প্রেম-অপ্রেম ও বিবাহ-বিচ্ছেদের রহস্য, বাস্তবিকতা এবং সমাধান:


প্রেম হচ্ছে একে অপরের প্রতি সম্বন্ধ। আর সম্বন্ধ নির্ভর করে এই বিষয়ের উপর যে দুজনের সম্পর্ক দুজনের প্রতি কতটা উপযোগী। যে যার প্রতি যতটা উপযোগী হবে তাদের মধ্যে সেই প্রকার সম্বন্ধ এবং ততটুকু সম্বন্ধই থাকবে। এই সম্বন্ধকেই প্রেম অথবা প্রেমের আকর্ষণ বলা হয়ে থাকে। যখন আমরা একে অপরের উপযোগিতার তাৎপর্য বুঝতে পারি এই ভেবে যে আমাদের সুখ পরস্পরের যোগদান ছাড়া সম্ভব নয় তখনই অন্যের প্রতি আমাদের আকর্ষণ তৈরি হয়। এই আকর্ষণকেই প্রেম বলা হয়। এই উপলব্ধি যে স্তরের হবে সেই স্তরের প্রেম তার ভেতর উৎপন্ন হবে। ব্যক্তিগত স্তরে যেহেতু আমরা একা সেহেতু সেখানে সম্পর্ক তৈরির জন্য অন্য কেউ থাকে না। তবে পারিবারিক স্তরের প্রেমকে বোঝার জন্য একটি উদাহরণ নেওয়া যেতে পারে। যখন স্ত্রীর কাছ থেকে স্বামী সুখ পেতে থাকে তখন তার প্রেম হতে থাকে। তখন সে বুঝে যায় স্ত্রীর কাছ থেকে যেমন সুখ পাচ্ছি সেই প্রকার সুখ স্ত্রী ব্যতীত উপভোগ করতে পারব না। সামাজিক স্তরের সুখকেও আমরা একইভাবে বুঝে নিতে পারি। যদিও সামাজিক স্তরের সুখকে অনুভব করা একটু কঠিন হয়ে যায় কেননা বিভিন্ন প্রকার সুখের মধ্যে সমাজের ভিন্ন ভিন্ন যোগদান থাকে। যিনি বুঝতে পারেন তিনিই তা অনুভব করতে পারেন।


এইজন্য বলা হয় বাস্তবিক জ্ঞান থেকেই প্রেম উৎপন্ন হয়। যখন আমাদের ভেতর প্রেম উৎপন্ন হবে কেবলমাত্র তখনই তা অনুভব করতে পারব তার আগে নয়। যেমন কোনো একটি অনুভব তখনই হয় যখন সেই বিষয় সম্পর্কিত কোনো ঘটনা ঘটে থাকে। অর্থাৎ অপরের যোগদান ছাড়া আমরা সামান্য সুখই উপভোগ করতে পারি, তাও বহু সংঘর্ষের পর। সুতরাং পারস্পরিক নির্ভরতার জ্ঞান থেকে একে অপরের প্রতি প্রেমের উৎপত্তি হয়ে থাকে। সে বুঝতে পারে অপরের সান্নিধ্য ছাড়া সম্পূর্ণরূপে সুখী হওয়া সম্ভব নয়। আর তখন অপরের গুরুত্বও অনুভব করতে পারে। যার ফলে তার অপরের সাথে প্রেম হয়ে যায়। যেমন বৃক্ষের মূল এবং শাখার সাথে যে সম্বন্ধ সেটিই প্রেমের সম্পর্ক। পারিবারিক সুখ প্রাপ্তির জন্য প্রেমই হচ্ছে আধার। পরিবারের অর্থ হচ্ছে দুই বা অধিক ব্যাক্তি দীর্ঘ সময় অবধি একসাথে থাকতে চায়। দীর্ঘ সময় অবধি থাকার ফলেই পারিবারিক সুখের উদয় হয়। এইজন্য পরিবার নামক কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে।


সাধারণভাবে প্রেমকে বুঝতে হলে এইভাবে জানতে হবে যে কারোর সান্নিধ্য পেয়ে যখন সুখ প্রাপ্তি হতে থাকে এবং তার সাথে ক্রমাগত বসবাস করার ইচ্ছে তৈরি হতে থাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত তার ইচ্ছে থাকবে ততক্ষন অবধি সেই সুখও যেন প্রাপ্তি হতে থাকে। এই রকম আকর্ষণকেই প্রেম বলা হয়। আর এটিই হচ্ছে প্রেমের সাধারণ পরিভাষা। কিছুদিন পর সেই সামান্য প্রেম গভীর হতে থাকে। তখন কেবলমাত্র নিজের সুখ প্রাধান্য পায় না বরং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সুখও প্রাধান্য পেতে থাকে। একেই পারিবারিক প্রেম বলে। এরপর প্রেমের বোধ আরো প্রসারিত হলে তা সামাজিক হতে থাকে এবং তারপর সমষ্টিগত হতে থাকে। অর্থাৎ ব্যক্তিগত প্রেম, পারিবারিক প্রেম, সামাজিক প্রেম এবং সমষ্টিগত প্রেম। প্রেমের এই চারটি স্তর রয়েছে।

প্রথমত— নিজের প্রতি প্রেম,
দ্বিতীয়ত—পরিবারের প্রতি প্রেম,
তৃতীয়ত— সমাজের প্রতি প্রেম এবং
চতুর্থত— সমষ্টির প্রতি প্রেম।

যে স্তরের জ্ঞান ও বোধ হবে সেই স্তরের প্রেম হবে এবং যে স্তরের প্রেম হবে সেই স্তরের কর্ম হবে। যে স্তরের কর্ম হবে সেই স্তরের পরিণাম আসবে। আর এর মাধ্যমেই কারোর ব্যক্তিত্ব প্রস্ফুটিত হবে।

বিবাহ-বিচ্ছেদ:
প্রেমঘটিত বিষয়ের ক্ষেত্রে কিংবা বিবাহের পর কবে একজন অপরজনকে ছেড়ে যেতে চাইবে সেই দুশ্চিন্তায় বহু মানুষ প্রেম বা বিবাহজনিত সম্পর্কে জড়াতে ভয় পান। হয়তো তারা ভাবেন সম্পর্কে জড়ালে একজনের লাভ হলে অপরজনের ক্ষতি হতে পারে। অথবা দুজনেরই ক্ষতি হবে। দুজনেই সমান লাভবান হবেন এমনটি ভেবে কেউই নিশ্চিত হতে পারেন না। অর্থাৎ সম্পর্ক শুরু হবার পূর্বেই মনের ভেতর আনুসঙ্গিক বহু বিষয় ঘুরপাক খেতে থাকে। এমনতর অবস্থায় সম্পর্কে জড়ালেও আশানুরূপ সম্বন্ধসুখ থেকে উভয়ই বঞ্চিত হন। হয়তো এইপ্রকার ভীতির কারণেই বহু মানুষ প্রেম এবং বিবাহের বিষয়টিকে ‘প্রেমের ফাঁদ’ কিংবা ‘বৈবাহিক বন্ধন’ বলে ব্যাঙ্গ করে থাকেন। কারণ কে কী প্রকার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রেম অথবা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে চাইছে তা সঠিকভাবে বুঝতে পারা যায় না। আবার, প্রেম বা বিবাহ যে-সম্পর্কই হোক না কেন তা থেকে মুক্ত হবার পথে বিপুল ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয়। এমনকি জটিল আইনি প্রক্রিয়াও উভয়পক্ষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, এমনকি সামাজিক জীবনযাপনের স্বাভাবিকতাকে বিনষ্ট করে ফেলে।

এইস্থানে দেখা যাচ্ছে মূলত দু’টি মুখ্য সমস্যা উদয় হয়েছে।

এক, বিপরীত সঙ্গীর মনোভাব বুঝতে না পারা, অর্থাৎ ম্যাচিং সঙ্গী-সঙ্গিনী না পাওয়া,

দুই, মাঝপথে কেউ বিচ্ছেদ চেয়ে বসার দুশ্চিন্তা।

যে-কোনো কাজের মত সম্পর্কের পেছনেও যে উদ্দেশ্য থাকবে এমটিই স্বাভাবিক। তা হতে পারে নিখাদ সম্পর্কজনিত সুখ উপভোগের বাসনা, হতে পারে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের আকাঙ্ক্ষা, হতে পারে সামাজিকতা রক্ষার বাধ্যবাধকতা, হতে পারে উভয়দিকের ভোগ-বাসনা, অথবা থাকতে পারে ভিন্ন কোনো গোপন অভিসন্ধি। সকল অভিসন্ধিমূলক সমস্যারই ব্যাখ্যাসহ মূল কারণ এবং স্থায়ী সমাধান প্রদানের প্রচেষ্টা থাকবে এই রচনায়। প্রণয়ঘটিত সমস্যা ছাড়াও পারিবারিক জটিলতার ক্ষেত্রেও বিষয়টিকে একইরকমভাবে বুঝে নিতে পারেন। অর্থাৎ পারিবারিক কলহ, বিবাদ, বিভাজন, মতান্তর, অর্থনৈতিক অসন্তোষ, মামলা-মোকদ্দমা, হত্যা-হিংসা ইত্যাদি সমস্যাগুলিরও মূল কারণ এবং স্থায়ী সমাধান থাকবে। প্রেম বা বিবাহজনিত সম্পর্কের বাইরেও বিভিন্নপ্রকার সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে। সেইসব সম্পর্কগুলি থেকেও আমরা নানাপ্রকার সুখ অনুভব করে থাকি। যেমন মায়ের থেকে মাতৃসুখ, পিতার থেকে পিতৃসুখ, ভাই-বোনের থেকে ভ্রাতৃত্বের সুখ, দাদু-ঠাকুমা-দিদিমার কাছ থেকেও ভিন্নতর সুখ পেয়ে থাকি। এরপর বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-পরিজন, সহকর্মী ছাড়াও যাদের সাথে যেমন সম্পর্ক তাদের থেকে সেইরূপ সুখ প্রাপ্ত করে থাকি। এককথায় ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, সমষ্টিগত সম্পর্কগুলি থেকে বিভিন্নপ্রকার সুখ অনুভব করে থাকি। সম্পর্কজনিত সুখ পরিপূর্ণভাবে উপভোগের মাঝে যে বিষয়টি প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় তা হচ্ছে অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা। আর্থিক পরনির্ভরতা যত অধিক থাকবে সেই সম্পর্কও ততটাই বাধ্যবাধকতার মধ্যে থাকবে এবং উক্ত সম্পর্ক থেকে সুখের পরিবর্তে দুঃখ অধিক উৎপন্ন হবে।

এবার খানিকটা মনের ভাব নিয়ে কথা বলা যাক। অর্থাৎ মন কী চাইছে। আমাদের অভিপ্রায় কী? জীবনের মূল উদ্দেশ্যই বা কী? জীবনযাপনের সমস্ত কর্মকাণ্ডের পেছনে মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সুখী হতে চাওয়া। সকলেই পছন্দের জ্ঞান, কর্ম, ভোগ ও বিশ্রামের মাধ্যমে সুখী জীবন উপভোগ করতে চায়। সকলেই শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, সুখসুবিধা এবং সুরক্ষিত জীবনযাপন পেতে চায়। জীবনের উদ্দেশ্যও তাই। সমৃদ্ধশালী জীবনযাপন উপভোগ করতে চাওয়াটা দোষের নয়। সকলে নিজের পছন্দ অনুযায়ী সুখসুবিধা পেতে চাইবে এবং সুখী জীবনযাপন উপভোগ করতে চাইবে এমনটিই স্বাভাবিক। তেমনি প্রতিটি ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দ থাকবে এবং জীবনযাপনের মধ্যে বৈচিত্র চাইবে এমনটিও স্বাভাবিক। এটি সমস্যা নয়। বরং জীবনে বৈচিত্র থাকলে ক্লান্তি-বিরক্তি-একঘেয়েমি-অবসাদ চেপে ধরে না।

মূল সমস্যা হচ্ছে সকলের জন্য শিক্ষণ-শিক্ষণ, কর্মসংস্থান, সুখসুবিধা, সুরক্ষার একসমান সুযোগসুবিধা তথা পছন্দ অনুযায়ী জীবনযাপনের বন্দোবস্ত না থাকাটা। একইসাথে ম্যাচিং সঙ্গী-সঙ্গিনী পাবার ব্যবস্থা না থাকা। যদি জীবনযাপনের মূল ইচ্ছেগুলি পূরণ হয়ে যায় তবে কেউই অপরের কাছে থেকে সম্পর্ক-সুখ ব্যতীত অন্যকিছুর আশা করবে না। সেজন্য প্রাথমিক পদক্ষেপ হচ্ছে সকলের জন্য জীবনযাপনের আবশ্যিক দিকগুলিকে সুনিশ্চিত করা। যেন সম্পর্কজনিত সুখ প্রাপ্তির ইচ্ছে ব্যতীত একজন অপরজনের উপর নির্ভরশীল না থাকে। তবেই চাওয়া-পাওয়ার গোপন অভিসন্ধি থাকবে না। এমনটি হলে তবেই সমস্ত সম্পর্ক প্রেমের আধারে নির্মিত হবে। অর্থাৎ শুধুমাত্র ‘সম্বন্ধ সুখ’ উপভোগের জন্যই সম্পর্ক স্থাপিত হবে।

এবার বিচ্ছেদের বিষয়টিতে আলোকপাত করা যাক।

বিচ্ছেদ হওয়া উচিত সহজ-সরল।

পারস্পরিক নির্ভরতা থেকে একে অপরের প্রতি প্রেমের উৎপত্তি হয়। একজন বুঝতে পারে অন্যজনের সান্নিধ্য ছাড়া সম্পূর্ণরূপে সুখী হওয়া সম্ভব নয়। যখন একজন অপরজনের গুরুত্ব অনুভব করতে পারে তখন পরস্পরের মধ্যে প্রেম হয়ে যায়। বৃক্ষের মূল এবং শাখার সাথে যে সম্বন্ধ সেটিই প্রেমের সম্পর্ক। অপরদিকে, পারিবারিক সুখ প্রাপ্তির জন্যও প্রেমই মূল আধার হওয়া উচিত। পরিবারের অর্থ হচ্ছে দুই বা অধিক ব্যক্তি দীর্ঘ সময় অবধি একসাথে থাকতে চায়। দীর্ঘ সময় অবধি একসাথে বসবাসের ফলেই পারিবারিক সুখের উদয় হয়। এইজন্যই পরিবার নামক কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। সাধারণভাবে প্রেমের অর্থ হচ্ছে যখন কারোর সান্নিধ্য পেয়ে সুখ প্রাপ্তি হতে থাকে এবং ক্রমাগত বসবাস করার ইচ্ছে জাগ্রত হতে থাকে। এমনটি হলে বুঝতে হবে প্রেমের সম্বন্ধ তৈরি হচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত ইচ্ছে থাকবে ততক্ষন অবধি প্রেমের সুখ যেন প্রাপ্তি হতে থাকে। এইরকম আকর্ষণকেই প্রেম বলা হয়।

অর্থনৈতিক বিষয়টির সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা পূর্বেই করা হয়েছে।

প্রথমত, উভয়পক্ষ আর্থিক দিক দিয়ে স্বতন্ত্র এবং আত্মনির্ভরশীল হলে পরস্পরের মধ্যে অহংকার বা হিংসার কারণ উৎপন্ন হবে না।

প্রথমতঃ
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের মানমর্যাদা তথা সমস্ত কর্মের মুল্যাংকন একসমান থাকা উচিত। অসম্পূর্ণ সমাজব্যবস্থা সমস্যার মূল কারণ। একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজব্যবস্থা নির্মাণের উদ্দেশ্যে সকল স্তরের মানুষের যোগদান প্রয়োজন হয়। ফলে সকলপ্রকার কর্মীর মুল্যাংকনও একসমান থাকা উচিত। একজনের ৫০০০ এবং অপরজনের ৫ লাখ- এই অন্যায়, অর্থাৎ আর্থিক বৈষম্য চলমান থাকলে গোপন অভিসন্ধির খেলা চলতেই থাকবে।

দ্বিতীয়ত:
ম্যাচিং সঙ্গী-সঙ্গিনীর বিষয়টি। পছন্দসই সঙ্গী-সঙ্গিনী কিংবা জীবনসাথী পেলে মতভেদের বিষয়টি গুরুত্বই পাবে না। মূলত আর্থিক বৈষম্যের বাধাটি নির্মূল হয়ে গেলে, অর্থাৎ প্রতিটি নারী-পুরুষ আত্মনির্ভরশীল হলে গোপন অভিসন্ধির দ্বিধা নিয়ে সম্পর্কে জড়ানোর দুশ্চিন্তা থাকবে না। বরং নিজেদের সম্মতিতেই সম্পর্ক তৈরি হবে। বাধ্যবাধকতাবিহীন সম্পর্কের মধ্যেই বাস্তবিক প্রেম থাকে, যা কেবলমাত্র পরস্পরের সম্মতির উপর নির্ভর করে। যদি সম্পর্কের বিজ্ঞানকে বুঝতে চাই তাহলে জানা যাবে, আমরা নানারকম সম্বন্ধ থেকে ভিন্ন ভিন্ন সুখ উপভোগের জন্যই সম্পর্ক তৈরি করে থাকি। সম্পর্কের সুখ আমরা এমনতর পরিবেশ থেকেই পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে পারি যেখানে কোনোপ্রকার বাধ্যবাধকতা থাকে না। আমাদের সম্পর্ক শুধুমাত্র সেইসব সুখ উপভোগের জন্যই তৈরি হোক যার জন্য আমরা সম্পর্ক স্থাপন করতে চাই। সঠিক সম্পর্ক কেবলমাত্র তখনই সম্ভব হবে যখন পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ অথবা প্রেমের অনুভব থাকবে। অপরদিকে স্ত্রী-পুরুষ সকলে আর্থিক দিক দিয়ে স্বতন্ত্র হলে একে অপরের প্রতি কেউ মালিকানা মনোভাব দেখাবে না। তখন একে অপরের সাথে থাকার একটিই কারণ এবং একটিই প্রয়োজন থাকবে তা হল বাস্তবিক প্রেম। সম্পর্কের কোনো সময়সীমা থাকা উচিত নয়। যতদিন প্রেম রয়েছে একসাথে থাকবে। যখন প্রেম সমাপ্ত সম্পর্কও সমাপ্ত। যখন সম্পর্ক সমাপ্ত সহাবস্থানও সমাপ্ত। শুধুমাত্র যার সাথে প্রেম অনুভব হবে তার সাথে জীবন কাটাবে। ফলে কোনো সমস্যা ছাড়াই সকলের জীবন সুখপূর্ণভাবে চলতে থাকবে।

সম্পর্ক যখন প্রত্যক্ষ কিংবা অপ্রত্যক্ষভাবে বাধ্য হয়ে তৈরি হয় তখন সেইসব সম্পর্ক দাসত্বের জন্ম দেয়, বন্ধন তৈরি করে। সন্তুষ্টি প্রদান করে না। সুতরাং এই বিষয়টি মানুষকেই নিশ্চিত করতে হবে যে সে কার সাথে, কেমনভাবে, কতক্ষণ, কতদিন সম্পর্ক রাখতে চায়। এই বিষয়টিকে অত্যন্ত্য গুরুত্বসহ দেখা উচিত যেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কেউই অপরের উপর বাধ্য না থাকে। যদি কোনো সম্পর্ক থেকে কেউ বেরিয়ে যেতে চায় তবে অপরপক্ষ যেন স্বাভাবিকভাবেই তা স্বীকার করে নিতে পারে। কোনোপ্রকার জটিলতা যেন না থাকে। এমনটি হলে সে অপরকে দুঃখী করে তুলবে অথবা নিজেও সুখী হতে পারবে না। তবেই আমাদের সম্পর্কগুলি সার্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে। কোনো একটি সম্বন্ধ সমাপ্ত করতে তখনই অসুবিধে হয় যখন আমাদের কাছে কোনো বিকল্প থাকে না। যেহেতু এই পরিবর্তনশীল সংসারে আমাদের রুচি প্রতিনিয়ত বদলাতে থাকে সেইজন্য সবকিছুই যদি পরিবর্তনশীল রাখা যায় তবেই অধিক সুখময় হবে। অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিরন্তর পরিবর্তনশীল থাকা উচিত। বিশেষ করে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তো অধিক সংবেদনশীল থাকা উচিত যেন একে অপরের প্রতি উদাসীনতা পরিলক্ষিত না হয়। উদাসীন থেকেও যদি আমরা সম্পর্ক ধরে রাখি অথবা অপরজনকে বাধ্য করে থাকি তবে এটিই বুঝে নিতে হবে আমরা আসলে দুঃখকেই নিমন্ত্রণ করছি। দুটি সমস্যারই মূল কারণ এবং স্থায়ী সমাধান থাকলেও বর্তমান ব্যবস্থায় তা সম্ভব নয়। কারণ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্য শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, সুখসুবিধা ও সুরক্ষার সমান সুযোগসুবিধার নিরিখে একটি পরিপূর্ণ ব্যবস্থা প্রথমে নির্মাণ করা চাই। যে-কারণে জাতি-ধর্ম-দলমত নির্বিশেষে নাগরিক সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে বিকল্প সমাজব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা আবশ্যক।


এইপ্রকার সিস্টেম কীভাবে সম্ভব?


প্রতিটি পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জীবনযাপনের সুরক্ষিত ব্যবস্থাপনা মূল সমস্যা। সকলের শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, সুখসুবিধা এবং সুরক্ষার সমান সুযোগসুবিধা তথা পছন্দ অনুযায়ী জীবনযাপনের দিকটি সুনিশ্চিত থাকা জরুরী। পাশাপাশি ম্যাচিং সঙ্গী-সঙ্গিনী খুঁজে পাবার সমস্যাটিরও নিরসন হওয়া আবশ্যক।

ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত যেন প্রত্যেকের ব্যক্তিগত প্রোফাইল থাকে। সকলের প্রোফাইল থাকলে সম্পর্ক সূচনার পূর্বেই প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ পছন্দের বিষয়গুলি মিলিয়ে নিতে পারবে এবং পরস্পর আলোচনা করে নিতে পারবে। নারী-পুরুষের কেউই যদি একে অপরের উপর আর্থিকভাবে নির্ভরশীল না থাকে তবে গোপন অভিসন্ধি বা ঠকে যাওয়ার বিষয়টি প্রাধান্য পাবে না। ইচ্ছে-অনিচ্ছে এবং পছন্দ-অপছন্দের বিষয়টিই প্রাধান্য পাবে। ফলে প্রেমও হবে যার সাথে ম্যাচ করবে কেবলমাত্র তার সাথেই। উভয়ই মতবিনিময় করে বন্ধুত্ব কিংবা সম্পর্ক তৈরির উদ্দেশ্যটি আগাম বুঝে নিতে পারবে। সম্পর্ক সম্বন্ধ বন্ধুত্ব, প্রেম বা বিবাহ যে উদ্দেশ্যে হচ্ছে কেবলমাত্র সেই উদ্দেশ্যে স্থাপিত হবে। একজন অপরেজনের উপর আর্থিকভাবে নির্ভরশীল না থাকলে কেউ অতিরিক্ত কিছু পাওয়ার আশায় সম্পর্ক স্থাপন করবে না। ফলে ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা, নিরাপত্তাহীনতা অথবা ভয়ের অবকাশ থাকবে না। অসঙ্গতি তৈরি হলে আলাদা হতে কিংবা নতুন সঙ্গী-সঙ্গিনী খুঁজে পেতেও সমস্যা উৎপন্ন হবে না। সকলের সাথে স্বচ্ছ আদান-প্রদানে বাধা থাকবে না। প্রেম বা বৈবাহিক সম্পর্ক ব্যতীত অন্যান্য পারিবারিক সম্বন্ধগুলির অভাবও পছন্দের ব্যক্তির সাথে তৈরি করে নিতে পারবে।

ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত যেন পরিবারের প্রতিটি সদস্য সরাসরি ব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত থাকে। শিশু-বৃদ্ধ, যুবক-যুবতী, স্বামী-স্ত্রী, প্রতিবন্ধী-অসুস্থ্য, তৃতীয় লিঙ্গ সহ সকলের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তু-পরিষেবার পাশাপাশি সমস্ত দায়দায়িত্ব যেন ব্যবস্থার অধীন থাকে। সন্তানদের সমস্তপ্রকার শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ-জীবিকা-গবেষণার বন্দোবস্তও যেন ব্যবস্থা বা সরকার অধীন থাকে। ব্যবস্থায় শর্তও এমন থাকতে হবে যেখানে শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ শেষে সকলকে একটি জীবিকা সম্পাদন করতে হবে। কারণ সকলকে কর্ম সম্পাদনে যোগদান না করলে সকলের জন্য বস্তু-পরিষেবার নির্মাণ কীভাবে হবে। ভারতে প্রায় একশো কোটি কর্মক্ষম নারী-পুরুষ রয়েছে, সকলের কর্মসংস্থানের বন্দোবস্ত হলে সকল শিক্ষার্থীর জন্য আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি দেশবাসীর জন্য উন্নতমানের স্বাস্থ্য পরিষেবা বিনামূল্যে প্রদান করা সম্ভব হবে। অসুস্থ্য এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দেখভালের জন্যও সুরক্ষিত বন্দোবস্ত সম্ভব হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উৎপাদনশিল্প, আইন, প্রশাসন সহ সামাজিক অবকাঠামো নির্মাণে কর্মী সংকট থাকবে না। এমন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে কেউই একে অপরের উপর বোঝা হয়ে থাকবে না। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা এবং নিরাপত্তাজনিত সমস্যা থাকবে না। সকলে মানসিক দিক থেকেও সুস্থ্য জীবনযাপনের অধিকারী হবে।

প্রথমত, সম্পর্কের ক্ষেত্রে ম্যাচিং না হলেও একসাথে থাকতে হবে এমনতর বাধ্যবাধকতা থাকবে না।

দ্বিতীয়ত, কেউ সহিংসতার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হবে। অপরাধীর জন্য উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা থাকবে। এমনকি ব্যবস্থার সুখসুবিধা থেকেও বরখাস্ত হতে পারে। একে তো হিংসার কোনো কারণ উৎপন্ন হবে না, তারপরও যদি কেউ নেতিবাচক কর্মে লিপ্ত হয় অথবা অপরের অসুবিধা সৃষ্টি করে তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে পরিগণিত হবে।

সমাজের সমস্ত শাখাপ্রশাখা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হলে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে স্পষ্টতা বৃদ্ধি পাবে এবং সম্মিলিত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সুবিধা হবে। ভারতের চলমান অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সংকটের নিরিখে যা অত্যন্ত জরুরী।


***

বিস্তারিত বর্ণনা সমাজব্যবস্থা বিষয়ক “সম্পূর্ণ সমাধান – নতুন সামাজিক রাজনৈতিক অর্থব্যবস্থা” এবং জীবনবোধ বিষয়ক “সম্পূর্ণ জীবন দর্শন - সুখী জীবনের অজ্ঞাত সূত্র” পুস্তকে রয়েছে।


সম্পূর্ণ সমাধান - নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থব্যবস্থা" অ্যামাজন লিংক

সম্পূর্ণ সমাধান - নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থব্যবস্থা" ফ্রি পিডিএফ লিংক https://drive.google.com/file/d/1rjuHZNuZnuS_vXwqhRi4YmRX8HAbAIud/view?usp=drive_link

"সম্পূর্ণ জীবন দর্শন - সুখী জীবনের অজ্ঞাত সূত্র" অ্যামাজন লিংক https://www.amazon.in/Sampurna-Jeevan-Darshan-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A7%82%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A3-%E0%A6%A6%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%B6%E0%A6%A8/dp/B0BKWGG6TN
"সম্পূর্ণ জীবন দর্শন - সুখী জীবনের অজ্ঞাত সূত্র" ফ্রি পিডিএফ লিংক

***
ULM Bangla ইউটিউব চ্যানেল লিংক

***

মতামতে সকলে স্বাগত।
ভালো লাগলে লাইক, শেয়ার, কমেন্ট করতে ভুলবেন না।
যোগাযোগ- 9830925502

***

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

ব্যবস্থাগত অসম্পূর্ণতা নাকি নেতৃত্বের ব্যর্থতা?