আজকের চীন পুঁজিকে ঠিক কীভাবে ব্যবহার করছে? পুঁজির আধিপত্য ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কেমন?
👉👉চীন কি সমাজতান্ত্রিক মডেল নাকি পুঁজির মডেল?
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদদের গবেষণার ভিত্তিতে বিষয়টি নিচে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হলো। মার্ক্সবাদী তত্ত্ব এবং বর্তমান চিনের বাস্তবতার আলোকে বুঝতে হবে কেন চিনে পুঁজিপতি থাকা সত্ত্বেও এটিকে সমাজতান্ত্রিক বলা হয়।
গবেষণামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে এর প্রধান কারণগুলো নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
## ১. সমাজতন্ত্রের প্রাথমিক স্তর (Primary Stage of Socialism)—
মার্ক্সবাদী তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ সরাসরি সাম্যবাদে পৌঁছাতে পারে না; তাকে কয়েকটি স্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। চিনা কমিউনিস্ট পার্টির (CCP) প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা ও তত্ত্ব অনুযায়ী, চিন বর্তমানে "সমাজতন্ত্রের প্রাথমিক স্তরে" রয়েছে। চিনের অর্থনৈতিক সংস্কারক দেং জিয়াওপিং যুক্তি দিয়েছিলেন যে, চরম দারিদ্র্য নিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। উৎপাদন ক্ষমতা (Productive Forces) চরম শিখরে নিয়ে যাওয়ার জন্য চিনে নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদী উপাদান ও মুক্ত বাজারকে একটি "মাধ্যম" হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে পরবর্তীতে একটি সম্পূর্ণ সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলা যায়।
## ২. নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদ বনাম রাষ্ট্রীয় প্রধান অর্থনৈতিক খাত—
বিশুদ্ধ পুঁজিবাদী দেশে পুঁজিপতিরা রাষ্ট্র ও আইনকে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু চিনে এর বিপরীত ঘটে। চিনের অর্থনীতিতে পুঁজিপতিদের ব্যক্তিগত খাতের বিকাশের অনুমতি দেওয়া হলেও, অর্থনীতির চালিকাশক্তি বা কৌশলগত খাতগুলো (যেমন: বড় ব্যাংক, খনিজ সম্পদ, জ্বালানি, ভারী শিল্প এবং পরিবহন) সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এন্টারপ্রাইজ (SOEs) দ্বারা পরিচালিত হয়। চিনের সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, দেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো জনগণের সম্মিলিত বা রাষ্ট্রীয় মালিকানা।
## ৩. পুঁজিপতিদের ওপর রাজনৈতিক ও আইনি আধিপত্য—
চিনে পুঁজিপতিদের ব্যবসা করার স্বাধীনতা থাকলেও তাদের কোনো রাজনৈতিক স্বাধীনতা নেই।
✍* দলীয় তদারকি: চিনের প্রতিটি বড় বেসরকারি কোম্পানিতে (এমনকি বিদেশি সংস্থাতেও) কমিউনিস্ট পার্টির একটি অভ্যন্তরীণ শাখা বা ইউনিট থাকা বাধ্যতামূলক।
✍** কঠোর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ: আলিবাবা (Alibaba) বা টেনসেন্টের (Tencent) মতো বড় প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো যখনই রাষ্ট্রের নীতি বা জনস্বার্থের বাইরে গিয়ে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেছে, চিনা সরকার তাদের ওপর বিলিয়ন ডলারের জরিমানা চাপিয়েছে এবং তাদের কার্যক্রম পুনর্গঠন করতে বাধ্য করেছে। অর্থাৎ, পুঁজিপতিরা সেখানে রাষ্ট্রের ওপর নয়, রাষ্ট্র পুঁজিপতিদের ওপর চূড়ান্ত ক্ষমতা ভোগ করে।
## ৪. জমির জাতীয়করণ এবং লিজ ব্যবস্থা—
পুঁজিবাদের প্রধান শর্ত হলো ভূমির ব্যক্তিগত মালিকানা ও অবাধ বেচাকেনা। কিন্তু চিনের আইন অনুযায়ী, সমস্ত গ্রামীণ জমি যৌথ মালিকানাধীন এবং শহুরে জমি সরাসরি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন। কোনো পুঁজিপতি চিনে স্থায়ীভাবে জমি কিনতে পারেন না; তারা সর্বোচ্চ ২০ থেকে ৭০ বছরের জন্য সরকারের কাছ থেকে জমি ব্যবহারের অধিকার বা লিজ (Land-use rights) নিতে পারেন। এই ব্যবস্থাটি পুঁজিবাদের মৌলিক নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর বড় প্রমাণ।
## ৫. সাধারণ সমৃদ্ধি (Common Prosperity) এবং লক্ষ্য—
চিনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর অন্যতম প্রধান নীতি হলো "কমন প্রসপারিটি" বা সাধারণ সমৃদ্ধি। এই দর্শনের মূল কথাই হলো, বাজার অর্থনীতি ব্যবহার করে যে সম্পদ পুঁজিপতিরা তৈরি করছে, তা কর ও কঠোর রাষ্ট্রীয় নীতিমালার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কল্যাণ, চরম দারিদ্র্য বিমোচন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে পুনর্বণ্টন করা। গত কয়েক দশকে চিনের কোটি কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করা এই সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যেরই অংশ।
সংক্ষেপে: চিনের মডেলটি কোনো বিশুদ্ধ পুঁজিবাদ নয়, বরং এটি একটি লেলিনবাদী রাষ্ট্রীয় কাঠামো যা সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাজার ব্যবস্থাকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
👉👉চিনের এই "সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি" বা চিনা কমিউনিস্ট পার্টির নিজস্ব রাজনৈতিক তাত্ত্বিক দিকগুলোর ব্যাখ্যা কী?
চিনের এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো আরও গভীরভাবে বোঝার জন্য আমাদের মূলত ৩টি প্রধান দিক বিশ্লেষণ করতে হবে। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণার আলোকে এই তিনটি দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
## ১. চিনা কমিউনিস্ট পার্টির (CCP) নিজস্ব তাত্ত্বিক ভিত্তি—
চিন কেন নিজেকে সমাজতান্ত্রিক দাবি করে, তা বুঝতে হলে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শনের বিবর্তন জানা জরুরি:
✍* মাও সেতুং-এর ভিত্তি: ১৯৪৯ সালের বিপ্লবের পর মাও সেতুং চিনে সমাজতন্ত্রের রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলেন। তবে তিনি অর্থনৈতিকভাবে একটি কৃষিপ্রধান অনুন্নত দেশকে সমাজতান্ত্রিক করতে চেয়েছিলেন, যা ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এবং ব্যর্থ হয়েছিল।
✍* দেং জিয়াওপিং-এর বাস্তববাদ (Pragmatism): ১৯৭৮ সালে দেং জিয়াওপিং চিনের অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু করেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল, "বিড়ালটি কালো নাকি সাদা তা বড় কথা নয়, এটি ইঁদুর ধরতে পারছে কি না সেটাই বড় কথা।" এর মানে হলো, চিনের দারিদ্র্য দূর করার জন্য যদি পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতি ব্যবহার করতে হয়, তবে সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য ঠিক রেখে তা-ই করা হবে।
✍* শি জিনপিং-এর "নতুন যুগ": বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই মডেলকে আরও শক্তিশালী করেছেন। তাঁর লক্ষ্য হলো ২০৪৯ সালের মধ্যে (চিন বিপ্লবের ১০০ বছর পূর্তিতে) চিনকে একটি সম্পূর্ণ আধুনিক ও শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করা।
## ২. পুঁজিবাদী দেশগুলোর সাথে চিনের মূল পার্থক্য—
চিনে পুঁজিপতি থাকলেও আমেরিকা বা ইউরোপের পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে এর দুটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে:
✍* পুঁজিপতিদের রাজনৈতিক ক্ষমতার অভাব: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য পুঁজিবাদী দেশে বড় বড় কর্পোরেট কোম্পানিগুলো রাজনৈতিক দলগুলোকে তহবিল দেয় এবং সরকারের আইন প্রণয়নে (Lobbying) প্রভাব বিস্তার করে। চিনে এটি সম্পূর্ণ অসম্ভব। চিনে পুঁজিপতিরা চিনা কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা বা প্রভাব খাটাতে পারে না।
✍* সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণমুখী লক্ষ্য: পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মূল লক্ষ্য থাকে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন। কিন্তু চিনে পুঁজিপতিদের মুনাফা অর্জনের সুযোগ দেওয়া হলেও, রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য থাকে সামাজিক স্থায়িত্ব এবং উন্নয়ন। উদাহরণস্বরূপ, চিনের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম সফল উদ্যোগ, যেখানে রাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপ করে কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে তুলেছে।
## ৩. বর্তমান চিনের বাস্তব চ্যালেঞ্জ—
গবেষকদের মতে, এই সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতির মডেলটি সম্পূর্ণ নিখুঁত নয় এবং এর কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে:
✍* সম্পদের বৈষম্য: মুক্ত বাজারের প্রবেশের ফলে চিনে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান অনেক বেড়েছে। চিনে যেমন বহু বিলিয়নেয়ার বা পুঁজিপতি তৈরি হয়েছে, তেমনি অনেক সাধারণ মানুষ এখনো নিম্ন আয়ের মধ্যে রয়েছেন।
✍* বেসরকারি খাতের সাথে দ্বন্দ্ব: চিনের জিডিপির (GDP) প্রায় ৬০% এবং কর্মসংস্থানের ৮০% আসে বেসরকারি খাত থেকে। ফলে চিনা কমিউনিস্ট পার্টিকে সবসময় একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়—যাতে বেসরকারি খাতকে খুব বেশি চাপ দিলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, আবার তাদের খুব বেশি ছাড় দিলে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ নষ্ট না হয়।
👉👉এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে চীন সমাজতন্ত্রের দিকে যাচ্ছে?
আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি এবং মার্ক্সবাদী গবেষকদের মধ্যে এই প্রশ্নটি নিয়ে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। এর কোনো একক বা সোজা উত্তর নেই। তবে বর্তমান চিনের নীতি এবং বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে গবেষকেরা মূলত দুটি ভিন্ন এবং প্রধান সিদ্ধান্তে উপনীত হন।
নিচে এই দুটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হলো:
## দৃষ্টিভঙ্গি ১: হ্যাঁ, চিন সমাজতন্ত্রের দিকেই যাচ্ছে (চিনা দাবি ও সমর্থকদের মত)—
এই পক্ষের গবেষকদের মতে, চিন পুঁজিবাদকে স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে নয়, বরং সমাজতন্ত্রে পৌঁছানোর একটি সাময়িক "হাতিয়ার" হিসেবে ব্যবহার করছে। এর সপক্ষে যুক্তিগুলো হলো:
✍* শি জিনপিং-এর কড়া নিয়ন্ত্রণ: ২০১২ সালে শি জিনপিং ক্ষমতায় আসার পর থেকে চিনের বেসরকারি খাতের ওপর কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণ বহুগুণ বেড়েছে। জ্যাক মা (Jack Ma)-এর মতো বড় পুঁজিপতিদের ডানা ছেঁটে দেওয়া এবং প্রযুক্তি ও আবাসন খাতের বড় কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর রাষ্ট্রীয় লাগাম টানা প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র পুঁজিপতিদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিচ্ছে না।
✍* "কমন প্রসপারিটি" বা সাধারণ সমৃদ্ধি: বর্তমান চিনা নেতৃত্বের মূল লক্ষ্য হলো ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান কমানো। পুঁজিপতিদের অর্জিত অতিরিক্ত অর্থ কর এবং সামাজিক কল্যাণমূলক তহবিলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আবাসন খাতে পুনর্বণ্টন করা হচ্ছে।
✍* ২০৪৯ সালের লক্ষ্যমাত্রা: চিনা কমিউনিস্ট পার্টির সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে যে, ২০৪৯ সালের মধ্যে (বিপ্লবের ১০০ বছর পূর্তিতে) চিনের উৎপাদন ক্ষমতা যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে, তখন তারা বাজার অর্থনীতির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে একটি সম্পূর্ণ আধুনিক, উন্নত এবং বৈষম্যহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে।
## দৃষ্টিভঙ্গি ২: না, চিন প্রকৃতপক্ষে "রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ"-এর দিকে গেছে (সমালোচক ও পশ্চিমা গবেষকদের মত)—
অনেক সমাজবিজ্ঞানী, বামপন্থী তাত্ত্বিক এবং পশ্চিমা বিশ্লেষক মনে করেন, চিন সমাজতন্ত্রের নাম ব্যবহার করলেও বাস্তবে তারা পুঁজিবাদী পথেই হেঁটেছে এবং সেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন। এর সপক্ষে যুক্তিগুলো হলো:
✍* স্থায়ী পুঁজিবাদী কাঠামো: চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চিনে মুক্ত বাজার ব্যবস্থা চালু থাকায় সেখানে পুঁজিবাদী সামাজিক সম্পর্ক গভীরভাবে শিকড় গেড়েছে। চিনের জিডিপির প্রায় ৬০% এবং কর্মসংস্থানের ৮০% আসে বেসরকারি খাত থেকে। এই বিশাল বেসরকারি খাতকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয়করণ করতে গেলে চিনের অর্থনীতি ধসে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
✍* তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য: সমাজতন্ত্রের মূল কথাই হলো সমতা। কিন্তু চিনে বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রধান পুঁজিপতি এবং বিলিয়নেয়ারদের বসবাস। সেখানে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা কোনো প্রথাগত সমাজতান্ত্রিক দেশের বৈশিষ্ট্য নয়।
✍* শ্রমিকদের অধিকারের সীমাবদ্ধতা: চিনে পুঁজিপতিদের লাভ করার সুযোগ থাকলেও, শ্রমিকদের স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন বা স্বাধীনভাবে ধর্মঘট করার অধিকার অত্যন্ত সীমিত। সমস্ত শ্রমিক সংগঠন সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন, যা অনেক মার্ক্সবাদী গবেষকের মতে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের পরিপন্থী।
## চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত—
তাত্ত্বিক দিক থেকে বিচার করলে, চিন সমাজতন্ত্রের দিকে যাওয়ার দাবি ও চেষ্টা দুটোই করছে এবং রাষ্ট্রকে পুঁজিপতিদের চেয়ে শক্তিশালী রাখছে। কিন্তু ব্যবহারিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে বিচার করলে, তারা বর্তমানে এমন এক জটিল "রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী" বা মিশ্র কাঠামোয় আটকে গেছে, যেখান থেকে সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ সমাজতন্ত্রে ফিরে যাওয়া অত্যন্ত দুরূহ।
👉👉চীনের উন্নয়ন সমাজতান্ত্রিক নীতির দ্বারা হয়নি বরং পুঁজির দ্বারা হয়েছে তা বলা যায়?
এই প্রশ্নের উত্তরও অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং দ্বিমুখী। চিনের উন্নয়ন পুঁজিবাদী পুঁজিলগ্নির মাধ্যমেই ঘটেছে, নাকি মার্ক্সবাদী কৌশলের মাধ্যমে হয়েছে—তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে স্পষ্ট দুটি মতামত রয়েছে। তবে চিনের বাস্তব উন্নয়ন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ছিল মার্ক্সবাদী লেলিনবাদী রাষ্ট্রকাঠামোর অধীনে পুঁজিবাদী পুঁজিকে ব্যবহার করার এক অনন্য কৌশল।
নিচে এই দুই পক্ষের প্রধান যুক্তিগুলো বিশদভাবে দেওয়া হলো:
## ১. পুঁজির দ্বারা উন্নয়ন হয়েছে (পুঁজিবাদী বা মুক্ত-বাজার অর্থনীতিবিদদের মত)—
এই পক্ষের গবেষকদের মতে, চিনের অর্থনৈতিক অলৌকিক উত্থানের মূল চালিকাশক্তি ছিল পশ্চিমা ধাঁচের পুঁজিবাদী উপাদান।
✍* বাজারের উন্মুক্তকরণ (১৯৭৮): মাও সেতুং-এর সম্পূর্ণ রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সমাজতান্ত্রিক মডেলের সময় চিন অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়েছিল। ১৯৭৮ সালে দেং জিয়াওপিং যখন বাজার উন্মুক্ত করেন, বেসরকারি খাতকে অনুমতি দেন এবং বিদেশি পুঁজিপতিদের জন্য 'বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল' (SEZ) তৈরি করেন, তখনই চিনের প্রকৃত উন্নয়ন শুরু হয়।
✍* বেসরকারি খাতের আধিপত্য: চিনের বর্তমান অর্থনীতির সিংহভাগ প্রবৃদ্ধি পুঁজিপতিদের ব্যক্তিগত উদ্যোগের মাধ্যমেই আসে। চিনের জিডিপির (GDP) ৬০%, উদ্ভাবনী প্রযুক্তির ৭০% এবং শহুরে কর্মসংস্থানের ৮০% বেসরকারি খাতের হাত ধরে তৈরি হয়েছে।
✍* বিশ্বায়নের সুবিধা: বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (WTO) যোগ দিয়ে চিন পশ্চিমা পুঁজি, প্রযুক্তি এবং বাজারকে ব্যবহার করে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। তাই পশ্চিমা গবেষকদের মতে, উন্নয়নটি আদতে পুঁজির অবাধ ব্যবহারের ফলেই সম্ভব হয়েছে।
## ২. মার্ক্সবাদী নীতির দ্বারা উন্নয়ন হয়েছে (চিনা কমিউনিস্ট পার্টি ও বামপন্থী গবেষকদের মত)—
অন্যদিকের গবেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, চিনের উন্নয়নকে কেবল "পুঁজির জয়" বলা ভুল হবে। কারণ, পুঁজিবাদী পুঁজিকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মার্ক্সবাদী ও লেলিনবাদী কৌশলের অংশ।
✍* লেলিনবাদী "নিউ ইকোনমিক পলিসি" (NEP): ১৯২০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নে ভ্লাদিমির লেলিন সমাজতন্ত্রের ভিত শক্ত করতে সাময়িকভাবে সীমিত আকারে বাজার অর্থনীতি ও পুঁজির অনুমতি দিয়েছিলেন। চিন ঠিক এই লেলিনবাদী কৌশলটিই বড় আকারে প্রয়োগ করেছে। তারা মনে করে, উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য পুঁজি একটি প্রয়োজনীয় হাতিয়ার মাত্র।
✍* রাষ্ট্রের চালকের আসন (Commanding Heights): সাধারণ পুঁজিবাদী দেশে পুঁজি ও পুঁজিপতিরা রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু চিনে রাষ্ট্র এবং কমিউনিস্ট পার্টি পুঁজিকে নিয়ন্ত্রণ করে। দেশের সমস্ত ব্যাংক, রেল, শক্তি ও প্রধান খাতগুলো রাষ্ট্রের হাতে থাকায় সরকার যেকোনো সংকট মুহূর্তে পুঁজিকে জনকল্যাণে বা দীর্ঘমেয়াদী অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করতে পেরেছে।
✍* পরিকল্পিত অর্থনীতি: চিনের উন্নয়ন কোনো অনিয়ন্ত্রিত মুক্ত বাজারের ফল নয়। প্রতি ৫ বছর পর পর কমিউনিস্ট পার্টি যে "পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা" করে, পুঁজিপতিদের সেই পরিকল্পনার ভেতরে থেকেই ব্যবসা করতে হয়। রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ছাড়া চিনের এই অভূতপূর্ব পরিকাঠামো ও দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব হতো না।
## চূড়ান্ত রূপরেখা—
সুতরাং, আপনি যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন তা আংশিক সত্য। চিনের উন্নয়নের জন্য যে শক্তি বা জ্বালানি লেগেছে, তা নিঃসন্দেহে "পুঁজি"। কিন্তু সেই পুঁজি কোন দিকে প্রবাহিত হবে, তা নিয়ন্ত্রণ করেছে চিনের "মার্ক্সবাদী-লেলিনবাদী রাষ্ট্রযন্ত্র"। পুঁজিবাদী দেশে পুঁজি কাজ করে পুঁজিপতিদের মুনাফার জন্য, আর চিনে পুঁজিকে খাটানো হয়েছে রাষ্ট্রের শক্তিশালীকরণ ও দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে। চিনের ভাষায় এটিই হলো—"পুঁজিকে সমাজতন্ত্রের অধীনে নিয়ে আসা।"
👉👉১৯২০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নে ভ্লাদিমির লেলিন সমাজতন্ত্রের ভিত শক্ত করতে সাময়িকভাবে সীমিত আকারে বাজার অর্থনীতি ও পুঁজির অনুমতি দিয়েছিলেন। এটি কী?
১৯২০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নে ভ্লাদিমির লেনিন যে সাময়িক বাজার অর্থনীতি ও পুঁজির অনুমতি দিয়েছিলেন, সেটিকে ইতিহাসে "নিউ ইকোনমিক পলিসি" (New Economic Policy) বা সংক্ষেপে NEP (নেপ) বলা হয়। বাংলায় এটিকে "নতুন অর্থনৈতিক নীতি" নামে অভিহিত করা হয়। ১৯২১ সালের মার্চ মাসে চিনা বা রুশ কমিউনিস্ট পার্টির (বলশেভিক) ১০ম কংগ্রেসে লেনিন এই ঐতিহাসিক নীতিটি ঘোষণা করেন, এর মূল বৈশিষ্ট্য, প্রেক্ষাপট এবং চিনের সাথে এর মিল নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
## কেন লেনিন এই নীতি এনেছিলেন? (প্রেক্ষাপট)—
১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর চিনে বা রাশিয়ায় তীব্র গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। গৃহযুদ্ধের সময় লেনিন "ওয়ার কমিউনিজম" (War Communism) বা "যুদ্ধকালীন সাম্যবাদ" নীতি চালু করেছিলেন। এর অধীনে সমস্ত ব্যবসা, কারখানা এবং কৃষিজমি রাষ্ট্র সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করত। কৃষকদের উদ্বৃত্ত শস্য সরকার জোর করে কেড়ে নিত যুদ্ধক্ষেত্রের সৈন্যদের খাওয়ানোর জন্য। এর ফলে দেশে চরম দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, অর্থনৈতিক উৎপাদন ধসে পড়ে এবং কৃষক ও শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়। এই অর্থনৈতিক সংকট থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নকে বাঁচাতে লেনিন কৌশলগতভাবে সমাজতন্ত্র থেকে সাময়িক এক ধাপ পিছিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
## 'নেপ' (NEP)-এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো কী ছিল?
✍* কৃষকদের কর ব্যবস্থা: জোর করে শস্য কেড়ে নেওয়ার বদলে কৃষকদের ওপর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ "শস্য কর" (Tax in kind) ধার্য করা হয়। কর দেওয়ার পর বাকি উদ্বৃত্ত শস্য কৃষকেরা খোলা বাজারে নিজেদের ইচ্ছামতো দামে বিক্রি করার স্বাধীনতা পায়।
✍* সীমিত বেসরকারি ব্যবসা: ক্ষুদ্র শিল্প ও ছোট ছোট খুচরা ব্যবসা (যেখানে ২০ জনের কম শ্রমিক কাজ করত) ব্যক্তিগত মালিকানায় বা পুঁজিপতিদের অধীনে পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়।
✍* রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ (The Commanding Heights): ক্ষুদ্র পুঁজির অনুমতি দেওয়া হলেও দেশের মূল চালিকাশক্তি—যেমন বড় ভারী শিল্প, ব্যাংক, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ রাষ্ট্র বা কমিউনিস্ট সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়。 লেনিন একে "রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ" (State Capitalism) বলে অভিহিত করেছিলেন।
## লেনিনের দর্শন ও বর্তমান চিনের মিল—
লেনিন এই নীতিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, "ভবিষ্যতে আরও জোরে সামনে লাফ দেওয়ার জন্য আমাদের এখন এক ধাপ পিছিয়ে যেতে হচ্ছে।" অর্থাৎ, সমাজতন্ত্রের চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগে দেশের অর্থনীতিকে সচল করা এবং উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো জরুরি ছিল।
১৯২৮ সালে জোসেফ স্টালিন এই নীতি বাতিল করে আবার সম্পূর্ণ রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা চালু করেন। তবে বর্তমান চিনের সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতির মূল অনুপ্রেরণা এবং তাত্ত্বিক ভিত্তি মূলত লেনিনের এই NEP বা নতুন অর্থনৈতিক নীতি থেকেই নেওয়া হয়েছে।
👉👉চীনের এই মডেলের কারণে সেখানে শ্রমিকদের অধিকার বা মজুরি কেমন? বর্তমান যুগের মার্ক্সবাদী চিন্তাবিদ ও লেখকেরা চিনকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
## ১. চিনে শ্রমিকদের অধিকার এবং মজুরি কেমন?
চিনের অর্থনৈতিক অলৌকিক উত্থানের পেছনে চিনা শ্রমিকদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তবে তাদের অধিকার এবং মজুরির চিত্রটি বেশ জটিল ও দ্বিমুখী।
✍* মজুরির ধারাবাহিক বৃদ্ধি: গত দুই দশকে চিনে শ্রমিকদের গড় মজুরি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০০০-এর দশকের শুরুতে চিনকে যেখানে "সস্তা শ্রমের দেশ" বলা হতো, বর্তমান চিনে শ্রমিকদের মজুরি এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার (যেমন: ভিয়েতনামী বা বাংলাদেশি) শ্রমবাজারের চেয়ে অনেক বেশি। চিনা কমিউনিস্ট পার্টি প্রতি বছর অঞ্চলভেদে ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ করে, যা জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
✍* স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়নের অনুপস্থিতি: চিনে শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী "স্বাধীন" ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করার আইনি অধিকার নেই। সেখানে কেবল একটিই আইনগত ইউনিয়ন রয়েছে—অল-চায়না ফেডারেশন অব ট্রেড ইউনিয়নস (ACFTU), যা সরাসরি চিনা কমিউনিস্ট পার্টির (CCP) নিয়ন্ত্রণাধীন। ফলে, পুঁজিপতি বা মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের নিজস্ব কোনো স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম নেই।
✍* ধর্মঘটের অধিকারের সীমাবদ্ধতা: চিনের সংবিধানে শ্রমিকদের ধর্মঘট বা স্ট্রাইক করার অধিকার স্পষ্টভাবে সুরক্ষিত নয়। যদিও বেতন বকেয়া বা কারখানা বন্ধের বিরুদ্ধে শ্রমিকেরা স্থানীয়ভাবে বিক্ষোভ করেন, তবে রাষ্ট্র সেগুলোকে খুব দ্রুত দলীয় তদারকির মাধ্যমে মীমাংসা করে অথবা বড় রাজনৈতিক রূপ নেওয়ার আগেই দমন করে।
✍* "৯৯৬" কাজের সংস্কৃতি ও শোষণের অভিযোগ: চিনের বেসরকারি প্রযুক্তি এবং বড় কর্পোরেট সেক্টরগুলোতে "996 Work Culture" (সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা, সপ্তাহে ৬ দিন কাজ) অত্যন্ত সাধারণ বিষয়। এটি চিনের শ্রম আইনের পরিপন্থী হলেও পুঁজিপতিরা উৎপাদনশীলতা বাড়াতে শ্রমিকদের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে, যা নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চিনের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে প্রচণ্ড অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
## ২. বর্তমান যুগের মার্ক্সবাদী চিন্তাবিদ ও লেখকেরা চিনকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
চিনের এই মডেলটিকে বিশ্বজুড়ে আধুনিক মার্ক্সবাদী, সমাজতান্ত্রিক এবং বামপন্থী গবেষকেরা মূলত ৩টি ধারায় বিভক্ত হয়ে মূল্যায়ন করেন:
✍* ধারা ক: "রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ" বা পুঁজিবাদী বিচ্যুতি (Critical Marxists):
ডেভিড হার্ভে (David Harvey)-এর মতো বিখ্যাত পশ্চিমা মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক বা চিনের ভেতরের "নিউ লেফট" (New Left) আন্দোলনের লেখকদের মতে, চিন সমাজতন্ত্রের পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। তাঁদের যুক্তি, উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর যদি শ্রমিক শ্রেণীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না থাকে এবং সেখানে যদি বিলিয়নেয়ার পুঁজিপতি শ্রেণী তৈরি হয়, তবে তাকে আর সমাজতান্ত্রিক বলা যায় না। তাঁরা চিনকে "রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ" (State Capitalism) বা একদলীয় একনায়কতন্ত্রের অধীনে পরিচালিত চরম পুঁজিবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
✍* ধারা খ: কৌশলগত সমাজতন্ত্র বা বাস্তববাদী মার্ক্সবাদ (Analytical/Pro-China Marxists):
কিছু মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক (বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথ বা ল্যাটিন আমেরিকার সমাজতন্ত্রীরা) চিনের পক্ষে যুক্তি দেন। তাঁদের মতে, কার্ল মার্ক্স কখনো বলেননি যে দরিদ্র দেশ সরাসরি সমাজতন্ত্রে যাবে। চিনের কমিউনিস্ট পার্টি পুঁজিকে সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে রাষ্ট্রকে মহাশক্তিশালী করেছে এবং কোটি কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করেছে। পুঁজিবাদ যেখানে রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করে, চিনে রাষ্ট্র পুঁজিকে চাকরের মতো খাটায়—তাই এটি মার্ক্সবাদেরই একটি সফল তাত্ত্বিক বিবর্তন।
✍* ধারা গ: বাজার সমাজতন্ত্র (Market Socialists):
এই পক্ষের অর্থনীতিবিদদের মতে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন প্রমাণ করেছে যে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পরিকল্পনা অর্থনীতি টেকসই নয়। তাই চিন বাজার বা মার্কেটকে সমাজতন্ত্রের স্বার্থে ব্যবহার করার যে "মার্কেট সোশ্যালিজম" মডেল তৈরি করেছে, তা মার্ক্সীয় তত্ত্বের একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বাস্তবসম্মত রূপ।
***

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন