শিক্ষা ও কর্মসংস্থান
শিক্ষা ও কর্মসংস্থান
শিক্ষা ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানাও
ইউনিভার্সাল লাইফ ম্যানেজমেন্ট (ULM) বা ‘সম্পূর্ণ সমাধান’ ব্যবস্থায় শিক্ষা ও কর্মসংস্থান একে অপরের পরিপূরক এবং একটি সামগ্রিক সামাজিক শৃঙ্খলার অংশ। এই ব্যবস্থায় প্রতিটি নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা এবং পছন্দসই সম্মানজনক জীবিকা সুনিশ্চিত করা হয়েছে [১৪১, ১২৬]। নিচে এর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:
শিক্ষা ব্যবস্থা
নতুন শিক্ষা মডেলটি শিক্ষার্থীদের উপর থেকে সকল প্রকার মানসিক চাপ ও বোঝা দূর করে তাদের স্বাভাবিক বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেয়।
১. বিনামূল্যে ও পরীক্ষাহীন শিক্ষা:
সকল শিক্ষার্থীর জন্য মনোরম পরিবেশে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ এবং গবেষণার ব্যবস্থা থাকবে। এই ব্যবস্থায় কোনো পরীক্ষা বা নম্বরের চাপ থাকবে না এবং কোনো শিক্ষার্থীকে অনুত্তীর্ণ (Fail) করানো হবে না।
২. শিক্ষার স্তর ও বয়সসীমা:
- সাধারণ শিক্ষা (৬ থেকে ২০ বছর): শিশু জন্মের পর ষষ্ঠ বছরে বিদ্যালয়ে নিবন্ধিত হবে। পরবর্তী ১৫ বছর (২০ বছর বয়স পর্যন্ত) তাকে সাধারণ পাঠ্যক্রমে চারটি বিষয় পড়ানো হবে— ভাষা, গণিত, সংজ্ঞান (Logic) এবং দর্শন।
- পেশাগত প্রশিক্ষণ বা মহাবিদ্যালয় (২০ থেকে ২৫ বছর): ২০ বছর বয়স পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষার পর শিক্ষার্থীর পছন্দ ও রুচি অনুযায়ী পরবর্তী ৫ বছর তাকে জীবিকার বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
- গবেষণা বা বিশ্ববিদ্যালয়: জীবিকাভিত্তিক প্রশিক্ষণের পর যোগ্য শিক্ষার্থীরা তাঁদের পছন্দমতো গবেষণা ও অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে পারবেন, যা একই সাথে তাঁদের কর্মসংস্থান হিসেবে গণ্য হবে।
৩. ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী শিক্ষা:
সাধারণ শিক্ষা অর্জনের পর মানুষের মধ্যে চার প্রকার ব্যক্তিত্বের (শারীরিক, মানসিক, ভাবনাত্মক ও চেতনাত্মক) উদ্ভব হয় এবং সেই অনুযায়ী কৃষি, উৎপাদনশিল্প, প্রশাসন ও নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
কর্মসংস্থান ব্যবস্থা
এই ব্যবস্থায় কর্মসংস্থান কোনো ব্যক্তিগত লড়াই নয়, বরং এটি প্রত্যেকের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সুনিশ্চিত একটি অধিকার।
১. বাধ্যতামূলক কর্মের বয়স ও সময়:
কেবল ২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী সুস্থ নারী ও পুরুষদের একটি জীবিকা সম্পাদন করা বাধ্যতামূলক। ৫০ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণ, ২৫ বছরের নিচে শিশু-কিশোর এবং অসুস্থ বা প্রতিবন্ধীদের জন্য কোনো কাজ ছাড়াই সমাজের সমস্ত আধুনিক সুবিধা ভোগ করার অধিকার থাকবে।
২. কর্মঘণ্টা ও সাপ্তাহিক ছুটি:
নাগরিকদের পর্যাপ্ত অবসর ও বিশ্রামের সুযোগ দিতে প্রতিদিন মাত্র ৫ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে মাত্র ৫ দিন কাজের বিধান রাখা হয়েছে।
৩. পছন্দ ও আগ্রহের প্রাধান্য:
প্রত্যেক নাগরিককে তাঁর রুচি ও পছন্দের (Interest) ভিত্তিতে জীবিকা প্রদান করা হবে। কাজকে এখানে ‘বোঝা’ নয়, বরং একটি সৃজনশীল সুখের উৎস হিসেবে দেখা হয়।
৪. মুদ্রাহীন ব্যবস্থা ও কর্মের মূল্য:
এই ব্যবস্থায় শ্রমের বিনিময়ে কোনো বেতন দেওয়া হবে না এবং কোনো পণ্যের মূল্য থাকবে না। প্রতিটি পেশার (যেমন— বিজ্ঞানী ও সাফাইকর্মী) সামাজিক মান ও মর্যাদা সমান থাকবে এবং সবাই সমানভাবে সমাজের সকল সুযোগ-সুবিধা ব্যবহারের অধিকারী হবেন।
৫. জীবিকা পরিবর্তনের স্বাধীনতা:
নাগরিকরা যোগ্যতা অনুযায়ী যেকোনো সময় জীবিকা পরিবর্তন বা স্থানান্তরিত হওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা পাবেন। উচ্চতর পদে যাওয়ার জন্য কেবল প্রয়োজনীয় দক্ষতা পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে।
৬. অনলাইন প্রোফাইল ও ব্যবস্থাপনা:
প্রতিটি নাগরিকের একটি ডিজিটাল প্রোফাইল থাকবে যেখানে তাঁদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও পছন্দ-অপছন্দের বিবরণ থাকবে। এই পোর্টালেই সরকার চাহিদা ও মানবসম্পদের হিসেব রেখে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের সমন্বয় করবে।
সংক্ষেপে, এই ব্যবস্থায় শিক্ষা শিক্ষার্থীকে একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে গড়ে তোলে এবং কর্মসংস্থান প্রতিটি মানুষকে তাঁর সৃজনশীল মেধা প্রকাশের সুযোগ দিয়ে একটি অভাবমুক্ত ও সুখী জীবন নিশ্চিত করে।
পঁচিশ বছর বয়সের
পর শিক্ষা
ও প্রশিক্ষণের সুযোগ কেমন
হবে?
ইউনিভার্সাল
লাইফ ম্যানেজমেন্ট
(ULM) প্রস্তাবিত
ব্যবস্থায় ২৫
বছর বয়স
পর্যন্ত সাধারণ
ও পেশাগত
শিক্ষা সম্পন্ন
হলেও, এর
পরেও নাগরিকদের
জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অবারিত সুযোগ
থাকবে। পঁচিশ
বছর বয়সের
পর এই
প্রক্রিয়াটি যেভাবে
কাজ করবে
তার মূল
দিকগুলো নিচে
দেওয়া হলো:
১.
জীবিকা পরিবর্তন ও পুনঃপ্রশিক্ষণ:
যদি
কোনো নাগরিক
তাঁর বর্তমান
জীবিকা পরিবর্তন
করতে চান
বা নতুন
কোনো ক্ষেত্রে
দক্ষতা অর্জন
করতে চান,
তবে ব্যবস্থা
তাঁকে সব
ধরণের সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণ
প্রদান করবে।
২.
যোগ্যতা যাচাই ও সুযোগ:
২৫
বছর বয়সের
পরও যে
কেউ তাঁর
পছন্দমতো নতুন
কোনো বিষয়
শিখতে বা
দক্ষতা অর্জন
করতে পারবেন।
তবে নতুন
কোনো উচ্চপদস্থ
জীবিকায় প্রবেশের
ক্ষেত্রে তাঁকে
সংশ্লিষ্ট পদের
জন্য প্রয়োজনীয়
যোগ্যতা ও দক্ষতা পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে।
৩.
বিনামূল্যে শিক্ষা ও গবেষণা:
সকল
নাগরিকের জন্য
আজীবন বিনামূল্যে শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ এবং গবেষণার ব্যবস্থা
থাকবে। ব্যবস্থার
মূল লক্ষ্য
হলো মানুষকে
তাঁর রুচি
ও পছন্দ
অনুযায়ী শিক্ষা
অর্জনের সুযোগ
দেওয়া, যাতে
তিনি সৃজনশীল
সুখ অনুভব
করতে পারেন।
৪.
অবসর সময়ে জ্ঞানচর্চা:
সপ্তাহে
মাত্র ২৫
ঘণ্টা কাজের
বিধান থাকায়
নাগরিকদের হাতে
প্রচুর অতিরিক্ত
সময় থাকবে।
এই অবসর
সময়ে তাঁরা
লাইব্রেরি, মিউজিয়াম
বা অনলাইন
পোর্টালের মাধ্যমে
নিরন্তর পড়াশোনা ও জ্ঞানার্জন
চালিয়ে যেতে
পারবেন।
৫.
আগ্রহভিত্তিক শিক্ষা:
এই
ব্যবস্থায় শিক্ষার
ওপর কোনো
বয়সসীমা বা
বাধ্যবাধকতা আরোপ
করা হয়
না। ২৫
বছরের বেশি
বয়সের যে
কেউ যদি
মনে করেন
তিনি কোনো
বিশেষ কারিগরি
কাজ বা
তাত্ত্বিক বিষয়
শিখতে চান,
তবে সরকার
সংশ্লিষ্ট বিভাগে
তাঁর জন্য
প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা
করবে।
সংক্ষেপে,
এই ব্যবস্থায়
শিক্ষা কেবল
জীবিকা অর্জনের
মাধ্যম নয়,
বরং এটি
একটি আজীবন সৃজনশীল প্রক্রিয়া,
যেখানে নাগরিকরা
যেকোনো বয়সে
তাঁদের মেধা
ও দক্ষতার
বিকাশ ঘটাতে
পারেন।
পছন্দসই জীবিকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কি কোনো বিধিনিষেধ থাকবে?
ইউনিভার্সাল লাইফ ম্যানেজমেন্ট (ULM) প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় পছন্দসই জীবিকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো জবরদস্তি বা নেতিবাচক বিধিনিষেধ নেই, তবে জীবিকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি ও নিয়ম রয়েছে। পছন্দসই জীবিকা নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি কীভাবে কাজ করবে তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. পছন্দ ও আগ্রহের প্রাধান্য:
এই ব্যবস্থায় প্রত্যেক নাগরিককে তাঁর রুচি, আগ্রহ এবং পছন্দের (Interest) ভিত্তিতে জীবিকা নির্বাচনের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। কাজকে এখানে ‘বোঝা’ হিসেবে না দেখে একটি ‘সৃজনশীল সুখের উৎস’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা নির্মাণকারী ও ব্যবহারকারী উভয়কেই আনন্দ দেয়।
২. যোগ্যতা ও দক্ষতার মাপকাঠি:
পছন্দসই জীবিকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রধান শর্ত বা বিধিনিষেধ হলো— ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট পদের জন্য যোগ্য (Qualified)
ও দক্ষ হতে হবে। অর্থাৎ, একজন নাগরিক যে পেশাই বেছে নিতে চান না কেন, তাঁকে সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।
৩. নির্দিষ্ট বয়সসীমা:
জীবিকা সম্পাদন কেবল ২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী সুস্থ নারী ও পুরুষদের জন্য বাধ্যতামূলক। ২৫ বছরের নিচে (শিশু ও শিক্ষার্থী) এবং ৫০ বছরের বেশি (প্রবীণ) ব্যক্তিদের জন্য কোনো কাজ ছাড়াই সমাজের সমস্ত আধুনিক সুবিধা ভোগ করার অধিকার থাকবে।
৪. বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা:
নাগরিকদের তাঁদের পছন্দের জীবিকার জন্য যোগ্য করে তুলতে ব্যবস্থা নিজেই বিনামূল্যে শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ ও গবেষণার অবারিত সুযোগ দেবে। ২০ বছর বয়স পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষার পর ৫ বছর পছন্দের জীবিকার ওপর বিশেষ কারিগরি বা পেশাগত প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যার মাধ্যমে তাঁর কর্মসংস্থান সুনিশ্চিত হবে।
৫. জীবিকা পরিবর্তনের স্বাধীনতা:
কোনো নাগরিক যদি তাঁর বর্তমান জীবিকা পরিবর্তন করতে চান বা অন্য পেশায় স্থানান্তরিত হতে চান, তবে তিনি তা করতে পারবেন। এক্ষেত্রেও মাপকাঠি হবে ওই নতুন পদের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও দক্ষতা প্রমাণ করা। কোনো ব্যক্তি যদি তাঁর বর্তমান যোগ্যতার চেয়ে নিচের কোনো স্তরে কাজ করতে চান, তবে কোনো পরীক্ষার প্রয়োজন নেই, কিন্তু উচ্চতর পদের জন্য পরীক্ষা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
৬. কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা:
এই ব্যবস্থায় প্রত্যেকের পছন্দ ও যোগ্যতা অনুযায়ী একটি জীবিকা সুনিশ্চিত থাকে, তাই বেকারত্বের কোনো ভয় থাকে না। এমনকি যদি কোনো কারণে ব্যবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে জীবিকা প্রদান করতে না পারে, তবুও সংশ্লিষ্ট নাগরিক সমাজের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা সমানভাবে পাওয়ার অধিকারী থাকবেন।
সংক্ষেপে, পছন্দসই জীবিকা নির্বাচনে নাগরিকের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকলেও ব্যবস্থার শৃঙ্খলা ও কাজের গুণমান বজায় রাখতে যোগ্যতা ও দক্ষতাকেই একমাত্র আবশ্যিক শর্ত বা বিধিনিষেধ হিসেবে রাখা হয়েছে।
পছন্দের জীবিকা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যোগ্যতা কীভাবে যাচাই করা হবে?
ইউনিভার্সাল লাইফ ম্যানেজমেন্ট (ULM) প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় পছন্দসই জীবিকা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং নিয়মতান্ত্রিক। এর মূল দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্যতা প্রমাণ:
যদি কোনো নাগরিক তাঁর বর্তমান জীবিকা পরিবর্তন করতে চান, তবে তাঁকে পরীক্ষার মাধ্যমে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে নতুন জীবিকায় নিযুক্ত হতে হবে। এই ব্যবস্থায় যেকোনো পদের জন্য মাপদণ্ড হলো— ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য প্রকৃতপক্ষেই যোগ্য হতে হবে।
২. যোগ্যতার স্তর অনুযায়ী নিয়ম:
- উচ্চতর পদের ক্ষেত্রে: যদি কোনো ব্যক্তি তাঁর বর্তমান যোগ্যতার স্তরের চেয়ে উপরের কোনো পেশায় যেতে চান, তবে তাঁকে অবশ্যই ওই পদের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও দক্ষতা পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে।
- নিম্নতর পদের ক্ষেত্রে: কোনো ব্যক্তি যদি তাঁর বর্তমান যোগ্যতার চেয়ে নিচের কোনো স্তরের কাজে স্থানান্তরিত হতে চান, তবে তাঁর জন্য কোনো পরীক্ষার প্রয়োজন হবে না।
৩. ব্যবস্থার পক্ষ থেকে সহযোগিতা:
কোনো নাগরিক নতুন কোনো জীবিকার জন্য নিজেকে যোগ্য করে তুলতে চাইলে ব্যবস্থা তাঁকে সব ধরণের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করবে। ২৫ বছর বয়সের পরেও যদি কারো মনে হয় তিনি অন্য কোনো কাজের জন্য উপযুক্ত, তবে তিনি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে ও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সেই জীবিকা গ্রহণ করতে পারেন।
৪. আগ্রহ ও দক্ষতার সমন্বয়:
এই ব্যবস্থায় জীবিকা কেবল কাজের বোঝা নয়, বরং একটি সৃজনশীল সুখের উৎস। তাই ব্যক্তির রুচি, পছন্দ এবং আগ্রহের (Interest) সাথে তাঁর অর্জিত দক্ষতার সামঞ্জস্য যাচাই করাই হলো এই পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য।
৫. নিরন্তর মূল্যায়নের সুযোগ:
শিক্ষা জীবন শেষে (২৫ বছর বয়সে) জফদযারয় বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকেই প্রাথমিক যোগ্যতা যাচাই করে জীবিকা সুনিশ্চিত করা হয়। তবে পরবর্তী জীবনেও যে কেউ নিজের দক্ষতা বৃদ্ধি করে বা নতুন বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করে জীবিকা পরিবর্তনের জন্য আবেদন করতে পারেন।
সংক্ষেপে, জীবিকা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও দক্ষতা যাচাইয়ের প্রধান মাধ্যম হলো পরীক্ষা, যা নিশ্চিত করে যে প্রতিটি পদের জন্য সঠিক এবং দক্ষ ব্যক্তিকেই নির্বাচন করা হচ্ছে।
গবেষণা
নতুন ব্যবস্থায় আধিদৈবিক এবং আধিভৌতিক গবেষণার পার্থক্য কী?
ইউনিভার্সাল লাইফ ম্যানেজমেন্ট (ULM) প্রস্তাবিত ‘সম্পূর্ণ সমাধান’ ব্যবস্থায় গবেষণাকে তিনটি মূল বিভাগে ভাগ করা হয়েছে: আধিভৌতিক, আধিদৈবিক এবং আধ্যাত্মিক। নিচে আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক গবেষণার মূল পার্থক্যগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১. গবেষণার মূল বিষয়বস্তু:
- আধিভৌতিক (Physical): এটি মূলত পদার্থ বা জড় জগৎ (Matter) সম্পর্কিত জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করে।
- আধিদৈবিক (Astral): এটি সমগ্র প্রকৃতি (Nature) এবং প্রকৃতির সূক্ষ্ম রহস্যসমূহ নিয়ে গবেষণার কাজ পরিচালনা করে।
২. গবেষণার ক্ষেত্র ও জীবিকা:
- আধিভৌতিক: এর অধীনে চার ধরণের ব্যবহারিক বা জীবিকামূলক ক্ষেত্র রয়েছে— কৃষি, উৎপাদন শিল্প, প্রশাসন এবং নেতৃত্ব সংক্রান্ত বিষয়ে গবেষণামূলক কাজ [১২]।
- আধিদৈবিক: এর মুখ্য কাজ হলো মহাজাগতিক ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নিয়ে গবেষণা করা। এর মধ্যে রয়েছে— গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাব, ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, মহামারী, খরা বা অতিবৃষ্টি এবং উল্কাপাত সহ সকল প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ ও প্রতিকার অনুসন্ধান [১৩২]।
৩. গবেষকদের অবস্থান ও কর্মস্থল:
- আধিভৌতিক গবেষক: এই বিষয়ের বিজ্ঞানীদের আবাসন ও কর্মস্থল মূলত সমাজের সাধারণ জনবসতির মধ্যে থাকবে [১৩২]।
- আধিদৈবিক গবেষক: যেহেতু তাঁদের গবেষণা মূলত প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে, তাই তাঁদের আবাসন ও কর্মস্থল হবে জনবসতি থেকে দূরে অরণ্যের নিভৃত পরিবেশে [১৩২]। তাঁরা কেবল বিশেষ প্রয়োজনে সাধারণ মানুষের সান্নিধ্যে আসবেন [১৩২]।
৪. গবেষণার লক্ষ্য:
- আধিভৌতিক: মানব সমাজের আধুনিক চাহিদা মেটাতে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধন এবং প্রশাসনিক ও শিল্প ব্যবস্থাকে ত্রুটিমুক্ত রাখাই এর লক্ষ্য [১২, ১৩২]।
- আধিদৈবিক: প্রকৃতির নিয়মগুলোকে গভীরভাবে জেনে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং বিশ্বকে দুর্যোগমুক্ত রাখাই এই গবেষণার প্রধান লক্ষ্য [১৩২]।
সংক্ষেপে, আধিভৌতিক গবেষণা মানুষের তৈরি সামাজিক ও বস্তুগত পরিকাঠামো নিয়ে কাজ করে, আর আধিদৈবিক গবেষণা প্রকৃতির বিশাল কর্মকাণ্ড ও রহস্যের ওপর আলোকপাত করে [১২, ১৩২]।
আধিভৌতিক গবেষণার চারটি বিভাগ সম্পর্কে বিস্তারিত বলুন
আধিভৌতিক (Physical) বিজ্ঞান মূলত পদার্থ বা জড় জগত সম্পর্কিত জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং গবেষণার কাজ পরিচালনা করে। এই গবেষণার অধীনে প্রধানত চারটি জীবিকামূলক বিভাগ রয়েছে, যা সমাজের বৈষয়িক ও প্রশাসনিক প্রয়োজন মেটায়।
আধিভৌতিক গবেষণার এই চারটি বিভাগ নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. কৃষি (Agriculture):
এই বিভাগটি মূলত মানুষের পুষ্টি ও খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য গবেষণামূলক কাজ করে। এর অধীনে শস্য উৎপাদন, ফল উৎপাদন এবং পশুপালন বা দুগ্ধ উৎপাদনের মতো ক্ষেত্রগুলো অন্তর্ভুক্ত। এই স্তরের কাজে সাধারণত শারীরিক সক্ষমতা-প্রধান (Physical Quotient) ব্যক্তিত্বের মানুষেরা নিযুক্ত থাকেন।
২. উৎপাদন শিল্প
(Production
Industry): এই বিভাগের লক্ষ্য হলো মানুষের সমৃদ্ধি ও বৈষয়িক আরাম-আয়েশের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য ও পরিষেবা উৎপাদন করা। এতে গবেষণার তিনটি স্তর থাকে:
- সাধারণ স্তর: সূত্রধর (ছুতোর), প্লাম্বার, দর্জি, ইলেকট্রিশিয়ান বা রাজমিস্ত্রি সংক্রান্ত কাজ।
- মধ্যম স্তর: প্রকৌশল (Engineering), কোয়ালিটি কন্ট্রোল, সফটওয়্যার প্রোগ্রামিং এবং ডিজাইনিং সংক্রান্ত উচ্চতর প্রযুক্তিগত কাজ।
- উচ্চ স্তর: বিশেষায়িত বিজ্ঞানী ও গবেষকদের মাধ্যমে অত্যাধুনিক উদ্ভাবন। এই বিভাগে মূলত মানসিক মেধা-প্রধান (Intelligence Quotient) ব্যক্তিরা কাজ করেন।
৩. প্রশাসন (Administration):
এই বিভাগটি জনসেবা এবং সামাজিক কল্যাণমূলক কার্যাবলী সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য গবেষণা করে। এর মধ্যে সাধারণ শিক্ষা, চিকিৎসা সেবা (ডাক্তার), বিভাগীয় ব্যবস্থাপনা, ন্যায়-বিচার এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা (সুরক্ষা) অন্তর্ভুক্ত। এই বিভাগের কাজে ভাবনাত্মক বা আবেগীয় সক্ষমতা-প্রধান (Emotional Quotient) ব্যক্তিরা তাঁদের মেধা প্রয়োগ করেন।
৪. নেতৃত্ব (Leadership):
এটি আধিভৌতিক গবেষণার সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী স্তর। এই বিভাগের কাজ হলো আইন-কানুন প্রণয়ন, নতুন নীতিনিয়ম নির্ধারণ, উচ্চতর অধ্যাপনা এবং সামগ্রিক ব্যবস্থার ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধান করা। এখানে চেতনাত্মক স্তরের যোগ্যতা-সম্পন্ন (Consciousness Quotient) ব্যক্তিরা কাজ করেন, যাঁরা গ্রাম স্তর থেকে শুরু করে রাষ্ট্র ও বিশ্ব স্তরের (World
Government) নীতিনির্ধারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সংক্ষেপে, আধিভৌতিক গবেষণা মানুষের শারীরিক সামর্থ্য, বৌদ্ধিক মেধা, আবেগীয় দক্ষতা এবং চেতনার বিকাশকে কাজে লাগিয়ে কৃষি থেকে শুরু করে বিশ্ব নেতৃত্ব পর্যন্ত একটি সুশৃঙ্খল পরিকাঠামো গড়ে তোলে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আধিদৈবিক গবেষকদের ভূমিকা কী হবে?
ইউনিভার্সাল লাইফ ম্যানেজমেন্ট (ULM) ব্যবস্থায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আধিদৈবিক (Astral) গবেষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মূল কাজ হলো প্রকৃতির সূক্ষ্ম রহস্যসমূহ উন্মোচন করা এবং মহাজাগতিক ভারসাম্য রক্ষা করা।
দুর্যোগ মোকাবিলায় তাঁদের নির্দিষ্ট ভূমিকাগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. দুর্যোগের কারণ ও প্রতিকার অনুসন্ধান:
আধিদৈবিক গবেষকরা মূলত ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঘড়, মহামারী, খরা বা অনাবৃষ্টি, অতি বর্ষণ এবং উল্কাপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ এবং তা থেকে সমাজকে রক্ষা করার উপায় নিয়ে গবেষণা করবেন।
২. প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখা:
তাঁদের প্রধান লক্ষ্য হলো প্রকৃতির নিয়মগুলোকে গভীরভাবে জেনে প্রকৃতির ভারসাম্য (Balance) বজায় রাখা। কোনো কারণে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হলে উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে তা সংশোধন করাও তাঁদের কাজের অংশ। যেমন— দীর্ঘ খরার সময় কৃত্রিম বৃষ্টির ব্যবস্থা করে বন ও বন্যপ্রাণীকে রক্ষা করা।
৩. মহাজাগতিক প্রভাব পর্যবেক্ষণ:
তাঁরা গ্রহ-নক্ষত্রের ক্ষতিকারক প্রভাব এবং মহাকাশ থেকে আগত বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি (যেমন—অগ্নিখণ্ড বা উল্কাপাত) পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করবেন।
৪. নিভৃত গবেষণা ও অবস্থান:
সঠিক মনোযোগের সাথে প্রকৃতির ওপর পর্যবেক্ষণ চালানোর জন্য এই গবেষকদের আবাসন ও কর্মস্থল সাধারণ জনবসতি থেকে দূরে অরণ্যের নিভৃত পরিবেশে থাকবে। তাঁরা কেবল বিশেষ প্রয়োজনে বা দুর্যোগ মোকাবিলায় সমাজকে দিকনির্দেশনা দিতে সাধারণ মানুষের সান্নিধ্যে আসবেন।
৫. নীতিনির্ধারণী ও নেতৃত্বমূলক ভূমিকা:
এই গবেষকরা রাজ্য বা দেশ স্তরে বিশেষজ্ঞ, উপদেষ্টা বা অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় তাঁরা সরকারকে প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা প্রদান করবেন।
সংক্ষেপে, আধিদৈবিক গবেষকরা আধুনিক প্রযুক্তির সাথে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটিয়ে বিশ্বকে দুর্যোগমুক্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে অতন্দ্র প্রহরীর মতো কাজ করবেন।
চাহিদা ও উৎপাদন স্থিতিশীল হওয়ার শর্ত কি হবে, অর্থাৎ এই ব্যবস্থা আগে থেকে চাহিদা অনুধাবন করবে কি করে?
ইউনিভার্সাল লাইফ ম্যানেজমেন্ট (ULM) বা ‘সম্পূর্ণ সমাধান’ ব্যবস্থায় চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মূল শর্ত হলো চাহিদাকে আয়ের (টাকা) কবল থেকে মুক্ত করা এবং একটি প্রযুক্তিনির্ভর কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে রিয়েল-টাইম ডাটা সংগ্রহ করা। এই ব্যবস্থা কীভাবে আগে থেকে চাহিদা অনুধাবন করবে এবং ভারসাম্য রক্ষা করবে, তার প্রধান দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. নাগরিকদের সরাসরি চাহিদা প্রদান (Direct
Input):
এই ব্যবস্থায় বাজারের অনুমানের পরিবর্তে নাগরিকদের সরাসরি অংশগ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি নাগরিকের একটি নিজস্ব অনলাইন প্রোফাইল বা ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট থাকবে, যার মাধ্যমে তারা তাদের প্রয়োজনীয় পণ্য বা পরিষেবার চাহিদা সরাসরি কেন্দ্রীয় পোর্টালে জানাবেন। এর ফলে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা নির্দিষ্ট সময় অন্তর কী পরিমাণ পণ্য প্রয়োজন হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানতে পারবে।
২. রিয়েল-টাইম ডাটা বিশ্লেষণ:
কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারটি নাগরিকদের দেওয়া অর্ডারের ডাটা রিয়েল-টাইমে
(Real-time) সংগ্রহ করবে। এই ডাটা থেকে প্রাপ্ত ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাকে একটি গাণিতিক ফর্মুলেশনের মাধ্যমে সামাজিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্যে রূপান্তরিত করা হবে। এর ফলে উৎপাদনের জন্য নিখুঁত গাণিতিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
৩. গাণিতিক মডেল ও লিনিয়ার প্রোগ্রামিং:
চাহিদা ও উৎপাদনের ভারসাম্য রক্ষার জন্য এই ব্যবস্থা লিনিয়ার প্রোগ্রামিং (Linear
Programming), অপ্টিমাইজেশান থিওরি এবং অটোমেটা থিওরির মতো উচ্চতর গাণিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করবে। এই অ্যালগরিদমগুলো উপলব্ধ প্রাকৃতিক সম্পদ, মানব সম্পদ এবং মেশিনের ক্ষমতার সাথে নাগরিক চাহিদাকে বিশ্লেষণ করে উৎপাদনের সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও সঠিক পথটি খুঁজে বের করবে।
৪. রূপান্তরকালীন প্রস্তুতি ও সমীক্ষা (৬-৮ মাস):
ব্যবস্থাটি পুরোপুরি চালুর আগে একটি ৬ থেকে ৮ মাসের প্রস্তুতি পর্ব থাকবে। এই সময়ে সরকার দেশের সমস্ত উৎপাদক (কোম্পানি ও কৃষক) এবং ভোক্তাদের একটি সার্বজনীন অনলাইন অ্যাপে তালিকাভুক্ত করবে। বিভিন্ন সমীক্ষার মাধ্যমে সরকার বুঝতে পারবে যে মানুষের হাতে প্রয়োজনীয় সুবিধা পৌঁছালে কোন জিনিসের চাহিদা কতটা বাড়তে পারে। এই পূর্বাভাসের ভিত্তিতেই অ্যাপে সুনির্দিষ্ট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বা ‘টার্গেট’ লিখে দেওয়া হবে।
৫. চাহিদা ও জোগানের গাণিতিক সামঞ্জস্য:
বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় মুনাফার লোভে অপ্রয়োজনীয় উৎপাদন বা জোগান কম রেখে দাম বাড়ানোর প্রবণতা থাকে, কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় ১০০ শতাংশ চাহিদাকে সামনে রেখেই ১০০ শতাংশ উৎপাদন পরিকল্পনা করা হবে। কৃষকরা অ্যাপে দেখতে পাবেন কোন ফসলের লক্ষ্যমাত্রা কতটুকু বাকি আছে, এবং তারা সেই অনুযায়ী চাষাবাদ করবেন, ফলে কোনো জিনিসেরই অতিরিক্ত উৎপাদন বা ঘাটতি হবে না।
৬. পণ্য ব্যবহারের গ্যারান্টি ও পুনর্ব্যবহার:
যেহেতু এই ব্যবস্থায় পণ্যের ব্যক্তিগত মালিকানা নেই, তাই ব্যবহারের পর পণ্যটি পুনরায় ব্যবস্থার কাছে ফিরে যাবে। কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার এই রিসাইক্লিং ও স্টোকের হিসাব রাখবে, যা নতুন উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণে এবং জোগানের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
সারসংক্ষেপে, নাগরিকদের দেওয়া সরাসরি অর্ডারের রিয়েল-টাইম ডাটা এবং উচ্চতর গাণিতিক সফটওয়্যারের সমন্বয়ে এই ব্যবস্থাটি নিখুঁতভাবে চাহিদা অনুধাবন করবে এবং সেই অনুযায়ী উৎপাদন সচল রাখবে।
নতুন ব্যবস্থায় জীবিকা বা পেশা ও অবদানের (contribution) সংজ্ঞা কি হবে?
ইউনর্ভাসাল লাইফ ম্যানেজমেন্ট (ULM) বা ‘সম্পূর্ণ সমাধান’ ব্যবস্থায় জীবিকা, পেশা এবং অবদানের
(contribution) প্রচলিত সংজ্ঞা আমূল পরিবর্তিত হবে। এখানে জীবিকা কেবল অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়, বরং জীবনকে উপভোগ করা এবং সমাজের প্রতি সহযোগিতার একটি মাধ্যম হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
এই নতুন ব্যবস্থায় জীবিকা ও অবদানের সংজ্ঞা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. জীবিকা বা পেশার সংজ্ঞা
(Definition of Profession/Livelihood):
- আগ্রহভিত্তিক সৃজনশীল সুখ: এই ব্যবস্থায় পেশাকে কেবল ‘কাজ’ বা ‘বোঝা’ হিসেবে দেখা হয় না, বরং একে ‘সৃজনশীল সুখের উৎস’
(Creative Happiness) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। মানুষ তার সহজাত প্রবৃত্তি এবং রুচি অনুযায়ী
(Interest) পেশা নির্বাচন করবে, ফলে কর্মজীবন হবে আনন্দময়।
- অধিকার ও দায়িত্ব: জীবিকা এখানে প্রত্যেকের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সুনিশ্চিত একটি অধিকার। ২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী সকল সুস্থ নাগরিকের জন্য তাঁদের পছন্দ ও যোগ্যতা অনুযায়ী একটি পেশা গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক সামাজিক দায়িত্ব, যার মাধ্যমে তাঁরা ব্যবস্থার সমস্ত সুবিধা ভোগের অধিকার অর্জন করবেন।
- বেতনহীন সেবা: এই ব্যবস্থায় কাজের বিনিময়ে কোনো বেতন বা মজুরি দেওয়া হবে না। জীবিকা হলো একটি মুদ্রাহীন সেবা পদ্ধতি যেখানে মানুষ সমাজকে সেবা দেয় এবং বিনিময়ে সমাজ তার সমস্ত প্রয়োজন মেটায়।
২. অবদানের সংজ্ঞা ও মূল্যায়ন
(Definition and Valuation of Contribution):
- সমান সামাজিক মূল্য: নতুন ব্যবস্থায় অবদানের কোনো উচ্চ বা নিম্ন স্তর নেই। এখানে সকল প্রকার পেশার মূল্য সমান [৮, ৪৩, ১৯১]। একজন বিজ্ঞানীর অবদানকে একজন সাফাইকর্মী বা কৃষকের অবদানের সমান গুরুত্ব ও মর্যাদা দেওয়া হবে।
- অ-আর্থিক পরিমাপ
(Internal Accounting): অবদানের কোনো বাজারমূল্য বা আর্থিক মূল্যায়ন থাকবে না। তবে ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও উৎপাদনের ভারসাম্য রক্ষার জন্য অবদানের একটি গাণিতিক গণনা পদ্ধতি থাকবে, যেখানে ১ ঘণ্টা শ্রম = ১ একক হিসেবে ধরা হবে। এটি কেবল সরকারের হিসাবরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হবে, কোনো ব্যক্তিগত আয়ের জন্য নয়।
- গুণমান ও স্বতঃস্ফূর্ততা: এখানে অবদান কেবল কাজের পরিমাণের ওপর নয়, বরং কাজের গুণমান
(Quality) এবং নাগরিক সন্তুষ্টির ওপর ভিত্তি করে সংজ্ঞায়িত হবে। মানুষ ভয়ের বদলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করবে, কারণ কাজ হবে তার পছন্দের।
৩. জীবিকার চারটি প্রধান বিভাগ:
অবদান এবং ব্যক্তিগত মেধার ভিত্তিতে পেশাকে চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছে:
১. কৃষি ও সংশ্লিষ্ট উৎপাদন পরিষেবা:
(Physical Quotient - PQ ভিত্তিক)।
২. প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সামাজিক পরিষেবা:
(Emotional Quotient - EQ ভিত্তিক)।
৩. শিল্প ও পেশাদার পরিষেবা:
(Intelligence Quotient - IQ ভিত্তিক)।
৪. নীতি নির্ধারণ ও নেতৃত্ব পরিষেবা:
(Consciousness Quotient - CQ ভিত্তিক)
সারসংক্ষেপে, নতুন ব্যবস্থায় জীবিকা হলো আগ্রহভিত্তিক একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং অবদান হলো সফল উৎপাদনের লক্ষে পারস্পরিক সহযোগিতা, যেখানে প্রতিটি মানুষের কাজ সমানভাবে সম্মানিত এবং মুদ্রার কবল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
প্রতিটি কাজের মূল্য কেন একসমান রাখা হয়েছে?
ইউনিভার্সাল লাইফ ম্যানেজমেন্ট (ULM) বা ‘সম্পূর্ণ সমাধান’ ব্যবস্থায় প্রতিটি পেশা বা কাজের মূল্য একসমান রাখার পেছনে গভীর সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো সমাজে বৈষম্য দূর করে একটি স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সুখী সমাজ গড়ে তোলা।
প্রতিটি কাজের মূল্য সমান রাখার প্রধান কারণগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. সামাজিক শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষা:
উৎস অনুসারে, যদি কোনো কাজকে উচ্চ বা নিম্ন হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়, তবে তা মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। আর্থিক বা পেশাগত ভিত্তিতে সমাজে বিভিন্ন শ্রেণি (Class) তৈরি হলে সেখানে দ্বেষ, ঘৃণা, অহিংসা এবং চুরির মতো অপরাধের জন্ম হয়। সকল পেশার মান সমান হলে এই ধরণের নেতিবাচক প্রতিযোগিতা বিলুপ্ত হয়।
২. সুখের অভিন্ন উদ্দেশ্য:
মানুষের সকল কর্মের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো সুখী হওয়া। একজন বিজ্ঞানী যেমন তার গবেষণার মাধ্যমে সমাজকে আনন্দ দেন, তেমনি একজন সাফাইকর্মী বা কৃষকও সমাজকে সুস্থ ও সবল রাখতে সমানভাবে অবদান রাখেন। যেহেতু উভয় কাজের উদ্দেশ্যই শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রয়োজন মেটানো ও সুখ দেওয়া, তাই তাদের সামাজিক মূল্যও এক হওয়া উচিত।
৩. প্রকৃত স্বাধীনতার নিশ্চয়তা:
এই ব্যবস্থায় মনে করা হয় যে, মানুষ তখনই প্রকৃত স্বাধীনতা অনুভব করে যখন সমাজের সকল নাগরিক সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার অধিকারী হয়। অর্থনৈতিক সমতাই হলো অন্য সকল স্বাধীনতার জননী; আর্থিক বৈষম্য থাকলে ধনীরা গরিবদের ওপর কর্তৃত্ব করে, যা প্রকৃত গণতন্ত্রের পরিপন্থী।
৪. আগ্রহভিত্তিক পেশা নির্বাচন:
যদি কিছু পেশায় বেশি সুবিধা বা মর্যাদা দেওয়া হতো, তবে মানুষ নিজের আগ্রহের বদলে কেবল সেই সুবিধা পাওয়ার জন্য কাজ করত। সকল কাজের মূল্য সমান হওয়ায় মানুষ এখন তার সহজাত রুচি এবং প্রতিভা
(Interest) অনুযায়ী পেশা নির্বাচন করবে, যার ফলে কাজের গুণমান বৃদ্ধি পাবে এবং মানুষ কাজ করে আনন্দ পাবে।
৫. অপরাধ ও দুর্নীতির বিলোপ:
বর্তমান সমাজে অধিকাংশ অপরাধ (যেমন— ঘুষ, জালিয়াতি, লুটপাট) হয় অন্যের তুলনায় বেশি সম্পদশালী হওয়ার বা শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লালসা থেকে। যখন সকল পেশার আর্থিক মান সমান এবং সকলের জীবনযাত্রার মান রাষ্ট্রীয়ভাবে সুনিশ্চিত থাকবে, তখন অতিরিক্ত কিছু পাওয়ার জন্য অপরাধ করার কোনো যৌক্তিক কারণ অবশিষ্ট থাকে না।
৬. পরস্পরের ওপর নির্ভরশীলতা:
ব্যবস্থার দর্শনে সমাজকে একটি অখণ্ড সত্তা হিসেবে দেখা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি মানুষ একে অপরের পরিপূরক। যেমন— একটি রথের চাকা সচল রাখতে তার বড় অংশের পাশাপাশি ছোট পেরেকটির গুরুত্বও সমান, তেমনি সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতিটি পেশার অবদানই অপরিহার্য।
সারসংক্ষেপে, প্রতিটি কাজের মূল্য একসমান রাখার উদ্দেশ্য হলো মানুষের মধ্যে উচ্চ-নীচ ভেদাভেদ মিটিয়ে এমন একটি বৈষম্যহীন সমাজ তৈরি করা, যেখানে মানুষ ভয়ের বদলে প্রেমের ভিত্তিতে একে অপরকে সহযোগিতা করবে।
কেন সকল কাজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য সমান রাখা হয়েছে?
ইউনিভার্সাল লাইফ ম্যানেজমেন্ট (ULM) বা ‘সম্পূর্ণ সমাধান’ ব্যবস্থায় প্রতিটি পেশা বা কাজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য একসমান রাখার পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো সমাজে বৈষম্য দূর করে একটি স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সুখী বিশ্ব গড়ে তোলা।
প্রতিটি কাজের মূল্য সমান রাখার প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. সামাজিক বৈষম্য ও শ্রেণিবিভেদ নির্মূল:
প্রচলিত ব্যবস্থায় কাজের ভিন্ন মূল্যায়নের কারণে সমাজে উঁচু-নিচু শ্রেণি এবং ধনী-দরিদ্র ভেদাভেদ তৈরি হয়। কাজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য সমান রাখা হলে এই কৃত্রিম বিভাজন দূর হবে এবং দ্বেষ, ঘৃণা ও শ্রেণিদ্বন্দ্বের অবসান ঘটবে।
২. অপরাধ ও দুর্নীতির মূল কারণ ধ্বংস করা:
তথাকথিত ‘উচ্চ’ ও ‘নিম্ন’ আয়ের ব্যবধান মানুষকে অন্যের তুলনায় শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে বা বিলাসিতা অর্জনে প্ররোচিত করে, যা চুরি, ডাকাতি, ঘুষ এবং জালিয়াতির মতো অপরাধের জন্ম দেয়। সকল কাজের মূল্য এক হলে অতিরিক্ত কিছু পাওয়ার লালসা বা অভাবের তাড়না থাকবে না, ফলে অপরাধের কোনো বস্তুগত কারণ অবশিষ্ট থাকবে না।
৩. আগ্রহভিত্তিক পেশা নির্বাচন:
যদি কিছু পেশায় বেশি সুবিধা বা মর্যাদা দেওয়া হতো, তবে মানুষ নিজের সহজাত মেধার বদলে কেবল সেই বাড়তি সুবিধা পাওয়ার লোভে কাজ করত। সব কাজের মূল্য সমান হওয়ায় মানুষ এখন তার সহজাত রুচি এবং প্রতিভা
(Interest) অনুযায়ী পেশা নির্বাচন করতে পারবে, যা কাজের গুণমান বৃদ্ধি করবে এবং কর্মজীবনকে সৃজনশীল সুখের উৎসে পরিণত করবে।
৪. পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও মর্যাদা:
ব্যবস্থার দর্শনে মনে করা হয় যে, প্রতিটি কাজই সমাজের জন্য সমানভাবে অপরিহার্য। একজন বিজ্ঞানী যেমন গবেষণার মাধ্যমে সমাজকে এগিয়ে নেন, তেমনি একজন কৃষক বা সাফাইকর্মী সমাজকে বাঁচিয়ে রাখেন। যেহেতু প্রতিটি পেশাই মানুষের সামগ্রিক সুখের জন্য জরুরি, তাই তাদের সামাজিক মান ও মর্যাদাও এক হওয়া উচিত।
৫. প্রকৃত স্বাধীনতার নিশ্চয়তা:
অর্থনৈতিক বৈষম্য থাকলে ধনীরা গরিবদের ওপর কর্তৃত্ব বা নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ পায়, যা মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে খর্ব করে। অর্থনৈতিক সমতাই হলো অন্য সকল স্বাধীনতার মূল ভিত্তি; যখন সকলের জীবনযাত্রার মান সমান হবে, কেবল তখনই মানুষ প্রকৃত স্বাধীনতা অনুভব করতে পারবে।
৬. মানসিক প্রশান্তি ও নিরাপত্তা:
বর্তমান ব্যবস্থায় অনেক বেশি আয়ের পেশাতেও সম্পদ হারানো বা ব্যবসায়িক লোকসানের গভীর মানসিক চাপ থাকে। সকলের অবদানকে সমান মূল্যায়ন করার মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রত্যেকের জন্য একই উচ্চমানের জীবনযাত্রা সুনিশ্চিত করে, যা মানুষকে চিরস্থায়ী দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেয়।
সারসংক্ষেপে, কাজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য সমান রাখার উদ্দেশ্য হলো মানুষকে অর্থের দাসে পরিণত না করে এমন একটি বৈষম্যহীন ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে প্রতিটি নাগরিক ভয়ের বদলে সহযোগিতার ভিত্তিতে সমাজ গঠনে অংশ নিতে পারেন।
অযোগ্য সত্ত্বেও কেউ কি এমন কোনো পেশায় যেতে চাইবে?
ইউনিভার্সাল লাইফ ম্যানেজমেন্ট (ULM) বা ‘সম্পূর্ণ সমাধান’ ব্যবস্থায় অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও কারো পক্ষে অন্য কোনো পেশায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এই
সিদ্ধান্তের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ উল্লেখ করা হয়েছে:
১. পেশাগত ও সামাজিক সমমর্যাদা:
এই ব্যবস্থায় প্রতিটি পেশার সামাজিক মান ও মর্যাদা সমান রাখা হয়েছে। বিজ্ঞানী বা সাফাইকর্মী—উভয়ই ব্যবস্থার সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ও বিলাসিতা সমানভাবে ভোগ করবেন। যেহেতু উচ্চতর কোনো পদে গেলে অতিরিক্ত কোনো বেতন বা বাড়তি সামাজিক শ্রেষ্ঠত্ব পাওয়া যাবে না, তাই মানুষ কেবল ‘মর্যাদা’ বা ‘অর্থের’ লোভে নিজের অযোগ্যতা লুকিয়ে কোনো পেশায় যেতে চাইবে না।
২. আগ্রহ বনাম যন্ত্রণা:
এই ব্যবস্থায় মনে করা হয় যে, মানুষ যখন তার যোগ্যতা ও আগ্রহের বাইরের কোনো কাজ করে, তখন সেই কাজটি তার কাছে খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায় এবং তা কেবল দুঃখ বা যন্ত্রণার (Suffering) কারণ হয়। অন্যদিকে, নিজের সহজাত প্রতিভা ও আগ্রহ অনুযায়ী কাজ করলে মানুষ তাতে আনন্দ খুঁজে পায়। মানুষ যেহেতু সহজাতভাবে সুখী হতে চায়, তাই সে নিজের অপছন্দের বা অযোগ্যতার কাজে নিজেকে জড়িয়ে কষ্ট পেতে চাইবে না।
৩. যোগ্যতা যাচাইয়ের কঠোর পদ্ধতি:
এই ব্যবস্থায় প্রতিটি পদের জন্য সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি ও নির্বাচনী পরীক্ষা রয়েছে। বিশেষ করে প্রশাসনিক বা নেতৃত্বস্থানীয় পদের জন্য শারীরিক (PQ), মানসিক (IQ), ভাবনাত্মক (EQ) এবং চেতনাত্মক (CQ) স্তরের পরীক্ষা নেওয়া বাধ্যতামূলক। কোনো ব্যক্তি যদি কোনো পদের জন্য প্রকৃতপক্ষেই যোগ্য না হন, তবে তিনি এই পরীক্ষার ধাপগুলো পার হতে পারবেন না।
৪. জীবিকা পরিবর্তনের সুযোগ:
যদি কোনো ব্যক্তি তাঁর বর্তমান পেশার বাইরে অন্য কোনো কাজে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছা পোষণ করেন, তবে ব্যবস্থা তাঁকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিনামূল্যে শিক্ষা ও পুনঃপ্রশিক্ষণের সুযোগ দেবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যোগ্যতা অর্জন করে এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই তিনি কেবল সেই নতুন পেশায় নিযুক্ত হতে পারবেন।
সারসংক্ষেপে, অযোগ্য সত্ত্বেও কারো অন্য পেশায় যাওয়ার কোনো বৈষয়িক বা মানসিক প্ররোচনা (Incentive) এই ব্যবস্থায় নেই; বরং যোগ্যতাহীন কাজ করা এখানে ব্যক্তির নিজের জন্য যন্ত্রণাদায়ক এবং ব্যবস্থার কঠোর নিয়মাবলি দ্বারা তা নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
পছন্দমতো কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে সাহায্য করবে?
ইউনিভার্সাল লাইফ ম্যানেজমেন্ট (ULM) ট্রাস্টের প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় শিক্ষা ব্যবস্থাটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে প্রতিটি মানুষ তার সহজাত প্রবৃত্তি এবং রুচি অনুযায়ী কাজ বেছে নিতে পারে। পছন্দমতো কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে এই শিক্ষা ব্যবস্থা যেভাবে সাহায্য করবে তা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. রুচিভিত্তিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ:
এই ব্যবস্থায় ৫ বছর বয়স থেকে ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত একজন ব্যক্তি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবেন। এই দীর্ঘ সময়ে তাকে তার পছন্দ বা আগ্রহের (Interest) বিষয়গুলো খুঁজে বের করতে এবং তাতে দক্ষ হতে সাহায্য করা হবে। যদি কারো কেবল গণিত, শিল্পকলা বা অভিনয়ে আগ্রহ থাকে, তবে তিনি সেই নির্দিষ্ট বিষয়টিই পড়ার সুযোগ পাবেন।
২. পরীক্ষা ও নম্বরের চাপহীনতা:
বর্তমানে ভালো বেতনের চাকরির জন্য অনেক নম্বর পাওয়ার যে প্রতিযোগিতা থাকে, এই ব্যবস্থায় তা থাকবে না। এখানে কোনো পরীক্ষা (Exam) থাকবে না, কারণ অর্থ উপার্জনের জন্য কাউকে উচ্চ নম্বর পাওয়ার লড়াইয়ে নামতে হবে না। ফলে শিক্ষার্থীরা কোনো মানসিক চাপ ছাড়াই তাদের সৃজনশীলতা বিকাশে মনোযোগ দিতে পারবেন।
৩. আত্ম-আবিষ্কারের সুযোগ:
শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে শিশুরা জগৎ এবং বিভিন্ন সম্পদ সম্পর্কে জানবে। এরপর তারা নিজেদের পছন্দ (যেমন: ঘোড়সওয়ারি, গাড়ি চালানো বা কৃষি কাজ) চিহ্নিত করতে শিখবে। ব্যবস্থাটি এমনভাবে তৈরি যাতে একজন ব্যক্তি তার প্রাকৃতিক দক্ষতা (Natural Software) অনুযায়ী গড়ে উঠতে পারে।
৪. শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে সহায়তা:
যেহেতু এই ব্যবস্থায় কোনো আর্থিক সীমাবদ্ধতা নেই, তাই ব্যবস্থাটি প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার পছন্দের ক্ষেত্রে সেরা স্তরে (Top Level) পৌঁছানোর জন্য সমস্ত প্রয়োজনীয় সম্পদ ও প্রশিক্ষণ প্রদান করবে।
৫. পেশাগত স্বাধীনতার নিশ্চয়তা:
২৫ বছর বয়সের পর যখন কাজের সময় আসবে, তখন মানুষকে তার আগ্রহের ভিত্তিতেই কাজ দেওয়া হবে। যেহেতু প্রত্যেকে তাদের পছন্দের কাজ করবেন, তাই কাজ আর কারো কাছে 'বোঝা' মনে হবে না এবং তারা অত্যন্ত আনন্দের সাথে নিজেদের সেরা পরিষেবা দিতে পারবেন।
সহজ কথায়, এই শিক্ষা ব্যবস্থা মানুষকে কেবল ডিগ্রিধারী কর্মী হিসেবে নয়, বরং একজন দক্ষ এবং আগ্রহী বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তুলবে, যা তাকে সারাজীবন তার পছন্দমতো কাজ করে সুখী থাকতে সাহায্য করবে।
২৫ বছরের কম বয়সের ছেলেমেয়েদের জীবনযাত্রা কেমন হবে?
ইউনিভার্সাল লাইফ ম্যানেজমেন্ট (ULM)-এর প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় জন্ম থেকে ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত সময়টিকে একজন মানুষের নিজেকে চেনা এবং দক্ষ করে গড়ে তোলার ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়েছে। এই সময়ের জীবনযাত্রা হবে সম্পূর্ণ চাপমুক্ত, অভাবহীন এবং সৃজনশীলতায় ভরপুর। নিচে এর প্রধান দিকগুলো আলোচনা করা হলো:
১. সম্পূর্ণ বিনামূল্যে জীবনযাপন:
এই ব্যবস্থায় ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতিটি ছেলেমেয়ের জন্য সবকিছুই বিনামূল্যে থাকবে। তাদের খাবার, পোশাক, আবাসন, যাতায়াত এবং বিনোদনের জন্য কোনো টাকা খরচ করতে হবে না। বা তাদের অভিভাবকদের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে না। তারা সরাসরি অনলাইন সিস্টেমের মাধ্যমে তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসের (যেমন- মোবাইল, ল্যাপটপ বা অন্য সরঞ্জাম) চাহিদা জানাতে পারবে এবং ব্যবস্থা তা সরবরাহ করবে।
২. অভিভাবকদের ওপর নির্ভরতাহীনতা:
বর্তমানে সন্তানদের ভরণপোষণের জন্য বাবা-মাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়, কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় জন্ম থেকেই রাষ্ট্র বা 'সিস্টেম' শিশুর সমস্ত দায়িত্ব নেবে। ফলে সন্তানদের পড়াশোনা বা লালন-পালনের খরচ নিয়ে অভিভাবকদের আর চিন্তিত থাকতে হবে না।
৩. পরীক্ষাহীন ও আনন্দময় শিক্ষা:
৫ থেকে ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত সময়টি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য নির্ধারিত। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো পরীক্ষা (Exam) বা নম্বরের চাপ থাকবে না। উচ্চ নম্বর পাওয়ার প্রতিযোগিতার বদলে তারা প্রকৃত জ্ঞান অর্জনে মনোযোগ দিতে পারবে।
৪. আগ্রহ ও রুচিভিত্তিক পড়াশোনা:
শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দ বা আগ্রহের (Interest) বিষয়গুলো বেছে নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা পাবে। যদি কারো কেবল গণিত, চিত্রকলা, অভিনয় বা বিজ্ঞানে আগ্রহ থাকে, তবে সে কেবল সেই বিষয়গুলোই পড়বে এবং তাতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করার সুযোগ পাবে।
৫. সহজাত দক্ষতা বা আগ্রহ খুঁজে বের করা:
শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে শিশুরা জগৎ এবং বিভিন্ন বৈষয়িক সম্পদ সম্পর্কে ধারণা লাভ করবে। এরপর তারা নিজেদের সহজাত বা প্রাকৃতিক দক্ষতা অনুযায়ী নিজের আগ্রহের ক্ষেত্র (যেমন: ঘোড়সওয়ারি, গাড়ি চালানো বা কৃষিকাজ) চিহ্নিত করতে শিখবে।
৬. পেশাগত শ্রম থেকে মুক্তি:
এই ব্যবস্থায় কেবল ২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের জন্য কাজ করা বাধ্যতামূলক। ফলে ২৫ বছরের কম বয়সীদের কোনো বাধ্যতামূলক কাজ বা অর্থ উপার্জনের চিন্তা করতে হবে না; তারা কেবল নিজেদের ব্যক্তিত্ব বিকাশে সময় ব্যয় করবে।
৭. চাহিদা পূরণের স্বাধীনতা:
তরুণ-তরুণীরা সরাসরি ব্যবস্থার (System) কাছে তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসের (যেমন: মোবাইল, ল্যাপটপ বা খেলার সরঞ্জাম) চাহিদা জানাতে পারবে এবং তা সরাসরি সরবরাহ করা হবে।
৮. বিনোদনের অফুরন্ত সুযোগ:
পড়াশোনার পাশাপাশি তারা জিম, সিনেমা, নাচ, গান বা যে কোনো খেলাধুলায় নিজেদের মগ্ন রাখার জন্য প্রচুর সময় ও আধুনিক সব সুবিধা পাবে।
সংক্ষেপে, ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত সময়টি হবে একজন মানুষের জন্য একটি প্রস্তুতি পর্ব, যেখানে কোনো আর্থিক বা মানসিক চাপ ছাড়াই সে একজন সুখী এবং দক্ষ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে।
সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থায় জীবিকা ও পেশার সংজ্ঞা কী হবে?
ইউনর্ভাসাল লাইফ ম্যানেজমেন্ট (ULM) বা ‘সম্পূর্ণ সমাধান’ ব্যবস্থায় জীবিকা এবং পেশার প্রচলিত সংজ্ঞা আমূল পরিবর্তিত হবে। এখানে জীবিকা কেবল অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়, বরং জীবনকে উপভোগ করা এবং সমাজের প্রতি সহযোগিতার একটি মাধ্যম হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
এই নতুন ব্যবস্থায় জীবিকা ও পেশার সংজ্ঞা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. আগ্রহভিত্তিক সৃজনশীল সুখ:
এই ব্যবস্থায় পেশাকে কেবল ‘কাজ’ বা ‘বোঝা’ হিসেবে দেখা হয় না, বরং একে ‘সৃজনশীল সুখের উৎস’
(Creative Happiness) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। মানুষ তার সহজাত প্রবৃত্তি এবং রুচি অনুযায়ী (Interest) পেশা নির্বাচন করবে, ফলে কর্মজীবন হবে আনন্দময়।
২. সামাজিক দায়িত্ব ও অধিকার:
জীবিকা এখানে প্রত্যেকের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সুনিশ্চিত একটি অধিকার। ২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী সকল সুস্থ নাগরিকের জন্য তাঁদের পছন্দ ও যোগ্যতা অনুযায়ী একটি পেশা গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক সামাজিক দায়িত্ব, যার মাধ্যমে তাঁরা ব্যবস্থার সমস্ত সুবিধা ভোগের অধিকার অর্জন করবেন।
৩. বেতনহীন সেবা পদ্ধতি:
এই ব্যবস্থায় কাজের বিনিময়ে কোনো বেতন বা মজুরি দেওয়া হবে না। জীবিকা হলো একটি মুদ্রাহীন সেবা পদ্ধতি যেখানে মানুষ সমাজকে শ্রম দেয় এবং বিনিময়ে সমাজ তার সমস্ত প্রয়োজন (খাদ্য, বাসস্থান, বিলাসিতা) বিনামূল্যে মেটায়।
৪. সমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য:
নতুন ব্যবস্থায় অবদানের কোনো উচ্চ বা নিম্ন স্তর নেই। এখানে সকল প্রকার পেশার মূল্য সমান। একজন বিজ্ঞানীর অবদানকে একজন সাফাইকর্মী বা কৃষকের অবদানের সমান গুরুত্ব ও মর্যাদা দেওয়া হবে।
৫. অভ্যন্তরীণ গাণিতিক পরিমাপ:
অবদানের কোনো আর্থিক মূল্যায়ন থাকবে না। তবে ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও উৎপাদনের ভারসাম্য রক্ষার জন্য শ্রমের একটি গাণিতিক গণনা পদ্ধতি থাকবে, যেখানে ১ ঘণ্টা শ্রম = ১ একক হিসেবে ধরা হবে। এটি কেবল সরকারের হিসাবরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হবে, কোনো ব্যক্তিগত আয়ের জন্য নয়।
৬. পেশার চারটি প্রধান বিভাগ:
ব্যক্তিগত মেধা ও ব্যক্তিত্বের ভিত্তিতে পেশাকে চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছ:
- কৃষি ও সংশ্লিষ্ট উৎপাদন পরিষেবা:
(Physical Quotient - PQ ভিত্তিক)।
- শিল্প ও পেশাদার পরিষেবা:
(Intelligence Quotient - IQ ভিত্তিক)।
- প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সামাজিক পরিষেবা:
(Emotional Quotient - EQ ভিত্তিক)।
- নীতি নির্ধারণ ও নেতৃত্ব পরিষেবা:
(Consciousness Quotient - CQ ভিত্তিক)।
সারসংক্ষেপে, নতুন ব্যবস্থায় জীবিকা হলো আগ্রহভিত্তিক একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং পেশা হলো পরম তৃপ্তি বা সৃজনশীল আনন্দের মাধ্যম, যেখানে প্রতিটি মানুষের শ্রম সমানভাবে সম্মানিত এবং মুদ্রার কবল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন