হাত খালি হবে না কখনই?

 


সরকারি চাকরির বাজার মন্দা বলে অনেকে ব্যবসা করতে উপদেশ দেন। যিনি উপদেশ দেন হয় তিনি ব্যবসার প্রতিদ্বন্দ্বিতা-কৌশল বোঝেন না কিংবা আদর্শ-নৈতিকতা নিয়ে কঠোর শ্রম দিলেই সফলতা গ্যারান্টি এমন মসৃণ রাস্তাকেই আঁকড়ে ধরে আছেন অথবা ব্যবসা করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং তিনি চান অন্যজনও ব্যবসা করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে করতে ক্ষতিগ্রস্ত হোন। অথবা তিনি চাকরি কিংবা ব্যবসা উভয় দিক দিয়ে সুরক্ষিত। কিংবা কোনো একটি দিক দিয়ে সুরক্ষিত। অনেক সময় মোটিভেশনাল স্পিকাররা এইসব উপদেশ দিয়ে থাকেন। কারণ উপদেশ প্রদান করাই তার পেশা। এইপ্রকার বক্তারা তথাকথিত ১০ শতাংশ সফলদের উদাহরণ হিসেবে দেখান। কখনই ৯০ শতাংশের বাস্তবিকতাকে দেখান না। যেমন নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পেশায় আজ অবধি এমনটি হয়নি যেখানে ৯০ শতাংশ কর্মী সফল হয়েছে। কারণ ৯০ শতাংশের লোকসান দিয়েই ১০ শতাংশের সফলতা। হিসেব বোধহয় একটু ভুল হল। নেটওয়র্কিং পেশায় বাস্তবিক সফলতার অনুপাত ১ শতাংশেরও কম হবে। গড়পড়তা সর্বক্ষেত্রে সুরক্ষিত মানুষের সংখ্যা ১০ শতাংশ মাত্র। সুরক্ষার অনুপাত চাকরিতে যেমন ১০ শতাংশ তেমনই ব্যবসাতেও একই অনুপাত বিদ্যমান। যত ব্যবসায়ী রয়েছে তাদের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশই সুরক্ষিত আয়ের কোঠায় রয়েছেন। কিংবা আরও কম। এবার কেউ যখন ব্যবসার উপদেশ দেবেন তার অর্থ হচ্ছে ক্রমাগত সংঘর্ষ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং কৌশল অবলম্বন করে ব্যবসা টিকিয়ে রেখে ১০ শতাংশের অবস্থানে আসা। বিষয়টি কতখানি চাপের ব্যবসায়ীরাই বোঝেন। বাজারে দেখা যায় কিছু কোম্পানির প্রোডাক্ট বা দোকানের বিক্রি অত্যধিক, বাকিদের সাধারণ কিংবা অনেক কম। এই নিয়মই সর্বত্র। অপরদিকে সরকারি-বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সুরক্ষিত শূন্যপদ এতোটাই যৎসামান্য যে সেখানেও চরম অধ্যবসায়, শ্রম, সময়, অর্থ সবকিছু ব্যয় করে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে ১০ শতাংশে পৌঁছাতে হবে। তারপরও সফলতা নিশ্চিত নয়। রয়েছে দুর্নীতি। সময়ের সাথে সাথে সরকারি-বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রে দুর্নীতির রূপেরও পরিবর্তন হচ্ছে। সরকারি দুর্নীতির যৎসামান্যই প্রমাণসহ প্রকাশ্যে আসে। কারণ সিস্টেমকে বাঁচিয়ে নানা কায়দায় দুর্নীতির কাজটি সম্পন্ন করা হয়। যেন সাপও মরে লাঠিও না ভাঙে। একই সাথে দুটি শর্ত পূরণ করা হয়। সমস্যার সমাধান এমনভাবে করা হয় সেখান থেকে যে দুর্নীতি করা হয়েছে জনতা বুঝতে পারে না। আইনি প্রমাণও থাকে না। এটিই এখন ট্রেন্ডিং। অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির মারপ্যাঁচ বোঝা গেলেও করবার মতন কিছুই থাকে না। প্রমাণিত মামলা হলেও জনশক্তির চাপে নাম কা ওয়াস্তে শাস্তি দেওয়া হয়। যা না দিলেই নয়। অনেক সময় রাঘব বোয়ালদের ব্যক্তিগত রোষানলে পড়ে অনেকে ধরা পড়তে পারেন। দলীয় কোন্দল কথাটি হামেশাই শোনা যায়। অর্থকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত রোষানলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্বাভাবিক একটি বিষয়। আপনি যে পেশাতেই যান কেন এই বিষয়টির খপ্পরে পড়তেই হয়। কারণ উচ্চস্তরের সুরক্ষিত পজিশন যৎসামান্য। প্রতিদ্বন্দ্বিতাই অর্থকেন্দ্রিক ব্যবস্থার হাতিয়ার। পরিবার হোক কিংবা সমাজ, অফিস হোক কিংবা ব্যবসা, প্রেম হোক কিংবা পরিণয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে সর্বত্র। দুর্নীতি পূর্বেও ছিল, আজও রয়েছে, সমাজব্যবস্থা একইপ্রকার চলমান থাকলে ভবিষ্যতেও থাকবে।
একই পরিস্থিতি শেয়ার বাজারে। সেখানেও পুঁজিপতিরাই উদ্বৃত্ত অর্থ ছড়িয়ে রাখেন। তারা এতোটাই সুরক্ষিত যে দীর্ঘ সময় অবধি বিনিয়োগ করে অপেক্ষা করতে পারেন। এই বড় মাছেদের সংখ্যাও ১০ শতাংশ। বা আরও কম। ৯০ শতাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছু ব্যক্তি স্বল্প মুনাফা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন বাকি সকলে ক্ষতির সম্মুখীন হন।
একই অবস্থা শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও। টিভি চ্যানেল, সিনেমা বা বিনোদনের ব্যবসাতেও ১০ শতাংশই মুনাফা করতে পারে। বিনোদন জগতের মানুষজনই বলে দিচ্ছেন মুনাফার বাজার তলানিতে ঠেকেছে। তবে ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে সমস্ত মাধ্যম যে দ্রুত বদলে যাচ্ছে তা বুঝতে কারোরই অসুবিধা হবার কথা নয়। বিনোদন কিংবা নিউজ চ্যানেল উভয়ের ক্ষেত্রে একচেটিয়া মুনাফার বাজারও দ্রুত কমে আসছে। মানুষ শুধুমাত্র সময় অর্থ ব্যয় করে অপরের বিনোদন দেখে তৃপ্তি লাভ করাই নয় নিজেও অংশগ্রহণ করতে চাইছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিভা বিকাশের সুযোগ বা আয়ের সুযোগ নিজেরাই করে নিচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে সমস্যা এখানেও পিছু হটছে না। ভিউ বা জনপ্রিয়তা বা কন্টেন্টের ডিমান্ড একপ্রকার থাকছে না। অর্থাৎ যে মাধ্যমই আসুক না কেন, প্রযুক্তিতে যতই বদল ঘটুক না কেন জীবনযাপনের সুরক্ষিত আয়ের অনুপাত একই রয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ, দুর্নীতি, প্রতারণা, লুণ্ঠন, প্রতিহিংসা, হত্যা, ধর্ষণ, আত্মহত্যা, অসহায়তা সহ সকল সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে দুষ্ট অর্থনীতি। এই দুষ্টনীতির গোঁড়ায় কী প্রকার সার-জল-হাওয়া প্রয়োগ করলে ১০ শতাংশের মত উদ্বৃত্ত মুনাফার পাহাড় নয় বরং প্রয়োজনীয় সকলপ্রকার অর্থনৈতিক সুরক্ষার সুখসুবিধা ৯০ শতাংশ পরিবারে পৌঁছাবে। একইসাথে অর্থনৈতিক সুখসুবিধা প্রাপ্তির পরও যে ১০ শতাংশ ক্রমাগত একাধিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন সেইসকল সমস্যারও স্থায়ী নিরসন সম্ভব হবে। অর্থনীতির এই রূপান্তর প্রক্রিয়া কীভাবে কোন মাধ্যমে সম্ভব এই রহস্যের ডিকোড যেন করা যাচ্ছে না কোনোভাবেই? প্রচেষ্টা তো গোড়া থেকেই চলমান রয়েছে। অর্থনীতিবিদগণও সমাধান-সমাধান বলে নানা পন্থার অবতারণা করে চলেছেন বটে আদপে মৌলিক সমস্যাদি যেখানে থাকবার সেখানেই রয়ে গিয়েছে।
এই অসহনীয় দুরবস্থার কোনও সুরাহা নেই? সকলের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত থাকবে এমন ব্যবস্থা কি করা যায় না? সিস্টেম বা ব্যবস্থা আসলে কী? ব্যবস্থাই কি সব? সমস্ত নিয়মনীতি কি ব্যবস্থারই অধীন?
***
মতামত ও আলোচনায় স্বাগত।
***

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

ব্যবস্থাগত অসম্পূর্ণতা নাকি নেতৃত্বের ব্যর্থতা?