অরবিন্দ দর্শন অনুযায়ী জীবের বন্ধনের কারণ কী?


জীবের বন্ধন কেন

অদ্বৈতবাদের মতে জীব তো "ব্রহ্মৈব নাপরঃ"; গীতায়ও বলা হয়েছে জীব পুরুষোত্তমের সনাতন অংশ। শ্রীঅরবিন্দের কথা Jiva is a partial manifestation of Purushottama. (Essays on The Gita, p. 71)। বেদান্ত স্বীকার করে জীব স্বরূপত ব্রহ্মেরই মতন "নিত্য শুদ্ধ বুদ্ধ মুক্ত”। তবে জীব কেন নিজেকে মুক্ত বলে না জেনে বদ্ধ মনে করে দুঃখ পায়? এ প্রশ্নের উত্তর কী? আমরা প্রথমে অদ্বৈতবাদী এ প্রশ্নের কী উত্তর দেন দেখবো; পরে শ্রীঅরবিন্দ এ প্রশ্নের যে উত্তর দিয়েছেন তার আলোচনা করবো।

অদ্বৈতবাদী বলেন জীব বস্তুত বদ্ধ নয়। অদ্বৈতবাদের মতে মুক্তি জীবের "সাধ্য" বস্তু নয়; অর্থাৎ মুক্তি এমন কোন জিনিস নয় যা জীবের থাকে না কিন্তু জীবকে অর্জন করতে হয়। মুক্তি জীবের "সিদ্ধ" বস্তু, অর্থাৎ জীব নিত্য মুক্ত। তবে যে জীব নিজেকে বদ্ধ মনে করে দুঃখ পায় তার কারণ অজ্ঞান। এই অজ্ঞান দূর হলেই জীবের আর কোন বন্ধন থাকে না। অদ্বৈতবাদ উপমার দ্বারা একথাটা বোঝাতে চেষ্টা করে। এক ব্যক্তির কণ্ঠের হার তার কণ্ঠেই রয়েছে কিন্তু তার এ ভ্রম জন্মেছে যে তার হার হারিয়ে গেছে। তখন তার দুঃখের অন্ত থাকে না, এবং সে চারিদিকে হারের খোঁজে ছুটাছুটি করতে থাকে। তখন যদি কেহ দেখিয়ে দেয় তার হার তার কণ্ঠেই রয়েছে তবে তার ভ্রম দূর হয় এবং তার দুঃখের অবসান হয়। জীব যে আত্মবিস্মৃত, সে যে নিজের পরিচয় জানে না, একথাটা বোঝবার জন্যে অদ্বৈতবাদী আর একটি উপমা দিয়ে থাকেন। এক সিংহশিশু দৈবক্রমে এক হরিণের দলভুক্ত হয়ে পড়েছিল, এবং হরিণের ন্যায় আচরণে অভ্যস্ত হয়েছিল। বিপদের আশঙ্কা দেখা দিলে অন্যান্য হরিণের ন্যায় সেও প্রাণভয়ে পালাতো। একদিন জলাশয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে সে বুঝলো সে দুর্বল হরিণ নয়, সে সিংহ; এবং নিজের পরিচয় পেয়ে সে সিংহের স্বভাবও লাভ করলো। মোটকথা অদ্বৈতবাদীর মতে অজ্ঞানের অবসান হলে বন্ধনেরও অবসান হয়; অজ্ঞানই বন্ধনের মূল।


শ্রীঅরবিন্দের মতে জীবের বন্ধনের কারণ

জীবের বন্ধনের কারণ বর্ণনায় শ্রীঅরবিন্দ তাঁর The Essays On The Gita গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ৭৩) যা বলেছেন তা এই: The Jiva descends into the lower prakriti and thinks itself bound by action. এখানে জীবের বন্ধনের কারণ দুটি বলা হলো-প্রথমত জীব অপরা প্রকৃতিতে নেমে আসে। নেমে আসার অর্থ প্রকৃতি থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র হওয়া সত্ত্বেও জীব নিজেকে অপরা প্রকৃতির সঙ্গে-দেহ, প্রাণ, মনের সঙ্গে অভিন্ন মনে করে। অপরা প্রকৃতি শ্রীঅরবিন্দের মতে হলো prakriti of body, life and mind। অহংবুদ্ধির বশে জীব নিজেকে দেহ প্রাণ মন বলে ভাবতে অভ্যস্ত হয়। এই হলো বন্ধনের প্রথম কারণ। দ্বিতীয়ত জীব অকর্তা; প্রকৃতিই কর্ম করে; তাই কর্মের দায় জীবের নয়। কিন্তু জীব, গীতার ভাষায়, “অহংকারবিমূঢ়াত্মা” হয়ে নিজেকে কর্মের জন্য দায়ী মনে করে; ফলে সে সুখ-দুঃখ ভোগ করে। সাংখ্যদর্শনে বলা হয় "জীব অকর্তা কিন্তু ভোক্তা"। গীতার ব্যাখ্যা ও শ্রীঅরবিন্দের এই ব্যাখ্যা সাংখ্যদর্শনের অনুযায়ী। তাহলে দেখা গেল জীবের বন্ধন কেন, এ প্রশ্নের উত্তরে অদ্বৈতবাদী বলেন জীব নিজেকে জানে না; আর শ্রীঅরবিন্দ বলেন জীব নিজেকে ভুলক্রমে অপরা প্রকৃতির সঙ্গে অভিন্ন মনে করে বদ্ধ হয়। এ-ও অবশ্য অজ্ঞান।

জীবের পাশ

আমাদের দেশে দুটি কথা সুপ্রচলিত-"যত্র জীব তত্র শিব" আর "পাশবদ্ধ জীব, পাশমুক্ত শিব।” প্রথম কথাটির অর্থ শ্রীঅরবিন্দের জীব আর ব্রহ্মা one in essential being অর্থাৎ স্বরূপত অভিন্ন। দ্বিতীয় কথাটির অর্থ জীব কতকগুলি 'পাশ' দ্বারা বদ্ধ হয়ে রয়েছে, এবং এই পাশ থেকে মুক্ত হলেই জীব শিব হয়; অর্থাৎ ব্রহ্মের সঙ্গে নিজের ঐক্য অনুভব করে। এই পাশগুলি কী?

বেদান্তে ও তন্ত্রাদি শাস্ত্রে জীবের এই পাশগুলির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে; শ্রীঅরবিন্দও তাঁর Synthesis of Yoga গ্রন্থে, The Life Divine পুস্তকে এবং চিঠিপত্রে বেদান্ত প্রভৃতি শাস্ত্র অনুসরণ করে পাশগুলির ব্যাখ্যা করেছেন। বেদান্তের পরিভাষায় এই পাশগুলির এক নাম কোশ। শ্রীঅরবিন্দ কোশ কথার প্রতিশব্দ হিসাবে sheath কথাটি ব্যবহার করেছেন। তিনি তাঁর Synthesis of Yoga পুস্তকে (৫১৮ পৃষ্ঠায়) বলেছেন উপনিষদে যাকে কোশ বলা হয়েছে তাকেই আবার তন্ত্র ও যোগ- শাস্ত্রে বিভিন্ন প্রকারের দেহ-স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারণ দেহ রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। কোশগুলির সংখ্যা পাঁচ। এই পঞ্চ কোশ এবং স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারণ দেহের কথা শ্রীঅরবিন্দের Synthesis of Yoga ও The Life Divine গ্রন্থে এবং তাঁর পত্র থেকে বোঝবার চেষ্টা করা যাক্। প্রথমে কোশ কথাটির প্রচলিত অর্থ কী দেখা দরকার।

কোশ কথাটির একটি অর্থ তলোয়ারের খাপ; অপর অর্থ প্রজাপতির গুটি। আত্মার প্রসঙ্গে কোশ কথাটির ব্যবহার তাহলে কী অর্থে? তলোয়ারের খাপ যেমন তলোয়ারকে লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখে, প্রজাপতি যেমন নিজের চারিদিকে গুটি রচনা ক'রে তার মধ্যে নিজেকে আড়াল করে রাখে, তেমনি দেহ প্রাণ মনের সঙ্গে নিজেকে অভিন্ন মনে করে জীব যেন নিজের জন্যে আবরণ রচনা করে; ফলে জীব নিজের প্রকৃত স্বরূপের পরিচয় ভুলে যায়। সে যে দেহ প্রাণ মন থেকে স্বতন্ত্র এ সত্য তাকে সাধনা দ্বারা উপলব্ধি করতে হয়। অর্থাৎ কোশগুলির দ্বারা জীব পাশবদ্ধ হয়ে রয়েছে এবং সাধনা আর 'কোশ-ভেদ' একার্থক।

কোশগুলি কী তা বুঝতে হলে আমাদের আবার তৈত্তিরীয় উপনিষদের ভৃগুর কাহিনী স্মরণ করতে হবে। ভৃগু প্রথমে উপলব্ধি করেছিলেন "অন্নম্ ব্রহ্মেতি” কিন্তু এই উপলব্ধি তাঁকে শাস্তি দিতে পারল না; এবং পরপর "প্রাণো ব্রহ্মেতি", "মনো ব্রহ্মেতি", "বিজ্ঞানম্ ব্রহ্মেতি" এই সব স্তর অতিক্রম করে শেষে ভৃগুর এ উপলব্ধি হলো যে "আনন্দম্ ব্রহ্মেতি' তখন তাঁর ব্রহ্মান্বেষণ শেষ হলো। শ্রীঅরবিন্দের কথা: The oldest Vedantic knowledge tells us of fine degrees of our being, the material, the vital, the mental, the ideal, the spiritual or beautific (The Life Divine, p.238). এই অন্নময় শ্রীঅরবিন্দের ভাষায় (gross material body), প্রাণময় (nervous body), বা মনোময় (mental body), বিজ্ঞানময় (ideal) ও আনন্দময় (spiritual or beautific) এই পাঁচটি হলো আত্মার পঞ্চকোশ। Spirit বা আত্মা থাকেন এই পাঁচটির ভিতরে অর্থাৎ আড়ালে। Spirit-কে জানতে হলে, শ্রীঅরবিন্দ বলেন, "It is positive that we have to get inside, behind the veil. (The Riddles of This World, p.38)


স্কুল, সূক্ষ্ম ও কারণ দেহ

পঞ্চ কোশ ও স্কুল, সূক্ষ্ম ও কারণ দেহ ভিন্ন জিনিস নয়। শ্রীঅরবিন্দ বলেন, কোশগুলি দেহগুলির উপাদান। যথা, অন্নময় ও প্রাণময় কোশ নিয়ে আমাদের স্কুল দেহ বা gross material body গঠিত; সূক্ষ্মদেহ বা subtle body হলো মনোময় কোশ। (See Synthesis of Yoga, p.796) আর বিজ্ঞানময় ও আনন্দময় কোশের সমবায়ে কারণ দেহ বা ideal and spiritual body রচিত। শ্রীঅরবিন্দ বলেন, 'in all of these bodies the Spirit actually and simultaneously dwells.' The Life Divine, p.238).

( আমাদের শাস্ত্রে আবার অন্নময় পুরুষ, প্রাণময় পুরুষ, মনোময় পুরুষ, বিজ্ঞানময় পুরুষ ও আনন্দময় পুরুষের কথাও বলা হয়ে থাকে। শ্রীঅরবিন্দ বলেন: We use normally our corporal senses and live almost wholly in the body and the physical vitality and the physical mind (Synthesis of Yoga, p.517).

অর্থাৎ প্রাকৃত মানুষ, রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ভাষায়, যে মানুষের 'হুশ' হয়নি, অর্থাৎ যার আধ্যাত্মিক চৈতন্য এখনও উদ্বুদ্ধ হয়নি, সে নিজের দেহের ও প্রাণের ক্ষুধা- তৃষ্ণা ও প্রবৃত্তিগুলিকে আর মনের নিম্নস্তরের বৃত্তিগুলিকেই (physical mind) নিজের আত্মা বলে জানে। মনের ঊর্ধ্বে বিজ্ঞানের স্তর হলো সত্য ও অধ্যাত্ম জীবনের স্তর। বিজ্ঞানময় পুরুষ ও তার পূর্ণতর রূপ আনন্দময় পুরুষ ও সচ্চিদানন্দ হলেন অধ্যাত্মজীবনের উচ্চতর ও উচ্চতম স্তর।

এখানে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে আমরা তো স্থূল দেহের জগতেই বাস করি; সূক্ষ্ম দেহের ও কারণ দেহের অস্তিত্বের প্রমাণ কোথায়; আর ঐ দুই জগতের অস্তিত্ব থাকলেও তাদের সঙ্গে মানুষের কারবার কি সম্ভব? এ প্রসঙ্গে শ্রীঅরবিন্দের কথা The supra-physical is a truth. তিনি তাঁর The Life Divine গ্রন্থে (২৩৮ পৃষ্ঠায়) যা বলেছেন তা উদ্ধৃত করা গেল: "The old Hathayogins and Tantriks of India had long ago reduced the matter of the higher human life and body (সূক্ষ্ম ও কারণ দেহ) to a science. It is possible to become conscious in our other bodies as well; and it is in fact the opening up of the veil between them and consequently between our physical, psychical and ideal personalities which is the cause of the 'psychic' and 'occult' phenomena that are now beginning to be increasingly though yet too little and too clumsily examined." অর্থাৎ আজকাল যে হিপনটিজম, clairvoyance (চক্ষুর দৃষ্টির বাইরের জিনিস প্রত্যক্ষ করা) প্রভৃতি "occult" (গুপ্ত বা "অলৌকিক') ব্যাপারের প্রতি বৈজ্ঞানিকদের দৃষ্টি একটু আধটু আকৃষ্ট হচ্ছে তা দ্বারা প্রমাণিত হয় সূক্ষ্ম জগতের সঙ্গে ক্ষেত্রবিশেষে স্থূল জগতের মানুষের কারবার করা সম্ভব। আমাদের দেশের প্রাচীনকালের হঠযোগীগণ ও তান্ত্রিক সাধকগণ সূক্ষ্ম ও কারণ জগতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে পরিচিত ছিলেন।

এখানে লেখকের তরফে একটু কৈফিয়ৎ দেওয়া প্রয়োজন। শ্রীঅরবিন্দের জীবন- দর্শনের কথা বলতে গেলে তাঁর "শ্রদ্ধার" কথা, অর্থাৎ তিনি কী বিশ্বাস করতেন তার কথা, উল্লেখ না করলে শ্রীঅরবিন্দের বক্তব্য অসম্পূর্ণ থাকবে। রুচিভেদে পাঠক শ্রীঅরবিন্দের কথার মধ্যে কোল্টির উপর গুরুত্ব আরোপ করবেন, কোন্টির উপর করবেন না, তা পাঠকই স্থির করবেন। লেখকের কাজ শ্রীঅরবিন্দের নিজের কথার সঙ্গে যথাসম্ভব পাঠকের পরিচয় করিয়ে দেওয়া; এবং শ্রীঅরবিন্দ নিজে কোন বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিতেন তা দেখিয়ে দেওয়া।


শ্রীঅরবিন্দের মতে পাশ-মুক্তির উপায়

পাশবদ্ধ জীব কী ভাবে পাশমুক্ত হতে পারে সে সম্বন্ধে শ্রীঅরবিন্দ বলেন: The Jiva (that descends into the Lower Prakriti and finds itself bound by action) can draw back and know itself as the Passive Purusha who eats not and is free from all action. It can rise above the gunas and be liberated from the bondage of action. এখানে শ্রীঅরবিন্দ যে মণ্ডুক ও শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে দুই পক্ষীরূপে বর্ণিত জীবাত্মা ও পরমাত্মার কথা বলেছেন তা বলাই বাহুল্য। শ্রীঅরবিন্দের বক্তব্য জীব যখন নিজেকে নিষ্ক্রিয় পরমাত্মার সঙ্গে অভিন্ন অর্থাৎ অকর্তা বলে উপলব্ধি করে তখন তার সকল বন্ধন মোচন হয়। উপরের উদ্ধৃতিতে একথাটাই তিনি অন্য ভাষায় এভাবে প্রকাশ করেছেন-জীব যখন ত্রিগুণাতীত হয়, তখন সে পাশমুক্ত হয়। ত্রিগুণাতীত বলতে কী বোঝায়? তা পূর্বেই বলা হয়েছে। যখন জীবের এই উপলব্ধি হয় যে কর্ম করে ত্রিগুণময়ী প্রকৃতি, আর "নাহং কর্তা বন্ধ-মোক্ষৌ কুত মে"- অর্থাৎ আমি কর্তা নই, আমার বন্ধ-মোক্ষ কোথায়? যখন এই উপলব্ধি লাভ হয় তখন জীব পাশমুক্ত হয়।


আত্মার ভূমিসমূহ

জীবের বন্ধন ও বন্ধনমুক্তি প্রসঙ্গে শ্রীঅরবিন্দ কোশ, অন্নময় মনোময় পুরুষ প্রভৃতি কথার ন্যায় ভারতীয় সাধনার অপর একটি পরিভাষিক শব্দ "ভূমি" কথাটিও ব্যবহার করেছেন। "ভূমি” কথাটির অর্থ আত্মা বা মনের অবস্থিতি স্থান। "ভূমি" কথাটির ইংরেজী শ্রীঅরবিন্দ করেছেন Plane of existence; এবং তাঁর Synthesis of Yoga গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের উনিশ অধ্যায়ে আমাদের Planes of existence-এর বিবরণ দিয়েছেন। ভূমিগুলির সংখ্যা সাত। "শ্রীঅরবিন্দের যোগ" প্রসঙ্গে আমাদের আবার একথার আলোচনা করতে হবে। এখানে পণ্ডিচেরী থেকে ১৯২০ সনে বারীন্দ্রকুমারের নিকট শ্রীঅরবিন্দ যে পত্র লিখেছিলেন তা-তে (২৭ পৃষ্ঠায়) তিনি "ভূমি" সম্বন্ধে যা লিখেছিলেন তা নিম্নে দেওয়া গেলঃ "অন্নময় দেহ, প্রাণ, মন-বুদ্ধি, বিজ্ঞান, আনন্দ এই হলো এই পাঁচটি ভূমি। (ভূমির সংখ্যা আবার সাতও বলা হয়।) যতই উঁচুতে উঠি, মানুষের Spiritual evolution-এর (আধ্যাত্মিক বিকাশের) চরম সিদ্ধির অবস্থা ততই নিকট হয়ে আসে। বিজ্ঞানে উঠলে আনন্দে উঠা সহজ হয়ে যায়। অখণ্ড অনন্ত আনন্দের অবস্থায় স্থির প্রতিষ্ঠা হয়; শুধু ত্রিকালাতীত পরব্রহ্মে নয়-দেহে, জগতে, জীবনে। পূর্ণ সত্তা, পূর্ণ চৈতন্য, পূর্ণ আনন্দ বিকশিত হ'য়ে জীবনে মূর্ত হয়। এই চেষ্টাই আমার যোগ-পন্থার central clue (মূল কথা)।"

আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্যে সাধককে পরপর দেহ, প্রাণ, মন, বিজ্ঞান ও আনন্দের "ভূমি” অতিক্রম করতে হবে; এবং সেই চেষ্টাই তাঁর সাধনার 'central clue', একথা বলে শ্রীঅরবিন্দ বিষয়গুলির গুরুত্ব সম্বন্ধে তাঁর স্পষ্ট অভিমত জানিয়েছেন। কাজেই এই বিষয়গুলির আলোচনা মোটেই বাহুল্য নয়।

আর একটা কথা এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়। পূর্বে বলা হয়েছে আত্মার ভূমি (বা plane of existence)-গুলির সংখ্যা পাঁচ (আবার সাতও বলা হয়ে থাকে)। দেহ, প্রাণ, মন, বিজ্ঞান ও আনন্দ এই হলো পাঁচ ভূমির বা কোশের প্রচলিত হিসাব। আনন্দে উঠলে সচ্চিদানন্দের অপর দুই অংশ সৎ ও চিৎ-এ ওঠা সহজ হয়, সচ্চিদানন্দের অনুভূতি লাভ হয়। পূর্বোক্ত দেহ, প্রাণাদি পাঁচ ভূমির সঙ্গে সৎ ও চিৎ যোগ করলে ভূমির সংখ্যা সাত হয়। পূর্ণ আনন্দ, পূর্ণ সত্তা ও পূর্ণ চৈতন্য একই কথা।

'জীব স্বরূপত কী' এ প্রশ্নের উত্তর এখানেই শেষ করা গেল। তার বন্ধন কেন এবং বন্ধন থেকে মুক্তির উপায় কী তা-ও বলা হলো। জীবের পরিণাম কী সে-প্রসঙ্গে দেখানো হয়েছে যে শ্রীঅরবিন্দের মতে লয় বা ব্যক্তিত্বের বিনাশ জীবের পরিণাম নয়; এবং জীব-ব্রহ্মে উপাসক ও উপাস্য এই সম্পর্ক চিরদিন বিদ্যমান থাকে।

***

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

ব্যবস্থাগত অসম্পূর্ণতা নাকি নেতৃত্বের ব্যর্থতা?