ভারতে বামপন্থার পাপ


ভারতে বামপন্থার পাপ


পর্ব ১

দেশদ্রোহিতা ও গণহত্যা

ক্ষুধার্ত হিংস্র নেকড়ে ও শকুনের মধ্যে পার্থক্য হলো, শকুন লাশের ওপরে নির্ভরশীল, কিন্তু মৃত লাশ কেবলমাত্র হিন্দুদেরই হতে হবে এরকম শর্ত শকুনরা না রাখলেও পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীরা রেখেছে!
তারা আপাত দৃষ্টিতে গালভরা বক্তব্য রাখলেও তাদের মূল লক্ষ্য কেবল ছলে বলে কৌশলে মসনদ লাভ ও বিদেশের কুকুরকে মাথায় তুলে স্বদেশের ঠাকুরকে পরিত্যাগ করা! হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি এদের প্রবল ঘৃণা ! যাই হোক আমাদের বঙ্গের ইতিহাসে তাদের হায়নার মতন ক্রূর রাজনীতির প্রভাব কি ছিল একটু দেখে নেয়া যাক!
১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে সিপিআই-এর পলিটব্যুরো আনুষ্ঠানিকভাবে "দ্য অল-পিপলস ওয়ার এগেইন্সট ফ্যাসিজম অ্যান্ড আওয়ার পলিসি অ্যান্ড টাস্কস" (The All-People's War Against Fascism and Our Policy and Tasks) শীর্ষক প্রস্তাব গ্রহণ করে । এই নতুন লাইনে যুদ্ধটিকে "জনযুদ্ধ" বা "পিপলস ওয়ার" (People's War) হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ব্রিটিশ সরকারের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় "শর্তহীন ও সর্বাত্মক সমর্থন" দেওয়ার নীতি গ্রহণ করা হয় । এই সময়কালে প্রকাশিত দলীয় পুস্তিকা "ফরওয়ার্ড টু ফ্রিডম" (Forward to Freedom)-এ যুক্তি দেওয়া হয় যে, ফ্যাসিবাদের পরাজয়ই ভারতের জাতীয় স্বাধীনতা অর্জনের পথকে ত্বরান্বিত করবে ।
কমিউনিস্ট পার্টির এই আদর্শিক পটপরিবর্তন কেবল তত্ত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের সাথে একটি সুনির্দিষ্ট এবং গোপন আদান-প্রদানের চুক্তিতে রূপ নিয়েছিল । ১৯৪১ সালের শেষভাগে ভারতের ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র সচিব (Home Member of the Viceroy's Executive Council) স্যার রেজিনাল্ড ম্যাক্সওয়েল একটি বিশেষ রাজনৈতিক চাল চালেন । তিনি গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির (CPGB) সাধারণ সম্পাদক হ্যারী পলিটের (Harry Pollitt) একটি গোপন নির্দেশনামূলক ©debanjanmukherjee চিঠি স্বহস্তে দেউলি ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি ভারতীয় কমিউনিস্ট নেতাদের কাছে পৌঁছে দেন । এই চিঠিতে ব্রিটিশ যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে কোনো রকম বাধা না দিয়ে ভারতের শিল্প উৎপাদন সচল রাখার জন্য ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল ।

১৯৪২ থেকে ১৯৪৪ সালের মধ্যে সিপিআই-এর সাধারণ সম্পাদক পি. সি. জোশী এবং স্যার রেজিনাল্ড ম্যাক্সওয়েলের মধ্যে নিয়মিত গোপন চিঠিপত্র বিনিময় হতো । এই যোগাযোগের ভিত্তিতেই ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে ব্রিটিশ সরকার কমিউনিস্ট পার্টির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে একে আইনি বৈধতা দেয় ।

সিপিআই-এর তৎকালীন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এস. এস. বাতলিওয়ালা (S.S. Batliwala) এই গোপন নথিপত্রগুলোর সত্যতা স্বীকার করে পরবর্তীতে প্রকাশ করেন যে, কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তরের সাথে সরাসরি হাত মিলিয়েছিল । এই অলিখিত চুক্তির শর্তানুযায়ী, কমিউনিস্টরা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধবিরোধী অন্যান্য বামপন্থী সংগঠন, আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবী দল এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সমর্থকদের গতিবিধি সংক্রান্ত গোপন তথ্য ও স্পাইং রিপোর্ট সরাসরি ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের কাছে সরবরাহ করত ।

এর বিনিময়ে ব্রিটিশ সরকার কমিউনিস্টদের প্রচারকার্য চালানোর জন্য বিশেষ অর্থায়ন, কাগজের কোটা এবং আইনি দায়মুক্তি প্রদান করেছিল । যুদ্ধের বাজারে সাধারণ মানুষের কাগজের যখন তীব্র আকাল ছিল, তখন কমিউনিস্টদের মুখপত্র ‘পিপলস ওয়ার’ (People's War) সরকারি সহায়তায় ইংরেজি সহ পাঁচটি প্রধান ভারতীয় ভাষায় এবং অন্য ছয়টি আঞ্চলিক ভাষায় বিপুল সংখ্যায় মুদ্রিত হতে শুরু করে । ১৯৪২ সালের শেষের দিকে এই পত্রিকার প্রচার সংখ্যা রেকর্ড গড়ে ৬৫,০০০ কপিতে পৌঁছায় । বাংলায় এই নীতির অধীনে ‘জনযুদ্ধ’ (Janayuddha) নামক সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হতো, যার সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন বিশিষ্ট কমিউনিস্ট নেতা বঙ্কিম মুখোপাধ্যায় । পরবর্তীতে ১৯৪৫ সালের শেষের দিকে কলকাতায় সোমনাথ লাহিড়ী ও রণেন সেনের তত্ত্বাবধানে ‘স্বাধীনতা’ (Swadhinata) দৈনিক পত্রিকা চালু হয়, যা মূলত যুদ্ধোত্তর পর্বে কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক ও কৃষক আন্দোলনের প্রধান মুখপত্র হিসেবে কাজ করতে থাকে ।

১৯৪২ সালের ৮ আগস্ট নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির বোম্বাই অধিবেশনে মহাত্মা গান্ধী যখন ঐতিহাসিক "ভারত ছাড়ো" (Quit India) আন্দোলনের ডাক দেন, তখন ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগো একে ১৮৫৭ সালের পর সবচেয়ে গুরুতর বিদ্রোহ হিসেবে বর্ণনা করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলকে চিঠি লেখেন । কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করে কারাগারে বন্দি করা হয় । ঠিক এই সন্ধিক্ষণে ব্রিটিশদের সাথে চুক্তিবদ্ধ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এই গণঅভ্যুত্থানকে সরাসরি বয়কট ও তীব্র বিরোধিতা করে ।©debanjanmukherjee তারা প্রচার করে যে, এই বিশৃঙ্খলা ও ধর্মঘট অক্ষশক্তির ফ্যাসিবাদের সহায়ক "পঞ্চম বাহিনী" (Fifth Column) এবং জাপানি আগ্রাসনকারীদের পথ সুগম করছে ।কমিউনিস্ট নিয়ন্ত্রিত অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (AITUC) এই আন্দোলনে ধর্মঘট ডাকতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানায় এবং যুদ্ধের জন্য কয়লা খনি, ইস্পাত কারখানা ও রেল পরিবহনের উৎপাদন সচল রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালায় । শ্রমিকদের যেকোনো অসন্তোষকে ধর্মঘটের পরিবর্তে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলার আইনি চাপ দেওয়া হয় । সমকালীন অত্যন্ত গোপনীয় গোয়েন্দা নথি ‘উইকেনডেন রিপোর্ট’ (Wickenden Report) থেকে জানা যায় যে, কমিউনিস্টদের এই প্রলুব্ধকর প্রোপাগান্ডা এবং "জনযুদ্ধ" নীতিকে ব্রিটিশ প্রশাসন জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধ ভাঙার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল।

সবচেয়ে জঘন্য প্রচারণা চালানো হয়েছিল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং তাঁর গঠিত দল ফরোয়ার্ড ব্লকের (Forward Bloc) বিরুদ্ধে । ‘পিপলস ওয়ার’ পত্রিকার কার্টুন ও সম্পাদকীয়গুলোতে নেতাজিকে "জাপানি সাম্রাজ্যবাদের তল্পিবাহক কুকুর" এবং আজাদ হিন্দ ফৌজকে (INA) লুণ্ঠনকারী ও ধর্ষক বাহিনী হিসেবে চিত্রায়িত করা হয় । ১৯৪২ সালের ২৫ অক্টোবর প্রখ্যাত কমিউনিস্ট তাত্ত্বিক ই. এম. এস. নাম্বুদিরিপাদ তাঁর এক নিবন্ধে ফরোয়ার্ড ব্লকের সদস্যদের সরাসরি "নিয়োজিত দালাল ও বিশ্বাসঘাতক" বলে চিহ্নিত করেন । কমিউনিস্টদের এই চরম জাতীয়তাবাদ-বিরোধী অবস্থানের কারণে তারা ভারতীয় বিপ্লবীদের চোখে স্থায়ীভাবে ব্রিটিশের চর ও স্পাই হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়ে ।

ব্রিটিশের সাথে সহযোগিতা করার পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের একাধিপত্যকে খর্ব করতে এবং যুদ্ধকালীন একটি "জাতীয় সরকার" (National Government) গঠনের লক্ষ্যে কমিউনিস্টরা নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সাথে কৌশলগত মৈত্রী গড়ে তোলে । এই political সমীকরণের অংশ হিসেবে ১৯৪০ সালের মুসলিম লীগের লাহোর প্রস্তাব বা পাকিস্তান দাবিকে কমিউনিস্ট পার্টি তাত্ত্বিকভাবে যৌক্তিকতা প্রদান করে । ১৯৪২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কমিউনিস্ট নেতা ড. গঙ্গাধর অধিকারী পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে "পাকিস্তান অ্যান্ড ন্যাশনাল ইউনিটি" (Pakistan and National Unity) শীর্ষক একটি তাত্ত্বিক প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যা পরবর্তীতে "অধিকারী থিসিস" (Adhikari Thesis) নামে সুখ্যাতি পায় এবং ১৯৪৩ সালের মে মাসে পার্টির প্রথম কংগ্রেসে সর্বসম্মতভাবে অনুমোদিত হয় ।

গঙ্গাধর অধিকারী সোভিয়েত ইউনিয়নের জাতিসত্তা সংক্রান্ত তত্ত্ব (যা জোসেফ স্টালিন রুশ জার সাম্রাজ্যের পরাধীন জাতিগুলোর মুক্তির জন্য প্রণয়ন করেছিলেন) অত্যন্ত যান্ত্রিকভাবে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রয়োগ করেন । এই থিসিস অনুযায়ী, ভারত কোনো একটি অখণ্ড জাতি রাষ্ট্র নয়, এটি বিভিন্ন পৃথক পৃথক জাতিসত্তার সমষ্টি । অধিকারী থিসিসে দাবি করা হয় যে, ভারতের ১৬টি ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চল—যেমন পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পাঠান, বেলুচ এবং বাঙালি—প্রত্যেকেই এক একটি পৃথক "জাতীয়তা" (Nationalities) এবং এদের প্রত্যেকেরই ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজস্ব স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করার "শর্তহীন আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার" রয়েছে ।

সিপিআই-এর তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক পি. সি. জোশী কমিউনিস্ট মুসলিম কর্মীদের গোপনে নির্দেশ দেন যেন তারা তাদের কমিউনিস্ট আদর্শ গোপন রেখে সরাসরি মুসলিম লীগে যোগদান করে লীগের সাংগঠনিক ভিত শক্তিশালী করে তোলে । এই কৌশলের ফলেই তৎকালীন পূর্ব বাংলায় কমিউনিস্টরা মুসলিম লীগের অভ্যন্তরে প্রগতিশীল ও দ্বিজাতিতত্ত্বপন্থী উভয় ধারাকেই পুষ্ট করেছিল, যা প্রকারান্তরে জিন্নাহর পাকিস্তান দাবিকে এক অভূতপূর্ব তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতা প্রদান করে ।

গোপন পত্রাবলী থেকে জানা যায় যে, পলিটব্যুরো ও ইংরেজ সরকারের মধ্যে সম্পাদিত গোপন আঁতাতের শর্ত অনুযায়ী P.C. Joshi তাঁর দলকে ইংরেজ সরকারের সেবায় স্বরাষ্ট্র দপ্তরের অধীনে রাখার বন্দোবস্ত করেন। (“an alliance existed between the Politbureau of the C.P.I. and the Home Deptt. of the Govt of India, by which Mr. Joshi was placing at the disposal of the Govt. of India the services of his party members...”) ©debanjanmukherjee
১৯৪৬ সালের ১৭ মার্চ, Bombay Chronicle-এ প্রকাশিত S. S. Batlivala-র পত্রে জানা যায় যে মিঃ যোশী এক পত্র মারফত ইংরেজ সরকার ও সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরকে গুপ্ত আন্দোলন ও নেতাজীর আজাদ হিন্দ বাহিনীর সদস্যদের পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া সহ সর্বপ্রকার সাহায্য-সহযোগিতার নিঃশর্ত প্রতিশ্রুতি দেন। যোশীর রাজনৈতিক বিশ্লেষণে “ভারত ছাড়ো আন্দোলনকারিগণ”, আজাদ হিন্দ বাহিনীর সমর্থক ও সেনানীবৃন্দ ছিল “বিশ্বাসঘাতক” ও “পঞ্চম বাহিনী”। এই পত্রে আরও প্রকাশ যে, C.P.I. এই সহযোগিতার বিনিময়ে ইংরেজ সরকারের কাছ থেকে পায় প্রচুর অর্থ সাহায্য। কমিউনিস্টদের সঙ্গে মুসলিম লীগেরও ছিল গোপন চুক্তি। (In a letter, published in the Bombay Chronicle on 17 March, 1946, Batlivala added further that Joshi had, as General Secretary of the party, written a letter in which he offered “unconditional help” to the then Government of India and the Army GHQ to fight the 1942 underground workers and the Azad Hind Fauz of Subhash Chandra Bose...These men were Characterised by Joshi in his letter as ‘“traitors” and “fifth columnists.” Joshis’ letter also revealed that the CPI was receiving financial aid from the Government, had a secret pact whith the Muslim League.)
প্রয়াত সাংবাদিক সুখরঞ্জন সেনগুপ্ত (সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত নয়) লিখেছেন, “ইংরেজ শাসকদের অর্থানুকূল্যে প্রকাশিত হতে আরম্ভ করল কমিউনিস্টদের খবরের কাগজ ও প্রচারপত্র ‘People’s War’, ‘জনযুদ্ধ’ ও ‘স্বাধীনতা’ এবং আরো কত কী। এগুলির একমাত্র উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল Quit India অর্থাৎ ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ও ‘৯ আগস্ট বিপ্লব’-এর বিরোধিতা করা। কেবল তাই নয় ... কংগ্রেসের, বিশেষ করে আগস্ট আন্দোলনের বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করে তাদের ধরিয়ে দেওয়াই ছিল ওই বিশ্বাসঘাতকদের প্রধান কাজ। কেবল তাই নয়, বহু কমিউনিস্ট ক্যাডার ‘বিপ্লবী’ সেজে আন্দোলনকারীদের গুপ্ত সংগঠনে ঢুকে গিয়ে প্রকৃত ত্যাগী বিপ্লবীদের পুলিশের হাতে তুলে দেয় এবং মামলার সময় ‘রাজসাক্ষী’ হয়ে যায়। এমন অনেক ঘটনা বাংলা সাহিত্যে লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন সুবোধ ঘোষ, সতীনাথ ভাদুড়ী, মনোজ বসু, তারাশঙ্কর, প্রমথনাথ বিশী, সজনীকান্ত দাস প্রমুখরাও”©debanjanmukherjee
১৯৪০-এর দশকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক দেশভাগের দাবিকে ত্বরান্বিত করতে তারা এক অভূতপূর্ব আপসকামিতার পথ অবলম্বন করেছিল । তৎকালীন কমিউনিস্ট দলিলের অভ্যন্তরে এই আপসকামিতা ও সহযোগিতাকে "শ্রমিক শ্রেণীর ঐক্য" এবং "উপনিবেশ-বিরোধী ফ্রন্ট" হিসেবে চালানোর চেষ্টা করা হলেও, বাস্তবে এটি জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বকে পুষ্ট করার সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিল ।১. মুসলিম লীগে কমিউনিস্ট কর্মীদের অনুপ্রবেশ ও সাংগঠনিক মদদসিপিআই নেতৃত্ব কেবল বাইরে থেকেই পাকিস্তান দাবিকে সমর্থন করেনি, বরং তাদের মুসলিম ক্যাডারদের সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার জন্য মুসলিম লীগে অনুপ্রবেশের প্রকাশ্য নির্দেশ দিয়েছিল । পি. সি. জোশী এই কৌশলের অধীনে কমিউনিস্ট কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন যে, সাম্প্রদায়িক মুসলিম লীগের গণভিত্তিকে বামপন্থী ভাবাদর্শের পক্ষে প্রভাবিত করতে হলে লীগের ভেতরে থেকেই কাজ করতে হবে । এর ফলে পূর্ব বাংলা ও আসামের কিষাণ সভা ও কমিউনিস্ট পার্টির বহু প্রথম সারির নেতা মুসলিম লীগের সদস্যপদ গ্রহণ করেন এবং লীগের অভ্যন্তরীণ প্রগতিশীল অংশটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন । এই সক্রিয় অনুপ্রবেশ লীগের পাকিস্তান আন্দোলনের গণ-উদ্বোধনকে গ্রামীণ স্তরে ত্বরান্বিত করতে প্রভূত সাহায্য করেছিল ।২. ব্রিটিশ ও লীগের দ্বিমুখী সুবিধা গ্রহণ এবং কংগ্রেসের অবদমনঐতিহাসিক অরুণ শৌরি এবং পরবর্তীতে অন্যান্য গবেষকদের দ্বারা উন্মোচিত নথিপত্র অনুসারে, পি. সি. জোশী ও ব্রিটিশ হোম মেম্বার স্যার রেজিনাল্ড ম্যাক্সওয়েলের মধ্যে যে গোপন চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল, তার অন্যতম প্রধান এজেন্ডা ছিল জাতীয় কংগ্রেসকে দুর্বল করা । এই গোপন যোগাযোগের ভিত্তিতে কমিউনিস্টরা একদিকে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের কাছে বিপ্লবী আন্ডারগ্রাউন্ডের তথ্য সরবরাহ করত, অন্যদিকে মুসলিম লীগের সাথে একটি অলিখিত "কৌশলগত ঐক্য" গড়ে তুলেছিল যাতে কংগ্রেসের একচ্ছত্র রাজনৈতিক প্রভাবকে প্রতিরোধ করা যায় । এই দ্বিমুখী রাজনৈতিক সুবিধাবাদের ফলে কমিউনিস্টরা ঔপনিবেশিক সরকার এবং লীগ উভয়ের কাছ থেকেই বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে ।

১৯৪৩ সালের ভয়াবহ মন্বন্তরের সময় বাংলায় খাজা নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল । এই লীগ সরকার ছিল মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের হাতের পুতুল, যারা চার্চিল সরকারের জেনোসাইডাল "নৌকা অপসারণ" ও "ধান-চাল বাজেয়াপ্তকরণ" নীতিকে বাস্তবায়নে প্রত্যক্ষ অংশ নিয়েছিল । এই চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুহূর্তেও কমিউনিস্টরা তাদের "জনযুদ্ধ" এবং ব্রিটিশ-সহযোগিতা নীতির কারণে লীগ সরকারের কুখ্যাত প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে সম্পূর্ণ আড়াল করেছিল ।কমিউনিস্টরা তাদের দলীয় মুখপত্র ‘জনযুদ্ধ’ ও ‘পিপলস ওয়ার’-এ প্রচারণা চালায় যে, এই দুর্ভিক্ষের জন্য কোনো রাষ্ট্রীয় বা লীগ সরকারের নীতি দায়ী নয়, বরং এর একমাত্র কারণ হলো স্থানীয় "Hindu মজুতদার ও চোরাকারবারি"দের ব্যক্তিগত লোভ । এই সাম্প্রদায়িক বয়ান খাজা নাজিমুদ্দিন এবং তাঁর মন্ত্রিসভাকে চরম জনক্ষোভের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয় । লীগ সরকারের ঘনিষ্ট সহযোগী এবং জিন্নাহর বিশ্বস্ত বন্ধু মির্জা আহমদ ইস্পাহানির একচেটিয়া চাল ক্রয়ের দুর্নীতি ও খাদ্য মজুতদারির বিরুদ্ধে কোনো আওয়াজ না তুলে, কমিউনিস্টরা উল্টো হিন্দু মহাসভার ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ত্রাণ তৎপরতা এবং বেঙ্গল রিলিফ কমিটিকে "সাম্প্রদায়িক প্রোপাগান্ডা" হিসেবে চরিত্রহনন করতে থাকে । এটি ছিল লীগ-ব্রিটিশ আঁতাতের পক্ষে কমিউনিস্টদের সবচেয়ে নগ্ন ও ঐতিহাসিক আপসকামিতার জ্বলন্ত প্রমাণ ।দাঙ্গার প্রাক্কালে কলকাতার মুসলিম লীগ সরকারকে প্রচ্ছন্ন সমর্থন ও জ্যোতি বসুর ভূমিকা১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট নিখিল ভারত মুসলিম লীগের "ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে" (Direct Action Day) বা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসকে কেন্দ্র করে কলকাতার বুকে যে কুখ্যাত "গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং" বা ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছিল, তার প্রাক্কালে বাংলার কমিউনিস্টদের এবং বিশেষ করে তাদের বিধানসভার উদীয়মান নেতা জ্যোতি বসুর ভূমিকা চরম বিতর্কের জন্ম দেয়।

১৯৪৬ সালের শেষভাগে নোয়াখালী ও ত্রিপুরার বিস্তীর্ণ এলাকায় গোলাম সারোয়ারের মতো সাম্প্রদায়িক লীগ নেতাদের উসকানিতে যখন বাঙালি হিন্দুদের ওপর ভয়াবহ গণহত্যা, ধর্ষণ ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের নারকীয় তাণ্ডব চলছিল, তখন কমিউনিস্টরা দোদুল্যমান ও অপ্রস্তুত অবস্থায় শান্তিরক্ষার গালভরা স্লোগান দিচ্ছিল। দেশভাগের ঠিক পূর্বে, শরৎচন্দ্র বসু এবং আবুল হাশিম যখন বাংলার ভৌগোলিক বিভক্তি রুখতে একটি "স্বাধীন ও অখণ্ড বাংলা" (United Bengal Scheme) গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন, তখন সিপিআই সম্পূর্ণ অস্পষ্ট ও জনবিচ্ছিন্ন অবস্থান নিয়ে "স্বাধীন ভারতের অভ্যন্তরে একটি সার্বভৌম ও মুক্ত বাংলা"র স্লোগান তোলে । এই মধ্যপন্থা কোনো পক্ষকেই সন্তুষ্ট করতে পারেনি এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালের জুন মাসে বঙ্গীয় আইনসভার ভোটাভুটির মাধ্যমে বাংলার ঐতিহাসিক দেশভাগ ও কোটি মানুষের ভিটেমাটি হারানোর বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে ওঠে ।

মেহনতী মানুষের বিরুদ্ধে পুঁজিপতিদের একটি শ্রেণী সংগঠন (Class organization of the Capitalists working against the fundamental interests of the toiling masses of our country.)’ কমিন্টার্নের এই নির্দেশ অনুযায়ী ১৯৩০-৩৩ সালে দেশব্যাপী প্রবল অসহযোগ আন্দোলনে কমিউনিস্টরা তো যোগদান করেই নি, বরং এই আন্দোলনকে দুর্বল করার জন্য অন্তর্ঘাতের (sabotage) পথ নিয়েছিল। পরে বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রণকৌশল পরিবর্তন করে সদ্যগঠিত কংগ্রেস সোস্যালিস্ট পার্টিতে যোগদান করে। উদ্দেশ্য ছিল Trojan Horse-এর ন্যায় কংগ্রেসকে ভেতর থেকে দুর্বল করা। জয়প্রকাশ নারায়ণ কমিউনিস্টদের দুরভিসন্ধি বুঝতে পেরে ১৯৪০ সালে তাদের বহিষ্কার করেন। এর পর তারা জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত AISF-এ অনুপ্রবেশ করলে সংগঠন দ্বিধা-বিভক্ত হয়। ১৯৪০ সালে হীরেন মুখার্জী ও কে. এম. আসরফের নেতৃত্বে SFI’র সম্মেলন থেকে ঘোষণা করা হয় : আগামী দিনে ভারত হবে পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে (অর্থাৎ কোন অঙ্গরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রে যোগদান না করে স্বাধীন সত্তা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে) স্বেচ্ছায় যোগদানে আগ্রহী অঙ্গরাজ্যগুলি নিয়ে গঠিত একটি যুক্তরাষ্ট্র। সুতরাং “এক অখণ্ড জাতি নয়—ভারত হল বহুজাতিক একটি দেশ,” এ তত্ত্ব কমিউনিস্টরা প্রচার করে। এই প্রচারের আর একটি উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানের পাকিস্তান দাবির স্বীকৃতি। (The conference of the communist students, in Dec-1940, led by Hiren Mukherjee and K.M.Ashraf, ...passed a resolution declaring “that the future India should be a voluntary federation of regional States based on mutual confidence.” Thus instead of a single nation comprising the people of India as a whole, the communists upheld the ideal of India as a multinational State. This resolution was a clear bid to enlist the support of the Muslims by conceding the claim of Pakistan).
একমাত্র কমিউনিস্ট পার্টি মুসলমানের পাকিস্তান দাবিকে সঙ্গত বলে মনে করে; এবং দাবি আদায়ের জন্য কংগ্রেস কমিউনিস্ট-মুসলিম লীগের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আহ্বান জানায়।” (The Communist party is the only party that recognises Muslim's demand for Pakistan as just and calls the league to achieve the fundamental goal of Pakistan through united struggle of the Congress, Muslim League and the communists.)^1
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মুসলমান দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেয়নি। পাকিস্তানী ঐতিহাসিক K.K. Aziz ইতিহাসের এই সাক্ষ্য সমর্থন করেন। স্বদেশের মুক্তি সংগ্রামে অংশ নেয়নি কমিউনিস্টরাও। ইংরেজ সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তারা করেছে অন্তর্ঘাত। কিন্তু কমিউনিস্টরা তাতেও সন্তুষ্ট হতে পারেনি। ভারতকে খণ্ড খণ্ড (Balkanisation) করার জন্য তারা সর্বপ্রকার চেষ্টা করেছে। দেশ ও জাতি দুর্বল না হলে সর্বহারা বিপ্লব যে সফল হয় না। শুধু পাকিস্তান দাবি সমর্থন নয়—এক ধাপ এগিয়ে কমিউনিস্টরা ঘোষণা করে যে “ভারতে প্রত্যেক ভাষাভাষি জনগোষ্ঠী-ই একটি স্বতন্ত্র জাতি। তাদের প্রত্যেকের অধিকার আছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করার; যেমন আছে রাশিয়ায়”। (The communists did not rest satisfied with sabotaging the national movement for freedom. They sought to destroy the unity of India. “Not only did the communists support the demand for Pakistan but went much further by saying that every linguistic group in India had a distinct nationality and was therefore entitled, as they claimed was the case in the U.S.S.R. to the right to secede.
১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট। মুসলিম লিগের ‘পাকিস্তান’ দাবি আদায়ের জন্য শহিদ সুরাবর্দির ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস।’ ওই দিবস উপলক্ষে সুরাবর্দি কংগ্রেস, কমিউনিস্ট পার্টি, নিখিল ভারত সিডিউল কাস্ট ফেডারেশনের নেতাদের নিমন্ত্রণ করেছিলেন মুসলিম লিগের ময়দান সমাবেশে যোগদানের জন্য। আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিল শিডিউল কাস্ট ফেডারেশন ও কমিউনিস্ট পার্টি।
মনুমেন্টের নিচে তাঁর সমাবেশে হাজির করিয়েছিলেন। ওই দু'জনের একজন হলেন যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল এবং অন্যজন জ্যোতি বসু। যোগেন মণ্ডল ‘পাকিস্তান’ দাবির সমর্থনে মঞ্চে আসন গ্রহণ করেছিলেন। জ্যোতি বসু পুলিশ পাহারায় পিছনে দাঁড়িয়েই দেখলেন যে সুরাবর্দির গুণ্ডাবাহিনী চৌরঙ্গির উপরে হিন্দুদের খোলা দোকানগুলি আক্রমণ করে, লুট করে, আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। এই দৃশ্য দেখেই জ্যোতিবাবু কৌশলে পুলিশ পাহারায় বউবাজারে পার্টি অফিসে দ্রুত ফিরে গেলেন।” (বাংলা : ফজলুল হক থেকে জ্যোতি বসু— সুখরঞ্জন সেনগুপ্ত)
“২৫ আগস্ট মুখ্যমন্ত্রী (প্রিমিয়ার) সুরাবর্দি রাইটার্স বিল্ডিংস-এ ‘শান্তি বৈঠক’ ডাকলেন। সুরাবর্দি শান্তি বৈঠকে যোগদানের জন্য ডাকলেন কংগ্রেস নেতা কিরণশঙ্কর রায়, শরৎচন্দ্র বসু, হিন্দু মহাসভা নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং কমিউনিস্ট পার্টির নেতা জ্যোতি বসুকে। খবরের কাগজে এই আমন্ত্রিত লোকদের নাম প্রকাশিত হল। শ্যামাপ্রসাদ সুরাবর্দির কাছে লিখিতভাবে জানতে চাইলেন, জ্যোতি বসু 'শান্তি বৈঠকে' কোন্ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করবেন? হিন্দুর? মুসলমানদের? কিংবা হিন্দু ও মুসলমানের উভয়ের। শ্যামাপ্রসাদ ওই চিঠিতে লিখলেন, কংগ্রেস হিন্দু ও মুসলমানের প্রতিনিধিত্ব করবে। হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব করবেন হিন্দু মহাসভার পক্ষে শ্যামাপ্রসাদ। মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করবেন সুরাবর্দি নিজে। সুতরাং জ্যোতি বসু কার প্রতিনিধিত্ব করবেন? জ্যোতি বসু 'শান্তি বৈঠকে' আমন্ত্রিত হলে শ্যামাপ্রসাদ ওই বৈঠকে যোগ দেবেন না। জ্যোতি বসুর কৌশল টিকল না। সুরাবর্দি জ্যোতি বসুকে পাঠানো চিঠি প্রত্যাহার করে নিলেন”।
এই কারণেই বামপন্থীদের, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ওপরে এত রাগ !
"কমিউনিস্ট দল এবং শরৎ বসুর ফরোয়ার্ড ব্লকও বাংলা ভাগের বিরোধী। তারা স্বাধীন যুক্ত বাংলার নামে প্রকারান্তরে পুরো বাংলাকেই পাকিস্তান বানাতে সওয়াল করে যাচ্ছে। কিন্তু বাংলার হিন্দু জনমত যে তাদের মতামতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছে তা বারোজও স্বীকার না করে পারেননি" -দীনেশচন্দ্র সিংহ .......(চলবে)

পর্ব ২

বাংলায় নকশালবাদের উত্থানঃ প্রজন্মকে পঙ্গু করে দেওয়ার বিল্পব

✅
স্বাধীনতার পরে বামপন্থীদের প্রথম আঘাত ছিল "নকশাল অন্দোলন" ! বাঙালি হিন্দুর কয়েকটি প্রজন্ম ছাড়খার হয়ে গেছিল এই নকশাল আন্দোলনের নেশায় ! শিক্ষিত মেধাবী ছাত্রদের জীবন নিয়ে কি করে ছিনিমিনি খেলতে হয়, একটি সংস্কৃতিমনস্ক জাতি যে মাত্র দুই দশক আগেই ইসলামিক জেনসাইডের হাত থেকে কোনোক্রমে বীর গোপাল মুখার্জীর বীরত্ব ও বুদ্ধির কারণে বেঁচে গেছিল সেই জাতির একটি প্রজন্মকে ছাড়খার করে দিয়েছিল বামপন্থীদের এই আন্দোলন !
✅
নকশালবাড়ি আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে এক রক্তাক্ত, আলোড়িত এবং সুদূরপ্রসারী অধ্যায়। ১৯৬৭ সালে দার্জিলিং জেলার একটি ছোট্ট গ্রামে কৃষকদের জমির অধিকার আদায়ের যে স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রাম শুরু হয়েছিল, তা খুব দ্রুতই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) বা সিপিআই (এম-এল)-এর রূপ নেয়। চারু মজুমদারের নেতৃত্বে এই আন্দোলন একসময় তার মূল কৃষিজীবী গণভিত্তি থেকে সরে গিয়ে শহুরে গুপ্তহত্যা বা ‘খতম লাইনে’ (Annihilation Line) পর্যবসিত হয়।
✅
সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রামাণ্য গ্রন্থ "In the Wake of Naxalbari" (নকশালবাড়ির পরিপ্রেক্ষিতে), সমসাময়িক পুলিশি রিপোর্ট, সংবাদপত্রের (যেমন: আনন্দবাজার, যুগান্তর, দ্য স্টেটসম্যান) প্রতিবেদন এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক দলিলের ভিত্তিতে এই আন্দোলনের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং হত্যাকাণ্ডের বিষদ ইতিহাস নিচে তুলে ধরা হলো।
---
✅
প্রথম পর্ব: যুবসমাজের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর বা ‘মগজধোলাই’
ষাটের দশকের শেষভাগ এবং সত্তরের দশকের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে (প্রেসিডেন্সি কলেজ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ) এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়। রাজ্যের সেরা মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, কেরিয়ার এবং পরিবার ত্যাগ করে সশস্ত্র বিপ্লবের স্বপ্নে ঘর ছাড়ে। চারু মজুমদার কীভাবে এই যুবসমাজকে সহিংস রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, তা বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কৌশল চোখে পড়ে:
✅
শ্রেণীশত্রু নিধন ছিল এই যুদ্ধের প্রথম ও প্রধান ধাপ। মাওয়ের উদ্ধৃতি অনুসরণ করে তিনি বলেন: “Attacks are not for the sake of attacking merely, attacks are for annihilating only.” অর্থাৎ আক্রমণ শুধু আক্রমণের জন্য নয়, শত্রুকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করার জন্য।
কে শ্রেণীশত্রু? (চারু মজুমদারের লেখা অনুসারে)
✅
রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিনিধি: পুলিশ, সামরিক কর্মকর্তা।
ঘৃণ্য আমলাতন্ত্র।
জোতদার, জমিদার, মহাজন (ধনী কৃষক/ভূস্বামী)।
সরকার-সমর্থক ব্যক্তি, দালাল, গুপ্তচর।
শহরে: ব্যবসায়ী, শিক্ষক (কিছু ক্ষেত্রে), বিচারক ইত্যাদি “বুর্জোয়া” প্রতীক।
✅
নিধনের উদ্দেশ্য ছিল:
অস্ত্র সংগ্রহ (পুলিশের রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়া)।
শত্রুর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক ক্ষমতা ধ্বংস।
কৃষকদের মধ্যে বিপ্লবী চেতনা জাগানো এবং “মুক্ত এলাকা” গড়ে তোলা।
✅
সন্ত্রাসের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে দুর্বল করা।
✅
১: সংসদীয় বামপন্থার প্রতি অনাস্থা তৈরি:
সেসময় সিপিআই (CPI) এবং সিপিআই(এম) [CPI(M)] সংসদীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে সরকার গঠন করছিল (যেমন ১৯৬৭ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকার)। চারু মজুমদার তাঁর ঐতিহাসিক আটটি দলিলে এই দলগুলোকে "নয়া-সংশোধনবাদী" এবং "সাম্রাজ্যবাদের দালাল" হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি যুবকদের বোঝাতে সক্ষম হন যে, ভোটের বাক্সে সমাজ বদলায় না; মাও সে তুঙের ভাষায়— "বন্দুকের নল থেকেই রাজনৈতিক ক্ষমতা বেরিয়ে আসে।"
✅
২. গণসংগঠন বাতিল ও গুপ্তহত্যার তত্ত্ব (Theory of Annihilation):
সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর গ্রন্থে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, চারু মজুমদার মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মূল নির্যাস থেকে কতটা সরে গিয়েছিলেন। চিরাচরিত কমিউনিস্টরা যেখানে শ্রমিক ইউনিয়ন বা কৃষক সভার মতো ‘গণসংগঠন’ (Mass Organization) গড়ে তোলার ওপর জোর দেন, চারু মজুমদার সেখানে এই সংগঠনগুলোকে "অর্থনীতিবাদের আখড়া" বলে বাতিল করে দেন। তাঁর মতে, প্রকাশ্যে গণ-আন্দোলন করলে পুলিশের দমননীতি নেমে আসবে। এর বদলে তিনি যুবকদের কয়েকটি ছোট ছোট ‘গোপন স্কোয়াড’ তৈরি করে রাতের অন্ধকারে জোতদার বা শ্রেণিশত্রুদের গুপ্তহত্যা করার নির্দেশ দেন।
✅
৩. রক্ত মাখার রোমান্টিসিজম ও শ্রেণীঘৃণা:
চারু মজুমদার যুবকদের মনে এই ধারণা গেঁথে দেন যে, শ্রেণিশত্রুর প্রতি চরম ঘৃণা ছাড়া সাচ্চা কমিউনিস্ট হওয়া যায় না। তাঁর নির্দেশ ছিল, আগ্নেয়াস্ত্র বা বন্দুক দিয়ে নয়, বরং কৃষকদের প্রাত্যহিক হাতিয়ার— দা, বর্শা, কাস্তে বা টাঙি দিয়ে কুপিয়ে শ্রেণিশত্রুকে হত্যা করতে হবে। এর মনস্তাত্ত্বিক যুক্তি হিসেবে তিনি বলতেন, শ্রেণিশত্রুর রক্তে নিজের হাত না রাঙালে বিপ্লবীর মনে কৃষকের প্রতি একাত্মতা আসবে না। মেধাবী শহুরে যুবকদের কাছে এই ‘রক্তক্ষয়ী আত্মত্যাগ’ এক ধরণের ভয়ঙ্কর রোমান্টিসিজম হিসেবে ধরা দিয়েছিল।
✅
৪ . শিক্ষাব্যবস্থা বর্জনের ডাক:
চারু মজুমদার ঘোষণা করেন, "যত পড়বে, তত মূর্খ হবে।" বুর্জোয়া শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে কেরানি ও সাম্রাজ্যবাদের দাস তৈরি করে— এই যুক্তিতে তিনি ছাত্রদের স্কুল-কলেজ ও পরীক্ষা বয়কটের ডাক দেন। হাজার হাজার ছাত্র নিজেদের শিক্ষাজীবন ধ্বংস করে ‘লাল এলাকা’ (Red Base) গড়ার স্বপ্নে গ্রামে চলে যায় অথবা শহরের রাস্তায় পুলিশের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধে লিপ্ত হয়।
✅
দ্বিতীয় পর্ব: নকশালদের ‘খতম লাইন’ এবং হত্যার শিকার কারা?
১৯৬৯ সালে সিপিআই (এম-এল) গঠিত হওয়ার পর আন্দোলন পুরোপুরি খতম লাইনে প্রবেশ করে। সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের গবেষণা এবং সমসাময়িক পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী, নকশালরা মূলত পাঁচটি শ্রেণিকে তাদের ‘শ্রেণিশত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে হত্যা করেছিল:
✅
১. জোতদার, জমিদার ও গ্রামীণ মহাজন
নকশাল আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে (১৯৬৭-১৯৬৯) খতম অভিযান সীমাবদ্ধ ছিল গ্রামাঞ্চলে। মেদিনীপুরের ডেবরা, গোপীবল্লভপুর, বীরভূম এবং উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এই হত্যাযজ্ঞ চলে।
✅
কারা নিহত হন: গ্রামের বড় জমির মালিক :
প্রেক্ষাপট: সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে দরিদ্র ভূমিহীন কৃষকরা এই হত্যাযজ্ঞে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছিল। কারণ, বছরের পর বছর ধরে চলা অবর্ণনীয় শোষণের প্রতিশোধ নেওয়ার এটিই তাদের কাছে একমাত্র পথ বলে মনে হয়েছিল।
✅
ধীরে ধীরে যখন মাঝারি ও ছোট কৃষকদেরও 'শ্রেণিশত্রু' আখ্যা দিয়ে হত্যা করা শুরু হয়, তখন সাধারণ কৃষকরা আন্দোলন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করে।
✅
২. পুলিশ বাহিনী, ট্রাফিক কনস্টেবল ও গোয়েন্দা আধিকারিক
১৯৭০ সালের দিকে আন্দোলন গ্রাম থেকে কলকাতার বুকে আছড়ে পড়ে (যাকে Urban Guerrilla Warfare বলা হতো)। শহরে নকশালদের প্রধান শিকারে পরিণত হয় পুলিশ।
✅
কারা নিহত হন: রাস্তার মোড়ে ডিউটিরত নিরস্ত্র ট্রাফিক পুলিশ, সাধারণ কনস্টেবল, থানার নিচুতলার কর্মী এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চের (SB) অফিসাররা।
✅
হত্যার কারণ ও কৌশল: চারু মজুমদারের নির্দেশ ছিল, রাষ্ট্রযন্ত্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে হলে পুলিশের মনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করতে হবে। নকশাল যুবকরা অতর্কিতে (Ambush) পেছন থেকে পুলিশকে ছুরিকাঘাত করত বা বোমা ছুড়ত এবং তাদের কাছে থাকা রাইফেল ছিনতাই করে পালাত।
✅
পরিসংখ্যান: ক্যালকাটা পুলিশ গেজেট* এবং সমসাময়িক *দ্য স্টেটসম্যান* পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭০ সালের গ্রীষ্মকাল থেকে কলকাতার রাস্তায় প্রায় প্রতিদিন পুলিশ খুনের ঘটনা ঘটতে থাকে। ১৯৭০ সালের অক্টোবর মাসের মধ্যেই কলকাতা ও শহরতলিতে প্রায় ৩৫ জনের বেশি পুলিশ নিহত এবং শত শত পুলিশ আহত হন। এই গুপ্তহত্যার ফলে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও প্রতিশোধস্পৃহা তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের রূপ নেয়।
✅
৩. শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী
যেহেতু নকশালরা প্রচলিত শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে বুর্জোয়াদের হাতিয়ার মনে করত, তাই তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভয়াবহ আক্রমণ শানায়।
✅
কারা নিহত হন: স্কুল ও কলেজের শিক্ষক, প্রধানশিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসকরা।
✅
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হত্যা: এই পর্বের সবচেয়ে মর্মান্তিক এবং আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনাটি ঘটে ১৯৭০ সালের ৩০ ডিসেম্বর। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য, অত্যন্ত সজ্জন ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব **ড. গোপাল চন্দ্র সেন**-কে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরেই নকশাল যুবকরা কুপিয়ে হত্যা করে।
✅
সাংস্কৃতিক ধ্বংসলীলা:** এর পাশাপাশি চলে মূর্তি ভাঙার হিড়িক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি কলেজ, হেয়ার স্কুলসহ বিভিন্ন স্থানে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ এবং মহাত্মা গান্ধীর মূর্তি ভেঙে ফেলা হয় এবং বই পুড়িয়ে দেওয়া হয়। নকশালদের চোখে এরা ছিলেন 'কমপ্রাডোর বুর্জোয়া' বা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দালাল।
✅
৪. রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ (সিপিআইএম, ফরোয়ার্ড ব্লক, কংগ্রেস কর্মী)
নকশালদের হাতে সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারিয়েছিলেন তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা। চারু মজুমদার অন্যান্য বামপন্থী দলগুলোকে "সংশোধনবাদী" আখ্যা দিয়ে তাদের খতম করাকে বিপ্লবের অঙ্গ বলে ঘোষণা করেন।
✅
সিপিআই(এম) বনাম নকশাল যুদ্ধ: সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মার্কাস ফ্রান্ডা উভয়েই দেখিয়েছেন কীভাবে কলকাতার বেলেঘাটা, বরানগর, কাশীপুর, যাদবপুর এবং টালিগঞ্জ এলাকায় সিপিআই(এম) এবং নকশালদের মধ্যে রক্তাক্ত ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষ চলে। নকশালরা সিপিআই(এম)-এর ট্রেড ইউনিয়ন নেতা এবং নিচুতলার কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। জবাবে সিপিআই(এম) কর্মীরাও পালটা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই বামে-বামে লড়াইয়ে শত শত তরুণ প্রাণ হারায়।
✅
হেমন্ত কুমার বসু হত্যাকাণ্ড: ১৯৭১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি এক রোমহর্ষক ঘটনায় প্রবীণ স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং ফরোয়ার্ড ব্লকের অবিসংবাদিত নেতা হেমন্ত কুমার বসুকে কলকাতার শ্যামপুকুর এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। যদিও এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রকৃত ষড়যন্ত্রকারী নিয়ে পরে কংগ্রেস ও নকশালদের মধ্যে দোষারোপের পালা চলে, তবে সেই সময়কার উত্তাল রাজনৈতিক আবহে এটি নকশালদেরই কাজ বলে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।
✅
ছাত্র পরিষদ ও কংগ্রেস কর্মী: ১৯৭১ সালে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের নেতৃত্বে কংগ্রেস যখন শক্তিশালী হচ্ছে, তখন কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন 'ছাত্র পরিষদ'-এর কর্মীদের সঙ্গে নকশালদের পাড়ায় পাড়ায় এলাকা দখলের লড়াই শুরু হয়। এতে উভয় পক্ষেরই বহু তরুণ গ্যাং-ওয়ারের শিকার হয়।
✅
৫. ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ এবং পুলিশের 'চর'
নকশালদের গোপন স্কোয়াডের কাজের একটি অন্ধকার দিক ছিল সাধারণ মানুষের ওপর নেমে আসা সন্ত্রাস।
✅
কারা নিহত হন: ছোট দোকানদার, পাড়ার সাধারণ মানুষ, চায়ের দোকানের আড্ডাধারী।
✅
প্রেক্ষাপট:** নকশাল স্কোয়াডগুলো পাড়ার মধ্যে অত্যন্ত গোপনে কাজ করত। কেউ যদি তাদের গতিবিধি নিয়ে প্রশ্ন করত বা পুলিশের সাথে কথা বলত, তবে তাকে বিনা বিচারে 'পুলিশের চর' বা 'ইনফর্মার' আখ্যা দিয়ে রাতের অন্ধকারে গলা কেটে হত্যা করা হতো। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নকশালদের প্রতি সমর্থন দ্রুত উবে গিয়ে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।
---
✅
তৃতীয় পর্ব: সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রন্থের আলোকে আন্দোলনের অবক্ষয়
সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের "In the Wake of Naxalbari" বইটি শুধু ঘটনার বিবরণ নয়, বরং কেন এই আন্দোলন ব্যর্থ হলো তার একটি গভীর সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। তিনি কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকের ওপর আলোকপাত করেছেন:
✅
১. লুম্পেন প্রলেতারিয়েত (Lumpenproletariat) বা সমাজবিরোধীদের অনুপ্রবেশ:
সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় খুব স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, ১৯৭১ সালের দিকে নকশাল আন্দোলনে এক বিশাল গুণগত অবক্ষয় ঘটে। প্রথম দিকের মেধাবী, আদর্শবান ছাত্ররা যখন পুলিশের গুলিতে নিহত বা জেলে বন্দি হতে শুরু করে, তখন আন্দোলনে সুযোগসন্ধানী এবং সমাজবিরোধী উপাদানের (যাদের মার্কসীয় পরিভাষায় লুম্পেন বলা হয়) অনুপ্রবেশ ঘটে। এই সমাজবিরোধীরা 'নকশাল' তকমা লাগিয়ে পাড়ায় পাড়ায় তোলাবাজি, ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটানো এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে খুন করার লাইসেন্স পেয়ে যায়। এর ফলে আন্দোলন তার রাজনৈতিক চরিত্র হারিয়ে সম্পূর্ণ মাফিয়া-রাজ বা গ্যাং-ওয়ারে পরিণত হয়।
© দেবাঞ্জনমুখার্জী
✅
২. শ্রমিক শ্রেণির বিচ্ছিন্নতা:
মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মূল ভিত্তি হলো শহুরে শিল্পশ্রমিকদের (Industrial Working Class) সংগঠিত করা। কিন্তু চারু মজুমদার শ্রমিকদের রাজনৈতিক ধর্মঘট বা ট্রেড ইউনিয়ন করাকে নিষিদ্ধ করেন। ফলে কলকাতার মতো বিশাল শিল্পাঞ্চলে নকশালরা কখনোই শ্রমিক শ্রেণির সমর্থন পায়নি। আন্দোলনটি মূলত রোমান্টিক ছাত্র এবং পরবর্তীতে সমাজবিরোধীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
✅
৩. হঠকারী সিদ্ধান্ত এবং নেতৃত্বের ব্যর্থতা:
সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় সমালোচনা করেছেন যে, চারু মজুমদার মাও সে তুঙের তত্ত্বকে ভারতের প্রেক্ষাপটে যান্ত্রিকভাবে (Mechanically) প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন। চীনের ভৌগোলিক বিশালতা এবং ১৯৩০-এর দশকের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে ১৯৭০ সালের পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতির কোনো মিল ছিল না। ভারতের শক্তিশালী রাষ্ট্রযন্ত্র এবং সুসংগঠিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মুষ্টিমেয় কিছু ছাত্রের বর্শা বা পাইপগান নিয়ে লড়াই করাটা ছিল আক্ষরিক অর্থেই আত্মঘাতী।
চতুর্থ পর্ব: রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও পালটা গণহত্যা !
✅
শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের ডাক
চারু মজুমদার মাও সে তুঙের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ধারণাকে ভারতের প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করেন। তিনি ছাত্রদের স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও পরীক্ষা বয়কটের ডাক দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, বুর্জোয়া শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে কেরানি বানায়। এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রেসিডেন্সি, যাদবপুর, শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের হাজার হাজার মেধাবী ছাত্র তাদের উজ্জ্বল কেরিয়ার ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছেড়ে দেওয়ার ফলে এই যুবকরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং সরাসরি পুলিশের টার্গেটে পরিণত হয়।
✅
গণসংগঠন বর্জন ও জনবিচ্ছিন্নতার ট্র্যাজেডি
ছাত্ররা যখন বিপ্লবের নেশায় পাগল, তখন চারু মজুমদার নির্দেশ দিলেন কোনো প্রকাশ্য ছাত্র ইউনিয়ন বা গণসংগঠন করা যাবে না। সব কাজ হবে গোপন স্কোয়াডের মাধ্যমে।
এর ফল হলো মারাত্মক। আগে যখন ছাত্ররা মিছিল বা ধর্মঘট করত, তখন সাধারণ মানুষের একটি সমর্থন বা কভার (Public Cover) তাদের পেছনে থাকত। কিন্তু যখন তাদের কয়েকজনের ছোট ছোট গোপন ‘অ্যাকশন স্কোয়াড’-এ ভাগ করে দেওয়া হলো এবং পুলিশ বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে খুন করার নির্দেশ দেওয়া হলো, তখন তারা সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে চলে গেল। জনবিচ্ছিন্ন এই ছাত্ররা পুলিশের কাছে অত্যন্ত সহজ শিকারে (Sitting Ducks) পরিণত হলো।
✅
হত্যার রোমান্টিসিজম ও মনস্তাত্ত্বিক মগজধোলাই
নকশাল নেতৃত্ব তরুণদের মগজে এই বিষাক্ত ধারণা ঢুকিয়ে দেয় যে— "যে যুবকের হাত শ্রেণি শত্রুর রক্তে লাল নয়, সে সাচ্চা কমিউনিস্ট নয়।"
যে ছেলেটি হয়তো কয়েকদিন আগে কলেজে বসে রবীন্দ্রনাথ বা শেকসপিয়র পড়ত, তাকে নির্দেশ দেওয়া হলো পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাফিক পুলিশ বা স্কুলের মাস্টারমশাইয়ের গলা কেটে আসতে। এই ভয়ঙ্কর ‘ব্লাড-স্পোর্ট’-কে বিপ্লবের সর্বোচ্চ ত্যাগ হিসেবে মহিমান্বিত করা হলো। তরুণদের বলা হয়েছিল, "আত্মত্যাগে ভীত হয়ো না।" এই রোমান্টিসিজমের ফাঁদে পড়ে হাজার হাজার তরুণ এমন এক অন্ধকারের পথে পা বাড়াল, যেখান থেকে ফেরার কোনো পথ ছিল না।
নকশালদের 'খতম লাইন'-এর সুযোগ নিয়ে ভারত সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার যে অমানবিক এবং নিষ্ঠুর দমনপীড়ন চালিয়েছিল, তা স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের কংগ্রেস সরকার পুলিশ এবং আধাসামরিক বাহিনীকে (CRPF) নকশাল দমনের নামে "ফ্রি হ্যান্ড" বা অবাধ ক্ষমতা দেয়।
✅
এনকাউন্টার (Encounter) বা ভুয়ো সংঘর্ষ:** পুলিশ শত শত নকশাল যুবককে রাস্তা থেকে বা বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্জন জায়গায় বা গঙ্গার ধারে গুলি করে হত্যা করে এবং পরের দিন সংবাদপত্রে বিবৃতি দেয় যে "পুলিশের হাত থেকে পালাতে গিয়ে সংঘর্ষে নিহত।"
✅
বারাসাত ও ডায়মন্ড হারবার হত্যাকাণ্ড:১৯৭০ সালের শেষের দিকে বারাসাত ও ডায়মন্ড হারবারের কাছে হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় একাধিক নকশাল যুবকের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ উদ্ধার হয়। এটি ছিল পুলিশের গোপন ঘাতক বাহিনীর (Death Squad) কাজ।
✅
কাশীপুর-বরানগর গণহত্যা (আগস্ট ১৯৭১): এটি ছিল সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনা। ১৯৭১ সালের ১২ ও ১৩ আগস্ট কংগ্রেসের মদতপুষ্ট দুষ্কৃতীরা এবং নকশাল-বিরোধী জোট পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে কাশীপুর ও বরানগর এলাকায় টানা ৪৮ ঘণ্টা ধরে তাণ্ডব চালায়। পাড়া ঘিরে ফেলে বাড়ি বাড়ি থেকে নকশাল সন্দেহে কিশোর ও যুবকদের টেনে বের করে কুপিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করে গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ১০০-এর কাছাকাছি হলেও, বেসরকারি মতে তা ছিল অনেক বেশি।
✅
জেলে হত্যাকাণ্ড:** আলিপুর সেন্ট্রাল জেল, প্রেসিডেন্সি জেল এবং মেদিনীপুর জেলে বন্দি নকশালদের ওপর রক্ষীরা নির্মম লাঠিচার্জ ও গুলি চালায়। জেল পালানোর চেষ্টার অজুহাতে বহু বন্দিকে জেলের ভেতরেই পিটিয়ে মারা হয়।
✅
এই চরমপন্থী লাইনের সবচেয়ে মর্মান্তিক পরিণতি হলো, পশ্চিমবঙ্গের একটি আস্ত প্রজন্মের উজ্জ্বলতম মেধাগুলো হয় পুলিশের এনকাউন্টারে প্রাণ হারাল, নয়তো জেলের অন্ধকারে পচে মরল।
✅✅
শহুরে সন্ত্রাস ও কলকাতায় হত্যার উত্থান (১৯৬৯-১৯৭২)
১৯৬৯-৭০ সাল থেকে আন্দোলন কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়। প্রেসিডেন্সি কলেজ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যোগ দেন। চারু মজুমদারের নির্দেশে “শ্রেণীশত্রু নিধন” চরমে ওঠে। ট্রাফিক পুলিশ, শিক্ষক, বিচারপতি, রাজনীতিবিদদের হত্যা করা হয়।
১৯৭০ সালে কলকাতায় দিনে ৪-৫টি হত্যার খবর পাওয়া যেত।
উল্লেখযোগ্য হত্যাকাণ্ড:
১৯৭০ সালের ডিসেম্বর ৩০: প্রফেসর গোপাল চন্দ্র সেন (যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্বর্তী উপাচার্য)। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির কাছে লোহার রড ও ছুরি দিয়ে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তিনি নকশালপন্থী ছাত্রদের পরীক্ষা বয়কটের বিরোধিতা করেছিলেন। পুলিশ রানা বসু (ডা. অমিয় বসুর ছেলে) সহ ছাত্রদের সন্দেহ করে।
দ্য স্টেটসম্যান, অমৃতবাজার পত্রিকা প্রভৃতি পত্রিকায় ব্যাপক প্রচারিত হয়।
১৯৭১ সালের ২০/২১ ফেব্রুয়ারি: হেমন্ত কুমার বসু (অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লকের জাতীয় সম্পাদক)। শ্যামপুকুর স্ট্রিটে কুপিয়ে হত্যা করা হয় নির্বাচনের আগে। নকশালবাদীদের দ্বারা হত্যার দায় সবচেয়ে বেশি চাপানো হয়। এটি নির্বাচনী সন্ত্রাস বাড়িয়ে দেয়।
বিচারপতি কে.এল. রায় (কলকাতা হাইকোর্ট): বিচারব্যবস্থার প্রতীক হিসেবে হত্যা করা হয়। কিছু সূত্রে মুক্তিপণ অস্বীকারের কথা বলা হয়।
রঞ্জিত কুমার রায় (পুলিশ কনস্টেবল): ডাক্তার্স লেন, টালতলা এলাকায় হত্যা—শহুরে পুলিশ হত্যার প্রথম দিকের ঘটনা।
প্রেম চাঁদ রবিদাস (ট্রাফিক কনস্টেবল): ১৯৭৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি হত্যা; রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
নকশালবাড়ি আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গের বুকে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল। একটি রাজ্যের শ্রেষ্ঠ মেধা— যাঁরা হতে পারতেন আগামী দিনের শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক বা সমাজসেবক— তাঁরা পুলিশের গুলিতে, জেলের পচাগলা কুঠুরিতে অথবা প্রতিপক্ষের ছুরির আঘাতে হারিয়ে গেলেন। যাঁরা বেঁচে ফিরলেন, তাঁদের অনেকেই ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে (PTSD) বাকি জীবনটা ট্রমার মধ্যে কাটালেন।
নকশাল নেতৃত্ব সেদিন তরুণ প্রজন্মের বুক-ভরা আবেগ, সততা ও আত্মত্যাগের মানসিকতাকে বিপ্লবের নামে এক আত্মঘাতী এবং হঠকারী পথে চালিত করেছিল। একটি শোষণহীন সুন্দর সমাজের স্বপ্ন দেখিয়ে, বাংলার সবচেয়ে প্রতিভাবান একটি প্রজন্মকে তাঁরা হিংসা, গুপ্তহত্যা এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এক ভয়াল যজ্ঞে নির্মমভাবে বলি দিয়েছিলেন। ইতিহাসের পাতায় এটি কেবল একটি রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি প্রজন্মের স্বপ্নের মর্মান্তিক অপমৃত্যু হিসেবেই চিরকাল লেখা থাকবে। মজার ব্যাপার চারু মজুমদারের সহযোদ্ধা কানু সান্যাল পরে বুঝতে পেরেছিলেন যে চারু মজুমদারের এই ‘খতম লাইন’ বা ব্যক্তিহত্যার রাজনীতি আসলে মার্কসবাদ নয়, বরং এক ধরনের হঠকারী সন্ত্রাসবাদ (Individual Terrorism)। তবুও আজকের দিনেও এই নকশালবাড়ি টেরর কে বিপ্লবের নাম বিক্রি করা হয় ! (চলবে...)


পর্ব ৩

নকশালরা বিপ্লবী নাকি সাইকোপ্যাথ? বিপ্লব নাকি গণহত্যা?

💀
বামপন্থী যখনই কোনো বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করেছে বা ক্ষমতায় এসেছে তখনি সে গণহত্যা ছাড়া আর কিছুই সমাজকে দিতে পারেনি ! আশ্চর্য লাগে আজকের দিনেও বামপন্থী বা কমিউনিস্টরা এই নক্সাল বিপ্লব কে বা ৭০ এর দশক নিয়ে এক রোমান্টিসিজমে ভুগে থাকে ! কিন্তু এই নক্সাল এর পরিনাম যে কেবলমাত্র নিজের দেশের সাধারণ মানুষদের রক্ত ঝরিয়েই শান্ত থাকেনি স্বাভাবিক ভাবে এর প্রতিরোধ এসেছিল সেই বামপন্থীদেরই মৃত্যুবাণ হিসেবে ! এক একটি প্রজন্ম শুধু হিংসার রাজনীতি করে শেষ হয়ে গেছিল ! সেসব কিছুর জন্য একমাত্র বামপন্থী ছাড়া কাদের কে দায়ী করবেন ? সেই সময় বিধবা মায়ের একমাত্র সন্তান পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর প্রদীপ ভট্টাচার্য কে নির্মম ভাবে নক্সাল বামপন্থী মেয়েরা যেভাবে হত্যা করেছিল সেটির বর্ণনা ও সেরকম বহু বর্ণনা রুনু গুহ নিয়োগী দিয়েছেন তার বইতে কিন্তু সেই বর্ণনা লেখার মতন সাহস আমার হয়নি ! কারণ সাইকোপ্যাথ নক্সালরা অবলীলাক্রমে যে নরসংহার চালিয়েছিল সেই বর্ণনা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে পড়া সম্ভব নয় !
পশ্চিমবঙ্গে নকশাল আন্দোলনের এই চরম হিংসাত্মক রূপান্তরের পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি ছিল চারু মজুমদারের উগ্র তাত্ত্বিক দর্শন এবং তাঁর কুখ্যাত 'খতম লাইন' (Annihilation Line)। এই প্রবন্ধে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব পশ্চিমবঙ্গে নকশালদের দ্বারা সংঘটিত বিভিন্ন হিংসাত্মক ঘটনাবলী, সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী থেকে শুরু করে শিক্ষাবিদ ও ব্যবসায়ীদের নির্মম হত্যা, এবং চারু মজুমদার সহ অন্যান্য নেতারা কীভাবে এক প্রজন্মের তরুণদের মগজধোলাই করে এই ভয়াল হিংসার পথে প্ররোচিত করেছিলেনউঠেছিল।
💀
১. চারু মজুমদারের তাত্ত্বিক দর্শন ও মনস্তাত্ত্বিক প্ররোচনা
নকশাল আন্দোলনের হিংসাত্মক রূপের মূল স্থপতি ছিলেন চারু মজুমদার । তাঁর রচিত আটটি ঐতিহাসিক দলিল এবং চিঠিপত্রের মাধ্যমে তিনি বাঙালি যুবকদের মনে চরমপন্থী মতাদর্শের বীজ বপন করেছিলেন ।
💀
শ্রেণীঘৃণা ও রক্তপাতের মহিমা:** চারু মজুমদার তরুণদের মনে এই ধারণা গেঁথে দিয়েছিলেন যে, শত্রুর প্রতি অন্ধ ও তীব্র ঘৃণা ছাড়া বিপ্লব সম্ভব নয় । তাঁর মারাত্মক প্ররোচনাটি ছিল, "যে কমিউনিস্ট তার হাত শ্রেণীশত্রুর রক্তে লাল করেনি, সে সাচ্চা কমিউনিস্ট নয়" । এই তত্ত্ব তরুণদের চিন্তাধারাকে বিকৃত করে দিয়েছিল ।
💀
খতম লাইন' ও হত্যার রোমান্টিসিজম:** তিনি যুবকদের শুধু আঘাত করার নয়, সরাসরি 'খতম' (Annihilation) করার নির্দেশ দেন । তাঁর মতে, আঘাত করলে পুলিশ প্রতিশোধ নেবে, কিন্তু হত্যা করলে রাষ্ট্রযন্ত্র আতঙ্কিত হবে । নকশাল যুবকদের মধ্যে খুন করার একটি অলিখিত 'কোটা' স্থির করে দেওয়া হতো । খুন করতে না পারার গ্লানি কাটাতে এবং নিজেদের হিংস্রতার প্রমাণ দিতে যুবকরা অবলীলায় রাস্তার কুকুরকে পর্যন্ত কুপিয়ে হত্যা করত ।
💀
শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের ডাক:** বুর্জোয়া শিক্ষাব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদের দাস তৈরি করে— এই যুক্তিতে তিনি ছাত্রদের স্কুল-কলেজ বর্জনের ডাক দেন । তাঁর ঘোষণা ছিল, "যত পড়বে, তত মূর্খ হবে" ।
💀
গণ-আন্দোলন বর্জন:** চিরাচরিত কমিউনিস্ট তত্ত্বে শ্রমিক ও কৃষকের গণ-আন্দোলনের ওপর জোর দেওয়া হলেও, চারু মজুমদার তা বর্জন করে কেবল গোপন স্কোয়াড বা 'অ্যাকশন স্কোয়াড' গঠনের নির্দেশ দেন ।
💀
২. কানু সান্যালের ভূমিকা এবং আদর্শগত সংঘাত
চারু মজুমদার যদি আন্দোলনের 'মস্তিষ্ক' হন, তবে কানু সান্যাল ছিলেন এর মাঠপর্যায়ের সংগঠক । ১৯৬৭ সালের মে মাসে নকশালবাড়িতে সশস্ত্র কৃষক অভ্যুত্থানের বাস্তব রূপকার ছিলেন কানু সান্যাল ।১৯৬৯ সালের ১ মে কলকাতার শহিদ মিনার ময়দানে তিনিই আনুষ্ঠানিকভাবে সিপিআই (এম-এল) গঠনের কথা ঘোষণা করেন 。১৯৬৮ সালের সেপ্টেম্বরে কানু সান্যাল "তরাই-এর কৃষক আন্দোলন সম্পর্কে রিপোর্ট" প্রকাশ করে গণসংগঠন ও গণ-আন্দোলনের পক্ষে সওয়াল করেন, যার তীব্র বিরোধিতা করেন চারু মজুমদার ।
পরবর্তীতে কানু সান্যাল বুঝতে পেরেছিলেন যে চারু মজুমদারের 'খতম লাইন' সন্ত্রাসবাদ 。 দীর্ঘ জেল খাটার পর এবং আজীবন লড়াইয়ের শেষে ২০১০ সালে তিনি আত্মঘাতী হন ।
💀
৩. পশ্চিমবঙ্গে সংঘটিত ভয়াবহ হিংসাত্মক ঘটনাবলী (১৯৬৭-১৯৭২)
আন্দোলনের প্রথম দিকে গ্রামাঞ্চলে জমিদার ও জোতদারদের ওপর আক্রমণ শুরু হলেও, ১৯৭০ সালের দিকে তা কলকাতার বুকে আছড়ে পড়ে । চারু মজুমদারের নির্দেশে আগ্নেয়াস্ত্রের বদলে দা, কাস্তে, বর্শা ও লাঠি দিয়ে কুপিয়ে মানুষ হত্যা করা হতো ।
💀
হত্যার পরিসংখ্যান:** শুধুমাত্র কলকাতাতেই ১৯৭০ সালে ১৭ জন পুলিশকর্মীসহ ৪৪ জনকে এবং ১৯৭১ সালে ১৬ জন পুলিশ ও ৩৪ জন সিপিআইএম কর্মীসহ ১১০ জনকে হত্যা করা হয় । ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ছিল কলকাতায় ২৮৭ জন, বীরভূমে ১৫১ জন, এবং ২৪ পরগনায় ১৪৭ জন ।
💀
৩.১ গ্রামীণ হিংসা ও পুলিশের ওপর হামলা (১৯৬৭)
💀
১২ এপ্রিল:** মণিরাম অঞ্চল পরিষদে ২০০ জন সশস্ত্র ব্যক্তি হামলা চালিয়ে অঞ্চল প্রধানকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে ।
💀
২৪ মে:** বড়ঝাড়ুজোত গ্রামে একটি পুলিশ দলকে ৩০০ জনের জনতা ঘিরে ফেলে। মহিলাদের ঢাল হিসেবে সামনে রেখে পুরুষরা তীর ছুড়ে ইন্সপেক্টর সোনম ওয়াংদিকে হত্যা করে ।
💀
২৫ মে:** প্রসাদজোতে পুলিশের ওপর পুনরায় মহিলাদের সামনে রেখে সশস্ত্র আক্রমণ হলে পুলিশ গুলি চালায়, যাতে ১০ জন নিহত হয় ।
💀
জুন মাস:** গোয়াবাড়িতে ধান লুট হয় এবং খড়িবাড়িতে হরিহর সিংয়ের বাড়িতে লুটপাট ও নাজিরজোতের নগেন রায় চৌধুরীকে মুণ্ডুহীন অবস্থায় হত্যা করা হয় ।
💀
৩.২ শহুরে সন্ত্রাস, টার্গেট কিলিং এবং পুলিশ হত্যা
রাষ্ট্রযন্ত্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে নকশালরা পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা ও অস্ত্র ছিনতাই শুরু করে ।
💀
লিশ হত্যা:** ১৯৭০ সালের ৩ জুন স্পেশাল ব্রাঞ্চের সাব-ইন্সপেক্টর অমিতাভ সিংহ রায়কে নিশীথ ভট্টাচার্যের স্কোয়াড হত্যা করে । ১৯৭১ সালের ২৭ জুলাই প্রবীণ পুলিশ আধিকারিক গোরাচাঁদ সান্যালকে নির্মমভাবে হত্যা করে তার মুণ্ডুচ্ছেদ করা হয় এবং তার রক্ত দিয়ে এক তরুণী নকশাল নিজের কপালে তিলক আঁকে । এছাড়া সাব-ইন্সপেক্টর নির্মল চক্রবর্তী, সিপাহী বীরেন চ্যাটার্জী, মুক্তিপ্রসাদ দে, হোমগার্ড প্রদীপ চক্রবর্তী প্রমুখকে নির্মমভাবে খুন করা হয় ।
💀
মিলিটারির ওপর হামলা:** ইজ্জত কলোনির কাছে একটি মিলিটারি কনভয়ের ওপর গ্রেনেড চার্জ করতে গিয়ে নকশাল মুকুলের নিজের হাতেই গ্রেনেড ফেটে তার ডান হাত উড়ে যায় ।
💀
৩.৩ শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব হত্যা
💀
উপাচার্য ড. গোপাল সেন:** যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. গোপাল সেন হস্টেলে সমাজবিরোধীদের আশ্রয় দেওয়ার প্রতিবাদ করেছিলেন বলে ১৯৭০ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাঁকে ক্যাম্পাসের ভেতরেই কুপিয়ে হত্যা করা হয় ।
💀
*বিচারপতি কে. এল. রায়:** বিপুল অঙ্কের মুক্তিপণ দিতে অস্বীকার করায় কলকাতা হাইকোর্টের সম্মানীয় বিচারপতি কে. এল. রায়কে হত্যা করা হয় ।
💀
হেমন্ত কুমার বসু ও অজিত বিশ্বাস:** ১৯৭১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ফরোয়ার্ড ব্লকের সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেতা হেমন্ত কুমার বসুকে কলকাতার শ্যামপুকুর এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় । ১৮ মে উপনির্বাচনের ফরোয়ার্ড ব্লক প্রার্থী অজিত বিশ্বাসকেও রিভলবার দিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় ।
💀
কংগ্রেস নেতা ও কর্মী:** ১১ আগস্ট ১৯৭১ তারিখে বরানগরের কংগ্রেস নেতা নির্মল চ্যাটার্জীকে এবং বেলেঘাটা মেইন রোডে যুব কংগ্রেস সভাপতি নারায়ণ করকে হত্যা করা হয় ।
💀
৩.৪ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সাধারণ মানুষ হত্যা
💀
সিপিআই(এম) বনাম নকশাল যুদ্ধ:** বেলেঘাটা, বরানগর, কাশীপুর এবং যাদবপুরে সিপিআই(এম) এবং নকশালদের মধ্যে রক্তাক্ত ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষ চলে । সিপিআই(এম)-এর মহিলা কর্মী বিথীকে দিনদুপুরে সিঁথি মোড়ে বাপি, অমিত প্রমুখ নকশাল যুবকরা কুপিয়ে হত্যা করে এবং রক্তমাখা হাতে "বিরাট বিপ্লব হয়েছে" বলে উল্লাস করে ।
💀
পুলিশের চর সন্দেহে নিরীহদের হত্যা: কালীচরণ শেঠ লেনে পুলিশের গুপ্তচর সন্দেহে কয়েকটা ভিখিরিকে খুন করে নকশালরা। রুস্তমজী পার্সি লেনে পুলিশ চর সন্দেহে পরপর কয়েকটা কাগজকুড়ানিকে (যাদের শ্যামল, শংকুরা খুন করেছিল) হত্যা করা হয়।
💀
১৯৭১ সালের কলকাতার পরিসংখ্যান
১৯৭১ সালে নকশালদের হত্যার রাজনীতি চরম আকার ধারণ করে। শুধুমাত্র ১৯৭১ সালেই কলকাতা শহরে নকশালরা মোট ১০৮ জনকে খুন করেছিল। এই নিহতের তালিকায় ছিল কংগ্রেসের ১৭ জন, সি.পি.আই (এম)-এর ২৫ জন, সি.পি.আই-এর ১ জন, পি.এস.পি-র ১ জন, হোমগার্ড ৭ জন, ব্যবসায়ী ৬ জন, পুলিশ ১৬ জন এবং অন্যান্য সাধারণ মানুষ ৩৭ জন।
💀
. সাঁইবাড়ি হত্যাকাণ্ড ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়
১৯৬৭ থেকে ১৯৭২ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক মূল্যবোধের এক বিশাল পরিবর্তন ঘটেছিল; রাজনৈতিক খুন ব্যাপারটি 'জলভাত' হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর একটি বড় প্রমাণ হলো ১৯৭০ সালের ১৭ই মার্চ বর্ধমানের সাঁইবাড়ি হত্যাকাণ্ড। দুই ভাই মলয় ও প্রণব যখন খেতে বসেছিল এবং তাদের মা ভাত বেড়ে দিচ্ছিলেন, তখন সিপিআই(এম)-এর একটি মিছিল আচমকা সেখানে ঢুকে পড়ে; দুই ভাইকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় এবং তাদের রক্ত তাদের মায়ের গায়ে ছিটিয়ে দেওয়া হয় (অনেকের মতে রক্তমাখা ভাত মায়ের মুখে গুঁজে দেওয়া হয়েছিল)। তৎকালীন সিপিআই(এম)-এর প্রবীণ কৃষক নেতা হরেকৃষ্ণ কোঙার প্রকাশ্যে এই ঘটনার সমর্থন করে বলেছিলেন, "সিপিআই(এম)-এর মিছিলে যারা বাধা দিতে আসবে তাদের ওই অবস্থাই হবে"। এই পুরো সময়কালটি প্রমাণ করে যে চারু মজুমদার এবং অন্যান্য চরমপন্থী রাজনীতির প্রভাবে বাংলার সমাজ কতটা হিংস্র ও সংবেদনহীন হয়ে পড়েছিল। ।
💀
৩.৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত
নকশালরা বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী এবং স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তি ভেঙে ফেলে, কারণ তাদের চোখে এরা ছিলেন সাম্রাজ্যবাদের দালাল । শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই এই ধরনের ভাঙচুর ও নাশকতার ১২৫৭টি ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে ৩৭৬টি ঘটেছিল কলকাতাতেই ।
💀
৪. গণমাধ্যমের উস্কানি, লুম্পেন অনুপ্রবেশ এবং দলের অন্তর্দ্বন্দ্ব
💀
উস্কানিমূলক প্রচার:** সরোজ দত্ত এবং সুনীতি ঘোষ তাদের মুখপত্র 'দেশব্রতী' এবং 'লিবারেশন'-এর মাধ্যমে হিংসাকে উসকে দিয়েছিলেন । পত্রিকাগুলোতে "কলকাতায় বিপ্লবী অ্যাকশনের দ্রুত অগ্রগতি" বা "খতমের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে" লিখে হত্যার প্রতিযোগিতা তৈরি করা হতো ।
💀
সমাজবিরোধীদের অনুপ্রবেশ:** ১৯৭১ সালের দিকে নকশাল আন্দোলনে দাগী অপরাধীদের ব্যাপক অন্তর্ভুক্তি ঘটে 。 তাদেরকে মাও সে-তুং-এর 'রেড বুক'-এর ওপর হাত রেখে শপথ করানো হতো এবং তারা আদর্শের তোয়াক্কা না করে খুন ও সন্ত্রাসের নেশায় মেতে ওঠে ।
💀
নিজেদের মধ্যে হত্যাকাণ্ড (Fratricidal Killings):** দলের ভেতরেও শুরু হয় খুনের রাজনীতি। অসীম চট্টোপাধ্যায় অভিযোগ করেন যে চারু মজুমদারের মদতেই তার কমরেড 'চণ্ডী'-কে খুন করা হয় । সুনীতি ঘোষের চিঠি থেকে জানা যায়, দলের দক্ষিণ কলকাতার নেতা কমল সান্যাল, অগ্নি রায় এবং পোর্ট এলাকার পাঞ্চু ও রমেনকে মিথ্যা 'পুলিশ চর' অপবাদ দিয়ে দলের তরফ থেকেই হত্যা করানো হয়েছিল ।
💀
৫. রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং পালটা গণহত্যা
নকশালদের এই লাগামছাড়া হিংসার সুযোগ নিয়ে তৎকালীন সরকার এক নির্মম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নামিয়ে আনে ।
💀
এনকাউন্টার ও ডেথ স্কোয়াড:** সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের সরকার পুলিশ এবং সিআরপিএফ-কে অবাধ ক্ষমতা দেয় । বারাসাত ও ডায়মন্ড হারবারের কাছে হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় যুবকদের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ উদ্ধার হয় ।
💀
কাশীপুর-বরানগর গণহত্যা (আগস্ট ১৯৭১):** কংগ্রেস নেতা নির্মল চ্যাটার্জী খুনের পর ১২ ও ১৩ আগস্ট পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে কংগ্রেস ও সিপিআই(এম) কর্মীরা একজোট হয়ে কাশীপুর ও বরানগর এলাকায় তাণ্ডব চালায় । একশোরও বেশি নকশাল যুবককে ঘর থেকে টেনে বের করে কুপিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করে গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয় ।
💀
মানবিক পুলিশি দৃষ্টিভঙ্গি:** অন্যদিকে, কলকাতা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ থার্ড ডিগ্রি নির্যাতন নিষিদ্ধ করে গ্রেপ্তার হওয়া নকশালদের বাবা-মায়ের সাথে কথা বলে যুবকদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর মানবিক উদ্যোগও নিয়েছিল ।
💀
৬. নকশালবাড়ি পরবর্তী যুগে বিবর্তন ও ভারত-বিরোধী সন্ত্রাস (১৯৭০-২০২০)
১৯৭২ সালে পুলিশের হেফাজতে চারু মজুমদারের মৃত্যুর পর নকশাল আন্দোলন নেতৃত্বহীন হয়ে বহু উপদলে বিভক্ত হয়ে যায় । তবে এই মতাদর্শের সমাপ্তি ঘটেনি, এটি ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর বিরুদ্ধে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে পরিণত হয় ।
💀
নতুন উপদলের জন্ম:** কানাই চ্যাটার্জি এবং অমূল্য সেনের নেতৃত্বে 'মাওবাদী কমিউনিস্ট সেন্টার' (MCC) এবং কোন্ডাপল্লী সীতারামাইয়ার নেতৃত্বে 'পিপলস ওয়ার গ্রুপ' (PWG) গড়ে ওঠে । বিহারে এমসিসি উচ্চবর্ণের জমিদারদের (যেমন রণবীর সেনা) বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে লিপ্ত হয় ।
💀
*সিপিআই (মাওবাদী) গঠন (২০০৪):** ২০০৪ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর এমসিসি এবং পিডব্লিউজি একত্রিত হয়ে 'কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মাওবাদী)' বা CPI (Maoist) গঠন করে । নেপাল সীমান্ত থেকে অন্ধ্রপ্রদেশ পর্যন্ত প্রায় ১০টি রাজ্যের ১৮০টি জেলায় তাদের 'লাল করিডর' (Red Corridor) ছড়িয়ে পড়ে । ২০০৯ সালে ভারত সরকার ইউএপিএ (UAPA) আইনের অধীনে এদের নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ।
💀
ন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ:** মাওবাদীদের সশস্ত্র শাখা (PLGA) আইইডি (IED) এবং ল্যান্ডমাইন ব্যবহার করে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালাতে শুরু করে । ২০১০ সালের ৬ই এপ্রিল ছত্তিশগড়ের দান্তেওয়াড়ায় হামলায় ৭৬ জন সিআরপিএফ জওয়ান শহীদ হন । ২০১৩ সালে দর্ভা উপত্যকায় কংগ্রেস নেতাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয় । সাধারণ মানুষের মনে ভীতি সঞ্চার করতে তারা 'গণআদালত' বসিয়ে নিরীহ মানুষকে হত্যা করে ।
💀
রাষ্ট্রের প্রত্যাঘাত:** ভারত সরকার নকশাল দমনে 'অপারেশন গ্রিন হান্ট' শুরু করে এবং ছত্তিশগড়ে 'সালওয়া জুড়ুম' মিলিশিয়া গড়ে ওঠে । ২০১৭ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক 'সমাধান' (SAMADHAN) ডকট্রিন চালু করে, যার মাধ্যমে নকশালবাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চূড়ান্ত আঘাত হানা হয় ।
💀
উপসংহার
নকশালবাড়ি আন্দোলন যে শোষণহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয়েছিল, চারু মজুমদারের উগ্র ও হঠকারী রাজনৈতিক লাইনের কারণে তা দ্রুতই পথভ্রষ্ট হয়ে এক আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে পরিণত হয় । চীনের ১৯৩০-এর দশকের মডেলকে ভারতের বুকে যান্ত্রিকভাবে চাপিয়ে দেওয়ার এই চেষ্টা ছিল সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ।
তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের নামে ট্রাফিক পুলিশ, স্কুল শিক্ষক, উপাচার্য, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ নিরপরাধ মানুষকে গলা কেটে হত্যা করে সাধারণ মানুষের সমর্থন হারিয়েছিল । এর পরিণামে নেমে আসে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, যার ফলে পশ্চিমবঙ্গের একটি আস্ত প্রজন্মের উজ্জ্বলতম মেধাগুলো হয় পুলিশের এনকাউন্টারে প্রাণ হারায়, নয়তো জেলের অন্ধকারে পচে মরে ।
💀
সত্তরের দশক পার হওয়ার পর কলকাতার দেওয়ালে লেখা একটি ব্যঙ্গাত্মক দেওয়াললিখন তাদের সম্পূর্ণ ব্যর্থতারই প্রতিফলন ছিল:
"শুয়োরের বাচ্চা জনগণ,
রইল তোদের আন্দোলন
চললাম মোরা বৃন্দাবন
দরকার পড়লে ডাকিস।"
💀
নকশাল আন্দোলনের এই ইতিহাস কেবল একটি রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি প্রজন্মের স্বপ্নের মর্মান্তিক অপমৃত্যু এবং স্বাধীন ভারতের বুকে গণতন্ত্র ও উগ্রপন্থার এক দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তাক্ত সংঘাতের প্রামাণ্য দলিল । বামপন্থী এই বিপ্লব সমাজকে গণহত্যা আর অরাজকতা ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি ।

পর্ব ৪

কাক কাকের মাংশ খায়না! বামপন্থীরা খায়?

✅
আজকে বামপন্থীদের কিছু আচরণ দেখে অনেকেই বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে উঠছেন ! ভাবছেন অমুক রঞ্জন কেমন করে অমুক মানুষের কেস করছে? তমুক দাদাই তো হিন্দুদের পাশে দাড়ায় না তাহলে ওদের পাশে কেমন করে দাড়ায় ? বহু বামপন্থী দলকর্মীরাও বেশ হতবাক ! কিন্তু বিশ্বাস করুন কাক কাকের মাংশ না খেলেও , কমিউনিস্টরা এ ব্যাপারে বেশ স্বচ্ছল ! ও বিশ্বাস হচ্ছে না ! দুটি উদাহরণ দিচ্ছি ! প্রথম ঘটনা থেকে আপনি জানতে পারবেন বামপন্থীরা কিভাবে কৃষকদের পাশে দাড়ায় ! কিভাবে ফুড ক্যান্টিন চালিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের পেট ভরেছিলো !
প্রথমটি বামেদের আরাধ্য পঞ্চপাপীর একজন : স্তালিন
✅
জোসেফ স্তালিনের শাসনামলে (১৯২৪-১৯৫৩) সোভিয়েত ইউনিয়নে লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়, যা বিংশ শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা।
ঐতিহাসিকভাবে স্তালিন মূলত চারটি প্রধান পদ্ধতির মাধ্যমে তার নিজের দেশের মানুষের ওপর এই ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল:
১. জোরপূর্বক যৌথ খামার ও কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ (হলোদোমোর)
১৯২০-এর দশকের শেষের দিকে স্তালিন কৃষিব্যবস্থাকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনতে "যৌথ খামার" বা Collectivization নীতি চালু করেন। কৃষকরা এর বিরোধিতা করলে তিনি চরম নির্মমতার আশ্রয় নেন।
কৃষিপণ্য বাজেয়াপ্ত: রাষ্ট্রীয় পুলিশ ও কর্মকর্তারা কৃষকদের উৎপাদিত শস্য, গবাদি পশু এবং বীজ জোরপূর্বক কেড়ে নেয়।
হলোদোমোর (Holodomor): ১৯৩২-১৯৩৩ সালে ইউক্রেনে এই নীতির ফলে এক ভয়াবহ কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়, যা 'হলোদোমোর' নামে পরিচিত। স্তালিন সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইউক্রেনের সীমান্ত বন্ধ করে দেয় যাতে কেউ খাবারের খোঁজে পালাতে না পারে।
ফলাফল: অনাহারে শুধুমাত্র ইউক্রেনেই প্রায় ৩৯ লক্ষ থেকে ৫০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। এছাড়া কাজাখস্তান ও ককেশাস অঞ্চলেও লাখ লাখ মানুষ মারা যায়।
স্তালিনের মনে সবসময় ক্ষমতা হারানোর ভয় (প্যারানোয়া) কাজ করত। নিজের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিশ্চিহ্ন করতে তিনি 'দ্য গ্রেট পার্জ' বা মহা-সন্ত্রাসের সূচনা করেন।
পদ্ধতি: সোভিয়েত গোপন পুলিশ (NKVD) সাধারণ নাগরিক, বুদ্ধিজীবী, সামরিক কর্মকর্তা এবং কমিউনিস্ট পার্টির পুরোনো নেতাদের কাল্পনিক রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে।
প্রহসনের বিচার: তথাকথিত 'শো ট্রায়াল' বা প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে ভয় দেখিয়ে বা নির্যাতন করে তাদের দিয়ে মিথ্যা দোষ স্বীকার করানো হতো।
ফলাফল: এই দুই বছরে প্রায় ৭ লক্ষ থেকে ১২ লক্ষ মানুষকে সরাসরি ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। রেড আর্মির শীর্ষস্থানীয় বেশিরভাগ জেনারেলকে হত্যা করায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে সোভিয়েত সেনাবাহিনী বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
✅
স্তালিনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নীতির কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রায় ৬০ লক্ষ থেকে ২ কোটি সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।
দ্বিতীয়টি লেখার পেছনে একটি কারণ আছে এই মূলতঃ নক্সাল আন্দোলনের সময়কার ! এখনকার যে সব যুবকরা নক্সাল নিয়ে একটি রোমান্টিসিজমে ভুগে থাকে! আর সাধারণ মানুষের মধ্যেও একটা ধারণা তৈরী করা হচ্ছে বামপন্থী মানেই অন্যায়এর বিরুদ্ধে লড়াই করা সুপারহির দাদাই ! আসুন এই ভুল ধারণা টি দূর করতে রুনু গুহ নিয়োগীর বর্ণিত একটি ঘটনা উল্লেখ করা যাক !
✅
পাইকপাড়ার গোপাল শীল সি পি এম করত। তাই ওর ওপর রাগ ছিল নকশালদের। সিঁথির নকশাল নেতা শ্যামল চৌধুরী একদিন পাইকপাড়ায় গিয়েছিল কোন কাজে। দেখল, গোপাল অন্য একটা বাড়ি থেকে বেরচ্ছে, তার মানে বোঝা গেল সেই বাড়িতে সে রাতে গোপনে থাকে। খবরটা ছিটকে, বিপাশাদের দিল শ্যামল। তারপর তারা শুরু করল পরিকল্পনা কিভাবে গোপালের মত “শ্রেণীশত্রুকে” খতম করা যায়। পাইকপাড়ার নকশাল পার্থকে ডাকা হল কারণ সে ওই দিককার সব গলি ঘুপচি চেনে। ঠিক হল, ভোরবেলায় বিপাশা গোপালকে বাড়িতে গিয়ে ডাকবে। গোপাল বাড়ি থেকে বেরলে বিপাশা ইনিয়ে বিনিয়ে তাকে বলবে, নর্দান অ্যাভিন্যূয়ের দিকে যাওয়ার সময় কটা ছেলে তাকে ধরবার চেষ্টা করছিল, কোনমতে পালিয়ে এসেছে। গোপাল যেন ওকে একটু এগিয়ে দেয়। গোপাল কোনরকম সন্দেহই করবে না, বিপাশাকে গোপাল ভালভাবে চেনে। গোপালকে নিয়ে বিপাশা একটা পয়েন্টে পৌঁছলেই শ্যামল, ছিটকেরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।
ছক অনুযায়ী একদিন কাকভোরে বিপাশা গোপালের বাড়ির সামনে গিয়ে ডাকতে শুরু করল, “গোপালদা, গোপালদা।” গোপাল মেয়েলি গলার ডাক শুনে বেরিয়ে এসে বিপাশাকে দেখে একটু আশ্চর্য হয়ে গেল, "কি ব্যাপার বিপাশা, এত ভোরে এখানে? আর আমি এই বাড়িতে থাকি তুমি জানলেই বা কি করে?” বিপাশা ভয়ার্ত গলায় বলল, “আমি প্রায়ই রাতের দিকে এদিকে আসি, আপনাকে দেখি এই বাড়িতে ঢুকতে, তাই। গতরাতেও এসেছিলাম, আজ ফেরার পথে শীতলা মন্দিরের কাছে কতগুলো ছেলে আমাকে তাড়া করল। আমি কোনমতে পালিয়ে এসেছি। আপনি যদি একটু এগিয়ে দেন, খুব ভাল হয়।” গোপাল সরল বিশ্বাসে বলল, “চল, তোমায় এগিয়ে দিয়ে আসি।” গোপাল আর বিপাশা নর্দান অ্যাভিন্যূ ধরে এগিয়ে শীতলা মন্দিরের সামনে আসতেই শ্যামল, ছিটকে, পার্থ তরোয়াল আর ছুরি নিয়ে গোপালের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। পেটে, বুকে, গলায় কোপের পর কোপ। গোপালের গলার স্বর নর্দান অ্যাভিন্যূয়ের কোনও বাড়িতে পৌঁছনর আগেই সে লুটিয়ে পড়ল রাস্তায়। কাজ শেষ। পাশেই রাস্তার কলে শ্যামলরা ধুয়ে নিল তরোয়াল, ছুরি, হাতের রক্ত। তারপর সিগারেট ধরিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেল সিঁথির দিকে। ভোরবেলা পাইকপাড়ার মানুষ বাড়ি থেকে বেরিয়ে দেখল শীতলা মন্দিরের সামনে পড়ে আছে রক্তাক্ত এক দেহ।
সুতরাং বামেদের মধ্যে যে ধারণা আছে রামরাজ্য খারাপ আর সাম্যবাদী বামপন্থা বিরাজিত হলেই রাজ্যের রাষ্ট্রের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ! তাদের জন্য একটি সুরক্ষাবাণী হলো বামপন্থীরা কারোর আপন হয়না এমনকি বামপন্থীদেরও নয় ! অনেকেই বলবেন আহা নক্সাল রা সিপি ওমুক তিনি ছিলেন সিপি তমুক , ওই সিপিএম, সিপিএম এল এবিসিডি ....কিন্তু সাপকে যে নামই দিন সে ছোবল মারবেই !

সূত্রঃ Debanjan Mukherjee'র ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া হয়েছে। যেহেতু ULM একটি নতুন সমাজ ব্যবস্থার প্রস্তাবনা নিয়ে কাজ করছে এবং যে নতুন আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পলিসির কথা বলা তা প্রতিষ্ঠিত করতে সশস্ত্র বিপ্লবের প্রয়োজন পড়বে না। এই প্রেক্ষিতকে ভিত্তি ধরে এই লেখনীর অবতারণা। আলোচনা-সমীক্ষায় সকলে স্বাগত। যোগাযোগ- 9830925502***

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

ব্যবস্থাগত অসম্পূর্ণতা নাকি নেতৃত্বের ব্যর্থতা?