বিশ্ব মানবাধিকার দিবস: একটি বিকল্প পর্যালোচনা
১০ই ডিসেম্বর ছিল বিশ্ব মানবাধিকার দিবস। দিনটি প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী একযোগে পালিত হয়। নানাপ্রকার উৎসব, বক্তব্য সহযোগে মানবাধিকারের জয়গান প্রচারিত হয়। 'মানবাধিকার' শব্দের মধ্যেই অধিকারের বিষয়টি জুড়ে রয়েছে? অধিকার কী? কীসের অধিকার? অধিকার কে কাকে দেবে, কেন দেবে, কেন দিচ্ছে না? অধিকারের মালিক কে? অধিকার কেউ প্রদান না করলে পাওয়া সম্ভব নয়? কীভাবে কী করলে পাওয়া সম্ভব? দেখা যায় 'টপ টু বটম' সকলেই কোনো না কোনো অধিকারের জন্য সংঘর্ষ করছে। ব্যক্তিগত অধিকার কিংবা সমষ্টিগত অধিকারের লড়াই।
একটু বুদ্ধের কাছে যাওয়া দরকার।
মানুষ নিজেই নিজের প্রদীপ হয়ে উঠতে পারে, অন্ধকার সরিয়ে আলোকিত হয়ে উঠতে পারে। নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে পারে, অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের অভিমুখে যাত্রা করতে পারে। অন্তরে মনুষ্যত্ত্বের বোধোদয় ঘটিয়ে নিজের এবং অপরের দুঃখ দূর করতে পারে।
আত্মশুদ্ধি, আত্ম-অবলোকন, আত্ম-সমালোচনা, আত্মোপলব্ধি, বিবেকের বোধোদয় ইত্যাদি উপদেশ-প্রক্রিয়া বহুকাল হতে চলমান রয়েছে যা আজও ক্রমবর্ধমান। তারপরও প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে, আত্মশুদ্ধির এই ফর্মুলা কি বাস্তবতার নিরিখে সফল?
যুদ্ধ, হত্যা, হিংসা, শোষণ, নিপীড়ন, ধর্ষণ নির্মূল হয়নি। কেন হয়নি? চৈতন্য জাগরণের অভিপ্রায় নিয়ে যে পথে, যে বিশেষণ দ্বারা, যে পদ্ধতি অবলম্বন করে অন্তরবদলের মাধ্যমে সমাধানের পথ দেখানো হচ্ছে তা কি যথার্থ? যদি তা নাহয় তবে সঠিক বিকল্প পথ 'কী' হতে পারে? এই বিষয়টি সমাজের কাছে পর্যালোচনার বিষয় হয়ে উঠলে নতুন কোনও সূত্র উঠেও আসতে পারে। সম্মিলিত উদ্যোগে আলোচনা-পর্যালোচনা-সমীক্ষার মাধ্যমেই সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব। কারণ-নিবারণের সিদ্ধান্ত সুনিশ্চিত হলে সমাধানের উদ্দেশ্যে মত-পথের সৃজন ঘটবে এবং প্রমাণিত সিদ্ধান্তকে প্রতিষ্ঠিত করবার উদ্যোগ-প্রক্রিয়া দ্রুত প্রারম্ভ হবে।
চলুন বিষয়টিকে অবলোকন করি।
ধরুন, যিনি জেগে ঘুমনোর ভান করছে তাকে কিভাবে ঘুম পাড়াবেন? যিনি জেনেবুঝে হত্যা-হিংসা করছে তাকে কোন মানবতার পাঠ পড়াবেন? যিনি জেনেবুঝে ধর্ষণ করছে তাকে কিভাবে মনুষ্যত্ব শেখাবেন? যিনি জেনেবুঝে অপরকে শোষণ-নিপীড়ন করছে তাকে কিভাবে মানবিকতা শেখাবেন? যিনি জেনেবুঝে দুর্নীতি করছে তাকে কিভাবে সততা-নৈতিকতা শেখাবেন?
আজ যিনি নৈতিক আগামীকাল অনৈতিক হবেন না এই গ্যারান্টি কীভাবে কোন মাপকাঠিতে দেবেন? আজ যিনি অনৈতিক আগামীকাল নৈতিক হয়ে উঠবেন কিনা এই গ্যারান্টি কোন মাপকাঠিতে যাচাই করবেন? এ বিষয়ের সিদ্ধান্ত কী হবে? এই অবধি যে সিদ্ধান্ত উঠে আসে তা হল সমাজ এখনও পর্যন্ত সমস্যার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করে উঠতে পারেনি। কিংবা সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেনি। তবে প্রচেষ্টা যে চলমান রয়েছে তা অস্বীকার করা যায় না।
এবার চলুন মানব স্বভাবের বাস্তবতা অনুধাবন করবার চেষ্টা করি। অপরকে দুঃখ-কষ্ট দিলে যে সে ব্যথা পাবে এটি কে না বোঝে! অপরের ক্ষতি করলে তিনি যে সমস্যায় পড়বেন তা কে না বোঝে। যুদ্ধ, হত্যা, হিংসা, শোষণ, নিপীড়ন, ধর্ষণ যে মন্দ কাজ তা কে না বোঝে! এইটুকু মানবতাবোধ তো সকলের মধ্যেই রয়েছে। এরজন্য যুক্তিবাদ কিংবা বিশেষ চেতনাবান হবার প্রয়োজন নেই। অপরাধী যখন মানবিকতা-অমানবিকতা কি তা জেনে-বুঝেই করছে তবে তাদের শোধরানোর প্রক্রিয়াই বা 'কী' হবে? এক্ষেত্রে সমস্যার কারণ কি ভিন্ন কিছু হবে এবং সমাধানের পথও কি নতুন কোনো সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হবে?
চেতনার মূল স্বভাব সে সুখী হতে চায়। সে মনুষ্য চেতনা হোক কিংবা ভিন্ন প্রাণীর চেতনা হোক। সুখের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্যই সকলের সমস্ত গতিবিধি, কান্ডকারখানা। এই গতিবিধি কখনো নিজের জন্য ইতিবাচক কখনো অপরের জন্য নেতিবাচক। আবার কখনো নিজের জন্য নেতিবাচক অপরের জন্য ইতিবাচক। প্রশ্ন হচ্ছে জেনেবুঝে অপরকে দুঃখ দিচ্ছে কেন? উত্তর হচ্ছে, সুখী হবার জন্য। আত্মরক্ষার জন্য। কিংবা সুখসুবিধা রক্ষা করার জন্য। অপরকে দুঃখ দিলে নিজে সুখী-সুরক্ষিত থাকা সম্ভব হবে বলে দুঃখ দিচ্ছে। প্রতিটি প্রাণীর মধ্যে পরিস্থিতি অনুযায়ী লাভ-লোকসান বুঝে অহিংস-সহিংস উভয় সিদ্ধান্তে উপনীত হবার ক্ষমতা রয়েছে। মনুষ্য চেতনা কাউকেই দুঃখ দিতে চায় না। দিতে বাধ্য হচ্ছে কারণ অপরের ক্ষতি না হলে নিজের লাভ হয় না। যতই সচেতন করুন, যতই জাগরণ ঘটান, যতই উপদেশ প্রদান করুন না কেন মানুষ লাভ-লোকসান-স্বার্থ বুঝেই সিদ্ধান্ত নেবে। সুযোগ বুঝে পিঠে ছুরি মারতে দ্বিধা করবে না। এমনটি সে করছে কেন সেই কারণ খোঁজা জরুরী।মানুষকে দোষারোপ করা কিংবা শাস্তি প্রদান করাও সমাধান নয়। এতে সমস্যার কারণ নির্মূলন হয় না। সমস্যা তাহলে কোথায় রয়েছে? সমস্যা রয়েছে ব্যক্তির মধ্যে নয় রয়েছে রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে, সমাজব্যবস্থার মধ্যে। সিস্টেমের মধ্যে। মানুষ তার চেতনাকে মানবতার স্বার্থে প্রয়োগ করতে পারবে এবং অন্যের ক্ষতিসাধন ব্যতীত সকলের লাভ হবে এমন ব্যবস্থাপনা সৃজন করা হয়নি। সমাধানের নিরিখে সম্মিলিত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়নি।
মানুষ নানা গোষ্ঠী, দল-মত-পথের সৃজন করেছে, সংস্কৃতি গড়েছে। সবই জীবনযাপনের প্রয়োজনেই করেছে। সম্মিলিত জীবনযাপনের জন্য মানব সম্পদ প্রয়োজন, প্রাকৃতিক সম্পদ প্রয়োজন, রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রয়োজন। তারও সৃজন হয়েছে। সমস্যা হয়েছে যে ব্যবস্থার সৃজন হয়েছে তা সকল সংস্কৃতির সকল স্তরের মানুষের প্রয়োজনীয়তা পূর্ণ করতে সমর্থ হয়নি। বলা যায় জরুরী মৌলিক অধিকারসমূহই সুরক্ষিত করা যায়নি। ফলে চলমান ব্যবস্থা যে অসম্পূর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখানে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে, গোষ্ঠীকে কিংবা রাজনৈতিক দলকে দোষারোপ করলে আমরা মূল কারণটিকে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হব। কারণ ব্যক্তি কিংবা রাজনৈতিক দল একাধিকবার বদলেছে, কিন্তু সমাধান সম্ভব হয়নি। কারণ ব্যক্তি কিংবা রাজনৈতিক দল সমস্যা নয়। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সকল দল-মত-পথের মানুষ বুঝে নিলে পারস্পরিক হিংসা-দ্বন্দ্ব নিরর্থক বলে মনে হবে।
সকলেই নিজ জীবন ভরপুর বাঁচতে চায়, উপভোগ করতে চায়। কেমনভাবে বাঁচতে চায়, কীভাবে উপভোগ করতে চায়, কী শিখতে চায়, কোন কর্ম সম্পাদন করতে চায়, কীভাবে জীবনযাপন করতে চায় তা ব্যক্তি নিজে জানে। অপর ব্যক্তি কিংবা সংস্থা এই দায়িত্ব পালন করতে পারে না। এইপ্রকার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। নাগরিকের অভিভাবক রাষ্ট্র। প্রতিটি ব্যক্তির দায়দায়িত্ব রাষ্ট্রের। অসম্পূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থার কারণেই সমস্যায় জর্জরিত ব্যক্তি সাহায্যপ্রার্থী হয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তির শরণাপন্ন হতে বাধ্য হচ্ছে, রাজনৈতিক দলের বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে, ধর্মগুরুর চরণে মস্তক ঠেকাতে বাধ্য হচ্ছে অথবা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হতে হচ্ছে। শোষিত হয়ে, অত্যাচারিত হয়ে, পদসেবা করে জীবন বাঁচিয়ে রাখার নাম কি মানবিকতা? সমাধান কোথাও মিলছে না। রাষ্ট্রের "ব্যবস্থা" এমন থাকা উচিত যেখানে সকল নাগরিক প্রয়োজনীয় সমস্ত সমস্যা, চাহিদা উপস্থাপন করতে পারবে এবং মতামত আদান-প্রদান করতে পারবে। রাষ্ট্রের কর্তব্য হবে তাঁকে সর্বোচ্চ সাহায্য-স্বাধীনতা প্রদান করা। প্রতিটি নাগরিকের পরিপূর্ণ দায়িত্ব রাষ্ট্র পালন করলে এবং প্রক্রিয়া চলমান থাকলে ব্যবস্থাকে 'সম্পূর্ণ' বলা যাবে। মানুষ নেতিবাচক-ইতিবাচক উভয় কর্ম হয় প্রয়োজনে করে কিংবা বাধ্য হয়ে করে। প্রয়োজন ব্যতিরেকে কিছু করে না। রাষ্ট্র নাগরিকের শিক্ষা, জীবিকা, সুখসুবিধা, সুরক্ষার সকল দায়িত্ব গ্রহণ করলে এবং প্রক্রিয়া চলমান থাকলে কারোর নেতিবাচক কর্মে লিপ্ত হবার কারণ অবশিষ্ট থাকবে না। রাষ্ট্র এই মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ বলেই নাগরিক নেতিবাচক পথ অবলম্বনে বাধ্য হচ্ছে। যাকে আমরা 'অমানবিক' বলে থাকি। তাহলে সমাধান কী? ব্যবস্থার অসম্পূর্ণতা থেকে সম্পূর্ণতার অভিমুখে সম্মিলিত উদ্যোগই হবে প্রকৃত পদক্ষেপ। অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্যোগ। অর্থনীতিবিদগণ প্রয়োজন পূরণের নিরিখে অর্থনীতির সৃজন করবেন, রাজনীতিজ্ঞরা ব্যক্তিগত স্তরে এবং সামাজিক স্তরে বণ্টন প্রক্রিয়ার নীতিনিয়ম সৃজন করবেন, শিক্ষাবিদগণ সকলের শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ-কর্মসংস্থান পরিকল্পনা করবেন, সাংস্কৃতিক কর্তাব্যক্তিগণ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল সৃজন করবেন, পরিবার পরিকল্পনায় আগ্রহী কর্মকর্তাগণ সম্মন্ধ এবং পরিবার পরিকল্পনার বিষয়াদি দেখভাল করবেন ইত্যাদি। এই জরুরী মৌলিক অধিকার এবং দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে দ্রুত বাস্তবিক অর্থে একটি প্রকৃত মানবতাবাদী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। প্রথম ধাপে জরুরী মৌলিক বিষয়াদির বন্দোবস্ত সাধিত হবে। অতঃপর ধাপে ধাপে সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা-সমাজব্যবস্থার অভিমুখে যাত্রা চলমান থাকবে।
***
মতামত জানাতে সকলে স্বাগত।
আলোচনার জন্য যোগাযোগ- 9830925502
***
#humanity #humane #WorldHumanRightsDay #HumanRights #everyone #highlight #follower #fbpost2024 #fbpost

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন