অর্থনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়া
মুদ্রার সঠিক স্বরূপ
যে ব্যবস্থা আমি প্রস্তাবনা করেছি তাতে মুদ্রার প্রয়োজন কেবলমাত্র সরকার এবং মানুষের মধ্যে গণনার জন্যই ব্যবহার হবে। একজন ব্যক্তির সাথে অপর ব্যক্তি মুদ্রা নিয়ে কোনো লেনদেন করতে পারবে না। এছাড়া সরকার আপন ব্যবস্থার অভ্যন্তরে যেখানে সম্পদ বিষয়ক গননার প্রয়োজন হবে সেখানেই কেবলমাত্র মুদ্রা প্রয়োগ করবে। যখনই কোনো ব্যক্তি সরকারের কাছে কোনো বস্তুর দাবী করবে সরকার সেই দাবীকে নির্দিষ্ট বিভাগে প্রেরণ করবে। উক্ত বিভাগ ওই বস্তু নির্মাণ করবে, এরপর বিতরণ বিভাগ নির্দিষ্ট ব্যক্তির ঠিকানায় প্রেরণ করবে। যখন ওই বস্তু ওই ব্যক্তির কাছে পৌঁছে যাবে তখন আপনিই সেই বস্তুর সমান মুদ্রা উক্ত ব্যক্তির একাউন্ট থেকে বিয়োগ হবে। সরকার এইপ্রকার মুদ্রাই জারী করবে। এমনটি করলে কখনোই মুদ্রার অভাব পড়বে না, মুদ্রা অধিক হবে না অথবা মুদ্রাস্ফীতি ঘটবে না। এই নীতির ফলে সরকারের কাছে কখনোই অর্থসঙ্কট আসবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ সর্বদা মজুত থাকবে। মুদ্রাস্ফীতি বা মুদ্রাসঙ্কট তো কখনো উৎপন্নই হবে না। মুদ্রা আমাদের জীবনে এইজন্য এসেছে যেন আমরা লেনদেন প্রক্রিয়াকে সরল করতে পারি। মুদ্রা এইজন্য আসেনি যাতে আমরা ঋণ দিয়ে সুদ নিতে পারি অথবা অর্থের মাধ্যমে অর্থের মুনাফা করতে পারি। লেনদেন ছাড়া মুদ্রার অন্য কোনো প্রয়োগ সমাজে অন্যায়কেই প্রভাবিত করতে থাকে। যার ফলে সমাজে অপরাধমূলক ঘটনা ঘটতে থাকে এবং ফলস্বরূপ অবিরত দুঃখের প্রাপ্তি হতে থাকে। একসময় সেই দুঃখ সমাজের অভিন্ন অঙ্গ হয়ে যায়। এইভাবে সমাজে অপরাধের জন্ম হতে থাকে এবং নিরন্তর সেই অপরাধ চলতে থাকে। এইজন্য মুদ্রার প্রয়োগ কেবলমাত্র গণনা করার কাজে ব্যবহার করা উচিত। এই নতুন ব্যবস্থায় মুদ্রার স্বরূপ এবং প্রয়োগ কেবলমাত্র এইজন্যই করা হবে। আর এইপ্রকার প্রয়োগ তখনই সম্ভব যখন তা সরকার ও জনগণের মধ্যে হবে এবং সরকার দ্বারা পরিচালিত হবে, ব্যক্তি দ্বারা নয়। মুদ্রা যদি জনগণের মধ্যে সঞ্চালিত হয় তবে তা থেকে অন্যায়কারী প্রতিফলনই সামনে আসবে।
পুরো সমাজ লাভ-ক্ষতির ভিত্তিতে চালিত হবে। অর্থাৎ অর্থের প্রয়োগ ভুল পথে হবে এবং সমাজে দুঃখ উৎপন্ন করবে। এইজন্য সরকারই কেবলমাত্র মুদ্রার প্রয়োগ করবে। অন্য কোনো ব্যক্তি স্বয়ং মুদ্রার প্রয়োগ করতে পারবে না। যদিও তার কোনো প্রয়োজনও পড়বে না। কারণ ব্যক্তির যা
উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক অর্থরাশির সীমা ১ লাখ টাকা এক বছরের জন্য প্রদান করা হল এবং আপনি বর্তমান বছরে ৯০ হাজার টাকা খরচ করলেন। পরের বছর সরকার আবার আপনাকে ১ লাখ টাকা প্রদান করবে। খরচ করার জন্য আপনার একাউন্টে তখন ১ লাখ ১০ হাজার টাকা থাকবে। কিন্তু এই অর্থ কেবলমাত্র সরকারের কাছে কিছু কেনাকাটা করার জন্য ব্যবহার করতে পারবেন। জনগণ নিজেদের মধ্যে কোনো লেনদেন করতে পারবে না। এমনটি এইজন্য করা হয়েছে যে সরকার যদি জনগণকে মুদ্রা লেনদেন করার স্বাধীনতা দিয়ে দেয় তবে সরকার কখনো জানতে পারবে না কোন বস্তু-পরিষেবার কতটা চাহিদা রয়েছে। কেননা জনগণ নিজেদের মধ্যেই লেনদেন করে নেবে এবং সরকারের কাছে তা জানার কোনো উপায় থাকবে না। সরকার যদি সকলের চাহিদা জানতে না পারে তাহলে পূরণ করার ব্যবস্থাও করতে পারবে না। তাহলে তো জনগণকে স্বয়ং নিজের ব্যবস্থা নিজেদেরকে করতে হবে, আর তা করে ওঠা কখনোই সম্ভব হবে না।
বর্তমান ব্যবস্থায় এমনটিই হয়ে চলেছে। এমন অবস্থায় বস্তুর মূল্য চাহিদা পূরণের আধারে চলতে থাকবে। মানুষ অধিক লাভের আশায় কিছু না কিছু হেরফের করতে থাকবে। যার ফলে কিছু বস্তুর মূল্য এতই বেড়ে যাবে যে স্বল্প আয়ের মানুষ কিনতেই পারবে না এবং কিছু বস্তুর মূল্য এতই কমে যাবে যে লগ্নি করা অর্থই ফেরত আসবে না। ফলস্বরূপ সমাজে ভয়ঙ্করভাবে আর্থিক বৈষম্য দেখা দেবে। উপরে আমরা বুঝে নিয়েছি যে আর্থিক বৈষম্যই হচ্ছে সমাজের সকল দুর্দশার কারণ। অধিক আয়ের লোভে খাদ্য পদার্থে ভেজাল মেশানো শুরু হবে। সকল প্রকার বস্তু-পরিষেবার গুণগত মান নিন্মমুখী হয়ে যাবে। সকল প্রকার দূষণ বাড়তে থাকবে এবং সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। কেননা কোথায় কোন ব্যক্তি কি তৈরি করবে এবং কে কোন বস্তু কিনছে সরকার জানতে পারবে না। ফলে পুনরায় মুদ্রাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এরপর তা মাধ্যম নয় সাধন হয়ে উঠবে অধিক থেকে অধিকতর মুদ্রা উপার্জন করার জন্য। একে অপরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, সমস্ত ব্যবহার নকল হয়ে উঠবে, প্রেমভাব থাকবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। এককথায় বললে বর্তমান সময়ের অবস্থাই ফিরে আসবে। তাহলে বোঝা গেল যে মুদ্রাকে স্বতন্ত্র করে দিলে সবকিছু অনিয়মিত এবং অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়। যেমনটি বর্তমানে ঘটছে। মুদ্রা ব্যবহারের স্বতন্ত্রতা সমাজে সকল প্রকার দুর্নীতি ক্রমাগত উৎপন্ন করতে থাকবে। সরকার তা ঠেকানোর যতই চেষ্টা করুক না কেন তা করতে পারবে না। কেননা যাদের সরকার দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য নিযুক্ত করবে তারাও আর্থিক বৈষম্যের কারণে দুর্নীতি করতে বাধ্য হয়ে যাবে। আবার সরকারেরও তো পরবর্তী নির্বাচনে লড়াই করার জন্য অর্থের প্রয়োজন হবে। সেটি দুর্নীতি থেকেই সম্ভব। সকলে তো সমৃদ্ধশালী জীবন-যাপন করতে চায়। এতে কিছুমাত্র ভুল নেই যে মানুষ কেন সমৃদ্ধশালী জীবন-যাপন করতে চায়। তার জন্য যথাসম্ভব প্রয়াস সে করতে থাকে। তাহলে আমরা বুঝতে পারছি যে মুদ্রাকে স্বতন্ত্র করে দিলে তার পরিণাম কি ভয়ানক হতে পারে। আর সেইসব আমরা আমাদের আভিজ্ঞতা থেকে স্বাভাবিকভাবেই জানি। আর্থিক বৈষম্য তখনই হবে যখন মুদ্রাকে সমাজ সঞ্চালন করবে, ব্যক্তি দ্বারা নয়। এখানে সমাজের অর্থ বলতে আমি সরকারকে বুঝিয়েছি। ব্যবস্থা তৈরি করার জন্য এবং ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য সমাজই তো সরকারকে নিযুক্ত করবে। কোনো ব্যক্তির যা কিছু প্রয়োজন হবে সে নিজের প্রোফাইল থেকে সরকারের কাছে অনলাইনে অর্ডার করবে এবং সেই অর্ডার আপনিই নির্দিষ্ট বিভাগে চলে যাবে। নির্দিষ্ট বিভাগ সেই বস্তু প্রস্তুত করে বিতরণ বিভাগে পাঠিয়ে দেবে। বিতরণ বিভাগ অর্ডার-কর্তার ঠিকানায় পৌঁছে দেবে। এইভাবে সকলে সরকারের কাছে বস্তু এবং পরিষেবা অর্ডার করতে পারবে এবং প্রাপ্ত করতে থাকবে। যদি কেউ কোনো পুরনো বস্তু বিক্রি করতে চায় তবে তা সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারবে এবং কেউ কোনো পুরনো বস্তু কিনতে চাইলে সে সরকারের কাছ থেকে কিনতেও পারবে। সরকার এইসব বস্তুর মূল্য অনলাইনে উল্লেখ করে দেবে। যার প্রয়োজন হবে তার জন্য সে সরকারের কাছে অর্ডার করতে পারবে। এইভাবেই পুরনো বস্তুকেও মানুষ ক্রয়-বিক্রয় করতে পারবে। এই প্রকারে সরকার মুদ্রা সঞ্চালনের পাশাপাশি আর্থিক সমতা বজায় রাখবে। অনেকে আবার এমনটি বলেন যে মুদ্রাই হচ্ছে সকল সমস্যার উৎস। মূলত বিষয়টি এমন নয়।
লেনদেনকে সহজ সরল করার জন্য মুদ্রা হচ্ছে একটি মাধ্যম মাত্র। বিষয়টি এমন— অনেকেই বলেন সব্জি কাটার ছুরিই হচ্ছে সকল সমস্যার কারণ। কেননা ছুরি দিয়ে বারবার হাত কেটে যায়। কিন্তু ছুরিকে যদি আপনি জীবন থেকে সরিয়ে দেন তবে অধিক অসুবিধেয় পড়বেন। তখন সব্জি কাটা বা খাবার তৈরি করতে অনেক সমস্যা হবে এবং সময় অধিক লাগবে। যেটি করতে হবে তা হচ্ছে ছুরি আমাদের কাছে থাকবে, তাকে এমনভাবে তৈরি করা যেন অসাবধান হলেও যেন আহত করতে না পারে। একইরকমভাবে আমি মুদ্রাকে রেখেছি, কিন্তু তার স্বরূপ এবং সঞ্চালন এমন করে দিয়েছি যেন তা থেকে সমাজের শুধুমাত্র লাভই হয় কোনোরূপ ক্ষতি ছাড়াই। বর্তমান ব্যবস্থায় মুদ্রার প্রচলন বন্ধ করে দিলে বস্তুর বিনিময় অনেক কঠিন হয়ে যাবে এবং বস্তু বিনিময়ের গতিও রুদ্ধ হয়ে পড়বে। যার ফলে মানুষ সময়মত প্রয়োজনীয় বস্তু প্রাপ্ত করতে পারবে না ও সুখী হতে পারবে না। এই অসুবিধের ফলে দুঃখই উৎপন্ন হবে। এর উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণও থাকবে না। কেননা সরকার জানতেই পারবে না যে মানুষ নিজেদের মধ্যে কি এবং কতটা লেনদেন করছে। আবার বস্তুর উৎপাদন বা যোগান জনগণের হাতেই দিতে হবে। ফলে ব্যবস্থা সঠিকভাবে চালিত হতে পারবে না। আবার নতুন করে আর্থিক বৈষম্য তৈরি হবে এবং বর্তমান সময়ের মতই সকল সমস্যা উৎপন্ন হয়ে যাবে। সমাজ বর্তমান সময় থেকে ১০০ বছর পেছনে চলে যাবে। সরকার সঠিকভাবে চালিত হতে পারবে না। বড় রকমের গবেষণা করতে পারবে না। সামাজিক সুখসুবিধা সীমিত হয়ে পড়বে। এভাবে বুঝে নিন যে রাজাদের সময়ে যেমন সামাজিক অবস্থা ছিল তেমন অবস্থা বর্তমান সময়ে চলে আসবে। এইজন্য মুদ্রাকে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে কোনো লাভ হবে না। উল্টে সমস্ত উন্নয়নের গতি শিথিল হয়ে পড়বে। সরকারকে যদি নিয়ন্ত্রণ করতেই হয় তবে তো মুদ্রা সঞ্চালনও নিয়ন্ত্রণ করে দেওয়া যায়, যেন মুদ্রার লাভ সকলে পেতে পারে এবং তা থেকে যেন কোনো দুঃখ উৎপন্ন না হয়। তাই এটিই হচ্ছে সঠিক পদ্ধতি কারণ এতে মুদ্রাও থাকবে এবং তা কেউ অপপ্রয়োগও করতে পারবে না।
মুদ্রা থেকে যেন সমাজের লাভই হয়। আর সেই পদ্ধতি কি তা আমি উপরে বুঝিয়ে দিয়েছি। কারোর কাছে এর চাইতেও উত্তম পদ্ধতি থাকলে দয়া করে আমায় জানাবেন। এই ব্যবস্থায় সকল বস্তু এবং পরিষেবার মাপদণ্ড একই প্রকার করা হবে। বর্তমান ব্যবস্থার মত নয়। তাই নতুন ব্যবস্থায় যে কোনো বস্তুর মূল্য সর্বদা একইরকম থাকবে। চাহিদা এবং পূর্তির আধারে তা নির্ণয় করা হবে না।
নতুন ব্যবস্থায় মূল্যবৃদ্ধির মত কোনো বিষয় থাকবেই না। সকলের জীবনস্তর একসমান থাকবে। সমাজ যখন পুরনো ব্যবস্থা থেকে নতুন ব্যবস্থায় প্রবেশ করবে তখন পুরনো অভিজ্ঞতার কারণে মানুষ অনাবশ্যক বস্তুর দাবী করতে চাইবে। ফলে তখন একটি বড় সমস্যা উৎপন্ন হবে। এই অসুবিধে থেকে মুক্ত হবার জন্য অর্ডার বা চাহিদা পূরণের উপর ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য নিয়ন্ত্রণ রাখার প্রয়োজন পড়বে। সেই সময়কালে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী কিছু প্রাপ্তির জন্য অর্থের প্রয়োজন পড়বে। এর ফলে সরকার আপনাকে প্রথমেই পর্যাপ্ত পরিমাণে অর্থরাশি প্রদান করে দেবে। বছরের মাঝে কোনো সময় যদি সরকারের মনে হয় অর্থের পরিমাণ বাড়ানো প্রয়োজন তবে তা বাড়াতেও পারবে। যখন সমাজের মধ্যে একরকম সমতা চলে আসবে তখন সম্ভবত অর্থের কোনো সীমা নির্ধারণের প্রয়োজন পড়বে না। যার যেমন বস্তু-পরিষেবা প্রয়োজন হবে তা গ্রহণ করতে থাকবে এবং সুখী জীবন উপভোগ করতে থাকবে। তখন এইপ্রকার নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন থাকবে না। কেননা সমস্ত বস্তু-পরিষেবা বিনামূল্যেই সকলে পেতে থাকবে।
বস্তু এবং পরিষেবার মূল্য গণনা
একথা সর্বদা মনে রাখতে হবে বস্তু-পরিষেবার মূল্য কখনোই ডিমান্ড এবং সাপ্লাইয়ের উপর নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়। বস্তু-পরিষেবার মূল্য সর্বদা একটি ন্যায়কারী মাপদন্ডের মাধ্যমে নির্ণয় করা উচিত। যেমন ধরা যাক ১ ঘণ্টা শ্রমের মূল্য ১ মুদ্রার সমান। এবার— কোনো বস্তু নির্মিত হতে এবং আপনার কাছে পৌঁছাতে যত ঘণ্টা সময় লাগবে তা হিসেব করতে হবে। ধরে নেওয়া যাক একটি বস্তু ২ ঘণ্টা শ্রমের বিনিময়ে তৈরি হল এবং বিতরণ হল। তাহলে সেই বস্তুর মূল্য ২ মুদ্রা হল। সামাজিক সুখসুবিধা তো আমরা সকলে বিনামুল্যেই পাব। আবার সকল প্রকার শ্রমের মূল্য নির্ধারণ করা কখনোই সম্ভব নয়। যেমন বৌদ্ধিক শ্রমের মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। যদিও নতুন ব্যবস্থায় সকল প্রকার শ্রমের মূল্য সমান থাকবে। সেইজন্য এমন সব বস্তু-পরিষেবার মূল্য নির্ধারণ সেই শ্রমের ভিত্তিতেই হবে যেসব বস্তুর মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। যার পদ্ধতি এমনতর হবে যে ধরুন একজন কাঠমিস্ত্রি একটি চেয়ার ১ ঘণ্টায় তৈরি করবে। এই হিসেব আসবে সপ্তাহে ৫ দিন কাজের ভিত্তিতে। তাহলে ৫ ঘণ্টায় সে প্রতিদিন ৫টি চেয়ার তৈরি করে ফেলবে। এইভাবে সে একমাসে ১০০টি (দিনে ৫ ঘণ্টা শ্রম × সপ্তাহে ৫ দিন = সপ্তাহে ২৫ ঘণ্টা × ৪ সপ্তাহ) চেয়ার তৈরি করে নেবে। তাহলে এইভাবে সেই কাঠমিস্ত্রির বেতন হবে প্রতিমাসে ১০০ মুদ্রা। এবার এই পদ্ধতিকে আধার করে সকলের বেতন হবে প্রতিমাসে ১০০ মুদ্রা। যারা সড়ক, জল, বিদ্যুৎ ইত্যাদি বিভাগে কর্মরত থাকবেন তাদের বেতনও প্রতিমাসে ১০০ মুদ্রা ধরা হবে। এবার ধরে নিই সরকারি কাজে ১০০০ জন ব্যক্তি কর্ম করছে। তাহলে প্রতি মাসে সকলের বেতন হবে ১,০০,০০০ মুদ্রা। অর্থাৎ প্রতি মাসে সরকারের মোট খরচ হবে ১,০০,০০০ মুদ্রা। সরকার এই খরচকে সেইসব বস্তু-পরিষেবার সাথে সামানভাবে জুড়ে দেবে। ধরে নেওয়া যাক ১,০০,০০০ মুদ্রার জন্য সেই পরিমাণ শ্রমের বিনিময়ে বস্তু-পরিষেবার নির্মাণ হল। এই হিসেব অনুযায়ী উৎপাদিত বস্তু-পরিষেবার মূল্য হবে ১,০০,০০০ (পরিমাপযোগ্য শ্রম) + ১,০০,০০০ (অপরিমাপযোগ্য শ্রম), অর্থাৎ ২,০০,০০০ মুদ্রা। এবার ২ প্রকার শ্রমের বিনিময়ে নির্মিত এবং বিতরণযোগ্য চেয়ারের অন্তিম মূল্য হবে ৪ মুদ্রা (উৎপাদন শ্রম + অন্যান্য পরিষেবাজনিত শ্রম)। এইভাবে বস্তু-পরিষেবার অন্তিম মূল্য নির্ধারিত হতে থাকবে। এই ব্যবস্থায় কাউকেই বেতন প্রদান করা হবে না। ব্যবস্থাকে সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য অবশ্যই সঠিকভাবে সমস্তকিছুর গণনা হবে। যখন সরকার কোনো কাজের প্ল্যানিং করবে তখন সরকারের অভ্যন্তরীণ বিভাগে এইপ্রকার হিসেব সহায়ক হবে। এই মূল্য নির্ধারণের সহায়তা নিয়েই সরকার কোনো বস্তুর অনাবশ্যক নির্মাণকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। প্রযুক্তি, মেশিন ইত্যাদির দ্বারা যা কিছু অন্তিম অবস্থায় প্রয়োগ হবে সেইসমস্ত ক্ষেত্রেও এই নিয়ম মেনে চলা হবে। এই প্রক্রিয়ায় কোথাও কোনো সমস্যা হলে ওই হিসেবের দ্বারা সহজেই তা জানা যাবে এবং তৎক্ষণাৎ সমাধান করা যাবে। তাহলে আমরা এবার নতুন ব্যবস্থায় মুদ্রার প্রয়োগ বুঝে নিয়েছি। সবশেষে আমি এটিই বলতে চাই যে মুদ্রার প্রয়োগ এইসব বিষয় মাথায় রেখেই করা হবে যেন সকলের জীবনযাপন সহজ হয়, আরামদায়ক হয়, স্পষ্টতা, পারদর্শিতা বৃদ্ধি পায় এবং সব মিলিয়ে যেন সুখ বৃদ্ধি পায়। কোনোপ্রকার দুঃখ যেন উৎপন্ন না হয়। এই মুদ্রাকে নিয়ে পরেও যদি কোনো সমস্যা উৎপন্ন হয় তার সমাধানও এই উপায়েই করা হবে। আর আপনার জ্ঞান অনুযায়ী যদি এর থেকে অন্য কোনো ভাল উপায় থাকে কিংবা যদি ভবিষ্যতেও আসে তবে তা আমি স্বীকার করে নেব। এই ব্যবস্থায় সরকারকে কোনোপ্রকার ট্যাক্স ইত্যাদি আদায় করতে হবে না। তাই ট্যাক্স তোলার জন্য কোনো বিভাগও খুলতে হবে না। মানুষকে ধরপাকড় করতে পুলিশ ব্যবহার করতে হবে না। কারণ কেউ টাকা নিয়ে পালিয়ে যাবে না। ফলে কাউকে তল্লাসি করতে হবে না। সবকিছু অত্যন্ত সহজ হয়ে যাবে। প্রাকৃতিকভাবে সম্পদ তো সকলের জন্য সমানভাবে বিনামূল্যেই রয়েছে। নতুন অর্থশাস্ত্র খুবই সরল হবে এবং সহজেই সকলে বুঝতে পারবে।
পারিমাণ রাশির গণনা
এই ব্যবস্থায় পরিমাণ রাশি সকলের জন্য সমান থাকবে। সরকার দ্বারা সকলের একাউন্টে সমান অর্থরাশি প্রতি বছরের পয়লা তারিখে প্রদান করা হবে। শিশুদের জন্য অর্থরাশি তাদের বয়স অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে ২৫ বছর থেকে ৫০ বছর বয়সীরা জীবিকা নির্বাহ করবে। কেউ চাইলে তার কার্যকাল কমিয়ে নিতে পারেন, তাহলে সরকার তার জন্য সেই অনুযায়ী অর্থরাশির সীমা নির্ধারণ করে দেবে। উদাহরণস্বরূপ ধরে নিন সরকার প্রতিদিন ৫ ঘণ্টা কাজের সাধারণ সময় নির্ধারণ করে দিল। যদি কাজের জন্য সপ্তাহে ৫ দিন নির্ধারিত হয় তবে এই হিসেবে একজনকে মাসে ২০ দিন কর্ম করতে হবে। অর্থাৎ মাসে ১০০ ঘণ্টা কর্ম করতে হবে। যদি কোনো ব্যক্তি দিনে ৩ ঘণ্টা কর্ম করতে চান সরকারও সেই হিসেবে অর্থরাশির পরিমাণ নির্ধারণ করে দেবে। উদাহরণ হিসেবে ধরে নিন সরকার প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ১ লক্ষ অর্থরাশি নির্ধারণ করে দিল ঐ বছরের জন্য। তাহলে এই হিসেব অনুযায়ী সরকার ৩ ঘণ্টা কাজের জন্য ৬০০০০ অর্থরাশি অবধি সীমা নির্ধারণ করে দেবে। এবার সেই ব্যক্তি এই অর্থরাশির সীমা অবধি সুবিধা নিতে পারবে। যদিও আমার অনুসন্ধান অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবে এমন কোনো ব্যক্তি নেই যিনি নির্ধারিত সময় অবধি কর্ম করতে চাইবেন না। যেহেতু বর্তমান সময়ের ব্যবস্থা সঠিক নেই তাই বেশীরভাগ মানুষ বাধ্য হয়ে অস্বাভাবিক জীবন-যাপন করছে। এর ফলে অনেকেই বিভিন্ন কারণে কর্ম করতে চান না অথবা পছন্দের কর্ম পাননা বলে কাজে ফাঁকি দেন এবং সমাজের উপরই নির্ভরশীল থাকতে চান। যখন এই ভুল ব্যবস্থা থেকে সঠিক ব্যবস্থায় পরিবর্তিত হতে থাকবে সেইসময়ও এই ধরণের সমস্যা আসতে পারে। শুরুতে কিছুটা দায়িত্ব সকলেকে নিতে হবে। হয় আমরা সরকারকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করব অথবা নিজেদের সহযোগিতার ভিত্তিতেই সরকারের কাছে আশা রাখব। যখনই নতুন ব্যবস্থা পূর্ণরূপে স্থাপিত হয়ে যাবে তখন কি করার প্রয়োজন পড়বে সে বিষয়ে সরকার বিচার বিবেচনা করবে। সরকার দেখবে এই কথার অর্থ হচ্ছে জনগণই দেখবে। এই ব্যবস্থায় জনগণই অন্তিম সিদ্ধান্ত নেবে। কখনো কোনো বস্তুর অভাব হবে না তার কারণ অর্ডার বা চাহিদা জনগণের কাছ থেকে প্রথমেই নিয়ে নেওয়া হবে। অর্ডার গ্রহণ করার পরেই তো কোনো বস্তু নির্মিত হবে, ফলে অনাবশ্যক গুদামঘর তৈরির প্রয়োজনও থাকবে না। প্রায় সমস্ত বস্তু সরাসরি তাদের আবাসিক স্থানে পৌঁছে দেওয়া হবে। বড় কোনো বাজারের প্রয়োজনও থাকবে না। মানুষের উপর কাজের ভারও কম থাকবে কেননা সকলেই নিজেদের প্রস্তাবিত কর্ম করবে এবং কেউই কোনো অনাবশ্যক কর্ম করবে না। এতে মানুষ অবসর সময়ে অন্য কোনো ব্যক্তিগত অথবা পারিবারিক সুখ উপভোগ করতে পারবে। সকল বস্তু এবং পরিষেবার মূল্য মোটামুটি স্থায়ী থাকবে। তাহলে মূল্যবৃদ্ধি বা মূল্যহ্রাসের অবস্থা কখনো হবে না। বার বার বেতন কখনোই বাড়াতে হবে না। দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধির জন্য বা অন্য কোনো সংকটে ভর্তুকি দিতে হবে না। কৃষকগণ কখনো বলবে না যে আমরা ফসলের সঠিক মূল্য পাচ্ছি না। গ্রাহকগণও কখনো মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ করবে না। সবকিছুর সামঞ্জস্য বা ভারসাম্য বজায় থাকবে। এর অর্থ হচ্ছে একবার যা চূড়ান্ত হয়ে যাবে বারবার তা বদলানোর প্রয়োজন পড়বে না। এখন যেমন সরকার ও জনগণ পরস্পরের মধ্যে চোর পুলিশের খেলা খেলতে থাকে এবং ব্যবস্থার অজুহাত দিয়ে সকলেই একে অপরকে দোষারোপ করতে থাকে। এইসব অভিযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে এমনকি প্রয়োজনও আর থাকবে না। কেননা মন্দ ব্যবস্থাতেই জনগণকে চোর সাজতে বাধ্য হতে হয়। তাই সরকারকে বাধ্য হয়ে পুলিশ রাখতে হয় এবং অনাবশ্যক খরচ বাড়তে থাকে, যার প্রভাব গ্রাহকের উপর পড়ে। সেইজন্য আসুন আমরা সকলে প্রথমে ব্যবস্থাকেই সঠিক করে নিই। যেখানে সকলের মান একসমান থাকবে। এই পুস্তকে আমি তাই উপস্থাপন করার প্রচেষ্টা করেছি। এখানে আমি যা কিছু সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করেছি তা আমার দ্বিতীয় পুস্তক ‘সম্পূর্ণ জীবন দর্শনে’ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি। ওই পুস্তকে আপনি এই ব্যবস্থা রচনার পেছনের কারণসমূহকে বিস্তারিতভাবে বুঝতে পারবেন। কিন্তু এই পুস্তকে আমি ব্যবস্থার মধ্যেই কেন্দ্রীভূত থেকেছি।
***
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন