রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সংঘর্ষের কারণ কী?


ভোট এলেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সংঘর্ষের সামাজিক দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরে। এর পেছনে গভীর এবং জটিল কারণ তো আছেই। কারণ ছাড়া কিছু ঘটে না। আধুনিক সময়ে রাজনৈতিক ব্যবস্থার এই গভীর ক্ষতটিকে কোনোভাবেই যে সুরাহা করা যাচ্ছে না এ বড় বেদনার। কেন সুরাহা করা যাচ্ছে না? এর পেছনে কারণগুলো কী?
রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই এমনভাবে তাদের মতাদর্শ প্রচার করে যে, কর্মীরা মনে করে তাদের দলের জয় মানেই 'দেশ বা ধর্মের জয়', আর পরাজয় মানেই 'সব ধ্বংস হয়ে যাওয়া'। এই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের অনুভূতি তাদের হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে দেয়। এটিকে আবেগের তীব্রতা ও মগজধোলাই বলা যায়।
কোনো রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে প্রতিপক্ষকে রাজনীতিতে জায়গা দিতে চায় না, তখন ক্ষমতার এই ভারসাম্যহীনতা প্রতিহিংসার জন্ম দেয়।
যখন বিচার বিভাগ বা পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন বিরোধীরা মনে করে তারা ন্যাবিচার পাবে না। এই ক্ষোভ থেকে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এক্ষেত্রে শাসক দল যেমন বিচার বিভাগ বা পুলিশি ব্যবস্থার অপব্যবহার করে থাকে, তেমনই বিরোধী পক্ষও আইনের অপব্যবহার করতে পিছুপা হয় না।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শগত লড়াইয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত রেষারেষি বা 'ব্যক্তিবিদ্বেষ' যখন প্রবল হয়, তখন গঠনমূলক আলোচনা কিংবা শিক্ষা-জীবিকা-সুখসুবিধা-সুরক্ষার সামগ্রিক প্ল্যানিং কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এই সামাজিক আলোচনা কিংবা সম্মিলিত সহযোগিতার পরিবর্তে একে অপরকে ধ্বংস করার মানসিকতা তৈরি হয়। যা বিদ্বেষমূলক রাজনীতির জন্ম দেয়।
একটি গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অভাব রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করে। যখন ক্ষমতার পরিবর্তন শান্তিপূর্ণভাবে (ব্যালট বক্সের মাধ্যমে) হওয়া কঠিন মনে হয়, তখন রাজপথে সংঘর্ষ বাড়ে। ভোটদানেও বাধা তৈরি হয়। এটিকে নির্বাচনী ব্যবস্থার সংকট বলা যায়।
অনেক সময় সম্পদ দখল বা ব্যবসায়িক আধিপত্য বজায় রাখার জন্যও রাজনৈতিক সংঘর্ষ হয়। টেন্ডারবাজি বা স্থানীয় প্রভাব ধরে রাখতে কর্মীরা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে দুর্নীতির আশ্রয় নিতে হয়। যেহেতু সরকার বা সিস্টেম সকলের আর্থিক ও রাজনৈতিক সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে সেক্ষেত্রে দলের কর্মীরা মনে করে সরকার কিছু করবে না সংঘর্ষ করে নিজ রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে সুখসুবিধা নেওয়া ছাড়া বিকল্প উপায় নেই। সে পথ সুনীতির তো হবে না দুর্নীতিরই হবে। কারণ অতীতের সকল দলীয় সরকার সার্বিক-মৌলিক সুরক্ষা প্রদানে ব্যর্থ হয়েছে। স্বাভাবিক সুযোগ ও বিকাশের পথ সমস্ত বিভাগে সীমিত ও রুদ্ধ থাকার কারণে রাজনৈতিক ব্যবস্থার মতন সমস্ত বিভাগে একই অবস্থা বিদ্যমান। এই সত্যটিও বলে রাখা উচিত যে, চলমান ব্যবস্থায় যে দলীয় সরকারই ক্ষমতায় আসীন হোন না কেন কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ১৯ থেকে ২০ এর অধিক হবে না। রাষ্ট্র সামাজিক স্বার্থ সুরক্ষিত না করলে ব্যক্তিবর্গ ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্বার্থ চরিতার্থ করবে এটিই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে নেতিবাচক কৌশল, দুর্নীতি, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সংঘর্ষ, হত্যা ছাড়া বিকল্প উপায় কী আছে জানাবেন।
অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো সহিংসতার বিচার না হওয়া বা অপরাধীদের রাজনৈতিক প্রশ্রয় পাওয়া প্রতিহিংসার চক্রকে জিইয়ে রাখে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির বদল কীভাবে কোন ব্যবস্থায় সম্ভব হবে?
সমাজ যখন আদর্শ বা ধর্মের ভিত্তিতে চরমভাবে বিভক্ত হয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষও একে অপরের প্রতি অসহনশীল হয়ে ওঠে, যা রাজনৈতিক উস্কানিতে আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। সামাজিক ও আদর্শিক মেরুকরণ যেন সমাজের রন্ধ্রে স্থায়ী আবাস গড়ে নিয়েছে।
যদি কোনো পরিবারের বা পরিচিত কেউ আগে রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়ে থাকে, তবে সেই ক্ষোভ থেকে মানুষ পরবর্তী সময়ে 'প্রতিশোধ' নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। তখন আইন বা নিজের জীবনের চেয়ে প্রতিশোধ বড় হয়ে দাঁড়ায়।
সমাজের অবহেলিত বা সাধারণ মানুষ যখন একটি শক্তিশালী দলের সাথে যুক্ত হয়, তখন সে এক ধরনের কৃত্রিম 'ক্ষমতা' অনুভব করে। অথচ এই পরিচয় এবং দল থেকে পাওয়া সম্মান ও নিরাপত্তা ধরে রাখতে তারা যেকোনো চরম সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করে না। রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের স্বাভাবিক মেধা, জীবিকা ও আত্মপরিচয়ের স্বতন্ত্রতা বিকাশে ব্যর্থ হয়েছে বলেই মানুষ পরিচয় সংকট ও ক্ষমতার মোহ অনুভব করে।
অনেক ক্ষেত্রে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা জীবনধারণের জন্য স্থানীয় নেতাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। নেতার নির্দেশ পালন করা তাদের জন্য অনেকটা 'জীবিকা' বা ভবিষ্যতের সুযোগ-সুবিধার পথ হয়ে দাঁড়ায়. অর্থনৈতিক পরনির্ভরতা মূল সমস্যা।
ভিড়ের মধ্যে মানুষ ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা ভুলে যায়। যখন শত শত মানুষ একসাথে কোনো উগ্র কাজে লিপ্ত হয়, তখন একা একজন মানুষও সেই উত্তোজনায় নিজেকে হারিয়ে ফেলে এবং ভয়াবহ কিছু ঘটিয়ে ফেলে।
পরিশেষে, বর্তমান ব্যবস্থা পরমতসহিষ্ণুতা নিবারণের উদ্দেশ্যে এমন কোনও নিদর্শন তৈরি করতে পারেনি। যে কারণে সরকারি উদ্যোগের বাইরে ব্যক্তিগত, সংস্থাগত কিংবা সমবায় প্রচেষ্টাগুলোও সাফল্যের পথ দেখেনি।
উপায়?
আর্থিক নীতি, রাজনীতি, সমাজিক-সাংস্কৃতিক নীতি, শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান নীতি, এমনকি বস্তুগত জীবন দর্শনের আমূল রূপান্তর জরুরী।
মূল উদ্যোগ হচ্ছে বিকল্প আর্থিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। যেখানে শতভাগ নাগরিক উন্নত ও সুরক্ষিত জীবনের ব্যবস্থাপনা পাবে। কাউকে পরনির্ভর হতে হবে না। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকবে না। রাষ্ট্রে প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন রয়েছে তেমনই কর্ম সম্পাদনের জন্য মানব সম্পদ রয়েছে। পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তি রয়েছে যার দ্বারা স্বল্প সময় এবং শ্রম ব্যয় করে অধিক উৎপাদন সম্ভব। অভাব রয়েছে যথাযথ ব্যবস্থার। চলমান সরকারও এই উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। এ দায়িত্ব শুধুমাত্র নির্দিষ্ট দল কিংবা ব্যক্তির নয়, সামগ্রিক জন-উদ্যোগ জরুরী। উদ্যোগ যদি ব্যক্তিগত স্বার্থ থেকে প্রারম্ভ করে সামগ্রিক কল্যাণের নিরিখে হয় তবে কোনও দল বা ব্যক্তির অসহযোগিতার সমস্যা উৎপন্ন হবে না। এক্ষেত্রে পূর্বের পথগুলোর আমূল সংশোধন কিংবা নতুন পথের কথা বলছি। এই বিষয় দীর্ঘ। এই পোস্টটি বিকল্প উদ্যোগ নিয়ে নয়। আমাদের পুস্তকে, ভিডিওতে ও অন্যান্য আর্টিকেলে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। এ বিষয়ে কেউ মতামত ও প্রশ্ন রাখলে উত্তর প্রদানে সুবিধা পাবো।
লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে লাইক কমেন্ট শেয়ার করতে ভুলবেন না।

***

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

ব্যবস্থাগত অসম্পূর্ণতা নাকি নেতৃত্বের ব্যর্থতা?