অরবিন্দ দর্শন অনুযায়ী 'সমাধি' কী?

 

সমাধি

সমাধির অবস্থা একটি উপমা দ্বারা বোঝানো হয়-শরবৎ তন্ময়। শর যেমন লক্ষ্যের সঙ্গে এক হয়ে যায়, তেমনি সমাধির অবস্থায় আত্মা ব্রহ্মের মধ্যে তন্ময় হয়ে পড়ে। রাজযোগে সমাধি বলতে কী বোঝায় তা নিম্নের উদ্ধৃতিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে: "সাদা কথায় ধ্যান করিতে করিতে যখন আত্মহারা হইয়া যাওয়া যায়, যখন কেবল ধ্যায় বিষয়ের সত্তারই উপলব্ধি হইতে থাকে এবং আত্মসত্তাকে ভুলিয়া যাওয়া যায়, যখন ধ্যায় বিষয় হইতে নিজের পার্থক্য জ্ঞানগোচর হয় না, ধ্যায় বিষয়ে তাদৃশ চিত্তস্থৈর্যকেই সমাধি বলা যায়।” (পাতঞ্জল দর্শন, হরিহরানন্দ আরণ্যক)

সমাধির অবস্থায় যে চিত্তধ্যায়াকারে পরিণত হয়, অর্থাৎ ধাতা ও ধ্যায়ের মধ্যে ভেদ থাকে না সেই সম্বন্ধে একটি গল্প আছে। চিত্ত স্থির করার অন্যতম উপায় হিসাবে পতঞ্জলি বলেছেন, "যথাভিমত ধ্যানাৎ বা” অর্থাৎ সাধকের প্রিয় কোন একটি বিষয়ের ধ্যানের দ্বারাও চিত্ত স্থির হয়। এখন গল্পটি বলা যাক:

"একটি ছাত্র গুরুর নিকট বেদাধ্যয়ন করিতে গিয়াছিল। গুরু দেখিলেন বেদপাঠের সময় ছাত্রটির মন স্থির থাকে না, বারবার এদিক ওদিক যায়। গুরু ছাত্রটিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, 'তোমার মন এদিক ওদিক যায় কেন?' ছাত্রটি বলিল, 'আমার একটি অত্যন্ত প্রিয় মহিষ আছে; তাহারই কথা মনে পড়ে, সুতরাং চিত্ত স্থির করিতে পারি না।' গুরু বলিলেন, 'তবে তুমি বেদপাঠ ক্ষান্ত রাখিয়া কিছুকাল তোমার প্রিয় মহিষটির বিষয় চিন্তা কর।' ছাত্রটি একান্তে বসিয়া প্রিয় মহিষটিরই চিন্তা আরম্ভ করিল। কিছুদিন পরে গুরু এক দিবস একটি ক্ষুদ্র দ্বারের অপর পার্শ্বে বসিয়া ছাত্রটিকে ডাকিলেন, 'তুমি এদিকে এস, পুনরায় তোমার বেদাধ্যয়ন আরম্ভ হইবে।' ছাত্রটি আসিল। গুরু দেখিলেন ছাত্রের চিত্ত তখনও স্থির হয় নাই। আবার ছাত্রটিকে মহিষের ধ্যান করিতে আদেশ করিলেন। ছাত্র পুনরায় তাহার প্রিয় মহিষের ধ্যানে বসিল। কিছুকাল পরে আবার গুরু সেই দ্বারের অপর পার্শ্বে বসিয়া তাহাকে ডাকিলেন। এবার ছাত্র উত্তর করিল, 'আমি কিরূপে আপনার নিকট উপস্থিত হইব? আমার শৃঙ্গ দ্বারে বাধিবে।' গুরু বুঝিলেন মহিষে ইহার সমাধি হইয়াছে, চিত্ত স্থির (অর্থাৎ ধ্যায়াকারে পরিণত হইয়াছে)। ছাত্রকে বলিলেন, 'এস, এস, তোমার শৃঙ্গ বাধিবে না; আমি তাহার প্রতিবিধান করিব।' ছাত্র গুরুর নিকট আসিল; বেদপাঠ আরম্ভ হইল। মহিষের ধ্যানে শিষ্যের এমন একাগ্রতা সাধন হইয়াছে যে অতি অল্পকালের মধ্যে তিনি বেদে বিখ্যাত পণ্ডিত হইয়া পড়িলেন।" (ভক্তিযোগ, অশ্বিনীকুমার দত্ত)। সমাধি বলতে কী বোঝায় তা এ গল্পে বলা হয়েছে।


সমাধি Trance নয়

সমাধির ইংরেজী প্রতিশব্দ হিসাবে 'trance' কথাটির ব্যবহার কেউ কেউ করে থাকেন। Trance তো এক বাহ্যজ্ঞানরহিত অবস্থা। কিন্তু সমাধিতে বাহ্যজ্ঞান না থাকলেও সমাধি অজ্ঞান অবস্থা নয়, বরং জ্ঞানের এক পূর্ণতর ও উচ্চতর অবস্থা। শ্রীঅরবিন্দ বলেন, পাশ্চাত্য মনোবিজ্ঞান কিছুদিন যাবৎ মনের অবচেতন স্তরের সন্ধান পেয়েছে, এবং স্বপ্ন, অবচেতন মন প্রভৃতির ব্যাখ্যা খুঁজছে; কিন্তু মনের স্তরের ঊর্ধ্বেকার স্তরের কথা, সমাধি প্রভৃতির কথা পাশ্চাত্য মনোবিজ্ঞানের অজ্ঞাত। কিন্তু ভারতের প্রাচীন ঋষিদের নিকট মনের ঊর্ধ্বতন ঐসব স্তর যে অজ্ঞাত ছিল না, তার প্রমাণ আমাদের উপনিষৎ, বিশেষভাবে মাণ্ডুক্য উপনিষৎ। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে যে মাণ্ডুক্য উপনিষদখানা আকারে অতি ক্ষুদ্র, মাত্র ১২টি সূত্রের সমষ্টি; কিন্তু তার মূল্য এতই অধিক যে তার সম্বন্ধে বলা হয় "মাণ্ডুক্যম্ একমেবালম্ মুমুক্ষুণাম্ বিমুক্তয়ে", অর্থাৎ মাণ্ডুক্য উপনিষৎ এককই মুমুক্ষুদিগের মুক্তির পক্ষে পর্যাপ্ত। শ্রীঅরবিন্দ তাঁর The Life Divine গ্রন্থে নানা স্থানে মাণ্ডুক্যের শ্লোকগুলি উদ্ধৃত ও ব্যাখ্যা করেছেন; এবং The Synthesis of Yoga গ্রন্থে তিনি মাণ্ডুক্যের সাহায্যে আত্মার স্বরূপ ও সমাধি তত্ত্বের ব্যাখ্যা করেছেন। কী ভাবে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন দেখা যাক (৫৯২পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)।

মাণ্ডুক্য উপনিষদে বলা হয়েছে: এই সমস্তই ব্রহ্ম। জীবাত্মা ব্রহ্ম। এই আত্মার চার অংশ। চেতনার চার অবস্থা-জাগ্রত, স্বপ্ন, সুষুপ্ত ও তুরীয়। শ্রীঅরবিন্দের ব্যাখ্যা: The old Indian Psychology divided consciousness into three provinces-waking state (জাগ্রত), dream state (স্বপ্ন) and sleep state (সুষুপ্ত); and it supposed in the human being a waking self, a dream self, a sleep self, with the supreme or absolute self of being or Turiya (তুরীয়) beyond. বলা বাহুল্য যে চেতনার স্তরগুলিকে জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্ত বলা হয়েছে বটে, কিন্তু সেই স্তরগুলি লৌকিক জীবনের জাগ্রত, স্বপ্ন ও নিদ্রা নয়। লৌকিক নিদ্রায় (সুষুপ্তিতে) জ্ঞান থাকে আচ্ছন্ন; কিন্তু আত্মার চেতনার সুষুপ্তির স্তরের নাম মাণ্ডুক্যে দেওয়া হয়েছে প্রজ্ঞান বা প্রকৃত জ্ঞানের অবস্থা; এবং এ অবস্থাকে বলা ।। হয়েছে। আত্মার। আনন্দের। অবস্থা। আর চেতনার। তিন। অবস্থা।। বা স্তর বলা হয়েছে এজন্যে যে তুরীয় বা চতুর্থ অবস্থাকে চেতনার স্তরের মধ্যে ধরা হয়নি কারণ সে অবস্থা চেতনার অবস্থা নয়, চেতনার ঊর্ধ্বতন এক Superconscious state। সেই অবস্থাকে মাণ্ডুক্য অচিন্ত্য, অনির্দেশ্য প্রভৃতি বিশেষণে বিশেষিত করেছে। শ্রীঅরবিন্দ ঐ বিশেষণগুলির অনুবাদ করেছেন এই বলে যে সে অবস্থা unthinkable, beyond relation, featureless in which all is stilled. অর্থাৎ সে অবস্থা চেতনার অতীত সমাধি-লভ্য এক অবস্থা।

সমাধিতে লভ্য এ অবস্থা অনির্দেশ্য, কারণ সে অবস্থায় মানুষের যে কী উপলব্ধি হয় তা বর্ণনা করা যায় না। স্বামী সারদানন্দ পরমহংসদেবের প্রসঙ্গে লিখেছেন যে পরমহংসদেব সমাধির অবস্থায় তিনি কী উপলব্ধি করেন তা তাঁর শিষ্যদের বলবার জন্যে বারবার চেষ্টা করেও বলতে পারেন নি। তিনি এ প্রসঙ্গে একটি উপমা দিতেন। নুনের পুতুল গেল সমুদ্রের গভীরতা মাপ করতে; কিন্তু সমুদ্রের জলে নুন গেল গ'লে। তখন কে আর সংবাদ দেবে? সমাধির অবস্থায় কী উপলব্ধি হয় তা মুখে বলা যায় না। রাজযোগে সমাধির অবস্থা সম্বন্ধে বলা হয় "তদা দ্রষ্টুঃ স্বরূপে অবস্থানম্", অর্থাৎ সমাধির অবস্থায় সাধক আত্মস্বরূপে অবস্থান করেন। জীব স্বরূপত ব্রহ্ম; তাই স্বরূপে অবস্থান কথার অর্থ ব্রহ্মের সঙ্গে জীবের ঐক্যানুভূতি লাভ। এই ঐক্যানুভূতিই সাধনার শেষ লক্ষ্য; তাই সমাধির এত মূল্য।


শ্রীঅরবিন্দের সাধনায় রাজযোগের স্থান

শ্রীঅরবিন্দের যোগে রাজযোগের স্থান কোথায়? আমরা দেখেছি যম ও নিয়মকে শ্রীঅরবিন্দ সাধনার প্রথম সোপান হিসাবে একান্ত আবশ্যক মনে করেন। একাগ্রতা- সাধনও তাঁর যোগের ও সকল যোগেই অত্যাবশ্যক। তবে রাজযোগে একাগ্রতা- সাধনের সহায়ক হিসাবে প্রাণায়ামের ব্যবহার হয়। শ্রীঅরবিন্দ প্রাণায়ামকে অত্যাবশ্যক মনে করতেন না। সমাধি হলো সাধনার লক্ষ্য; কিন্তু রাজযোগে যে সমাধি লভ্য শ্রীঅরবিন্দের নিকট তা কাম্য নয়। রাজযোগে সমাধি হয় ধ্যানের পরিপক্ক অবস্থায়; সমাধি-ভঙ্গে প্রতিদিনের জীবনে ফিরে এলে সমাধিতে যে উপলব্ধি লাভ হয়েছিল তা অন্তর্হিত হয়। কিন্তু শ্রীঅরবিন্দের লক্ষ্য প্রতিদিনের জাগ্রত অবস্থায়ও ব্রহ্মের সঙ্গে জীবের ঐক্যানুভূতিতে স্থির থাকতে হবে। আর তাঁর কথা পতঞ্জলি একাগ্রতাসাধনের জন্যে ও সমাধিলাভের জন্যে যে সকল পথ নির্দেশ করেছেন সে পথ ব্যতীত অন্য পথেও ঐ ফল লাভ করা যেতে পারে। তাই তাঁর কথা তাঁর যোগে রাজযোগ হলো 'of secondary importance' অর্থাৎ অত্যাবশ্যক নয়। তবে কোন সাধক যদি 'প্রাণায়ামাদির ব্যবহারে উপকার পান তাহলে তাঁর ব্যবহারে কোন দোষ নাই।

***

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

ব্যবস্থাগত অসম্পূর্ণতা নাকি নেতৃত্বের ব্যর্থতা?