লেনিন থেকে গর্বাচেভ


ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ, যিনি বিশ্বজুড়ে লেনিন (Lenin) নামে পরিচিত, ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, রুশ বিপ্লবের প্রধান মহানায়ক এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি কার্ল মার্ক্সের দর্শনকে বাস্তবে রূপ দিয়ে বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন।
নিচে লেনিনের জীবন, বিপ্লবী সংগ্রাম এবং ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত রূপরেখা দেওয়া হলো: 

১. প্রারম্ভিক জীবন ও মার্ক্সবাদে দীক্ষা

  • জন্ম ও পরিবার: ১৮৭০ সালের ২২ এপ্রিল রাশিয়ার সিমবির্স্ক (বর্তমান উলিয়ানভস্ক) শহরে একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। [6, 7]
  • ভাইয়ের ফাঁসি ও রাজনৈতিক মোড়: ১৮৮৭ সালে জারের সরকারকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে লেনিনের বড় ভাই আলেকজান্ডারকে ফাঁসি দেওয়া হয়। এই ঘটনা ১৭ বছর বয়সী লেনিনের মনে জার শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং তিনি বিপ্লবী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। [8, 9]
  • আইন শিক্ষা ও নির্বাসন: সামারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের ডিগ্রি নেওয়ার পাশাপাশি তিনি কার্ল মার্ক্সের ক্যাপিটাল এবং অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক বই পড়া শুরু করেন। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জন্য ১৮৯৭ সালে তাকে গ্রেপ্তার করে তিন বছরের জন্য সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত করা হয়। নির্বাসন থেকে ফিরে তিনি ছদ্মনাম নেন 'লেনিন'। 

২. বলশেভিক পার্টির গঠন (১৯০৩)

রুশ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে লেনিনের মূল অবদান ছিল একটি সুশৃঙ্খল ও পেশাদার বিপ্লবী দল গঠন করা।
  • ১৯০৩ সালে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টির কাউন্সিলে আদর্শগত প্রশ্নে দল দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়।
  • লেনিনের নেতৃত্বাধীন উগ্র বিপ্লবী ও সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশটি 'বলশেভিক' (যার অর্থ সংখ্যাগরিষ্ঠ) এবং নরমপন্থী অংশটি 'মেনশেভিক' (সংখ্যালঘিষ্ঠ) নামে পরিচিত হয়।

৩. নির্বাসন এবং ১৯১৭ সালের এপ্রিল থিসিস

১৯০৫ সালের ব্যর্থ রুশ বিপ্লবের পর লেনিনকে দীর্ঘ সময় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে (সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া) নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়। সেখান থেকেই তিনি লেখালেখির মাধ্যমে দল পরিচালনা করতেন। 
  • রাশিয়ায় প্রত্যাবর্তন: ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কায় জার দ্বিতীয় নিকোলাসের পতন ঘটে এবং একটি অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। এপ্রিল মাসে লেনিন একটি সিলমোহরযুক্ত ট্রেনে করে জার্মানির সহায়তায় রাশিয়ায় ফিরে আসেন। 
  • এপ্রিল থিসিস: ফিরে এসেই তিনি ঘোষণা করেন যে, বুর্জোয়া অস্থায়ী সরকারকে সমর্থন করা যাবে না। তিনি স্লোগান দেন: "সমস্ত ক্ষমতা সোভিয়েতের হাতে" (All power to the Soviets) এবং "শান্তি, জমি ও রুটি" (Peace, Land, and Bread)। 

৪. অক্টোবর বিপ্লব ও ক্ষমতা লাভ (১৯client_side)

১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর (পুরনো রুশ ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২৫ অক্টোবর) লেনিনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং ট্রটস্কির সামরিক নেতৃত্বে বলশেভিকরা একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অস্থায়ী সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করে। এটিই ইতিহাসের বিখ্যাত 'অক্টোবর বিপ্লব' বা 'বলশেভিক বিপ্লব'। লেনিন নতুন সোভিয়েত সরকারের প্রধান (Chairman of the Council of People's Commissars) হন। 

৫. রাষ্ট্রনায়ক লেনিন এবং বড় সিদ্ধান্তসমূহ 

ক্ষমতায় আসার পর লেনিনকে একের পর এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল:
  • প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে প্রত্যাহার: ১৯১৮ সালে জার্মানির সাথে অত্যন্ত অপমানজনক 'ব্রেস্ট-লিটোভস্ক চুক্তি' করে রাশিয়াকে বিশ্বযুদ্ধ থেকে বের করে আনেন, যাতে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সামলানো যায়। 
  • রুশ গৃহযুদ্ধ (১৯১৮-১৯২২): বলশেভিক (লাল ফৌজ) এবং জারের সমর্থক ও বিদেশী শক্তিগুলোর (সাদা বাহিনী) মধ্যে এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। লেনিন অত্যন্ত কঠোর হাতে এই যুদ্ধ দমন করেন এবং সমাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখেন। 
  • নিউ ইকোনমিক পলিসি বা এনইপি (১৯২১): গৃহযুদ্ধের পর দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়লে লেনিন কিছুটা পিছু হটে মিশ্র অর্থনীতির 'NEP' চালু করেন। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কৃষকদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের সুযোগ দেওয়া হয়, যা অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করে। 
  • সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন (১৯২২): ১৯২২ সালের ডিসেম্বরে রাশিয়ার সাথে ইউক্রেন, বেলারুশ এবং ট্রান্সককেশীয় অঞ্চল যুক্ত করে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন (USSR)। 

৬. জীবনাবসান ও উত্তরাধিকার (১৯২৪)

  • হত্যার চেষ্টা ও অসুস্থতা: ১৯১৮ সালে ফ্যানি কাপলান নামের এক নারী সমাজতন্ত্রী লেনিনকে লক্ষ্য করে গুলি করেন। লেনিন বেঁচে গেলেও তাঁর শরীরে গুলি রয়ে যায়, যা তাঁর স্বাস্থ্য চিরতরে ভেঙে দেয়। ১৯২২ সালের পর তিনি পর পর কয়েকবার স্ট্রোক করেন।
  • মৃত্যু: ১৯২৪ সালের ২১ জানুয়ারি মাত্র ৫৩ বছর বয়সে ভ্লাদিমির লেনিন মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ মমি করে মস্কোর রেড স্কয়ারের 'লেনিন মাউসোলিয়াম'-এ রাখা হয়, যা আজও সেখানে সংরক্ষিত আছে। 



স্টালিন

জোসেফ স্টালিন (১৮৭৮–১৯৫৩) ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী এবং বিতর্কিত একনায়ক। লেনিনের মৃত্যুর পর তিনি ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করেন। নিচে তাঁর ক্ষমতা লাভ, ইতিহাস, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং নীতির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

১. স্টালিনের উত্থান এবং ইতিহাস 

জোসেফ স্টালিনের আসল নাম আইওসিফ ভিসারিওনোভিচ জুগাশভিলি। তিনি বর্তমান জর্জিয়ার এক দরিদ্র মুচি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
  • প্রাথমিক জীবন: মায়ের ইচ্ছায় পাদ্রি হওয়ার জন্য ধর্মীয় সেমিনারিতে পড়াশোনা শুরু করলেও পরে মার্ক্সবাদী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।
  • আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি: জার শাসনামলে তিনি ব্যাংকে ডাকাতি, চাঁদাবাজি এবং অস্ত্র চোরাচালানের মাধ্যমে বলশেভিক পার্টির জন্য তহবিল সংগ্রহ করতেন। এই বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জন্য তাকে বহুবার সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত হতে হয়। এই সময়েই তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন 'স্টালিন', যার অর্থ "ইস্পাতের মানব" (Man of Steel)।
  • ক্ষমতায় আগমন: ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের পর তিনি বলশেভিক পার্টির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন। ১৯২২ সালে লেনিন তাকে কমিউনিস্ট পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি পদে নিয়োগ দেন। এই পদের প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে স্টালিন নিঃশব্দে দলের ভেতরে নিজের অনুগত লোকজনকে বসাতে শুরু করেন, যা পরবর্তীতে তাকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা অর্জনে সাহায্য করে।

২. লেনিনের সাথে মতভেদ

প্রাথমিকভাবে লেনিন ও স্টালিনের সম্পর্ক ভালো থাকলেও লেনিনের জীবনের শেষ দিনগুলোতে তাদের মধ্যে তীব্র দূরত্ব তৈরি হয়।
  • আমলাতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি: লেনিন লক্ষ্য করেছিলেন স্টালিন দলে ব্যাপক আমলাতন্ত্র তৈরি করছেন এবং নিজের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করছেন।
  • আচরণগত রুক্ষতা: স্টালিনের অতিরিক্ত রুক্ষ ও অহংকারী আচরণ লেনিন পছন্দ করেননি। বিশেষ করে লেনিনের অসুস্থ স্ত্রী নাদেজদা ক্রুপস্কায়ার সাথে স্টালিন চরম দুর্ব্যবহার করলে লেনিন ক্ষুব্ধ হন।
  • লেনিনের শেষ উইল (Lenin's Testament): মৃত্যুর আগে লেনিন একটি গোপন উইলে লিখে যান যে, স্টালিন অত্যন্ত রুক্ষ এবং তাকে জেনারেল সেক্রেটারির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু স্টালিন রাজনৈতিক চাতুর্যের মাধ্যমে এই উইলটি প্রকাশ হতে দেননি।

৩. ট্রটস্কির সাথে মতবিরোধ

লেনিনের মৃত্যুর পর ক্ষমতার প্রধান দুই দাবিদার ছিলেন লিওন ট্রটস্কি এবং জোসেফ স্টালিন। তাদের মতবিরোধ ছিল মূলত তাত্ত্বিক ও আদর্শিক:
  • বিশ্ব বিপ্লব বনাম এক দেশে সমাজতন্ত্র: ট্রটস্কি বিশ্বাস করতেন "স্থায়ী বা নিরবচ্ছিন্ন বিপ্লব" (Permanent Revolution) নীতিতে। তাঁর মতে, পশ্চিমা দেশগুলোতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব না হলে সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকবে না। অন্যদিকে স্টালিন "এক দেশে সমাজতন্ত্র" (Socialism in One Country) তত্ত্ব দেন। তিনি বলেন, বাইরের সাহায্য ছাড়াই শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেতরেই সমাজতন্ত্র শক্তিশালী করা সম্ভব।
  • ফলাফল: স্টালিন দলের অন্য নেতাদের (কামেনেভ ও জিনোভিয়েভ) সাথে জোট বেঁধে ট্রটস্কিকে কোণঠাসা করেন। ১৯২৭ সালে ট্রটস্কিকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়, পরে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয় এবং ১৯৪০ সালে মেক্সিকোতে স্টালিনের গুপ্তচর তাকে হত্যা করে।

৪. স্টালিনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নীতি (Stalinist Policies)

ক্ষমতা পাওয়ার পর স্টালিন লেনিনের মিশ্র অর্থনীতি (NEP) বাতিল করে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা চালু করেন। তাঁর মূল নীতিগুলো ছিল:
  • পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (Five-Year Plans): ১৯২৮ সাল থেকে শুরু হওয়া এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল কৃষিভিত্তিক সোভিয়েত ইউনিয়নকে দ্রুত একটি ভারী শিল্পোন্নত দেশে রূপান্তর করা।
  • কৃষির সমবায়করণ (Collectivization): ব্যক্তিগত কৃষিজমি কেড়ে নিয়ে বড় বড় সরকারি খামারে (Kolkhoz) রূপান্তর করা।
  • গ্রেট পার্জ বা মহামুক্তিকরণ (Great Purge): ১৯৩০-এর দশকে দলের ভেতরে নিজের সমস্ত শত্রু, বুদ্ধিজীবী এবং সেনা কর্মকর্তাদের বন্দি বা মৃত্যুদণ্ড দিয়ে নিজের একচ্ছত্র একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন।

৫. স্টালিনের নীতির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক

স্টালিনের শাসনকাল ছিল একাধারে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সাফল্য এবং চরম মানবিক বিপর্যয়ের সংমিশ্রণ।

ইরিবাচক বা ইতিবাচক দিক (Positive Impacts)

  • দ্রুত শিল্পায়ন: মাত্র এক দশকের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি অনগ্রসর কৃষিপ্রধান দেশ থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
  • দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়: স্টালিনের তৈরি ভারী শিল্প ও সামরিক শক্তির ওপর ভর করেই সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নাৎসি বাহিনীকে পরাজিত করতে পেরেছিল।
  • সামাজিক উন্নয়ন: শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থানের ব্যাপক প্রসার ঘটে। শতভাগ সাক্ষরতা অর্জিত হয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দেশ বহুদূর এগিয়ে যায়। 

নেতিবাচক দিক (Negative Impacts)

  • মানবিক বিপর্যয় ও দুর্ভিক্ষ (Holodomor): জোরপূর্বক কৃষির সমবায়করণের ফলে ১৯৩২-৩৩ সালে ইউক্রেন ও কাজাখস্তানে কৃত্রিম মহামারী ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যাতে লাখ লাখ মানুষ না খেয়ে মারা যায়।
  • গুলাগ (Gulag) এবং নির্যাতন: স্টালিনের বিরোধিতা করার অপরাধে বা সামান্য সন্দেহের বশে লক্ষ লক্ষ মানুষকে সাইবেরিয়ার শ্রম শিবিরে (Gulag) অমানুষিক খাটুনির মধ্যে রাখা হতো, যেখানে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে।
  • একনায়কতন্ত্র ও ভয়ের শাসন: বাক-স্বাধীনতা সম্পূর্ণ কেড়ে নেওয়া হয়। ইতিহাস বিকৃত করে নিজের স্তুতি (Cult of Personality) প্রচার করা শুরু হয় এবং স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হয়। [3]
এককথায়, স্টালিন সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরাশক্তিতে পরিণত করেছিলেন, কিন্তু তার মূল্য দিতে হয়েছিল কোটি মানুষের জীবন ও স্বাধীনতার বিনিময়ে।

ট্রটস্কি

লিওন ট্রটস্কি (Leon Trotsky) ছিলেন রুশ বিপ্লবের অন্যতম প্রধান রূপকার, প্রখর মেধাবী তাত্ত্বিক, এবং লাল ফৌজের (Red Army) প্রতিষ্ঠাতা। লেনিনের পর বলশেভিক পার্টির সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা হওয়া সত্ত্বেও স্টালিনের সাথে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে হেরে তাকে দেশ ছাড়তে হয় এবং শেষ পর্যন্ত নির্মম পরিণতির শিকার হতে হয়।
নিচে ট্রটস্কির জীবনের সম্পূর্ণ ইতিহাস ও রাজনৈতিক অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

১. প্রাথমিক জীবন ও বিপ্লবী রাজনীতিতে প্রবেশ

  • জন্ম ও নাম: ১৮৭৯ সালে বর্তমান ইউক্রেনের এক ধনী ইহুদি কৃষক পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর আসল নাম ছিল লেভ দাভিদোভিচ ব্রনস্টাইন। পরবর্তীতে জার সরকারের জেল থেকে পালানোর সময় তিনি ছদ্মনাম নেন 'ট্রটস্কি'।
  • মার্ক্সবাদে দীক্ষা: ছাত্রাবস্থাতেই তিনি জারের শাসনবিরোধী আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৮৯৮ সালে প্রথম গ্রেপ্তার হন এবং তাকে সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত করা হয়।
  • বলশেভিক বনাম মেনশেভিক: ১৯০৩ সালে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টি দুই ভাগে (লেনিনের বলশেভিক এবং মার্তভের মেনশেভিক) বিভক্ত হলে ট্রটস্কি শুরুতে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেন। তবে আদর্শিক কারণে দীর্ঘ সময় লেনিনের সাথে তাঁর তীব্র বিতর্ক চলে।

২. ১৯১৭ সালের বিপ্লব ও ট্রটস্কির ভূমিকা

  • বলশেভিক পার্টিতে যোগ: ১৯১৭ সালে জার শাসনের পতনের পর ট্রটস্কি রাশিয়ায় ফিরে আসেন এবং লেনিনের নীতিকে পুরোপুরি সমর্থন করে আনুষ্ঠানিকভাবে বলশেভিক পার্টিতে যোগ দেন।
  • অক্টোবর বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি: ট্রটস্কি ছিলেন পেট্রোগ্রাদ সোভিয়েতের সভাপতি। লেনিন যখন বিপ্লবের তাত্ত্বিক রূপরেখা দিচ্ছিলেন, ট্রটস্কি তখন মাঠে থেকে সরাসরি অক্টোবর বিপ্লবের (October Revolution) সামরিক পরিকল্পনা ও সশস্ত্র অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন।

৩. লাল ফৌজ গঠন ও গৃহযুদ্ধ (Civil War)

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রী: বিপ্লবের পর তিনি প্রথম সোভিয়েত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী (Commissar for Foreign Affairs) হন এবং জার্মানির সাথে চুক্তি করে রাশিয়াকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে সরিয়ে নেন।
  • রেড আর্মি প্রতিষ্ঠা: এরপর তাকে যুদ্ধ মন্ত্রী করা হয়। তিনি সম্পূর্ণ শূন্য থেকে 'লাল ফৌজ' বা 'রেড আর্মি' গড়ে তোলেন। ১৯১৮-১৯২২ সালের রক্তক্ষয়ী রুশ গৃহযুদ্ধে রাজতন্ত্রী 'সাদা বাহিনী' (White Army) এবং বিদেশী আক্রমণকারীদের পরাজিত করে সোভিয়েত ইউনিয়নকে টিকিয়ে রাখার মূল কৃতিত্ব ছিল ট্রটস্কির সামরিক দক্ষতার।

৪. ট্রটস্কির রাজনৈতিক দর্শন: স্থায়ী বিপ্লব (Permanent Revolution)

ট্রটস্কির মূল তত্ত্ব ছিল "স্থায়ী বা নিরবচ্ছিন্ন বিপ্লব"
  • তাঁর মতে, রাশিয়ার মতো একটি অনগ্রসর দেশে সমাজতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে ইউরোপের অন্যান্য উন্নত শিল্পোন্নত দেশগুলোতেও (যেমন জার্মানি, ফ্রান্স) সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ছড়িয়ে দিতে হবে।
  • তিনি বিশ্বাস করতেন, বিশ্ব বিপ্লব ছাড়া একক কোনো দেশে সমাজতন্ত্র পুরোপুরি সফল হতে পারে না।

৫. স্টালিনের সাথে ক্ষমতা দ্বন্দ্ব ও নির্বাসন

১৯২৪ সালে লেনিনের মৃত্যুর পর ট্রটস্কিকে লেনিনের স্বাভাবিক উত্তরসূরি মনে করা হতো। কিন্তু তিনি স্টালিনের চাতুর্যের কাছে হেরে যান।
  • কোণঠাসা হওয়া: স্টালিন "এক দেশে সমাজতন্ত্র" তত্ত্ব দিয়ে দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে নিজের পক্ষে টানেন এবং ট্রটস্কিকে "দেশদ্রোহী" ও "পার্টি বিরোধী" হিসেবে চিত্রায়িত করেন।
  • দেশত্যাগ: ১৯২৭ সালে ট্রটস্কিকে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়। ১৯২৯ সালে তাকে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে সম্পূর্ণ নির্বাসিত করা হয়। তিনি তুরস্ক, ফ্রান্স ও নরওয়ে হয়ে শেষ পর্যন্ত মেক্সিকোতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন।

৬. নির্মম শেষ পরিণতি (১৯৪০)

নির্বাসনে থেকেও ট্রটস্কি স্টালিনের আমলাতান্ত্রিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কলম ধরা বন্ধ করেননি। তিনি স্টালিনবাদের তীব্র সমালোচনা করে বই ও প্রবন্ধ লিখতে থাকেন।
  • হত্যাকাণ্ড: স্টালিন ট্রটস্কিকে নিজের ক্ষমতার জন্য সবসময়ই হুমকি মনে করতেন। ১৯৪০ সালের ২০ আগস্ট মেক্সিকোতে ট্রটস্কির নিজের বাড়িতেই স্টালিনের একজন গুপ্তচর (রামন মার্কাদের) বরফ কাটার কুড়াল (Ice axe) দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করে।
  • মৃত্যু: এই মারাত্মক আঘাতের পরদিন, অর্থাৎ ২১ আগস্ট ১৯৪০ সালে লিওন ট্রটস্কি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।


স্টালিন ও ট্রটস্কির বিরোধ কোথায়?
স্টালিন ও ট্রটস্কির মূল বিরোধ ছিল আদর্শ, ক্ষমতা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ পরিচালনার নীতি নিয়ে। লেনিনের মৃত্যুর পর ১৯২৪ থেকে ১৯২৯ সালের মধ্যে এই বিরোধ চরম আকার ধারণ করে।
তাঁদের প্রধান প্রধান বিরোধের ক্ষেত্রগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. মতাদর্শগত বিরোধ (সবচেয়ে বড় পার্থক্য)

  • স্টালিনের 'এক দেশে সমাজতন্ত্র' (Socialism in One Country): স্টালিন বিশ্বাস করতেন, বিশ্বজুড়ে বিপ্লবের আশা বাদ দিয়ে প্রথমে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেতরেই সমাজতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হবে। রাশিয়াকে দ্রুত শিল্পায়ন ও সামরিক দিক থেকে স্বাবলম্বী করাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।
  • ট্রটস্কির 'নিরন্তর বিপ্লব' (Permanent Revolution): ট্রটস্কি মনে করতেন, রাশিয়া একটি অনুন্নত দেশ হওয়ায় একা সমাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে পারবে না। ইউরোপের অন্যান্য উন্নত দেশে (যেমন জার্মানি বা ফ্রান্সে) শ্রমিক বিপ্লব না ঘটলে সোভিয়েত ইউনিয়ন শেষ পর্যন্ত পুঁজিবাদী শক্তির কাছে হেরে যাবে। তাই রাশিয়ার উচিত বিশ্ববিপ্লবে উসকানি ও নেতৃত্ব দেওয়া।

২. দলীয় গণতন্ত্র বনাম আমলাতন্ত্র

  • ট্রটস্কির অবস্থান: ট্রটস্কি অভিযোগ করেন যে স্টালিন কমিউনিস্ট পার্টির ভেতরের বাক-স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ধ্বংস করে দিয়েছেন। দল এখন সাধারণ কর্মীদের নয়, বরং স্টালিনের অনুগত আমলা ও কর্মকর্তাদের (Bureaucracy) পকেটে চলে গেছে।
  • স্টালিনের অবস্থান: স্টালিন ট্রটস্কির এই সমালোচনাকে 'দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ' এবং 'উপদলীয় কোন্দল' (Factionalism) হিসেবে আখ্যা দেন, যা লেনিনের তৈরি করা নিয়মের পরিপন্থী ছিল।

৩. অর্থনৈতিক নীতি (কৃষক বনাম শ্রমিক)

  • কৃষকদের ভূমিকা: স্টালিন শুরুতে মধ্যবিত্ত কৃষকদের (Kulaks) ছাড় দিয়ে অর্থনীতি সচল রাখার পক্ষে ছিলেন (যদিও পরে তিনি নিজেই জোরপূর্বক যৌথ খামার বা Collectivization নীতি আনেন)।
  • শিল্পায়নের গতি: ট্রটস্কি অনেক আগে থেকেই কৃষকদের ওপর কঠোর কর চাপিয়ে এবং জোরপূর্বক অতি-দ্রুত শিল্পায়নের (Rapid Industrialization) পক্ষে সওয়াল করেছিলেন, যা স্টালিন তখন 'অবাস্তব' বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

৪. ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক কৌশলের সংঘাত

  • ট্রটস্কি: তিনি ছিলেন একজন তুখোড় বক্তা, তাত্ত্বিক এবং লাল ফৌজের (Red Army) প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু তিনি ছিলেন কিছুটা অহংকারী এবং দলের তৃণমূলের নেতাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারেননি।
  • স্টালিন: স্টালিন পর্দার আড়ালে কাজ করতে পছন্দ করতেন। কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক (General Secretary) হওয়ার সুবাদে তিনি দলের প্রতিটি স্তরে নিজের বিশ্বস্ত লোকদের বসিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে ট্রটস্কির বিপুল জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও সাংগঠনিক ক্ষমতায় তিনি স্টালিনের কাছে হেরে যান।
এই আদর্শ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত স্টালিন জয়ী হন এবং ট্রটস্কিকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেন।

স্টালিন জয়ী হন কীভাবে?
জোসেফ স্টালিন মূলত তাঁর সাংগঠনিক চতুরতা, পর্দার আড়ালের রাজনৈতিক চাল এবং ট্রটস্কির ভুল পদক্ষেপগুলোকে কাজে লাগিয়ে এই ক্ষমতার লড়াইয়ে জয়ী হন। লেনিনের মৃত্যুর পর স্টালিন নিজেকে শীর্ষ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে নিচের কৌশলগুলো ব্যবহার করেছিলেন:

১. সাধারণ সম্পাদকের (General Secretary) পদের অপব্যবহার

১৯২২ সালে স্টালিন যখন কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন, তখন অনেকেই এই পদটিকে একটি বিরক্তিকর আমলাতান্ত্রিক কাজ মনে করতেন। কিন্তু স্টালিন এই পদের ক্ষমতাকে নিখুঁতভাবে ব্যবহার করেন:
  • দলের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি নিজের বিশ্বস্ত ও অনুগত মানুষদের নিয়োগ দেন।
  • এর ফলে যখনই কোনো বিষয়ে ভোট হতো, স্টালিনের অনুগতরা চোখ বন্ধ করে তাঁকে সমর্থন দিত।
  • ট্রটস্কি যতই ভালো বক্তা বা তাত্ত্বিক হোন না কেন, দলের ভেতরে ভোটের জোরে তিনি স্টালিনের কাছে বারবার হেরে যান।

২. রাজনৈতিক জোট গঠন (The Triumvirate)

ট্রটস্কি ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং লাল ফৌজের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁকে একাকী হারানো অসম্ভব জেনে স্টালিন দলের অন্য দুই শীর্ষ নেতা কামেনেভ (Kamenev) এবং জিনোভিয়েভের (Zinoviev) সাথে একটি গোপন ত্রয়ী জোট (Triumvirate) গঠন করেন।
  • এই তিন নেতা মিলে প্রচার করতে থাকেন যে ট্রটস্কি একজন অহংকারী অহিংস নেতা, যিনি লেনিনের জায়গা কেড়ে নিয়ে নিজে একনায়ক বা ডিক্টেটর হতে চান।
  • এই অপপ্রচারের ফলে দলের ভেতরে ট্রটস্কির জনপ্রিয়তা এবং গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত কমতে থাকে।

৩. কামেনেভ ও জিনোভিয়েভকে ধোঁকা দেওয়া

ট্রটস্কিকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার পর স্টালিন তাঁর পুরনো মিত্র কামেনেভ ও জিনোভিয়েভকে দল থেকে ছুড়ে ফেলেন। এবার তিনি দলের ডানপন্থী নেতা নিকোলাই বুখারিনের (Nikolai Bukharin) সাথে হাত মেলান এবং কামেনেভ-জিনোভিয়েভকে 'বামপন্থী বিচ্যুত' আখ্যা দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করেন। সবশেষে, বুখারিনকেও তিনি দল থেকে তাড়িয়ে দিয়ে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হন।

৪. লেনিনের উত্তরাধিকারী হিসেবে নিজেকে জাহির করা

১৯২৪ সালে লেনিনের মৃত্যুর পর স্টালিন নিজেকে লেনিনের একমাত্র সুযোগ্য এবং অনুগত শীর্ষ শিষ্য হিসেবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করেন:
  • তিনি লেনিনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া (Funeral) বিশাল আয়োজনে সম্পন্ন করেন এবং সেখানে প্রধান শোকবার্তা পাঠ করেন।
  • অন্যদিকে, ট্রটস্কি তখন অসুস্থতার কারণে দূরে ছিলেন। স্টালিন তাঁকে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ভুল তারিখ জানিয়ে বিভ্রান্ত করেন, যার ফলে ট্রটস্কি লেনিনের শেষকৃত্যে অংশ নিতে পারেননি। এতে জনগণের কাছে বার্তা যায় যে ট্রটস্কি লেনিনকে সম্মান করেন না।

৫. 'এক দেশে সমাজতন্ত্র' নীতির জনপ্রিয়তা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, রুশ বিপ্লব এবং গৃহযুদ্ধের কারণে রাশিয়ার সাধারণ মানুষ তখন ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত ছিল। ট্রটস্কির 'নিরন্তর বিশ্ববিপ্লব' নীতি শুনলে মানুষ মনে করত রাশিয়াকে আবার কোনো আন্তর্জাতিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হবে। অন্যদিকে স্টালিনের 'এক দেশে সমাজতন্ত্র' (আগে নিজেদের দেশ গড়া) নীতিটি রুশ জনগণের কাছে অনেক বেশি নিরাপদ ও বাস্তবসম্মত মনে হয়েছিল।
এইসব চতুর রাজনৈতিক চালের মাধ্যমে ১৯২৭ সালের মধ্যে স্টালিন ট্রটস্কিকে দল থেকে সম্পূর্ণ বহিষ্কার করেন এবং ১৯২৯ সালে দেশ থেকে নির্বাসিত করে সোভিয়েত ইউনিয়নের একচ্ছত্র শাসক বা ডিক্টেটর হয়ে ওঠেন।

জোসেফ স্টালিনের যৌথ খামারকরণ (Collectivization) নীতি এবং এর ফলশ্রুতিতে ইউক্রেনে ঘটা 'হলোডোমোর' (Holodomor) দুর্ভিক্ষ ছিল সোভিয়েত ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ও নির্মম অধ্যায়।
নিচে এই দুটি বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:

১. যৌথ খামারকরণ নীতি (১৯২৯–১৯৪০)

স্টালিন চেয়েছিলেন দেশের সমস্ত কৃষি জমি এবং উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর রাষ্ট্রের একক ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে।
  • ব্যক্তিগত জমির অবসান: কৃষকদের সমস্ত ব্যক্তিগত জমি, গবাদি পশু এবং কৃষি যন্ত্রপাতি কেড়ে নেওয়া হয়। এগুলোকে একত্রিত করে বিশাল রাষ্ট্রীয় যৌথ খামার বা 'কোলখোজ' (Kolkhoz) গঠন করা হয়।
  • উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা: রাষ্ট্র প্রতিটি খামারের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শস্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা (Quota) বেঁধে দিত। উৎপাদিত ফসলের সিংহভাগ রাষ্ট্র খুব কম মূল্যে শহর এবং সেনাবাহিনীর জন্য নিয়ে যেত।
  • কুলাক উচ্ছেদ (Dekulakization): ধনী কৃষক বা 'কুলাক'রা এই নীতির তীব্র বিরোধিতা করে। স্টালিন তাদের 'শ্রেণীর শত্রু' ঘোষণা করেন। প্রায় ১০ লক্ষেরও বেশি কুলাক পরিবারকে হত্যা করা হয়, জেলে পাঠানো হয় অথবা সাইবেরিয়ার বরফাবৃত অঞ্চলে নির্বাসিত করা হয়। ক্ষোভে অনেক কৃষক তাদের নিজেদের ফসল পুড়িয়ে দেয় এবং গবাদি পশু হত্যা করে।

২. হলোডোমোর: ইউক্রেনের কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ (১৯৩২-১৯৩৩)

ইউক্রেনীয় ভাষায় 'হলোডোমোর' শব্দের অর্থ "ক্ষুধা দ্বারা সৃষ্ট মৃত্যু"। ইউক্রেন ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সবচেয়ে উর্বর এবং প্রধান শস্য উৎপাদনকারী অঞ্চল (Granary of Europe)। কিন্তু স্টালিনের নীতির কারণে সেখানেই সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটে।
  • শস্যের অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা: ১৯৩২ সালে খামারকরণের বিশৃঙ্খলার কারণে উৎপাদন কমে গেলেও স্টালিন ইউক্রেনের জন্য শস্য আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়িয়ে দেন।
  • ব্লকেড বা অবরুদ্ধকরণ: লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় স্টালিন ইউক্রেনের গ্রামগুলো সামরিক বাহিনী দিয়ে অবরুদ্ধ করেন। গ্রামের সমস্ত খাদ্যশস্য, এমনকি বীজ ধান পর্যন্ত বলপ্রয়োগ করে কেড়ে নেওয়া হয়। কোনো কৃষককে গ্রাম থেকে শহরে গিয়ে খাবার খোঁজার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
  • ভয়াবহ মৃত্যুযজ্ঞ: খাবারের অভাবে মানুষ গাছের পাতা, ছাল এবং গৃহপালিত পশুপাখি খেতে শুরু করে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করে যে মানুষ মানুষের মাংস পর্যন্ত খেতে বাধ্য হয়েছিল।
  • মৃতের সংখ্যা: মাত্র এক বছরের মধ্যে ইউক্রেনে প্রায় ৩৯ লক্ষ মানুষ না খেতে পেয়ে মারা যায়। অনেক ইতিহাসবিদ এবং বর্তমানে বহু দেশ একে স্টালিন সরকারের দ্বারা ইউক্রেনীয়দের বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি 'পরিকল্পিত গণহত্যা' (Genocide) হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

ফলাফল ও প্রভাব

এই চরম নিষ্ঠুরতার বিনিময়ে স্টালিন গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। জবরদস্তিমূলকভাবে কেড়ে নেওয়া এই শস্য বিদেশে রপ্তানি করে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে, যা দিয়ে পশ্চিমা প্রযুক্তি ও ভারী শিল্প যন্ত্রপাতি কেনা হয়। এর ফলেই সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্রুত একটি আধুনিক শিল্পোন্নত দেশে রূপান্তরিত হতে পেরেছিল, যার পেছনে ছিল লক্ষ লক্ষ কৃষকের রক্ত ও প্রাণ।
স্টালিনের এই জমানার অন্য কোনো রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান (Great Purge) বা সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পর্কে কি আপনার কোনো প্রশ্ন আছে?

প্রতিটি রাষ্ট্র প্রধানের 
সোভিয়েত ইউনিয়ন (১৯২২–১৯৯১) এর জন্ম থেকে পতন পর্যন্ত সর্বমোট ৭ জন প্রধান রাষ্ট্রপ্রধান বা সর্বময় নেতা শাসন পরিচালনা করেছেন (এখানে ক্ষণস্থায়ী বা নামমাত্র প্রধানদের বাদ দিয়ে মূল নীতিনির্ধারকদের ধরা হয়েছে)। নিচে কালানুক্রমিকভাবে প্রতিটি রাষ্ট্রপ্রধানের ইতিহাস, তাদের ভালো-মন্দ সিদ্ধান্ত, উন্নয়ন, অবনয়ন এবং সার্বিকভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের কারণগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. ভ্লাদিমির লেনিন (Vladimir Lenin) — [শাসনকাল: ১৯২২–১৯২৪]

  • ইতিহাস: বলশেভিক বিপ্লবের (১৯১৭) মহানায়ক এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধান প্রতিষ্ঠাতা। কার্ল মার্ক্সের তত্ত্বকে প্রথম বাস্তব রূপ দেন।
  • উন্নয়ন ও ভালো সিদ্ধান্ত:
    • সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন: ১৯২২ সালে বিভিন্ন অঞ্চলের সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রগুলোকে একত্র করে সোভিয়েত ইউনিয়ন (USSR) গড়ে তোলেন।
    • নিউ ইকোনমিক পলিসি (NEP): গৃহযুদ্ধের পর দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়লে তিনি কিছুটা পিছু হটে মিশ্র অর্থনীতির ‘NEP’ চালু করেন। এর ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কৃষকদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের সুযোগ দিয়ে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করেন।
  • অবনয়ন ও মন্দ সিদ্ধান্ত:
    • রেড টেরর (লাল সন্ত্রাস): ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বিরোধী রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী এবং জার-সমর্থকদের ওপর ব্যাপক সহিংসতা ও দমনপীড়ন চালান।
    • একদলীয় শাসন: বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ চিরতরে বন্ধ করে কমিউনিস্ট পার্টির একচ্ছত্র একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে স্টালিনবাদের ভিত্তি তৈরি করে।

২. জোসেফ স্টালিন (Joseph Stalin) — [শাসনকাল: ১৯২৪–১৯৫৩]

  • ইতিহাস: লেনিনের মৃত্যুর পর দলের ভেতরের সমস্ত প্রতিদ্বন্দ্বীকে (যেমন ট্রটস্কি) সরিয়ে ক্ষমতার শীর্ষে বসেন। তিনি ছিলেন সোভিয়েত ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী ও কঠোর একনায়ক।
  • উন্নয়ন ও ভালো সিদ্ধান্ত:
    • দ্রুত শিল্পায়ন ও পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা: অনগ্রসর কৃষিপ্রধান দেশকে মাত্র এক দশকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করেন।
    • দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়: তাঁর তৈরি ভারী শিল্প ও সামরিক শক্তির ওপর ভর করেই সোভিয়েত ইউনিয়ন হিটলারের নাৎসি বাহিনীকে পরাজিত করে বিশ্ব পরাশক্তিতে পরিণত হয়।
    • সামাজিক খাত: শতভাগ সাক্ষরতা অর্জন, বিনামূল্যে বিশ্বমানের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশ ঘটে।
  • অবনয়ন ও মন্দ সিদ্ধান্ত:
    • জোরপূর্বক সমবায়করণ (Collectivization): কৃষকদের জমি জোর করে রাষ্ট্রীয় খামারে রূপান্তর করায় ইউক্রেন ও কাজাখস্তানে ভয়াবহ কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ (Holodomor) হয়, যাতে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়।
    • গ্রেট পার্জ (মহামুক্তিকরণ) ও গুলাগ: সামান্য সন্দেহের বশে দলের ভেতরে-বাইরে কোটি কোটি মানুষকে হত্যা করা হয় অথবা সাইবেরিয়ার শ্রম শিবিরে (Gulag) অমানুষিক খাটুনিতে মরতে বাধ্য করা হয়।

৩. নিকিতা ক্রুশ্চেভ (Nikita Khrushchev) — [শাসনকাল: ১৯৫৩–১৯৬৪]

  • ইতিহাস: স্টালিনের মৃত্যুর পর এক রক্তপাতহীন ক্ষমতা দ্বন্দ্বে জয়ী হয়ে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের শীর্ষ নেতা হন।
  • উন্নয়ন ও ভালো সিদ্ধান্ত:
    • স্টালিনকরণ-মুক্ত নীতি (De-Stalinization): তিনি স্টালিনের আমলের ভয়ের রাজত্ব এবং গুলাগ প্রথা বন্ধ করেন। রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দেন এবং বাক-স্বাধীনতায় কিছুটা শিথিলতা আনেন (Thaw)।
    • মহাকাশ জয়: তাঁর আমলেই সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ 'স্পুটনিক-১' এবং প্রথম মানুষ 'ইউরি গ্যাগারিন'-কে মহাকাশে পাঠিয়ে স্পেস রেস-এ আমেরিকাকে পেছনে ফেলে দেয়।
  • অবনয়ন ও মন্দ সিদ্ধান্ত:
    • কিউবান মিসাইল সংকট (১৯৬২): আমেরিকার দোরগোড়ায় কিউবায় পারমাণবিক মিসাইল বসিয়ে বিশ্বকে পরমাণু যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যান, যদিও পরে পিছু হটেন।
    • কৃষি বিপর্যয়: সঠিক পরিকল্পনা ছাড়াই সাইবেরিয়ার অনুর্বর জমিতে ব্যাপক ভুট্টা চাষের (Virgin Lands Campaign) সিদ্ধান্ত নিয়ে চরম খাদ্য সংকটের সৃষ্টি করেন।

৪. লিওনিড ব্রেজনেভ (Leonid Brezhnev) — [শাসনকাল: ১৯৬৪–১৯৮২]

  • ইতিহাস: ক্রুশ্চেভের নীতিতে অসন্তুষ্ট হয়ে দলের নেতারা তাকে সরিয়ে ব্রেজনেভকে ক্ষমতায় বসান। তাঁর শাসনকাল ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক শক্তির স্বর্ণযুগ, কিন্তু অর্থনৈতিক পতনকাল।
  • উন্নয়ন ও ভালো সিদ্ধান্ত:
    • সামরিক পরাশক্তি: আমেরিকার সাথে পারমাণবিক ও সামরিক শক্তিতে সমতা (Parity) অর্জন করেন।
    • স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক প্রভাব: ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও মহাকাশ গবেষণায় বড় ভূমিকা রাখেন। খনিজ তেল রপ্তানি করে দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেন।
  • অবনয়ন ও মন্দ সিদ্ধান্ত:
    • স্থবিরতার যুগ (Era of Stagnation): তেলের টাকার ওপর অতি-নির্ভরশীলতার কারণে অভ্যন্তরীণ শিল্প ও প্রযুক্তির আধুনিকায়ন থমকে যায়। অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে আসে।
    • আফগানিস্তান আক্রমণ (১৯৭৯): আফগানিস্তানে সেনা পাঠিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন এক দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, যা ছিল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুল (সোভিয়েতের ভিয়েতনাম)।
    • ব্যাপক দুর্নীতি: সরকারি আমলা ও নেতাদের (Nomenklatura) মধ্যে নজিরবিহীন দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি ছড়িয়ে পড়ে।

৫ & ৬. ইউরি আন্দ্রোপভ এবং কনস্টান্টিন চেরনেনকো — [শাসনকাল: ১৯৮২–১৯৮৫]

  • ইতিহাস: ব্রেজনেভের মৃত্যুর পর এই দুজন প্রবীণ নেতা অত্যন্ত স্বল্প সময়ের জন্য ক্ষমতায় ছিলেন।
  • সার্বিক অবস্থা: আন্দ্রোপভ (সাবেক কেজিবি প্রধান) দুর্নীতি দমনের কিছু চেষ্টা করলেও ১৫ মাসের মাথায় মারা যান। এরপর চেরনেনকো মাত্র ১৩ মাস ক্ষমতায় থেকে মারা যান। এই সময়টিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের "বৃদ্ধতন্ত্রের যুগ" বলা হয়, যা দেশের নীতি নির্ধারণকে পঙ্গু করে দিয়েছিল।

৭. মিখাইল গর্বাচেভ (Mikhail Gorbachev) — [শাসনকাল: ১৯৮৫–১৯৯১]

  • ইতিহাস: মাত্র ৫৪ বছর বয়সে তরুণ নেতা হিসেবে ভঙ্গুর সোভিয়েত ইউনিয়নকে সংস্কার করার উদ্দেশ্যে ক্ষমতায় আসেন। তিনি ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বশেষ রাষ্ট্রপ্রধান।
  • উন্নয়ন ও ভালো সিদ্ধান্ত:
    • গ্লাসনস্ত (Glasnost - উন্মুক্ততা): দেশে বাক-স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন। স্টালিনের আমলের গোপন ইতিহাস জনগণের সামনে উন্মুক্ত করেন।
    • পেরেস্ত্রৈকা (Perestroika - পুনর্গঠন): আমলাতান্ত্রিক অর্থনীতিতে গতি আনতে কিছুটা বাজার অর্থনীতি ও সীমিত ব্যক্তিগত ব্যবসার সুযোগ দেন।
    • আফগান যুদ্ধ অবসান ও নিরস্ত্রীকরণ: আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করেন এবং আমেরিকার সাথে ঐতিহাসিক পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাস চুক্তি সই করে কোল্ড ওয়ার (Cold War)-এর অবসান ঘটান।
  • অবনয়ন ও মন্দ সিদ্ধান্ত:
    • নিয়ন্ত্রণ হারানো: তাঁর সংস্কারগুলো ছিল অর্ধেক ও অপরিকল্পিত। গ্লাসনস্তের কারণে জনগণ ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ পায়, কিন্তু পেরেস্ত্রৈকা অর্থনৈতিক সংকটের সমাধান করতে পারেনি। ফলে দেশে তীব্র খাদ্য সংকট ও মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়।
    • জাতীয়তাবাদের উত্থান: বাক-স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ১৫টি প্রজাতন্ত্রে (যেমন ইউক্রেন, বাল্টিক রাষ্ট্রসমূহ) স্বাধীনতার দাবি জোরালো হয়ে ওঠে, যা গর্বাচেভ কঠোরভাবে দমন করতে পারেননি।

সোভিয়েত ইউনিয়নের সার্বিক পতনের মূল কারণসমূহ (১৯৯১)

১৯৯১ সালের ২৫ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে যায়। এই পতনের পেছনে কোনো একক ব্যক্তি নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা দায়ী ছিল:
  1. অর্থনৈতিক পঙ্গুত্ব: সম্পূর্ণ রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতিতে কোনো প্রতিযোগিতা না থাকায় উৎপাদনশীলতা কমে যায়। সাধারণ মানুষের জন্য ভোগ্যপণ্য (কাপড়, জুতো, সাবান) এবং খাদ্যের তীব্র সংকট তৈরি হয়, যেখানে লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষকে জিনিসপত্র কিনতে হতো।
  2. সামরিক খাতের অতিরিক্ত ব্যয়: আমেরিকার সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সোভিয়েত ইউনিয়ন তার জিডিপির প্রায় ১৫-২০% সামরিক খাতে ব্যয় করত, যা দেশের সাধারণ অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেয়।
  3. আফগান যুদ্ধের ব্যর্থতা: ১০ বছরের দীর্ঘ যুদ্ধে হাজার হাজার সোভিয়েত সৈন্য মারা যায় এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় হয়, যা দেশের ভেতরে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট করে।
  4. চের্নোবিল পারমাণবিক বিপর্যয় (১৯৮৬): এই দুর্ঘটনা শুধু পরিবেশগত বিপর্যয়ই আনেনি, বরং সরকারের গোপনীয়তা বজায় রাখার ব্যর্থতা এবং কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি সোভিয়েত ব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়।
  5. আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি ও আদর্শিক মৃত্যু: কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা সাধারণ মানুষের চেয়ে রাজকীয় জীবনযাপন করতেন। ফলে জনগণের মনে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি আস্থা সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়।

সোভিয়েত ইউনিয়নের এই বিশাল ও জটিল ইতিহাস একনজরে দেখার পর, আপনার কি কোনো নির্দিষ্ট নেতার সময়কাল বা কোনো বিশেষ ঘটনা (যেমন চের্নোবিল বিপর্যয় বা আফগান যুদ্ধ) নিয়ে আরও বিস্তারিত জানার আগ্রহ আছে? আপনি চাইলে আমরা সেই নির্দিষ্ট বিষয়টি নিয়ে আরও গভীরে আলোচনা করতে পারি।
সমাজতন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে বলেই পুঁজির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?
আপনার পর্যবেক্ষণটি এককথায় নিখুঁত এবং ঐতিহাসিকভাবে সম্পূর্ণ সত্য। হ্যাঁ, সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক মডেলটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল বলেই তাঁরা পুঁজিবাদের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
খাতা-কলমে সমাজতন্ত্রের উদ্দেশ্য যত মহৎই হোক না কেন, বাস্তব ময়দানে তা চালাতে গিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানেরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই ব্যবস্থাটি অর্থনৈতিকভাবে আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দিক থেকে সমাজতন্ত্রের ঠিক কোন কোন বড় ব্যর্থতার কারণে এই পুঁজিবাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, তা নিচে সুনির্দিষ্টভাবে আলোচনা করা হলো:

১. উৎপাদন ও জোগানের চরম ব্যর্থতা (Shortage Economy)

সমাজতন্ত্রে যেহেতু কোনো ব্যক্তিগত ব্যবসা থাকে না, তাই জুতো থেকে শুরু করে গাড়ি পর্যন্ত সবকিছু রাষ্ট্রকে বানাতে হতো। রাষ্ট্র একটি কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার (Central Planning) মাধ্যমে ঠিক করত দেশে কতটুকু সাবান বা কতটুকু রুটি লাগবে।
  • বাস্তবতা: এই আমলাতান্ত্রিক হিসাব কখনোই মিলত না। ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের চরম সংকট লেগেই থাকত।
  • পরিণতি: একটা টুথপেস্ট বা রুটি কেনার জন্য সাধারণ মানুষকে কনকনে শীতের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। যে ব্যবস্থা তার নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে পারে না, তার ব্যর্থতা ছিল স্পষ্ট।

২. মানুষের কাজের আগ্রহ বা 'ইনসেনটিভ' (Incentive)-এর অভাব

পুঁজিবাদের মূল শক্তি হলো প্রতিযোগিতা। একজন মানুষ যত ভালো কাজ করবে, সে তত বেশি লাভ বা প্রফিট করবে—এই লোভই মানুষকে নতুন আবিষ্কার ও কঠোর পরিশ্রমে বাধ্য করে। কিন্তু খাঁটি সমাজতন্ত্রে সবাই রাষ্ট্রের কর্মচারী।
  • বাস্তবতা: একজন অলস শ্রমিক এবং একজন অত্যন্ত দক্ষ পরিশ্রমী শ্রমিক—দুজনেই মাস শেষে সমান বেতন ও সমান রেশন পেতেন। ফলে মানুষের মধ্যে ভালো কাজ করার বা নতুন কিছু উদ্ভাবন করার কোনো আগ্রহই অবশিষ্ট ছিল না।
  • পরিণতি: কলকারখানায় উৎপাদনের গতি মারাত্মকভাবে কমে যায় এবং অর্থনীতির চাকা স্থবির হয়ে পড়ে। লেনিন ১৯২১ সালেই বুঝে গিয়েছিলেন যে, মানুষকে কাজের অনুপ্রেরণা দিতে হলে "ব্যক্তিগত লাভের (Profit)" সুযোগ দিতেই হবে।

৩. প্রতিযোগিতার অভাব ও নিম্নমানের প্রযুক্তি

পুঁজিবাদী বাজারে টিকে থাকার জন্য কোম্পানিগুলো দিনরাত তাদের পণ্যের মান উন্নত করে এবং দাম কমায়। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ায় কোনো প্রতিযোগিতা ছিল না। রাষ্ট্র যে ব্র্যান্ডের জুতো বা গাড়ি বানাত, মানুষকে বাধ্য হয়ে সেটাই কিনতে হতো।
  • বাস্তবতা: এর ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি পণ্যের মান আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অত্যন্ত নিম্নমানের হয়ে পড়ে। সামরিক খাত বাদ দিলে, সাধারণ মানুষের ব্যবহারের কোনো প্রযুক্তি বা পণ্য তারা পশ্চিমা বিশ্বের সমকক্ষ করে গড়ে তুলতে পারেনি।

৪. দেউলিয়া দশা ও ঋণের ফাঁদ

লিওনিড ব্রেজনেভের আমল থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন কেবল সামরিক শক্তি প্রদর্শন এবং অন্য দেশের যুদ্ধ (যেমন আফগানিস্তান) অর্থায়নে ব্যস্ত ছিল। ভেতরের অর্থনীতি যে ফাঁপা হয়ে যাচ্ছিল, সেদিকে নজর ছিল না। ১৯৯১ সালের দিকে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, রাশিয়ার নিজেদের খাওয়ার মতো গম কেনার টাকাও রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ছিল না।
তখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং মার্কিন ব্যাংকগুলোর কাছে হাত পাতা ছাড়া রাশিয়ার আর কোনো উপায় ছিল না। আর পশ্চিমা বিশ্ব পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল, ঋণ পেতে হলে সমাজতন্ত্রের খাতা বন্ধ করে পুঁজিবাদের "মুক্তবাজার" নীতি চালু করতে হবে।
সারসংক্ষেপ:
সুতরাং, লেনিন বা ইয়েলতসিন শখ করে পুঁজিবাদের সিদ্ধান্ত নেননি। সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটি ভেতর থেকে এতটাই পচে এবং ভেঙে পড়েছিল যে, দেশ সচল রাখতে এবং দেউলিয়া দশা থেকে বাঁচতে পুঁজিবাদকে আলিঙ্গন করা ছাড়া তাঁদের সামনে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না।
রাশিয়ার এই সমাজতান্ত্রিক ব্যর্থতার পর আজকের পুতিনের রাশিয়া কীভাবে রাষ্ট্র ও পুঁজিবাদের মিশ্রণে চলছে, তা নিয়ে কি আপনি জানতে চান?

জোসেফ স্টালিনকে আজকের সমাজবিদরা কীভাবে সমীক্ষা করেন?

আজকের সমাজবিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জোসেফ স্টালিনকে কোনো একক বা সরলরেখায় মূল্যায়ন করেন না। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর গোপন রাষ্ট্রীয় নথিপত্র (Soviet Archives) উন্মুক্ত হওয়ায় স্টালিনের ওপর গবেষণার গভীরতা ও দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বদলে গেছে।
আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসচর্চায় স্টালিনকে প্রধানত তিনটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমীক্ষা করা হয়:

১. 'টোটালিটারিয়ানিজম' বা চরম স্বৈরতন্ত্রের মূর্ত প্রতীক

অধিকাংশ আধুনিক সমাজবিজ্ঞানী স্টালিনকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সবচেয়ে নিষ্ঠুর একনায়ক হিসেবে চিহ্নিত করেন। আরিস্টটলের স্বৈরতন্ত্রের তত্ত্ব এবং আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের 'টোটালিটারিয়ান' (Totalitarian) মডেলের নিখুঁত উদাহরণ হিসেবে তাকে দেখা হয়: 
  • মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: সমাজবিজ্ঞানীরা স্টালিনের চরম 'প্যারানয়া' বা গভীর অবিশ্বাসের ব্যাধি নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি ক্ষমতার জন্য নিজের দলের অনুগতদেরও রেহাই দেননি।
  • কাঠামোগত সহিংসতা: তাঁর 'গ্রেট পার্জ' (Great Purge) এবং সাইবেরিয়ার 'গুলাগ' শ্রমশিবিরগুলোকে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে "রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সুপরিকল্পিত সামাজিক প্রকৌশল ও নিধনীকরণ" (State-sponsored Social Engineering) হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। 
  • ব্যক্তিপূজা (Cult of Personality): প্রচারমাধ্যম ও সংস্কৃতির ওপর শতভাগ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে কীভাবে একজন মানুষকে দেবতার স্তরে নিয়ে যাওয়া যায়, আধুনিক মিডিয়া ও সমাজতত্ত্বে স্টালিনবাদ তার একটি প্রধান কেস স্টাডি। 

২. 'আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ' ও বাস্তববাদী আধুনিকায়ন

সমাজবিজ্ঞানের একটি বড় অংশ (বিশেষ করে বামপন্থী বা বাস্তববাদী গবেষকরা) স্টালিনের নীতিগুলোকে পুরোপুরি আদর্শিক না দেখে চরম 'প্রাগম্যাটিজম' বা বাস্তববাদিতা হিসেবে দেখেন: 
  • অতি-বাস্তববাদী বা আল্ট্রা-রিয়ালিস্ট: স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নরম্যান নেইমার্কের মতো গবেষকদের মতে, স্টালিন ছিলেন একজন চরম বাস্তববাদী (Ultimate Realist)। সমাজতন্ত্রের আন্তর্জাতিক আদর্শের চেয়ে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের নিজস্ব ভৌগোলিক ও সামরিক নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন।
  • বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আধুনিকায়ন: সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, পশ্চিমা দেশগুলো যে শিল্পায়নে ১০০ বছর সময় নিয়েছিল, স্টালিন তা মাত্র ১০ বছরে করতে চেয়েছিলেন। একে সমাজতত্ত্বে "জোরপূর্বক আধুনিকায়ন" (Forced Modernization) বলা হয়। তবে গবেষকদের প্রশ্ন—এই অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য কোটি কোটি মানুষের জীবনের যে মূল্য (Human Cost) দিতে হয়েছিল, তা কোনোভাবেই কি গ্রহণযোগ্য ছিল?

৩. আধুনিক রাশিয়ায় 'নব্য-স্টালিনবাদ' এবং জাতীয়তাবাদী পুনরুত্থান

বর্তমান সময়ের সমাজবিজ্ঞানীদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় গবেষণার বিষয় হলো—আজকের রাশিয়ায় স্টালিনের জনপ্রিয়তা কেন বাড়ছে? 
  • পাসপোর্টের চেয়ে দেশ বড় (Imperial Nostalgia): আধুনিক রাশিয়ার সামাজিক জরিপগুলোতে (যেমন লেভাডা সেন্টার) দেখা গেছে, ৭০% এরও বেশি রুশ নাগরিক স্টালিনের ঐতিহাসিক ভূমিকাকে ইতিবাচক মনে করেন। সমাজবিজ্ঞানীরা একে বলছেন "সাম্রাজ্যবাদী নস্টালজিয়া"। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়া যে বৈশ্বিক মর্যাদা হারিয়েছিল, মানুষ স্টালিনের মধ্য দিয়ে সেই ‘পরাশক্তি’র গৌরব ফিরে পেতে চায়।
  • পুতিন প্রশাসনের রাজনৈতিক ব্যবহার: গবেষকদের মতে, বর্তমান রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন সরকার স্টালিনকে একজন "সমাজতন্ত্রী" হিসেবে নয়, বরং একজন "মহান দেশপ্রেমিক, আধুনিকায়নকারী এবং যুদ্ধবিজয়ী নেতা" হিসেবে পাঠ্যপুস্তক ও প্রচারণায় তুলে ধরছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারকে হারানোর কৃতিত্বকে সামনে রেখে স্টালিনকে রাশিয়ার জাতীয় ঐক্যের প্রতীক বানানো হচ্ছে।
সংক্ষেপে:
আজকের সমাজবিদদের চোখে স্টালিন একই সাথে একজন ভয়াবহ মানবতাবিদ্বোধী অপরাধী এবং একটি অনগ্রসর রাষ্ট্রকে পরাশক্তিতে রূপান্তরকারী চতুর ও নির্মম প্রকৌশলী। বর্তমান সমাজবিজ্ঞান তাঁর নিষ্ঠুরতাকে কোনোভাবেই বৈধতা দেয় না, তবে একবিংশ শতাব্দীতে এসেও পপুলিজম বা জাতীয়তাবাদের প্রয়োজনে কীভাবে একজন মৃত একনায়ককে পুনরায় জনপ্রিয় করে তোলা যায়, স্টালিনের বর্তমান ইমেজ তারই প্রমাণ।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর স্টালিনের গোপন রাষ্ট্রীয় নথিপত্র যা উন্মুক্ত হয়েছে সেসবের বিস্তারিত বর্ণনা কর

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক পতন এবং মিখাইল গর্বাচেভের 'গ্লাসনস্ত' (উন্মুক্ততা) নীতির ফলে ক্রেমলিনের সবচেয়ে সুরক্ষিত এবং গোপন রাষ্ট্রীয় নথিপত্রগুলো (Soviet Archives) বিশ্বজুড়ে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। একে বলা হয় "আর্কাইভাল বিপ্লব" (Archival Revolution)। 
এই নথিপত্রগুলো উন্মুক্ত হওয়ার পর জোসেফ স্টালিনের শাসনকাল, তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং তাঁর নির্দেশে ঘটা বিভিন্ন ঐতিহাসিক নৃশংসতার এমন সব তথ্য সামনে আসে, যা আগে কেবল অনুমান করা হতো। এই গোপন নথিপত্রগুলোর একটি বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো: 

১. 'মহামুক্তিকরণ' (Great Purge) ও মৃত্যুদণ্ডের গোপন তালিকা

আর্কাইভ খোলার পর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে স্টালিনের সরাসরি নির্দেশে চালানো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলার পর।
  • ডেথ লিস্ট (Death Lists): গবেষকরা স্টালিনের ব্যক্তিগত ফাইল থেকে এমন শত শত তালিকা খুঁজে পান, যেখানে সমাজতান্ত্রিক দলের শীর্ষ নেতা, বুদ্ধিজীবী এবং সেনা কর্মকর্তাদের নাম ছিল। এই তালিকাগুলোর নিচে স্টালিনের নিজের হাতের স্বাক্ষর এবং লাল কালির টিক চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা নির্দেশ করত যে তাদের বিচার ছাড়াই সরাসরি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক।
  • কোটা পদ্ধতি: গোপন নথিতে দেখা যায়, তৎকালীন সোভিয়েত গোপন পুলিশকে (NKVD) প্রতিটি অঞ্চল থেকে কতজন মানুষকে "জনগণের শত্রু" হিসেবে গ্রেপ্তার বা হত্যা করতে হবে, তার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বা 'কোটা' বেঁধে দেওয়া হতো।

২. কাটিন বন massacre (Katyn Massacre)-এর সত্যতা 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪০ সালে পোল্যান্ডের প্রায় ২২,০০০ সামরিক কর্মকর্তা ও বুদ্ধিজীবীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। দশকের পর দশক ধরে সোভিয়েত ইউনিয়ন এই হত্যাকাণ্ডের দায় নাৎসি জার্মানির ওপর চাপিয়ে আসছিল। 
  • বেরিয়ার গোপন চিঠি: ১৯৯১ সালের পর উন্মুক্ত হওয়া "প্যাকেট নম্বর ১" (Packet No. 1) নামক অতি-গোপন ফাইল থেকে আসল সত্য উন্মোচিত হয়।
  • এতে দেখা যায়, ১৯৪০ সালের ৫ মার্চ গোপন পুলিশ প্রধান লাভরেন্তি বেরিয়া স্টালিনকে একটি চিঠি লিখে পোলিশ বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার প্রস্তাব করেন। সেই চিঠির ওপরে স্টালিনসহ পলিটব্যুরোর অন্য সদস্যদের নীল পেন্সিলের স্বাক্ষর পাওয়া যায়, যা পোলিশদের হত্যার সরাসরি রাষ্ট্রীয় আদেশ প্রমাণ করে।

৩. গুলাগ (Gulag) ব্যবস্থার ভয়াবহতা ও মৃত্যুর সঠিক পরিসংখ্যান

স্টালিনের আমলের কুখ্যাত সাইবেরিয়ার শ্রমশিবির বা 'গুলাগ' ব্যবস্থার আসল স্কেল ও পরিসংখ্যান এই নথিপত্রগুলোর মাধ্যমে প্রথম সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়। 
  • আগে পশ্চিমা ইতিহাসবিদরা অনুমান করতেন যে স্টালিনের দমনপীড়নে কয়েক কোটি মানুষ মারা গেছে। কিন্তু অফিসিয়াল রেকর্ড (যেমন- গুল্যাগ ডিরেক্টরেটের ফাইল) খোলার পর দেখা যায়, ১৯২১ থেকে ১৯৫৩ সালের মধ্যে প্রায় ৪-৫ মিলিয়ন (৪০-৫০ লাখ) মানুষ সরাসরি মৃত্যুদণ্ড বা গুলাগের অমানুষিক নির্যাতন ও অনাহারে মারা গিয়েছিল। 
  • বন্দিদের ওপর খাটাখাটুনির হিসাব, তাদের দৈনিক সামান্য খাদ্যের বরাদ্দ এবং বন্দিশিবিরগুলোকে কীভাবে সোভিয়েত অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি (যেমন মাইনিং বা ক্যানেল খনন) হিসেবে ব্যবহার করা হতো, তার নিখুঁত আমলাতান্ত্রিক হিসাব এই ফাইলগুলোতে পাওয়া যায়। 

৪. ইউক্রেনের কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ (Holodomor)

১৯৩২-৩৩ সালে ইউক্রেনে হওয়া ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের যে নিজস্ব নথিপত্র ছিল, তা সামনে আসে।
  • ফাইলগুলো প্রমাণ করে যে, এই দুর্ভিক্ষ কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না। স্টালিন সরকার ইউক্রেনের কৃষকদের সমস্ত শস্য ও বীজ জোরপূর্বক কেড়ে নিয়েছিল এবং ইউক্রেনের সীমান্ত সিল করে দিয়েছিল যাতে ক্ষুধার্ত মানুষ অন্য কোথাও পালিয়ে যেতে না পারে। নথিতে স্টালিনের এমন বহু নির্দেশনামা পাওয়া যায়, যেখানে শস্য লুকিয়ে রাখার অপরাধে কৃষকদের সরাসরি গুলি করার আদেশ ছিল। 

৫. হিটলার-স্টালিন গোপন চুক্তি (Molotov-Ribbentrop Pact)

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে জার্মানির সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের যে 'অনাক্রমণ চুক্তি' হয়েছিল, তার একটি অত্যন্ত গোপন অংশ (Secret Protocol) সোভিয়েত ইউনিয়ন সবসময় অস্বীকার করে আসছিল। 
  • আর্কাইভের মূল নথি থেকে প্রমাণিত হয় যে, হিটলার এবং স্টালিন গোপনে চুক্তি করেছিলেন যে তারা পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড এবং বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোকে (এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া) নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবেন। এই নথির প্রকাশ সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতির আসল রূপটি বিশ্বের সামনে উন্মোচন করে। 

৬. স্টালিনের ব্যক্তিগত লাইব্রেরি ও ডায়েরি (Stalin's Personal Notes)

রুশ রাষ্ট্রীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস আর্কাইভ (RGASPI) থেকে স্টালিনের ব্যক্তিগত জীবনের বহু গোপন নথি সামনে আনা হয়। 
  • বইয়ের মার্জিন নোট (Marginalia): স্টালিনের ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে প্রায় ৪০০টিরও বেশি বই পাওয়া যায়, যেগুলোর পৃষ্ঠার কোণায় তিনি নিজের হাতে মন্তব্য লিখে রেখেছিলেন। বিশেষ করে লেনিন, ট্রটস্কি এবং বুখারিনের লেখা বইগুলোর ওপর তাঁর করা এই মন্তব্যগুলো থেকে বোঝা যায় দলের অন্য নেতাদের প্রতি তাঁর তীব্র ঈর্ষা, ঘৃণা এবং গভীর মনস্তাত্ত্বিক অবিশ্বাস কেমন ছিল। 
  • পরাশক্তি কূটনীতি: বিশ্বনেতাদের (যেমন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল) সাথে স্টালিনের সম্পূর্ণ যুদ্ধকালীন চিঠি এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বজয়ের নিজস্ব রণকৌশলের নকশাও এই আর্কাইভে পাওয়া যায়। 

উপসংহার:
১৯৯১ সালের এই আর্কাইভাল উন্মোচন স্টালিনকে নিয়ে বিশ্ব রাজনীতির ধারণাই বদলে দেয়। এটি প্রমাণ করে যে স্টালিনের আমলের নৃশংসতা কোনো বিশৃঙ্খল ঘটনা ছিল না, বরং অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায়, সুপরিকল্পিত এবং সম্পূর্ণ আমলাতান্ত্রিক উপায়ে রাষ্ট্রপ্রধানের নির্দেশে পরিচালিত হয়েছিল। 

কাটিন গণহত্যা ইতিহাস কী?
কাটিন গণহত্যা (Katyn Massacre) ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঘটিত ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস এবং ঠান্ডা মাথার একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। ১৯৪০ সালের এপ্রিল ও মে মাসে তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের গোপন পুলিশ বাহিনী এনকেভিডি (NKVD) জোসেফ স্টালিনের সরাসরি আদেশে পোল্যান্ডের প্রায় ২২,০০০ সামরিক কর্মকর্তা, বুদ্ধিজীবী, ডাক্তার ও প্রকৌশলীকে সম্পূর্ণ গোপনে গুলি করে হত্যা করে।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এই গণহত্যার অতি-গোপন নথিপত্র বা "প্যাকেট নম্বর ১" উন্মুক্ত হওয়ার পর এই ঘটনার রোমহর্ষক সত্যতা ও বিবরণ বিশ্বের সামনে আসে। নিচে কাটিন গণহত্যার সম্পূর্ণ ইতিহাস ও গোপন নথির বিবরণ তুলে ধরা হলো:

১. গণহত্যার পটভূমি (১৯৩৯–১৯৪০)

  • পোল্যান্ড বিভাজন: ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হিটলারের জার্মানি এবং স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন 'মলোটোভ-রিবেনট্রপ' চুক্তির অধীনে পোল্যান্ডকে নিজেদের মধ্যে দুই ভাগে ভাগ করে নেয়।
  • বন্দী শিবির: পূর্ব পোল্যান্ড দখলের পর সোভিয়েত লাল ফৌজ পোলিশ সেনাবাহিনীর হাজার হাজার কর্মকর্তা, পুলিশ এবং উচ্চশিক্ষিত বেসামরিক নাগরিকদের বন্দী করে রাশিয়ার বিভিন্ন শিবিরে নিয়ে যায়।
  • স্টালিনের ভয়: স্টালিন এবং তাঁর সহযোগীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে এই উচ্চশিক্ষিত পোলিশ নাগরিকরা ভবিষ্যতে পোল্যান্ডে পুনরায় সোভিয়েত-বিরোধী বা স্বাধীনচেতা আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে। তাই তাদের চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।

২. বেরিয়ার চিঠি এবং স্টালিনের স্বাক্ষর (The Death Warrant)

১৯৯১ সালে উন্মুক্ত হওয়া "প্যাকেট নম্বর ১" (Packet No. 1) ফাইলে এই গণহত্যার সবচেয়ে অকাট্য প্রমাণটি পাওয়া যায়:
  • ১৯৪০ সালের ৫ মার্চ, সোভিয়েত গোপন পুলিশ (NKVD) প্রধান লাভরেন্তি বেরিয়া স্টালিনের কাছে একটি অতি-গোপন চিঠি পাঠান।
  • চিঠিতে বেরিয়া যুক্তি দেন যে, বন্দী পোলিশ কর্মকর্তারা হলেন "সোভিয়েত ব্যবস্থার কট্টর ও সংশোধনাতীত শত্রু"। তাই কোনো বিচার বা তদন্ত ছাড়াই তাদের সবাইকে সর্বোচ্চ শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড) দেওয়া হোক।
  • এই চিঠির ওপর জোসেফ স্টালিন, ক্লিমেন্ট ভরশিলভ, ভিয়াচেস্লাভ মলোটোভ এবং মিখাইল কালিনিনের মতো শীর্ষ সোভিয়েত নেতাদের নিজের হাতের স্বাক্ষর ও সম্মতি (নীল পেন্সিলে লেখা) পাওয়া যায়। এটিই ছিল ২২,০০০ মানুষের অফিশিয়াল ডেথ ওয়ারেন্ট বা মৃত্যুদণ্ডের আদেশ।

৩. যেভাবে হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছিল

১৯৪০ সালের এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে বন্দীদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে কাটিন বন (স্মলেনস্ক, রাশিয়া), কালিনিন এবং খারকিভের গোপন বন্দিশিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়।
  • পদ্ধতি: বন্দীদের হাত পেছনে শক্ত করে বেঁধে একটি অন্ধকার ঘরে বা বনের গর্তের সামনে আনা হতো। এরপর জার্মান তৈরি পিস্তল (যাতে পরবর্তীতে জার্মানির ওপর দোষ চাপানো যায়) দিয়ে তাদের মাথার পেছনে খুব কাছ থেকে গুলি করা হতো।
  • গণকবর: গুলি করার পর লাশগুলো কাটিন বনের বিশাল বিশাল গর্তে স্তূপ করে মাটি চাপা দেওয়া হতো এবং তার ওপর পাইন গাছ রোপণ করা হতো যাতে কেউ কখনো সন্দেহ না করতে পারে।

৪. জার্মানির আবিষ্কার এবং সোভিয়েতের মিথ্যাচার (১৯৪৩)

১৯৪৩ সালে নাৎসি জার্মানি যখন রাশিয়া আক্রমণ করে, তখন তারা কাটিন বনে পাইন গাছের নিচে হাজার হাজার পোলিশ সামরিক অফিসারের গণকবর আবিষ্কার করে এবং তা বিশ্ব মিডিয়ার সামনে প্রচার করে।
  • সোভিয়েত অস্বীকার: স্টালিন সরকার তাৎক্ষণিকভাবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে। তারা পাল্টা দাবি করে যে, ১৯৪১ সালে জার্মানরাই পোল্যান্ডের এই লোকদের হত্যা করেছে।
  • কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন: পোল্যান্ডের তৎকালীন প্রবাসী সরকার (লন্ডনে অবস্থিত) যখন এই ঘটনার আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করে, তখন স্টালিন ক্ষুব্ধ হয়ে পোলিশ সরকারের সাথে সমস্ত কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেন। পরবর্তীতে মিত্রশক্তি (আমেরিকা ও ব্রিটেন) যুদ্ধের স্বার্থে স্টালিনকে চটাতে চায়নি, তাই তারাও এই বিষয়ে নীরবতা বজায় রেখেছিল।

৫. ১৯৯১ সালের "আর্কাইভাল বিপ্লব" ও সত্যের জয়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে প্রায় ৫০ বছর ধরে সোভিয়েত ইউনিয়ন এই হত্যাকাণ্ডের দায় অস্বীকার করে আসছিল এবং রাশিয়ার পাঠ্যপুস্তকে একে জার্মানির অপরাধ হিসেবে দেখানো হতো।
  • গোপন নথি প্রকাশ: ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ঠিক আগে এবং পরে মিখাইল গর্বাচেভ এবং পরবর্তী রুশ প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন ক্রেমলিনের বিশেষ আর্কাইভ থেকে "প্যাকেট নম্বর ১" বের করেন।
  • অফিশিয়াল স্বীকারোক্তি: ১৯৯২ সালে বরিস ইয়েলৎসিন এই নথির মূল কপি পোল্যান্ডের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লেখ ওয়ালেসার হাতে তুলে দেন এবং রাশিয়ার পক্ষে অফিশিয়ালি ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ২০১০ সালে রাশিয়ার পার্লামেন্ট (দুমা) একটি প্রস্তাব পাস করে স্বীকার করে যে, এই গণহত্যা স্টালিন এবং অন্যান্য সোভিয়েত কর্মকর্তাদের সরাসরি নির্দেশে ঘটেছিল।

কাটিন গণহত্যা ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় মিথ্যাচার এবং আমলাতান্ত্রিক নৃশংসতার এক চরম উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

ব্যবস্থাগত অসম্পূর্ণতা নাকি নেতৃত্বের ব্যর্থতা?