়েছে। স্রষ্টাই সৃষ্টিতে রূপান্তরিত হয়েছে যেমন একটি বীজ থেকে বৃক্ষ হয়, পরে সেই বৃক্ষ ফলের মাধ্যমে বহু বীজে রূপান্তরিত হয় তেমনি স্রষ্টাও প্রাণীরূপে বহুত্বে রূপান্তরিত হয়েছে প্রাণীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে মনুষ্য এবং মনুষ্যের সকল গুণাবলী সেই স্রষ্টার ভেতর ছিল এই সংসারে সেই স্রষ্টাই বর্তমানে মনুষ্যরূপে পূর্ণ চেতনায় বিরাজ করছে। অবশিষ্ট সৃষ্টিও অবচেতন, অর্ধচেতন, কোথাও অধিচেতনরূপে অবস্থিত রয়েছে সেই স্রষ্টাই আপন ইচ্ছে অনুযায়ী সৃষ্টিতে রূপান্তরিত হয়েছে এর পেছনে উদ্দেশ্য হচ্ছে সকল প্রকার সুখ প্রাপ্তি করা এবার ঈশ্বর নিজেকে কেনই বা দণ্ড প্রদান করবে? এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে আমার দ্বিতীয় পুস্তক সম্পূর্ণ জীবন দর্শন অবশ্যই অধ্যয়ন করুন

এমনটি নয় যে মানুষ পূর্ব জন্মে যে পাপ করেছিল এবং সেইসব পাপের দণ্ড বর্তমানে ভোগ করছে। এই দন্ড বিধান কেবলমাত্র মানুষের কল্পনা দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে কারণ এখনও অবধি এমন ব্যবস্থা আসেনি যেখানে পুনর্জন্মের দন্ড বিধানের প্রয়োজনই পড়বে না আমি এই বিষয় সম্পর্কে জেনেছি এবং এমনতর একটি ব্যবস্থার কল্পনাও করে ফেলেছি যেখানে কোনো দণ্ড বিধানের প্রয়োজন পড়বে না এবং সকলেই নিজেদের ঈপ্সিত সুখ প্রাপ্ত করতে পারবে এই নতুন ব্যবস্থাকে আমি এমনভাবে রূপায়িত করেছি যেখানে একজনের সুখ কখনই অন্যের জন্য দুঃখের কারণ হবে না বরং একজনের সুখ অপরজনের সুখের কারণ হবে অর্থাৎ এই ব্যবস্থায় একজন যত অধিক সুখ ভোগ করবে অপরের জন্যও সুখ ততই বৃদ্ধি পেতে থাকবে নতুন ব্যবস্থায় সকলের সুখ পর্যাপ্ত থাকবে শুধুমাত্র পুণ্য সৃষ্টি হবে কোনো পাপ সৃষ্টি হবে না মানুষের পাপ-পুণ্যের জন্য বাস্তবে ভ্রষ্ট ব্যবস্থাই দায়ী, কোনো ব্যক্তি নয় এর কারণ হচ্ছে মানুষ এখনও পর্যন্ত সেই জ্ঞানের স্তরে পৌঁছাতে পারে নি যেখানে সে একটি সঠিক ব্যবস্থার কল্পানা করতে পারে উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বৈজ্ঞানিকরা যতদিন পর্যন্ত বিদ্যুৎ এবং বাল্বের আবিষ্কার করেননি ততদিন পর্যন্ত আমরা রাতের অন্ধকারে বাস করতে বাধ্য ছিলাম এবার আপনি কি বলবেন আমরা সকলে তখন কোনো না কোনো পাপের দন্ড ভোগ করছিলাম? এর জন্য আপনি কাকে অপরাধী বলবেন? যখন বৈজ্ঞানিকগণ বিদ্যুৎ এবং বাল্বের আবিষ্কার করে দিলেন এবং নির্মাণ ও বিতরণ ব্যবস্থার কারণে এখন বহু মানুষের কাছে আলোক বাতির সুবিধা পৌঁছে গিয়েছে বর্তমানে দুর্গম স্থানেও পৌঁছে যাচ্ছে এবার আপনি কি বলবেন মানুষ পূর্ব জন্মের পুণ্যের কারণে এই সুখ উপভোগ করছে? বাস্তবে এই সকল সুখ আমাদের জ্ঞানের কারণে উপভোগ করছি এবং অজ্ঞানের কারণে যাবতীয় দুঃখ প্রাপ্ত করে চলেছি এই জ্ঞান এবং অজ্ঞান হয়তো আমাদের কাছে ব্যক্তিগত মনে হতে পারে মূলত তা সমষ্টিগত যারা বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেন তাদের জন্য কি সেই সময়কালীন সমাজের অবদান থাকে না? এবার আপনি একজন বৈজ্ঞানিকের ক্ষেত্রে ভাবুন সেই বৈজ্ঞানিকের জ্ঞানী হবার পেছনে কি মনুষ্য সমাজের যোগদান নেই? অবশ্যই রয়েছে সেই সময়ে যেমন ব্যবস্থা ছিল সেই মত তারা নিজেদের শিক্ষা, লালন-পালন ইত্যাদি সমাজ থেকেই পেয়েছে যার কারণে তারা এত জ্ঞানী হতে পেরেছে তাই গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে জানা যায় যে এখানে সমস্তকিছুই হচ্ছে সমষ্টিগত

 আপনি পাপ-পুণ্য ইত্যাদি বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে আমি বলব সেসবও সমষ্টিগতই হবে ব্যক্তিগত বলার অর্থ হবে সেই ব্যক্তির প্রতি অন্যায় করা পাপজ্ঞান এবং পুণ্যজ্ঞান মূলত অজ্ঞান থেকেই উৎপন্ন হয় যার কারণ সমষ্টিগত ব্যক্তিগত নয় এই সংসারে আমরা যতটুকু জ্ঞান প্রাপ্ত করব ততটুকুই সুখ সকলে উপভোগ করব এবং যে সকল বিষয়ে আমরা অজ্ঞানী থাকব সেইসবদিক গুলিতে আমরা দুঃখ ভোগ করব এবার আশা করি এই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গিয়েছেন


 প্রশ্ন ২৬ ।। সকলের পক্ষে কি পরম সুখী হওয়া সম্ভব?

 উত্তর ।। অবশ্যই সম্ভব চলুন এই বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করি দুজন অভিভাবকের কল্পনা করুন যারা সমস্ত দিক দিয়ে সমৃদ্ধ ধরুন তাদের একটি সন্তান রয়েছে সে মাতাপিতার সাথেই থাকে মাতাপিতা সমৃদ্ধশালী হবার কারণে সেই সন্তান যা কিছু ইচ্ছে করে সমস্ত ইচ্ছে পূরণ হতে থাকে সেইসময় যেমন সুখসুবিধা সম্ভব ছিল সেই অনুযায়ী যেমন করে আমরা প্রবীণদের কাছ থেকে গৌতম বুদ্ধের গল্প শুনে থাকি গৌতম বুদ্ধ ৩০ বছর বয়স অবধি কোনোরকম দুঃখ অনুভব করেননি তারপরই তিনি দুঃখ অনুভব করেন এবং সেইসব দুঃখ নিরসনের জন্য রাজপ্রাসাদ ছেড়ে সন্যাসি হয়ে যান এই উদাহরণের মাধ্যমে আমি বলতে চেয়েছি যেভাবে গৌতম বুদ্ধের ৩০ বছর বয়স অবধি কোনোপ্রকার দুঃখ অনুভব হয়নি, একইভাবে সকলের জীবন এতটাই সমৃদ্ধশালী তৈরি করা যেতে পারে যে কারোর জীবনে কোনোপ্রকার দুঃখ যেন না আসে এবার যখন জীবনে দুঃখই থাকবে না তখন দুঃখ বলে কিছু রয়েছে এমন কেউ অনুভবও করবে না কোনো এক বয়সে যদি কারোর জীবনে আধ্যাত্মিক উৎসুকতা জাগ্রত হয়ে যায় এবং তা অভ্যাস করারও ব্যবস্থা থাকে তাহলে তার জীবনে কোনোপ্রকার দুঃখ থাকবে না গৌতম বুদ্ধ যদি এমন কোনো ব্যবস্থা পেতেন যার মাধ্যমে দুঃখের কারণ জানা যেতো তাহলে তিনি দীর্ঘসময় ব্যয় করে কঠিন তপস্যার মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে প্রয়াস করতেন না। তাকে কোনোপ্রকার দুঃখের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে হতো না আনন্দের সাথে এইসকল জ্ঞান প্রাপ্ত করতেন এবং জীবনে কোনোপ্রকার দুঃখই থাকতো না এইভাবে আমরা বুঝে নিতে পারি জীবনকে সম্পূর্ণরূপে সুখী করা সম্ভব, যদি সকলপ্রকার ব্যবস্থা নির্মাণ করে দেওয়া যায় এমন ব্যবস্থা যেখানে আমরা যেমন জ্ঞান অর্জন করতে চাই, যেমন কর্ম করতে চাই, যেমন ভোগ করতে চাই এবং যেমন বিশ্রাম করতে চাই সেসব করতে পারব এই নিয়ম অনুযায়ী সকল ব্যবস্থা থাকলে দুঃখ থাকার কোনো কারণ তো আমার চোখে পড়ে না যদি আপনি কিছু দেখতে পান তাহলে সে সম্পর্কে আমায় অবগত করুন। আপনাকে সাদর আমন্ত্রণআমি নিশ্চিত হয়েই বলতে পারি জীবনে পরম সুখের অবস্থা সহজেই প্রাপ্ত করা সম্ভব আমি এমন একটি ব্যবস্থাকেই খুঁজে নিয়েছি যেখানে এইসব অতি সহজেই সম্ভব হয়ে যাবে


 প্রশ্ন ২৭ ।। অরবিন্দ দর্শন অনুযায়ী জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে দেবত্বের অভিব্যক্তি এই বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

 উত্তর ।। এর উত্তর তো আপনি অতি সহজেই বের করে নিতে পারেন আপনাকে শুধুমাত্র এইকথা জিজ্ঞেস করতে হবে দেবত্ব প্রাপ্তির পর উনি কী করবেন? কেননা উদ্দেশ্যের অর্থ এমন হওয়া উচিত যেন সকল প্রশ্নের সমাপ্তি হয়ে যায় সেখান থেকে আর কোনো প্রশ্ন যেন উদয় হতে পারে না অর্থাৎ আমরা আর জিজ্ঞেস করতে পারি না এরপর কী হবে? যদি কোনো ছাত্রকে জিজ্ঞেস করা হয় শিক্ষা প্রাপ্তির উদ্দেশ্য কী? তাহলে সেই ছাত্রটি বলবে, ভাল কোনো চাকরি পাবার জন্য অধ্যয়ন করছি বাস্তবে এটি কিন্তু অন্তিম উদ্দেশ্য হল না কেননা আপনি সেই ছাত্রকে আবার জিজ্ঞেস করবেন ভাল চাকরি পাবার পর সে কী করবে? ছাত্র আপনাকে বলবে, এতে আমি সম্মানজনক জীবন-যাপন করতে পারব এখানেও প্রশ্ন সমাপ্ত হয় না আপনি আবার জিজ্ঞেস করবেন, সম্মানজনক জীবন-যাপন করে কী মিলবে? এরপর ছাত্র আপনাকে বলবে, সম্মানজনক জীবন-যাপন করে আমি পরিবারের সাথে সুখ অনুভব করব এবং সন্তুষ্টি প্রাপ্ত করব এবার এই স্থানে এসে সকল প্রশ্ন সমাপ্ত হয়ে যায় আর আমি জিজ্ঞেস করতে পারি না, সুখ-সন্তুষ্টি প্রাপ্ত করে কী করবে? সুতরাং আর কোনো প্রশ্ন উৎপন্ন হয় না বরং এখানে এসে আলোচনা সমাপ্ত হয়ে যায় এই আলোচনার মূল অর্থ এটিই যে সুখী থাকার ইচ্ছেই আমাদের অন্তরের মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ কোনো একটি কথা ইচ্ছে দিয়ে প্রারম্ভ হয় এবং ইচ্ছেপূরণ দিয়ে সমাপ্ত হয়ে যায় এই জন্য আমি বলতে পারি জীবনের উদ্দেশ্য দেবত্ব প্রাপ্তি হতে পারে না, বরং সুখ প্রাপ্তিই হবে জীবনের মূল উদ্দেশ্য কেননা কোনো ইচ্ছের সমাপ্তি ইচ্ছেপূরণ দ্বারাই হতে পারে তার পূর্বে নয় দেবত্ব প্রাপ্তি থেকেও কিছু না কিছু লাভ হবে তাই না? দেবত্ব প্রাপ্তি হলে এমন সুখ কি আমরা পাব যেমনটি একটি ভাল চাকরি অথবা সুস্বাদু আহার গ্রহণ করলে পেয়ে থাকি? তাহলে আমরা বুঝতে পারছি সমস্ত প্রশ্ন সুখের প্রান্তে এসেই থেমে যাচ্ছে এইজন্য সুখ প্রাপ্তিই হবে জীবনের উদ্দেশ্য অন্য কিছু নয় সুখ প্রাপ্তির জন্য অবশিষ্ট সব বিষয় মধ্যবর্তী উপকরণ হতে পারে অন্তিম উদ্দেশ্য কখনই নয় তাই সুখের কাছে এসেই আলোচনা সমাপ্ত হবে অন্য কোথাও নয়


 প্রশ্ন ২৮ ।। জীবনে কী এমন কোনো বিষয় আছে যা যুক্তির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা এবং যুক্তি দ্বারা বোঝানো যেতে পারে? মানুষের জীবনে বিশ্বাসের স্থানই বা কোথায়?

 উত্তর ।। অবশ্যই যুক্তির মাধ্যমে সবকিছু  নিজে বোঝা এবং অপরকে বোঝানো যেতে পারে কিন্তু এইকথা বোঝার পূর্বে সর্বপ্রথমে বুঝতে হবে যুক্তি কী এবং এর উপযোগিতা কীযুক্তি সম্পর্কে মানুষের নানা প্রকার ভুল ধারণা রয়েছে। তারা মনে করে যুক্তির দিয়ে আমাদের অনুভব কাউকে বোঝানো সম্ভব নয়। কারণ যুক্তির মাধ্যমে আমি যেমন অনুভব করব অপরজনও কি একইরকম অনুভব করবে? সুতরাং আমাদের বুঝে নেওয়া উচিত যে যুক্তি কোনো বিষয়ের অনুভবকে বোঝানোর জন্য করা হয় কাউকে অনুভব করানোর জন্য নয়। যেমন জল দ্বারা পিপাসা নিবারণের অনুভব হয় তা দিয়ে মখমলের নরম অনুভব তো হয় না। তেমনি প্রতিটি সামগ্রীর নিজস্ব গুরুত্ব এবং পরিণাম থাকে যুক্তি এমন একটি মাধ্যম যা আমাদের বিভিন্ন প্রকার জ্ঞান প্রদান করে থাকে, এমনকি আমরা সেই বিষয় সম্পর্কে অনুভব না করলেও যুক্তির মাধ্যমে এই পরিণাম পেতে পারি এর চেয়ে আলাদা কোনো পরিণামের আশা করার অর্থ হল আমরা যুক্তির সম্বন্ধকে বুঝতে পারিনি যুক্তি কি ধরণের উপকরণ এবং আমাদের জীবনে এটির কি গুরুত্ব রয়েছে? যুক্তি কোনো অনুভব করার উপকরণ নয় যুক্তিকে এভাবে বুঝে নিতে হবে ধরুনকোনো একটি বিষয় সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা রয়েছে, এবার আপনার অন্য কোনো বিষয় সম্পর্কে জানার প্রয়োজন হয়েছে। এখানে আপনি নিজের কাছে থাকা অনুভব ছাড়া এমন কোনো বিষয়বস্তুকে বুঝতে চাইছেন যার সম্পর্কে আপনার পূর্বের অনুভব নেই আপনি আপনার অনুভবের আধারেই যুক্তি প্রস্তুত করেন এবং সেই সম্পর্কে অনেক বিষয় বুঝতে পারেন এমনটি নয় যে অজানা বিষয় সম্পর্কে অনুভব হয়ে যাবে অনুভব তখনই হবে যখন আপনি সেই বিষয়বস্তুর সংস্পর্শে আসবেন আমাদের জীবনে এই তর্কযুক্ত বোধের একটি নিজস্ব উপযোগিতা রয়েছে যে সকল অনুভব আমরা উপলব্ধি করেছি ততক্ষণ পর্যন্ত সেইসব অনুভবকে আমরা বোঝাতে পারব না যতক্ষণ পর্যন্ত আরও কিছু আনুষঙ্গিক বিষয় যুক্তি দ্বারা না বুঝব তাহলে যুক্তি এখানে আমাদের এমন কিছু বোঝাতে সাহায্য করে যা কেবলমাত্র অনুভব দ্বারা বোঝা সম্ভব হতো না তাই যুক্তি আমাদেরকে কোনোকিছু বুঝতে সাহায্য করে এবং বোঝানোর এই মাধ্যমই হচ্ছে তর্কযুক্তি আমাদের সঠিক এবং ভুলের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে করব কি করব না, খাব কি খাব না, যাব কি যাব না ইত্যাদি বলে দেয় এইভাবে আমরা যুক্তির গুরুত্বকে বুঝে নিতে পারি আমি আপনাদের এইসব বোঝাতে সক্ষম হচ্ছি সেটিও তো যুক্তির দ্বারাই এবং আপনিও যে বুঝতে পারছেন সেটিও তো যুক্তির সাহায্যেই। যুক্তির সহায়তায় সমস্তকিছুই বোঝা সম্ভব তা সে আত্মা হোক বা ইন্দ্রিয় বহির্ভূত বিষয় হোক, অথবা অন্য কোনো বিষয় হোক না কেন হোক বা না হোক দুটোই যুক্তির সহায়তায় বোঝা যেতে পারে শুধুমাত্র যুক্তির ব্যবহার করতে জানা চাই এটিও একটি শিল্পকলা


 প্রশ্ন ২৯ ।। সংস্কার বিষয়ে আপনি কী বোঝেন? নতুন ব্যবস্থায় আপনি মন্দ সংস্কারকে কীভাবে সংশোধন করবেন?

 উত্তর ।। সংস্কারের অর্থ হচ্ছে জেনে বুঝে প্রদান করা কোনো আকার অর্থাৎ কোনোকিছুকে উপযুক্ত তৈরি করা আপনি শুনে থাকবেন যে আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় ঔষধির সংস্কার করা হয় কেননা প্রকৃতিতে বহু ঔষধ শুদ্ধরূপে পাওয়া যায় না বলে সরাসরি ব্যবহার করা যায় না। তাই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সেসবের শোধন করে নিতে হয় তাতে এমন কিছু তত্ত্ব মিশে থাকে যা সরাসরি ব্যবহার করলে উপকার করবে না বরং অপকার করবে। ঔষধ থেকে ক্ষতিকারক তত্ত্বগুলিকে নিষ্কাশন করার প্রক্রিয়াকে সংস্কার বলা হয় একইভাবে জন্মের সময় মানুষের কাছে সংসার সম্পর্কে এবং সমাজ সম্পর্কে কোনো আগাম তথ্য থাকে না যদি সে কোনো তথ্য ছাড়াই বড় হয়ে যায় তবে তার নিজের সাথে সমাজের কোনো মেলবন্ধন থাকবে না যার কারণে তাকে এবং সমাজকে বহু অসুবিধের সম্মুখীন হতে হবে সমাজে বহু রকমের দুঃখ উৎপন্ন হবে। উদাহরণস্বরূপ পথে চলাচলের সময় যদি কাউকে ট্রাফিক নিয়ম সম্পর্কে শিক্ষা না দেওয়া হয় তবে সে পথে চলার সময় কোনোরূপ নিয়ম পালন করবে না ফলে বার বার দুর্ঘটনা ঘটবে, সমাজে দুঃখ উৎপন্ন হতে থাকবে তাই মানুষকে ওইসব প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করা অথবা শিক্ষিত করাকেই সংস্কার বলা হবে বলা হবে সমাজ তাকে সংস্কার প্রদান করছে অথবা শোধন করছে অর্থাৎ তাকে সভ্য করে তোলা হচ্ছে এবং সমাজে বসবাসের যোগ্য তৈরি করা হচ্ছে। এতে নিজের এবং সকলের জীবন সুখে থাকবে এটিই হচ্ছে সংস্কার না অধিক না কম সংস্কারের অর্থ উপযুক্ত তৈরি করা উপযুক্ত তৈরি করার অর্থ তার ব্যবহারিক জীবন যেন সুখের হয় এমনটি নয় যে কেউ ভ্রষ্ট হয়ে জন্ম নিয়েছে এবার তাকে শোধরাতে হবে এর থেকে আপনি বুঝে নিতে পারেন যে পূর্ব জন্মের কোনো সংস্কারের সাথে এই জীবনের কোনো সম্পর্ক নেই এমনকি এই জীবনের সংস্কারের সাথেও পরবর্তী জীবনের কোনো সম্পর্ক থাকবে না এই জীবনে সংস্কারের সম্পর্ক এই জীবনের সাথেই জড়িত কেননা প্রকৃতির নিয়মে পূর্ব জীবনের কথা কোনো আমাদের মনে থাকে না এবং এই জীবনের কোনো কথাও পরের জীবনে মনে থাকবে না এই জীবনে যদি আপনি অন্য কোনো দেশে বসবাস করতে যান তবে আপনাকে সেই দেশের আইন কানুন অথবা সংস্কার শিখতে হবে তা নাহলে সেখানে সুখে বসবাস করতে পারবেন না নিজেও দুঃখী হবেন এবং সেখানকার সমাজও দুঃখী হবে দুঃখ তো কেউ চায় না এইজন্য সংস্কার প্রদান করা হয় যেন সকলে সুখে জীবন-যাপন করতে পারে খুব ভাল হয় পুরো বিশ্বে যদি একরকম নীতিনিয়ম অথবা একরকম সংস্কার প্রতিষ্ঠিত হয় যেন বারবার সেইসব শিখতে না হয় এই পুস্তকের মাধ্যমে এটিই বলছি চাইছি যে সম্পূর্ণ বিশ্বে সমস্ত শিক্ষা ও নীতিনিয়ম একরকম হোক এতে বহু সমস্যা উৎপন্নই হবে না যা বর্তমানে অবিরত হয়ে চলেছে একজন কিছু বললে অপরজন অন্য কিছু বোঝে ফলে সমস্যার পাহাড় উৎপন্ন হয়। যার কোনো সমাধান দেখতে পাওয়া যায় না মনে হয় মনুষ্য জাতি দুঃখ ভোগ করার জন্যই অভিশপ্ত কিছু মানুষের বোধের অভাবে এটিকে সমাজের অভিন্ন অঙ্গ মনে করে থাকে এর ফলে তারা সগর্বে দুঃখ ভোগ করে চলেছে তারা বলে থাকে সুখ-দুঃখ জীবনের অভিন্ন অঙ্গজীবনে দুটোই থাকবে এ নিয়ে আমরা কিছু করতে পারব না যদিও আমরা বুঝে গিয়েছি যে একথা সত্য নয় অজ্ঞানতাই হচ্ছে এর মূল কারণ

 মন্দ সংস্কারের অর্থ হচ্ছে কারোর কাছে কোনো বিষয় নিয়ে ভুল সূচনা রয়েছে যখনই আপনি জেনে যাবেন এইসব তথ্য এবং জ্ঞান ভুল তখনই তাকে সংশোধন করে নিন একেই সঠিক সংস্কার করা বলা হবে এর অধিক কিছু নয় আশা করি আপনি আমার কথার অর্থ বুঝতে পেরেছেন


বিস্তারিত জানতে 

"সম্পূর্ণ সমাধানঃ নতুন সামাজিক রাজনৈতিক অর্থব্যবস্থা" 

অধ্যয়ন করুন

(অ্যামাজন লিংক)


পিডিএফ লিংক

 ***

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

ব্যবস্থাগত অসম্পূর্ণতা নাকি নেতৃত্বের ব্যর্থতা?