সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের কারণ
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের কারণ নিয়ে বহু আলোচনা ও পুস্তক রচনা হয়ে গেলেও জানিনা চলমান সময়ে সেই আলোচনার পুনরাবৃত্তি ও পুস্তকগুলো নিয়ে কতখানি পঠন-পাঠন-আলোচনা-সমীক্ষা চলছে। পূর্বে চীন নিয়ে একাধিক আলোচনা রেখেছি। সেসব ভিডিও ও আর্টিকেল ফেসবুকে, ইউটিউবে ও ব্লগ সাইটে উপলব্ধ। এরপর কিউবার দুর্দশা নিয়ে লিখব। ব্যক্তি নয় তত্ত্বের সমালোচনা-সমীক্ষা চলমান থাকা উচিত। নানা তত্ত্বের অনুসন্ধান ও সংশোধন অগ্রগতিরই অংশ। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের কারণগুলো এখানে সংক্ষেপে রইল। এ বিষয়ে মতামতে-সংযোজনে সকলে স্বাগত। উদ্দেশ্য হচ্ছে অনুসন্ধান, সংশোধন ও সময়ের নিরিখে সঠিক পদ্ধতির সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। যেন একই ত্রুটির পুনরাবৃত্তি না হয়। যেন উন্নত বিকল্প গৃহীত হয়। প্রসঙ্গত বলে রাখি, ULM যে বিকল্প ব্যবস্থার প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছে তা বর্তমান পুঁজিতন্ত্র থেকে যেমন পৃথক তেমনই মার্কসীয় ব্যবস্থা থেকেও পৃথক। এক কথায় বললে পূর্বের সকল ব্যবস্থা থেকে পৃথক। মানব সভ্যতাকে কখনোই পশ্চাত-বিমুখ হওয়া উচিত নয়। সভ্যতাকে সর্বদা অগ্রগতির অভিমুখেই ধাবিত হওয়া উচিত। মানুষ বাস্তবে অগ্রগতিকেই গ্রহণ করে। এই অগ্রগতি শুধুমাত্র বৈষয়িক দিকে হয় না মনস্তত্ত্বের দিক দিয়েও হয়। ULM প্রদত্ত ব্যবস্থা আধুনিক সময়ের নিরিখে বাস্তবিক মানবীয় মনস্তত্ত্বকে বুঝে প্রস্তুত করা হয়েছে। এ নিয়ে তুলনামূলক পর্যালোচনায়-সমীক্ষায় সর্বদা সকলে স্বাগত।
এবার এই রচনার মূল বিষয়ে ফিরে আসি।
সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপ্লব এবং তার পরবর্তী গৃহযুদ্ধে (১৯১৭–১৯২২) মোট ক্ষয়ক্ষতি ও নিহতের সংখ্যা কত আপনারা অনুসন্ধান করতে পারেন। আমি এখানে সংক্ষেপে ব্যক্ত করলাম। সেই সময়ের নিরিখে চলমান সভ্যতা এখন ১০০-১৫০ এগিয়ে রয়েছে। এই সময়েও একই বিপ্লবের পুনরাবৃত্তি হলে ক্ষয়ক্ষতি এবং মৃত্যুর হার কোথায় যাবে আপনারা অনুমান করে জানাবেন। উন্নত বিকল্প এলে তা গ্রহণ করা উচিত না অনুচিত একথাও জানাবেন।
বিপ্লব ও রেড টেরর (Red Terror):
১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লব এবং পরবর্তীতে বলশেভিকদের বিরোধী দমন অভিযানের সময় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ মারা যায়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক অনুমান অনুযায়ী, বলশেভিকদের দ্বারা পরিচালিত রেড টেরর অভিযানে প্রায় ৫০,০০০ থেকে ১.৩ মিলিয়ন (১৩ লাখ) মানুষ মারা গিয়েছিল।
গৃহযুদ্ধ ও অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি:
১৯১৭ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত চলা গৃহযুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহতের পাশাপাশি রোগবালাই ও দুর্ভিক্ষের কারণে নিহতের সংখ্যা বিশাল। কিছু গবেষণা মতে, বলশেভিকরা ১৯১৭ থেকে ১৯২২ সালের মধ্যে প্রায় ২০ লাখ (২ মিলিয়ন) মানুষকে হত্যা করেছে।
সুদূরপ্রসারী হিসাব:
কেউ কেউ ১৯১৭ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত পুরো সোভিয়েত শাসনামলের শাসনতান্ত্রিক হত্যাকাণ্ডের (democide) হিসাব করেন। সেই হিসেবে নিহতের সংখ্যা ২৮ মিলিয়ন থেকে ১২৬ মিলিয়ন (প্রায় ৩ কোটি থেকে ১৩ কোটি) পর্যন্ত হতে পারে বলে অনুমান করা হয়, যার মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মধ্যম হিসাবটি হলো প্রায় ৬২ মিলিয়ন (৬.২ কোটি)।
স্ট্যালিন আমল:
বিপ্লব-পরবর্তী জোসেফ স্ট্যালিনের শাসনকালেও (১৯৩৬–১৯৩৮) 'গ্রেট পার্জ' বা শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে প্রায় ৭ থেকে ১২ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।
সোভিয়েতের ভাঙন দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক সমস্যার পুঞ্জীভূত ফলাফল। পতনের প্রধান কারণগুলো সংক্ষেপে নিচে আলোচনা করা হলো:
গর্বাচেভের সংস্কার (পেরেস্ত্রোইকা ও গ্লাসনোস্ত):
মিখাইল গর্বাচেভ সোভিয়েত ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে পেরেস্ত্রোইকা (অর্থনৈতিক পুনর্গঠন) এবং গ্লাসনোস্ত (রাজনৈতিক উন্মুক্ততা) নীতি চালু করেন। কিন্তু এই সংস্কারগুলো হিতে বিপরীত হয় এবং দীর্ঘদিনের চেপে রাখা জনঅসন্তোষকে উসকে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত কমিউনিস্ট শাসনের ভিত্তি দুর্বল করে ফেলে।
অর্থনৈতিক স্থবিরতা:
১৯৭০ ও ৮০-র দশকে সোভিয়েত অর্থনীতি চরম মন্দার কবলে পড়ে। কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাভিত্তিক অর্থনীতির অদক্ষতা, নিত্যপণ্যের তীব্র সংকট এবং প্রযুক্তিগতভাবে পশ্চাৎপদতা জনগণের মধ্যে প্রচণ্ড হতাশা তৈরি করে।
জাতীয়তাবাদের উত্থান:
সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ১৫টি প্রজাতন্ত্রের মধ্যে তীব্র জাতিগত জাতীয়তাবাদ দেখা দেয়। এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া এবং পরবর্তীতে ইউক্রেন ও জর্জিয়ার মতো রাষ্ট্রগুলো স্বাধীনতা দাবি করতে শুরু করলে ইউনিয়নের ঐক্য বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও সামরিক ব্যয়:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শীতল যুদ্ধের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন তার বাজেটের বিশাল একটি অংশ প্রতিরক্ষা ও পারমাণবিক অস্ত্র খাতে ব্যয় করত। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও অবকাঠামো তৈরির জন্য পর্যাপ্ত অর্থ অবশিষ্ট থাকত না।
আফগান যুদ্ধ ও চেরনোবিল বিপর্যয়:
আফগানিস্তানে দীর্ঘমেয়াদী ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে পরাজয় সোভিয়েত সেনাবাহিনীর মনোবল ও মর্যাদা ধূলিসাৎ করে দেয়। এছাড়া ১৯৮৬ সালের চেরনোবিল পারমাণবিক বিপর্যয় সোভিয়েত শাসনব্যবস্থার অদক্ষতা ও অস্বচ্ছতাকে বিশ্বের সামনে উন্মোচিত করে দেয়।
একদলীয় একনায়কতন্ত্র ও দুর্নীতি:
কমিউনিস্ট পার্টির একচ্ছত্র ক্ষমতা এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে শিকড় গেড়ে বসা দুর্নীতি সাধারণ মানুষকে সরকারের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছিল।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে মোট ১৫টি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী দেশগুলো হলো:
বাল্টিক রাষ্ট্রসমূহ:
লিথুয়ানিয়া
লাটভিয়া
এস্তোনিয়া
মধ্য এশীয় রাষ্ট্রসমূহ:
কাজাখস্তান
উজবেকিস্তান
তুর্কমেনিস্তান
কিরগিজস্তান
তাজিকিস্তান
ককেশাস অঞ্চল:
জর্জিয়া
আর্মেনিয়া
আজারবাইজান
***





মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন