জোসেফ স্তালিনের নির্মমতার কোপ এম এন রায়ের উপর কীভাবে পড়েছিল?
জোসেফ স্তালিনের ক্ষমতা একচেটিয়াকরণ এবং 'গ্রেট পার্জ' (Great Purge) বা শুদ্ধি অভিযানের প্রভাব ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের জনক এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তাত্ত্বিক মানবেন্দ্রনাথ রায়- এর ওপর অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও নাটকীয় ছিল।
স্তালিনের উত্থান এবং এই রাজনৈতিক শুদ্ধিকরণ এম. এন. রায়ের জীবন সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। এর প্রধান ৪টি প্রভাব নিচে দেওয়া হলো:
➡️ ১. স্তালিনের সাথে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং চীন মিশন ব্যর্থ—
১৯২০-এর দশকে লেনিনের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র এম. এন. রায় কমিন্টার্নের (Comintern) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদের সদস্য ছিলেন। কিন্তু লেনিনের মৃত্যুর পর স্তালিন যখন ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে শুরু করেন, তখন কমিন্টার্নের ভেতর উপদলীয় কোন্দল শুরু হয়। ১৯২৭ সালে স্তালিন রায়কে চীনের কমিউনিস্ট আন্দোলন পরিচালনার জন্য পাঠান। চীনের সেই মিশনটি চরমভাবে ব্যর্থ হয়, যার জন্য স্তালিন সরাসরি রায়কে বলির পাঁঠা (Scapegoat) বানান।
➡️ ২. বুকহারিনপন্থী তকমা ও কমিন্টার্ন থেকে বহিষ্কার—
স্তালিন তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের একে একে নির্মূল করছিলেন। এম. এন. রায় কমিন্টার্নের বিখ্যাত সমাজতান্ত্রিক তাত্ত্বিক নিকোলাই বুকহারিন (Nikolai Bukharin)-এর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। স্তালিন যখন বুকহারিন এবং তাঁর দক্ষিণপন্থী অংশকে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন রায়ের ভাগ্যও নির্ধারিত হয়ে যায়। ১৯২৯ সালের ডিসেম্বর মাসে এম. এন. রায়কে কমিন্টার্ন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কার করা হয়।
➡️ ৩. নাটকীয়ভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পলায়ন—
বহিষ্কারের পর এম. এন. রায় বুঝতে পেরেছিলেন যে মস্কোয় অবস্থান করা তাঁর জন্য আর নিরাপদ নয়। স্তালিনের গোপন পুলিশ বাহিনী (NKVD) যেকোনো সময় তাঁকে গ্রেপ্তার বা হত্যা করতে পারত। এম. এন. রায় অত্যন্ত গোপনে, ছদ্মবেশে মস্কো থেকে পালিয়ে জার্মানির বার্লিনে আশ্রয় নেন। সেখান থেকেই তিনি স্তালিনের কট্টর নীতি এবং একনায়কতন্ত্রের সমালোচনা করে বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক জার্নালে লেখালেখি শুরু করেন।
➡️ ৪. আদর্শগত মোহভঙ্গ এবং 'র্যাডিকাল হিউম্যানিজম'—
স্তালিনের এই রক্তাক্ত শুদ্ধিকরণ, ভিন্নমতের ওপর নির্মম অত্যাচার এবং অন্ধ একনায়কতন্ত্র সচক্ষে দেখে সমাজতন্ত্র ও মার্ক্সবাদের ওপর থেকে এম. এন. রায়ের চিরতরে মোহভঙ্গ ঘটে।
* তিনি বুঝতে পারেন যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাম্যবাদ আসলে একটি নতুন ধরনের ফ্যাসিবাদ বা একনায়কতন্ত্রে রূপ নিয়েছে।
* ১৯৩০ সালে তিনি ভারতে ফিরে আসেন এবং পরবর্তীতে সম্পূর্ণ নতুন একটি রাজনৈতিক দর্শন প্রচার করেন, যা 'র্যাডিকাল হিউম্যানিজম' (Radical Humanism) বা 'উগ্র মানবতাবাদ' নামে পরিচিত।
এই দর্শনে তিনি অর্থনৈতিক ব্যাখ্যার চেয়ে মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, স্তালিনের শুদ্ধিকরণ নীতি অবনী মুখোপাধ্যায় বা বীরেন্দ্রনাথের মতো এম. এন. রায়ের জীবন প্রদীপ কেড়ে নিতে না পারলেও, তাঁকে চিরকালের জন্য কমিউনিস্ট আন্দোলন থেকে বিচ্যুত করে এক প্রখ্যাত মানবতাবাদী তাত্ত্বিকে রূপান্তরিত করেছিল।
⭐ কমিউনিস্ট পার্টি অফ গ্রেট ব্রিটেনের সাথে এম. এন. রায়ের মতবিরোধের কারণ কী?
কমিউনিস্ট পার্টি অফ গ্রেট ব্রিটেন (CPGB)-এর হাতে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের মূল নিয়ন্ত্রণ বা ক্ষমতা চলে যাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ সত্য। ১৯২০-এর দশকে ভারতীয় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এম. এন. রায় এবং CPGB-এর মধ্যে একটি তীব্র রাজনৈতিক ও কৌশলগত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত রায়ের পতন ও ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।
এই ক্ষমতা হস্তান্তর এবং এর সাথে এম. এন. রায়ের সংযোগের বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:
➡️ ১. ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু পরিবর্তন: এম. এন. রায় বনাম CPGB—
* প্রারম্ভিক পর্যায় (এম. এন. রায়ের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ):
১৯২০ সালে উজবেকিস্তানের তাসখন্দে এম. এন. রায় যখন 'ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি' (CPI) গঠন করেন, তখন কমিন্টার্ন (Comintern) বা আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট সংস্থায় ভারতের সমস্ত কর্মকাণ্ডের প্রধান ও একমাত্র নিয়ন্ত্রক ছিলেন রায় নিজেই। লেনিনের সরাসরি সমর্থনে তিনিই ছিলেন ভারতের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের "পোস্টার বয়"।
* CPGB-এর হস্তক্ষেপ:
১৯২১-২২ সাল থেকে ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টি (CPGB) দাবি করতে শুরু করে যে, ভারত যেহেতু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ (Colony), তাই ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন পরিচালনার মূল দায়িত্ব ব্রিটেনের কমিউনিস্টদের হওয়া উচিত, কোনো একক প্রবাসী ভারতীয় নেতার (এম. এন. রায়) নয়।
➡️ ২. আদর্শগত ও কৌশলগত দ্বন্দ্ব (Strategic Conflict)—
এম. এন. রায়ের সাথে ব্রিটিশ কমিউনিস্টদের প্রধান বিরোধ ছিল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের কৌশল নিয়ে:
* রায়ের কৌশল:
এম. এন. রায় বিশ্বাস করতেন, সরাসরি ভারত এবং তার আশেপাশের অঞ্চল (যেমন আফগানিস্তান বা রাশিয়ার সীমান্ত) থেকে ভারতে কমিউনিস্ট কর্মী ও অর্থ পাঠিয়ে গোপন সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। তিনি বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্তদের পরিচালিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে খুব একটা বিশ্বাস করতেন না।
* CPGB-এর কৌশল:
ব্রিটেনের কমিউনিস্টরা (যার মধ্যে ভারতীয় বংশোদ্ভূত রজনী পাম দত্ত এবং শাপুরজি সাকলাতওয়ালা অন্যতম প্রধান ছিলেন) মনে করতেন, লন্ডন থেকে আইনি ও প্রকাশ্য উপায়ে ভারতে বামপন্থী চিন্তাধারা পাঠাতে হবে। তাঁরা ভারতের ভেতরের জাতীয়তাবাদী দল ও ট্রেড ইউনিয়নের ভেতর ঢুকে কাজ করার পক্ষপাতী ছিলেন।
➡️ ৩. কীভাবে CPGB মূল ক্ষমতা দখল করল?
১৯২৪ সালের পর থেকে এম. এন. রায়ের হাত থেকে ক্ষমতা ধীরে ধীরে CPGB-এর কাছে চলে যেতে থাকে। এর পেছনে ৩টি মূল কারণ ছিল:
* যোগাযোগের সুবিধা:
ভারত তখন ব্রিটিশদের অধীনে থাকায় মস্কো বা বার্লিন থেকে এম. এন. রায়ের পক্ষে সরাসরি ভারতে অর্থ বা সাহিত্য পাঠানো কঠিন ছিল। অন্যদিকে, লন্ডন থেকে ব্রিটিশ নাগরিকদের মাধ্যমে ভারতে আসা-যাওয়া এবং যোগাযোগ করা অনেক সহজ ছিল।
* কমিন্টার্নের সিদ্ধান্ত:
১৯২৫ সালের পর কমিন্টার্ন আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয় যে, ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে সরাসরি সহায়তার দায়িত্ব দেওয়া হবে কমিউনিস্ট পার্টি অফ গ্রেট ব্রিটেন (CPGB)-কে। এর ফলে ফিলিপ স্প্রাট (Philip Spratt) এবং বেন ব্রাডলি (Ben Bradley)-র মতো ব্রিটিশ কমিউনিস্ট নেতাদের কমিন্টার্ন সরাসরি ভারতে পাঠায় সংগঠন গোছানোর জন্য।
* মীরট ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২৯):
ব্রিটিশ পুলিশ যখন ভারতের কমিউনিস্ট নেতাদের গ্রেপ্তার করে বিখ্যাত 'মীরট ষড়যন্ত্র মামলা' (Meerut Conspiracy Case) শুরু করে, তখন ভারতের কমিউনিস্টদের আইনি ও রাজনৈতিক সাহায্য দেওয়ার মূল কাজটি লন্ডন থেকে CPGB-ই পরিচালনা করেছিল। এর ফলে ভারতের অভ্যন্তরীণ কমিউনিস্টদের ওপর CPGB-এর আধিপত্য সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
➡️ ৪. এম. এন. রায়কে বহিষ্কার ও তাঁর নিজস্ব প্রতিক্রিয়া—
এম. এন. রায় তাঁর কমিন্টার্ন থেকে বহিষ্কার এবং রাজনৈতিক কোন্দলের পেছনে স্তালিনের পাশাপাশি CPGB-এর এই আধিপত্য বিস্তারের চক্রান্তকে সরাসরি দায়ী করেছিলেন।
* রায় মনে করতেন, ব্রিটিশ কমিউনিস্টরা অত্যন্ত ঔপনিবেশিক মানসিকতা (Chauvinistic Attitude) নিয়ে ভারতীয় আন্দোলনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছিল, যাতে আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী মহলে তাঁদের নিজেদের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।
* ১৯২৯ সালে রায় যখন স্তালিনের সুনজর হারিয়ে কমিন্টার্ন থেকে বহিষ্কৃত হন, তখন CPGB ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (CPI) ওপর তাদের শতভাগ নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে। এর পর থেকে স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত ভারতের কমিউনিস্টদের প্রায় প্রতিটি বড় রাজনৈতিক লাইন (যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের সমর্থন করা বা না করা) নির্ধারিত হতো মস্কোর নির্দেশে এবং লন্ডনের CPGB-এর মধ্যস্থতায়।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন মস্কোতে এম. এন. রায়ের হাত ধরে শুরু হলেও, ১৯২০-এর দশকের শেষের দিকে তা পুরোপুরি কমিউনিস্ট পার্টি অফ গ্রেট ব্রিটেন (CPGB)-এর দাপ্তরিক নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, যা রায়ের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে কোণঠাসা করার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল।
⭐ 'র্যাডিকাল হিউম্যানিজম' কী?
'র্যাডিকাল হিউম্যানিজম' (Radical Humanism) বা 'উগ্র মানবতাবাদ' (অনেক সময় একে 'Scientific Humanism' বা বৈজ্ঞানিক মানবতাবাদও বলা হয়) হলো মানবেন্দ্রনাথ রায় (M. N. Roy) কর্তৃক জীবনের শেষভাগে প্রবর্তিত একটি সম্পূর্ণ নতুন ও মৌলিক রাজনৈতিক-সামাজিক দর্শন।
১৯৪০-এর দশকের শেষভাগে, বিশেষ করে ১৯৪৭ সালে তাঁর বিখ্যাত "New Humanism: A Manifesto" গ্রন্থটির মাধ্যমে তিনি এই তত্ত্ব বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। মার্ক্সবাদ, সমাজতন্ত্র এবং পশ্চিমা পুঁজিবাদী গণতন্ত্র—সবকিছুর সীমাবদ্ধতা ও হিংস্রতা দেখার পর, মানুষের মুক্তির জন্য তিনি এই দর্শনের অবতারণা করেন।
র্যাডিকাল হিউম্যানিজমের মূল স্তম্ভ এবং এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:
➡️ ১. মূল দর্শন:
মানুষই সবকিছুর পরিমাপক (Man is the Measure of All Things)—
রায়ের এই দর্শনের মূল কথা হলো—ব্যক্তি মানুষের স্বাধীনতাই চূড়ান্ত। কোনো রাষ্ট্র, সমাজ, ধর্ম বা রাজনৈতিক দল মানুষের চেয়ে বড় হতে পারে না।
* পুঁজিবাদ মানুষকে স্রেফ "অর্থনৈতিক হাতিয়ার" বা পণ্যে রূপান্তর করে।
* সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজম রাষ্ট্রের নামে ব্যক্তির স্বাধীনতা কেড়ে নেয় এবং মানুষকে "পার্টির দাস" বানায় (যা তিনি স্তালিনের জমানায় সচক্ষে দেখেছিলেন)।
* র্যাডিকাল হিউম্যানিজম বলে, সমাজ বা রাষ্ট্রকে উন্নত করতে হলে প্রথমে প্রতিটি একক মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে।
➡️ ২. তিনটি মূল ভিত্তি: স্বাধীনতা, যুক্তি এবং নীতিবোধ (Freedom, Reason, and Morality)—
এম. এন. রায় মনে করতেন মানুষের সমস্ত প্রগতির পেছনে তিনটি প্রাকৃতিক ও জৈবিক উপাদান কাজ করে:
* স্বাধীনতা (Freedom):
মানুষের অস্তিত্বের মূল চালিকাশক্তি হলো স্বাধীনতা। এটি কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক মুক্তি নয়, বরং মানুষের চিন্তার মুক্তি।
* যুক্তি (Reason):
মানুষ প্রাকৃতিকভাবেই একটি যুক্তিবাদী প্রাণী। ধর্মীয় কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস বা কোনো রাজনৈতিক দলের অন্ধ আনুগত্য বর্জন করে মানুষকে বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চিন্তা করতে হবে।
* নীতিবোধ (Morality):
রায় মনে করতেন, নীতিবোধ কোনো স্বর্গীয় বা ধর্মীয় দান নয়। এটি মানুষের যুক্তিবোধ থেকে জন্ম নেয়। সমাজ পরিচালনার জন্য মানুষের ভেতরের এই সহজাত নৈতিকতাকে জাগিয়ে তুলতে হবে, কোনো পুলিশ বা স্বৈরাচারী রাষ্ট্রের ভয়ে নয়।
➡️ ৩. দলহীন গণতন্ত্রের ধারণা (Partyless Democracy)—
র্যাডিকাল হিউম্যানিজমের রাজনৈতিক রূপটি অত্যন্ত বৈপ্লবিক। রায় প্রচলিত সংসদীয় বা দলীয় গণতন্ত্রের ঘোর বিরোধী ছিলেন।
* দলের কুফল:
তিনি মনে করতেন, রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার লোভে মানুষকে বিভক্ত করে, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয় এবং আসল ক্ষমতা কিছু শীর্ষ নেতার হাতে কুক্ষিগত করে (Decentralization-এর অভাব)।
* বিকল্প রূপ:
তিনি 'দলহীন গণতন্ত্র' এবং 'পিপলস কমিটি' (People's Committees) বা স্থানীয় নাগরিক পরিষদের কথা বলেন। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটিয়ে একদম তৃণমূল স্তরের মানুষ নিজেরাই নিজেদের শাসন পরিচালনা করবে, যেখানে কোনো পেশাদার রাজনৈতিক দল থাকবে না।
➡️ ৪. মার্ক্সবাদের পরিমার্জন ও সমালোচনা—
এম. এন. রায় একসময় কট্টর মার্ক্সবাদী থাকলেও এই দর্শনে তিনি মার্ক্সবাদের মূল ভিত্তিগুলোকে চ্যালেঞ্জ করেন:
* অর্থনৈতিক নিয়তিবাদের বিরোধিতা:
মার্ক্সবাদ মনে করে অর্থনীতিই মানুষের সমাজ ও ইতিহাস নিয়ন্ত্রণ করে (Economic Determinism)। রায় এটি অস্বীকার করে বলেন, মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও আইডিয়াও ইতিহাস পরিবর্তন করতে পারে।
* শ্রেণি সংগ্রামের চেয়ে মানবতাবাদের গুরুত্ব:
মার্ক্সবাদ সমাজকে 'শোষক ও শোষিত' এই দুই শ্রেণিতে ভাগ করে হিংসাত্মক বিপ্লবের কথা বলে। রায় বলেন, মানুষে মানুষে বিভেদের চেয়ে মানুষের ভেতরের সার্বজনীন মানবিক ঐক্য ও সহযোগিতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সারসংক্ষেপ:
সহজ কথায়, এম. এন. রায়ের 'র্যাডিকাল হিউম্যানিজম' হলো এমন এক সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন, যেখানে কোনো ধর্মের অন্ধত্ব থাকবে না, কোনো রাজনৈতিক দলের একনায়কত্ব থাকবে না এবং কোনো কর্পোরেট পুঁজির শোষণ থাকবে না। বিজ্ঞান, যুক্তি এবং নৈতিকতার ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি মানুষ স্বাধীনভাবে বাঁচবে—এটাই এই দর্শনের মূল লক্ষ্য।
⭐ র্যাডিকাল হিউম্যানিজম দর্শনের প্রয়োগ হিসেবে এম. এন. রায় তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক দল 'র্যাডিকাল ডেমোক্রেটিক পার্টি' (RDP) ১৯৪৮ সালে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন। এই দল বিলুপ্তির পেছনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত কী ছিল?
এম. এন. রায় (M. N. Roy) কর্তৃক ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠিত দল 'র্যাডিকাল ডেমোক্রেটিক পার্টি' (RDP) বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্তটি ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ও বৈপ্লবিক ঘটনা ছিল। কোনো রাজনৈতিক দলের সুপ্রিম লিডার নিজের হাতে দল ভেঙে দিচ্ছেন—এমন ঘটনা সচরাচর দেখা যায় না।
এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের পেছনের মূল কারণ ও প্রেক্ষাপট নিচে দেওয়া হলো:
➡️ ১. ক্ষমতার রাজনীতির প্রতি চরম মোহভঙ্গ—
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ভারতের স্বাধীনতার (১৯৪৭) পরবর্তী সময়ে এম. এন. রায় ভারতের মূল ধারার দলীয় রাজনীতি খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি দেখেন যে, কংগ্রেস বা মুসলিম লীগের মতো দলগুলো ক্ষমতার জন্য আদর্শ বিসর্জন দিচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে কেবল ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করছে। তিনি অনুভব করেন যে, ক্ষমতার লোভ (Power Politics) যেকোনো ভালো আদর্শকেও কলুষিত করে তোলে।
➡️ ২. নিজস্ব দর্শনের (Radical Humanism) বাস্তব প্রয়োগ—
১৯৪৭ সালে রায় যখন তাঁর 'র্যাডিকাল হিউম্যানিজম' বা নতুন মানবতাবাদের তত্ত্ব চূড়ান্ত করেন, তখন তিনি বুঝতে পারেন যে একটি রাজনৈতিক দলের কাঠামোতে থেকে এই দর্শন প্রচার করা অসম্ভব।
* আদর্শিক স্ববিরোধিতা:
তাঁর নতুন দর্শন বলছিল যে "দলীয় প্রথা বা Party System মানুষের স্বাধীন চিন্তাকে ধ্বংস করে"।
* সিদ্ধান্ত:
যেহেতু তিনি নিজেই দল প্রথার বিরোধিতা করছিলেন, তাই নৈতিকভাবে নিজের দল 'RDP' টিকিয়ে রাখা তাঁর নিজের দর্শনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার শামিল হতো। নিজের তত্ত্বের প্রতি সৎ থেকেই তিনি দল বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত নেন।
➡️ ৩. নির্বাচনে পরাজয় ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন—
১৯৪৬ সালের ভারতের সাধারণ নির্বাচনে রায়ের র্যাডিকাল ডেমোক্রেটিক পার্টি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে চরমভাবে পরাজিত হয়। ভারতের সাধারণ মানুষ তখন কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদ এবং মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জোয়ারে ভাসছিল। রায় বুঝতে পারেন যে, প্রচলিত নির্বাচনী ব্যবস্থার নোংরা খেলায় মেতে তাঁর এই উচ্চশিক্ষিত ও বুদ্ধিবৃত্তিক দল কখনো সাধারণ মানুষের মন জয় করতে পারবে না।
➡️ ৪. ১৯৪৮ সালের কলকাতা সম্মেলন (The Historic Dehradun/Calcutta Dissolution)—
১৯৪৮ সালের ২৬-৩০ ডিসেম্বর কলকাতায় র্যাডিকাল ডেমোক্রেটিক পার্টির শেষ সর্বভারতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দীর্ঘ আলোচনার পর রায় তাঁর কর্মীদের বোঝাতে সক্ষম হন যে, ক্ষমতা দখলের রাজনীতি দিয়ে মানুষের মুক্তি আসবে না।
* সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে দল বিলুপ্তির প্রস্তাব পাস করা হয়।
* রাজনৈতিক দলের পরিবর্তে তাঁরা গঠন করেন 'র্যাডিকাল হিউম্যানিস্ট মুভমেন্ট' (Radical Humanist Movement)। এটি কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না, বরং ছিল একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন।
➡️ ৫. দলের বিকল্প: 'পিপলস কমিটি' এবং বুদ্ধিজীবী তৈরি—
দল ভেঙে দেওয়ার পর এম. এন. রায় তাঁর কর্মীদের নির্দেশ দেন তাঁরা যেন নির্বাচনে লড়ার পেছনে সময় নষ্ট না করে গ্রামে-গঞ্জে সাধারণ মানুষের কাছে যান। তাঁদের মূল কাজ হবে:
* সাধারণ মানুষকে যুক্তিবাদী ও স্বাধীনচেতা করে তোলা।
* তৃণমূল স্তরে 'পিপলস কমিটি' (People's Committees) বা দলহীন স্থানীয় পরিষদ গড়ে তোলা, যা নিচ থেকে গণতন্ত্র পরিচালনা করবে।
এম. এন. রায়ের এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে তিনি ক্ষমতার কাঙাল কোনো প্রথাগত রাজনীতিবিদ ছিলেন না, বরং ছিলেন একজন খাঁটি দার্শনিক। তিনি একটি রাজনৈতিক দল পরিচালনার চেয়ে মানুষের চিন্তার মুক্তিকে অনেক বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন।
***
ভালো লাগলে লাইক কমেন্ট শেয়ার ফলো করতে ভুলবেন না।
***

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন