জোসেফ স্টালিন: একটি সমাজতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ


 

জোসেফ স্টালিন: একটি সমাজতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ।

১. ইতিহাস ও জীবনী (১৮৭৮-১৯৫৩) —

➡️জন্মঃ
স্তালিন ১৮৭৮ সালের ১৮ই ডিসেম্বর জর্জিয়ার গোরি শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আসল নাম ছিল ইওসিফ ভিসারিওনোভিচ জুগাশভিলি। পরবর্তীতে তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে 'স্টালিন' রাখেন। যার অর্থ 'ইস্পাতের মানব'।

➡️শৈশব ও শিক্ষা:
তাঁর শৈশব কেটেছে চরম দারিদ্র্য ও পারিবারিক সহিংসতার মধ্যে। বাবা ছিলেন মদ্যপ এবং মা ছিলেন গৃহকর্মী। মায়ের ইচ্ছায় তিনি 'তিফলিস থিওলজিক্যাল সেমিনারি'-তে যাজক বা পুরোহিত হওয়ার জন্য পড়াশোনা শুরু করেন।

➡️বিপ্লবী রাজনীতিতে প্রবেশ:
সেমিনারিতে থাকাকালীন তিনি কার্ল মার্ক্সের মতাদর্শের সংস্পর্শে আসেন এবং জার-বিরোধী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ফলে ১৮৯৯ সালে তিনি সেমিনারি থেকে বহিষ্কৃত হন। এরপর তিনি ভ্লাদিমির লেনিনের বলশেভিক দলে যোগ দেন এবং দলের তহবিল সংগ্রহের জন্য একাধিক ব্যাংক ডাকাতি ও গোপন কার্যকলাপে নেতৃত্ব দেন। ১৯০২ থেকে ১৯১৭ সালের মধ্যে তিনি বহুবার গ্রেপ্তার হন এবং সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত হন।

➡️ক্ষমতায় আরোহণ:
১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের পর তিনি বলশেভিক সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসেন এবং ১৯২২ সালে পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। ১৯২৪ সালে লেনিনের মৃত্যুর পর সুকৌশলে লিওন ট্রটস্কিসহ অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের অপসারিত করে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের একক ডিক্টেটর বা একনায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

২. পারিবারিক জীবন ও পরিণতি—

স্টালিনের পারিবারিক জীবন ছিল বিচ্ছিন্নতা, একাকীত্ব এবং চরম নিষ্ঠুরতায় ভরা। প্রথম স্ত্রী ইয়েকাতেরইনা সোয়ানিদজে ১৯০৭ সালে টাইফয়েডে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর স্টালিন বলেছিলেন, মানুষের প্রতি তাঁর শেষ মানবিক অনুভূতিটুকুও হারিয়ে গেছে।

প্রথম পক্ষের ছেলে ইয়াকভ জুগাশভিলির সাথে স্টালিনের সম্পর্ক মধুর ছিল না। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানদের হাতে বন্দী হন। হিটলার তাঁকে এক জার্মান 'ফিল্ড মার্শালের' বদলে মুক্তি দিতে চাইলে স্টালিন তা প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৪৩ সালে বন্দী শিবিরেই ইয়াকভ মারা যান।

দ্বিতীয় স্ত্রী নাদেঝদা আলুয়েভা স্টালিনের রাজনৈতিক কঠোরতা সহ্য করতে না পেরে ১৯৩২ সালে নিজের বুকে গুলি করে আত্মহত্যা করেন।

দ্বিতীয় পক্ষের পুত্র সন্তান ভ্যাসিলি বিমান বাহিনীর জেনারেল হলেও চরম মদ্যপ ছিলেন এবং ৪১ বছর বয়সে মারা যান।

একমাত্র মেয়ে সভেতলানা ১৯৬৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পালিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন এবং বাবার স্বৈরাচারী শাসনের তীব্র সমালোচনা করেন।

➡️স্টালিনের শেষ পরিণতি (মৃত্যু):

৫ই মার্চ, ১৯৫৩ সালে মস্কোর অদূরে নিজের বাংলোতে পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় নিঃসঙ্গভাবে মারা যান। স্ট্রোক করার পর প্রায় ১০-১২ ঘণ্টা ভয়ে কোনো রক্ষী বা ডাক্তার তাঁর ঘরে ঢোকার সাহস করেনি, যা তাঁর নিজের তৈরি করা ভয়ের সংস্কৃতিরই চরম পরিণতি ছিল।

পরদিন যখন তাঁর শীর্ষ রাজনৈতিক সহযোগীরা (বেরিয়া, ক্রুশ্চেভ, মালেঙ্কভ) তাঁকে দেখতে আসেন, তাঁরাও অবিলম্বে ডাক্তার ডাকেননি। ধারণা করা হয়, স্টালিন মারা যাক—সেটিই তাঁরা মনে মনে চাচ্ছিলেন, কারণ স্টালিন তাঁদের অনেককেই পরবর্তী শুদ্ধি অভিযানে (Purge) হত্যার পরিকল্পনা করছিলেন। অবশেষে ৫ই মার্চ, ১৯৫৩ সালে ৭৪ বছর বয়সে স্টালিন মারা যান। চিকিৎসকদের মতে, স্ট্রোকের ফলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণই ছিল তাঁর মৃত্যুর কারণ।

➡️মৃত্যুর পর স্টালিনের উত্তরাধিকারের পরিণতি (De-Stalinization)—

স্টালিন মৃত্যুর সময়কালে যে পরিণতি ভোগ করেছিলেন, তা ছিল তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত। তিনি ভেবেছিলেন ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে থাকবেন, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরই সোভিয়েত ইউনিয়ন তাঁর স্মৃতি মুছে ফেলতে শুরু করে। স্টালিনের মৃত্যুর পর ক্ষমতার শীর্ষে আসেন নিকিতা ক্রুশ্চেভ। ১৯৫৬ সালে কমিউনিস্ট পার্টির এক গোপন অধিবেশনে ক্রুশ্চেভ স্টালিনের নির্মম হত্যাকাণ্ড, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং 'ব্যক্তিত্ব পূজা'-র তীব্র নিন্দা করেন। একে ইতিহাসে "ডি-স্টালিনাইজেশন" (De-Stalinization) বলা হয়। মৃত্যুর পর স্টালিনের লাশ মমি করে রেড স্কয়ারের লেনিনের সমাধিসৌধের পাশে রাখা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৬১ সালে সোভিয়েত সরকার সেখান থেকে স্টালিনের মমি বের করে নেয় এবং ক্রেমলিনের দেয়ালের পাশে একটি সাধারণ কবরে তাঁকে সমাহিত করে।

৩. ঐতিহাসিক সফলতা—

➡️ দ্রুত শিল্পায়ন (Industrialization):

একদিকে যেমন জোসেফ স্তালিনের শাসনকাল (১৯২৪-১৯৫৩) সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায়। এক দশক পিছিয়ে থাকা একটি কৃষিপ্রধান দেশকে তিনি পারমাণবিক পরাশক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন, বিপরীতে যার বিনিময়ে মূল্য দিতে হয়েছিল লাখ লাখ মানুষের জীবন। পরে বিস্তারিত বিবরণ থাকবে।

➡️ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়:

নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে মহাজাগতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলে (Great Patriotic War) বার্লিন দখল করেন এবং অক্ষশক্তির পতন ঘটিয়ে বিশ্বমঞ্চে সমাজতন্ত্রের সীমানা বৃদ্ধি করেন।

➡️বিজ্ঞান ও শিক্ষার বিস্তার:

দেশজুড়ে নিরক্ষরতা দূরীকরণ, আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তি স্থাপন করেন, যা পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নকে মহাকাশ জয়ের উপযোগী করে তোলে। প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষণ তাঁর আমলেই হয়েছিল। ১৯৪৯ সালের ২৯শে আগস্ট ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান কাজাখস্তানের অন্তর্ভুক্ত) সেমিপালাতিনস্ক টেস্ট সাইটে এই সফল পরীক্ষাটি চালানো হয়।

৪. ব্যর্থতা ও ঐতিহাসিক ত্রুটি—

➡️জোরপূর্বক যৌথ খামার (Collectivization):

জোসেফ স্তালিনের প্রবর্তিত জোরপূর্বক যৌথ খামার ব্যবস্থা (Forced Collectivization) ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়। মূলত ছোট ছোট ব্যক্তিগত জমি কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বড় খামার (যাকে রাশিয়াতে কোলখোজ বা Kolkhoz বলা হতো) তৈরি করাই ছিল এর লক্ষ্য। কৃষিজমি রাষ্ট্রীয়করণের জোরপূর্বক নীতির ফলে উৎপাদন ভেঙে পড়ে। এর ফলে ১৯৩২-৩৩ সালে ইউক্রেন ও রাশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এক ভয়াবহ কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় (যা ইউক্রেনে 'হলোডোমোর' নামে পরিচিত), যেখানে লাখ লাখ মানুষ মারা যান।

➡️জোরপূর্বক শিল্পায়ন (Forced Industrialization):

অর্থনৈতিক ও মানবিক—এই দুই দৃষ্টিকোণ থেকে স্তালিনের জোরপূর্বক শিল্পায়নের মূল্যায়ন ভিন্ন হতে পারে। তবে আধুনিক ঐতিহাসিক ও অর্থনীতিবিদদের সিংহভাগের মতে, এটি একটি চরম বিপর্যয় ও বড় ভুল ছিল, কারণ এর অর্থনৈতিক সাফল্যের চেয়ে মানবিক ও সামাজিক মূল্য ছিল অনেক বেশি ভয়াবহ।

➡️দ্য গ্রেট পার্জ বা "মহা শুদ্ধি অভিযান" (১৯৩৬-১৯৩৮):

মহা শুদ্ধি অভিযান (The Great Purge) ছিল ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে জোসেফ স্তালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়নে চালানো এক দেশব্যাপী চরম দমনপীড়ন ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। নিজের ক্ষমতা নিষ্কণ্টক করতে তিনি বলশেভিক পার্টির মূল প্রতিষ্ঠাতা, সামরিক বাহিনীর শীর্ষ জেনারেল এবং বুদ্ধিজীবীদের রাষ্ট্রদ্রোহের মিথ্যা অভিযোগে ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করেন বা সাইবেরিয়ার 'গুলাগ' (Gulag) শ্রমশিবিরে পাঠান। স্তালিনের একচ্ছত্র ক্ষমতা সুনিশ্চিত করা, কমিউনিস্ট পার্টির ভেতরের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্মূল করা এবং পুরো দেশে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে যেকোনো ধরনের ভিন্নমত স্তব্ধ করে দেওয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য। মাত্র দুই বছরের অভিযানে প্রায় ৭ থেকে ১২ লক্ষ মানুষকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করা হয় এবং আরও লক্ষ লক্ষ মানুষ শ্রমশিবিরের চরম নির্যাতন ও ক্ষুধায় মারা যান।

➡️সামরিক কৌশলগত ভুল (১৯৪১):

হিটলারের সাথে 'নন-অ্যাগ্রেশন প্যাক্ট' (Molotov-Ribbentrop Pact)-এর ওপর অতিরিক্ত বিশ্বাস রেখেছিলেন। গোয়েন্দাদের আগাম সতর্কবার্তা উপেক্ষা করায় ১৯৪১ সালে জার্মানির আচমকা আক্রমণে (Operation Barbarossa) শুরুতে লাখ লাখ সোভিয়েত সেনা মারা যান।

৫.জোরপূর্বক উন্নয়ন—

➡️কৃষিখাতের ধ্বংস ও দুর্ভিক্ষ (Holodomor):
শিল্পায়নের অর্থ জোগাতে স্তালিন জোরপূর্বক কৃষিজমির জাতীয়করণ (Collectivization) করেন। এর ফলে ১৯৩২-১৯৩৩ সালে ইউক্রেন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যান্য অঞ্চলে এক ভয়াবহ কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যাতে প্রায় ৪০ থেকে ৭০ লক্ষ মানুষ না খেয়ে মারা যায়।

➡️দাস শ্রমের ব্যবহার:
পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার বড় বড় অবকাঠামো (যেমন: হোয়াইট সি ক্যানেল) তৈরি করা হয়েছিল গুলাগ (Gulag) শ্রমশিবিরের বন্দিদের দিয়ে। সেখানে লাখ লাখ মানুষকে দাস হিসেবে খাটিয়ে অমানবিক পরিবেশে মেরে ফেলা হয়।

➡️ভারসাম্যহীন অর্থনীতি:
স্তালিন কেবল ভারী শিল্প (লোহা, ইস্পাত, কয়লা) ও সামরিক খাতের ওপর জোর দিয়েছিলেন। এর ফলে সাধারণ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য, বস্ত্র ও আবাসন খাতের চরম সংকট তৈরি হয়, যা মানুষের জীবনযাত্রার মান আজীবন নিম্নমুখী করে রেখেছিল।

➡️দক্ষ জনবলের অভাব ও অপচয়:
দ্রুত লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপে পণ্যের গুণগত মান ছিল অত্যন্ত নিম্ন। এছাড়া, 'মহা শুদ্ধি অভিযান'-এর কারণে বহু দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী ও ব্যবস্থাপককে 'দেশদ্রোহী' আখ্যা দিয়ে হত্যা করায় শিল্পখাত দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

স্তালিনের প্রধান যুক্তি ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন পশ্চিমাদের চেয়ে ৫০-১০০ বছর পিছিয়ে আছে এবং ১০ বছরের মধ্যে এই গ্যাপ পূরণ না করলে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে। এই দ্রুত শিল্পায়নের ফলেই সোভিয়েত ইউনিয়ন মাত্র এক দশকে একটি অনগ্রসর কৃষিপ্রধান দেশ থেকে পরাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ট্যাংক, বিমান ও আধুনিক অস্ত্র তৈরির এই ক্ষমতাই পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানিকে হারাতে মূল ভূমিকা রেখেছিল।

➡️সারসংক্ষেপ:
সামরিক দিক থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন শক্তিশালী হলেও, নিজস্ব নাগরিকদের ওপর এমন চরম নৃশংসতা, গণ-অনাহার এবং লাখ লাখ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই শিল্পায়নকে আধুনিক বিশ্ব একটি অমানবিক ও ত্রুটিপূর্ণ নীতি হিসেবেই গণ্য করে। বলা যায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে যে হত্যা ও ধ্বংসের মাধ্যম ব্যবহার করতে হয়েছে এরপর সেই তন্ত্র টিকিয়ে রাখতে তার চাইতেও ভয়ংকর দুর্দশা ভোগ করতে হয়েছে।

৬. স্তালিনের সমাজতান্ত্রিক আদর্শের অবনতি—

স্তালিন তাত্ত্বিক সমাজতান্ত্রিক আদর্শ সম্পূর্ণভাবে মেনে চলেননি; বরং তিনি নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং দ্রুত শিল্পায়নের স্বার্থে কার্ল মার্ক্স বা ভ্লাদিমির লেনিনের মূল আদর্শকে চরমভাবে বিকৃত করেছিলেন। মার্ক্সবাদী দর্শনে সমাজতন্ত্রের মূল লক্ষ্য ছিল শ্রমিকের মুক্তি ও সাম্য, কিন্তু স্তালিনের আমলে এটি একটি চরম স্বৈরাচারী শাসন বা "রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদে" (State Capitalism) রূপ নেয়।

সমাজতান্ত্রিক আদর্শের সাথে স্তালিনের কাজের প্রধান বৈপরীত্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

➡️শ্রমিকদের শোষণ ও অধিকার হরণ:

সমাজতন্ত্রের মূল কথা হলো উৎপাদনে শ্রমিকের অধিকার। কিন্তু স্তালিনের আমলে শ্রমিকদের স্বাধীন ইউনিয়ন গড়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। 'স্টাখানোভাইট আন্দোলন'-এর মতো প্রচারণার মাধ্যমে শ্রমিকদের ওপর অতিরিক্ত উৎপাদনের চরম চাপ সৃষ্টি করা হয় এবং লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে শাস্তির ব্যবস্থা করা হতো।

➡️শ্রেণিহীন সমাজের বদলে নতুন শ্রেণির জন্ম:

মার্ক্সীয় আদর্শ অনুযায়ী সমাজতন্ত্রে কোনো বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণি থাকার কথা নয়। অথচ স্তালিনের রাজত্বে পার্টি আমলা, গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং স্তালিনের অনুগতদের নিয়ে 'নমেনক্লাতুরা' (Nomenklatura) নামক একটি নতুন অভিজাত ও সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির জন্ম হয়, যারা সাধারণ মানুষের চেয়ে বহুগুণ বেশি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত।

➡️এক দেশে সমাজতন্ত্র):

মার্ক্স ও লেনিন বিশ্বাস করতেন সমাজতন্ত্রকে সফল করতে হলে বিশ্ববিপ্লব (World Revolution) প্রয়োজন। কিন্তু স্তালিন ট্রটস্কির এই বিশ্ববিপ্লবের ধারণা বাতিল করে 'এক দেশে সমাজতন্ত্র' নীতি নেন, যা আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মূল স্পিরিটকে দুর্বল করে দেয়।

➡️রাষ্ট্রের অবলুপ্তির বদলে রাষ্ট্রের চরম শক্তিশালীকরণ:

মার্ক্সবাদী তত্ত্ব অনুযায়ী, সমাজতন্ত্রের চূড়ান্ত পর্যায়ে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কমতে কমতে একসময় রাষ্ট্র ব্যবস্থা বিলুপ্ত হবে। স্তালিন এর উল্টো পথ ধরে রাষ্ট্র, পুলিশ এবং সামরিক বাহিনীকে ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সর্বগ্রাসী (Totalitarian) সংস্থায় পরিণত করেন।

➡️ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও ভিন্নমতের ওপর নির্মম দমন:

সমাজতন্ত্রে পুঁজিবাদী শোষণ থেকে মানুষের মুক্তির কথা বলা হলেও স্তালিনের আমলে মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক অধিকার পুরোপুরি কেড়ে নেওয়া হয়। সাধারণ ভিন্নমতকেও 'বিপ্লব-বিরোধী' তকমা দিয়ে মৃত্যুদণ্ড বা গুলাগে পাঠানো হতো।

এই আদর্শগত বিচ্যুতির কারণেই লিয়ন ট্রটস্কিসহ সমসাময়িক বহু সমাজতন্ত্রী স্তালিনের এই শাসনকে সমাজতন্ত্র না বলে "আমলাতান্ত্রিক বিকৃতি" (Bureaucratic Degeneration) বা স্বৈরতন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

৭. স্তালিনের একমাত্র কন্যা স্বেতলানা অলিলুয়েভার "Twenty Letters to a Friend" পুস্তকে পিতার নিষ্ঠুরতার দলিল—

"একটি বন্ধুর কাছে ২০টি চিঠি" বইটির ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপিটি ১৯৬৩ সালের গ্রীষ্মকালে (জুলাই মাসে) মস্কোর বাইরে 'ঝুকোভকা' (Zhukovka) নামক একটি শান্ত গ্রামে বসে লিখেছিলেন। যা পরবর্তীকালে স্বেতলানা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিলে বইটি প্রকাশিত হয় এবং রাতারাতি বেস্টসেলার বই হিসেবে বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়।

বইটির প্রধান বিষয়বস্তু নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

➡️ ১. স্ট্যালিনের দানবীয় রূপ ও পারিবারিক ধ্বংসযজ্ঞ—
* মায়ের আত্মহত্যার আসল সত্য:

স্বেতলানা জানান, তাঁর মা নাদেঝদা অলিলুয়েভা ১৯৩২ সালে আত্মহত্যা করেছিলেন। স্ট্যালিনের নিষ্ঠুর আচরণ, পরকীয়া এবং রাজনৈতিক নৃশংসতা সহ্য করতে না পেরেই তিনি এই পথ বেছে নেন। সোভিয়েত সরকার এটিকে "অসুস্থতাজনিত মৃত্যু" বলে চালিয়ে দিয়েছিল।

* ভাইদের করুণ পরিণতি:

তাঁর বড় ভাই ইয়াকভকে স্ট্যালিন কতটা ঘৃণা করতেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিদের হাতে বন্দি হওয়ার পর স্ট্যালিন কীভাবে তাঁকে উদ্ধার করতে অস্বীকার করেন, তার বিবরণ রয়েছে। এছাড়া তাঁর ছোট ভাই ভাসিলি কীভাবে মদ্যপ হয়ে পড়েন এবং বাবার মৃত্যুর পর রহস্যজনকভাবে মারা যান, তা তিনি তুলে ধরেন।

➡️ ২. লাভরেন্তি বেরিয়ার ভয়ঙ্কর চরিত্র—

* বইটিতে স্ট্যালিনের কুখ্যাত গোয়েন্দা প্রধান লাভরেন্তি বেরিয়াকে (Lavrentiy Beria) একটি "ভয়াবহ ও শয়তান চরিত্র" হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। স্বেতলানা দাবি করেন, বেরিয়া স্ট্যালিনের সন্দেহপ্রবণ মানসিকতাকে উস্কে দিতেন এবং ক্রেমলিনের ভেতরের সমস্ত ষড়যন্ত্রের মূল হোতা ছিলেন তিনি।

➡️ ৩. ক্রেমলিনের অবরুদ্ধ ও ভয়ার্ত জীবন—

* স্বেতলানা তাঁর শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করে দেখিয়েছেন যে, ক্রেমলিনের ভেতরের জীবন কোনো রাজপ্রাসাদ ছিল না, বরং সেটি ছিল এক অবরুদ্ধ কারাগার। সেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেককে সন্দেহ করত এবং সার্বক্ষণিক ভয়ের পরিবেশ বিরাজ করত।

➡️ ৪. স্ট্যালিনের মৃত্যুর বাস্তব চিত্র—

* ১৯৫৩ সালে স্ট্যালিনের শেষ দিনগুলোর একটি অত্যন্ত জীবন্ত ও লোমহর্ষক বিবরণ রয়েছে বইটিতে। স্ট্যালিন যখন স্ট্রোক করে বিছানায় ছটফট করছিলেন, তখন তাঁর চারপাশের অনুগত নেতারা (যেমন বেরিয়া, ক্রুশ্চেভ) কীভাবে তাঁর চিকিৎসার চেয়ে তাঁর মৃত্যু কামনা করছিলেন এবং ক্ষমতার জন্য অপেক্ষা করছিলেন, স্বেতলানা তা নিজের চোখে দেখেছিলেন।

বইটি কোনো রাজনৈতিক তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং এক অসহায় মেয়ের চোখে তাঁর নিষ্ঠুর বাবা এবং একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থার ভেতরের গল্প।

৮. ১৯৯১ এবং ২০১০ সালে গোপন ফাইল প্রকাশের পর উন্মোচিত নতুন সত্য—

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন (১৯৯১) এবং পরবর্তীতে ২০১০ সালে রুশ সরকারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল অবমুক্ত করার পর স্টালিনের ইতিহাস ও অপরাধের পরিধি সম্পর্কে বিশ্বজুড়ে ঐতিহাসিকদের কাছে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর এবং অলঙ্ঘনীয় তথ্য প্রমাণিত হয়:

👉ক. ১৯৯১ সালের ফাইল প্রকাশের পর (Post-Soviet Archive Openings)—

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মস্কোর কেন্দ্রীয় ক্রেমলিন আর্কাইভ গবেষকদের জন্য আংশিক খুলে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে যে সত্যগুলো সামনে আসে:

➡️1. গুলাগের (Gulag) প্রকৃত পরিসংখ্যান:

পশ্চিমা দেশগুলো আগে দাবি করত গুলাগে কয়েক কোটি মানুষ মারা গেছে। কিন্তু প্রকৃত রাষ্ট্রীয় নথিতে দেখা যায়, ১৯৩০ থেকে ১৯৫৩ সালের মধ্যে প্রায় ১.৫ থেকে ১.৭ মিলিয়ন (১৫ থেকে ১৭ লাখ) মানুষ এই শ্রমশিবিরে কঠোর পরিশ্রম ও অবহেলায় মারা যান। যদিও এই সংখ্যাটি আগের অনুমানের চেয়ে কম, তবুও তা রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক নৃশংসতার এক অকাট্য দলিল।

* স্বহস্তে স্বাক্ষরিত মৃত্যুদণ্ডের তালিকা (The Death Lists):

১৯৯০-এর দশকে পলিটব্যুরোর গোপন ফাইল থেকে জানা যায় যে, ১৯৩৭-১৯৩৮ সালের 'গ্রেট পার্জ' বা মহা-শুদ্ধি অভিযানের সময় স্তালিন নিজে প্রায় ৪৪,০০০ মানুষের মৃত্যুদণ্ডের তালিকায় সরাসরি স্বাক্ষর করেছিলেন। স্তাবকদের দাবি ছিল স্তালিন অনেক হত্যাকাণ্ডের খবর জানতেন না, কিন্তু আর্কাইভ প্রমাণ করে তিনি প্রতিটি শীর্ষস্থানীয় হত্যাকাণ্ডের সরাসরি তদারকি করতেন।

* পোল্যান্ড বিভাজন এবং হিটলার-স্তালিন গোপন চুক্তি (২০১৯ সালে প্রকাশ):

স্তালিন সমর্থকরা দাবি করতেন যে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাধ্য হয়ে জার্মানির সাথে অনাক্রমণ চুক্তি করেছিল এবং হিটলারের সাথে স্তালিনের কোনো গোপন আঁতাত ছিল না। কিন্তু ২০১৯ সালে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৯৩৯ সালের মলোটভ-রিবেনট্রপ চুক্তির (Molotov-Ribbentrop Pact) মূল গোপন প্রোটোকলটির স্ক্যান কপি জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করে। এই নথিতে দেখা যায়, হিটলার ও স্তালিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগেই পোল্যান্ড এবং বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার ব্যাপারে লিখিত চুক্তি করেছিলেন, যা স্তালিনের "ফ্যাসিবাদ-বিরোধী" ইমেজের সম্পূর্ণ বিপরীত।

➡️2. জাতিগত নির্বাসন (Ethnic Deportations):

গোপন ফাইল প্রমাণ করে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্টালিন সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে চেচেন, তাতার, ইনগুশ এবং কোরিয়ানদের মতো পুরো একটি জাতিকে তাদের মাতৃভূমি থেকে জোরপূর্বক মধ্য এশিয়ায় নির্বাসিত করেছিলেন, যাকে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা "সাংস্কৃতিক গণহত্যা" বলে অভিহিত করেন।

➡️3. লেনিনের সাথে ধারাবাহিকতা:

অনেক কমিউনিস্ট দাবি করতেন স্টালিনের নৃশংসতা তাঁর নিজস্ব বিকৃতি। কিন্তু ফাইলগুলো প্রমাণ করে যে, বলশেভিকদের রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনের জন্য "রেড টেরর" বা গোপন পুলিশ বাহিনী তৈরির মূল নীল নকশাটি ভ্লাদিমির লেনিন নিজেই শুরু করেছিলেন, স্টালিন কেবল সেটিকে চরম মাত্রায় নিয়ে যান।

👉খ. ২০১০ সালের ফাইল প্রকাশের পর (Katyn Massacre Documents Online)—

২০১০ সালের এপ্রিল মাসে রাশিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভের নির্দেশে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় আর্কাইভ তাদের ওয়েবসাইটে ১৯৪০ সালের "কাতিন গণহত্যা" (Katyn Massacre) সংক্রান্ত সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং অতি-গোপন নথির 'প্যাকেট নম্বর ১' (Packet No. 1) সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়:

➡️1. হত্যাকাণ্ডের সরাসরি দায়:

১৯৪০ সালে পোল্যান্ডের প্রায় ২২,০০০ সামরিক কর্মকর্তা, পুলিশ এবং বুদ্ধিজীবীকে গুলি করে হত্যা করে বনের মধ্যে গণকবর দেওয়া হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে দাবি করে আসছিল যে এই কাজটি হিটলারের নাৎসি বাহিনী করেছে। কিন্তু ২০১০ সালে প্রকাশিত মূল ফাইলে দেখা যায়, এনকেভিডি (NKVD) প্রধান লাভ্রেন্তি বেরিয়ার দেওয়া যুদ্ধবন্দীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রস্তাবে জোসেফ স্টালিনের নিজের হাতের নীল কালির স্বাক্ষর রয়েছে। যুদ্ধের নীতি ভেঙ্গে ঠাণ্ডা মাথায় এই বিরাট হত্যাকাণ্ডকে তিনি অফিশিয়ালি গোপন করে রেখেছিলেন।

➡️2. পরিকল্পিত বুদ্ধিজীবী নিধন:

নথিপত্র থেকে জানা যায়, পোল্যান্ডকে ভবিষ্যতে যেন আর কোনোদিন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়াতে না দেওয়া যায়, সেজন্যই পোলিশ সমাজের মগজ বা বুদ্ধিজীবী অংশকে বেছে বেছে হত্যা করার নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক ছক কষেছিলেন স্টালিন।

সংক্ষেপে, এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে, স্টালিনীয় যুগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং তা ছিল একটি "সর্বগ্রাসী আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো" (Totalitarian Bureaucratic State)-এর চূড়ান্ত রূপ। ১৯৯১ ও ২০১০ সালের ফাইলগুলো সোভিয়েত প্রোপাগান্ডার আড়ালে থাকা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদকে রাজনৈতিক ও আইনিভাবে বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করতে ঐতিহাসিকদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।

৯. লেনিন এবং ট্রটস্কির সাথে স্টালিনের বিশ্বাসঘাতকতা—

রাজনৈতিক ইতিহাস এবং সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে কেবল ব্যক্তিগত ক্ষমতার লোভ হিসেবে দেখা হয় না, বরং এটি ছিল রুশ বিপ্লবের মূল আদর্শিক চেতনা থেকে একটি স্বৈরাচারী ও আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে বিচ্যুতি।

👉১. ভ্লাদিমির লেনিনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা (Betrayal of Lenin's Legacy)—

লেনিন বলশেভিক বিপ্লবের মূল তাত্ত্বিক ও নেতা ছিলেন। জীবনের শেষভাগে (১৯২২-১৯২৪) তিনি স্টালিনের ক্ষমতার লোভ এবং রুক্ষ আচরণ দেখে অত্যন্ত শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। স্টালিন লেনিনের আদর্শের সাথে মূলত ৩টি ক্ষেত্রে বিশ্বাসঘাতকতা করেন:

➡️ক) লেনিনের শেষ ইচ্ছাপত্র (Lenin's Testament) গোপন করা:

১৯২২ সালের ডিসেম্বরে স্ট্রোক করার পর লেনিন একটি গোপন দলিল বা 'টেস্টামেন্ট' লিখেছিলেন। সেখানে তিনি স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন যে—"স্টালিন অত্যন্ত রুক্ষ এবং তাঁর হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে। কমরেডদের উচিত স্টালিনকে জেনারেল সেক্রেটারির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া।"

১৯২৪ সালে লেনিনের মৃত্যুর পর স্টালিন সুকৌশলে পার্টির শীর্ষ নেতাদের (কিমেনেভ ও জিনোভিয়েভ) হাত করে সেন্ট্রাল কমিটিতে এই উইলটি সম্পূর্ণ গোপন ও ধামাচাপা দেন। লেনিনের মৃত্যুর পর তাঁর মমি তৈরি করে 'ব্যক্তিত্ব পূজা' (Cult of Personality) শুরু করেন, অথচ লেনিনের রাজনৈতিক শেষ ইচ্ছাকে সম্পূর্ণ পদদলিত করেন।

➡️খ) সোভিয়েত গণতন্ত্র ও দলীয় বহুত্ববাদ ধ্বংস করা:

* লেনিনের দর্শন:
লেনিন 'গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা' (Democratic Centralism) বিশ্বাস করতেন, যেখানে দলের ভেতরে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ ছিল।

* স্টালিনের রূপান্তর:
স্টালিন লেনিনের মৃত্যুর পর দলের ভেতরের সব ধরণের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিষিদ্ধ করেন। পার্টিকে একটি একক আমলাতান্ত্রিক যন্ত্রে পরিণত করা হয়, যেখানে স্টালিনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার অর্থই ছিল নির্ঘাত মৃত্যু।

➡️গ) লেনিনের বিশ্বস্ত কমরেডদের নিশ্চিহ্ন করা (The Great Purge):

* ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবে লেনিনের সাথে যে 'পলিটব্যুরো' (Politburo) বা মূল চালিকাশক্তি ছিল, স্টালিন ১৯৩৬-৩৮ সালের মধ্যে তাঁদের প্রায় সবাইকে (কামেনেভ, জিনোভিয়েভ, বুখারিন, রিকভ) "দেশদ্রোহী" ও "লেনিন-বিরোধী" তকমা দিয়ে ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করেন। লেনিনের তৈরি পুরো বিপ্লবী প্রজন্মকে ধ্বংস করাই ছিল স্টালিনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা।

👉২. লিওন ট্রটস্কির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা (Betrayal and Elimination of Trotsky)—

লেনিনের পর বলশেভিক বিপ্লবের এবং লাল ফৌজ (Red Army)-এর প্রধান রূপকার ছিলেন লিওন ট্রটস্কি। লেনিন নিজেই ট্রটস্কিকে তাঁর যোগ্যতম উত্তরসূরি মনে করতেন। ট্রটস্কির সাথে স্টালিনের বিশ্বাসঘাতকতা ছিল আরও বেশি নির্মম ও সুদূরপ্রসারী:

➡️ক) ক্ষমতা দখলের নোংরা রাজনীতি ও ইতিহাস বিকৃতি:

* কবরের কার্যক্রমে প্রতারণা:
১৯২৪ সালে লেনিনের মৃত্যুর সময় ট্রটস্কি কৃষ্ণ সাগর অঞ্চলে চিকিৎসাধীন ছিলেন। স্টালিন ট্রটস্কিকে লেনিনের দাফনের ভুল তারিখ পাঠান, যাতে ট্রটস্কি সময়মতো পৌঁছাতে না পারেন। এর ফলে জনগণের কাছে বার্তা যায় যে ট্রটস্কি লেনিনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন।

* ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলা:
স্টালিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জোরে অক্টোবর বিপ্লবের সব সরকারি নথিপত্র ও ছবি থেকে ট্রটস্কির অবদান মুছে ফেলেন। যে ট্রটস্কি লাল ফৌজের নেতৃত্ব দিয়ে বিপ্লব রক্ষা করেছিলেন, তাঁকে রাতারাতি "পুঁজিবাদীদের চর" এবং "ফ্যাসিবাদের দোসর" হিসেবে প্রচার করা শুরু হয়।

➡️খ) নির্বাসন এবং আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে ফাটল:

* ১৯২৭ সালে ট্রটস্কিকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং ১৯২৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। স্টালিনের এই চরমপন্থার কারণে বিশ্বজুড়ে কমিউনিস্ট আন্দোলন দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে (স্টালিনপন্থী বনাম ট্রটস্কিপন্থী), যা সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী লড়াইকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করে দেয়।

➡️গ) মেক্সিকোতে নৃশংস হত্যাকাণ্ড (Operation Duck):

* ট্রটস্কি নির্বাসনে থেকেও স্টালিনের আমলাতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে কলম ধরেন এবং 'চতুর্থ আন্তর্জাতিক' (Fourth International) গঠন করেন। স্টালিন একে সহ্য করতে পারেননি। সমস্ত আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে, মেক্সিকোর মাটিতে গুপ্তচর পাঠিয়ে ১৯৪০ সালের ২০শে আগস্ট ট্রটস্কিকে আইস-অ্যাক্স দিয়ে মাথায় আঘাত করে খুন করেন স্ট্যালিনের পাঠানো গুপ্তঘাতক। এ বিষয়ে পূর্বের পোস্টে ট্রটস্কি ও স্ট্যালিন বিষয়ক প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

১০. গবেষকদের জন্য তাত্ত্বিক সারসংক্ষেপ (Analytical Conclusion)—

সমাজবিজ্ঞানী এবং রাজনৈতিক ঐতিহাসিকদের মতে, লেনিন এবং ট্রটস্কির সাথে স্টালিনের এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না; এটি ছিল একটি আদর্শিক কাউন্টার-রেভোলিউশন (Counter-Revolution) বা প্রতি-বিপ্লব।

লেনিন ও ট্রটস্কির আন্তর্জাতিক বিপ্লব, সমতা ও শ্রমিক গণতন্ত্রের আদর্শ থেকে স্টালিনের বিচ্যুত হয়ে এক দেশে সমাজতন্ত্র', রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও আমলাতন্ত্র কায়েম করেছিলেন।

লেনিন ও ট্রটস্কি চেয়েছিলেন একটি মুক্ত, শোষণহীন, আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমাজ। আর স্টালিন তাঁদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে প্রতিষ্ঠা করেন একটি জাতীয়তাবাদী, সর্বগ্রাসী এবং পুলিশি রাষ্ট্র (Police State), যা কালক্রমে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

এই পর্বে স্তালিনের দীর্ঘ অধ্যায় সংক্ষেপে রেখেছি। পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে স্তালিনের বিশেষ ঘটনাক্রম নিয়ে বিস্তারিত রচনা থাকবে।
***
ভাল লাগলে লাইক কমেন্ট শেয়ার করতে ভুলবেন না।
***

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

বিকল্প অর্থনীতি দ্বারা সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রের নির্মাণ কীভাবে সম্ভব?