দুই সমাজতান্ত্রিক বন্ধুর মতবিরোধ এবং বিচ্ছেদের কারণ কী ছিল?


 

ভ্লাদিমির লেনিন এবং জুলিয়াস মারতভের বন্ধুত্ব এবং পরবর্তীতে শত্রুতায় রূপ নেওয়ার ইতিহাসটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন, জটিল এবং রাজনৈতিক আদর্শে ভরপুর। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের আগে তাঁরা দুজনে মিলে রাশিয়ার মার্ক্সবাদী আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তিটি তৈরি করেছিলেন।

তাঁদের বন্ধুত্বের শুরু, গভীরতা এবং ভাঙনের ইতিহাস নিচে কয়েকটি ধাপে তুলে ধরা হলো:

১. পরিচয়ের শুরু এবং সেন্ট পিটার্সবার্গ (১৮৯৫)—
১৮৯৫ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গে এই দুই তরুণ বিপ্লবীর প্রথম পরিচয় হয়। লেনিন ছিলেন একজন প্রখর বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন, বাস্তববাদী ও কঠোর শৃঙ্খলাপ্রিয় আইনি ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষ। অন্যদিকে মারতভ (আসল নাম জুলিয়াস সেডারবাম) ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান, আবেগপ্রবণ, চমৎকার লেখক এবং একজন খাঁটি বুদ্ধিজীবী।

* তাঁরা দুজনে মিলে গঠন করেন 'লীগ অব স্ট্রাগল ফর দি ইম্যানসিপেশন অব দি ওয়ার্কিং ক্লাস'।
* এই সংগঠনের মাধ্যমে তাঁরা রাশিয়ার শ্রমিকদের সংগঠিত করতে শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁদের মধ্যে গভীর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।

২. সাইবেরিয়ায় নির্বাসন এবং 'ইস্ক্রা' পত্রিকা (১৯০০-১৯০৩)—
বলশেভিক ও মার্ক্সবাদী কর্মকাণ্ডের জন্য জার সরকার দুজনকেই গ্রেপ্তার করে সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে পাঠায়।

* নির্বাসন শেষ করে ১৯০০ সালে তাঁরা সুইজারল্যান্ড এবং পরবর্তীতে লন্ডনে চলে যান।
* সেখানে লেনিন ও মারতভ যৌথভাবে 'ইস্ক্রা' (Iskra-স্ফুলিঙ্গ) নামে একটি আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনৈতিক পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন। এই পত্রিকাটি রাশিয়ায় গোপনে পাচার করা হতো।
* এই সময়ে তাঁরা লন্ডনে একই সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাজনৈতিক তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতেন, একসাথে খেতেন এবং রাশিয়ার রাজতন্ত্র উৎখাতের স্বপ্ন দেখতেন। সমসাময়িক ঐতিহাসিকদের মতে, মারতভই ছিলেন সেই সামান্য কয়েকজন মানুষের একজন, যাঁকে লেনিন গভীর ভালোবাসতেন এবং 'তুমি' (তুই) বলে সম্বোধন করতেন।

৩. ১৯০৩ সালের সেই ঐতিহাসিক ভাঙন—
১৯০৩ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে তাঁদের এই গভীর বন্ধুত্বে চিরতরে ফাটল ধরে।

* পার্টির সদস্যপদের সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্কের সময় লেনিন যখন মারতভের উদারপন্থার বিরোধিতা করেন, তখন মারতভ অত্যন্ত আঘাত পান।
* মারতভ লেনিনের কঠোর ও একনায়কতান্ত্রিক মনোভাবকে মেনে নিতে পারেননি। অন্যদিকে লেনিন ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে রাজনৈতিক আদর্শকে ও লক্ষ্যকে বড় করে দেখেছিলেন। এই ঘটনার পর তাঁদের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব শত্রুতা ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নেয়।

৪. দূরত্বের মাঝেও লুকিয়ে থাকা শ্রদ্ধা ও শেষ পরিণতি—
রাজনৈতিকভাবে তীব্র শত্রুতা থাকা সত্ত্বেও, তাঁদের মনে একে অপরের প্রতি এক ধরণের প্রচ্ছন্ন টান ও শ্রদ্ধা আজীবন থেকে গিয়েছিল।

* ১৯২০ সালে মারতভ যখন গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় সোভিয়েত রাশিয়া ছেড়ে জার্মানিতে চলে যাচ্ছিলেন, তখন লেনিন গোপনে তাঁর চিকিৎসার জন্য সরকারি তহবিলের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, যদিও মারতভ তখন লেনিনের সরকারের কট্টর বিরোধী ছিলেন।

* লেনিন যখন ১৯২৩-২৪ সালের দিকে নিজে পক্ষাঘাতগ্রস্ত (প্যারালাইজড) হয়ে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তিনি তাঁর স্ত্রীকে (ক্রুপস্কায়া) আক্ষেপ করে বলেছিলেন, "ওরা বলে মারতভও নাকি মারা যাচ্ছে।" লেনিন তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোতেও তাঁর এই পুরোনো বন্ধুর কথা মনে করতেন।

* ১৯২৩ সালের এপ্রিলে মারতভ জার্মানিতে মারা যান এবং তার ঠিক ৯ মাস পর ১৯২৪ সালের জানুয়ারিতে লেনিন মৃত্যুবরণ করেন।

লেনিন ও মারতভের এই সম্পর্কটি ছিল ইতিহাসের এমন এক ট্র্যাজেডি, যেখানে রাজনীতির নিষ্ঠুর মারপ্যাঁচ দুটি প্রগাঢ় বন্ধু হৃদয়কে চিরতরে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।

➡️➡️কোন মতবিরোধ নিয়ে লেনিন ও মারতভ দুই বন্ধুর বিচ্ছেদ ঘটে?

১৯০৩ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত 'রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টি' (RSDLP)-এর দ্বিতীয় কংগ্রেসে মূলত পার্টির সাংগঠনিক কাঠামো এবং সদস্যপদের সংজ্ঞা নিয়ে ভ্লাদিমির লেনিন এবং জুলিয়াস মারতভের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। এই বিরোধের জেরেই দুই বন্ধুর মধ্যে ঐতিহাসিক বিচ্ছেদ ঘটে।

মতবিরোধের মূল বিষয়গুলোঃ

সদস্যপদ নিয়ে মতবিরোধ—
* লেনিন চেয়েছিলেন, পার্টির সদস্য হতে হলে প্রত্যেককে কঠোরভাবে অনুগত এবং পার্টির কোনো একটি গোপন সংগঠনের অধীনে সরাসরি ও সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে।
* মারতভ মনে করতেন, সদস্যপদ আরও উন্মুক্ত হওয়া উচিত এবং পার্টির যেকোনো সংগঠনের নির্দেশনায় কাজ করতে ইচ্ছুক এমন যেকোনো ব্যক্তিই সদস্য হতে পারবেন।

পার্টির রূপরেখা নিয়ে মতবিরোধ—
* লেনিন একটি ছোট, সুশৃঙ্খল এবং কঠোর পেশাদার বিপ্লবীদের দল গঠনের পক্ষে ছিলেন।
* মারতভ এর চেয়ে বড় এবং অপেক্ষাকৃত গণতান্ত্রিক ও উদার রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

এই বিতর্কের ভোটাভুটিতে মারতভের প্রস্তাব জয়ী হয়। কিন্তু পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় কমিটি ও পত্রিকার সম্পাদক নির্বাচন নিয়ে লেনিনের দল বেশি ভোট পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তখন থেকেই লেনিনের অনুসারীদের 'বলশেভিক' (সংখ্যাগরিষ্ঠ) এবং মারতভের অনুসারীদের 'মেনশেভিক' (সংখ্যালঘু) বলা হয়।

➡️➡️বিপ্লব নিয়েও কি মতপার্থক্য ছিল?

হ্যাঁ, বিপ্লবের কৌশল, নেতৃত্ব এবং বুর্জোয়া শ্রেণীর ভূমিকা নিয়েও লেনিন ও মারতভের মধ্যে গভীর মৌলিক পার্থক্য ছিল।

রাশিয়ায় কীভাবে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হবে, তা নিয়ে তাঁদের প্রধান মতপার্থক্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:

বিপ্লবের নেতৃত্ব নিয়ে মতপার্থক্য—
* লেনিন (বলশেভিক) বিশ্বাস করতেন রাশিয়ার বুর্জোয়া বা পুঁজিপতি শ্রেণী খুবই দুর্বল। তাই শ্রমিক শ্রেণীকে কৃষকদের সাথে জোট বেঁধে বিপ্লবের নেতৃত্ব দিতে হবে।
* মারতভ (মেনশেভিক) কার্ল মার্ক্সের মূল তত্ত্বকে কঠোরভাবে অনুসরণ করতেন। তাঁর মতে, বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি হবে শ্রমিক শ্রেণী, তবে পুঁজিপতি বা বুর্জোয়া শ্রেণীকেও সেখানে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে।

বিপ্লবের ধাপ বা পর্যায় নিয়ে মতপার্থক্য—
* লেনিন বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে একসাথে মিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ, একটি বিপ্লবের পরপরই সরাসরি সমাজতন্ত্রে রূপান্তর সম্ভব বলে মনে করতেন।
* মারতভ মনে করতেন রাশিয়া এখনো অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর। তাই প্রথমে একটি দীর্ঘস্থায়ী বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক শাসন আসবে এবং পুঁজিবাদ পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার পরই কেবল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হবে।

কৃষক সমাজের ভূমিকা নিয়ে মতপার্থক্য—
* লেনিন রাশিয়ার বিশাল কৃষক সমাজকে বিপ্লবের অন্যতম প্রধান এবং শক্তিশালী সহযোগী হিসেবে দেখতেন।
* মারতভ কৃষকদের রক্ষণশীল মনে করতেন এবং বিপ্লবের জন্য মূলত শহুরে শিল্প শ্রমিকদের ওপরই বেশি আস্থা রাখতেন।

এই আদর্শিক দূরত্বের কারণেই ১৯১৭ সালের অক্টোবরে লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করলে, মারতভ তার তীব্র বিরোধিতা করেন এবং দুই পক্ষের পথ চিরতরে আলাদা হয়ে যায়।

➡️➡️মারতভের শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রে পৌঁছানোর পথ কী ছিল?

জুলিয়াস মারতভের এই তত্ত্বটি বোঝার জন্য কার্ল মার্ক্সের মূল ঐতিহাসিক বস্তুবাদের (Historical Materialism) ধারণাটি জানা প্রয়োজন। মারতভ মনে করতেন, রাশিয়ার মতো একটি অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর দেশে সমাজতন্ত্রের রূপান্তর রাতারাতি বা জোর করে সম্ভব নয়।

বুর্জোয়ারা কীভাবে ক্ষমতা ছাড়বে এবং মারতভের সমাজতন্ত্রে পৌঁছানোর দীর্ঘমেয়াদী পথ বা ধাপগুলো কেমন ছিল, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

##১. মারতভের সমাজতন্ত্রে পৌঁছানোর ধাপসমূহ (The Menshevik Path)—
মারতভ বিপ্লবকে প্রধানত দুটি স্পষ্ট এবং দীর্ঘস্থায়ী ধাপে ভাগ করেছিলেন:

ধাপ ১: বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব (Bourgeois-Democratic Revolution)—
* কাজ: প্রথমে জারতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে একটি পুঁজিবাদী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।

* কেন এটি দরকার? মারতভের মতে, সমাজতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য শর্ত হলো উন্নত শিল্পখাত এবং একটি বিশাল ও সচেতন শ্রমিক শ্রেণী (Proletariat)। রাশিয়া তখন ছিল মূলত একটি অনগ্রসর কৃষকপ্রধান দেশ। পুঁজিবাদ বিকাশের মাধ্যমেই কেবল আধুনিক শিল্পকারখানা এবং শিক্ষিত ও সংগঠিত শ্রমিক শ্রেণী গড়ে ওঠা সম্ভব।

ধাপ ২: দীর্ঘস্থায়ী পুঁজিবাদী বিকাশ ও সচেতনতা
* কাজ: এই পর্বে বুর্জোয়াদের অধীনে দেশ দীর্ঘসময় ধরে শাসিত হবে। এই গণতান্ত্রিক পরিবেশে শ্রমিকরা বাক-স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের আইনি অধিকার পাবে।

* ফলাফল: এই দীর্ঘ সময়ে শ্রমিকরা রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত, সচেতন এবং সংখ্যায় রাশিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণীতে পরিণত হবে।

ধাপ ৩: সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর (The Socialist Transition)—
* কাজ: যখন শ্রমিক শ্রেণী দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশে পরিণত হবে এবং পুঁজিবাদ তার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে সংকটে পড়বে, তখন শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে (নির্বাচনের মাধ্যমে বা গণআন্দোলনের মাধ্যমে) ক্ষমতা দখল করবে।

## ২. বুর্জোয়ারা কীভাবে ক্ষমতা ছাড়বে? (মারতভের যুক্তি)
আপনার প্রশ্নটি খুবই যৌক্তিক এবং এই প্রশ্নটি স্বয়ং লেনিনও মারতভকে করেছিলেন। বুর্জোয়ারা স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়বে না—এটি মারতভও জানতেন। কিন্তু তাঁর কৌশলটি ছিল ভিন্ন:

* সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি:
মারতভ মনে করতেন, পুঁজিবাদ যখন পুরোপুরি বিকশিত হবে, তখন সমাজে বুর্জোয়া বা পুঁজিপতিদের সংখ্যা হবে খুবই নগণ্য (মাত্র কয়েক শতাংশ), আর শ্রমিকদের সংখ্যা হবে বিশাল। এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক শ্রেণী যখন পুরোপুরি সচেতন হবে, তখন তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধর্মঘটের চাপের মুখে বুর্জোয়াদের ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হতে হবে।

* গণতান্ত্রিক উপায়ে উৎখাত:
মারতভ পশ্চিম ইউরোপের (যেমন: জার্মানি বা ফ্রান্স) সামাজিক গণতান্ত্রিক দলগুলোর মডেল অনুসরণ করতে চেয়েছিলেন। সেখানে শ্রমিকদের দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিয়ে আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সমাজতান্ত্রিক আইন পাসের মাধ্যমে পুঁজিবাদকে ক্রমান্বয়ে বিলুপ্ত করার পথ খুঁজছিল।

* সর্বহারার একনায়কত্ব বনাম গণতন্ত্র:
লেনিন চেয়েছিলেন একটি ছোট সশস্ত্র দল দিয়ে জোর করে বুর্জোয়াদের দমন করতে। কিন্তু মারতভ মনে করতেন, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া সমাজতন্ত্র আসলে 'একনায়কত্বে' রূপ নেবে (যা পরবর্তীতে স্টালিনের আমলে সত্যি প্রমাণিত হয়েছিল)। মারতভের মতে, বুর্জোয়াদের ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রক্রিয়াটি হতে হবে সমাজতান্ত্রিক দলগুলোর একটি বহুদলীয় জোট এবং ব্যাপক জনগণের সমর্থনের ভিত্তিতে, কোনো একক দলের স্বৈরাচারী উপায়ে নয়।

সংক্ষেপে পার্থক্য:
লেনিন চেয়েছিলেন "সংখ্যালঘুর সশস্ত্র অভ্যুত্থান" যা বুর্জোয়া ও পুঁজিবাদকে এক ধাক্কায় ধ্বংস করবে। আর মারতভ চেয়েছিলেন "বহুসংখ্যক শ্রমিকের দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক আন্দোলন", যা পুঁজিবাদকে ভেতর থেকে দুর্বল করে ক্রমান্বয়ে সমাজতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাবে।

➡️➡️ইউরোপীয় স্ক্যান্ডিনেভিয়ান মডেল কি মারতভের মডেল অনুযায়ী গড়ে উঠেছে?

না, ইউরোপীয় স্ক্যান্ডিনেভিয়ান মডেল হুবহু মারতভের মডেল অনুযায়ী গড়ে ওঠেনি; তবে এটি মারতভের মূল আদর্শিক লক্ষ্য ও বিবর্তনীয় দর্শনের সাথে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সহজ কথায়, মারতভ যে তাত্ত্বিক সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো তার একটি বাস্তব ও পরিমার্জিত রূপ তৈরি করেছে। কেন এটি সম্পূর্ণ মারতভের মডেল নয় এবং কোথায় এর মিল-অমিল রয়েছে, তা নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:

১. মিল যেখানে (মারতভের দর্শনের প্রতিফলন)

মারতভ এবং মেনশেভিকদের মূল রাজনৈতিক লাইন ছিল লেনিনের বিপরীত। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান মডেল সেই লাইনেই অগ্রসর হয়েছে:
  • শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পথ: মারতভ লেনিনের মতো সশস্ত্র বিপ্লব ও একনায়কত্বের ঘোর বিরোধী ছিলেন। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান মডেলও সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক নির্বাচন, সংসদীয় আইন এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের (যেমন ১৯৩৮ সালের সালতসোবাদেন চুক্তি) মাধ্যমে গড়ে উঠেছে।
  • শ্রমিকদের শক্তিশালী অবস্থান: মারতভ চেয়েছিলেন শ্রমিকরা সংগঠিত হয়ে নিজেদের অধিকার আদায় করুক। নর্ডিক মডেলে ট্রেড ইউনিয়নগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তারা মালিকপক্ষের সাথে সমানে সমানে দরকষাকষি করে।
  • পর্যায়ক্রমিক বিবর্তন: মারতভ রাতারাতি সমাজতন্ত্র চাননি, ধাপে ধাপে রূপান্তর চেয়েছিলেন। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোও ১৯৩০ থেকে ১৯৫০-এর দশকের মধ্যে ধীরে ধীরে আইনের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।

২. অমিল যেখানে (যেখানে এটি মারতভের মডেল নয়)

বাস্তবতা হলো, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেনি, তারা পুঁজিবাদকে মানবিক ও নিয়ন্ত্রিত করেছে। এখানেই মারতভের তত্ত্বের সাথে এর মৌলিক পার্থক্য:
  • পুঁজিবাদের অস্তিত্ব: মারতভ শেষ পর্যন্ত কার্ল মার্ক্সের অনুসারী ছিলেন এবং তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল সমাজতন্ত্র—যেখানে উৎপাদনের উপায়ের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা বা পুঁজিবাদ থাকবে না। কিন্তু স্ক্যান্ডিনেভিয়ান মডেলে পুঁজিবাদ পুরোপুরি টিকে আছে। ভলভো, আইকিয়া বা স্পোটিফাইয়ের মতো বড় বড় বৈশ্বিক কোম্পানি ব্যক্তিগত মালিকানাতেই চলে।
  • মিশ্র অর্থনীতি: স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়, এগুলো হলো 'কল্যাণমুখী রাষ্ট্র' (Welfare State)। এখানে অর্থনীতি চলে পুঁজিবাদী মুক্তবাজার নিয়মে, কিন্তু রাষ্ট্র বিপুল কর (Tax) আদায় করে শিক্ষা, চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তার পেছনে খরচ করে সম্পদের ভারসাম্য রক্ষা করে। মারতভ বেঁচে থাকলে হয়তো একে সমাজতন্ত্র না বলে 'উন্নত পুঁজিবাদী সংস্কার' বলতেন।

চূড়ান্ত মূল্যায়ন

স্ক্যান্ডিনেভিয়ান মডেলকে মারতভের মডেলে তৈরি বলা ভুল হবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, ১৯০৩ সালে লেনিনের সাথে বিতর্কে মারতভ যে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন—"জোর করে সমাজতন্ত্র চাপিয়ে দিলে তা স্বৈরাচার ডেকে আনবে"—তা সোভিয়েত ইউনিয়নে সত্যি প্রমাণিত হয়েছিল। অন্যদিকে, মারতভ যে গণতন্ত্র, বাক-স্বাধীনতা এবং শ্রমিক কল্যাণের কথা বলেছিলেন, তার সবচেয়ে সফল বাস্তব রূপ আজকের এই নর্ডিক বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান মডেল।

পরিশেষে, পশ্চিম ইউরোপ এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো (যেমন: সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক) মূলত মারতভের সেই গণতান্ত্রিক ও বিবর্তনীয় সমাজতন্ত্রের (Democratic and Evolutionary Socialism) ধারণাটিকে আংশিক বাস্তবায়ন করেছে বলা যায়। এই অঞ্চলের দেশগুলো রাশিয়ার মতো রক্তক্ষয়ী বিপ্লব বা একনায়কতন্ত্রের পথ এড়িয়ে সম্পূর্ণ ব্যালট ও বুলেটের পরিবর্তে ভোটের মাধ্যমে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে।

পশ্চিম ইউরোপীয় সোশ্যাল ডেমোক্রেট যারা যুদ্ধের পরও বুর্জোয়া ব্যবস্থার ভেতরে থেকে ক্রমান্বয়ে সংস্কারের পথে হেঁটেছিল এবং পরবর্তীতে (১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে) স্ক্যান্ডিনেভিয়ান মডেল গড়ে তুলেছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯–১৯৪৫) পুরোটা সময় জুড়ে পশ্চিম ইউরোপ এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ার এই সামাজিক গণতান্ত্রিক (সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক) দল ও দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত থাকলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সাথে এই যুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণের রাজনৈতিক ও আদর্শগত কারণ সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণ ছিল মূলত হিটলার ও ফ্যাসিবাদের হাত থেকে নিজেদের টিকিয়ে রাখার লড়াই। এই যুদ্ধে জয়লাভের পরেই তারা ১৯৪৬-১৯৫০ সালের মধ্যে সেই বিখ্যাত আধুনিক 'কল্যাণমুখী রাষ্ট্র' বা 'নর্ডিক মডেল' পূর্ণাঙ্গভাবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।

'কল্যাণমুখী রাষ্ট্র' বা 'নর্ডিক মডেল'-এর প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা মূলত ১৯৩০-এর দশকে শুরু হয়েছিল, তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ থেকে ১৯৫০-এর দশকের মধ্যে এটি তার পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক রূপ লাভ করে।

➡️➡️জুলিয়াস মারতভের সমাজতন্ত্রের মূল নীতিগুলি কী ছিল?

জুলিয়াস মারতভ (Julius Martov) ছিলেন রুশ সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টির (RSDLP) মেনশেভিক বা অপেক্ষাকৃত মধ্যপন্থী সমাজতান্ত্রিক ধারার প্রধান নেতা। তাঁর সমাজতান্ত্রিক নীতি ও দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল মার্কসবাদের গণতান্ত্রিক ও বিবর্তনবাদী ব্যাখ্যা।

তাঁর সমাজতান্ত্রিক নীতিগুলোর মধ্যে প্রধান দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:

* গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র:
মারতভ বিশ্বাস করতেন, সমাজতন্ত্র কোনো সংখ্যালঘু দলের একনায়কত্ব বা জোরজবরদস্তির মাধ্যমে আসতে পারে না। এটি অর্জিত হতে হবে শ্রমিক শ্রেণির স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং একটি পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে।

* ধাপে ধাপে বিপ্লব:
মার্কসীয় ঐতিহাসিক বস্তুবাদ মেনে মারতভ মনে করতেন, পিছিয়ে পড়া রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আগে বুর্জোয়া-পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর্যায়টি সম্পন্ন হওয়া অপরিহার্য। সরাসরি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য রাশিয়ার আর্থ-সামাজিক অবস্থা তখনও প্রস্তুত ছিল না।

* গণভিত্তিক দল:
১৯০৩ সালে ভ্লাদিমির লেনিনের সঙ্গে তাঁর প্রধান তাত্ত্বিক বিরোধ বাধে। লেনিন যেখানে একটি ক্ষুদ্র ও কঠোর অনুশাসন মেনে চলা 'পেশাদার বিপ্লবীদের' দল চেয়েছিলেন, সেখানে মারতভের নীতি ছিল—শ্রমিকদের ব্যাপক অংশগ্রহণে একটি উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক মাস-পার্টি বা গণদল গঠন করা।

* শান্তিপূর্ণ ও আন্তর্জাতিক নীতি:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি একজন কট্টর আন্তর্জাতিকতাবাদী ছিলেন। যুদ্ধকে সাম্রাজ্যবাদী আখ্যা দিয়ে তিনি সমস্ত দেশের সমাজতন্ত্রীদের যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পক্ষে জোরালো ভূমিকা পালন করেন।

* 'রেড টেরর' বা রাজনৈতিক সন্ত্রাসের বিরোধিতা:
১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের পর তিনি বলশেভিক সরকারের নীতি, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ, গণপরিষদ ভেঙে দেওয়া এবং বলপ্রয়োগ ও সন্ত্রাসের তীব্র বিরোধিতা করেন। মেনশেভিকদের নিয়ে তিনি একটি বৈধ ও গঠনমূলক বিরোধী দল হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করেন।


➡️➡️অক্টোবর বিপ্লব এবং ক্ষমতা দখল (১৯১৭)—
* ১৯১৭ সালের ২৫শে অক্টোবর লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা এক সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে। লেনিন একটি সম্পূর্ণ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে বদ্ধপরিকর ছিলেন।
* বলশেভিকরা 'অক্টোবর বিপ্লব'-এর মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা কেড়ে নিলে মেনশেভিকরা তা বর্জন করে। মারতভ এই সশস্ত্র অভ্যুত্থানের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি একে বলশেভিকদের 'সামরিক ক্যু' বা একনায়কতন্ত্র বলে আখ্যা দেন। তিনি সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটি যৌথ সমাজতান্ত্রিক সরকার গঠনের দাবি জানান।

➡️➡️পরবর্তী পরিণতি ও নির্বাসন—
* বিপ্লবের পর লেনিন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধান নেতা হন এবং একদলীয় কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
* বলশেভিক সরকার গঠন করার পর মারতভ রাশিয়ায় থেকেই রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বলশেভিকদের দমনপীড়নের মুখে ১৯২০ সালে তিনি রাশিয়া ছাড়তে বাধ্য হন এবং ১৯২৩ সালে জার্মানিতে নির্বাসিত অবস্থায় মারা যান।

➡️➡️বিপ্লবের পর যুদ্ধকালীন কমিউনিজম বা নতুন অর্থনৈতিক নীতি (NEP) কী ছিল?

১৯১৭ সালের এই ঘটনাবলি প্রমাণ করে যে, দুই বন্ধুই সমাজতন্ত্র চেয়েছিলেন, কিন্তু লেনিন বেছে নিয়েছিলেন সশস্ত্র ও দ্রুত বিপ্লবের পথ, আর মারতভ বিশ্বাসী ছিলেন গণতান্ত্রিক ও পর্যায়ক্রমিক বিবর্তনের পথে।

ক্ষমতা দখলের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং নিজেদের শাসন টিকিয়ে রাখতে ভ্লাদিমির লেনিন পর্যায়ক্রমে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করেছিলেন। নিচে এই নীতি দুটি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. যুদ্ধকালীন কমিউনিজম বা ওয়ার কমিউনিজম (War Communism: ১৯১৮-১৯২১)—
১৯১৮ সালে রাশিয়ায় ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হলে লেনিন এই চরমপন্থী ও কঠোর অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়ন করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল যেকোনো মূল্যে বলশেভিকদের 'লাল ফৌজ' (Red Army)-এর জন্য খাদ্য ও রসদ নিশ্চিত করা।

মূল পদক্ষেপসমূহ—
* খাদ্য জোরপূর্বক বাজেয়াপ্তকরণ: কৃষকদের নিজেদের খাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অংশটুকু রেখে বাকি সমস্ত উদ্বৃত্ত শস্য রাষ্ট্র জোর করে কেড়ে নিত।
* শিল্পের জাতীয়করণ: দেশের সমস্ত কলকারখানা, ব্যাংক এবং খনি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। ছোট ছোট কারখানাও সরকার নিজের অধীনে নিয়ে নেয়।
* ব্যক্তিগত ব্যবসা নিষিদ্ধ: যেকোনো ধরনের ব্যক্তিগত বাণিজ্য, কেনাবেচা বা মুনাফা অর্জন সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়।
* অর্থহীন সমাজ (Abolition of Money): কাগজের মুদ্রার ব্যবহার প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং পণ্যের বিনিময়ে পণ্য (Barter) ও রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়।

ফলাফল—
এই নীতি গৃহযুদ্ধে বলশেভিকদের জেতাতে সাহায্য করলেও দেশের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। তীব্র দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যাতে লাখ লাখ মানুষ মারা যায় এবং কৃষকরা বলশেভিক সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ (যেমন: ক্রনশটাদ বিদ্রোহ) শুরু করে।

২. নতুন অর্থনৈতিক নীতি বা এনইপি (New Economic Policy - NEP: ১৯২১-১৯২৮)—
যুদ্ধকালীন কমিউনিজমের ব্যর্থতা এবং গণঅসন্তোষের মুখে লেনিন বুঝতে পারেন যে কঠোর সমাজতন্ত্র এখনই চাপিয়ে দিলে দল ক্ষমতা হারাবে। তাই ১৯২১ সালে তিনি কিছুটা 'পিছু হটে' পুঁজিবাদের কিছু বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনেন, যা NEP নামে পরিচিত। লেনিন একে ব্যাখ্যা করেছিলেন—"ভবিষ্যতে দু-পা এগোনোর জন্য এখন এক পা পিছিয়ে যাওয়া।"

মূল পদক্ষেপসমূহ—
* জোরপূর্বক শস্য আদায় বন্ধ: কৃষকদের কাছ থেকে জোর করে শস্য নেওয়া বন্ধ করে একটি নির্দিষ্ট 'খাজনা বা কর' (Tax in kind) ধার্য করা হয়।
* উন্মুক্ত বাজার: কর দেওয়ার পর কৃষকরা তাঁদের উদ্বৃত্ত ফসল খোলা বাজারে নিজেদের ইচ্ছামতো দামে বিক্রি করার স্বাধীনতা পান。
* ব্যক্তিগত মালিকানা ফেরত: ছোট ও মাঝারি শিল্পকারখানা এবং খুচরা ব্যবসা আবার ব্যক্তিগত মালিকানায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
* রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ (The Commanding Heights): তবে লেনিন ভারী শিল্প, ব্যাংক, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো বড় বড় খাতগুলো রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণেই রাখেন।

ফলাফল—
এই মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন আবার যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে আসে এবং দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতির অবসান ঘটে।

১৯২৪ সালে লেনিনের মৃত্যুর পর এই নীতি নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির ভেতরে আবার দ্বন্দ্ব শুরু হয় এবং ১৯২৮ সালে জোসেফ স্টালিন ক্ষমতা পেয়ে এই নীতি (NEP) বাতিল করে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রিত 'পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা' চালু করেন।
***




মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

ব্যবস্থাগত অসম্পূর্ণতা নাকি নেতৃত্বের ব্যর্থতা?