‘মার্কসবাদ’ ও ULM প্রস্তাবিত ‘সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থা’র মধ্যে তুলনা

 

‘মার্কসবাদ’ ও ULM প্রস্তাবিত ‘সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থা’র মধ্যে তুলনা


যেসব বিষয়ে মিল রয়েছে

‘মার্কসবাদ’ এবং UlM প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থার মধ্যে কিছু মৌলিক উদ্দেশ্যগত আদর্শিক মিল নিচে উল্লেখ করা হলো:

 

শোষণমুক্ত সমাজের আকাঙ্ক্ষা:

উভয় ব্যবস্থাই সমাজ থেকে শোষণ এবং অন্যায্য বঞ্চনা দূর করতে চায়। মার্কসবাদ যেখানে পুঁজিবাদী শোষণের অবসান ঘটিয়ে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থাও এমন একটি সিস্টেমের কথা বলে যেখানে কেউ কারও ওপর শোষণ বা দুর্নীতি করতে পারবে না।

 

সিস্টেমিক পরিবর্তনের ওপর জোর:

উভয় দর্শনই মনে করে যে কেবল ভালো মানুষের নেতৃত্ব বা বিচ্ছিন্ন সংস্কার দিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মার্কসবাদের মতে সমাজের অর্থনৈতিক 'ভিত্তি' পরিবর্তন জরুরি, আর সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থাও দাবি করে যে নেতৃত্বের পরিবর্তে সিস্টেমের আর্কিটেকচারের পরিবর্তনই হলো আসল সমাধান।

 

অর্থনৈতিক অধিকারের গুরুত্ব:

মার্কসবাদ যেমন মনে করে যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই রাজনীতির মূল ভিত্তি, সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থাও প্রতিটি নাগরিকের জন্মগত অর্থনৈতিক অধিকার এবং মৌলিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করে।

 

বর্তমান ব্যবস্থার ব্যর্থতা স্বীকার:

উভয় ব্যবস্থাই একমত যে বর্তমান প্রচলিত মুনাফাকেন্দ্রিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়েছে। মার্কসের মতে পুঁজিবাদ নিজেই নিজের ধ্বংসের কারণ তৈরি করে, আর সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থার মতে বর্তমান সিস্টেমের ফর্মুলা ভুল বলেই তা বারবার বিফল হচ্ছে।

 

সাধারণ মানুষের কল্যাণ:

মার্কসবাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো একটি শ্রেণিহীন সমাজ যেখানে প্রত্যেকে তার প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পদ ভোগ করবে। একইভাবে, সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো এমন একটি সমৃদ্ধ আধুনিক ব্যবস্থা তৈরি করা যেখানে প্রতিটি পরিবারের প্রতিটি সদস্যের প্রয়োজনীয় সুখ-সুবিধা সুরক্ষা সুনিশ্চিত থাকবে।

 

প্রগতিশীল আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি:

মার্কসবাদ নিজেকে একটি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে উপস্থাপন করে যা সমাজের বিবর্তন ব্যাখ্যা করে। অন্যদিকে, সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থাও বিজ্ঞানসম্মত ও আধুনিক প্রযুক্তি (এআই, রোবটিক্স, অটোমেশন) ব্যবহার করে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মানুষের শ্রম কমানোর এক আধুনিক উন্নত ব্যবস্থার কথা বলে।

 

সারসংক্ষেপে, যদিও দুই ব্যবস্থার পথ বা পদ্ধতি ভিন্ন, তবে একটি স্থায়ী, বৈষম্যহীন এবং সুরক্ষিত সমাজ ব্যবস্থা গঠন করাই হলো উভয় দর্শনের মূল সাধারণ উদ্দেশ্য

 

যেসব বিষয়ে পার্থক্য রয়েছে

কাল মার্কসের ব্যবস্থা (মার্কসবাদ) এবং 'সম্পূর্ণ সমাধান' ব্যবস্থার মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলো নিচে পয়েন্ট আকারে উল্লেখ করা হলো:

 

পরিবর্তনের পদ্ধতি:

মার্কসীয় ব্যবস্থায় বিশ্বাস করা হয় যে শ্রেণি সংগ্রামের মাধ্যমে শোষিত 'সর্বহারা' শ্রেণি বিপ্লব ঘটিয়ে পুঁজিপতিদের হটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করবে। অন্যদিকে, সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থায় বলা হয়েছে যে এখানে কোনো সশস্ত্র পথ কিংবা গতানুগতিক আন্দোলনের প্রয়োজন পড়বে না, বরং এমন এক বিকল্প আর্থিক রূপান্তরের ব্যবস্থা তৈরি করা হবে যেখানে সকল নাগরিক সংস্থার লাভ হবে, ফলে কেউ এর বিরোধ করবে না।

 

নেতৃত্ব বনাম সিস্টেম:

মার্কসবাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল এবং পরিচালনার ওপর জোর দিলেও, সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থার মূল দর্শন হলো নেতৃত্ব নয়, বরং সিস্টেমের পরিবর্তন এখানে বলা হয়েছে যে আদর্শবান নেতৃত্ব এলেও সিস্টেমের পরিবর্তন না হলে সমাধান সম্ভব নয়, কারণ ভুল সিস্টেমের ফলাফল সবসময় একই হবে।

 

দুর্নীতি প্রতিরোধ:

সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থায় এমন একটি সিস্টেমের কথা বলা হয়েছে যেখানে সকলের সুখসুবিধা-সুরক্ষা প্রদান, আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি বিকল্প আর্থিক নীতির ফলে কেউ দুর্নীতি করতে পারবে না, এমনকি দুর্নীতি করার প্রয়োজনও পড়বে না। মার্কসীয় অর্থনীতি মূলত পুঁজিবাদের শোষণ উদ্বৃত্ত মূল্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যা শোষণের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে। ULM ব্যবস্থায় আর্থিক নীতিই এমন রয়েছে যেখানে উদ্বৃত্ত মূল্য স্বাভাবিকভাবে সরকার বা সিস্টেমের কাছে চলে যাবে।

 

প্রযুক্তির ব্যবহার:

নতুন ব্যবস্থায় এআই (AI), রোবটিক্স এবং অটোমেশন ব্যবহার করে স্বল্প সময়ে শ্রমে অধিক উৎপাদনের কথা বলা হয়েছে। মার্কসের তত্ত্বে শ্রমই সব মূল্যের উৎস হিসেবে গণ্য করা হয় (শ্রমের মূল্যতত্ত্ব), যেখানে প্রযুক্তির চেয়ে শ্রমিকের শ্রমের গুরুত্ব অধিক আলোচিত হয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এবং ২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী সকল কর্মক্ষম মানুষের কর্মে যোগদানের ফলে সকল কাজের সময়সীমা দিনে মাত্র ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৫ দিন থাকবে।

 

নাগরিক অধিকার সুরক্ষা:

সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থায় প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অধিকার জন্মগতভাবে সিস্টেমের মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকবে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা সর্বদা সাধারণ মানুষের হাতে ন্যস্ত থাকবে। সেখানে জীবন দর্শন, ব্যবহারিক জ্ঞান ও ব্যবস্থাগত পাঠদানের ফলে রুচি ও যোগ্যতা অনুযায়ী সকলে একদিকে যেমন দক্ষ কর্মী হয়ে উঠবে অন্যদিকে কর্মের প্রতি আগ্রহ থাকবে। মার্কসবাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো একটি রাষ্ট্রহীন শ্রেণিহীন সমাজ গঠন করা, যেখানে প্রত্যেকে সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করবে প্রয়োজন অনুযায়ী ভোগ করবে। এ বিষয়ে দুটি ব্যবস্থার মধ্যে দ্বিমত নেই।

 

অতীতের বিফলতা:

ULM প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থা মুনাফাকেন্দ্রিক পুঁজি ব্যবস্থা, মার্কসীয় বিপ্লব কিংবা সমবায় ব্যবস্থা নয়, কারণ এগুলো ইতোমধ্যেই প্রয়োগ হয়েছে এবং বিফল হয়েছে। তিনি একে একটি আধুনিক, উন্নত এবং সম্পূর্ণ নতুন আর্থিক ও রাজনৈতিক নীতির ব্যবস্থা হিসেবে অভিহিত করেছেন।

 

সংক্ষেপে, মার্কসবাদ যেখানে শ্রেণী সংঘাত এবং বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তনের কথা বলে, সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থা সেখানে প্রযুক্তি এবং সিস্টেমের আর্কিটেকচার পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি শোষণমুক্ত দুর্নীতিহীন সমাজ গড়ার কথা বলে।

 

মার্কসীয় দর্শন এবং সম্পূর্ণ জীবন দর্শনের মূল থিয়োরির মিল অমিলগুলো কী কী?

মার্কসীয় দর্শন এবং সম্পূর্ণ জীবন দর্শনের (ULM) মূল থিওরির মিল অমিলগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

 

মৌলিক মিলসমূহ

পরিবেশ সিস্টেমের প্রভাব:

উভয় দর্শনই মনে করে যে মানুষের চিন্তা বা আচরণ মূলত তার চারপাশের পরিবেশ বা সিস্টেম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। মার্কসবাদের মতে, অর্থনৈতিক 'ভিত্তি' (Base) মানুষের চেতনা তৈরি করে। অন্যদিকে, সম্পূর্ণ জীবন দর্শনে বলা হয়েছে যে বাইরের সিস্টেম বা ব্যবস্থা যেমন হবে, মানুষের ভেতরের অবস্থা এবং আচরণও তেমনই হবে।

 

বর্তমান ব্যবস্থার সমালোচনা:

উভয় থিওরিই বিদ্যমান মুনাফাকেন্দ্রিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার শোষণের সমালোচনা করে। মার্কসবাদ যেখানে উদ্বৃত্ত মূল্যের মাধ্যমে শ্রমিক শোষণের কথা বলে, সম্পূর্ণ জীবন দর্শন সেখানে ত্রুটিপূর্ণ অর্থব্যবস্থাকে অপরাধ দুঃখের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে।

 

শোষণমুক্ত সমাজের লক্ষ্য:

উভয় দর্শনেরই চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো এমন একটি সমাজ গঠন করা যেখানে বঞ্চনা থাকবে না এবং প্রতিটি মানুষ তার অধিকার ভোগ করতে পারবে।

 

বিজ্ঞানের প্রতি গুরুত্ব:

মার্কসবাদ নিজেকে একটি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে দাবি করে। একইভাবে, সম্পূর্ণ জীবন দর্শনও প্রযুক্তি, এআই (AI) এবং গবেষণানির্ভর একটি বিজ্ঞানসম্মত সমাজ গড়ার কথা বলে।

 

মৌলিক অমিলসমূহ

 

বস্তু বনাম চেতনা (দার্শনিক ভিত্তি):

মার্কসীয় দর্শনের মূল ভিত্তি হলো দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ, যেখানে বস্তুই প্রধান এবং চেতনা বস্তুর একটি গুণ বা উপজাত (Product) কিন্তু সম্পূর্ণ জীবন দর্শন বা ULM অনুযায়ী, মহাবিশ্বের আদি তত্ত্বে জড় চেতনা উভয়ই সম্মিলিতভাবে বিদ্যমান ছিল; জড় থেকে চেতনা সৃষ্টি হয়নি, বরং উভয়ই সমানভাবে সত্য।

 

পরিবর্তনের পদ্ধতি:

মার্কসবাদ শ্রেণি সংগ্রাম বিপ্লবের মাধ্যমে শোষিত শ্রেণির হাতে ক্ষমতা দখলের কথা বলে। বিপরীতে, সম্পূর্ণ জীবন দর্শন কোনো সশস্ত্র পথ বা আন্দোলনের প্রয়োজন নেই বলে মনে করে; এটি সিস্টেমের আর্কিটেকচার বা গঠন পরিবর্তনের মাধ্যমে এমন এক বিকল্প ব্যবস্থার প্রস্তাব দেয় যেখানে সকলের লাভ হবে, ফলে কেউ এর বিরোধ করবে না।

 

মানবিক আকাঙ্ক্ষার প্রকৃতি:

প্রচলিত মার্কসীয় বা পুঁজিবাদী অর্থনীতি মানুষের অভাবকে অসীম মনে করলেও, সম্পূর্ণ জীবন দর্শন দাবি করে যে মানুষের জীবনকাল ও দৈনিক সীমিত সময়ের নিরিখে  আকাঙ্ক্ষা বা ইচ্ছা অসীম নয়, বরং তা সীমাবদ্ধ এবং পূরণযোগ্য। অসীম মনে করা হয় কারণ একদিকে দার্শনিক সিদ্ধান্তজনিত জ্ঞানের অভাবে অপরদিকে তা ব্যবস্থাগত অসাম্যের ফল।

 

মোক্ষ ধর্মের সংজ্ঞা:

মার্কসবাদ ধর্মকে উপরি-কাঠামো হিসেবে দেখে এবং পরকাল বা আধ্যাত্মিকতাকে অস্বীকার করে। সম্পূর্ণ জীবন দর্শন 'মোক্ষ'-কে একটি ইহজাগতিক আধুনিক রূপ দেয়; এখানে জীবিত অবস্থায় যাবতীয় আকাঙ্ক্ষার নিরন্তর পূর্তি এবং পরম সন্তুষ্টির অবস্থাই হলো মোক্ষ। এই দর্শনে যা কিছু মানুষের মোক্ষ প্রদান করে বা যা ধারণ করলে সামগ্রিক কল্যাণ সম্ভব হয় তা- হলো ধর্ম

 

রাষ্ট্র নেতৃত্বের ভূমিকা:

মার্কসবাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো একটি রাষ্ট্রহীন সমাজ গঠন করা। সম্পূর্ণ জীবন দর্শনের ফোকাস হলো নেতৃত্বের পরিবর্তে সিস্টেমের পরিবর্তন, যেখানে শতভাগ নাগরিকের চাহিদাভিত্তিক উৎপাদন ও বিতরণের নতুন আর্থিক নীতি, মানব সম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্নীতি অভাব দূর করে প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সুরক্ষা জন্মগতভাবে নিশ্চিত করা হবে।

 

সারসংক্ষেপে, মার্কসীয় দর্শন যেখানে শ্রেণি সংঘাত এবং বস্তুবাদের ওপর দাঁড়িয়ে সমাজ পরিবর্তনের কথা বলে, সম্পূর্ণ জীবন দর্শন সেখানে জড় চেতনার সমন্বয় এবং সিস্টেমের প্রযুক্তিগত রূপান্তরের মাধ্যমে একটি নিরন্তর সুখী সমাজ গড়ার থিওরি প্রদান করে।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

ব্যবস্থাগত অসম্পূর্ণতা নাকি নেতৃত্বের ব্যর্থতা?