বিকল্প নবজাগরণ: কোন কোন উপাদান চেতনা বিকাশে সহায়ক হতে পারে?
আমাদের কাছে যে "সম্পূর্ণ সমাধান - নতুন সামাজিক রাজনৈতিক অর্থব্যবস্থা"টি লিপিবদ্ধ অবস্থায় এসেছে, সেই ব্যবস্থাটির সাথে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বেশ কিছু ক্ষেত্রে মিল লক্ষ্য করা গেছে। তবুও কিছু অমিলও রয়েছে। আমার মতে এই সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থাটি খুবই আধুনিক ও সম্পূর্ণ ব্যবস্থা। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা সমাজে আনয়নের জন্য যে উপায় বা পথ মার্কসবাদে বলা হয়েছে, তা হলো শ্রেণীসংগ্রাম এবং শ্রেণী সংগ্রামের এক চূড়ান্ত অবস্থায় রাজনৈতিক সশস্ত্র বিপ্লব। বিভিন্ন দেশে মানব সমাজের ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য ইতিহাসে আমরা দুই রকম বিপ্লব দেখতে পাই। (১) সশস্ত্র বিপ্লব ও (২) সাংস্কৃতিক নবজাগরণ। পৃথিবীতে যেসব ক্ষেত্রে সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে, সেক্ষেত্রে এই দুই ধরণের বিপ্লব দেখা গেছে। সশস্ত্র বিপ্লবের ক্ষেত্রে এক বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এই আধুনিক পৃথিবীতে যেখানে বেশির ভাগ রাষ্ট্র প্রতিরক্ষা খাতে প্রচুর ব্যয়ের মাধ্যমে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে বলীয়ান, সেক্ষেত্রে সশস্ত্র বিপ্লবের ক্ষেত্রে এক বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে। তাছাড়া, অনেক রাষ্ট্রেই সংসদীয় ব্যবস্থা কায়েম আছে যেখানে বেশ কিছুটা গণতান্ত্রিকতাও রয়েছে। আর, বর্তমানে সমাজমাধ্যমের জোরালো উপস্থিতির দরুণ মানুষের সাথে মানুষের মত বিনিময় অনেক সহজ হয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের পলিসি কী হবে?
সোশ্যাল মিডিয়া বা সমাজমাধ্যমকে ব্যবহার করে সমাজের বহু পরিবর্তন করা যেতে পারে। তবে তার সাথে সাথে কিছু অফলাইন সভা-সমিতি, কিছু সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক-সামাজিক অনুষ্ঠানেরও প্রয়োজন হবে।
আমরা সমাজমাধ্যমকে ব্যবহার করে যথার্থ সাংস্কৃতিক আন্দোলন এমনকি বর্তমান শতকে নবজাগরণের অনেকটা সার্থক প্রয়াস নিতে পারি।
আমরা কোন সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি ইউটিউব চ্যানেল তৈরি করতে পারি যার নাম হতে পারে "একুশ শতকে নবজাগরণ"। নাম থেকেই এর উদ্দেশ্য বোঝা যায়। এর উদ্দেশ্য হলো 'নবজাগরণ'। চলতি শতকে নবজাগরণের উপাদানগুলি যেমন- মনীষীর (কোন ধর্মীয় মনীষী নয়) জীবনী পাঠ, যে সকল মানুষ সাধারণ হয়েও তাঁদের ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায়ের প্রভাবে নিজেদের এক বিরাট উচ্চতায় তুলে ধরেছেন, তাঁদের সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ, সাধারণ কুসংস্কার বিরোধীতা, জ্যোতিষ বিরোধীতা, ঈশ্বর বিরোধীতা, ধর্মের সমালোচনা, বিবাহ-শ্রাদ্ধ-অন্নপ্রাশনে অপ্রয়োজনীয় ধর্মীয় আচার-আচরণ বর্জনের প্রচার, পরিবেশ সচেতনতা, জল সচেতনতা, সমাজ সচেতনতা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, বিভিন্ন নেশাদ্রব্যের কুপ্রভাব বিষয়ে সচেতনতা, গরিবদের উপর ধনীদের শোষণের বিষয়ে রাজনৈতিক সচেতনতা ইত্যাদি। আমরা যদি এরূপ ইউটিউব চ্যানেলের কণ্টেণ্ট ছোট ও আকর্ষণীয় করে তৈরি করতে পারি এবং কিছু শর্ট ভিডিও ও বেশ কিছু কয়েক মিনিটের ভিডিও তৈরি করতে পারি, যদি আমরা কিছু শ্রুতিনাটক ভাল বিষয়ের উপর (যেমন, নাস্তিকতা নিয়ে নাটক, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী নাটক যেমন, মুসলমানীর গল্প, আদাব, মহেশ ইত্যাদি; দুর্নীতিবিরোধী নাটক যেমন, ঘুষ, এছাড়া মরণোত্তর দেহ ও চক্ষুদান, থ্যালাসেমিয়া, এইডস ইত্যাদির সচেতনতা বিষয়ক নাটক, ভিডিও ইত্যাদি) তৈরি করে ইউটিউবে আপলোড করি এবং আমাদের সদস্যরা প্রতিটি ভিডিও দেখে ও শেয়ার করে তাহলে প্রচুর মানুষ ভিডিও দেখবে ও প্রভাবিত হবে।
এছাড়া, আমরা একই বিষয় "একুশ শতকে নবজাগরণ" নিয়ে একটি ফেসবুক পেজ ও একটা ব্লগ ওয়েবসাইট বানাতে পারি। এই ফেসবুক পেজে আমরা বর্তমান শতকের নবজাগরণের উপাদানগুলি নিয়ে ভিডিও, কিছু নিবন্ধ পোস্ট করতে পারি। আর, ব্লগ ওয়েবসাইটে থাকবে শুধুই কণ্টেণ্ট। কণ্টেণ্টের বিষয়গুলি হবে নবজাগরণের বিষয়।
ফেসবুক পেজটিতে ইউটিউব চ্যানেলের লিঙ্ক ও ব্লগ-ওয়েবসাইটের লিঙ্ক দেয়া থাকবে। একইভাবে ব্লগ ওয়েবসাইটটিতে ফেসবুক পেজ ও ইউ টিউব চ্যানেল উভয়ের লিঙ্ক দেয়া থাকবে।
এই ইউটিউব চ্যানেলের ভিডিওগুলি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য আমাদের কোন এক বা একাধিক সংগঠনকে কাজে লাগাতে হবে। একাজে প্রত্যেক সদস্যকে দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে তার হোয়াটসঅ্যাপে যে কজনের কন্টাক্ট নম্বর (হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর) আছে, তার মধ্যে সংগঠনের সদস্য বাদে যারা রয়েছেন, তাঁদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর নিয়ে একটি, দুটি, তিনটি বা চারটি ব্রডকাস্ট গ্রুপ গঠন করা যাতে প্রত্যেক ব্রডকাস্ট গ্রুপে সর্বাধিক ২৫৬ জন থাকতে পারে। এরপর, প্রত্যেক সদস্য যদি প্রত্যেকটি ভিডিও প্রকাশ হবার পরেই নিজে দেখে লাইক, কমেণ্ট করে এবং তাদের এই তিনটি বা চারটি ব্রডকাস্ট গ্রুপে শেয়ার করে তবে এইভাবে অসংখ্য ব্যক্তির কাছে ভিডিওগুলো পৌছে যাবে। একটা আন্দাজ করা যাক। যদি ধরা যায়, সংগঠনের সদস্য সংখ্যা পাঁচশো, আর প্রতিজন তাঁদের ব্রডকাস্ট গ্রুপ ও ফেসবুক অথবা ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে কমপক্ষে এক হাজার জনকে পাঠাতে পারেন, তবে এভাবে ৫০০×১০০০ = পাঁচ লাখ লোকের মধ্যে শেয়ার করা যাবে। আর এর সাথে যদি প্রত্যেক ক্ষেত্রে একটা হার্দিক অনুরোধ থাকে ভিডিওগুলি শেয়ার করবার জন্য তবে সেখান থেকেও অনেকের কাছে শেয়ার হতে পারে। যদি আমরা এক হাজার সদস্যকে একাজে যুক্ত করতে পারি, তবে দৈনিক পাঁচ মিনিটের চেষ্টায় প্রত্যেক সদস্য কমপক্ষে তাদের ব্রডকাস্ট গ্রুপের এক হাজার জন (৪×২৫০=১০০০) -কে ভিডিওগুলি প্রত্যেক দিন অথবা দু-একদিন বাদে বাদে পাঠাতে পারবে। ফলে মোট (১০০০×১০০০=১০,০০,০০০) বা দশ লাখ মানুষের মধ্যে সচেতনতা ছড়িয়ে পড়বার সম্ভাবনা থাকবে। আর, এই ব্রডকাস্ট গ্রুপের ক্ষেত্রে সুবিধা এই যে, এরা জানতেও পারবে না যে, এরা কোন ব্রডকাস্ট গ্রুপে রয়েছে। কারণ, এদের কাছে পাঠানো ভিডিওগুলো এরা এককভাবে পাবে। এককভাবে এরা উত্তরও দেবে। একজনের উত্তর আর একজন দেখতেও পাবে না।
এইভাবে ব্রডকাস্ট গ্রুপকে কাজে লাগিয়ে আমরা প্রতিটা ভিডিও ছ-সাত লাখ লোকের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারবো।
এবারে, আলোচনা করা যাক, রডকাস্ট গ্রুপ কাদের নিয়ে গঠন করা হবে? এক্ষেত্রে বলা যায়, মূলতঃ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানুষেরাই সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক অন্দোলনের চালিকাশক্তি। অর্থাৎ, "একুশ শতকে নবজাগরণ" যদি কোন বিমান অথবা জাহাজ হয়, তবে তার পাইলট হবে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত। এই শ্রেণীর মানুষকে যদি বৌদ্ধিক, সাংস্কৃতিক অথবা সামাজিক -রাজনৈতিকভাবে বিকশিত করা যায়, তবে সেই ঢেউ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়বে গোটা সমাজে।
সোশ্যাল মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে নবজাগরণ প্রয়াসের পাশাপাশি অফলাইনেও যথেষ্ট উদ্যোগ নিতে হবে।
- ১) সোশ্যাল মিডিয়ায় যে ব্লগ ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ বা ইউটিউব চ্যানেল তৈরি করে অনলাইনে পড়ানোর অথবা শোনানোর এবং শেয়ার করার অনুরোধ থাকবে, পাশাপাশি সেই ব্লগ ওয়েবসাইট এবং ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলের প্রচারের জন্য ব্রডকাস্ট গ্রুপগুলোর বাইরে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ছোট প্রচারপত্র বেশ কিছু সংখ্যায় ছাপিয়ে সংগঠন সদস্যদের মাধ্যমে বিভিন্ন বাসডিপোতে অপেক্ষারত মানুষের মধ্যে, অথবা ট্রেনে/বাসে সুবিধামতো মানুষের হাতে পৌঁছে দিতে হবে এবং সোশ্যাল মিডিয়ার সাইটগুলি পড়ার বা শোনার জন্য অনুরোধ করা হবে।
- ২) বিশেষ কিছু বিষয়ে, যেমন, রক্তদান-চক্ষু-দেহদান-থ্যালাসেমিয়া বিষয়ে সচেতনতা প্রচারের লক্ষ্যে একটি পরিকল্পিত লিফলেট বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে কোন এলাকায় রক্তদান উৎসবের দিন কতক পূর্বে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশেষ করে রক্তদান-থ্যালাসেমিয়ার সচেতনতা গড়ার লক্ষ্যে যুবক-যুবতীদের মধ্যে এবং চক্ষুদান-দেহদান এর অঙ্গীকারের লক্ষ্যে যুব ও প্রৌঢ়-বৃদ্ধদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন ক্লাবে অথবা শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলিতে এবং বিভিন্ন এনজিওগুলির মধ্যে প্রচার করতে হবে বিশেষভাবে। এটি প্রচার করতে হবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং প্রচারের সময় সুযোগ বুঝে অর্থসাহায্য গ্রহণের চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে মনে হয়, এধরণের লিফলেট ছাপানোর খরচের জন্য অনুদানের কথা বললে ভালো অনুদানও মিলবে।
- ৩) উপরিউক্ত লিফলেট সংক্রান্ত অনুদান থেকে ওই লিফলেট ছাড়াও জ্যোতিষবিরোধী লিফলেট, কুসংস্কার বিরোধী বুকলেট; পণপ্রথা, বাল্যবিবাহ- এসব বিষয়ে বুকলেট তৈরি করে মানুষের মধ্যে দিতে হবে।
- ৪) এছাড়া, মূল্যবোধ-ইচ্ছাশক্তি-চরিত্রগঠন নিয়েও বুকলেট তৈরি করে মানুষকে দিতে হবে। এক্ষেত্রে কিছু অনুদানও মিলতে পারে।
- ৫) জ্যোতিষ বিরোধীতা, কুসংস্কার বিরোধীতা নিয়ে কিছু পোস্টার তৈরি করে দেয়ালে সাঁটা যেতে পারে।
- ৬) একুশ শতকের নবজাগরণের উপাদানগুলো নিয়ে একটি বই তৈরি করা যেতে পারে।
- ৭) ছাত্র-ছাত্রীদের মানুষ গড়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন মনীষীদের জীবনী (ধর্মীয় মনীষী ব্যতীত), ইচ্ছাশক্তি, চরিত্র গঠন, বিভিন্ন সমাজকর্মীদের কিছু সামাজিক কাজ, কিছু মোটিভেশনাল নিবন্ধ, কিছু মুক্তমনা মানুষদের জীবনী, স্বাস্থ্য সচেতনতা, সমাজ সচেতনতামূলক ছোট প্রবন্ধ, কিছু উল্লেখযোগ্য কবিতা, কুসংস্কার বিরোধী ছড়া, নিবন্ধ, - এসব নিয়ে একটি বই "মানুষ গড়ো নিজেকে" প্রকাশ করা যেতে পারে।
- ৮) সংগঠনের সকলে মিলে বৃক্ষরোপণের ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে পারি। সেক্ষেত্রে, খেজুর ও তালগাছের বীজ সংগ্রহ করে ওগুলো জীবাণুমুক্ত করে রোপণের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনামাফিক রোপণ করা হবে নির্দিষ্ট স্থানে। এবং, এগুলো রোপণের একটা রাফ ম্যাপও তৈরি করা হবে। একইসাথে কোন জায়গায় (রাস্তার ধারে অথবা নদী বা খালের ধারে) গাছ লাগানো যেতে পারে তারও একটা ম্যাপ থাকা বাঞ্ছনীয়।
পরিশেষে এটা বলা যায়, এভাবে নবজাগরণের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতি নির্মাণ করে সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদকেও প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে, যা আজ সময়ের দাবি।
আমরা নবজাগরণের আন্দোলনের শেষদিকে নবজাগরণের প্রচারের সাথে সাথে সম্পূর্ণ সমাধানের প্রচার শুরু করে দিতে পারি। নবজাগরণের মাধ্যমে উন্নত সাংস্কৃতিক চেতনায় সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তুলে সেই সমাজের কাছে আমাদের "সম্পূর্ণ সমাধান" ব্যবস্থার খসড়া তুলে ধরলে এই উন্নত বৌদ্ধিক সমাজ সহজেই তা গ্রহণ করবে। এরপর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে সংসদীয় পার্টি গঠন করে "সম্পূর্ণ সমাধান" ব্যবস্থা সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে ধাপে ধাপে।
সমীক্ষা কিংবা মতামত প্রদানে সকলে স্বাগত।
---পার্থপ্রতিম গুহ
***

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন