অম্লান দত্ত: সমাজ ও সত্যের অন্বেষণ
অধ্যাপনায় যোগ দেয়া, গবেষণায় নয়
আমাদের ছাত্রাবস্থায় আমরা এমন অনেক শিক্ষককে পেয়েছি যারা গবেষণা-ডিগ্রি- দু তিনটি ইনক্রিমেন্ট এই দুর্ভাবনা না করে শিক্ষকতা করে যেতেন। নির্মলকুমার বসুকে দেখেছি। বন্ধুস্থানীয় শিবনারায়ণ রায়কে দেখেছি। তাই এম এ পাশ করার পর যখন বাবা জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কী করবে? ব্যারিষ্টারি পড়বে নাকি শিক্ষকতায় যাবে-আমি জানালাম, শিক্ষকতা করব এবং স্বাধীনভাবে থাকব। যে কারণে আমি প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াইনি, কারণ ওটি সরকারি কলেজ, সরকারি নিয়মে আমি থাকতে চাইনি। আমার তখনকার ইচ্ছা ছিল, শিক্ষকতা করব, তরুণ ছেলেমেয়েদের সঙ্গে থাকব, তাদের নবীন প্রাণ নবীন উদ্দীপনার দোসর হব এবং আমি স্বাধীনভাবে চিন্তা করব। জীবন নিয়ে অর্থনীতি নিয়ে সমাজ নিয়ে আমার ভাবনাগুলো মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিলই, আমি চেয়েছিলাম তাদের বুঝতে যুক্তি খুঁজতে এবং সেটা ভাষায় প্রকাশ করতে। এটাই আমি চাইতাম আর তাই করেছিলাম। গবেষণা সম্বন্ধে কোনোদিনই আমার পৃথক কোনো ভাবনা ছিল না। যে অর্থে কান্ট গবেষণা করেননি রবীন্দ্রনাথ করেননি গান্ধী করেননি- সেই অর্থেই গবেষণার প্রতি আমার কোনো আগ্রহ ছিল না। ডিগ্রি পাওয়া যাবে এমন গবেষণার দুটো কাজ দেখতাম-হয় পুরনো চিন্তাবিদের লেখাগুলো জড়ো করে একটা মিশেল দেয়া; নয়, একটা প্রশ্নমালা সাজিয়ে কোনো অঞ্চলে ফিল্ড ওয়ার্ক করে কিছু বলার চেষ্টা করা-দুটোতেই আমি নিরাসক্ত ছিলাম, তাই গবেষণায় না গিয়ে অধ্যাপনায় চলে আসি। স্বাধীনভাবে ভাবতে থাকি লিখতে থাকি।
বিদেশে শিক্ষকতা করা
বাবা জানতে চেয়েছিলেন-কী হতে চাও? ব্যারিষ্টার না শিক্ষক? যাই হতে চাও, বিদেশে তো যেতে হবে, সেটা আমিই পাঠাব।
তো, বাবাকে সেভাবে বলিনি, আমি কয়েকটা বিষয়ে ততদিনে স্বচ্ছ ও দৃঢ় হয়ে গেছি, যেমন এই বিদেশে যাবার ব্যাপার- আমি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম যে, বাবার পয়সায় বিদেশ যাব না। দুই, বিদেশে আমি তখনি যাব যখন আমার বলার মতো কিছু তৈরি হবে, ছাত্র হয়ে আমি কোনোদিন বিদেশে যাব না। শিখতে যাব শেখাতে যাব। বিদেশে যাবার অনাগ্রহ আমার ছিল না। পৃথিবীকে দেখা বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে মেশার আমার খুবই ঝোঁক। কিন্তু, বাবার পয়সায় যাব না, ছাত্র হয়ে যাব না, নিজের বলার মতো ঝোঁক এলে তবেই যাব-এই তিনটে ব্যাপারে আমি দৃঢ় ছিলাম। আর সেভাবেই আমি বিদেশে গেছি, পড়িয়েছি, শিখেওছি।
স্বপ্ন- সেদিন, আজ:
আমি যে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছি যার প্রথম প্রকাশ ঘটিয়েছিলাম আমার প্রথম বই For Democracy-১৯৫৩ সালে- তার সঙ্গে আজকের তেমন কিছু ফারাক তুমি খুঁজে পাবে না। রাষ্ট্রবিপ্লব নয়, সমাজবিপ্লব হচ্ছে যথার্থ পথ; রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে ঐ দখল যাতে হাতছাড়া না হয়ে যায় সেই দিকে ঝোঁক থাকবে, সমাজবিপ্লব কি মানবমুক্তির কাজ ঘটবে না- এটা আমার পরিষ্কার ছিল, আজ তেমনি আছে। তবে এখন কয়েকটা গুণগত পরিবর্তন হয়েছে ভোগবাদী জীবনযাত্রা এবং যন্ত্র সভ্যতার অগ্রগতির ফলে যা তখন দৃশ্য ছিল না- যেমন, পরিবেশ দূষণ কি মানবজীবনের একাকিত্ব (আমার তো এটা অদ্ভুত প্যারাডক্সিক্যাল মনে হয়েছে যে, একদিকে আমরা যোগাযোগ ব্যবস্থায় এতই দক্ষ হয়ে উঠেছি যে, পৃথিবীর যে কোনো কোণে বসে সেটিকে কেন্দ্র করে সারা বিশ্বের সঙ্গে মত বিনিময় করতে পারি এবং একই সময়ে আমরা ভীষণভাবে একা হয়ে যাচ্ছি, একাকিত্ব আমাদের ছেয়ে ধরেছে)- এগুলো আমার ভাবনায় পরে পরে এসেছে।
আমার বিপ্লব শিক্ষার শিক্ষক মার্কস নন, গান্ধী এবং রবীন্দ্রনাথ। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি এই ভেবে যে, যে দেশে ওঁরা জন্মেছেন কাজ করেছেন সে দেশে আমিও জন্মেছি। তো, ওঁদের ভাবনামতোই আমি সমাজবিপ্লবকে ভেবেছি। আজ সারা বিশ্বে সমাজবিপ্লবের যে ভাবনা বা কাজ হচ্ছে তার রূপরেখা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে তা ওঁদের পথেই ঘটেছে-নামে হোক বা না হোক, নামে কিছুই আসে যায় না-ফলে বিপ্লবের ধারণা আমার পাল্টায়নি, নতুন নতুন দৃষ্টান্ত যোগ হচ্ছে। এই যা তফাত।
গান্ধী-রবীন্দ্রনাথ:
একমাত্র চিন্তাবিদ, বিশ্বে একজন চিন্তাবিদকেই দেখেছি যিনি ভেবেছেন, জটিলতম ভাবনাকে সহজ করে বুঝতে চেয়েছেন এবং মাঠে নেমে কাজ করেছেন। তিনি গান্ধী। এভাবে ওপরে নিচে অনায়াসে বিচরণ করতে আমরা আর কারোকে দেখিনি শুনিনি। রবীন্দ্রনাথের মূল্য অন্যভাবে। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া একজনও কবির কথা শুনিনি, যিনি সুরুলের গ্রামে কোঅপারেটিভ করার পরীক্ষা করছেন, চাষ নিয়ে ভাবছেন, মেঠো শিক্ষার জন্য শ্রীনিকেতন গড়ছেন আবার আইনস্টাইনদের সঙ্গে বৈদগ্ধ রক্ষা করে চলেছেন। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বিশ্বে আর কোনো কবি এতটা বিছিয়ে কাজ করতে পারেননি।
এই দুজনের দেশে জন্মেছি, শৈশব থেকে এঁদের লেখাপত্র পড়েছি-আমি ধন্য।
আমার কাজ:
আমি মনে করি, দৃঢ়ভাবে মনে করি, সে সেই কাজটাই করবে যে কাজটা সে ভালোভাবে করতে পারবে। আমি শিক্ষকতা করেছি। শিক্ষকতার মধ্যে আমি কাজ করতে চেয়েছি। আমি যদি চিকিৎসক হতাম তাহলে অন্যভাবে সমাজের সেবা করতে চাইতাম। তা হয়নি, আমি হয়েছি শিক্ষক, এবং সমাজ ও মানুষ সম্বন্ধে আমার ভাবনা ছিল, সেটা নিয়ে আমি বলতে চেয়েছি লিখতে চেয়েছি। এটাই আমি পারি আর তাই আমি করেছি। এখনো করছি। এর চেয়ে বিস্তৃত, তোমরা যাকে বলছ, মাঠে নেমে কাজ করা, তেমন কাজ করার কথা আমি ভাবিনি, করিওনি। আমি কি করতে পারি, না পারি তা আমার চেয়ে ভালো আর কেউ কি জানবেন-আমি জেনেছি বুঝেছি এবং যেটা করা সম্ভব মনে হয়েছে তাই করেছি। অনেককেই বলতে শুনেছি, অম্লান দত্ত সমাজবিপ্লব নিয়ে নানা কথা বলেছেন তো তিনি কি করেছেন! আমার খুব অদ্ভুত লাগে এই প্রশ্ন। বাবা আমটে পান্নালাল দাশগুপ্তেরা যা করেছেন সেটা আমি নিজে করিনি এই জন্যে আমি বলতেও পারব না যে ওটা একটা কাজ-এ কেমন কথা। তাহলে তো মার্কসও বাতিল হয়ে যাবেন, তিনি যে কোনোদিনই 'মাঠে' নামেননি। আমার কাজ- সমাজবিপ্লবের কথা বলা, ভাবা, যেটা অশুভ তাকে কিভাবে কেউ কেউ কাটিয়ে উঠছেন, কিভাবে তা কাটানো যাবে-এটা নিয়ে বলা ভাবা লেখাটাই আমার কাজ, আর সেটা আমি করে যাচ্ছি।
বিশ্বায়ন ও পল্লী সংগঠন:
বৃহৎ শিল্প, রাষ্ট্র, রাষ্ট্র কাঠামো, বিশ্ব বাজার ও বাণিজ্য- এরা থাকবে, বহুদিন থাকবে, অন্তত এখনো এদের অবসানের ন্যূনতম ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না। এরা থাকবে এবং এদের সুবিধে মতো এরা সরকারকে প্রভাবিত করবে। তাদের দখলদারি বজায় রাখতে যুদ্ধ ব্যবসা থাকবে এবং মাস প্রডাকশনের উপভোক্তা হিসেবে জনসাধারণের মধ্যে ভোগবাদকে ছড়িয়ে দেবার যথাসম্ভব চাপ তারা দেবে, দিচ্ছেও। আমি দেখেছি, এই প্রাবল্যে তারা নিত্য নতুন সমস্যা তৈরি করুক কি সমাধান করুক, যাই করুক না কেন, সমাজমুক্তির সমস্যাটা তারা সমাধান করতে পারছে না। অর্থনীতিবিদরা এসময় একটা মজার সমীকরণ টানেন যে, ফ্রিডম অফ চয়েসই মুখ্য লক্ষ্য। সেটা কী? সেটা হচ্ছে, আমি বাজারে যাচ্ছি, থরে থরে সাবান সাজানো রয়েছে, আমি আমার ইচ্ছেমতো সাবানটা কিনলাম- এটাই আমার মুক্ত অবস্থা। ভালো কথা। কিন্তু বাজারে গিয়ে কি তুমি এইভাবে ভালোবাসা কিনবে? মনের মানুষ কিনবে? সংগীতপ্রেম কিনবে? সাহিত্যের আনন্দ কিনবে?
আসলে বিশ্বায়ন বিশ্ববাজার- ওটা একটা ধারা; আর পল্লীসমাজ গড়া, সেই সমাজোন্নয়নে অংশ নেয়া-এটা আরেক ধারা। তুমি যদি মনে কর এই সমাজ উন্নয়নটাই বড় কথা তো তুমি কাজ কর, যেভাবে সম্ভব বলে মনে করছ সেভাবে কর, যখন ওটাই তোমার কাছে বড় কাজ বলে মনে হয় তখন বিশ্বায়ন ব্যাপারটা তোমার কাজের পরিপ্রেক্ষিতেই ভাব। যখনি বলা হচ্ছে যে, বিশ্বায়ন বিশ্বকে শেষ করে ফেলছে, তখনি এই কথা বেরিয়ে আসে- আমরা কি শেষটা চাইছি। যদি বলি না চাইছি না, তাহলে যেটা শেষের পথ নয় সেটা ধরে যাওয়া যাক। এই চলায় যদি বাধা আসে, মোকাবিলা কর। অস্ত্র তো গান্ধী দিয়ে গেছেন- যা তোমার কাছে সত্য বলে মনে হচ্ছে তাকে আঁকড়ে ধর, যথাসাধ্য অহিংসপূর্ণ পথে তাকে প্রতিষ্ঠা করতে থাক, না যদি পার তাহলে হিংসার পথ নাও কিন্তু দুটো শর্ত যেন অটুট থাকে-সত্যকে ত্যাগ করবে না, অন্যায়কে মেনে নেবে না এবং সামনাসামনি প্রতিরোধ করবে। তাই বিশ্বায়ন বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে আসছে, এটা আর যাই করুক তোমার সত্যকে তো ঘা দিতে পারবে না, তোমার কাছে যেটা ঠিক সেটা যদি ঠিক থাকে, তাকে কৌশলের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা কর।
এটা ঠিক যে, একটা কম্প্রোমাইসে থাকতে হয়। তোমার জীবিকা ও জীবন এক ছন্দে না মিলতেও পারে। সেক্ষেত্রে কম্প্রোমাইস করতে হয়। তাই বলে কিন্তু অন্যায়কে মেনে নেবার কথা বলছি না। বিশ্বায়ন না পল্লীসমাজ-বিশ্বায়ন কি পল্লীসমাজকে গিলে খাবে- এসব প্রশ্নের উত্তর একটাই-যাকে সত্য ভাবছি সেটা করতে থাকা।
আবেগ ও যুক্তি:
প্রতি প্রজন্মেই আবেগি কিছু ছেলেমেয়ে থাকে, চলে আসে। কেন আসে সেটার কথা তুললে মনে হয়, না আসাটাই তো অস্বাভাবিক। মানুষ মানুষকে ভালোবাসবে বুঝবে দয়াবান হবে এটাই স্বাভাবিক। সেটা যে হারিয়ে যায় তার একটা কারণ হলো, ভোগ। আবার ওখানে একটা বিরাট মজা রয়েছে। ভোগী দেশের ছেলেমেয়েরা এখন বিরক্ত হয়ে উঠছে, ভালোবাসা তো কিনতে পারছে না অথচ সমৃদ্ধির চূড়ায় বসে রয়েছে। বহু ছেলেমেয়েকে দেখেছি, আমেরিকাতেই, কমিউনিটি গড়ে তুলছে, কিছু না হলে দল বেঁধে হরে কৃষ্ণ হরে রাম করছে। পার্থিব যা যা ভোগ করবার সবটা তাদের নাগালে চলে এসেছে, এবার তাদের নতুন কী পাবার ইচ্ছে হবে? আমি প্রথম বিশ্ব দ্বিতীয় বিশ্ব বা তৃতীয় বিশ্ব এভাবে দেখি না- গান্ধী শিখেছেন থোরো রাস্কিন টলস্টয় থেকে, আবার মার্টিন লুথার জুনিয়র নেলসন ম্যান্ডেলা গান্ধীর থেকে শিখেছেন-চিন্তার এই যাতায়াত সারা বিশ্ব জুড়ে হয়ে চলেছে। আমি যেখানেই থাকি না, চিন্তা আমাকে স্পর্শ করবেই। সেটা বিশ্বের মধ্যে থেকে ঘটছে, প্রথম কি দ্বিতীয় কি তৃতীয়, এভাবে নয়। তো সেই ভাবনা, নতুন কিছু করার আবেগ চিরকাল আছে, থাকবেও। আবেগী প্রাণেরা বিপদ জেনে ঝাঁপ দিয়েছে, দেবেও। যুক্তির প্রসঙ্গটা হলো বুঝে নেয়া- যা আজ ছোট কিন্তু কাল বড় হতে পারার সম্ভাবনা রয়েছে তাকে যদি তোমার সঠিক মনে হয় তো যুক্তি দিয়ে বিবেচনা কর। কাজটা আজ ছোট হলেও কি কি পদক্ষেপ নিলে কাল তা ছড়িয়ে পড়বে, কি, যে যে পথে চললে তাতে ভাঙন অবধারিত তাদের এড়িয়ে চলা- এটাই যুক্তি দিয়ে বুঝতে হবে।
সাহস:
এমনটা নয় যে আমি সাহসী হবার চেষ্টা করেছি। ধাপে ধাপে সাহসী হয়ে উঠেছি, তাও নয়। দু একটা ব্যাপার খুব ছোট বয়স থেকেই আমার মধ্যে হয়ে গেছে, আমি যুক্তি দিয়ে বলতেও পারব না কেন তা হয়েছে, তবে সেটা যে হয়েছে তা বলাই যায়, তাদের নিয়ে চলতে চলতে, তোমরা যাকে বলছ সাহসী হওয়া- তাই হয়ে গেছে। একটা ব্যাপার হলো, আমি দেখেছি মানুষ মৃত্যুকে ভয় করে থাকে, কিন্তু আমার কাছে মৃত্যু কখনো ভয়ের হয়ে ওঠেনি। কেন-তা আমি ব্যাখ্যা করতে পারব না, হয়তো এটা মানসিক গঠনের ব্যাপারই হবে। আমি যে সাহসী তা নয়, আমি একদিক থেকে ভীতুও, কয়েক ক্ষেত্রে তো মনে হয়ই যে অনেকের মনের জোর আমার থেকে অনেক বেশি। যেমন আমি অন্যের ব্যথা যন্ত্রণা সহ্য করতে পারি না, দৌড়ে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। একটা ঘটনা বলি-কলেজে তখন নিচু ক্লাসে পড়ি, পায়ে একটা অপারেশন হবে, কলকাতায় আমি একা থাকতাম, বাবা-মা ও বাংলায় থাকতেন; তো একা একাই হাসপাতালে গেছি, চারদিক দেখছি। অন্যেরা যন্ত্রণায় চিৎকার করছে এটা সহ্য করতে পারছিলাম না, আমি চাইছিলাম আমার অপারেশনটা আগে হয়ে যাক আমি বাড়ি চলে যাই। এখানে দেখ, আমার ওপর কি কাটাছেঁড়া হবে সেটায় ভয় পাচ্ছি না অথচ অন্যের ব্যথা আমি সহ্য করতে পারছি না-আমি লিখেওছিলাম, ভালো সার্জন হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তো এটাকে কি বলা যাবে যে, আমি যথেষ্ট সাহসী? মৃত্যু হলো যাবতীয় সুখ দুঃখের অবসান, তাই তাকে ভয় পাবার দুর্ভাবনা আমার আজো নেই। সাহসের কথাটা ওঠে, যখন থেকে আমি স্বাধীন মত প্রকাশ করতে লাগলাম, সর্বোপরি তিনটে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য সহ-উপাচার্য থাকার সময়ে কিছু ছেলে আমাকে শ্রেণীশত্রু ঠাউরে 'মেরে ফেলব' 'পুড়িয়ে মারব' এমন হুংকার করত। সেখানে ঠিক সাহস নয়, মরার ভয়টা পেতাম না বলেই ও ধরনের পরিস্থিতিতে আমি ভয় পাইনি। অনেকবার ঘেরাও হয়েছি, অন্যকে ঘেরাও করেছে তার মধ্যে ঢুকে পড়েছি, অনেক শুভাকাঙ্খী সাবধানও করে দিতেন-একা একা ঐ ঐ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন, দুর্বৃত্ত ছাত্রেরা ওত পেতে বসে আছে, মারতে এলে কি করবেন- আমি এতে মজা পেতাম। আমার এমন একটা ভাবনাও কষা হয়ে গেছিল যে, যদি কেউ আমাকে খুন করতে আসে তাহলে তাকে বলব যে, ভালো ভালো বসো, একটু কথাবার্তা বলা যাক তোমার সঙ্গে, দেখ আমায় মারলে আমার তো কোনো ক্ষতিই নেই, কিন্তু তোমার যে ভাই বিপদ আসবে সেটা কি করে সামাল দেবে। ধর, তোমার পেছনে পুলিশ লাগবে, তাকে ঠেকাবে কি করে, তারপর ধর তোমার তো মন আছে, আজ না হোক কাল কি পরশু মনের মধ্যে দুশ্চিন্তা আসবেই, একটা মানুষকে মেরে ফেলেছ এটা ভেবে কষ্ট হবে- তো দেখ, তোমার ভালো থাকার জন্যে কষ্ট কমাবার জন্য আমি কি কি করে যেতে পারি....!
আসলে, যুক্তি দিয়ে বুঝতে পারি মানুষ যন্ত্রণাকে ভয় পেতে পারে, কিন্তু মৃত্যুকে ভয় পাওয়াটা ঠিক বুদ্ধিগ্রাহ্য নয়। আমার কাছে এটা স্বাভাবিকভাবে আসেনা ক্যানসার হলো, আরো কিছুদিন বাঁচার জন্যে যন্ত্রণা সহ্য করা-এটা আমার অস্বাভাবিকই লাগে, তুলনায় মৃত্যু সব দুঃখকষ্টের অবসান বলে ভালোই।
আমার ধারণা যতক্ষণ বেঁচে আছি সমাজের জন্য ভাবা কি কাজ করা দরকার, যখন তা পারব না তখন কোন অধিকারে সমাজের অন্ন ধ্বংস করব, যতক্ষণ বাঁচছি সমাজ থেকে নিচ্ছি, তো কেবলি নিয়ে যাব কিছু দিতে পারব না-এটা ভাবলেই খারাপ লাগে। আবার এও ঠিক আমি চাইলেই যে মারা যাব তাও নয়, যদি সেরকম অনায়াস মৃত্যুর পথ কেউ বলে দিতে পারেন তিনি আমার প্রকৃত বন্ধুর কাজই করবেন।
ধর্মবিশ্বাস:
মূল ভাবনা হলো মোক্ষ নিয়ে, আমি মুক্তির কথাই ভেবে এসেছি। মোক্ষ চিন্তায় ঈশ্বরের অস্তিত্ব অনস্তিত্ব নিয়ে ভাবার কোনো প্রয়োজন পড়েনি। অনেক সময় অনেকে প্রশ্ন করেছেন, আপনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন কি? প্রত্যুত্তরে আমার তাদের থেকে জানতে ইচ্ছে হয়, ঈশ্বর বলতে আপনারা ঠিক কি বলতে চাইছেন সেটা বুঝিয়ে বলুন, তাহলে সেটা মানা না মানার কথা বলা যাবে। পাশ্চাত্যে ধর্মচিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে ঈশ্বর থাকেন, কিন্তু ভারতীয় ধর্মভাবনায়, অনেক সময়ই দেখা যায়, ঈশ্বর আছেন কিনা সেটা মুখ্য হয়ে ওঠেনি, মোক্ষই প্রধান প্রশ্ন। এটা বৌদ্ধ দর্শনে এসেছে জৈন দর্শনে এসেছে। পাশ্চাত্যে দ্যকার্তই অন্যভাবে ভাবা শুরু করেছিলেন, দ্যকার্তে জানতে চেয়েছিলেন নিশ্চিতভাবে কোনটা ধরে নিতে পারি যে তা আছে-দ্যকার্ত দেখেছিলেন, সন্দেহ আছে, চিন্তা আছে। অন্যদিকে, বুদ্ধ বলছেন, দুঃখ আছে। ওটাই প্রথম প্রশ্ন। দুঃখ আছে, দুঃখের কারণ আছে, কারণটি খোঁজা যায় এবং সর্বোপরি, পথ আছে। মোক্ষ সম্ভব।
এটা আমারো ভাবনা। আমি যে বুদ্ধ পড়ে এমন ধারণায় এসেছি তা কিন্তু নয়। সতেরো আঠারো বছর বয়সে আমার মনে প্রশ্ন এসেছিল যে, আমাকে জানতে হবে জীবনে সত্যি মূল্যবান কি আছে। জীবনে মূল্যবান অনেক কিছুই রয়েছে কিন্তু তাদের মূল্য অন্যের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। সত্যি মূল্যবান তাই যা নিজেই মূল্যবান যা অন্যের ওপর নির্ভর করে না। এটা কি- তাই হয়েছিল আমার ভাবনা, কারণ এটি না জানলে আমি তো বুঝতেই পারছিলাম না কি জন্যে আমার বেঁচে থাকা প্রয়োজন। আর এ প্রশ্নের উত্তর যে বই পড়ে পাব না তা বুঝে গিয়েছিলাম, এর উত্তর আমাকে পেতে হবে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে, নিজস্ব অনুভব থেকে। বই পড়ে জানব কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে যা জানব তাতে জানাটা আরো গভীরে পৌঁছে যাবে, যাকে বলা হয় প্রত্যয় বাড়বে; এটা বই পড়ে আসে না। এটাই খুঁজছিলাম। ভাবছিলাম। ভাবতে ভাবতে মনে হলো, আলোবাসার অভিজ্ঞতাই হচ্ছে সেই মূল্যবান যার মূল্য কারোর ওপর নির্ভর করে না। এই ভালোবাসা একজন মানুষের প্রতি হতে পারে, সমাজের প্রতি হতে পারে। সূর্য রোজই ওঠে, কিন্তু এমন একটা সময় আসে এমন একটা পরিস্থিতি আসে 'যখন সূর্যোদয় অতি মধুর হয়ে ওঠে। ঐ মধুরতা ঐ সময়টার জন্যই ঐ মুহূর্তের জন্যই। এবং ঐ সময় ঐ মুহূর্ত একটা দৃষ্টিভঙ্গির ওপরই দাঁড়িয়ে রয়েছে, তখন যা দেখছি সবই সুন্দর হয়ে উঠছে যা শুনছি সবই সুন্দর হয়ে উঠছে। এরপর যা আসে তা হলো, যা আমার জন্য অন্য-নিরপেক্ষভাবে মূল্যবান তা সকলের জন্য মূল্যবান। সমাজ সম্বন্ধে ঐ ধারণাই পাই যাতে সমাজে সবাই আনন্দে থাকবে সুখে থাকবে। আর এরই উল্টোদিকে যে সমস্যাটা রয়েছে তা হলো, কোন্ ভালোবাসা মূল্যবান সেটি বিচার করা। বিচার করলে দেখতে পাই, যে ভালোবাসা ঠিক তার বিপরীত ধর্মটা তৈরি করতে পারে না, অর্থাৎ কিনা, ঈর্ষার জন্ম দিতে পারে না সেটাই প্রকৃত মূল্যবান। যা সেল্ফ সাসটেইনিং সেটাই মূল্যবান। মানবজীবনের গভীরতম ট্রাজেডি বোধহয় এও যে ভালোবাসা দাবি করতে থাকে, আঁকড়ে ধরতে থাকে, ঈর্ষা আনতে থাকে। এ নিয়ে একটু পরে ভাবব। আমার ধর্মবিশ্বাসের প্রশ্ন যদি ওঠে তাহলে বলব, ঐ স্বকীয় মূল্যবান ভালোবাসা খোঁজাটাই আমার ধর্ম এবং তার প্রতি আস্থাশীল থাকাটাই আমার বিশ্বাস।
হতাশা:
এমন নিশ্চিতি আমার নেই যে, মানুষ শেষ পর্যন্ত এই ভালোবাসাকেই মূল্য দেবে। হয়তো এটাই আমার হতাশার জায়গা দুশ্চিন্তার জায়গা। ভালোবাসার প্রবৃত্তি এতই প্রবল যে, যাকে ভালোবাসছি যা ভালোবাসছি তা না পেলে মানুষ ধ্বংস করতে পিছপা হয় না। এর ফলে সমাজে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। আর তাই হচ্ছেও। এটাই দুশ্চিন্তার। মানুষ যেমন ভালোবাসতে পারে তেমনি না ভালোবাসতে পারলে শেষ করে দিতে পারে, প্রবৃত্তিতে এই হিংসার ভাবটি লক্ষ করে দেখলাম, অহিংসার কথা বাইরের জীবনে বলা কি করাটাই তো যথেষ্ট নয়, ভালোবাসার মন থেকেই যে হিংসা উঠে আসছে তার থেকেও তো উঠে আসতে হবে- ভেতরে বাইরে এই নিরন্তর সংগ্রাম মানুষ করবে কি করে এটাই ভাবনার। আমি ডেথ উইশ নিয়ে চিন্তা করছি না, যা ভালোবাসতে পারছি না তাকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার মনোবৃত্তি আমাকে আঘাত করছে। এখান থেকে তৃতীয় একটা পথ বার হয়ে আসে, যা হলো, উপেক্ষা করা। কিন্তু এটাও কতটা কষ্টকর দেখ, সবই যদি উপেক্ষা করতে থাকি সবাইকে যদি উপেক্ষা করতে থাকি, তাহলে একজন যে নিজের থেকে নিঃস্ব হয়ে যাবে, তখন কী নিয়ে বাঁচবে মানুষ? আমার দুশ্চিন্তা এটাই। একে পাশোনাল টার্মসে বলা যায় যে, আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করছি মানুষকে এসব বলার, যত জায়গায় আমাকে বলতে বলা হয়, যত বিচিত্র বিষয়ে কথা বলি না কেন, আমি চেয়েছি এই মূল কথাটা মূল দুশ্চিন্তাটা শ্রোতৃবন্ধুদের বলতে; তবু মনে হয় শ্রোতা কি পাঠকের মনে হয়তো বা এটা পৌঁছায়নি। আসলে কেউ নিজে যদি না ভাবে তার মধ্যে যদি জিজ্ঞাসা না জন্মায় তাহলে হয়তো বাইরে থেকে পৌঁছনো যায়ও না।
এটাই অন্য রকমভাবে বলা যায় যে, সমাজের রীতিনীতির সঙ্গে আমার ভাবনার অনেক প্রভেদ আছে, সমাজ যা আচারবিচার মানতে বলবে, আমি তাকে মানব কি মানব না সেটা আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা দিয়ে বিচার করে ঠিক করব। এটা স্বেচ্ছাচার নয় এটা স্বাধীনতা; এতে আমি অন্যকে খাটো করছি না অন্যের দাপটে গা ভাসিয়েও দিচ্ছি না, আমি ভালোবাসার স্বকীয় মূল্যে আস্থা রেখে আনন্দ পেতে চাইছি।
হয়তো অনেকটাই বলা হয়ে যাবে যদি এই উদাহরণটি দিই যে, প্রেসিডেন্সি কলেজে ছাত্র থাকার সময় বন্ধুদের নিয়ে অধ্যাপক সুশোভন সরকারের পৌরোহিত্যে একটা বিতর্ক সভার আয়োজন করি, বিষয় ছিল: বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটি কি প্রয়োজন? তখন থেকেই আমার মনে ধারণা ছিল, স্বকীয় মূল্যবান ভালোবাসাটাই মুখ্য, বিবাহের বাদবাকি সব স্টাম্প-নিয়ম-কানুন বৈষয়িক জমিবাড়ি কেনাবেচারই নামান্তর অথবা সমার্থক। প্রথমটা যদি না থাকে, তাহলে ঐ ভালোবাসাই আহত হয়ে একে অন্যকে গিলে খাবার চেষ্টা করতে থাকে, তখন থেকে যায় পশে সিভনেস, ক্ষমতা সম্পত্তির (মনেরও) দখলদারি।
র্যাডিকাল ভাবনা:
এমন নয় যে আমি আশাবাদী। আমি আশা কি নিরাশা এভাবে বাঁচি না, এভাবে ভাবিও না; আমি কাজ নির্বাচন করা এবং কাজ করা এটাই ভাবি। এমনটা কখনোই নয় যে, বিশ্বসংসারের দুর্ভাবনা নিয়ে আমি বিভোর হয়ে আছি আমার ভাবনার র্যাডিকাল ব্যাপার যদি কিছু থাকে তা হলো, এটা খোঁজা যে কোন উপলব্ধিটা স্বকীয় মূল্য নিয়ে আছে ও তাকে নিজের জীবন এবং সমাজজীবনে ব্যবহার করা। এটা একদিক থেকে যুক্তির বাইরে, সোজাসুজি অনুভূতি দিয়ে পাই তাও ঠিক, তবে যুক্তি এর বিরোধী নয়, এও যুক্তিবিরোধী নয়-অন্য-মূল্য-নিরপেক্ষ এই উপলব্ধিটা নিয়ে নিজের কাজ নির্বাচন করা। ব্যাপারটা এটুকুই। আমি যতটা পারতে পারি, যতটা পারব বলে আমার প্রত্যয় জন্মেছে ততটাই করব। এখানে আশা-নিরাশার ব্যাপার নেই, নিজে যা করতে পারি তা করার চেষ্টা শুধু থাকছে।
ব্যক্তিত্ব ও সমাজভাবনা-আমার জীবনে:
মানুষের জীবনে এ এক বিস্ময়কর বৈপরীত্য যে, মন সঙ্গী চায় আবার সঙ্গী পেলে মন চায় নিঃসঙ্গতা! আসলে এক মনের সব চিন্তা উপলব্ধি অন্য মনে পৌঁছে দেয়া যায় না, অন্য মন যতটা চায় ততটাই যায়। যতটা যায় না তাই নিয়ে বাধে বিপদ কাকে সে দেবে তারপর? তাই, সমাজ ছাড়া ব্যক্তি তার ব্যক্তিত্ব গড়েই তুলতে পারে না আবার একই নিয়মে ব্যক্তি যে তার সবটা জমা রাখবে তাও নয়-আমাকে যে বাঁধবে ধরে এই হবে যার সাধন সে কি অমনি হবে! এই সবার সঙ্গে মেলা, পুনরায় নিজের কাছে ফিরে যাবার খেলা, এ নিরন্তর চলছে। আমি মনে করি এটা ভালোই, এটা সমাজ ও ব্যক্তি উভয়কেই বলিষ্ঠ করছে। মেলা ও ফেরা- উভয়েই প্রশ্ন তুলছে, ভাবাচ্ছে, ভাবনা সদর্থে মোড় নিলে উভয়েরই মঙ্গল। অন্যের সঙ্গে মেলার প্রবণতা যে কি প্রবল তা টের পাওয়া যাবে কিছুদিন একা থাকলে কি কিছুদিন নিঃসঙ্গ অবস্থায় কাটালে, স্বভাবত আমরা সে অবস্থায় কাটাই না বলে বুঝতে পারি না, -এ একটা যন্ত্রণা। আবার সম্পূর্ণভাবে একজনের সঙ্গে মনের মিলও সম্ভব নয়- তখন আরেক যন্ত্রণা। এই ফান্ডামেন্টাল ডিলেমার মধ্যেই একজন ব্যক্তির নিজস্বতা এবং সমাজমনস্কতা। আবার সেই কথাই উঠবে- কি পারব তাতে নিশ্চিতি এনে কাজ করা।
সত্য ও আনন্দ:
ব্যবহারিক স্বার্থে মানুষ একধরনের সম্পর্ক তৈরি করে, অন্য মানুষের সঙ্গে, বিশ্ব প্রকৃতির সঙ্গেও। আর এই কাজটা করবার জন্য প্রকৃতি কতকগুলো অস্ত্র মানুষের হাতে তুলে দিয়েছে যাদের প্রবৃত্তি বলা যায়। যেমন আবেগ, এটা একটা অস্ত্র। এই অস্ত্রের রকমফের হলো ভয় হিংসা লোভ আত্মরক্ষা ইত্যাদি। এই অস্ত্রগুলো মানুষ ব্যবহারিক স্বার্থে প্রয়োগ করে। একটা বিপদের আভাস পেলাম, ভয় পেয়ে পালিয়ে যেতে পারি আবার রেগে গিয়ে মারতেও পারি। যেমন যেমন প্রয়োজন তেমন তেমন ভাবে অস্ত্রের ব্যবহার করা যায়। কিন্তু এতে একটা অসুবিধে হলো এই যে, এই অস্ত্রগুলো বেশি বেশি ব্যবহৃত হয়েও থাকে, তাতে ব্যাপারটা, ইংরাজিতে যাকে বলে, কাউন্টার-প্রডাকটিভ হয়ে যায়। বেশি ভয় পেতে পেতে পঙ্গু হয়ে যেতে পারি, হিংসার দ্বারা অভিভূত হতে হতে বুদ্ধি লোপ পেয়ে যেতে পারে-আতিশয্য তখন আত্মস্বার্থরক্ষার চেয়ে আত্মধ্বংসের কারণ হয়ে যায়।
একদিকে আত্মস্বার্থ রক্ষা আরেকদিকে আত্মধ্বংস-দেখা যাচ্ছে, এই দীর্ঘ জায়গার মধ্যে কাজ করছে প্রবৃত্তি। সে সীমার মধ্যে থেকে কাজ করলে আত্মস্বার্থ রক্ষার কাজ হতে থাকে, সীমা পার হয়ে গেলে আত্মধ্বংস ডেকে আনে। এখানে প্রশ্ন উঠেছিল, সীমানাটি কে নির্ধারণ করবে বা করতে পারে? উত্তর হয়েছিল, যুক্তি, reason, হলো রথের চালক; যে রথের ঘোড়াগুলি হচ্ছে কামনা বাসনা, passion, desire ইত্যাদি।
মানুষ যুক্তি দিয়ে বিচার করে নেবে কতটা অব্দি প্রবৃত্তির অস্ত্র ব্যবহার করে আত্মস্বার্থে তৃপ্ত হওয়া যায় এবং কখন সেই সীমা লঙ্ঘন করলে নিজেকেই শেষ করে ফেলা যায়।
তাহলে দেখতে পাচ্ছি, যুক্তিও কাজ করছে স্বার্থবর্ধনের ওপর। ব্যবহারিক প্রয়োজনেই এই যুক্তির জন্ম। সে মানুষকে সাবধান করে দেয়, এই সীমার মধ্যে থাক, তার বাইরে যেয়ো না তাহলে তুমিই তোমার ক্ষতি করে ফেলবে। এই যুক্তিকেই বিজ্ঞানের শাখায় পরিচিত করানো হয় প্রযুক্তি হিসেবে এবং প্রযুক্তি যেমন ব্যবহারিক প্রয়োজন অপ্রয়োজন, তাদের প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি শেখায়, তেমনি আরেকটি বিষয় মানুষকে চেনাতে থাকে, যা হলো শুদ্ধ বিজ্ঞান। যেখানে ব্যবহারিক পাওয়া না পাওয়া ব্যক্তিগত পাওয়া না পাওয়া এবার মুখ্য হয়ে ওঠে না, বরং তাদের ছাপিয়ে চলে যায়, চলে যায় মহাবিশ্বে, সহজ কথায়, সে মহাবিশ্বে সামঞ্জস্য খুঁজতে যায় আবিষ্কার করতে যায়। এই খোঁজা চলে সাংসারিক স্বার্থ মাথায় না এনেই, আখেরে কি আসবে তা না ভেবেই। খুঁজতে খুঁজতেই এমন উত্তরণ ঘটে এবং এই বোধটা মানুষের অনুভূতিকে আরেকভাবে তৃপ্ত করে। এই তৃপ্তি ব্যবহারিক কিছু পাওয়ার থেকে স্বভাবতই আলাদা, এবং এই যে উপলব্ধি একেই কেউ কেউ চিহ্নিত করেন 'শুদ্ধ বিজ্ঞানের আনন্দ' বলে।
এই আনন্দিত মন যে সত্যকে পায়, সেই সত্য ব্যবহারিক স্বার্থতৃপ্তির সত্যতা থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে এবং এই যে মহাবিশ্বে সামঞ্জস্য খোঁজার মন, এই মন, দেখা যাবে, চেতনাকে মুক্তি দিয়ে ফেলছে। কিভাবে? অনেকটা এইভাবে যে, মহাবিশ্বের সামঞ্জস্য তার মনের সঙ্গে বিশ্বমননের ছন্দোগত মিলন এনে দিচ্ছে। যে মন ব্যবহারিক স্বার্থবুদ্ধিতে উত্তেজনায় ঘৃণায় লোভে আচ্ছন্ন হয়েছিল, সে মন ছড়িয়ে যাচ্ছে-অধরা মাধুরী পড়েছি ছন্দোবন্ধনে....।
প্রবৃত্তিজনিত যে আবেগ মনকে অধিকার করে থাকে সে বন্ধনের অবস্থা, হয় তাকে একটা কিছু পেতে হবে নয়, তাকে একটা কিছু ধ্বংস করতে হবে- এমন অন্যের ওপর নির্ভরশীল এই বন্ধন। সেই আবেগ যখন শিল্পের মধ্যে দিয়ে ছন্দের মধ্যে দিয়ে তালের মধ্যে দিয়ে জৈববৃত্তি ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছে, অহৈতুকী আনন্দে মনকে বিভোর করে দিচ্ছে তখন যে সৃষ্টি হয় তখন যে লেখা হয়, যেমন, শুধু অকারণ পুলকে, কি নৃত্যের তালে তালে, কি বিশ্ববীণারবে- এই যে শব্দের ব্যবহার একি শুধুই শব্দ? অনুভবের যেখানে বসে কবি বিশ্ববীণার অনুরণন শোনেন একেই আমি আধ্যাত্মিক চেতনা বলছি। এবং এটা এমন নয় যে, এই চেতনা বিশেষ বিশেষ কারোর হবে। আমি মনে করি এটা সবারই হয়, অজান্তে। বিশ্বচেতনা প্রতিদিন প্রতিনিয়ত ধরা দিচ্ছে। অস্বাভাবিক কেন হবে-যে সামঞ্জস্যের খোঁজ করতে চলেছি যে ছন্দের খোঁজ করতে চলেছি সেই বিশ্বমননের একজন তো আমিও, তাহলে কেন তা আমার কাছে ধরা দেবে না, কেন রবীন্দ্রনাথ লিখছেন-তাই তোমার আনন্দ আমার পর তুমি তাই এসেছ নিচে, আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর তোমার প্রেম হতো যে মিছে? বিশ্বচেতনা বারবার ধরা দিচ্ছে; রবীন্দ্রনাথ বলছেন, অপরিচিতের এই চিরপরিচয়/এতই সহজে নিত্য/ভরিয়াছে গভীর হৃদয়/সে কথা বলিতে পারি/এমন সরল বাণী/আমি নাহি জানি। এই চেতনাকেই আধ্যাত্মিক বলছি। আমার তো মনে হয় এই চেতনায় উত্তরণ আমাদের সবারই হয়: অপরিচিতের চিরপরিচয় আমরা পেয়েই থাকি। তবে এও সত্যি ব্যবহারিক জ্ঞানবুদ্ধির চেয়ে এই মার্গের একটা মৌল পার্থক্য রয়েছে তাই ব্যবহারিক মন নিয়ে বিভোর থাকাকালে 'একটি ধানের শিষের ওপরে একটি শিশিরবিন্দু' তেমন রেখাপাত করতে পারে না এবং এক শ্রেণীর মতবাদ বলে, এই বাধাটা কেটে যায় চিত্তশুদ্ধির পর। ব্যাপারটা এই যে, বন্ধন থেকে ওপরে ওঠা এবং বৃহত্তর সত্যের সঙ্গে যোগ বোধ করা। আর এটাই আনন্দ। ব্যবহারিক আনন্দ হলো উত্তেজনাপ্রসূত, তাতে উল্লাস রয়েছে হতাশাও রয়েছে। কিন্তু তারও ওপরে একটা আনন্দ রয়েছে, যা অহৈতুকী আনন্দ, যেখানে আমার ব্যবহারিক পাওয়া না পাওয়া কোনোমাত্র প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। আমি বাসে যাচ্ছি, আমার সামনের সিটে একটি বাচ্চা তার মায়ের কোলে বসে রয়েছে, এটা সেটা দেখছে, দেখতে দেখতেই আমার সঙ্গে তার চোখাচোখি, সে একগাল হাসল, হাসলাম আমিও এবং ঐ যে আনন্দ পেলাম এর কি কোনো ব্যবহারিক মূল্য আছে? নেই। এই হলো সেই অহৈতুকী আনন্দ।
এর পরের প্রশ্নটা এরকম উঠবে যে, সাংসারিক প্রয়োজন কি আমরা ত্যাগ করতে পারি? না, পারি না। রবীন্দ্রনাথ বোধহয় এরও মীমাংসা করে গেছেন- পিতাকে সেই পিতার মধ্যে, মাতাকে সেই মাতার মধ্যে, বন্ধুকে সেই বন্ধুর মধ্যে ক্রমে ক্রমে মিশিয়ে নেবার পরীক্ষা করে যেতে হবে। এভাবেই একটা আসাযাওয়া চলে, আমরা হাজার বার বৃহত্তর আনন্দটা পাই আবার হারাইও, হয়তো তারই মধ্যে মধ্যে চলে আসে এক গভীর অনুভূতি, তখনি যেন বলতে পারি- তোমায় নতুন করে পাব বলে হারাই ক্ষণে ক্ষণ।
এই আসা যাওয়াটা চলতে থাকে। স্থায়ীভাবে যে আধ্যাত্মিক মার্গে থাকি তা নয়, আসলে ঐ বাইরের ডাকটি না শুনলে বৃহত্তর ঐ সুরে না মিললে দৈনন্দিনের মনে এত জঞ্জাল জমবে যে থাকার জায়গাটা নিতান্তই দুর্বল হয়ে যাবে। বাঁচা হয়ে পড়বে মূল্যহীন। তাই চলেছে অন্বেষণ, যদি বলি- ঐ শুনি যেন চরণধ্বনি রে, তাও যা; যদি বলি, সত্যের অন্বেষণ, সেও তা!
(কথোপকথনের লেখ্যরূপ। পথিক বসু)
***

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন