একটি নতুন সমাজ-ব্যবস্থা কেন জরুরী?
আমাদের জীবনযাপনের সমস্ত কর্মকাণ্ডের পেছনে মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সুখী হতে চাওয়া। আমরা যদি নিজের ও অন্য সকল প্রাণীদের সমস্ত গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখতে পাব জগতের সমস্ত প্রাণী সর্বদা সুখী হতে চাইছে। কেউ শুধুমাত্র নিজেকে সুখী দেখতে চায়, কেউ নিজের সাথে পরিবারকে সুখী দেখতে চায়, কেউ নিজের পরিবারের সাথে সমাজকে সুখী দেখতে চায়। আবার এমন মানুষও আছেন যারা নিজের, পরিবারের এবং সমাজের সাথে সম্পূর্ণ জগতের সকলকে সুখী দেখতে চায়। অর্থাৎ গভীরভাবে ভাবলে আমরা বুঝতে সক্ষম হব শুধুমাত্র সুখের আকাঙ্ক্ষাই হচ্ছে জীবনের এবং সংসারের একমাত্র লক্ষ্য। মানুষ ব্যবহারিক জীবনে মূলত জ্ঞান, কর্ম, ভোগ ও বিশ্রামের মাধ্যমে সুখী হতে চায় তথা স্থায়ীরূপে সমৃদ্ধশালী জীবন উপভোগ করতে চায়। সকলেই শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, সুখসুবিধা এবং সুরক্ষিত জীবনযাপনের সুযোগসুবিধা পেতে চায়। এটিই জীবনের উদ্দেশ্য। সকলে নিজের পছন্দ অনুযায়ী সুখসুবিধা পেতে চাইবে এবং সুখী জীবনযাপন উপভোগ করতে চাইবে এমনটিই স্বাভাবিক নিয়ম। তেমনি প্রতিটি ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দ এবং জীবনযাপনের মধ্যে বৈচিত্র থাকবে এমনটিও স্বাভাবিক। বরং জীবনে বৈচিত্র থাকলে ক্লান্তি-বিরক্তি-একঘেয়েমি-অবসাদ চেপে ধরে না। সকলের পছন্দ অনুযায়ী জীবনযাপনের বন্দোবস্ত না থাকাটাই মূল সমস্যা। এই অপর্যাপ্ত অবস্থার কারণ হচ্ছে এখনও অবধি জীবনের উদ্দেশ্যকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়নি এবং সিদ্ধান্তকে সুনিশ্চিত করা হয়নি। যার ফলে জীবনের বাস্তবিক চাওয়া-পাওয়া এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে গতানুগতিক সিদ্ধান্তজনিত দ্বন্দ্ব পরম্পরাগতভাবে চলে এসেছে। এই দ্বান্দ্বিকতার কারণে সমাজে বহু সমস্যা উৎপন্ন হয়ে চলেছে। জীবন স্বাভাবিকভাবে যেমন চাইছে তেমনভাবে ইচ্ছেগুলি অবিরত পূরণ না হবার ফলে মানুষ নেতিবাচক কার্যকলাপে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়েছে। সেজন্য প্রাথমিক পদক্ষেপ হচ্ছে সকলের জন্য জীবনযাপনের আবশ্যিক দিকগুলিকে সুনিশ্চিত করা।
মোটামুটি সকলেই মনে করেন ‘মানুষের ইচ্ছে অনন্ত এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত’। অর্থাৎ সকলের জন্য সমৃদ্ধশালী জীবনযাপনের বন্দোবস্ত করা সম্ভব নয়। বহুকাল পূর্ব হতে এই মতবাদ চলে আসছে। আসুন প্রথমে এই দুটি বিষয়ের পর্যালোচনা করি। হয়তো এখনও অবধি এই বিষয়টি নিয়ে যেভাবে চিন্তন-মননের প্রয়োজন সেভাবে বিচার-বিবেচনা করা হয়নি। চলুন দেখে নিই এই সিদ্ধান্তে আমরা কীভাবে উপনীত হয়েছি তার উপর চিন্তন-মনন করি। প্রথমে অনন্ত ইচ্ছেগুলি নিয়ে পর্যালোচনা করি। সর্বপ্রথম আমরা নিজের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে জানার চেষ্টা করি, আমার নিজ ইচ্ছেগুলি কি অনন্ত? উদাহরণস্বরূপ আমরা ইচ্ছেগুলির একটি তালিকা উপস্থাপন করে মিলিয়ে নিতে পারি।
১. সমস্তপ্রকার সুবিধাযুক্ত একটি বাড়ির প্রয়োজন হয়।
২. সর্বাধিক ৩০ প্রকারের সুস্বাদু এবং স্বাস্থ্যবর্ধক ভোজন, পাকা ফল, শুকনো ফল, ফলের রস ইত্যাদি প্রয়োজন হয়।
৩. সর্বাধিক ৩০ প্রকারের পোশাক, জুতো ইত্যাদি প্রয়োজন হয়।
৪. কিছু প্রযুক্তি প্রয়োজন হয়, যেমন— মোবাইল, ল্যাপটপ, মোটরবাইক, মোটরগাড়ি ইত্যাদি।
৫. ইচ্ছে অনুযায়ী শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান প্রয়োজন হয়।
৬. পছন্দ অনুযায়ী সঙ্গী-সঙ্গিনী প্রয়োজন হয়।
৭. কখনও পিকনিক, ভ্রমন, বিনোদন ইত্যাদি প্রয়োজন হয়।
৮. সড়ক, বিদ্যুৎ, জল, পার্ক, স্টেডিয়াম, ক্লাব, পুস্তকালয়, যাতায়াত, স্বাস্থ্য, সুরক্ষা ইত্যাদি পরিষেবা প্রয়োজন হয়।
যদি আমরা কাগজে ইচ্ছেগুলি লিপিবদ্ধ করার প্রয়াস করি তবে এই ভেবে অবাক হব যে আমাদের ইচ্ছেগুলি মূলত সীমিত। দেখতে পাব ইচ্ছেগুলি একটি নির্দিষ্ট পরিসীমার মধ্যেই ঘোরাফেরা করে চলেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাবে একই ইচ্ছে বারংবার চক্রাকারে আবর্তিত হয়ে চলেছে। অর্থাৎ মানুষের ইচ্ছে অনন্ত নয় এবং প্রাকৃতিক সম্পদও সীমিত নয়। এটি সত্যিই এক অদ্ভুত অবস্থা যে আমরা সামান্য ক’টি ইচ্ছেও পূরণ করতে পারিনা। এটি ব্যক্তিগত অপারদর্শিতা নয়। ব্যবস্থাগত ত্রুটি। ব্যক্তিগত উদ্যোগে সুখী হবার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে বলেই মানুষকে অপরের সাহায্য নিতে হয়েছে। এক থেকে একাধিক হয়ে দল-গোষ্ঠী-তন্ত্র-রাজ্য তথা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নির্মিত হয়েছে। সেইসকল ব্যবস্থা মানুষের চেতনা, ইচ্ছে বা উদ্দেশ্যকে কেন্দ্রবিন্দুকে রেখে নির্মাণ করা হয়নি। ব্যবস্থা নির্মাণের উদ্দেশ্য হচ্ছে রাষ্ট্রের সমস্ত সম্পদের অধিকার এবং বণ্টনের সুব্যবস্থা থাকবে। সমস্যা হয়েছে জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্টতা না থাকার ফলে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নির্মাণ করা হয়নি। পূর্বের ব্যবস্থাসমূহ নির্মাণকালে সকলের যুক্তি-বুদ্ধিকে সামিল করা হয়নি এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পূর্বে যথেষ্ট চিন্তন-মনন করা হয়নি। চিন্তন-মননের সাথে অধিকতর তথ্য, খবরাখবর, অভিজ্ঞতা ইত্যাদির সাহায্য নেওয়া হয়নি। যে কারণে বর্তমান ব্যবস্থায় সমস্তকিছুতে অসম্পূর্ণতা, বৈপরিত্য এবং সংঘাত দেখা দিয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা এবং চিন্তন-মনন করার মত কোনো প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়নি যেখানে সকল নাগরিক নিজেদের মতামত উপস্থাপন করতে পারবে এবং অন্তিম সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারবে। জীবনের স্বাভাবিক-বাস্তবিক ইচ্ছেগুলিকে জেনে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নির্মিত না হবার ফলেই সমস্ত সমস্যা উৎপন্ন হয়েছে। সঠিক ব্যবস্থা না থাকায় অসীম সম্পদও বর্তমানে স্বল্প মনে হচ্ছে এবং সামান্য ইচ্ছেও অনন্ত বলে অনুভূত হচ্ছে। যদি সঠিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হয় তবে সীমিত সম্পদও পর্যাপ্ত হয়ে যাবে এবং অনন্ত ইচ্ছেও সামান্য মনে হবে। ব্যবস্থা সঠিক হলে আমাদের কাছে যতটুকু প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানব সম্পদ রয়েছে সেসবের উপযুক্ত ব্যবহার হতে পারবে। এবং মানুষের বাস্তবিক পছন্দকে মাথায় রেখে বস্তু ও পরিষেবার নির্মাণ হতে পারবে। অসম্পূর্ণ ব্যবস্থায় সর্বদা সম্পদের অপব্যবহার হয় এবং সমস্তকিছুর অভাব দেখা দেয়। সুতরাং সকলের মিলিত উদ্যোগে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থার পরিকল্পনা, পর্যালোচনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন