অপসংস্কৃতি ও যুবচেতনা: ডাঃ কে. পি. ঘোষ
ঊনবিংশ শতকের প্রারম্ভে ও তার পূর্ব্ববর্তী অধ্যায়ে বাংলার নরজাগরণের ক্ষেত্রে, রাজনৈতিক জগতে, ধর্মজগতে, সাহিত্যে ও সমাজচেতনায়, এক অদ্ভুত বিপ্লব ঘটে গেল। রাজারামমোহন, পণ্ডিত বিদ্যাসাগর মহাশয়, রামকৃষ্ণদেব ও স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্কিমচন্দ্র, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ও আচার্য্য জগদীশচন্দ্র, সমস্ত উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কগণ বাঙলার আকাশ আলো করে বসলেন। তৎকালীন বাঙলার বিক্ষুব্ধ যুবতেচনার যে প্রকাশ এবং যে চিন্তাধারা সমূলে ভারতীয় ঐতিহ্য ও ভারতীয় সংস্কৃতিকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছিলো, এই মহাপুরুষেরা তার রাশ টেনে ধরে তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করলেন। তার দ্বিতীয় পর্যায়ে এল স্বাধীনতা সংগ্রাম ও অগ্নিযুগ ও আত্মোৎসর্গের কাল। সারা দেশে একটি সাড়া পড়ে গেলো। 'কার আগে প্রাণ কে করিবে দান' এই হোল বাঙলার মূল মন্ত্র। সমস্ত বাঙলার এক প্রান্ত হ'তে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত, একই জাতীয় ভাবধারা, একই আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্বে বিশ্বাসী এক নূতন বাঙলার তরুণদল, উন্মাদ আবেগ ও দৃপ্তপদক্ষেপে এগিয়ে চলল। উত্তরে তার উত্তঙ্গ হিমালয়, দক্ষিণে সাগরের ফেনিল উচ্ছাস, এক দিকে তার গৈরিক মৃত্তিকার রক্তিম আভা, অন্যদিকে তার শ্যামল বনছায়া সমস্ত বাঙলার মানসজীবনকে বিধৃত করেছেন। তারই ছায়ায় নতুন বাঙলা তৈরী হোল।
কিন্তু ধীরে ধীরে কালোমেঘ যেন বাঙলার আকাশে জমতে শুরু করল; বেজে উঠল যুদ্ধের দামামা। একদিকে ব্রিটিশের সরকারী চক্রান্তে শুরু হোল মন্বন্তর, এল ধ্বংসের অশনিসংকেত, অন্যদিকে এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে সমস্ত যুবসমাজের সামনে নানারকম বৈষম্য-মূলক রাজনৈতিক চিন্তাধারা এবং রাজনৈতিক সংগঠকদের সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণের অভাব ও তার ফলে সমস্ত যুবসমাজের মধ্যে বিভ্রান্তি, অবচেতনা ও সাময়িক পশ্চাদঅপসরণের ইতিহাস। যুদ্ধের কৌলিণ্যে সমাজে সৃষ্টি হোল সুবিধাবাদীদল, যারা তাদের পুঞ্জীভূত অর্থ দিয়ে তাদের লোলুপহস্ত বাড়িয়ে দিল কালোবাজারের পথে ও অসামাজিক কাজে। অন্যদিকে রেশন ব্যবস্থা ও যুদ্ধের যোগানদের অশুভ আঁতাত, অন্যদিকে অনাহার ও হাহাকারে বাঙলার যুবচেতনা মূর্ছিত হোল না, ধনীক ও বণিকের হাত থেকে অর্থ ও খাদ্য ছিনিয়ে নেবার মতো মানসিকতা ছিল না।
পরবর্তী অধ্যায়ে বাঙলায় আরো বিপর্যয় এল, আরো বেদনা, আরো রক্তক্ষয়, আরো দুঃখ ও অন্ধকার ঘনিয়ে এলো মর্মান্তিক ভ্রাতৃ হত্যা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কল্যাণে। সমস্ত দেশে ছিন্নমস্তার মতো তার নিজের রক্তপান শুরু হোল। কে মিত্র, কে শত্রু বিচারের ভার পড়ল সমাজদ্রোহীগুণ্ডার হাতে। শাসন হয়ে গেল অকেজো। দেশের যাঁরা নেতৃস্থানীয় তাঁরা হয়ে গেলেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও চেতনাহীন। যাঁরা -শুভবুদ্ধিসম্পন্ন রাজনৈতিক সচেতন, উন্মত্ত কোলাহলে-তাঁদের প্রতিবাদ স্তব্ধ হয়ে গেলো। শুরু হোল দেশ-ভাগের এক চক্রান্ত ও দেশভাগের পরিণাম, দেশত্যাগের মর্মান্তিক ইতিহাস।
একদিন যারা অন্নদাতা তাঁদের ভিক্ষাই হোল সম্বল। সর্বহারা মানুষের দল হারালো ন্যায় নীর্তি ও পারিবারিক বন্ধন অর্জন করল চরম হাহাকার ও ভ্রষ্টাচার। বাংলার আকাশে কালো মেঘ আরো ঘনীভূত হোল। যুদ্ধের সময়ে যারা সমাজ বিরোধী ছিল, তাদের সঙ্গে যোগ হোল আর একদল সমাজবিরোধী যারা সাম্প্রাদায়িক দাঙ্গার সময় সামনের সারিতে ছিল।
বাঙলার যুবচেতনা আরো বিভৎস হোল। ক্ষতবিক্ষত হোল বাঙলার মানস ও জীবন নিভৃতে বেদনায় রক্তক্ষয় শুরু হোল ন্যায় ও বিচারের সমাজচেতনা পিছিয়ে গেলো। রুদ্ধ চেতনায় বাঙলার সংস্কৃতি ও নবজাগরণের আদর্শ মূমূর্ষু হয়ে রইল প্রতিবাদের ফল এলো না। নতুন পথের সন্ধান এলো না। নেতাজীর মহান আদর্শ ও নৌবিদ্রোহের প্রাণদান, ছাত্র ও কিশোরের সংগ্রাম কোন গণ-চেতনার পটভূমি সৃষ্টি করতে পারল না। বরং ১৫ই আগষ্টের রাত্রির অন্ধকারে যারা ক্ষমতার অধিকার পেলো তাদের অধিকাংশই সুযোগ সন্ধানী, স্বার্থপর ও রাজনৈতিক খেলোয়ার কেউ ধনী কেউবা বণিকের দালাল, কেউবা সিনেমা বা মঞ্চের প্রচ্ছন্ন এজেন্ট, কেবা নারীসর্বস্ব লম্পট, কিছু কয়েকজন ছিলেন পুরাতন সংগ্রামী।
এরা খদ্দর পরতেন, মুখে পছন্দসই ভাষণ দিতেন কিন্তু এঁদের গোপন জীবন আরো ভয়াবহ ও পিচ্ছিল। মুখে রামধূন গাঁইতেন কিন্তু অন্তর ছিল সাম্প্রদায়িকতার পূর্ণ। বক্তৃতায় সমাজতন্ত্রের বুলি বলতেন, কিন্তু গোপনে সমাজতান্ত্রিক পথের ধ্বংসসাধনে ব্যস্ত ছিলেন। ধনীক আরো ধনী হোল, গরীবের সমস্যা মিটল না, বেকার সমস্যা হোল সীমাহীন। ধনীকের লোভ হোল অভ্রংলীহ সমস্ত বাঙলার যুবচেতনা মান ও কর্ম্মে কোন আদর্শবাদীর চিহ্ন পর্যন্ত রইল না, বেকার সমস্যা মধ্যবিত্তের জীবনকে আরোও দূর্বিসহ করে তুলল এবং অপসংস্কৃতি প্রধান উপজীব্যরূপে সমস্ত নন্দনতত্ত্ব ও সংস্কৃতিকে অধিকার করে বসল। শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ইঙ্গ-আমেরিকান প্রলোভন ও নূতন চিন্তাধারা রূপকের মাধ্যমে সমস্ত সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতি নূতন পথের দিগন্তে চলে এলো। সাহিত্য ও শিল্পের যাঁরা ধারক, তাঁরা হলেন ধনীকের সেবাদাস। সংবাদপত্র হোল ধনীকের কুক্ষিগত। যৌনসাহিত্য ও সমালোচনাই হ'ল সাহিত্যের একমাত্র রসদ।
সুতরাং, সমাজতন্ত্রের স্বর্ণাকরণোজ্জল সমাজের সর্ব্বস্তরে ব্যপ্ত হওয়া দুরের কথা, ঘুরপাক খেতে খেতে পথ হারিয়ে ফেললো। দৃষ্টিনন্দন আলোক শিক্ষা সীমাবদ্ধ গণ্ডির মধ্যেই সিনেমার খল নায়কেরাই হ'ল সমাজের যুবশ্রেণীর আদর্শ। কোন শুভচেতনা রাজনৈতিক সচেতনতা সংস্কৃতির কৌলিন্য বা প্রতিভার সাক্ষর সামাজিক মাপ-কাঠিতে শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হোল না। বরং, চটুল, চপল মনোহরণ সোনার হরিণ'ই সমস্ত যুবমানসকে ইশারা করতে লাগল। জমিদারীর বদলে বাণিজ্যলক্ষী এমন একটি শ্রেণী চিহ্নিত করে দিল যাদের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপিত হ'ল সমাজের অপসংস্কৃতির ধারক ও বাহক এক বিশেষ বর্ণসঙ্কর শ্রেণীর। যুবমানসের বিয়াট এক অংশ হ'ল আদর্শভ্রষ্ট রাজনৈতিক ধাপ্পাবাজির ধারক ও বাহক। যাঁরা বয়স্ক তাঁরা দায়িত্ব পালনে অসমর্থ, এক শ্রেণীর গুরুবাদ ও ধর্মের অন্ধ গোঁড়ামীকে জীবন সর্বস্ব করে বসলেন এবং চোখ বন্ধ করে ইষ্টসাধনায় ব্যপৃত হলেন অথচ সামাজিক অনিষ্ট সাধনে ইন্ধন জোগাতে লাগলেন।
যাঁরা এতদিনের স্বাধীনতাসংগ্রামী ছিলেন, তাঁরা তাঁদের যোগ্য মর্যাদার আসন কায়েম করতে পারলেন না। যাঁরা ভ্রষ্টাচার ও সামাজিক সমস্যায় নির্বিকার তাঁরাই তাঁদের পিছনের সারিতে ঠেলে দিল। তাঁরা হলেন স্থানভ্রষ্ট ও পথভ্রষ্ট। সুতরাং, আজ সমস্ত সামাজিক পটভূমিতে ছাত্র ও কিশোরের দল ও বাংলার যুবমানস, বাংলার শাশ্বত ঐতিহ্য ইতিহাসের পথ থেকে বিচ্ছিন্ন।
কিছু অংশ যাঁরা রাজনৈতিক সুচেতন ও সংস্কৃতিতে আত্মসচেতন এবং কৰ্ম্মে নতুন জীবনের দীক্ষায় দৃপ্ত তাঁদের কিন্তু নতুন এই বিরাট কালবৈশাখীর কালো মেঘকে বাধা দেবার সাধ্য নেই।
তাই আজ যদি বাংলার কৃষ্টি ও শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক মানকে রক্ষা করতে হয়, জাতীয় চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করতে হয়, সমাজতান্ত্রিক আদর্শে নতুন শুভ্রস্বর্ণকিরণোজ্জ্বল আকাশকে আহ্বান করতে হয়। তাহলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবনধারা ও সামাজিক কর্তব্য ও পটভূমিতে নতুন আলোকশিখা জাগাতে হবে। শিক্ষা-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক জগতে নতুন মানুরের আবির্ভাব প্রয়োজন। যাঁরা প্রতিভা ও বুদ্ধিতে দীপ্ত অথচ সত্যিকার বাঙালীর চিন্তায় সমুজ্জ্বল, যাঁরা সংস্কারমুক্ত মন ও মোহমুক্ত জীবনধারায় সমস্ত বাঙলার যুবমানস্ককে উদ্বুদ্ধ করতে পারবেন, একমাত্র তাঁদের পক্ষেই সম্ভব বর্তমান অবচেতন চিন্তাধারা ও অপসংস্কৃতির, জোয়ারকে রোধ করা।
আমি আশা করব, বাঙলার নবচেতনার যুগে যেরকম বাঙলার সমস্ত দিকপাল বাঙালীগণ মনীষা ও চৈতন্যের ধারক ও বাহক হয়েছিলেন, সেরূপ আর একদল বাঙালী আমাদের চিন্তার দৈন্য, বুদ্ধির ক্লীবতা ও অপসংস্কৃতির কালো যবনিকাকে অপসারিত করবে, নতুন আশার আলো সঞ্চারিত করবেন।
***
লেখক ডাঃ কৃষ্ণপ্রসাদ ঘোষের জন্ম চট্টগ্রাম শহরে। ছাত্রজীবনে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবী-দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ডাক্তারী পাশ করেই তিনি চিকিৎসাকে সেবা হিসাবে গ্রহণ করেন। তিনি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পঞ্চাশের মন্বন্তরে যখন দেশে অশনি-সংকেত তখন তাঁর অনলস সেবাকার্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য তার নির্ভীক সংগ্রামের কথা সকলেই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। তিনি চট্টগ্রামে একটি শিশু হাসপাতাল ও একটি অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে সুদীর্ঘকাল পরিচালনা করেন। তিনি ১৯৫২ থেকে ১৯৭২ সদ পর্যন্ত দুই দশক ছিলেন কলকাতা পৌরসভার বিশিষ্ট সদস্য। চিন্তা-ধারায় প্রগতিবাদী এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগী। ডাঃ ঘোষ তাঁর এই গ্রন্থে নানা-বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। কলকাতার নগর-জীবনের সমস্যা সম্পর্কে তাঁর রচনার বিশেষগুণ এই যে, তিনি শুধু রোগ বিশ্লেষণ করেই কর্তব্য সম্পাদন করেন নি, তার নিরাময়েরও পথনির্দেশ করেছেন। তার বিষয় নির্বাচন এবং বিশ্লেষণগুণে এই "প্রবন্ধ সংকলন" গ্রন্থটি পাঠকের কাছে সমাদৃত হবে।
***
#ডাঃ_কৃষ্ণপ্রসাদ_ঘোষ #DRKPGHOSH

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন