লেখক চেতন ভগতের "মেকিং ইন্ডিয়া অসাম" পুস্তকের বিষয়বস্তু কী?
এই রচনাটি চেতন ভগতের ‘মেকিং ইন্ডিয়া অসম’ বইটির একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি প্রদান করে, যেখানে লেখক ভারতকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তিনি ভারতের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো জটিল বিষয়গুলোকে সহজভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। ভগত মনে করেন, কেবল সরকার পরিবর্তন করলেই দেশের উন্নতি সম্ভব নয়, বরং সাধারণ মানুষের চিন্তাধারা ও নৈতিক মূল্যবোধের পরিবর্তন জরুরি। বইটিতে তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করার পাশাপাশি নারী অধিকার, সমকামীদের অধিকার এবং সংখ্যালঘু সমস্যার সমাধান খোঁজার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। লেখক পাঠকদের নিছক সমালোচনা না করে গঠনমূলক সমাধানের পথ খুঁজতে অনুপ্রাণিত করেছেন। পরিশেষে, এই সংকলনটি ভারতীয় সমাজকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করার একটি আহ্বান হিসেবে কাজ করে।
ভারতের উন্নতির জন্য লেখক কেন ৪টি মূল বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন?
লেখক চেতন ভগত ভারতকে কেবল ধনী নয়, বরং 'অসাধারণ' (awesome) করে তোলার লক্ষ্যে ৪টি মূল বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, কেবল একজন অসাধারণ নেতাকে ক্ষমতায় বসিয়েই দেশের ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব নয়; এর জন্য নাগরিকদের নিজেদের ওপর কাজ করা এবং দেশের চারটি প্রধান স্তম্ভকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
লেখক এই ৪টি বিষয়ের ওপর যে কারণে গুরুত্বারোপ করেছেন তা নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. উন্নত শাসনব্যবস্থা (Awesome Governance):
সরকার হলো দেশের 'কন্ট্রোল রুম', যেখান থেকে অর্থনীতি ও সমাজ পরিচালিত হয়। লেখক মনে করেন, আমাদের রাজনীতি, ভোটারদের চিন্তাধারা এবং নীতি নির্ধারণকে বিশ্বমানের না করলে দেশ কখনোই অসাধারণ হয়ে উঠতে পারবে না। কেবল রাজনীতিকদের পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়, শাসনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা আনা জরুরি। সরকার, রাজনীতি এবং নীতি নির্ধারণকে সঠিক পথে আনা। লেখক মনে করেন যে শাসনব্যবস্থা বিশ্বমানের না হলে দেশ কখনোই অসাধারণ হয়ে উঠতে পারবে না।
২. উন্নত সমাজ (Awesome Society):
একটি দেশ মূলত সেখানকার মানুষের সমষ্টি; তাই দেশ বদলাতে হলে মানুষের মানসিকতা ও অভ্যাস বদলানো প্রয়োজন। লেখক বিশ্বাস করেন যে, কেবল আইন বা শাসক সমাজকে ঠিক করতে পারে না, যদি না সমাজ নিজে তার মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি সংস্কার করতে উদ্যোগী হয়। সামাজিক মূল্যবোধ, সংস্কৃতি এবং অভ্যাসগুলোর সংস্কার করা। লেখক বিশ্বাস করেন যে নাগরিকদের নিজেদের দায়িত্ববোধ এবং মানসিকতা পরিবর্তন করা দেশের উন্নতির জন্য অপরিহার্য।
৩. উন্নত সাম্য (Awesome Equality):
লেখকের মতে, প্রকৃত শ্রদ্ধা বা 'কুলনেস' কেবল অর্থ বা সামরিক ক্ষমতা থেকে আসে না, বরং পরিচয় নির্বিশেষে সকলের প্রতি সমান ও ন্যায়সঙ্গত আচরণ থেকে আসে। নারী অধিকার, সংখ্যালঘু অধিকার এবং সমকামীদের অধিকার রক্ষা করা একটি দেশের উন্নত চরিত্রের পরিচয় দেয়। তাঁর মতে, কোনো দেশ প্রকৃত অর্থেই তখনই 'কুল' বা উন্নত হয়ে ওঠে যখন সেখানে পরিচয় নির্বিশেষে সকলের সাথে সমান ও ন্যায়সঙ্গত আচরণ করা হয়।
৪. উন্নত সম্পদ (Awesome Resources):
ভারতের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার যুবশক্তি। যদি এই বিশাল যুবসমাজের শক্তিকে সঠিক শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে কাজে লাগানো না যায় তবে তাদের হতাশা দেশের জন্য মারাত্মক বা 'বিষাক্ত' হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ ভারতের যুবশক্তিকে সঠিক উপায়ে ব্যবহার করা। তিনি মনে করেন যুবসমাজই দেশের প্রধান চালিকাশক্তি এবং তাদের সঠিক মূল্যবোধ ও সুযোগ প্রদান করলে দেশ দ্রুত উন্নতি করবে।
লেখক এই ৪টি বিষয়ের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন কারণ তিনি মনে করেন যে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন এবং সরকার পরিবর্তনের লড়াই কেবল প্রথম অংশ অর্থাৎ শাসনব্যবস্থার ওপর আংশিকভাবে কাজ করেছে। দেশের সার্বিক উন্নতির জন্য সাম্য প্রতিষ্ঠা, সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন এবং যুবসম্পদের সঠিক ব্যবহার এই তিনটি ক্ষেত্রেও সমানভাবে কাজ করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, ভারত তখনই 'অসাধারণ' তকমা পাবে যখন এই ৪টি বিষয়ের প্রতিটিতেই আমাদের অগ্রগতি সন্তোষজনক হবে।
উন্নত শাসনব্যবস্থার জন্য লেখকের ১৭টি নির্দেশ কী কী?
লেখক চেতন ভগত তাঁর বইতে উন্নত শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এবং বিজেপি-কে ভারতের প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে টিকিয়ে রাখতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্দেশ্যে ১৭টি নির্দেশ বা 'কমান্ডমেন্টস' প্রদান করেছেন। এই নির্দেশগুলি মূলত রাজনীতি ও অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের করণীয় বিষয়গুলি তুলে ধরে:
১. মাটির কাছাকাছি থাকা:
নিজেকে কেবল একজন বিশ্বনেতা বা স্টেটসম্যান হিসেবে তুলে না ধরে সাধারণ মানুষের কথা ভাবা। অনাবাসী ভারতীয়দের (NRI) কাছ থেকে অনুদান নিয়ে দলের তহবিলে স্বচ্ছতা আনা।
২. দিল্লি নির্বাচনের হার থেকে শিক্ষা নেওয়া:
মানুষের মনের কথা বোঝা এবং মোদী হাওয়ার ওপর অতি-নির্ভরশীল না হওয়া।
৩. লোকপাল বিল পাস করা:
সিবিআই (CBI) এবং সিভিআই-কে (CVC) শক্তিশালী করে দুর্নীতি দমনে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
৪. সংবাদমাধ্যম বা সহকর্মীদের ভয় না দেখানো:
দম্ভ পরিহার করে ভয়ের বদলে শ্রদ্ধার জায়গা তৈরি করা।
৫. দলের ভেতরের মেধাকে গুরুত্ব দেওয়া:
বিজেপি-কে কেবল একজন ব্যক্তির দল হিসেবে গড়ে না তুলে নতুন প্রতিভা ও মেধাকে ভয় না পেয়ে লালন করা।
৬. উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের মুখ বন্ধ করা:
উগ্রপন্থী ও পশ্চাৎপদ কথাবার্তাকে স্পষ্টভাবে অগ্রাহ্য করা এবং নারী অধিকার ও সংখ্যালঘু অধিকার বিষয়ে সহকর্মীদের শিক্ষিত করা।
৭. বক্তৃতায় অতি-আত্মবিশ্বাস বর্জন করা:
কেবল স্তাবকদের দিয়ে পরিবেষ্টিত না থেকে চারপাশ সমালোচকদের রাখা এবং জনসমক্ষে বলার আগে সবকিছু যাচাই করে নেওয়া।
৮. সাধারণ পোশাক পরিধান করা:
ব্যক্তিত্বকে দামী পোশাকের বদলে সততা, দক্ষতা এবং সহমর্মিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা।
৯. যুবসমাজের সাথে যুক্ত থাকা:
কেবল বিদেশ ভ্রমণ না করে দেশের কলেজগুলোতে গিয়ে যুবকদের সাথে সরাসরি কথা বলা এবং তাদের জন্য দৃশ্যমান কিছু করা।
১০. কৌশলের চেয়ে সংযোগকে গুরুত্ব দেওয়া:
কেবল চতুর রাজনৈতিক চাল চাললেই নির্বাচনে জেতা যায় না, মানুষের সাথে হৃদয়ের সম্পর্ক স্থাপন করা জরুরি।
১১. মানুষের ওপর কথা না বলে মানুষের সাথে কথা বলা:
একপাক্ষিক রেডিও বক্তৃতা (যেমন 'মন কি বাত') না দিয়ে সরাসরি প্রশ্ন নেওয়া এবং আলাপচারিতা করা।
১২. শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে জোর দেওয়া:
আরও কলেজ খোলা, পর্যটনের প্রসার ঘটানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে কর কমানো এবং প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নত করা।
১৩. শহুরে দরিদ্রদের জন্য আবাসন:
পানীয় জল, বিদ্যুৎ এবং উন্নত পরিবহণ ব্যবস্থা সহ স্বল্পমূল্যে আবাসন তৈরি করে দরিদ্রদের মর্যাদা দেওয়া।
১৪. মানবিক ভাবমূর্তি বজায় রাখা:
কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য রক্ষা করা (যেমন সিনেমা দেখা বা সাধারণ খাবার খাওয়া), যাতে মানুষকে আরও বেশি আপন মনে হয়।
১৫. মূর্তি নির্মাণ বন্ধ করা:
স্কুল বা হাসপাতালের বদলে অহেতুক মূর্তি নির্মাণে অর্থ ব্যয় না করা।
১৬. ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং ধনকুবেরদের সঙ্গ এড়িয়ে চলা:
বিরোধীদের ব্যক্তিগত আক্রমণ না করা এবং কেবল শিল্পপতিদের সাথে সময় না কাটিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে মেলামেশা করা।
১৭. জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করা:
পরিশেষে, দলের উচিত সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়াকে প্রধান্য দিয়ে কাজ করা।
লেখকের মতে, এই পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করলে শাসনব্যবস্থা বিশ্বমানের হয়ে উঠবে এবং ভারত 'অসাধারণ' হয়ে ওঠার পথে এগিয়ে যাবে।
লেখক চেতন ভগত বিশ্বাস করেন যে, কেবল একজন অসাধারণ নেতাকে ক্ষমতায় বসিয়ে ভারতের ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব নয়; বরং এর জন্য সাধারণ নাগরিকদের নিজেদের চিন্তাধারা এবং মানসিকতায় আমূল পরিবর্তন আনা অপরিহার্য। তাঁর মতে, সমাজ যদি নিজে থেকে বদলাতে না চায়, তবে কোনো আইন বা শাসকের পক্ষে দেশকে উন্নত করা সম্ভব নয়।
সাধারণ ভারতীয়দের চিন্তাধারায় পরিবর্তন আনা কেন জরুরি, সে সম্পর্কে লেখকের প্রধান যুক্তিগুলি নিচে দেওয়া হলো:
- নিজেদের ওপর দায়িত্ব নেওয়া:
- লেখক লক্ষ্য করেছেন যে, ভারতীয়রা প্রায়ই দেশের সমস্যার জন্য কেবল রাজনীতিবিদ বা কর্তৃপক্ষকে দোষ দেয়, কিন্তু নিজেদের দায়িত্ব স্বীকার করে না। তাঁর মতে, কোনো সমস্যার সমাধান খুঁজতে হলে 'অন্যের দোষ' খোঁজার বদলে আমাদের নিজেদের অভ্যাস এবং আচরণের দিকে তাকাতে হবে।
- দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রকৃত ঘৃণা:
- আমরা দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগ করি, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে ছোটখাটো নিয়ম ভঙ্গ করা বা সুবিধা নেওয়ার সুযোগ খুঁজি। লেখক মনে করেন, যতক্ষণ না আমাদের সমাজ সততাকে একটি প্রধান সামাজিক মূল্যবোধ হিসেবে গ্রহণ করছে এবং প্রতিটি অসৎ কাজকে ঘৃণা করতে শিখছে, ততক্ষণ কেবল আইন দিয়ে দুর্নীতি দূর করা যাবে না।
- সংকীর্ণ কুসংস্কার ত্যাগ করা:
- ভারতীয় ভোটারদের মনে জাতি, ধর্ম বা সম্প্রদায় নিয়ে গভীর কুসংস্কার রয়েছে, যা রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে জেতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। লেখক জোর দিয়ে বলেছেন যে, আমরা যদি পরিচয়ের রাজনীতি ভুলে যোগ্যতার ভিত্তিতে ভোট দিতে না শিখি, তবে দেশ কখনোই সঠিক নেতৃত্ব পাবে না।
- নেতাদের 'রাজা' ভাবা বন্ধ করা:
- ভারতীয়রা এখনো নেতাদের 'রাজা' বা 'শাসক' মনে করে এবং তাদের প্রতি অতি-অনুগত থাকে। লেখকের মতে, এই মানসিকতা বদলানো জরুরি; আমাদের বুঝতে হবে যে নেতারা হলেন জনগণের দ্বারা নিযুক্ত 'পরিষেবা প্রদানকারী' (service providers), যারা জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ।
- সামাজিক মূল্যবোধের সংস্কার:
- ভারতকে 'অসাধারণ' করে তোলার জন্য কেবল অর্থনৈতিক উন্নতি যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন নারী অধিকার, সংখ্যালঘু অধিকার এবং বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার প্রতি শ্রদ্ধা রাখা।
পরিশেষে, লেখক মনে করেন যে "পরিষ্কার মানসিকতা" (swachh manasikta) ছাড়া একটি উন্নত ভারত গড়ে তোলা সম্ভব নয়। নাগরিকদের চিন্তাধারায় এই পরিবর্তনই ভারতকে প্রকৃত অর্থে বিশ্বের দরবারে 'অসাধারণ' করে তুলবে।
লেখক চেতন ভগত ভারতকে 'অসাধারণ' করে তোলার জন্য যুবশক্তিকে দেশের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, ভারতের প্রায় ৫০ কোটির বেশি তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন ও শক্তিকে যদি সঠিক পথে পরিচালিত করা যায়, তবে দেশ দ্রুত উন্নতি করবে।
যুবশক্তির সঠিক ব্যবহারের বিষয়ে লেখকের পরিকল্পনা ও প্রধান পরামর্শগুলি নিচে দেওয়া হলো:
- শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন: লেখক লক্ষ্য করেছেন যে গ্রামীণ ভারতের অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী প্রাথমিক পর্যায়ের ন্যূনতম দক্ষতা (যেমন পড়তে পারা বা সাধারণ অংক করা) অর্জন করতে পারছে না। তাঁর পরিকল্পনা হলো প্রযুক্তির ব্যবহার করে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের ভার্চুয়াল ক্লাস নেওয়া, রিপোর্টিং সিস্টেম উন্নত করা এবং কেবল মুখস্থ বিদ্যার বদলে প্রকৃত শিখনের ওপর জোর দেওয়া।
- কর্মসংস্থান সৃষ্টি: যুবশক্তির শক্তি যদি সঠিক সুযোগ না পায়, তবে তা হতাশায় পর্যবসিত হয়ে দেশের জন্য ক্ষতিকর বা 'বিষাক্ত' (toxic) হয়ে উঠতে পারে। তাই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে লেখক অর্থনীতিতে বার্ষিক ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন, পর্যটন শিল্পের প্রসার এবং উচ্চ-কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতগুলোতে কর কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন।
- উচ্চশিক্ষায় ভর্তির নিয়মে সংস্কার: দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের (DU) মতো নামী প্রতিষ্ঠানগুলোতে কেবল উচ্চ 'কাট-অফ' নম্বর বা মার্কসের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী বাছাই না করে তাদের ব্যক্তিত্ব, সৃজনশীলতা, এবং যোগাযোগ দক্ষতাকেও গুরুত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। এছাড়া নামী কলেজের আসন সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও তাঁর রয়েছে।
- যুবকদের রাজনৈতিক সচেতনতা: লেখক যুবসমাজকে কেবল অভিযোগ না করে একটি শক্তিশালী 'ভোট ব্যাংক' হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন যাতে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হয়।
- সরকারের সাথে সরাসরি সংযোগ: প্রধানমন্ত্রী ও নেতাদের উচিত কেবল বিদেশ ভ্রমণ বা রেডিওতে একপাক্ষিক বক্তৃতা (যেমন 'মন কি বাত') না দিয়ে সরাসরি কলেজগুলোতে গিয়ে তরুণদের সাথে কথা বলা এবং তাদের জন্য দৃশ্যমান কাজ করা।
লেখকের মতে, যুবশক্তি হলো একটি 'পচনশীল সম্পদ' (perishable resource); একে যদি সঠিক সময়ে কাজে লাগানো না যায়, তবে দেশ এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে।
শিক্ষা সংস্কারে লেখকের প্রধান প্রস্তাবগুলো কী কী?
লেখক চেতন ভগত ভারতের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুবশক্তির সঠিক ব্যবহারের প্রধান মাধ্যম হিসেবে দেখছেন এবং এর আমূল সংস্কারের জন্য বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও বৈপ্লবিক প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর প্রধান প্রস্তাবগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. প্রাথমিক শিক্ষার সংস্কার (Primary Education Reform):
লেখক লক্ষ্য করেছেন যে গ্রামীণ ভারতের অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী প্রাথমিক পর্যায়ের ন্যূনতম দক্ষতা (যেমন পড়তে পারা বা সাধারণ অংক করা) অর্জন করতে পারছে না। এই সমস্যা সমাধানে তাঁর প্রস্তাবগুলি হলো:
- প্রযুক্তির ব্যবহার: ভালো শিক্ষকের অভাব মেটাতে প্রযুক্তির মাধ্যমে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের দ্বারা 'ভার্চুয়াল ক্লাস' নেওয়া এবং কম দক্ষ শিক্ষকদের দিয়ে সরাসরি ক্লাসের সমন্বয় ঘটানো।
- রিপোর্টিং সিস্টেম: কেবল শিক্ষার্থীর উপস্থিতি গণনা না করে, প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দক্ষতা বৃদ্ধির খতিয়ান ট্র্যাক করা।
- শ্রেণি-ভিত্তিক পদ্ধতির পরিবর্তন: কেবল এক শ্রেণি থেকে অন্য শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করে দেওয়া বন্ধ করে প্রকৃত শিখনের ওপর ভিত্তি করে 'হার্ডল মার্কার' বা বাধা চিহ্ন তৈরি করা। অর্থাৎ, মৌলিক দক্ষতা অর্জন না করা পর্যন্ত উচ্চতর শ্রেণিতে উত্তীর্ণ না করা।
- মুখস্থ বিদ্যা বর্জন: মুখস্থ করার (rote learning) প্রাচীন পদ্ধতির বদলে পাঠ্যক্রমে বোধগম্যতা এবং যুক্তিনির্ভর শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া।
২. উচ্চশিক্ষায় ভর্তির নিয়মে সংস্কার (Higher Education Admission):
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় (DU)-এর মতো নামী প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তির ক্ষেত্রে কেবল উচ্চ 'কাট-অফ' নম্বর বা মার্কসের ওপর নির্ভর করার কঠোর সমালোচনা করেছেন লেখক। তাঁর প্রস্তাবগুলি হলো:
- সর্বাঙ্গীণ মূল্যায়ন: কেবল নম্বরের ভিত্তিতে নয়, বরং শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজের ক্ষমতা এবং নেতৃত্বের গুণের ভিত্তিতে ভর্তি করা উচিত।
- মার্কিন মডেল অনুসরণ: নামী মার্কিন কলেজগুলোর মতো একাডেমিক রেকর্ডের পাশাপাশি রচনা (essays), সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম এবং সুপারিশের (recommendations) ওপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা।
- আসন সংখ্যা বৃদ্ধি: শিক্ষার্থীর সংখ্যা বহুগুণ বাড়লেও নামী কলেজের সংখ্যা বাড়েনি। তাই দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ ঘটিয়ে নতুন ক্যাম্পাস (যেমন DU-II, DU-III) খোলার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
৩. বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও উদ্যোক্তা তৈরি (Vocational Education &
Entrepreneurship):
- যুবকদের কেবল চাকরির প্রত্যাশা না করে ব্যবসার কৌশল শেখার এবং উদ্যোক্তা (Entrepreneurship) হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন লেখক।
- প্রত্যন্ত অঞ্চলে দক্ষতা এবং কর্মসংস্থান পৌঁছে দেওয়ার জন্য আরও কলেজ খোলার এবং প্রাথমিক শিক্ষা মজবুত করার ওপর তিনি জোর দিয়েছেন।
৪. ভাষা সংস্কার (Language Reform):
- হিন্দি ভাষাকে আধুনিক বিশ্বের এবং ইন্টারনেটের উপযোগী করে তুলতে তিনি 'রোমান হিন্দি' (রোমান হরফে হিন্দি লেখা, যেমন: 'Aap kaise hain?') গ্রহণের একটি বৈপ্লবিক প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর মতে এটি ইংরেজি এবং হিন্দিভাষীদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করবে এবং ভাষাকে আরও জনপ্রিয় করে তুলবে।
লেখকের মতে, এই সংস্কারগুলো কার্যকর করা না হলে ভারতের বিশাল যুবশক্তি দেশের জন্য একটি 'টাইম বোমা' বা 'বিষাক্ত সম্পদে' (toxic resource) পরিণত হতে পারে।
বেকারত্ব দূর করতে লেখক কোন অর্থনৈতিক পদক্ষেপের কথা বলেছেন?
লেখক চেতন ভগত বেকারত্ব দূর করতে এবং যুবসমাজের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন:
- ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন: লেখকের মতে, ভারতের মতো জনবহুল দেশে বেকারত্ব সমস্যার সমাধানের জন্য প্রতি বছর অন্তত ১০ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা অপরিহার্য। প্রবৃদ্ধি এর চেয়ে কম হলে দেশের বিশাল যুববাহিনীর জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হবে না।
- কর ছাড় ও নীতিগত সহায়তা: লেখক পরামর্শ দিয়েছেন যে, যেসব খাতে প্রচুর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় (high-employment sectors), সেই খাতগুলোতে করের হার কমানো উচিত। এছাড়া যেসব কোম্পানি বড় শহর ছেড়ে ছোট শহরগুলোতে তাদের সদর দপ্তর সরিয়ে নেবে, তাদের জন্য বিশেষ কর ছাড়ের (tax breaks) ব্যবস্থা করার কথা তিনি বলেছেন।
- বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা: বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সরকারের 'নিয়ন্ত্রণকারী মানসিকতা' (control freak mindset) দূর করার ওপর লেখক জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, ব্যবসার নিয়মগুলো সহজ, স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক মানের হওয়া উচিত যাতে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বোধ করেন এবং দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।
- পর্যটন শিল্পের প্রসার: লেখক পর্যটনকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির একটি বড় মাধ্যম হিসেবে মনে করেন। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এলাকাগুলোতে পর্যটনের বিকাশের মাধ্যমে স্থানীয় যুবকদের জন্য অনেক কাজের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
- উদ্যোক্তা তৈরিতে উৎসাহ প্রদান: কেবল চাকরির পেছনে না ছুটে যুবকদের উদ্যোক্তা (Entrepreneurship) হওয়ার এবং নিজস্ব ব্যবসা শুরু করার পরামর্শ দিয়েছেন লেখক। তিনি মনে করেন, সবার জন্য সরকারি বা কর্পোরেট চাকরি নিশ্চিত করা কঠিন, তাই যুবকদের ব্যবসার কৌশল শেখা ও স্বাবলম্বী হওয়া জরুরি।
- প্রাথমিক শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধি: লেখক মনে করেন, বেকারত্ব দূর করতে হলে গোড়া থেকে কাজ করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নত করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কাজের প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং বোধগম্যতা তৈরি করতে হবে, যাতে তারা ভবিষ্যতে শ্রমবাজারে যোগ্য হয়ে ওঠে।
পরিশেষে লেখক জোর দিয়ে বলেছেন যে, একটি স্থিতিশীল ও কর্মমুখী সরকার এবং ব্যবসা-বান্ধব অর্থনৈতিক চিন্তাধারাই পারে ভারতের যুবশক্তির হতাশাকে সাফল্যে রূপান্তর করতে।
ভারতের উন্নতির রূপরেখা: একটি 'অসাধারণ' দেশ গড়ার মহাপরিকল্পনা
চেতন ভগতের ‘Making India Awesome’ গ্রন্থের মূল দর্শনের আলোকে ভারতের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের এই মহাপরিকল্পনাটি প্রণয়ন করা হয়েছে। একজন জননীতি বিশেষজ্ঞ হিসেবে ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা এবং জনমানসের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা এখানে বিশ্লেষণ করা হলো।
১. ভূমিকা: 'অসাধারণ' (Awesome) ভারতের সংজ্ঞা ও লক্ষ্য
ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ও জনমত চরম নৈরাশ্যে নিমজ্জিত। এই প্রেক্ষাপটে ‘Awesome’ বা ‘অসাধারণ’ ভারত গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হলে আমাদের প্রথমে শব্দগুলোর আভিধানিক ও ভাবার্থ অনুধাবন করতে হবে:
- Making (ক্রিয়া): কোনো কিছু অস্তিত্বে আনা বা উৎপাদন করা; কোনো বিষয়কে এক অবস্থা বা বিভাগ থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তরিত করা (To convert from one state to another)।
- India (বিশেষ্য): দক্ষিণ এশিয়ার সার্বভৌম রাষ্ট্র; আয়তনে বিশ্বের সপ্তম এবং ১.২ বিলিয়নেরও বেশি জনসংখ্যা বিশিষ্ট বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র।
- Awesome (বিশেষণ): যা বিস্ময় বা ভক্তি জাগায়; ইন্টারনেট প্রজন্মের কাছে যা অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং শ্রদ্ধার উদ্রেককারী।
ভারতের বর্তমান অস্থিরতা এবং তরুণ প্রজন্মের রাজনীতিবিমুখতার মূল কারণ হলো জাতীয় সমস্যার সমাধানের চেয়ে রাজনৈতিক কোলাহল ও কাদা ছোড়াছুড়ির আধিক্য। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত ভারতকে কেবল একটি দেশ হিসেবে নয়, বরং একটি ‘কুল’ বা আকর্ষণীয় ও শ্রদ্ধাশীল রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠা করা।
২. ভারতীয় তরুণ প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ (৮০:২০ নিয়ম)
দেশের জনমিতিক লভ্যাংশকে (Demographic Dividend) কাজে লাগাতে হলে তরুণদের চিন্তাধারার বিশ্লেষণ জরুরি। লেখকের বর্ণিত ৮০:২০ নিয়মের ভিত্তিতে ভারতীয় যুবসমাজকে তিনটি শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা যায়:
|
শ্রেণির নাম |
বৈশিষ্ট্য ও কার্যপদ্ধতি |
শতাংশ |
|
উদাসীন ভারতীয় (Self-focused Indifferent) |
এরা রাজনীতি বা সুশাসন নিয়ে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত। এদের জগত কেবল নিজস্ব ক্যারিয়ার, চাকরি এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। |
৮০% |
|
পক্ষপাতদুষ্ট সচেতন (Caring but Aligned) |
এরা দেশের কথা ভাবলেও নির্দিষ্ট কোনো দল বা ব্যক্তিত্বের অন্ধ ভক্ত। যুক্তিহীনভাবে দলের পক্ষ নেয় এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর ভার্চুয়াল মব (Virtual Mob) হিসেবে চড়াও হয়। এরা সমস্যার অংশ, সমাধান নয়। |
১৬% |
|
নিরপেক্ষ সচেতন (Caring Objective) |
এরা কোনো দলের অনুসারী নয়, বরং ইস্যুভিত্তিক বিচার করে। এদের কাছে ব্যক্তির চেয়ে দেশ এবং যুক্তিনির্ভর সমাধান বড়। |
৪% |
বিশ্লেষণ: এই ৪ শতাংশ ‘সচেতন নিরপেক্ষ’ ভারতীয়রাই দেশের প্রকৃত আশার আলো। তারা সংখ্যায় বৃদ্ধি পেলে এবং ইস্যুভিত্তিক সমর্থন প্রদান করলে রাজনীতিবিদরা জনকল্যাণে বাধ্য হবেন।
৩. প্রথম স্তম্ভ: উন্নত শাসনব্যবস্থা (Awesome Governance)
শাসনব্যবস্থার উন্নয়ন কেবল নীতি পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন।
- মানসিক প্রতিবন্ধকতা: ‘The Kings in Our Minds’ নিবন্ধের আলোকে দেখা যায়, ভারতীয়রা এখনো নেতাদের ‘শাসক’ মনে করে। অথচ গণতন্ত্রে জনপ্রতিনিধিরা হলেন ‘সেবা প্রদানকারী’ (Service Providers), ঠিক যেমন একজন ভাড়ায় চালিত বাস চালক। চালক বাসটি চালালেও তিনি বাসের মালিক নন—দেশও কোনো নেতার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।
- ভোটারদের কুসংস্কার ও রাজনীতির খেলা: রাজনীতিবিদরা প্রায়ই ভোটারদের ‘বই’ (দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন) না দিয়ে ‘টফি’ (তাত্ক্ষণিক উপঢৌকন বা পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি) দিয়ে প্রলুব্ধ করেন। যতক্ষণ ভোটাররা মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে জাত-পাত বা ধর্মের ভিত্তিতে ভোট দেবেন, ততক্ষণ এই রাজনৈতিক সার্কাস চলতেই থাকবে।
শাসনব্যবস্থা সংস্কারে ৫টি প্রধান আদেশ (Commandments): ১. স্বচ্ছ দলীয় তহবিল: এনআরআই (NRI) অনুদানের মাধ্যমে দলীয় তহবিলে ‘ক্লিন মানি’ নিশ্চিত করা এবং অর্থায়নের পদ্ধতি স্বচ্ছ করা। ২. পদ্ধতিগত দুর্নীতি দমন: লোকপাল বিল পাস করা এবং CBI ও CVC-কে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা। ৩. জবাবদিহিতামূলক নেতৃত্ব: ‘মন কি বাত’-এর মতো একপাক্ষিক আলোচনার চেয়ে জনগণের কঠিন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা (উত্তর কোরিয়ার মতো একপাক্ষিক প্রচারণা বর্জনীয়)। ৪. শিক্ষা ও কর্মসংস্থান: উচ্চ কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে কর হ্রাস এবং মফস্বল এলাকায় শিল্প স্থানান্তরে বিশেষ প্রণোদনা। ৫. জনমুখী জীবনাচরণ: নেতাদের জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক বা ‘ভিআইপি কালচার’ বর্জন করে সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করা (যেমন: মাঝে মাঝে মুভি দেখতে যাওয়া বা সাধারণ খাবারের দোকানে খাওয়া)।
৪. দ্বিতীয় স্তম্ভ: উন্নত সমাজ (Awesome Society)
সমাজ নিজে থেকে শুদ্ধ না হলে কোনো আইন দিয়ে দুর্নীতিমুক্ত ভারত গড়া সম্ভব নয়। মন্দির বা উপাসনালয়ে জুতো পরে না ঢোকার যে আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ আমাদের মধ্যে স্বতস্ফূর্তভাবে কাজ করে, সেই একই নীতিবোধ দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রয়োগ করতে হবে।
সামাজিক ব্যাধি বনাম প্রতিকারের রূপরেখা:
|
সামাজিক ব্যাধি ও মন্দ অভ্যাস |
সংস্কারমূলক পদক্ষেপ ও সমাধান |
|
গৃহকর্মীদের প্রতি বৈষম্য: ন্যূনতম মজুরি বা ছুটির অভাব এবং মানবিক অবমাননা। |
ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করা এবং শ্রমের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন। |
|
একাডেমিক জালিয়াতি: পরীক্ষায় নকল করাকে অপরাধ মনে না করা। |
ব্যক্তিগত সততাকে সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। |
|
দুর্নীতিতে কমপ্লিসিটি: ট্রাফিক জরিমানা এড়াতে ঘুষ দেওয়া বা টিকিটের জন্য তদ্বির করা। |
অনৈতিক সুবিধাকে মন্দিরে জুতো নিয়ে ঢোকার মতোই ‘অশুদ্ধ’ বা ‘পাপ’ হিসেবে গণ্য করা। |
৫. তৃতীয় স্তম্ভ: উন্নত সাম্য (Awesome Equality)
সাম্য ছাড়া কোনো দেশ ‘অসাধারণ’ হতে পারে না। এর জন্য আমাদের অভ্যন্তরীণ গোঁড়ামি দূর করা জরুরি।
- বৈবাহিক কুসংস্কার (The Marriage Test): ভারতীয়দের প্রকৃত আধুনিকতার পরীক্ষা হয় তাদের সন্তানদের বিয়ের সময়। যদি কেউ ভিন্ন জাত বা ধর্মে বিয়ে দিতে অসম্মত হয়, তবে বুঝতে হবে সে এখনো কুসংস্কারচ্ছন্ন, মুখে সে যত বড় জাতীয়তাবাদীই হোক না কেন।
- ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও ধারা ৩৭৭: সমকামিতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা একটি ‘সামষ্টিক পাপ’। আধুনিক রাষ্ট্রে ব্যক্তিগত পছন্দের অধিকার থাকা অপরিহার্য।
- অবদমিত শ্রেণির প্রতিশোধ (Revenge of the Oppressed): অনেক ক্ষেত্রে শোষিত শ্রেণি দুর্নীতিকে সমর্থন করে কারণ তারা মনে করে এতে লুণ্ঠিত সম্পদের অংশ তাদের হাতেও আসবে। এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য উচ্চবর্ণের হিন্দুদের গোঁড়ামি ত্যাগ করতে হবে এবং অবদমিত শ্রেণিকে আত্ম-ক্ষমতায়নের দিকে নজর দিতে হবে।
৬. চতুর্থ স্তম্ভ: উন্নত সম্পদ (Awesome Resources)
ভারতের প্রধান সম্পদ খনিজ বা ভূমি নয়, বরং এর বিশাল তরুণ প্রজন্ম। তবে এই সম্পদের বর্তমান অবস্থা আশঙ্কাজনক। অর্ধেকের বেশি স্কুলছাত্র সাধারণ বাক্য পাঠ করতে পারে না, যা আমাদের ‘অর্ধ-শিক্ষিত’ করে তুলছে।
উন্নয়নের রূপরেখা:
- পর্যটন বিপ্লব: পর্যটন খাতকে উন্মুক্ত করে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
- শিক্ষার মানোন্নয়ন: কেবল ডিগ্রির পেছনে না ছুটে দক্ষতা ভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া এবং স্কোর কম পাওয়া ছাত্রদের জন্য বিকল্প ক্যারিয়ারের সুযোগ তৈরি করা।
- বিকেন্দ্রীকরণ: বড় শহরগুলোর ওপর চাপ কমাতে ছোট শহরগুলোতে কর ছাড় দিয়ে কর্পোরেট সদর দপ্তর বা শিল্প কারখানা সরিয়ে নেওয়া।
৭. উপসংহার: 'অসাধারণ' পাঠক ও নাগরিকের দায়িত্ব
ভারতের সমস্যাগুলো কেবল নেতার পরিবর্তনে মিটবে না; এর জন্য প্রয়োজন মানসিকতা ও সামাজিক অভ্যাসের আমূল পরিবর্তন। একজন ‘Caring Objective Indian’ হিসেবে আপনার দায়িত্ব হলো কেবল অভিযোগ না করে প্রতিটি সমস্যার যৌক্তিক সমাধান খোঁজা।
নাগরিকদের প্রতি আহ্বান: কোনো রাজনৈতিক দলের অন্ধ মোহে আবিষ্ট না হয়ে ইস্যুভিত্তিক বিচার করুন। পরিবর্তনের জন্য কোনো ‘মেসিয়া’ বা ত্রাণকর্তার অপেক্ষা না করে নিজের নৈতিকতা ও সচেতনতা দিয়ে সমাজকে পথ দেখান। আপনি যখন সমাধানের অংশ হবেন, তখনই ভারত প্রকৃত অর্থে ‘অসাধারণ’ হয়ে উঠবে।
পরিশেষে, সমাধানের উদ্দেশ্যে কোন কোন ক্ষেত্রে কি করা উচিত এ বিষয়ে মৌলিক পয়েন্টগুলোর উল্লেখ রয়েছে। বইটি প্রকাশিত হয়েছে ১০ বছর পেরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নের নিরিখে কোথায় অসঙ্গতি রয়েছে এ বিষয়ে সমীক্ষা জরুরী।
মতামতে স্বাগত।
"Making India Awesome" পুস্তকটি অ্যামাজন ছাড়াও অনলাইন মাধ্যমে পিডিএফ কপি বিনামূল্যে উপলব্ধ রয়েছে।
যোগাযোগ- 9830925502
ফেসবুকঃ https://www.facebook.com/madhabranjan.sarkar/
ইউটিউবঃ https://www.youtube.com/@ulmbangla

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন