নেতৃত্বের ব্যর্থতা নাকি ব্যবস্থাগত অসম্পূর্ণতা? সমাধান কী?


ভারতরাষ্ট্রের স্বাধীনতা লাভ ৭৭ পেরিয়ে ৭৮ বছরের দোরগোড়ায়। প্রাকৃতিক সম্পদ এবং মানব সম্পদে সমৃদ্ধ একটি বৃহৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের পক্ষে সামগ্রিক উন্নয়নের নিরিখে এই দীর্ঘকালীন পরিসর সীমিত সময় নয়, বলা যায় একজন নাগরিকের জীবনকালের সমান।


পরিসংখ্যান বলছে ভারতবর্ষে যে পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ এবং মানব সম্পদ বিদ্যমান তাতে প্রতিটি পরিবারের সমৃদ্ধ জীবনযাত্রার স্থায়ী এবং সুরক্ষিত ব্যবস্থাপনা সম্ভব। একবিংশ শতাব্দীর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির অটোমেশন, রোবোটিক, এআই ইত্যাদি সুবিধাগুলি কর্ম সম্পাদনায় ব্যবহুত হলে সময়-শক্তির সাশ্রয় করে দ্রুত সকলের প্রয়োজনীয় বস্তু-পরিষেবা উৎপাদন সম্ভব। বিদ্যালয়, শিল্পকেন্দ্র, চিকিৎসালয়, বাসস্থান সহ সকল সামাজিক পরিকাঠামো নির্মাণের পর্যাপ্ত সম্পদ রাষ্ট্রের কাছে রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে এই সার্বিক উন্নয়নের পথে বাধা কোথায়? সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকারকে কেউ কি আটকে রেখেছে? কেন্দ্রে-রাজ্যে একাধিক সরকারের বদল ঘটেছে, জনতা একাধিক রাজনৈতিক দল এবং নেতৃত্বের উপর বিশ্বাস রেখে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিয়েও বারংবার আশাহত হয়েছে। এখানেই প্রশ্ন, অসম্পূর্ণতা-অসঙ্গতি ঠিক কোথায়? নেতৃত্বের ব্যর্থতা নাকি ব্যবস্থাগত অসম্পূর্ণতা? সমাধান কী?


ভারতীয় সংবিধান ২৬ জানুয়ারি, ১৯৫০ সালে গৃহীত হবার পর থেকে ১০৫ বার সংশোধিত হয়েছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিবর্গের মধ্যে নৈতিক, জাতীয়তাবাদী, জনদরদি নেতৃত্ববর্গও একাধিক সুযোগ পেয়েছেন। তারপরও ৭০% -এর অধিক নাগরিকের জীবনে মৌলিক সমস্যাসমূহ একইপ্রকার থেকে গিয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে সংগঠিত ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট চাকরির সংখ্যা ৩০% -এরও কম, অর্থাৎ ৭০% -এর অধিক কর্মক্ষম নাগরিক অসহায় শ্রমিক এবং দরিদ্র কৃষিজীবী। মাত্র ২০% নাগরিকের কাছে একপ্রকার অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা উপভোগের সুযোগ রয়েছে। গুটিকয়েক প্রথম শ্রেণীর বিত্তশালী ব্যবসায়ীদের কথা বাদ দিলে অবশিষ্ট যে সংখ্যক মানুষ সুরক্ষিত কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছে তাদের মধ্যেও বৈষম্য রয়েছে চরম পর্যায়ে। সেখানেও উচ্চস্তরের সুরক্ষিত বেতনভোগীর সংখ্যা ৩০% -এরও কম। অর্থাৎ ৭০% এর অধিক চাকরিজীবী মানুষকে বাধ্য হয়ে স্বল্প আয়ের জীবিকা ধরে রাখতে হচ্ছে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে বিত্তশালীবর্গ এবং দরিদ্রবর্গের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও অর্থনৈতিক বৈষম্যের যে অনুপাত তা একইপ্রকার থেকে গিয়েছে। সমস্যা এখানেই। ভারতের মোট সম্পদের ৮০ শতাংশই রয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ বিত্তশালীদের দখলে। এ সবই ঘটছে সাংবিধানিক-গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করেই। এখানেই প্রশ্ন, এই ব্যবস্থা একইপ্রকার চলমান থাকলে ভবিষ্যতেও বৈষম্যের অনুপাতে যে বদল ঘটবে না এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে দ্বিধা থাকবার কথা নয়।

এযাবৎ সরকারপক্ষের বিপক্ষে আন্দোলন-অভিযোগের বৈধ পথে সমাধানের প্রচেষ্টা হয়েছে বিস্তর। বিচারালয়য়ে মামলার সংখ্যাও জমে গিয়েছে পাহাড় সমান। অপরদিকে সমাজ-কল্যাণের উদ্দেশ্যে প্রচেষ্টারত বেসরকারি সংগঠনের সংখাও কম নয়।

উপরোক্ত লেখনীর সারবস্তু হচ্ছে সংবিধানের সংশোধন, দলীয় সরকারের পরিবর্তন, আদর্শবান-নৈতিক নেতৃত্ব, আন্দোলন-অভিযোগ, বেসরকারি সাংগঠনিক প্রচেষ্টা কোনোটিই কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য পূরণে সফলতা অর্জন করেনি।

উপায় কী?

সমস্যার মূল কারণ কোনটি?

দুর্ভাগ্যই ভারতরাষ্ট্রের ভবিতব্য?

সমাধান কী?

***

অনুসন্ধান বলছে বেশিরভাগ মানুষের কামনাগুলো পূরণ হয় না। সাধারণত ৮ থেকে ১০ শতাংশ মানুষ তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারে, অর্থাৎ ৯২ শতাংশই ব্যর্থ হয়। যে মৌলিক প্রয়োজনগুলো পূরণ হওয়া আবশ্যক তার জন্য মানুষ সাধ্যমত চেষ্টা করে থাকে। যেহেতু সুযোগ সীমিত সেহেতু অধিকাংশই ব্যর্থ হবে স্বাভাবিক। এটি ব্যক্তিগত অযোগ্যতার ব্যর্থতা নয়, সিস্টেমের ত্রুটি। সকলের কোনও না কোনও বিষয়ে ট্যালেন্ট রয়েছে; ট্রেনিং এবং উচিত আয়যুক্ত কাজের সুযোগ পাওয়া হচ্ছে সমস্যা। সিস্টেম এমন করে তৈরি করাই হয়নি যেখানে প্রতিটি নাগরিক শিক্ষা ও কর্মসংস্থান পাবে এবং উচিত পারিশ্রমিক পাবে যেখানে জীবনের প্রয়োজনগুলো পূরণ করতে পারবে। ভারতবর্ষে যে পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ এবং মানব সম্পদ বিদ্যমান তাতে প্রতিটি পরিবারের সমৃদ্ধ জীবনযাত্রার স্থায়ী এবং সুরক্ষিত ব্যবস্থাপনা সম্ভব। নিজের ও পরিবারের ভাগ্যকে দোষারোপ করে দরিদ্রতা সঙ্গী করে বেঁচেও থাকা সঠিক পথ, সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। ব্যবস্থা একইরকম থাকলে ৯০% শতাংশ মানুষের দুর্দশাও একইপ্রকার থেকে যাবে। কেন্দ্রে-রাজ্যে একাধিক সরকারের এবং নেতৃত্বের বদল ঘটেছে কিন্তু সিস্টেম একই রয়ে গিয়েছে। সিস্টেমের আমূল রূপান্তর জরুরী। একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে জাতি-ধর্ম-দল নির্বিশেষে নাগরিক সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিস্তারিত আলোচনায় সকলে স্বাগত।

***


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

ব্যবস্থাগত অসম্পূর্ণতা নাকি নেতৃত্বের ব্যর্থতা?