অধ্যায় ৫: সুখের আধার


 সুখের আধার


সত্য

সত্য এটিই যে আমরা সকলে একই মূল তত্ত্ব থেকে বিস্তৃত হয়েছি বাহ্যিক দিক দিয়ে ভিন্ন মনে হলেও আমরা সকলে মূলত একটি বৃহৎ মালার পুঁতির মতই গেঁথে রয়েছি সাধারণ চোখে দেখলে মনে হবে আমরা সকলে ভিন্ন এবং একে অপরের থেকে পৃথক যদি জ্ঞানচক্ষু দিয়ে দেখা যায় তবে জানা যাবে এটি মূলত অর্ধসত্য সম্পূর্ণ সত্য এই যে আমরা পৃথক হয়েও মূলত একই সাংসারিক চোখে আমাদের মধ্যে ভিন্নতা দেখা যায় কিন্তু জ্ঞানের চোখ দিয়ে দেখলে মনে হবে তা একীভূত আমরা সকলে সেই বৃক্ষের মত যার শাখা অনেক কিন্তু মূল এক আমাদের সকলের উদ্দেশ্যও এক, সেটি হচ্ছে আমাদের ইপ্সিত সুখকে নিরন্তর গ্রহণ করা ব্যক্তিগত সুখ সকলের ভিন্ন-ভিন্ন হয়ে থাকে সকলের পছন্দ-অপছন্দও ভিন্ন-ভিন্ন হয়ে থাকে সকলের প্রবৃত্তি ভিন্ন-ভিন্ন হয়ে থাকে একই বস্তু দ্বারা কেউ সুখ এবং কেউ দুঃখ পেতে পারে আবার একই বস্তু থেকে কেউ ভিন্ন-ভিন্ন সময় কখনো সুখ এবং কখনো দুঃখ পেতে পারে এই পরিবর্তনশীল সংসারে সমস্তকিছুই পরিবর্তনশীল এটিও তো সত্য আর প্রকৃতির মধ্যে যত জ্ঞান-বিজ্ঞান রয়েছে এবং ভবিষ্যতে যা কিছু আবিষ্কার হবে সবই সত্যের অধীনে আসবে এই সত্যকে কখনো অবহেলা করা উচিত নয় তাহলে পরিণাম হিসেবে জীবনে দুঃখই আসবে তখন জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তির পথ খুঁজে বেড়াতে হবে তারপরও সেই পথ মিলবে না, কারণ এমন কিছু তো বাস্তবে হয় না কেননা সমষ্টি থেকে বিচ্ছিন্ন হবার কোনো সম্ভাবনা নেই


প্রেম

সত্যের জ্ঞান থেকেই প্রেমের উৎপত্তি হয় প্রেম হচ্ছে একে অপরের প্রতি সম্বন্ধআর সম্বন্ধ নির্ভর করে এই বিষয়ের উপর যে দুজনের সম্পর্ক একে অপরের প্রতি কতটা উপযোগী যে যার প্রতি যতটা উপযোগী হবে তাদের মধ্যে সেই প্রকার সম্বন্ধ এবং ততটুকুই সম্বন্ধ থাকবে এই সম্বন্ধকেই প্রেম অথবা প্রেমের আকর্ষণ বলা হয়ে থাকে যখন আমরা একে অপরের উপযোগিতার তাৎপর্য বুঝতে পারি এই ভেবে যে আমাদের সুখ পরস্পরের যোগদান ছাড়া সম্ভব নয় তখনই অন্যের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয় এই আকর্ষণকেই প্রেম বলা হয় এই উপলব্ধি যে স্তরের হবে তার ভেতর সেই স্তরের প্রেম উৎপন্ন হবে ব্যক্তিগত স্তরে যেহেতু আমরা একা সেহেতু সেখানে সম্পর্ক তৈরির জন্য অন্য কেউ থাকে না তবে পারিবারিক স্তরের প্রেমকে বোঝার জন্য একটি উদাহরণ নেওয়া যেতে পারে। যখন স্ত্রীর কাছ থেকে স্বামী সুখ পেতে থাকে তখন তার প্রেম হতে থাকে তখন সে বুঝে যায়, স্ত্রীর কাছ থেকে যেমন সুখ পাচ্ছি সেই প্রকার সুখ স্ত্রী ব্যতীত উপভোগ করতে পারব না সামাজিক স্তরের সুখকেও আমরা একইভাবে বুঝে নিতে পারি যদিও সামাজিক স্তরের সুখকে অনুভব করা একটু কঠিন হয়ে যায় কেননা বিভিন্ন প্রকার সুখের মধ্যে সমাজের ভিন্ন-ভিন্ন যোগদান থাকে যিনি বুঝতে পারেন তিনিই তা অনুভব করতে পারেন এইজন্য বলা হয় বাস্তবিক জ্ঞান থেকেই প্রেম উৎপন্ন হয় যখন আমাদের ভেতর প্রেম উৎপন্ন হবে কেবলমাত্র তখনই তা অনুভব করতে পারব তার পূর্বে নয় যেমন কোনো একটি অনুভব তখনই হয় যখন সেই বিষয় সম্পর্কিত কোনো ঘটনা ঘটে থাকে অর্থাৎ অপরের যোগদান ছাড়া আমরা সামান্য সুখই উপভোগ করতে পারি তাও বহু সংঘর্ষের পর সুতরাং পারস্পরিক নির্ভরতার জ্ঞান থেকে একে অপরের প্রতি প্রেমের উৎপত্তি হয়ে থাকে সে বুঝতে পারে অপরের সান্নিধ্য ছাড়া সম্পূর্ণরূপে সুখী হওয়া সম্ভব নয় আর তখন অপরের গুরুত্বও অনুভব করতে পারে যার ফলে তার সাথে অপরের প্রেম হয়ে যায় যেমন বৃক্ষের মূল এবং শাখার সাথে যে সম্বন্ধ সেটিই প্রেমের সম্বন্ধ পারিবারিক সুখ প্রাপ্তির জন্য প্রেমই হচ্ছে আধার পরিবারের অর্থ হচ্ছে দুই বা অধিক ব্যক্তি দীর্ঘ সময় অবধি একসাথে থাকতে চায় দীর্ঘ সময় অবধি থাকার ফলেই পারিবারিক সুখের উদয় হয় এইজন্য পরিবার নামক কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে সাধারণভাবে প্রেমকে বুঝতে হলে এইভাবে জানতে হবে যে কারোর সান্নিধ্য পেয়ে যখন সুখ প্রাপ্তি হতে থাকে এবং তার সাথে ক্রমাগত বসবাস করার ইচ্ছে তৈরি হতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত তার ইচ্ছে থাকবে ততক্ষন অবধি সেই সুখও যেন প্রাপ্তি হতে থাকে এই রকম আকর্ষণকেই প্রেম বলা হয় মূলত এটিই হচ্ছে প্রেমের সাধারণ পরিভাষা কিছুদিন পর সেই সামান্য প্রেম গভীর হতে থাকে তখন কেবলমাত্র নিজের সুখ প্রাধান্য পায় না বরং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সুখও প্রাধান্য পেতে থাকে একেই পারিবারিক প্রেম বলে এরপর প্রেমের বোধ আরো প্রসারিত হলে তা সামাজিক হতে থাকে এবং তারপর সমষ্টিগত হতে থাকে অর্থাৎ ব্যক্তিগত প্রেম, পারিবারিক প্রেম, সামাজিক প্রেম এবং সমষ্টিগত প্রেম প্রেমের এই চারটি স্তর রয়েছে প্রথমত নিজের প্রতি প্রেম, দ্বিতীয়তপরিবারের প্রতি প্রেম, তৃতীয়তসমাজের প্রতি প্রেম এবং চতুর্থত সমষ্টির প্রতি প্রেম যে স্তরের জ্ঞান ও বোধ হবে সেই স্তরের প্রেম হবে যে স্তরের প্রেম হবে সেই স্তরের কর্ম হবে যে স্তরের কর্ম হবে সেই স্তরের পরিণাম আসবেএর মাধ্যমেই কারোর ব্যক্তিত্ব প্রস্ফুটিত হবে

 

ন্যায়

ন্যায়বান মনুষ্যের অর্থ হচ্ছে যিনি সক্রিয় অবস্থা প্রাপ্ত করেছেন অর্থাৎ যার মধ্যে চিন্তন-মনন করার সামর্থ্য তৈরি হয়েছে যিনি কোনোকিছুর অর্থ সঠিকভাবে বুঝতে পারেন মন দ্বারা সঠিক অর্থ অনুধাবন করে আমরা ন্যায়কেও বুঝে নিতে পারব ন্যায়ের অর্থ হচ্ছে সকলে নিজেদের ইচ্ছে অনুযায়ী সমস্তকিছু পেয়ে যাবে যার দ্বারা তারা সুখী হতে চায় সম্পূর্ণরূপে সুখী হওয়াই জীবনের উদ্দেশ্য আর যে ব্যবস্থা থেকে সকলে নিজেদের অভীষ্ট সুখ পেয়ে যাবে এবং নিজেদের উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে যাবে তাকেই ন্যায়কারী ব্যবস্থা বলা যাবে সেই ব্যবস্থাকেই আমরা ন্যায়কারী ব্যবস্থা বলব যার মাধ্যমে সমাজে ন্যায় স্থাপিত হবে এখানে যা কিছু প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে সেসবের উপর সকলের সমান অধিকার রয়েছে এবার সকলে এই সমান অধিকার কীভাবে গ্রহণ করতে পারে তার জন্য অধিকার এবং কর্তব্যের নির্ধারণ করতে হবে এইজন্য ন্যায়কেই আধার হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত এবার এইকথা বুঝে গিয়েছেন যে ব্যক্তিগত সামর্থ্য দ্বারা সংসারের সমস্ত রকমের সুখ অর্জন করা সম্ভব নয় এমনকি পরিবার দ্বারাও সমস্তরকম সুখ উপভোগ করা সম্ভব নয় তখন তিনি সকলের সহযোগিতার অভাব অনুভব করেন এবং চান সকলে একসাথে থাকুক এমন অবস্থা হলে বুঝতে হবে তিনি সামাজিক হয়ে গিয়েছেন এবং সমাজের অর্থ বুঝতে পেরেছেন এই সমস্ত জ্ঞান শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রদান করা উচিত যেন সকলে একটি ব্যবস্থাকে বোঝার জন্য উপযুক্ত হতে পারে তা অবশ্যই হবে একটি নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যে অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থা অনুযায়ী ২৫ বছর বয়স পূর্ণ হবার পূর্বেই

 

যদি কেউ নীতিনিয়মকে জানে না কিংবা বোঝে না তখন তার কাছে এমন আশা কীভাবে করা যায় যে এটিকে সে পালন করবে? বিশেষ করে আমরা এখানে যেমন সরকারের কথা বলছি তেমন সরকারি ব্যবস্থা সামাজিক স্তর থেকেই শুরু হওয়া উচিত এই সরকারের উচিত কর্ম হবে ন্যায় ব্যবস্থাকে স্থাপন করা এবং পরিচালিত করা তবেই সকল কর্ম এবং অধিকারের ন্যায়পূর্ণ সমাধান হতে পারে যদি আমরা এই প্রকার ন্যায় ব্যবস্থা নির্মাণ না করি তবে দুঃখী জীবন কাটানোর জন্য তৈরি থাকা উচিত আর ন্যায় নিয়ে শুধুমাত্র বাক্য বিনিময় করলে অথবা সংবিধানে লিখে দিলেই বাস্তবায়িত হয়ে যায় না তার জন্য এমন কিছু বিধান তৈরি করতে হয় যার দ্বারা ন্যায় ব্যবস্থা যেন বাস্তবে রূপায়িত হয় এবং সকলে সুখী হতে পারে যে মানুষের যতটা জ্ঞান অর্জনের রুচি থাকবে সে ততটা জ্ঞান প্রাপ্ত করতে পারবে, যতটা কর্ম করার ইচ্ছে থাকবে ততটা কর্ম সে পেয়ে যাবে, যতটা ভোগ করার ইচ্ছে থাকবে ততটা ভোগ তার প্রাপ্তি হবে, যতটা বিশ্রাম করার ইচ্ছে থাকবে ততটা বিশ্রাম সে পেয়ে যাবে ব্যস এটিই হচ্ছে ন্যায় আর তা সকলের জন্য সম্ভব হয়ে গেলে তবেই সঠিক সমতা রয়েছে এমনটি বলা যাবে যদি প্রাথমিক স্তরেই ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া যায় অর্থাৎ সরকারের সবকিছু ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত হয় তবে আদালত ইত্যাদির প্রয়োজনীয়তা ন্যুনতম হয়ে যাবে যে ব্যবস্থায় আদালত ইত্যাদির অধিক প্রয়োজন হয়ে থাকে বুঝে নিতে হবে সেই ব্যবস্থা ততটাই অন্যায়পূর্ণ কোনো ব্যবস্থাকে পরিমাপের জন্য এটি হচ্ছে একপ্রকার মাপকাঠি যদি সকলে সবকিছু পেয়ে যায় তবে কেনই বা কেউ চুরি-ছিনতাই ইত্যাদি করবে? কেননা সমস্ত অপরাধ মূলত সুখী হবার জন্যই করা হয়ে থাকে এমন ব্যবস্থা থাকলে আদালতের প্রয়োজন পড়বে কেন? তাহলে তো সকলেই সুখ-শান্তি এবং আরামের জীবন উপভোগ করত ন্যায়ের মূলত এটিই হচ্ছে অর্থ

 

পুণ্য

যেহেতু আমরা সকলে নিজেদের মত করে জীবন-যাপন নিয়ে ব্যস্ত রয়েছি সেহেতু আমাদের আজ্ঞাতসারে এমন অনেক কর্মের সম্ভাবনা রয়ে যায় যার ফলে সৃষ্টির বিভিন্ন চক্রের ভারসাম্য নষ্ট হয় তাহলে এমন ব্যবস্থা প্রথম থেকেই বর্তমান থাকুক যেন ক্ষতিও ন্যুনতম থেকে ন্যুনতম হয় দ্বিতীয়ত, তারপরও যদি ভারসাম্য বিনষ্ট হয় তবে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান বিকাশের মাধ্যমে তৎক্ষণাৎ সেসবের সমাধান করে নেওয়া উচিত এমনতর উপায়কেই পুণ্য কর্ম বলা হয় যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারি ব্যবস্থা থেকে সম্পাদিত হয়ে থাকে কখনো কখনো জনগণের মাধ্যমেও বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের প্রয়োজনীয়তা হতে পারে তবে হ্যাঁ, প্রাপ্ত জ্ঞানের মাধ্যমে এমন প্রয়াস সকলেকে করা উচিত যেন প্রকৃতির ভারসাম্য বিনষ্ট না হয় তবে এটিই বোঝা গেল যে সমষ্টির আধার পুণ্যই হওয়া উচিত

 

সঠিক ব্যবস্থার মাপকাঠি

সুখের এই সকল পুষ্প যা সত্য, প্রেম, ন্যায় এবং পূণ্যের মাধ্যমে তখনই প্রস্ফুটিত হবে যখন এই সংসারে একটি পরিপূর্ণ ব্যবস্থা থাকবে পরিপূর্ণ ব্যবস্থার অভাবের ফলে তা বিকশিত হতে পারে না আর মন্দ ব্যবস্থায় যদি কেউ তাকে বিকশিত করার চেষ্টা করে তবে সমাজ অধিক দুষিত হতে থাকে, যার ফলে দুঃখ অধিক বেড়ে যায় এইজন্য যারা নিজের জীবনে বা অন্যের জীবনে বলপূর্বক নৈতিকতাকে প্রতিষ্ঠা করতে চান তারা আজ্ঞাতসারে দুঃখকে অধিক বাড়িয়ে তোলেন আর এমন লোকদের পরিবারবর্গও অনেক প্রকার দুঃখের সম্মুখীন হয় সাধারণভাবে দেখলে এমন মনে হবে তারা অনেক মহান ব্যক্তি কিন্তু বলপূর্বক নিয়ে আসা এই মহানুভবতার পরিণাম কেবলমাত্র দুঃখই বয়ে নিয়ে আসে তাহলে খেয়াল রাখতে হবে এই চার ধরনের পুষ্প কেবলমাত্র একটি সঠিক ব্যবস্থারই পরিণাম হতে পারে যেমন ব্যবস্থা হবে তেমন আমাদের অবস্থা তৈরি হয়ে যাবে নৈতিকতার এই চার পুষ্প একটি পরিপূর্ণ ব্যবস্থার সঠিক অবস্থা এখনো অবধি যদি তা প্রস্ফুটিত না হয়ে থাকে তবে বুঝতে হবে পরিপূর্ণ ব্যবস্থা এখনো আসেনি এই পুষ্পদেরকেই মাপকাঠি হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত যে ব্যবস্থায় এই পুষ্পগুলি বিকশিত হবে সেই ব্যবস্থাকেই পরিপূর্ণ ব্যবস্থা বলা হবে নাহলে ততক্ষন অবধি আমাদের বর্তমান ব্যবস্থাকে বদলে শুধরে নেওয়া উচিত আর এই শোধরানো বা বদলের প্রক্রিয়া ততক্ষন পর্যন্ত বন্ধ করা উচিত নয় যতক্ষণ পর্যন্ত এই চার প্রকার পুষ্প প্রস্ফুটিত না হয় সঠিক শিক্ষা দ্বারা জ্ঞান প্রাপ্তি হয় সত্যের আধারেই কোনো জ্ঞানী মানুষ সঠিক ব্যবস্থার নির্মাণ করেন এবং সকলের অনুমতি নিয়ে তা বাস্তবায়িত করেন এইরূপ ব্যবস্থা দ্বারা এক সঠিক অবস্থার নির্মাণ হয়ে থাকে অর্থাৎ যার মাধ্যমে আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে সুখ, শান্তি, সন্তুষ্টি মোক্ষ প্রাপ্তি হতে থাকে সমাজেও তখন ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয় সেই কারণে আমাদের মধ্যে সঠিক আচার-ব্যবহারের মাধ্যমে প্রেম উৎপন্ন হতে থাকে ন্যায় স্থাপিত হলে পুণ্য প্রতিষ্ঠিত হয় তখন সে বুঝে যায় এখানে যে সমতা রয়েছে তার মুলে রয়েছে সমষ্টি তখন সে সমষ্টির ভারসাম্যের খেয়াল রাখে যা পূণ্যের প্রক্রিয়া দ্বারাই সম্ভব সমষ্টির ভারসাম্যহীনতাকে সঠিক সমতায় নিয়ে আসার জন্য যে কর্ম করা হয় তাকে পুণ্য বলা হয় যেমন আপনি এমনভাবে জীবন-যাপন করুন যেন অসুস্থই না হন তখন এমন জীবনকে পুণ্যময় জীবন বলা যাবে অথবা আমাদের শরীর যখন অসুস্থ্য হয় তখন সুস্থ্য হবার জন্য আমরা চিকিৎসা ইত্যাদি গ্রহণ করি তখন তাকে পূণ্যের শ্রেণীতে রাখা যেতে পারে উদাহরণস্বরূপ ধরুন গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড তাপের প্রভাবে জঙ্গলের উদ্ভিদ শুকিয়ে গেলে পশু-পক্ষীরা দুঃখী হয়ে গেল তখন তাদের দুঃখ দূর করার জন্য জঙ্গলে একটি নালা তৈরি করে জল সেঁচের ব্যবস্থা করে দেওয়া হল ব্যস এটিকেই পুণ্য বলা হয়। অথবা বিজ্ঞান উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে জঙ্গলে বৃষ্টির ব্যবস্থা করে দেওয়া হল দেখতে হবে কোনোপ্রকার দূষণ যেন না হয়যদি কোনো কারণে হয়ে যায় তাকে অতিশীঘ্র দূর করার উপায় করে নেওয়া উচিত এবং ভবিষ্যতে যেন দূষিত না হতে পারে তার ব্যবস্থা করে নেওয়া উচিত এটিই হচ্ছে পুণ্য চলুন অন্য একটি দৃষ্টিকোণ থেকে এই চার বিষয়কে বুঝে নিই

ওটি যা এটিও হচ্ছে তাই অর্থাৎ যা ব্রহ্ম তাই ব্রহ্মাণ্ড যা স্রষ্টা তাই সৃষ্টি যিনি প্রভু তিনিই বিভু এক মূল থেকেই সমস্ত সংসার সৃষ্টি হয়েছে এবং সমস্তপ্রকার সুখ উপভোগের জন্যই এক থেকে অনেক হয়েছে প্রভু থেকে বিভু হয়েছে, স্রষ্টা থেকে সৃষ্টি হয়েছে অর্থাৎ ব্রহ্ম থেকে ব্রহ্মাণ্ড হয়েছে এটিই মূল সত্য মূল জ্ঞান থেকে শুরু করে সমস্ত বিজ্ঞান সবই সত্যের শ্রেণীতে আসে

যে হৃদয়ে সাত্ত্বিক, ইতিবাচক বা শুভ ভাবনা বিদ্যমান রয়েছে তাকে সৎভাব বলা হয় যার মাধ্যমে সকলে সুখ পেয়ে থাকে প্রচলিত ভাষায় সৎভাবকেই প্রেম বলা হয়

যে মানব মস্তিস্কে সমতাবোধ রয়েছে সেই সমদর্শীতার উপর নির্ভরশীল সম্যক নির্ণয়শক্তিই হচ্ছে সৎবুদ্ধি যার দ্বারা সকলে কেবলমাত্র সুখীই হয় প্রচলিত ভাষায় সৎবুদ্ধিকেই ন্যায় বলা হয়

সত্য, প্রেম এবং ন্যায়ের উপর নির্মিত যে একনিষ্ঠতা তাকে সৎকর্ম বলে প্রচলিত ভাষায় সৎকর্মকেই পুণ্য বলা হয় এর দ্বারা সমস্ত সমষ্টিতে ভারসাম্য থাকে এবং সকলে পরস্পরের কাছে থেকে সুখ পেতে থাকে আসুন এবার প্রাকৃতিক এবং সাংস্কৃতিক বিষয়াবলীর অর্থ কী তা বোঝার চেষ্টা করি

 

প্রাকৃতিক কথার অর্থ

মনুষ্য জন্ম হবার পূর্বেই প্রাকৃতিকভাবে যা কিছু তত্ত্ব দিয়ে সংসার রচিত হয়েছে এবং যার নির্মাণ মনুষ্য দ্বারা হয়নি অর্থাৎ মনুষ্য জন্মের পূর্বেই যা নির্মিত হয়ে রয়েছে তাকে আমরা প্রাকৃতিক বলব উদাহরণস্বরূপ যেমন গঙ্গা নদী প্রাকৃতিকভাবেই সৃষ্টি হয়ে রয়েছে তাই একে প্রাকৃতিক বলব আর যদি মানুষ তা থেকে কোনো উপনদী তৈরি করে নেয় তাহলে সেটি হবে মনুষ্যকৃত যদি সঠিকভাবে তৈরি করা হয়ে থাকে তবে তাকে আমরা সাংস্কৃতিক বলব

 

সাংস্কৃতিক কথার অর্থ

মনুষ্য দ্বারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের মাধ্যমে সঠিক চিন্তা বোধের সমন্বয়ে উৎকৃষ্টতা অর্থাৎ সকলের সুখের জন্য ভোগসামগ্রী যা প্রকৃতি থেকে সরাসরি প্রাপ্ত হয় না উদাহরণস্বরূপ প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন হওয়া শস্য দানা চিবিয়ে খাওয়ার সুখকে বলা হবে প্রাকৃতিক সঠিক চিন্তা বোধের মাধ্যমে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাহায্য নিয়ে শস্য দানা সঠিক প্রকারে মজুত করে রেখে দেওয়া এবং সময় প্রয়োজন অনুসারে সেই শস্য দানা থেকে চাল বা আটা তৈরি করে ভাত, রুটি, পরোটা, পিঠে-পুলি ইত্যাদি বানিয়ে নিয়ে অথবা অন্য কোনো ভোজন বানিয়ে তার সুখ উপভোগ করাকে সাংস্কৃতিক বলা হবে আপনি পুরো প্রকৃতিকে অধ্যয়ন করলে দেখতে পাবেন যে প্রকৃতিতে অধিকাংশ সম্পদ কাঁচা মালের অবস্থায় থাকে তা সরাসরি ব্যবহার করে আমরা সুখী হতে পারব না অবশ্য কিছু খাওয়া পান করার বস্তু ছাড়া অবশিষ্ট সমস্ত বস্তুদের মাটি থেকে তুলে নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী তৈরি করে নিতে হয় সঠিক অর্থে দেখলে বোঝা যাবে যে মানুষ প্রাকৃতিকভাবে স্বর্গসম জীবন প্রাপ্ত করতে পারবে না তারপরও যদি চেষ্টা করে তবে প্রাকৃতিকভাবে সে পশুতুল্য জীবনই পাবে যেখানে সুখ রয়েছে ন্যুনতম আর বিকশিত মানুষ তেমন জীবন কখনো চাইবে না যদি তারপরও কোনো মানুষ প্রাকৃতিকভাবে থাকতে চায় তবে সে জঙ্গলে গিয়ে থাকতে পারে কারণ প্রকৃতির উপস্থিতি তো সর্বদা রয়েছেই, এইজন্য ভিন্নভাবে কিছু করার তো প্রয়োজন নেই কিন্তু যিনি সাংস্কৃতিকভাবে জীবন-যাপন করতে চান তার জন্য তো সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা থাকতেই হবে দুরকম ব্যবস্থাই থাকতে হবে যে যেমনভাবে থাকতে চায় সে যেন নিজের ইচ্ছেমত থাকতে পারে এবং সুখ উপভোগ করতে পারে প্রাকৃতিক ব্যবস্থা তো শুরু থেকেই রয়েছে এখন শুধুমাত্র সঠিক সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে যে কর্মে আমি প্রচেষ্টারত রয়েছি পরিশেষে যারা সাংস্কৃতিক ব্যবস্থায় সম্পূর্ণরূপে সুখী জীবন উপভোগ করতে চান তারা এই অত্যাবশ্যক কাজে যেভাবে পারবেন আমাকে সহযোগিতা করুন কেননা কোনো একজন ব্যক্তি দ্বারা কর্ম কখনো সম্ভব হবে না। কারণ এটি একটি সামাজিক কর্ম এবং সকলের সমর্থনের মাধ্যমে সম্পাদনের কর্ম আর যিনি প্রাকৃতিকভাবে জীবন-যাপন করতে চান তিনি এখন থেকেই সেইভাবে জীবন-যাপন করতে পারেন তার জন্য কিছু করার প্রয়োজন নেই এবং কখনো তা হবেও না

 

***

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

ব্যবস্থাগত অসম্পূর্ণতা নাকি নেতৃত্বের ব্যর্থতা?