ULM প্রশ্নোত্তরীঃ সামাজিক মডেল (পরিবার, জলবায়ু, ধর্ম)


 সামাজিক মডেল

৪২. এই ব্যবস্থা দ্বারা পারিবারিক হিংসা কীভাবে বন্ধ হবে?

এই ব্যবস্থায় পরিবারের সকলেই আর্থিকভাবে ব্যবস্থার উপর নির্ভর করবে শিশু, বৃদ্ধ, যুবক, স্বামী, স্ত্রী সকলে ব্যবস্থার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সমস্ত বস্তু-পরিষেবা অর্ডার করতে পারবে কেউই একে অপরের উপর বোঝা হয়ে থাকবে না। ফলে সমস্ত সম্বন্ধ প্রেমের আধারেই তৈরি হবে। প্রথমত, একসাথে থাকার জন্য কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না দ্বিতীয়ত, কেউ সহিংসতার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়ে যাবে তার উপর উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা হবে, এমনকি ব্যবস্থা থেকে বরখাস্তও হতে পারে একে তো এমন হিংসা কেউ করবে না, যদি করে বসে তবে তা শাস্তিযোগ্য হবে।


৪৩. এই ব্যবস্থা জলবায়ু পরিবর্তন এবং দূষণকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে?

এই ব্যবস্থায় দূষণ সৃষ্টিই হবে না তাই বন্ধ করার প্রশ্নই নেই। নতুন ব্যবস্থায় সমস্ত প্রক্রিয়া এমনভাবে ব্যবস্থিত করা হয়েছেকোনো স্থান, প্রকৃতি, মনুষ্য জীবন অথবা অন্যান্য জীব জন্তুদের যেন হানি না পৌঁছায়এখানে পরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা শহুরে ব্যবস্থা থাকবেপ্রতিটি শহরে ২ থেকে ৫ লাখের মধ্যে হবে। কম ঘনত্ব থাকার কারণে দূষণ উৎপন্ন হবে না। সমস্ত বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করার ব্যবস্থা থাকবে। জলের জন্যও কোনো অসুবিধা হবে না প্রচুর মাত্রায় খাল বিছানো থাকবে, প্রচুর বন থাকবে। গাছপালা অধিক থাকায় বাতাসও শুদ্ধ থাকবে অনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘটবে না। পশু-পক্ষীরাও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারবে এতে জৈবিক বৈচিত্র্য অব্যাহত থাকবে, অর্থাৎ ইকো-সিস্টেম স্থিতিশীল থাকবে। এইসব বিজ্ঞানীদের তত্ত্বাবধানে থাকবে


৪৪. নতুন ব্যবস্থায় ধার্মিক উন্মত্ততা এবং সংঘাত কীভাবে বন্ধ হবে?

এর জন্য নতুন ব্যবস্থায় একটি নিয়ম থাকবে। নিয়ম এটিই হবে যে সকলেই ধর্মীয় বিশ্বাস পালনে স্বাধীন থাকবে শুধুমাত্র একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে আপনার বিশ্বাস পালন যেন অন্য কারোর অসুবিধা উৎপন্ন না করেএকজনের বিশ্বাসের সাথে অপরজনের বিশ্বাসের মিল না থাকার কথা বলছি না, জীবনযাপনের ক্ষেত্রে যদি কোনো অসুবিধা সৃষ্টি করে তবে তাকে অপরাধ বলা হবে

প্রথমত, ধর্মীয় বিশ্বাস পালনে যদি কোনো ব্যক্তি কোথাও শোরগোল করে, কোনো গোষ্ঠী যদি রাস্তা অবরোধ করে অথবা মিছিল বের করে তবে তা অপরাধ হিসেবে ধরা হবে এবং দণ্ডনীয় হবে ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য নির্দিষ্ট স্থানের বন্দোবস্ত থাকবে, যা হবে বসতি অঞ্চল থেকে কিছুটা দূরে, সেখানে সকল ধর্মীয় গোষ্ঠী জমায়েত হয়ে নিজেদের ধর্মীয় কার্যক্রম পালন করতে পারবে এরপর সমাজে ফিরে এসে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে হবে

দ্বিতীয়ত, আপনি আপনার বিশ্বাসকে অন্যের উপর আরোপিত করতে পারবেন না। কেউ স্বেচ্ছায় আপনার সাথে যেতে চাইলে যাবে, যেতে না চাইলে যাবে না। যদি আপনি কারোর সাথে জবরদস্তি করেন তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং শাস্তিযোগ্য হবে

তৃতীয়ত, আপনি এটিকে মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখুন যে, মানুষ কেন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে চায়? কারণ তাদের বর্তমান জীবনে অনেক প্রকারের দুঃখ রয়েছে, জীবনে সুখের অভাব রয়েছে; তাই তারা এইসব আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একটু সুখী হবার চেষ্টা করে থাকে, কোথাও একসাথে জড়ো হয়, দু-চারজন মিলে কিছুটা সময় আনন্দময়য় মনোভাব নিয়ে কথা বলে। মানুষ দুঃখী হলে মন্দির, মসজিদ, গির্জা কিংবা অন্যান্য দেবালয়ে গিয়ে ঈশ্বর, পরমাত্মা, আল্লাহর সামনে কাকুতি মিনতি করে, এতে সাময়িক দুঃখ কিছুটা লাঘব হয় এবং কিছুটা মানসিক শক্তি পাওয়া যায় এই ভেবে যে, কেউ তো আছে যিনি আমাদের দেখছেন এছাড়া স্বর্গের গল্প, নরকের গল্প, এখানে না হলে অন্য কোনও জগতে গিয়ে সুখী হব ইত্যাদি বিষয় কল্পনা করতে থাকে বিশ্বাস এইটুকুই সাহায্য করে যখন নতুন ব্যবস্থা এসে যাবে এবং সবাই সব দিক দিয়ে সুখী হবে তখন আমার মনে হয় না পরমাত্মার কাছে কেউ কিছু চাইতে যাবে তখন এইসব বিশ্বাস এবং আচার-অনুষ্ঠানের অর্থ এমনটি আর থাকবে না যেমনটি বর্তমানে রয়েছে আপনি বাস্তবে দেখতেই পান যে অত্যন্ত বিত্তশালী পরিবারগুলির কেউই ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে না নতুন ব্যবস্থাতেও এসব ধীরে ধীরে বেমানান হয়ে যাবে। বর্তমানে যা কিছু রয়েছে সেসবকে এভাবেই রেখে দেওয়া যেতে পারে কারোর ক্ষতি না করে কিছু টিকে থাকলে সমস্যা কোথায়

প্রতিটি মানুষ নিজের ভাল মন্দ বোঝেসে নিত্যদিন নিজের এবং পরিবারের জন্য সুখী-সমৃদ্ধশালী জীবনযাপনের জন্য প্রচেষ্টা করে থাকেফলে মানুষ নিজেরাই বিচার করবে বর্তমান ব্যবস্থায় আজীবন ধর্মগুরুদের উপদেশ শুনে তাঁদের পূর্বপুরুষেরা কী পেয়েছে এবং একই প্রকার চলতে থাকলে ভবিষ্যতে নিজেদের জীবনে নতুন কী পরিবর্তন আসবে; অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থায় স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করেও তাঁরা কেমন জীবন পাবেনতুন ব্যবস্থা কারোর বিশ্বাসের অমর্যাদা করবে নাসকলে ব্যক্তিগত স্তরে নিজ ইষ্টদেবতার পূজা-প্রার্থনা পালনের জন্য স্বতন্ত্র থাকবেব্যবস্থা এটিই দেখবে যেন একজনের প্র্যাকটিস অপরজনের অসুবিধা সৃষ্টি না করে এবং কারোর স্বাধীনতায় যেন বাধা উৎপন্ন না করেএরপরও যদি কোনো গোষ্ঠী কিংবা ধর্মগুরু তাঁদের তত্ত্ব কিংবা জ্ঞান সমাজের জন্য সর্বাধিক উপকারী এবং সকলের সুখী-সমৃদ্ধশালী জীবন প্রদানে সর্বোত্তম পন্থা তবে তারা যেন মুক্ত মঞ্চে এসে প্রমাণিত করেন, এরপর তা আর মান্যতা হিসেবে থাকবে না বরং তথ্য হিসেবে প্রকাশিত হবে সর্বোত্তম সমাধান বলে প্রমাণিত হলে উক্ত জ্ঞান কিংবা তত্ত্ব নতুন ব্যবস্থার অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হবে যতদিন পর্যন্ত বিষয়টি প্রমাণিত না হয় ততদিন এইসব বিশ্বাস ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবেই থাকবে


৪৫. নতুন ব্যবস্থা বর্ণ প্রথাকে কীভাবে সম্বোধন করবে?


প্রথমে দেখা যাক কেন সমাজে বর্ণবাদ সৃষ্টি হয়েছে। বর্ণবাদ থাকার দুটি কারণ রয়েছে একটি হল অসমতা, যেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্যই মুখ্য কারণ যেখানে বিত্তশালীদের সাথে জীবনযাত্রার মান, শিক্ষা, উঠাবসা, থাকাখাওয়া, পরিচ্ছন্নতা, ঐশ্বর্যময়তা ইত্যাদি মেলে না যখন কেউ ভিন্ন স্তরের জীবনযাপন করছে তখন তারা একে অপরের সাথে কীভাবে সমান আচরণ করবে কীভাবে সমান সম্বন্ধ বজায় রাখবে? যখন তারা একইরকমভাবে জীবনযাপন করে না তখন দুপক্ষের মধ্যে মিলও থাকে না। সমান জীবনস্তর থাকলে আচরণ সমান হবে উঁচু-নিচুর মধ্যে কোনো সম্পর্কই ঠিকঠাক কাজ করে না। কোনো না কোনোভাবে অপছন্দ এসেই যায় পরে এইসব বিষয়ই ঐতিহ্যের মধ্যে প্রবেশ করে সামাজিক কাঠামোর রূপ নেয়। কিন্তু অর্থনৈতিক সমতা এসে গেলে এইসব সমস্যা থাকবে না। যখন সবাই সমান শিক্ষা এবং সমান সুখসুবিধা পাবে তখন এইসবের কোনো মূল্য অবশিষ্ট থাকবে না। নতুন ব্যবস্থায় আপনাকে জিজ্ঞাসা করা হবে না তোমার ধর্ম কী, জাত কী, বর্ণ কীতাই ধীরে ধীরে আপনা থেকেই এই বিষয়টি বিলুপ্ত হয়ে যাবে যে জিনিসের কোনো প্রাসঙ্গিকতা থাকে না তা আপনই বিলুপ্ত হয়ে যায়, টিকে থাকে নাএভাবেই ধীরে ধীরে এইসব কুপ্রথা বিলুপ্ত হয়ে যাবেতবে যারা এসব ধরে রাখতে চাইবে, তারা রাখতে পারে এতে কোনো পার্থক্য আসবে না কেননা মানুষ যেভাবে জীবনযাপন করতে চায় সেভাবে করতে পারবে। এরপরও যদি কেউ নিজেকে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, কায়স্থ কিংবা SC/ST/OBC’ ছাপ লাগিয়ে চালিয়ে যেতে চায় অথবা এইসব অপ্রয়োজনীয় শব্দ ব্যবহার করতে পছন্দ করে নিজের জন্য করবে

***

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

ব্যবস্থাগত অসম্পূর্ণতা নাকি নেতৃত্বের ব্যর্থতা?