অরবিন্দ দর্শনের মর্মার্থ কী?

জগতে এত দুঃখ কেন?

দুঃখ থেকে কারোই নিষ্কৃতি নেই। পৃথিবীতে জন্মালে সকলকেই নানা দুঃখ পেতে হয়। এর কারণ কী? এ নিবৃত্তির কি কোনো উপার নেই? অনেক মহাপুরুষ এই নিয়ে চিন্তা ও তপস্যা করেছেন, তাঁরা নানা উপায়ের কথাও বলে গেছেন। তন্মধ্যে বুদ্ধের কথা সকলেই জানে। সাংখ্যকার কপিল মুনি এই নিয়েই গোটা সাংখ্যতত্ত্ব রচনা করেছেন, তার প্রথম সূত্রই "দুঃখ প্রয়াভিগাভাৎ জিজ্ঞাসা” থেকে শুরু, অর্থাৎ আধিভৌতিক, আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক এই তিনরকম দুঃখের হেতু কি ও তাকে দূর করার উপায় কি, তার কথাই বলেছেন। কিন্তু তবু মানুষের দুঃখ তো রইলই, তাই কি চিরদিন চলবে?

শ্রীঅরবিন্দ আমাদের এই চরম প্রশ্নটির জবাব দিয়েছেন। জগতে এত দুঃখ কেন, এ প্রশ্নের জবাব ও তার সমস্যা সমাধানের কিছু নতুন রকম উপায়ও তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন। তাঁর জীবনব্যাপী সুদীর্ঘ সাধনাতে এই উপায় খোঁজার কাজেই তিনি সর্বদা নিযুক্ত ছিলেন।

মানুষের জগতে এত দুঃখ কোথা হতে কেমন করে এল, তা জানতে হলে জগৎসৃষ্টির ব্যাপারটিকে গোড়া থেকে অনুসরণ করে দেখতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে একই রকমের ব্যাপার ঘটে চলেছে মনে হলেও সৃষ্টির ক্রিয়া নিতান্ত একঘেয়ে পুনরাবৃত্তি নয়, এর মধ্যে অতি মন্থরভাবে এগিয়ে চলেছে এক নিরবচ্ছিন্ন ক্রমবিকাশের নিগূঢ় কাহিনী। 

গোড়া থেকে দেখলে এই কাহিনীটিকে কোনো নিপুণ নাট্যকারের রচিত এক পঞ্চাঙ্ক নাটকের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। এর প্রথম অঙ্কের যবনিকা উঠতেই দেখা গেল, পৃথিবী একটা জড়পিণ্ডবৎ ঘুরছে, তার সবই জড়, জড়ের রাজ্যে চলেছে কেবল জড়েরই লীলা। দুঃখের কোনো চিহ্নই সেখানে নেই। দুঃখ, দৈন্য, অভাব, অভিযোগ, দ্বন্দ্ব, বিরোধ কোনো কিছুই নেই। এ যে কোনো এক অপূর্ব নাটকে দাঁড়াতে পারে তা তখন আদৌ বোঝাই যাচ্ছে না। তারপর দ্বিতীয় অঙ্ক ঘখন এলো তখন একটু নতুন জিনিস দেখা গেল, জড় ছাড়াও তখন সেখানে উদ্ভিদের আবির্ভাব হয়েছে, তার মধ্যে কিছু যেন প্রাণের স্পন্দন পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু তখনও সেখানে দুঃখের লেশমাত্র নেই। তৃতীয় অঙ্কে দেখা গেল আরো কিছু নতুন জিনিস, ওর মধ্যে অনেক রকম প্রাণীর আবির্ভাব হয়েছে, তাদের নিয়ে সেখানে প্রাণের লীলা শুরু হয়েছে। আর এখান থেকেই নাটকের মধ্যে শুরু হলো প্রথম সুখদুঃখের সূচনা। কারণ প্রাণীদের মধ্যে বৈচিত্র্য দেখা দিল, পরস্পরে তারা অপরকে মেরে নিজেকে বাঁচাতে চায়, আপন-পরের প্রভেদ করতে থাকে, এক দলের সঙ্গে অন্য দলের হারজিতের লীলা চলতে থাকে। নাটকটি একটু জমে উঠল বটে, কিন্তু দুঃখের গুরুত্ব তখনও বিশেষ দেখা দেয়নি। তার পরে এল চতুর্থ অঙ্ক, তখন রঙ্গমঞ্চে মানুষের আবির্ভাব হলো। তাদের প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা চরিত্র। এদের মধ্যে বৈচিত্র্য ফোটাবার জন্য নাট্যকার কাউকে করলেন সাধু কাউকে অসাধু, কাউকে বা নম্র কাউকে নিষ্ঠুর, কাউকে বা সোজা কাউকে বাঁকা। এমনিভাবে সৃষ্টি করে তিনি অবাধে তাদের ছেড়ে দিলেন রঙ্গমণ্ডে নিজেদের চরিত্রানুযায়ী অভিনয়-ক্রিয়া দেখাতে; বলে দিলেন, যে যতখানি পারো নিজের নিজের স্বরূপ ব্যক্ত করো। তখন বেধে গেল পরস্পরের সঙ্গে পরস্পরের ঘোরতর সংঘাত ও দ্বন্দ্ববিরোধ। আর চরিত্রের সঙ্গে চরিত্রের, স্বার্থের সঙ্গে স্বার্থের যেখানেই সংঘাত সেখানেই দুঃখ। তখন থেকেই হলো দুঃখের আবির্ভাব। ক্রমশ সংঘাতও যত বেড়ে চলেছে, দুঃখও ততই বেড়ে চলেছে। বর্তমানে এই অবস্থা।

এটি অপরিহার্য। কারণ সংঘাতই হলো নাটকের প্রাণ, সংঘাত না থাকলে কোনো নাটকই জমে না। তার থেকেই নাটকের চতুর্থ অঙ্কে এত দুঃখের বাড়াবাড়ি। ব্যক্তিগত ও দলগত চরিত্র যতই চূড়ান্তরূপে স্বাতন্ত্র্য নিয়ে ফুটে ওঠে, দুঃখের পরিস্থিতিও তারই অনুপাতে চূড়ান্ত হয়ে ওঠে।

চতুর্থ অঙ্কে তাই এখন ঘোরতর দুঃখের পালাই চলেছে। এর ভিতর দিয়ে আমাদের অতিক্রম করে যেতে হবে, তার পরে আসবে অন্য পালা। খৃস্ট প্রভৃতি মহাপুরুষেরা তাই দুঃখকে বলেছেন বরণীয়। দুঃখ ছাড়া কোন-কিছুর পরিণতি হয় না, কোনো-কিছুর উন্মেষ হয় না। আমাদের কবিও তাই বলেছেন, "দুঃখ যদি না পাবে তো দুঃখ তোমার ঘুচবে কবে।” দুঃখ ঘোচাবার জন্যই দুঃখের ভোগ হওয়া চাই।

কিন্তু দর্শকদের সে কথা মনে হয় না। দুঃখের বহর দেখে তাদের মনে হয় এবার সবই বুঝি গেল গেল, এ নাটকের সবই হবে বিয়োগান্ত। দুঃখ তো ক্রমশ বেড়েই চলেছে, ভবিষ্যতের সম্বন্ধে কোনো আশাই মিলছে না, মানুষদের দুর্গতির যেন অন্ত নেই। এই দেখে দর্শকদের মন উত্তরোত্তর উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। এ সম্বন্ধে শ্রীঅরবিন্দকে প্রশ্নও করা হয়েছিল, তাঁকে বলা হয়েছিল যে এখন যেমন দুর্গতি দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীতে মানুষের ইতিহাসে এমন আর কখনও দেখা যায়নি। তার জবাবে তিনি বলেছিলেন, এটা কিছু অস্বাভাবিক নয়, বরং এটাই প্রত্যাশিত। রাত্রি শেষ হবার ঠিক আগেই অন্ধকার সব চেয়ে বেশি গাঢ় হয় ("Night is darkest before dawn")। ওতে ভাবনার কিছু নেই, ওর থেকে বোঝা যাচ্ছে যে দুঃখের দিন ফুরিয়ে এলো, এর পরেই আসছে নতুন অরুণোদয়ের পালা। আসছে এবার মিলনের আনন্দের পালা।

নাট্যকারের এ অপূর্ব নাট্য বিয়োগান্ত নয়, মিলনান্ত। এর শেষ অঙ্কে তিনি মিলন দেখিয়ে দেবেন। সব-কিছু বিরোধের মাঝে সামঞ্জস্য ও সঙ্গতি আনিয়ে দেবেন। নাটকের সেই শেষ খেলা দেখানোএখনও বাকি রয়েছে। শ্রীঅরবিন্দ তাকেই বলেছেন দিব্যজীবনের পালা। আর আমরাই হবো সেই নতুন যুগের নতুন জীবনের নতুন মানুষ। এখনও আমাদের মধ্যে দিব্যজীবনের সেই পূর্ণচেতনা ফোটেনি। এখনও আমরা অর্ধ-চেতনাতেই রয়েছি, তাই মিথ্যাকে নিয়ে সত্যের মতো কারবার করছি। তাই মারবার অভিনয় করতে গিয়ে যথার্থ মেরেই বসছি, কাটা দেখাতে গিয়ে যথার্থ কেটেই ফেলছি। ছোটোর অংশ যে করছে তাকে সত্যি ছোটো বলেই ভাবছি, বড়োর অংশ অভিনয় করতে পেরে নিজেকে সত্যি বড়ো বলেই ভাবছি। এই সব থেকেই দুঃখের বোঝা ভারি হয়ে উঠছে। পূর্ণচেতনা এলে এগুলো আর থাকবে না, তখন হবে সত্যকে নিয়েই সত্যের কারবার। তারই নাম অতিমানস-চেতনা।

সেই উচ্চতর চেতনা এসে পড়ার সময় এখনই। নাট্যকার তাঁর পঞ্চম অঙ্ক দেখাতে প্রস্তুত। এর আগের অঙ্ক পর্যন্ত তিনি মনবিহীন পুতুলদের নিয়ে দেখিয়েছিলেন পুতুলনাচের খেলা, কিন্তু এখন এই মনবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ-অভিনেতাদের নিয়ে তা আর চলে না। এবার তাদেরও এতে সক্রিয় সহযোগিতা চাই। নইলে নাট্যকার চাইছেন একরকম দেখাতে, আর অভিনেতারা যদি তার উল্টো দিকে যায়, তাহলে কিছুই কাজ হয় না। এখন তাই-ই হয়ে চলেছে বলেই পঞ্চম অঙ্ক আসতে বিলম্ব হচ্ছে। কিন্তু এতকাল যা হয়ে গেছে তা হয়ে গেছে, এখন তাড়াতাড়ি দুঃখের পালা শেষ করে দেওয়াই দরকার। নাট্যকারের সঙ্গে আমাদের এখন মিল রেখেই চলতে হবে, দিব্যজীবন অভিব্যক্ত করার জন্য আমাদেরও প্রয়াস করতে হবে।

অতএব চেতনারই এখন প্রস্ফুটন আনা দরকার। তাতেই আমাদের সকল দুঃখ ঘুচবে, দুঃখের বদলে মানুষের জীবনে এক দিব্য আনন্দের পালা শুরু হবে। যেমন ধরনের জীবনে সেই উচ্চতর চেতনা প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে তারই নাম দিব্যজীবন।


***


কাকে বলে দিব্যজীবন?

পূর্বেই বলা হলো যে জগৎসৃষ্টির নাটক অঙ্কে অঙ্কে বিকশিত হয়ে চলেছে। এর প্রথমে হলো জড়-জীবন, তার পরে হলো উদ্ভিদ-জীবন, তার পরে প্রাণী-জীবন, তার পরে মনুষ্য-জীবন, শেষকালে হবে দিব্য- জীবন। শেষেরটি হতে এখনও বাকি আছে।

শ্রীঅরবিন্দই আমাদের প্রথম শোনালেন এই দিব্যজীবনের কথা। তিনি বললেন যে, মানুষ হয়ে জন্মে আমরা ইচ্ছা করলে এর চেয়েও বড়ো রকমের এক দিব্যজীবন এই পৃথিবীতেই পেতে পারি।

দিব্যজীবন মানে আমাদের এখনকার এই পার্থিব চেতনার চেয়েও এক উচ্চতর ও পূর্ণতর চেতনার জীবন। তা কেবল এই পার্থিব চেতনারই পরাকাষ্ঠা এমন মনে করা উচিত নয়। অর্থাৎ তা কেবল আমাদের বুদ্ধিবৃত্তির উন্নতি নয়, কোনো একটা নতুন আদর্শবাদও নয়, কোনো নৈতিকতা বা ধার্মিকতাও নয়, এগুলির সব-কিছু মিলিয়ে যা দাঁড়াতে পারে তা-ও নয়। এই সব গুণ থাকলে তা দিব্যজীবন লাভের পক্ষে সহায়ক হতে পারে বটে, কিন্তু ওর থেকেই যে হবে তার কোনো মানে নেই। আমাদের দেহ প্রাণ ও মন ছাড়াও যে আভ্যন্তরীণ সত্তাটি বা অন্তরাত্মাটি রয়েছে, দিব্যজীবন মানে তারই এক নতুন ধরনের জাগরণ, এবং সঙ্গে সঙ্গে আমাদের এখনকার দৃষ্টিভঙ্গির এক আমূল পরিবর্তন। সে জীবনে দেখা যাবে যে জগতের সব-কিছুই সুন্দর, সবই সত্য ও সঙ্গতিপূর্ণ। কোনো-কিছুই অর্থহীন নয়, সবই আলোকময় ও আনন্দময় (শ্রীঅরবিন্দের ভাষাতে- "a hidden sweetness and laughter in things, a sunshine and gladness of life, everywhere a harmony and truth of order.")। তাকেই বলা যাবে দিব্যজীবন। এই জগতে সাধারণ মানুষ হয়ে বাস করেও তেমন জীবনে উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব। এমন কি বিদ্যাবুদ্ধিশূন্য নিরক্ষর মানুষও যে এই দিব্যজীবনে উত্তীর্ণ হতে পারে তার জাজ্বল্যমান প্রমাণ দৃষ্টান্ত আগের থেকেই দেখিয়ে দিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ।

কিন্তু সাধারণ মানুষ হয়তো বলবে, কেন, আমরা তো বেশ আছি, ঐ সব নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাবার দরকার কি? জগতের উন্নতি ক্রমশই হয়ে চলেছে, মানুষের বৈজ্ঞানিক বুদ্ধি ক্রমশই বেড়ে চলেছে, সুতরাং এখনও যা অপূর্ণতা রয়েছে তা ওতেই ক্রমশ দূর হয়ে যাবে। কিন্তু বস্তুত দেখা যাচ্ছে যে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে একদিকে শক্তিসম্পদের মাত্রা যতই বেড়ে চলেছে, অন্যদিকে মানুষেরা কিন্তু ততই বেশি দুঃস্থ হচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে যে এই আদিত্য চেতনা নিয়ে এমনভাবে চলতে থাকলে কোনো কালে আমরা শান্তি পাবো না। কিছুতেই আমাদের কারোই ক্ষোভ মিটবে না। যতই কেন মানুষের পার্থিব উন্নতি হোক, তবু-"যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই, যাহা পাই তাহা চাই না,” চির- কালই এই অসন্তুষ্টির ভাবটি থেকে যাবে। দুঃখ কিছুতেই ঘুচবে না; এখনকার মতো এমনি অর্ধ-চেতন অর্ধ-অজ্ঞানতার মধ্যে থেকে দ্বন্দ্ববিরোধ ও অভাববোধ কিছুতে দূর হবার নয়।

মনুষ্য-জীবনের এই অপরিহার্য দুঃখ দূর করবার জন্য আগেকার মহাপুরুষ ও মনীষিগণ অনেক উপায় উদ্ভাবন করেছেন। কিন্তু কেবল আধ্যাত্মিক রাস্তায় পালিয়ে যাওয়া ছাড়া এর অন্য কিছু কিনারা কেউ করতে পারেননি। বুদ্ধ বললেন, যদি রোগ শোক জরা মৃত্যুর দুঃখ থেকে নিষ্কৃতি পেতে চাও তাহলে নির্বাণের সাধনায় চলে যাও। নির্বাণে পৌঁছতে পারলে তাতে বাস্তবিকই শান্তি মেলে বটে, কিন্তু তাতে পার্থিব ও সাংসারিক অস্তিত্বের প্রত্যক্ষ করতে হয়। মায়াবাদীও ঐরূপ কথাই বলেন। সত্যটিকে অস্বীকার জগৎকে মায়া জ্ঞানে পরিত্যাগ করে সন্ন্যাসী হওয়াই তাঁর কাছে শাস্তিময় জীবনের আদর্শ- স্বরূপ। সাধুসন্ন্যাসীরা বলে থাকেন যে আধ্যাত্মিক জীবনই প্রকৃত জীবন, সাংসারিক জীবন মিথ্যা মায়ার বন্ধন ছাড়া আর কিছুই নয়। কেউ কেউ তাই সংসারে বাস করেও সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আধ্যাত্মিক জীবন যাপন করেন। কিন্তু তাতে তাঁদের ব্যক্তিগত সমস্যা একরূপ ভাবে মিটে গেলেও মানব জগতের সমূহ সমস্যা যেমন ছিল তেমনি থেকে যায়।

শ্রীঅরবিন্দ তাই বলেছেন, ওতে চলবে না। কেবল আধ্যাত্মিক জীবন নয়, আমাদের চাই তার চেয়েও বড়ো রকমের জিনিস, দিব্য- জীবন; আমাদের চাই পূর্ণচেতনা। সেই পূর্ণচেতনা যতকাল না মিলছে ততকাল আমাদের জীবনও অপূর্ণ থেকে যাবে। অপূর্ণ রকমের চেতনা নিয়ে আমরা অপূর্ণই থেকে যাব।

বলতে গেলে চেতনা সব-কিছুর মধ্যেই রয়েছে। তবে তার বিকাশের বিভিন্ন পর্যায় ও বিভিন্ন স্তর আছে। সর্বনিম্ন স্তর থেকে তা ক্রমশ ধাপে ধাপে উত্তরোত্তর বেশি মাত্রাতে বিকাশ পেয়েছে। তাকেই বলা হয় চেতনার বিবর্তন বা ক্রমবিকাশ। মাটি পাথর প্রভৃতি জড়বস্তুর মধ্যে কোনো চেতনাই নেই বলে আমাদের মনে হয়। কিন্তু বৈজ্ঞানিক দেখতে পায় যে জড়ের মধোও একরূপ এমন দুর্দান্ত রকমের আণবিক শক্তি লুকিয়ে আছে যা অবস্থাবিশেষে মারাত্মক মূর্তিতে প্রকাশ পেতে পারে। উদ্ভিদের মধ্যে চেতনা তো আছেই, এমন কি প্রাণের অনুভূতিও আছে, সে কথা আচার্য বসু প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। প্রাণীদের মধ্যে চেতনা ও প্রাণের লক্ষণ ওর চেয়ে আরো বেশি প্রকট। আবার মানুষদের মধ্যে প্রাণ ছাড়াও মন আছে, যা জন্তুদের প্রাণচেতনার আরো এক ধাপ উপরে। কিন্তু তবু চেতনার সম্পূর্ণ বিকাশ এখনও হয়নি, আরো এক ধাপ বাকি আছে। শ্রীঅরবিন্দ তাকে বলেছেন সবার উপরকার অতিমানস-চেতনা। দিব্যজীবনের যুগে সকলে না হোক, অনেকেই সেই অতিমানস-চেতনার স্তরে উঠতে পারে।

সাধ্যরণের মনে প্রশ্ন জাগে, মানুষের মন ও বুদ্ধির উপরে আরো কিছু আছে নাকি? কিন্তু তা যে বাস্তবিকই আছে তার প্রমাণ আমরা এই সাধারণ অবস্থাতেও মাঝে মাঝে পেয়ে থাকি। হঠাৎ আমাদের মধ্যে এমন এক একটা প্রেরণা (inspiration) জাগে, যা আমাদের বুদ্ধির অতীত, যার জোরে আমরা এমন এক একটি কাজ করে ফেলি যা আমাদের স্বাভাবিক সাধ্যের অতীত। অমন প্রেরণা কোথা থেকে আসে? আবার হঠাৎ আমাদের মধ্যে এমন কিছু বোধির (intuition) উদয় হয় যার দ্বারা অতি সহজে ও বিনা বিচারে আমরা আসল সত্যটিকে আপনা থেকেই বুঝে নিতে পারি, কোনো হিসাবের দরকার হয় না। এর অস্তিত্বের কথা বৈজ্ঞানিকরাও স্বীকার করেন, বিজ্ঞানের ইতিহাসেও শোনা যায় যে এই বোধির প্রভাবে অপ্রত্যাশিত রকমের সন্ধান মিলে যাওরাতে কত যুগান্তকারী সত্যের আবিষ্কার হয়েছে। এ ছাড়া সাধুসন্তদের মধ্যে কেউ কেউ এমন দিব্যদৃষ্টি বা সত্যদৃষ্টি (revelation) পেয়ে থাকেন যার দ্বারা তাঁরা ভবিষ্যতের কথা বলতে পারেন, আর এমন সব লোকোত্তরের কথা বলতে পারেন যার খবর আমরা কিছুই জানি না। এগুলিকে সাধারণ মানুষের মনোবুদ্ধির অতীত একটা কিছু শক্তিই বলতে হবে। এ শক্তির অঙ্কুর আমাদের মধ্যেই রয়েছে, তবে এখন তার আভাস মাত্র ক্ষণিকের জন্যই দেখা দেয়। দিব্যজীবনের বিকাশ হলে এই সকল ক্ষমতা আরো বেশি সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। তখন সৃষ্টি সম্বন্ধে অজ্ঞাত কিছুই থাকবে না, হেঁয়ালি কিছুই থাকবে না।

এই দিব্যজীবন লাভের উদ্দেশ্য কেবল যোগী তপস্বী হয়ে কিংবা ব্রহ্মজ্ঞ হয়ে ব্যক্তিগত আনন্দসাগরে নিমগ্ন থেকে নিজের জন্যই একটা মোক্ষলাভের উপায় করে নেওয়া নয়। দিব্যজীবনকে আয়ত্ত করার উদ্দেশ্য এখানেই এই পার্থিব জীবনের ক্ষেত্রেই পূর্ণতর সেই অতিমানস চেতনাকে নামিয়ে আনা, কেবল নিজের জন্য বা নিজের কাছাকাছি জনকতকের জন্য নয়, কিন্তু সকলেই যাতে তার সুফল ভোগ করতে পারে তার জন্য। তবে প্রথমটায় এই দিব্যজীবনকে আয়ত্তে আনার চেষ্টা করতে হবে ব্যক্তিগত ভাবেই। বৈজ্ঞানিক যেমন তার ব্যক্তিগত সাধনার দ্বারা কোনো একটা সত্যকে আবিষ্কার করতে আগে নিজেই আপন ল্যাবরেটরিতে বসে প্রাণপণ চেষ্টা করে, তার পরে সেই সত্যটির আবিষ্কার হয়ে গেলে তখন তা সকলের জন্য প্রকাশ্যে বিতরণ করে দেয় এবং সকলেই তার সুফল ভোগ করে, এখানেও সেই কথা। দিব্যজীবনের জন্য সাধনা চলবে প্রথমে নিজেরই দিক থেকে, কিন্তু এই সংসারক্ষেত্রের মধ্যে থেকেই, একে বর্জন করে বা এড়িয়ে থেকে নয়। তার পরে উচ্চতর চেতনার আলো যখন নেমে আসবে সেই ব্যক্তিগত সাধকের মধ্যে, তখন তা আরো অনেকের মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে চারিদিকে আলোকবিস্তার করতে থাকবে।

এইরূপে জনে জনে অনেক সাধকের ভিতর দিয়ে দিব্যজীবন যখন এখানে বাস্তবরূপে অবতরণ করবে, তখন তার রাজ্য হবে নির্মল চেতনার রাজ্য, এখনকার মতো আবিল চেতনার নয়; তখনকার জ্ঞান হবে প্রত্যক্ষ এবং তা বোধিমূলক সহজ জ্ঞান, এখনকার মতো যুক্তিনির্ভর জ্ঞান নয়; তখনকার জীবন হবে আঁধারের বদলে আলোর, আন্দাজের বদলে সুনিশ্চিতের, ব্যর্থতার বদলে সার্থকতার, কুটিল দুঃখের বদলে সরল আনন্দ, ভয়ের বদলে নির্ভয়ের, হতাশার বদলে পরিপূর্ণ ভরসার জীবন। বেঁচে থাকার আনন্দ মানুষ এমনভাবে দৈবাৎ একটু আধটু মাত্রই ভোগ করবে না, তা পুরাপুরিভাবেই তখন মিলতে থাকবে। সুতরাং কোনোগতিকে নিজের একটু সুখের ব্যবস্থা করে নেবার জন্য এখনকার মতো তাকে নানাবিধ ব্যভিচার ও দুর্নীতি ও দুঃসাহসের ও মিথ্যার আশ্রয় নিতে হবে না। তার বাক্যেও পরিবর্তন আসবে, আচরণেও পরিবর্তন আসবে, দেহে ও প্রাণে ও মনে সব দিক দিয়েই পরিবর্তন আসবে। সুতরাং অযথা কষ্টভোগ ও মৃত্যুভয়েও তাকে অস্থির হতে হবে না। অস্তিত্বকে সে সম্পূর্ণরূপেই উপভোগ করতে পারবে।

প্রাকৃতিক নিয়মে মানুষ একদিন এই দিব্যজীবনের অবস্থায় গিয়ে পৌঁছবেই, এরূপ মধ্যবর্তী ত্রিশঙ্কুর অবস্থাতে সে চিরকাল থাকবে না। তবে স্বাভাবিক নিয়মে সে পরিবর্তন আসতে অনেক যুগ লেগে যেতে পারে। কিন্তু মানুষের নিজের সাধনা থাকলে এবং তার সঙ্গে ভগবানের কৃপা এসে যোগ দিলে সে পরিবর্তন খুবই ত্বরান্বিত হবে। আপাতত অতিমানস চেতনা আমাদের দিকে অনেকটাই এগিয়ে এসেছে, এখন আমাদেরও সচেষ্ট হয়ে সেই দিকে এগিয়ে যাওয়া দরকার। মোটামুটি এই হলো শ্রীঅরবিন্দের মূল বক্তব্য।

কিন্তু কেবল দিব্যজীবনের দিকে অগ্রসর হবার জন্যই নয়, শ্রীঅরবিন্দ বলেন যে সাধারণ পথেও নিরাপদে ও ভরসার বর্মে আবৃত হয়ে চলতে কেবল এই দুটি জিনিসকে জীবনের সম্বল করে যদি নিতে পারো তাহলেই তুমি দুঃখ হতে বেঁচে গেলে-একদিকে চাই মা ভগবতীর কৃপা, আর তোমার দিক থেকে চাই বিশ্বাস, ঐ বিষয়ে অন্তরের ঐকান্তিকতা ও সমর্পণ। অতঃপর এখন সেই সকল কথাই আমাদের যথাক্রমে আলোচ্য।

*** "সমস্ত ভয়, বিপদ এবং বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে সাঁজোয়া জীবনের মধ্য দিয়ে চলার জন্য কেবল দুটি জিনিসের প্রয়োজন, দুটি যা সর্বদা একসাথে যায় - ঐশ্বরিক মায়ের করুণা এবং আপনার পাশে বিশ্বাস, আন্তরিকতা এবং আত্মসমর্পণ দ্বারা গঠিত একটি অভ্যন্তরীণ অবস্থা।" - শ্রী অরবিন্দ।

***


আস্পৃহা

আদিম যুগ থেকে মানুষ কতকটা এমনি মনোভাব নিয়েই নানারূপ পূজা আরাধনা ও ধর্মচর্চা প্রভৃতি ক্রিয়াগুলি করে আসছে। বুদ্ধির দ্বারা নয় কিন্তু সহজ বোধের দ্বারাই মানুষ বুঝেছিল যে, দুনিয়ার সর্বশক্তিমান মালিক কেউ একজন আছেন। তিনি সব-কিছু করতে পারেন আর সব-কিছু দিতে পারেন, কিন্তু অন্তরালে থাকেন বলে আমরা সহজে তাঁর নাগাল পাই না।

আমার নিজের মধ্যেও ভগবান বিরাজ করছেন, তবু আমি তাঁকে একবারও দেখি না কেন? শ্রীঅরবিন্দ তার জবাবে বলেছেন, তোমার এখনও চোখ ফোটেনি তাই, তোমার মধ্যে এখনও আলো জ্বলেনি তাই। স্থিরতার দ্বারা স্বচ্ছ রকমের একটা অনুভব আসে, আর সেই স্বচ্ছতার দ্বারা ক্রমশ ধীরে ধীরে একটা জ্ঞানদৃষ্টি খোলে। তার জন্য আগে সমস্ত অস্থিরতা ও আবিলতা দূর করা দরকার। এখন তোমার মনের ভিতরটা কাদাগোলা জলের মতো ঘোলাটে হয়ে আছে। জল অতি স্বচ্ছ জিনিস, তার ভিতর দিয়ে তলা পর্যন্ত দেখা যায়, কিন্তু বর্ষার গঙ্গার কাদাগোলা ঘোলাটে জল দেখে সে কথা মনেই হবে না। সে জল একবারও স্বচ্ছ হয় না, কারণ তা ছুটন্ত স্রোতের জোয়ার-ভাটায় অনবরতই তোলপাড় করছে। আগে বর্ষা কেটে যাক, স্রোতের টান কমে আসুক, তখন দেখা যাবে যে তার থিতোনো জল বাস্তবিকই স্বচ্ছ, বাস্তবিকই তার ভিতর দিয়ে তলা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। আকাশে যখন চাঁদ উঠবে তখন সেই স্থির জলে তার নিখুঁত প্রতিবিম্ব দেখবে, তখন দেখবে উপরের আকাশের চাঁদ জলের তলা পর্যন্ত ডুবে রয়েছে। তাই শ্রীঅরবিন্দ বলেন যে, অশুদ্ধ ঘোলাটে মন নিয়ে ভগবানের সঙ্গে যোগের সাধনা চলে না, অশুদ্ধের সঙ্গে বিশুদ্ধ মিল খায় না। আগে চাই অচঞ্চল ভাবে আত্মশুদ্ধির প্রয়াস। তাকেই বলা হয়েছে অশুদ্ধির প্রত্যাখ্যান, তাকেই বলে তপস্যা। দিব্যজীবনে উত্তীর্ণ হতে হলে আগে এই তপস্যা থাকা চাই। এমন তপস্যা ছাড়াও হয়তো কেবল মনের সাধনাতে এরূপ যোগ- সিদ্ধি মিলতে পারে, কিন্তু তাতে ভগবানের প্রকৃতির সঙ্গে আমার প্রকৃতির মিল করে নেওয়া হয় না।


অতিমানস উপলব্ধি

এতে স্বয়ং ভগবানকে পাওয়া ছাড়িয়েও তাঁর মূল অতিমানস চেতনাতে গিয়ে পৌঁছানো যাবে। তাঁর সেই অতিমানস চেতনা ও আমাদের সাধারণ মানব-চেতনার মধ্যে ধাপে ধাপে অনেকগুলি স্তর আছে। মনের স্তরের ঠিক উপরেই রয়েছে উচ্চমানসের স্তর (higher mind), তার উপরে জ্ঞানদীপ্তির স্তর (illumined mind), তার উপরে বোধির স্তর (intuitive mind), তার উপরে অধিমানসের স্তর (overmind), এবং সবার উপরে অতিমানসের স্তর (supermind)। নিচের স্তরগুলিকে একে একে অতিক্রম করে তবে সেখানে পৌঁছনো যায়। তেমনি উপলব্ধিরও স্তরভেদ আছে। প্রথমে অনুভূতির মধ্যে তাঁকে পাওয়া, তার পরে উপলব্ধির মধ্যে প্রত্যক্ষ-দর্শন, তার পরে সামীপ্য অর্থাৎ সর্বক্ষণই তাঁর নিকট-উপস্থিতি বোধ করতে থাকা, তার পরে সাযুজ্য অর্থাৎ তাঁর সঙ্গে মিলে যাওয়া, অতঃপর আসে চরম অতিমানস চেতনা।


দিব্যজীবনে ব্যক্তির সার্থকতা ও পরিপূর্ণতা


দিব্যজীবন পেয়ে আমাদের কী লাভ হবে?

ঋগ্বেদ বলেছেন, ভগবানের ক্রতু বা দিব্যশক্তি পেয়ে বিশ্বজন দেবত্ব লাভ করবে। তার মানে মানুষ এর চেয়েও বেশিরকম কিছু শক্তি ও চেতনা পেয়ে পূর্ণপরিণত হয়ে উঠবে। এখনকার চেতনাতে তার আসল স্বরূপ অর্ধস্ফুট হয়েছে মাত্র, সেই জীবনে তা আরো উত্তমরূপে পূর্ণ- প্রস্ফুটিত হতে পারবে।

দিব্যজীবনে মানুষের চেহারা ভিতরে বাহিরে সকল বিষয়ে কি একই রকমের হবে? এখনকার বুদ্ধির বিচারে আমাদের তাই হয়তে। মনে নেয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা হবে না। এখনকার মতোই প্রত্যেকের স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা তার স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে চলবে, কিন্তু সেই ব্যক্তিত্বই দিব্য ভাব পেয়ে তার আপন পরিচয়ের ভিতর দিয়ে পূর্ণতা লাভ করবে। ঠিক যেমন ভিন্ন ভিন্ন আকৃতি ও সৌন্দর্য ও সৌরভ নিয়ে বাগানের হরেক রকমের ফুলগুলি ফুটে ওঠে। যে গোলাপ সে গোলাপই থাকে, যে চাঁপা সে চাঁপাই থাকে, তাদের দেখলেই গোলাপ এবং চাঁপা বলে নির্ভুলভাবে চেনা যায়, কিন্তু সম্পূর্ণরূপে ফুটে উঠেছে দুজনেই, আধফোটা হয়ে কেউ রয়ে গেল না, না-ফুটে কেউ ঝরে পড়ল না। দুজনেই নিজের নিজের পরিণতি পেয়েছে, দুজনের জীবনই সার্থক হয়েছে। ওদের রূপও রইল আলাদা, গন্ধও রইল আলাদা, কিন্তু তৎসত্ত্বেও দুজনেই আপনাকে মেলে দিতে পেরেছে, তাই জন্মানো বৃথা হলো বলে কারো তরফে কোনো ক্ষোভ নেই।

এমনি ব্যক্তিত্ব কিছু থাকবেই। এখনই কি আমাদের ব্যক্তিত্ব নেই? যথেষ্টই আছে, কিন্তু সে কেবল অজ্ঞানে ভরা অন্ধ ব্যক্তিত্ব, নিজেকেও সে  দেখতে পায় না। কারণ সে আমাদের কেবল মন-প্রাণ-দেহেরই ভাগ করে নেওয়া ব্যক্তিত্ব, ভিতরে আসল যে আত্মপুরুষ চাপা পড়ে আছে তার খাঁটি ব্যক্তিত্ব নয়। এখানকার যে ব্যক্তিত্ব তা আমাদের সত্তার প্রত্যেকটি অংশের অহং ভাবনাতেই ভরপুর। এ ব্যক্তিত্ব কেবল নিজেকে চেনে আর নিজের জনকয়েক আত্মীয়-স্বজনকে চেনে, তা ছাড়া আর কিছু চেনে না। আমার বেলাতেও তাই আর প্রত্যেকের বেলাতেও তাই।

এখনকার জীবনে আমরা কেউ কাউকে জানি না, বুঝি না। মানুষ হয়ে আমরা খুব কাছাকাছি বাস করেও পরস্পর থেকে সরে আছি অনেকখানি দূরে। শুধু তাই নয়, কেউ কাউকে আমরা সহ্য করতে পারছি না, সকলকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে নিজেই কেবল বড়ো হতে চাইছি। এতে প্রত্যেকেই প্রত্যেককে বাধা দিচ্ছে, এবং সেই কারণে কেউ-ই ভালো করে ফুটে উঠতে পারছি না। এমন সংকীর্ণ স্বার্থপর ব্যক্তিত্ব নিয়ে কতকাল চলতে পারে? এতে ফুটে ওঠা তো আমাদের কখনই হবে না। ভালো করে ফুটতে গেলে আমাদের ব্যক্তিচেতনার এর চেয়ে প্রসার হওয়া চাই। সেই কারণেই আমাদের এর চেয়ে বৃহত্তর জীবন অর্থাৎ দিব্যজীবন লাভ করা দরকার।

কিন্তু তা করতে হলে বহির্মুখী জীবনের হৈ হৈ হট্টগোল ছেড়ে অন্তর্মুখী হয়ে নিজেদের অন্তরের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে আমাদের এখনকার বহির্মুখী প্রকৃতি স্বভাবতই আপন অহংএর ব্যাপার নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে থাকে, অন্য কোনো কথা ভেবে দেখতে তার সময় নেই। এ-ও অবশ্য অস্তিত্বেরই একটা লক্ষণ বটে, কিন্তু সে অস্তিত্বের চেতনা একেবারে সীমাবদ্ধ, সেখানে শক্তিও তারই মধ্যে থেকে সংকুচিত। তাই দুঃখদৈন্য প্রতি মূহূর্তেই আঘাত দিয়ে আমাদের কাবু করতে থাকে। অতএব ঐ অগভীর অবস্থায় থাকলে আমাদের চলবে না, আরো গভীরে এবার তলিয়ে যেতে হবে।

গভীরে তলিয়ে যাওয়া কঠিন বটে। বাহ্যচেতনা নিয়েই যাদের কারবার তাদের পক্ষে সে একটা দুঃসাধ্য সাধনা। কিন্তু তা ছাড়া নিজের স্বরূপ উপলব্ধি করবার অন্য কোনো পথ নেই। একমাত্র ঐ উপায়েই আমরা সংকীর্ণ চেতনার গণ্ডী ছেড়ে বৃহত্তর চেতনাতে ও বিশ্বচেতনাতে উত্তীর্ণ হতে পারি। ষোলকলায় পূর্ণ হয়ে ওঠা কেবল ভিতরদিক থেকেই সম্ভব, বাইরের দিক থেকে কোনোমতে নয়।

তবে সেই পূর্ণতার মধ্যে বৈচিত্র্য থাকবেই। আর একের মধ্যে প্রবেশলাভ করে বহুর বৈচিত্র্যকে উপলব্ধি করা হবে সেই পূর্ণ চেতনার এক অপরিহার্য অঙ্গ। ঐক্যের মধ্যে বৈচিত্র্য, আর বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য, এই দেখবার দিব্যদৃষ্টি যখন আমরা পেয়ে যাবো, তখন নিজেকে সকলের সঙ্গে এক করে মিলিয়ে আমি দেখতে থাকবো, এবং তখনই বুঝে নিতে পারবে। যে আমার আসল ব্যক্তিত্বের স্বরূপ কি এবং তার প্রকৃত মূল্য কোথায়। তখন বুঝতে পারবে। যে কেমনভাবে আমার প্রকৃতি নিজের বৈশিষ্ট্যটুকু বজায় রেখে সকলের পাশাপাশি থেকে পূর্ণতায় ফুটে উঠতে চাইছে। সেই ব্যক্তিত্বই হবে যথার্থভাবে সার্থক।

নিজেকে নিয়ে আলাদা হয়ে থাকাতে ব্যক্তিত্বের পূর্ণবিকাশ নয়, সকলের মধ্য থেকে ফুটে ওঠাতেই পূর্ণবিকাশ। জনে জনে যখন এই- ভাবে ফুটে উঠবে, সেই হবে দিব্যজীবন। তাতে প্রত্যেকেই হবে নিজের দিক থেকে ও সকলের দিক থেকে সার্থক।

ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন ভগবানের কোনো একটি কাজ করবার জন্য, তাঁর বহুবৈচিত্র্যের মধ্যে বিশেষ কোনো একটি রূপকে ফোটাবার জন্য, বিশেষ কোনো একটি সৌরভকে বিকাশ করবার জন্য। একই চেতনাকে বহুভাবে অভিব্যক্ত করবার জন্য বহু ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন। সেখানেই ব্যক্তিত্বের যথার্থ সার্থকতা। সেই ব্যক্তিত্বকে সেইভাবেই বজায় রেখে তাঁর হাতে সমর্পণ করে যদি দেওয়া যায় তাহলে তিনিই তার যথা-ইচ্ছা পরিণতি ঘটাবেন।

***

আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ।

যোগাযোগ- 9830925502


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

ব্যবস্থাগত অসম্পূর্ণতা নাকি নেতৃত্বের ব্যর্থতা?