সামাজিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আলোচনা কেন জরুরী?

অধিকাংশ মানুষ জানেই না কিভাবে আলোচনা করা উচিত এবং কেন করা উচিত। সেইজন্য অধিকাংশ মানুষের মধ্যে আলোচনা করার সময়ই দ্বন্দ্ব বেধে যায়। বাস্তবে আলোচনার প্রক্রিয়া কি তা আমাদের বোঝা উচিত। তবেই এর মহত্ত্ব এবং উপযোগিতাকে আমরা নিজেদের জীবনে কাজে লাগাতে পারব। বর্তমানে আমি মানুষকে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে দেখে এটিই বুঝেছি যে, বেশীরভাগ মানুষ ভেবে নিয়েছে আলোচনা হচ্ছে একটি ব্যর্থ প্রক্রিয়া, এতে শুধুমাত্র ঝগড়া-বিবাদ হয়। তারপরও আলোচনার প্রক্রিয়া ছাড়া কেউ চলতেও পারে না। কেননা এটি ছাড়া কোনো কর্ম হয় না। যদি চিন্তন-মনন বা আলোচনার সাহায্য না নেওয়া হয় তবে যতটুকু ছোটখাটো সিদ্ধান্ত আমরা নিয়ে থাকি সেটুকুও নিতে পারব না। চিন্তন-মননের জন্য জীবনও কিছুটা সহজ হয়। নাহলে অধিক নরক যন্ত্রণা ভুগতে হতো। আপনি নিউজ চ্যানেলে নিশ্চয়ই দেখেছেন যে আলোচনা করার সময় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দ্বন্দ্ব লেগে থাকে, তারা কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছে এমনটি দেখা যায় না। যদিও সেখানে সময়ও অনেক কম থাকে। ভুলটি মূলত কোথায় হচ্ছে তা আমাদের বুঝে নেওয়া উচিত। আমার বিবেচনা অনুযায়ী আলোচনার পূর্বে উদ্দেশ্যকে নিশ্চিত করে নেওয়া উচিত এবং নিয়মাবলী সঠিক করে নেওয়া উচিত। আলোচনার সময় সর্বদা মনে রাখা উচিত যে, আমরা নিয়ম ভঙ্গ করছি কিনা অথবা উদ্দেশ্য থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি কিনা... এমন অনেক বিষয় যা আমরা জানিই না।
প্রথমত,
যেমন— এই মানব জীবনের উদ্দেশ্য কী? জীবনের উদ্দেশ্যকে আমরা নির্দিষ্ট করে জানি? জানলেও অস্পষ্টভাবে জানি। যতক্ষণ আমরা আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য কি তা না জানব ততক্ষণ অবধি আমরা সঠিক গতিপথে ধাবিত হতে পারব না। যেমন— কেউ বলে থাকেন জীবনের উদ্দেশ্য মোক্ষলাভ করা। এমনকি মোক্ষলাভেরও আবার বিভিন্ন বিভাগ রয়েছে। কেউ বলেন নির্বাণ, কেউ বলেন পরমাত্মায় বিলীন হয়ে যাওয়া, কেউ বলেন ভক্তি করা, কেউ বলেন পূজা করা, কেউ বলেন নামাজ বা প্রার্থনা করা, কেউ বলেন এইসব বাজে কথা জীবনের কোনো উদ্দেশ্যই নেই ইত্যাদি। এবার ভাবুন যে সমাজে এত ভিন্ন-ভিন্ন উদ্দেশ্য ঘুরে বেড়াচ্ছে সেখানে মানুষ কীভাবে একটি নির্দিষ্ট সীমারেখায় চিন্তন-মনন করতে পারবে? প্রথমে তো জীবনের উদ্দেশ্য কি তা ঠিক করা উচিত। যেহেতু আমরা সকলেই মানুষ সেহেতু আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য ভিন্ন হয় কি করে! আমাদের মধ্যে পছন্দের ভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু সকলের অন্তিম ইচ্ছে ভিন্ন কি করে হবে! এ বিষয়ে আমি “সম্পূর্ণ জীবন দর্শনঃ সুখী জীবনের অজ্ঞাত সূত্র” পুস্তকে বিস্তারিত বর্ণনা করেছি।
উদ্দেশ্য থেকেই আমরা পরীক্ষা করতে পারি, আমরা যা করছি তা সঠিক কিনা অথবা আমাদের দিকনির্দেশ সঠিক রয়েছে কিনা। থাকলে কতটা সঠিক রয়েছে এবং কতটা ভুল রয়েছে। এইসব বিষয় আমরা উদ্দেশ্যের মাধ্যমেই নির্ধারণ করে নিতে পারি। এছাড়া অন্য কোনো মাপকাঠি নেই। এবার যদি উদ্দেশ্য কি তাই না বুঝি তবে তো মাপদন্ডও সঠিক হবে না এবং ফলাফলও সঠিক আসবে না। কোনো একটি সিদ্ধান্তকে যাচাই করবার জন্য জীবনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে মূল মাপকাঠি। উদ্দেশ্য থেকেই দিকদর্শন নির্ধারিত হয়।
আমি সকলের জীবনের অন্তিম উদ্দেশ্য যা রেখেছি তা হচ্ছে আমরা যেন আমাদের সম্পূর্ণ জীবন সর্বদা সুখী হয়ে কাটাতে পারি।
সুখের প্রাপ্তি হবে কীভাবে?
পছন্দের জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে, পছন্দের কর্ম সম্পাদনার মাধ্যমে, পছন্দের সুখসুবিধা উপভোগের মাধ্যমে। এজন্য দেশে প্রয়োজনীয় বস্তু-পরিষেবা উৎপাদনের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, কর্ম সম্পাদনার জন্য মানব রয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি রয়েছে। যা ব্যবহার করে স্বল্প সময় ও শ্রম ব্যয় করে অধিক উৎপাদন সম্ভব। অভাব রয়েছে একটি যথাযথ ম্যানেজমেন্ট বা সিস্টেমের, সম্মিলিত নাগরিক সিদ্ধান্তের। যা আলোচনার সাহায্য ব্যতীত সম্ভব নয়।
এতে যদি কারোর কোনো ভিন্নমত থাকে, যদিও তা থাকবেই, সেইজন্য আমি এই বিষয়ে আলোচনা করতে চাইব। যারা এই বিষয়ে আমার সাথে আলোচনা করতে চাইবেন তাদের জন্য সর্বদা আমার তরফ থেকে আমন্ত্রণ রইল।
দ্বিতীয়ত, যত মত তত পথ ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে হয়। সমাজ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে হাজারটা সিদ্ধান্ত হয় না। এতে মানব সম্পদ ও প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় হয়, হয়েছেও। একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হবার উদ্দেশ্যে গঠনমূলক আলোচনা জরুরী। সামাজিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে (অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষানীতি, কর্মসংস্থাননীতি, স্বাস্থ্যনীতি, শিল্পনীতি, বাণিজ্যনীতি, সামাজিক-সাংস্কৃতিক নীতি ইত্যাদি) ভিন্নতা থাকলে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বৈষম্য বা গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হবে এটিই স্বাভাবিক। সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থাকুক এতে কোনও সমস্যা নেই।
মতামত জানাতে পারেন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন