আমেরিকার চাঁদের প্রতি এত আগ্রহ কেন?

 

টেকনিক্যাল এবং ভূ-রাজনৈতিক— উভয় দিক থেকেই আমেরিকার চাঁদের প্রতি আগ্রহের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
১. মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠাতে চাইলে চাঁদ হলো সেরা প্র্যাকটিস গ্রাউন্ড। চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি গেড়ে সেখান থেকে অন্য গ্রহে যাওয়ার প্রযুক্তি ও জ্বালানি তৈরি করা অনেক সহজ ও সাশ্রয়ী হবে। চাঁদই হয়ে উঠবে ভবিষ্যৎ অভিযানের 'বেস ক্যাম্প'।
২. চাঁদে 'হিলিয়াম-৩' (Helium-3) নামক একটি বিরল গ্যাস আছে, যা ভবিষ্যতে পৃথিবীতে ক্লিন এনার্জি বা পারমাণবিক শক্তির উৎস হতে পারে। এছাড়া সোনা, প্ল্যাটিনাম এবং দুর্লভ খনিজ (Rare Earth Metals) পাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। মূল্যবান খনিজ ও জ্বালানি দখলের প্রতিযোগিতা কারোর অজানা নয়।
৩. চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে জমাটবদ্ধ বরফ বা জলের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই জল থেকে রকেটের জ্বালানি (হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন) তৈরি করা সম্ভব, যা মহাকাশ ভ্রমণকে অনেক সহজ করে দেবে।
৪. বর্তমানে চীন এবং অন্যান্য দেশও চাঁদে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামছে। মহাকাশে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে এবং নতুন আন্তর্জাতিক নিয়ম (যেমন: আর্টেমিস অ্যাকর্ডস) তৈরিতে আমেরিকা সবার আগে থাকতে চায়। যাকে আমরা মহাকাশ আধিপত্য (Space Politics) বলতে পারি।
৫. নাসা বর্তমানে ‘আর্টেমিস’ (Artemis) প্রোগ্রামের মাধ্যমে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে (যেমন: SpaceX, Blue Origin) যুক্ত করছে। এর ফলে মহাকাশ পর্যটন এবং নতুন একটি 'লুনার ইকোনমি' বা চন্দ্র-অর্থনীতি তৈরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও আর্থিক মুনাফা দুই বিষয় জুড়ে থাকবেই।
এক কথায় চাঁদ এখন কেবল গবেষণার বিষয় নয়, বরং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দুও বটে।
আরেকটি প্রশ্ন ঘোরে যে অ্যাপোলো ১৭ এর পর আর কোনো মিশন হয়নি কেন?
অ্যাপোলো ১৭-এর পর আর কোনো মিশন না হওয়ার প্রধান কারণ ছিল বাজেট সংকট এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক অগ্রাধিকার। মূলত নিচের কয়েকটি কারণে নাসা চন্দ্র অভিযান বন্ধ করে দেয়:
* বিশাল খরচ:
অ্যাপোলো প্রোগ্রামের পেছনে আমেরিকার প্রায় ২৫.৮ বিলিয়ন ডলার (বর্তমানে যা প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের সমান) ব্যয় হয়েছিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধের ব্যয় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে সরকার নাসার বাজেটে বড় ধরনের কাটছাঁট করতে বাধ্য হয়।
* রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণ:
অ্যাপোলো মিশনের মূল লক্ষ্য ছিল কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধের সময় রাশিয়ার আগে চাঁদে পৌঁছানো। নীল আর্মস্ট্রংয়ের অবতরণের মাধ্যমেই আমেরিকা সেই লক্ষ্য অর্জন করে ফেলে, ফলে পরবর্তী মিশনগুলোর রাজনৈতিক গুরুত্ব কমে যায়।
* জনসাধারণের অনাগ্রহ:
অ্যাপোলো ১১-এর পর সাধারণ মানুষের মধ্যে চাঁদে যাওয়ার উত্তেজনা কমে আসছিল। ১৯৭০ সালের দিকে অনেক আমেরিকান মনে করতে শুরু করেন যে, মহাকাশে এত টাকা খরচ করার চেয়ে পৃথিবীর সমস্যা সমাধানে সেই টাকা ব্যয় করা বেশি জরুরি।
* ঝুঁকি ও নিরাপত্তা:
অ্যাপোলো ১৩-এর যান্ত্রিক ত্রুটি এবং নভোচারীদের জীবন সংকটের ঘটনা নাসার কর্মকর্তাদের দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে বারবার এমন ঝুঁকিপূর্ণ মিশন চালানোর চেয়ে তারা নতুন প্রযুক্তি ও স্পেস শাটল (Space Shuttle) প্রোগ্রামে মনোনিবেশ করাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
উল্লেখ্য যে, নাসা আসলে অ্যাপোলো ২০ পর্যন্ত মিশনের পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু অর্থ সংকটের কারণে ১৮, ১৯ এবং ২০ নম্বর মিশনগুলো বাতিল করা হয়।
তবে বর্তমানে চলমান আর্টেমিস (Artemis) মিশন দ্বারা মানুষকে আবার চাঁদে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে আমেরিকা। ইতিমধ্যে দুটি মিশন সফল হয়েছে।
প্রসঙ্গত বহু মানুষ মনে করেন নাসার চন্দ্রাভিজান সত্য নয়। এ বিষয়ে আরও জানতে গেলে নিজ আগ্রহে নাসার অ্যাপোলোর সবগুলো মিশনের প্রস্তুতি, ব্যাকগ্রাউন্ড, অন্যান্য দেশের প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি গোড়া থেকে জানতে হবে। নাসার (NASA) অ্যাপোলো প্রোগ্রামটি ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম সাহসী এবং সফল মহাকাশ অভিযান। ১৯৬৭ সালের অ্যাপোলোর প্রথম মিশনটিই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। তারপরও মিশন জারি থেকেছে। অর্থাৎ চাঁদে পা ফেলা রাতারাতি হয়নি। অ্যাপোলো কর্মসূচির অধীনে নাসা মূলত মোট ২০টি মিশন পরিচালনার পরিকল্পনা করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত অ্যাপোলো ১৭ ছিল এই কর্মসূচির শেষ মিশন। এরমধ্যে অ্যাপোলো ১১ থেকে ১৭ পর্যন্ত মোট ৬ বার মানুষ চাঁদে অবতরণ করেছে।
অ্যাপোলো ১১ মিশনের সাফল্যের পর মহাকাশ আধিপত্য প্রতিযোগিতা ও স্নায়ুযুদ্ধের শত্রু সোভিয়েত ইউনিয়নের তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান (Presidium of the Supreme Soviet-এর চেয়ারম্যান) নিকোলাই পোদগোর্নি পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে একটি অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছিলেন।
তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকার চাঁদে অবতরণের স্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছিল এবং তারা কখনো একে অস্বীকার করেনি। মহাকাশ প্রতিযোগিতায় একে অপরের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া সত্ত্বেও সোভিয়েতরা অ্যাপোলো মিশনগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করেছিল। এর প্রধান কারণগুলো নিচে রইলঃ
* রেডিও ট্র্যাকিং:
সোভিয়েত ইউনিয়নের নিজস্ব গভীর মহাকাশ ট্র্যাকিং নেটওয়ার্ক ছিল। তারা অ্যাপোলো মহাকাশযানগুলো থেকে আসা রেডিও সংকেত এবং টেলিভিশন ট্রান্সমিশন স্বাধীনভাবে ট্র্যাক করেছিল। তারা নিশ্চিত ছিল যে সংকেতগুলো চন্দ্র কক্ষপথ এবং চাঁদের পৃষ্ঠ থেকেই আসছিল।
* চন্দ্র শিলা বিনিময়:
সোভিয়েত ইউনিয়নের নিজস্ব চালকবিহীন যান 'লুনা ১৬' চাঁদ থেকে মাটির নমুনা নিয়ে এসেছিল। পরবর্তীতে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন একে অপরের সাথে সংগৃহীত চাঁদের মাটির নমুনা বিনিময় করে এবং গবেষণাগারে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয় যে উভয় নমুনা একই ধরনের উপাদানে তৈরি।
* সরকারি অভিনন্দন:
অ্যাপোলো ১১ মিশনের সফলতার পর সোভিয়েত নেতারা প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে অভিনন্দন বার্তা পাঠান এবং সোভিয়েত গণমাধ্যম ও টেলিভিশনে এই খবর প্রচার করা হয়। তৎকালীন সোভিয়েত মহাকাশচারীরাও (যেমন কন্সতান্তিন ফিওক্তিস্তভ) মার্কিন নভোচারীদের এই অর্জনকে বিজ্ঞান ও গবেষণার এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
* লেজার রিফ্লেক্টর:
অ্যাপোলো ১১, ১৪ এবং ১৫ মিশনের মাধ্যমে চাঁদে বিশেষ আয়না (Retroreflectors) বসানো হয়েছিল। পৃথিবী থেকে লেজার পাঠিয়ে সেই আয়না থেকে প্রতিফলন পাওয়ার মাধ্যমে যে কেউ চাঁদে মানুষের অবস্থানের প্রমাণ পেতে পারে, যা সোভিয়েত বিজ্ঞানীদের কাছেও স্পষ্ট ছিল।
সোভিয়েত ইউনিয়ন কেন এই মিশনকে 'মিথ্যা' দাবি করেনি— এই প্রশ্নের সবচেয়ে সহজ উত্তর হলো, তারা জানত যে এটি সত্যি। যদি আমেরিকার এই দাবি মিথ্যে হতো, তবে কোল্ড ওয়ারের সেই উত্তপ্ত সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নই সবার আগে তা বিশ্বের সামনে ফাঁস করে দিত।
চীন ও জাপান কি আমেরিকার আমেরিকার চাঁদে অবতরণের প্রমাণ পেয়েছে?
চীন ও জাপান উভয় দেশই তাদের নিজস্ব চন্দ্রাভিযানের মাধ্যমে আমেরিকার চাঁদে অবতরণের স্বাধীন প্রমাণ পেয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে তারা চাঁদের কক্ষপথ থেকে অ্যাপোলো মিশনের ফেলে আসা সরঞ্জামগুলোর ছবি তুলেছে এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে এর সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
এর বিস্তারিত প্রমাণগুলো হলো:
* জাপানের প্রমাণ (SELENE/Kaguya):
২০০৮ সালে জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা JAXA-এর পাঠানো 'সেলেন' (SELENE) বা 'কাগুয়া' মহাকাশযানটি অ্যাপোলো ১৫-এর অবতরণ স্থলের ত্রিমাত্রিক ছবি তোলে। তাদের ক্যামেরায় অ্যাপোলোর ল্যান্ডার ইঞ্জিনের নির্গত ধোঁয়ার ফলে চাঁদের মাটিতে তৈরি হওয়া সাদাটে বলয় বা 'হ্যালো' (halo) স্পষ্ট দেখা গিয়েছিল। জাপানের তোলা ভূ-প্রকৃতির এই ছবিগুলো অ্যাপোলোর নভোচারীদের তোলা ছবির সাথে হুবহু মিলে যায়।
* চীনের প্রমাণ (Chang'e Missions):
২০১০ সালে চীনের 'ছাংএ-২' (Chang'e 2) মহাকাশযানটি চাঁদের অত্যন্ত উচ্চ রেজোলিউশনের ছবি তুলেছিল। চীনা বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন যে, তাদের ক্যামেরায় অ্যাপোলো ল্যান্ডারের চিহ্ন ধরা পড়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালে চীনের একটি সরকারি সংস্থা অ্যাপোলো মিশনকে 'ভুয়া' দাবি করা কিছু অনলাইন গুজবকেও খণ্ডন করেছে।
* ভারতের প্রমাণ (Chandrayaan-2):
চীন ও জাপানের পাশাপাশি ভারতের 'চন্দ্রযান-২' ২০২১ সালে অ্যাপোলো ১১ ও ১২-এর ল্যান্ডারের অত্যন্ত স্পষ্ট ছবি পাঠিয়েছে। এই ছবিতে এমনকি অ্যাপোলো ১২-এর নভোচারীদের চাঁদের মাটিতে হাঁটার পায়ের ছাপ এবং রোভারের চাকার দাগও স্পষ্ট দেখা গেছে।
* লেজার রিফ্লেক্টর:
আমেরিকা চাঁদে যে বিশেষ আয়নাগুলো রেখে এসেছিল, চীন ও জাপানের বিজ্ঞানীরা পৃথিবী থেকে সেখানে লেজার পাঠিয়ে প্রতিফলন গ্রহণ করার মাধ্যমে আজও পৃথিবীর সাথে চাঁদের দূরত্ব মাপছেন, যা সেখানে সরঞ্জাম থাকার একটি জীবন্ত প্রমাণ।
সহজ কথায়, আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরেও ভারত, চীন ও জাপানের মতো দেশগুলো স্বাধীনভাবে পরীক্ষা চালিয়ে নিশ্চিত হয়েছে যে আমেরিকার চন্দ্রাভিযানগুলো সত্যি ছিল।
অনেকে নানা ষড়যন্ত্রমূলত তত্ত্ব নিয়ে মেতে রয়েছেন। তাদের উদ্দেশ্যে বলব "চিল কান নিয়ে গিয়েছে" শুনে চিলের পেছনে না ছুটে পূর্বের নানা দেশের খবরের কাগজ থেকে শুরু করে পুস্তক, নানা বিজ্ঞানীদের লেখনী সহ বহু ভিডিও ব্যাখ্যা রয়েছে। বাকি সব নিজস্ব আগ্রহ। তারপরও বলব সকলকে মহাকাশ চর্চা করতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

***
#আমেরিকার_চাঁদের_প্রতি_এত_আগ্রহ_কেন?

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

ব্যবস্থাগত অসম্পূর্ণতা নাকি নেতৃত্বের ব্যর্থতা?