ULM প্রশ্নোত্তরীঃ শিক্ষা মডেল
শিক্ষা মডেল
৩৫. বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় আপনি কী কী ত্রুটি লক্ষ্য করেছেন?
অনেক ধরনের
ত্রুটি রয়েছে। প্রথমত, অধিক পড়ার বোঝা। দ্বিতীয়ত, অল্প বয়স থেকেই লেখাপড়া শুরু হয়ে যাওয়া। তৃতীয়ত, উচ্চতর চাকরি পেতে পরিবারের সদস্যদের দ্বারা চাপ প্রদান। চতুর্থত, সকল শিক্ষার্থীর জন্য সমান স্তরে শিক্ষার ব্যবস্থাপনা না থাকা। পঞ্চমত, শিক্ষার্থীরা যে ধরনের শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ নিতে চায় তা গ্রহণের সুযোগসুবিধা না পাওয়া। অর্থাৎ যে ধরনের কাজ শিখতে
চায় তেমন ট্রেনিং পায় না। যে ধরনের কর্ম সম্পাদন করতে চায় তেমন জীবিকা পায় না। সুতরাং বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার এই সমস্ত ত্রুটিই
মানুষের উপর বোঝার মত চেপে বসেছে এবং শিক্ষার্থীকে সঙ্কুচিত করে রেখেছে। আমার মনে হয় এই অসুবিধাগুলি মানুষের সম্ভাবনাকে প্রসারিত হতে দেয় না। শিক্ষার্থী বুঝতে পারে শারীরিক দিক থেকে তো সে যুবা হয়ে উঠছে কিন্তু ভেতরে যেন মৃত। যেন মর-মর হয়ে জীবনযাপন করছে। এর অর্থ সে আসলে সুখে নেই। শুরুর দিকে দু-চার বছর মনে হয় জীবনে আনন্দ আছে, সুখ আছে। যখনই সে স্কুলে যাওয়া শুরু করে তখন থেকেই মনে হতে থাকে যেন শাস্তি শুরু হয়ে গিয়েছে। এরপর ২০-২৫ বছর বয়সে গিয়ে শিক্ষা সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত শাস্তি চলতে থাকে। একেবারে শুরু থেকেই যখন এমন অবস্থা তখন কীভাবে সে স্বাভাবিক মানসিকতার হয়ে উঠবে? সে কীভাবে সুখী হবে? কীভাবে ১৫০-২০০-৪০০ বছর অবধি জীবিত থাকবে? আদৌ কী সম্ভব? সুতরাং বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার এই প্রণালী শুধুই বোঝা চাপিয়ে চলেছে। শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষ বাস্তবে যেমন থাকতে পছন্দ করে তেমনভাবে থাকবে। যা হতে চায় তার জন্য সুবিধা-সাহায্য পাবে। এরপর ব্যবস্থা সেই ব্যক্তির কাছ থেকে যোগ্যতা অনুযায়ী সহযোগিতা নেবে যেন বিভিন্ন প্রকার ভোগ সামগ্রী, পরিষেবা ইত্যাদি উৎপন্ন হয়। যেন সকলে সুখী হতে পারে।
৩৬. আপনার মত অনুযায়ী শিক্ষার পরিভাষা কী?
শিক্ষা আমাদের
অন্তঃকরণকে শিষ্ট করে তোলে। সার্বিকভাবে শিক্ষাই আমাদের শিষ্ট করে তোলে। শিষ্টতা দ্বারাই মানুষ সভ্য হয়ে উঠে। সভ্যের অর্থ হচ্ছে যে
সমাজ তৈরি হয়েছে তাতে যেন সে আচরণের যোগ্য হয়ে ওঠে। সভ্য হবার অর্থ এই নয়
মানুষ একটি নষ্ট প্রাণী, তাকে শিক্ষা দিয়ে সংশোধন করতে হবে। মানুষ স্বাভাবিকভাবে যেমন হওয়া উচিত তেমনই হয়ে থাকে। শিক্ষার লক্ষ্য কেবলমাত্র এটিই হওয়া উচিত যেন সে সমাজের
নীতিনিয়ম সম্পর্কে সচেতন হতে পারে, যেন সে সামাজিক আচার ব্যবহারে সফল হতে পারে এবং সমাজে তার কর্ম কী হবে তা নির্বাচন
করতে পারে। যেন সমাজের উদ্দেশ্যে নিজের অবদান রাখতে পারে। এইজন্যই তো সমাজের রচনা
হয়েছে, যেন আমরা সকলে ইপ্সিত সুখ প্রাপ্ত করতে পারি। শিক্ষার মাধ্যমে আমরা জানতে
পারি কেন আমাদের কর্ম করা উচিত, কীভাবে করা উচিত, কোনটি সঠিক এবং কোনটি ভুল। কার সাথে কেমন ব্যবহার করা উচিত, সমাজে তার অবস্থান কীরূপ
হবে, কার সাথে কীভাবে মোকাবিলা করবে, কীভাবে আচরণ করবে– এসব শিক্ষার মাধ্যমে সহজে ও দ্রুত
জানা যায়। এটিই শিক্ষার পরিভাষা। শিক্ষা আমাদের শেখায় যে কীভাবে সুখী হওয়া যেতে পারে, কীভাবে জীবনের
লক্ষ্যগুলি পূরণ করা যেতে পারে, কেমন ব্যবস্থা
আমাদের প্রয়োজন, কীভাবে আমরা সেই ব্যবস্থায় একে
অপরের সাথে সহযোগিতার সাথে বসবাস করতে পারি ইত্যাদি। শিক্ষা আমাদের কোনো
একটি পেশায়, কোনো একটি বিষয়ে দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত করে তোলে। শিক্ষার অর্থ এটি কখনই হতে পারে না কেউ মন্দ মানুষ হয় এবং নৈতিকতা পাঠ করিয়ে করিয়ে
তাকে ভাল মানুষ তৈরি করতে হবে। অপরদিকে তাকে মূর্খ থেকে বিদ্বান হওয়ার জন্য জোর
প্রদান করতে হবে। দুটোই সঠিক পন্থা নয়।
উপসংহার এই যে মানব
জীবনের সার্বিক বিকাশের জন্য শিক্ষা অপরিহার্য। শিক্ষা আমাদের জন্য সঠিক অর্থে
সামাজিক হয়ে উঠতে সহায়তা করে। সামাজিক হওয়ার মাধ্যমেই সব ধরনের সুখের দরজা
খুলতে শুরু করে। কীভাবে সমাজের সকলকে সমৃদ্ধ করা যায়, সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করা যায়, কীভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সন্ধান করা যায়, কীভাবে সেই জ্ঞান-বিজ্ঞানকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে প্রেরণ করা যায় ইত্যাদি। যেন আগামী প্রজন্ম সহজে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে
সেই জ্ঞান লাভ করতে পারে। এছাড়াও শিক্ষা কীভাবে অধিক আবিষ্কারের দিকে নিয়ে যেতে
পারে, যা আবিষ্কৃত হয়েছে তা জীবনের সুবিধার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে, যেন আমরা অধিক সুখী
হতে পারি। পরিবার এবং সমাজ গঠনের উদ্দেশ্যও তো
তাই। এই কাঠামো তৈরি করার
জন্যই শিক্ষার প্রয়োজন হয়।
৩৭. আপনার প্রস্তাবিত শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে কোথায় ভিন্ন?
নতুন
শিক্ষাব্যবস্থা শিশুদের রুচি অনুযায়ী হবে এবং খুবই সহজ সরল থাকবে। স্কুল দুই ঘণ্টার হবে। কোনো শিশুর আগ্রহ অধিক হলে অতিরিক্ত দুই ঘণ্টা বৃদ্ধি করা
যেতে পারে। সেইরকম শিশুদের জন্য রুচি অনুযায়ী অনুকূল ব্যবস্থা তৈরি করা হবে। এই ধরণের শিক্ষার জন্য বিভিন্ন রকম উদ্ভাবনী শিক্ষা পদ্ধতি বিদ্যমান থাকবে যা শিশুদের
আগ্রহের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হবে। শিশুরা যে বিষয়ই শিখুক না কেন সবার স্বীকৃতি সমান হবে। তারা যে বিষয়ে যতটা গভীরে
যেতে চায় তার জন্য সম্পূর্ণ প্লাটফর্ম থাকবে। ফলে তারা যে অবধি যেতে যায় যেতে পারবে। যতটা শিখতে চায় শিখতে পারবে। যদি না শিখতে চায় তবে শিখবে না। এমনভাবেই শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা হবে।
শিক্ষা হতে হবে শিক্ষার্থীর ইচ্ছানুযায়ী। তাতে শিক্ষা গ্রহণকারীও সুখী হবে, এমনকি শিক্ষা প্রদানকারীও সুখী হবে। এটিই হচ্ছে নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। যেখানে কেউ কোনোপ্রকার চাপের অধীনে থাকবে না। বলা যায় খেলতে খেলতে শেখানো পড়ানো চলতে থাকবে।
শিক্ষা দুই
ধরনের হবে– সাধারণ এবং জীবিকানির্ভর। ১৫ বছরের সাধারণ পাঠ্যক্রম থাকবে। যা সকলের জন্য অনিবার্য
থাকবে। কোনো শিক্ষার্থীকে কখনোই অনুত্তীর্ণ করানো হবে না। যে যত নম্বর পাবে, সেইসব নম্বরের ভিত্তিতেই শিক্ষার্থীকে পরবর্তী ক্লাসে প্রবেশ করানো হবে। সাধারণ
পাঠ্যক্রমে মাত্র চারটি বিষয় পড়ানো হবে। ভাষা, গণিত, সংজ্ঞান এবং দর্শন। যা সকল শিশুর ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটাবে। ‘ভাষা’ মনের বিকাশ ঘটাবে, ‘গণিত’ বুদ্ধির বিকাশ ঘটাবে, ‘সংজ্ঞান’ চিত্ত বা বোধশক্তির বিকাশ ঘটাবে এবং ‘দর্শন’ অহংকারের বিকাশ ঘটাবে। এইস্থানে অহংকারের অর্থ ব্যক্তিত্ব। অন্তঃকরণ বিকাশের দ্বারাই মনুষ্য সঠিক এবং অন্যায়ের
জ্ঞান লাভ করে। কখন কী করতে হবে তার জ্ঞান শুধুমাত্র শিক্ষার মাধ্যমেই তৈরি হয়। আচার-আচরণ কেমন হওয়া উচিত সেসব মানুষ শিক্ষার মাধ্যমে জানতে পারে।
সাধারণ শিক্ষা
অর্জনের পর চার প্রকার ব্যক্তিত্বের উদ্ভব হবে। শারীরিক অবস্থা (Physical Quotient), মানসিক অবস্থা (Intelligence Quotient), ভাবনা অবস্থা (Emotional Quotient) এবং চেতনা অবস্থা. (Conciousness
Quotient)।
সাধারণত শিশু জন্মের পর পঞ্চম বর্ষ পূর্ণ হলে ষষ্ঠতম বছরে প্রথমবারের মতো বিদ্যালয়ে নিবন্ধিত হবে এবং প্রথম কক্ষে প্রবেশ করবে। ২০ বছর বয়স অবধি প্রতিটি শিশু সাধারণ শিক্ষা সম্পন্ন করবে এবং বিদ্যালয় দ্বারা সমস্ত শিশুর
যোগ্যতা নির্ধারণ করা হবে। অতঃপর শিক্ষার্থীর পছন্দ এবং রুচি অনুযায়ী কোনো একটি বিষয়ে জীবিকার প্রশিক্ষণ আগামী
৫ বছরের জন্য প্রদান করা হবে। এই সময়কালকে
মহাবিদ্যালয় বলা হবে। এই প্রশিক্ষণের ভিত্তিতে সকল শিক্ষার্থীকে একটি জীবিকা
প্রদান করা হবে। জীবিকাভিত্তিক প্রশিক্ষণের পরবর্তী পর্যায়ে শুধুমাত্র যোগ্য শিক্ষার্থীরাই তাদের ইচ্ছানুযায়ী অনুসন্ধান-গবেষণা চালিয়ে যেতে পারবে। এটির নাম হবে
বিশ্ববিদ্যালয়। যা একইসাথে হবে তাদের কর্মসংস্থান।
পঞ্চবর্ষীয় প্রশিক্ষণ বিধানের অন্তর্গত চার প্রকার ব্যক্তিত্বের জন্য চার ধরনের প্রশিক্ষণ থাকবে।
১. কৃষি শিক্ষা
২. উৎপাদনশিল্পকর্ম
শিক্ষা
৩. প্রশাসনিক
শিক্ষা
4. নেতৃত্ব শিক্ষা
·
শারীরিক
স্তরের যোগ্যতা-প্রধান ব্যক্তিরা
কৃষিকর্ম, পশুপালন, দুগ্ধ উৎপাদন, ফল উৎপাদন, উদ্যান, বাগান ইত্যাদি কর্ম সম্পর্কিত শিক্ষা গ্রহণ করবে।
·
মানসিক
স্তরের যোগ্যতা-প্রধান ব্যক্তিরা উৎপাদনশিল্পকর্ম, বস্তু,
পরিষেবা, বিভিন্ন প্রকার সামাজিক সুখসুবিধার প্রবন্ধন যেমন– সড়ক, জল,
বিদ্যুৎ, বিদ্যালয়, পুস্তকালয়, আবাস, পার্ক,
স্টেডিয়াম, ক্লাব, সাংস্কৃতিক মঞ্চ ইত্যাদি
নির্মাণ সম্পর্কিত শিক্ষা গ্রহণ করবে।
·
ভাবনামূলক
স্তরের যোগ্যতা-প্রধান ব্যক্তিরা
প্রশাসনিক কর্ম, জনসেবা, ন্যায়-বিচার সংক্রান্ত কর্ম, চিকিৎসা, সুরক্ষা ইত্যাদি কর্ম সম্পর্কিত শিক্ষা গ্রহণ করবে।
·
চেতনামূলক
স্তরের যোগ্যতা-প্রধান ব্যক্তিরা
নেতৃত্ব, অধ্যাপনা, গবেষণা, অনুসন্ধান, আইন এবং নীতিনিয়ম
প্রণয়ন, বিভিন্ন প্রকার ব্যবস্থাপনা
ইত্যাদি কর্ম সম্পর্কিত শিক্ষা গ্রহণ করবে।
গবেষণা-অনুসন্ধান বিধান
বিশ্ববিদ্যালয়ের
অন্তর্গত গবেষণা বিভাগ থাকবে। সমস্ত ক্ষেত্রে এবং বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণার কাজ চলতে
থাকবে। গবেষণারত ব্যক্তিদের বৈজ্ঞানিকের
উপাধি দ্বারা জানা যাবে। গবেষণা শিক্ষায় তিনটি বিভাগে থাকবে। যেমন আপনার শরীর, মন ও প্রাণ রয়েছে; একইভাবে সমষ্টিতেও পদার্থ, প্রকৃতি এবং প্রাণ রয়েছে। পদার্থ সম্পর্কিত জ্ঞানবিজ্ঞান গবেষণার জন্য ‘আধিভৌতিক’ বিজ্ঞান (Physical), প্রকৃতি সম্পর্কিত
জ্ঞানবিজ্ঞান গবেষণার জন্য ‘আধিদৈবিক’ বিজ্ঞান (Astral) এবং প্রাণ সম্পর্কিত জ্ঞানবিজ্ঞান গবেষণার জন্য ‘আধ্যাত্মিক’ বিজ্ঞান (Spiritual)। মূলত আধিভৌতিক শিক্ষা, আধিদৈবিক শিক্ষা, আধ্যাত্মিক শিক্ষা– এই তিন ধরনের গবেষণা অনুসন্ধান হয়ে থাকে।
প্রথমত, আধিভৌতিক শিক্ষার
অধীনে চার ধরনের জীবিকামূলক শিক্ষা থাকবে। যেমন কৃষি, উৎপাদনশিল্পকর্ম, প্রশাসন এবং নেতৃত্বমূলক বিষয়ে গবেষণামূলক কাজ।
দ্বিতীয়ত, সমগ্র প্রকৃতির
অধ্যয়ন এবং সূক্ষ্ম গবেষণামূলক কাজ আধিদৈবিক শিক্ষার পরিসরে আসে।
তৃতীয়ত, প্রাণের অধ্যয়ন এবং
গবেষণামূলক কাজ আধ্যাত্মিক শিক্ষার অন্তর্গত থাকবে।
সংক্ষেপে এই হল
সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থার শিক্ষাগত কাঠামো।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন