কেমন ছিল ক্রুশ্চেভের "ডি-স্তালিনাইজেশন"?


এই অধ্যায়টিকে আমরা পাঁচটি ভাগে পড়বো। প্রথম ভাগে জানবো মহামানব হয়ে ওঠা স্তালিনের ব্যক্তিপুজার ইতিহাস, দ্বিতীয় ভাগে জানবো ডি স্তালিনাইজেশনের প্রক্রিয়া, তৃতীয় ভাগে দেখবো সমাজতাত্ত্বিকরা কীভাবে বিষয়টির ব্যাখ্যা করেছেন, চতুর্থ ভাগে দেখবো কার্ল মার্ক্স বা ভ্লাদিমির লেনিন নিজেদের মূর্তিপূজা বা ব্যক্তিপূজা নিয়ে কী সতর্কতা দিয়েছিলেন এবং অন্তিম অধ্যায়ে জানবো লেনিন নিজেও মার্কসের কোন কোন আদর্শ লঙ্ঘন করেছিলেন।


#### কেমন ছিল দেশজুড়ে স্তালিনের মূর্তি প্রতিষ্ঠা থেকে ব্যক্তিপুজার ইতিহাস?

জোসেফ স্তালিনের আমলে (১৯২৯-১৯৫৩) সোভিয়েত ইউনিয়ন জুড়ে তাঁর মূর্তি, ছবি এবং গুণকীর্তনের যে সর্বব্যাপী রূপ ছিল, তা মানব ইতিহাসের অন্যতম তীব্র ও সুপরিকল্পিত "ব্যক্তিপূজা" (Cult of Personality) হিসেবে পরিচিত। এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক শ্রদ্ধা ছিল না, বরং রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডা ও ভয়ের শাসনকে কাজে লাগিয়ে স্তালিনকে এক 'অভ্রান্ত ঈশ্বর' বা 'ত্রুটিহীন অতিমানব' হিসেবে জনগণের মনস্তত্ত্বে গেঁথে দেওয়ার একটি আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছিল।

নিচে দেশজুড়ে স্তালিনের মূর্তি সংস্কৃতি এবং এই ব্যক্তিপূজার সম্পূর্ণ ইতিহাস বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

## ১. সর্বত্র মূর্তির সর্বব্যাপী উপস্থিতি (The Geography of Idols)—

স্তালিনের আমলে সোভিয়েত ইউনিয়নের এমন কোনো ভৌগোলিক বা সামাজিক কোণ ছিল না, যেখানে তাঁর মূর্তি বা ভাস্কর্য দৃশ্যমান ছিল না:

* বিশালকার মেগা-ভাস্কর্য:
প্রতিটি বড় শহরের মূল চত্বর (Square), পার্ক, রেলস্টেশন, বিমানবন্দর এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রবেশদ্বারে স্তালিনের বিশাল ব্রোঞ্জ, মার্বেল বা কংক্রিটের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, ভলগা-ডন ক্যানেলের প্রবেশদ্বারে স্তালিনের একটি ৪০ মিটার (১৩০ ফুট) উঁচু মেগা-মূর্তি তৈরি করা হয়েছিল।

* শ্রেণিকক্ষ ও কলকারখানা:
প্রতিটি ফ্যাক্টরি, সরকারি অফিস, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং এমনকি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে ব্ল্যাকবোর্ডের ঠিক ওপরে স্তালিনের ছবি বা ছোট আবক্ষ মূর্তি (Bust) রাখা আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল।

* বাসাবাড়ির "পবিত্র কোণ":
সাধারণ সোভিয়েত নাগরিকেরা তাঁদের ঘরের দেয়ালে স্তালিনের ছবি টাঙিয়ে রাখতেন [Everyday Stalinism]। তৎকালীন সময়ে রাশিয়ার বহু মানুষ ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় আইকন বা যীশুর ছবির মতো করেই ঘরের মূল কোণটিতে স্তালিনের ছবি রাখতেন [Everyday Stalinism]। কারণ, ঘরে স্তালিনের ছবি না থাকাটা সিক্রেট পুলিশের চোখে "পার্টির প্রতি আনুগত্যের অভাব" বা "দেশদ্রোহিতা" হিসেবে গণ্য হতে পারত।

## ২. স্তালিনকে "পূজা" করার ধরণ ও মিডিয়া প্রচারণা—

খবরের কাগজ, বই, রেডিও এবং সিনেমার মাধ্যমে স্তালিনের ভাবমূর্তি এমন এক স্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যা ধর্মীয় উপাসনার সমতুল্য রূপ ধারণ করেছিল:

* ঐশ্বরিক উপাধি ও বিশেষণ:
স্তালিনকে কেবল একজন সাধারণ রাজনৈতিক নেতা বা জেনারেল সেক্রেটারি বলা হতো না। সোভিয়েত গণমাধ্যমে তাঁকে সম্বোধন করা হতো—"মানবজাতির মহান শিক্ষক", "সর্বকালের সেরা প্রতিভাবান বিজ্ঞানী", "আমাদের সুখের কারিগর", "বিশ্বের সব শিশুদের পরম প্রিয় বাবা" এবং "কমিউনিজমের আলোকবর্তিকা" [Everyday Stalinism]।

* ইতিহাসের প্রাতিষ্ঠানিক বিকৃতি:
১৯৩০-এর দশকে স্কুল-কলেজের সমস্ত পাঠ্যপুস্তক রাতারাতি পুনর্লিখন করা হয়েছিল। সেখানে দেখানো হতো যে, ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব এবং লাল ফৌজ (Red Army) গঠনের পুরো কৃতিত্ব ছিল কেবল ভ্লাদিমির লেনিন ও জোসেফ স্তালিনের। লেনিনের আসল প্রধান সহযোদ্ধা (যেমন লিওন ট্রটস্কি)-দের নাম ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ মুছে দিয়ে ছবি থেকে তাঁদের অবয়ব এডিট করে স্তালিনকে লেনিনের একমাত্র সুযোগ্য এবং ত্রুটিহীন উত্তরসূরি হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছিল।

* শিল্প ও সংস্কৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ:
কবি, লেখক এবং চিত্রশিল্পীদের জন্য স্তালিনকে নিয়ে প্রশংসা গীতি বা কবিতা লেখা বাধ্যতামূলক ছিল। বিখ্যাত রুশ সুরকার, নাট্যকার ও চিত্রশিল্পীরা কেবল স্তালিনের মহিমা প্রচারের জন্য দিনরাত কাজ করতে বাধ্য হতেন। এর ব্যতিক্রম করলেই জোটে মিলত সাইবেরিয়ার নির্বাসন।

## ৩. এই "পূজা" প্রদর্শন না করার আইনি ও সামাজিক পরিণতি—

স্তালিনের এই ব্যক্তিপূজা মন থেকে না করলেও, প্রকাশ্যে তা শতভাগ প্রদর্শন করা ছিল বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি:

* হাততালির আতঙ্ক ও ট্র্যাজেডি:
পার্টির বিভিন্ন সাধারণ সভায় যখন স্তালিনের নাম উচ্চারণ করা হতো, তখন হলের সব মানুষ দাঁড়িয়ে হাততালি দেওয়া শুরু করতেন। কেউ আগে হাততালি থামানোর সাহস পেতেন না, কারণ সিক্রেট পুলিশ (NKVD) নজর রাখত কে প্রথম হাততালি থামাল। অনেক সময় টানা ১০-১৫ মিনিট হাততালি চলার পর অফিশিয়াল বেল বাজিয়ে হাততালি থামানো হতো। যিনি প্রথম হাততালি থামাতেন, অনেক ক্ষেত্রে পরের দিন তাঁকে "স্তালিন-বিরোধী" বা বুর্জোয়া স্পাই অভিযোগে গ্রেফতার করা হতো।

* অসাবধানতার চরম শাস্তি:
স্তালিনের মূর্তি বা ছবির প্রতি সামান্যতম অবহেলা বা অসম্মানের শাস্তি ছিল কুখ্যাত 'গুল্যাগ' (Gulag) শ্রমশিবিরে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড বা সরাসরি মৃত্যুদণ্ড [Khrushchev's Thaw]। উদাহরণস্বরূপ, অসাবধানতাবশত খবরের কাগজে থাকা স্তালিনের ছবির ওপর কোনো কালির দাগ পড়া, চা পড়ে যাওয়া বা সেই কাগজ দিয়ে কোনো জিনিস মোড়ানোর অপরাধেও বহু মানুষকে সাইবেরিয়ার বরফে খাটতে পাঠানো হয়েছিল।

## ৪. স্তালিনের নিজস্ব রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি—

ঐতিহাসিকদের (যেমন স্টিফেন কোটকিন বা জে. আর্চ গেটি) মতে, স্তালিন ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত বাস্তববাদী এবং ঠান্ডা মাথার মানুষ ছিলেন [J. Arch Getty, Stephen Kotkin]। তিনি নিজে জানতেন যে তিনি ঈশ্বর নন এবং ব্যক্তিগত জীবনে তিনি খুব বিলাসবহুল পোশাকও পরতেন না। কিন্তু তিনি এই ব্যক্তিপূজাকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপুল অশিক্ষিত ও ধর্মীয় ভাবাবেগসম্পন্ন সাধারণ মানুষকে (যারা শত শত বছর ধরে জারের শাসন ও ধর্মীয় রাজতন্ত্রে অভ্যস্ত ছিল) একটি একক পতাকার নিচে একতাবদ্ধ রাখতে, নিজের একনায়কত্বকে বৈধতা দিতে এবং বলশেভিক পার্টির ভেতরের সব ভিন্নমতকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে তিনি এই "দেবতুল্য" ভাবমূর্তি রাষ্ট্র জুড়ে তৈরি হতে দিয়েছিলেন।

## ৫. মূর্তির পতন ও পূজার অবসান—

১৯৫৩ সালে স্তালিনের মৃত্যুর পর এই চরম ব্যক্তিপূজার অবসান ঘটে। ১৯৫৬ সালের ২০তম পার্টি কংগ্রেসে নিকিতা ক্রুশ্চেভ তাঁর বিখ্যাত "গোপন বক্তৃতা"র মাধ্যমে এই ব্যক্তিপূজার চূড়ান্ত নিন্দা করেন এবং একে "মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের মূল চেতনার অবমাননা" হিসেবে ঘোষণা করেন। এর পরেই শুরু হয় 'ডি-স্তালিনাইজেশন' বা স্তালিনমুক্তকরণ প্রক্রিয়া।

#### স্তালিনমুক্তকরণ বা 'ডি-স্তালিনাইজেশন' কী?

'ডি-স্তালিনাইজেশন' (De-Stalinization) বা স্তালিনমুক্তকরণ প্রক্রিয়া হলো সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসের অন্যতম বড় একটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার আন্দোলন।

পুরো সোভিয়েত ইউনিয়ন জুড়ে স্তালিনের হাজার হাজার ব্রোঞ্জ ও মার্বেলের মূর্তি রাতারাতি ক্রেন দিয়ে উপড়ে ফেলে গলিয়ে ফেলা হয়, স্তালিনগ্রাদ শহরের নাম বদলে ভলগোগ্রাদ রাখা হয় এবং ১৯৬১ সালে লেনিনের পাশ থেকে স্তালিনের মমি করা দেহ বের করে ক্রেমলিনের সাধারণ মাটিতে পুঁতে দেওয়া হয়। মূর্তির এই পতন সোভিয়েত মানুষকে শিখিয়েছিল যে ইতিহাসে কোনো শাসকই চিরস্থায়ী বা দেবতার মতো অভ্রান্ত নন।

১৯৫৩ সালে জোসেফ স্তালিনের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরসূরি নিকিতা ক্রুশ্চেভ এই প্রক্রিয়ার সূচনা করেন।

এর মূল উদ্দেশ্য ছিল স্তালিনের আমলের চরম স্বৈরতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, অযৌক্তিক ভয়ের সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিসর্বস্ব শাসন (Cult of Personality) উচ্ছেদ করে সোভিয়েত ইউনিয়নকে একটি মানবিক, আইনসম্মত ও আধুনিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তর করা।

নিচে ডি-স্তালিনাইজেশন প্রক্রিয়ার পুরো ইতিহাস, বিভিন্ন পর্যায় ও এর প্রভাব বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

## ১. পটভূমি ও ঐতিহাসিক "গোপন বক্তৃতা" (১৯৫৬)—

স্তালিনের মৃত্যুর পর (১৯৫৩) তাঁর অতি-কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা কাঠামো ভাঙার জন্য ক্রুশ্চেভ একটি মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন।

* ২০তম পার্টি কংগ্রেস:
২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির ২০তম কংগ্রেসের শেষ দিনে ক্রুশ্চেভ এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তাঁর বিখ্যাত "গোপন বক্তৃতা" (Secret Speech) পাঠ করেন ।

* মুখোশ উন্মোচন:
এই বক্তৃতায় তিনি স্তালিনের 'ব্যক্তিপূজা'র তীব্র নিন্দা করেন এবং ১৯৩৬-৩৮ সালের "গ্রেট পার্জ" বা মহা-শুদ্ধি অভিযানে লাখ লাখ নিরীহ কমিউনিস্ট ও নাগরিকদের অন্যায়ভাবে হত্যার নথিপত্র ফাঁস করেন। এটিই ছিল ডি-স্তালিনাইজেশনের আনুষ্ঠানিক সূচনা।

## ২. ডি-স্তালিনাইজেশন প্রক্রিয়ার প্রধান প্রধান পদক্ষেপসমূহ—

এই প্রক্রিয়ার অধীনে সোভিয়েত ইউনিয়নকে সম্পূর্ণ স্তালিনমুক্ত করার জন্য রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক স্তরে বিশাল ওলটপালট করা হয়:

## ক) রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কার—

* গুল্যাগ (Gulag) ব্যবস্থার অবসান:
স্তালিনের কুখ্যাত সাইবেরিয়ান শ্রমশিবিরগুলো বা গুল্যাগ নেটওয়ার্ক প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। আনুমানিক কয়েক মিলিয়ন (লাখ লাখ) রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দিয়ে সমাজে পুনর্বাসন করা হয়।

* মরণোত্তর পুনর্বাসন (Rehabilitation):
স্তালিনের আমলে যে সমস্ত কমিউনিস্ট নেতা (যেমন বুখারিন, কামেনেভ) ও সাধারণ মানুষকে "দেশদ্রোহী" বা "বিদেশি স্পাই" বলে গুলি করা হয়েছিল, রাষ্ট্রীয় তদন্তের মাধ্যমে তাঁদের নির্দোষ ঘোষণা করে তাঁদের সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

* কেজিবি (KGB)-র ডানা ছাঁটা:
স্তালিনের প্রধান হাতিয়ার—সিক্রেট পুলিশ (NKVD/KGB)-এর ক্ষমতা বহুগুণ কমিয়ে দেওয়া হয়। বিচারের আগে শারীরিক নির্যাতন বা বিনা বিচারে আটকে রাখার আইন বাতিল করা হয়।

## খ) প্রতীকী ও ভৌগোলিক পরিবর্তন (Symbolic Purge)—

* মূর্তি ও ছবি অপসারণ:
পুরো সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিটি শহর, পার্ক, স্কুল ও কারখানা থেকে স্তালিনের হাজার হাজার বিশাল বিশাল মূর্তি, ভাস্কর্য এবং ছবি রাতারাতি সরিয়ে ফেলা হয়।

* শহরের নাম বদল:
স্তালিনের নামে রাখা প্রধান প্রধান শহরের নাম বদলে ফেলা হয়। যেমন—ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত যুদ্ধক্ষেত্র 'স্তালিনগ্রাদ' (Stalingrad)-এর নাম বদলে রাখা হয় 'ভলগোগ্রাদ' (Volgograd)।

* মরদেহ অপসারণ (১৯৬১):
ডি-স্তালিনাইজেশনের চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবে, ১৯৬১ সালে মস্কোর রেড স্কয়ারে অবস্থিত লেনিনের রাজকীয় সমাধিসৌধ (Mausoleum) থেকে স্তালিনের সংরক্ষিত মৃতদেহ বের করে আনা হয় এবং ক্রেমলিনের দেয়ালের পাশে সাধারণ মাটির নিচে দাফন করা হয়।

## গ) সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদারীকরণ ('ক্রুশ্চেভের বরফগলা')—

* সেন্সরশিপ শিথিলকরণ:
গণমাধ্যম এবং সাহিত্যের ওপর কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই কমিয়ে দেওয়া হয়। ফলে দীর্ঘকাল পর সোভিয়েত লেখক ও কবিরা সমাজে স্তালিন আমলের ট্রমা ও ভয়ের বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তোলার স্বাধীনতা পান।

* আবাসন বিপ্লব:
স্তালিনের আমলের গাদাগাদি কম্যুনাল ফ্ল্যাট (Kommunalka) সংস্কৃতি বন্ধ করে সাধারণ মানুষের জন্য ব্যক্তিগত রান্নাঘর ও বাথরুমসহ স্বতন্ত্র অ্যাপার্টমেন্ট (Khrushchevka) তৈরি শুরু হয়, যা মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা প্রাইভেসির অধিকার ফিরিয়ে দেয়।

## ৩. আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও সমাজতান্ত্রিক শিবিরে ফাটল—

ডি-স্তালিনাইজেশন কেবল সোভিয়েত ইউনিয়নে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি বৈশ্বিক রাজনীতিতে বিশাল প্রভাব ফেলেছিল:

* সোভিয়েত-চীন ফাটল (Sino-Soviet Split):
চীনের কমিউনিস্ট নেতা মাও সেতুং স্তালিনের কট্টর অনুসারী ছিলেন। ক্রুশ্চেভ কর্তৃক স্তালিনের এই প্রকাশ্য সমালোচনাকে মাও সেতুং "মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা" ও রিভিশনবাদ (Revisionism) বলে আখ্যা দেন। এর ফলে বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের দুই পরাশক্তির সম্পর্ক চিরতরে ভেঙে যায়।

* পূর্ব ইউরোপে বিদ্রোহ:
স্তালিনের ভয় দূর হতেই পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে সোভিয়েত আধিপত্যের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ শুরু হয়। বিশেষ করে ১৯৫৬ সালে পোল্যান্ড এবং হাঙ্গেরিতে এক বিশাল সোভিয়েত-বিরোধী সশস্ত্র বিদ্রোহ দেখা দেয়, যা ক্রুশ্চেভ পরবর্তীতে সামরিক শক্তি দিয়ে দমন করেছিলেন [Hungarian Revolution of 1956]।

## ৪. ডি-স্তালিনাইজেশনের সীমাবদ্ধতা—

ক্রুশ্চেভের এই সংস্কার আন্দোলন শতভাগ সফল বা ত্রুটিমুক্ত ছিল না। এর কিছু বড় সীমাবদ্ধতা ছিল:

* ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়নি:
ক্রুশ্চেভ স্তালিন নামক 'ব্যক্তি'টির সমালোচনা করেছিলেন, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের একক দলীয় 'কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থা' বা একনায়কতান্ত্রিক কাঠামোর কোনো পরিবর্তন করেননি।

* স্ববিরোধী আচরণ:
ক্রুশ্চেভ নিজে স্তালিনের আমলে ইউক্রেনের প্রধান থাকার সময় বহু দমনপীড়নে অংশ নিয়েছিলেন। ফলে তিনি সেইসব অপরাধের দায় নিজের ওপর না নিয়ে কেবল স্তালিনের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন।

## ৫. সমাপ্তি ও ফলাফল—

১৯৬৪ সালে লিওনিদ ব্রেজনেভের নেতৃত্বে এক অভ্যন্তরীণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্রুশ্চেভ ক্ষমতাচ্যুত হন [Nikita Khrushchev]। ব্রেজনেভ ক্ষমতায় এসে এই ডি-স্তালিনাইজেশন প্রক্রিয়াটি থামিয়ে দেন, যা ইতিহাসে 'রি-স্তালিনাইজেশন' (Re-Stalinization) বা স্তালিনের আংশিক পুনর্বাসন নামে পরিচিত। ব্রেজনেভ স্তালিনের বড় বড় অপরাধের আলোচনা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ করেন এবং পাঠ্যপুস্তকে স্তালিনকে আবার একজন "মহৎ যুদ্ধজয়ী নেতা" হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেন।

সারসংক্ষেপ:
ডি-স্তালিনাইজেশন ছিল সোভিয়েত ইতিহাসের এমন এক ঐতিহাসিক মোড়, যা কোটি কোটি মানুষকে ভয়ের অন্ধকার থেকে বের করে এনেছিল। এটি প্রমাণ করেছিল যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতরেও ভুলের সংশোধন করা সম্ভব এবং এই প্রক্রিয়াই পরবর্তীতে ১৯৮০-এর দশকে মিখাইল গর্বাচেভের 'গ্লাসনস্ত' (উদারীকরণ) নীতি গ্রহণের পথ তৈরি করে দিয়েছিল।

#### দেশজুড়ে স্তালিনের মূর্তি সংস্কৃতি এবং এই ব্যক্তিপূজার ইতিহাসকে সমাজতাত্ত্বিকরা কীভাবে ব্যাখ্যা করেছেন?

জোসেফ স্তালিনের আমলের এই তীব্র ব্যক্তিপূজা এবং মূর্তি সংস্কৃতিকে মার্ক্সীয় সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা সমাজতন্ত্রের কোনো স্বাভাবিক রূপ হিসেবে দেখেননি, বরং একে মার্ক্সবাদের মূল চেতনার চরম বিকৃতি বা অবক্ষয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

কার্ল মার্ক্স তাঁর দর্শনে ব্যক্তিপূজার তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি ১৮৭৭ সালে উইলহেম ব্লসকে লেখা একটি চিঠিতে স্পষ্ট বলেছিলেন,
"কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল গঠনের সময় আমরা ব্যক্তিপূজার সমস্ত উপাদানকে সমূলে উৎপাটন করার শর্ত রেখেছিলাম।"
তাই স্তালিনের এই প্রাঙ্গণজুড়ে মূর্তি সংস্কৃতিকে ব্যাখ্যা করতে মার্ক্সীয় তাত্ত্বিকেরা কয়েকটি প্রধান ধারায় বিভক্ত হয়ে তাঁদের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দাঁড় করিয়েছেন:

## ১. লিওন ট্রটস্কি এবং 'আমলাতান্ত্রিক অবক্ষয়' (Bureaucratic Degeneration)—

মার্ক্সীয় সমাজতাত্ত্বিকদের মধ্যে স্তালিনবাদের প্রথম ও সবচেয়ে প্রামাণ্য বিশ্লেষণ করেন লেনিনের সহযোদ্ধা লিওন ট্রটস্কি তাঁর 'The Revolution Betrayed' (১৯৩৬) গ্রন্থে।

* শ্রমিক শ্রেণীর ক্ষমতা হরণ:
ট্রটস্কিপন্থী মার্ক্সবাদীদের মতে, সমাজতন্ত্রে ক্ষমতা থাকার কথা শ্রমিকদের (Soviets) হাতে। কিন্তু স্তালিনের আমলে একদল সুযোগসন্ধানী আমলা বা 'নমেনক্লাতুরা' (Nomenklatura) রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতা দখল করে নেয়।

* আমলাতন্ত্রের ঢাল:
এই আমলাতান্ত্রিক শ্রেণীটির নিজেদের কোনো ঐতিহাসিক বা সামাজিক বৈধতা ছিল না। তাই তাদের নিজেদের ক্ষমতা, প্রিভিলেজ এবং দুর্নীতিকে আড়াল করতে এবং জনগণের অসন্তোষকে দমন করতে স্তালিনকে একটি "অভ্রান্ত দেবতুল্য প্রতীক" বা মূর্তিতে রূপান্তর করার প্রয়োজন ছিল। স্তালিনের ব্যক্তিপূজা আসলে স্তালিন নামক ব্যক্তির পূজা ছিল না, তা ছিল সোভিয়েত আমলাতন্ত্রের আত্মরক্ষার ঢাল।

## ২. ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল এবং 'মনস্তাত্ত্বিক কতৃত্ববাদ' (Authoritarian Psychology)—

পশ্চিম ইউরোপের মার্ক্সীয় সমাজতাত্ত্বিকদের ধারা (যেমন থিওডোর অ্যাডর্নো, হার্বার্ট মার্কুজে বা এরিক ফ্রম) ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের মাধ্যমে স্তালিনের ব্যক্তিপূজাকে সামাজিক মনস্তত্ত্বের আলোতে ব্যাখ্যা করেছেন:

* জারিস্ত মানসিকতা ও শূন্যতা:
রাশিয়ার সাধারণ মানুষ শত শত বছর ধরে 'জার' (Tsar) বা রাজতন্ত্র এবং অর্থোডক্স চার্চের ঐশ্বরিক শাসনে অভ্যস্ত ছিল। ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পর হঠাৎ করে ঈশ্বর ও জারের সেই শূন্যতা তৈরি হয়।

* বিকল্প গড (Alternative God):
ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের মতে, স্তালিনীয় রাষ্ট্রকাঠামো জনগণের এই অবদমিত মনস্তত্ত্বকে ব্যবহার করে স্তালিনকে একজন "বিকল্প ঈশ্বর" বা আধুনিক সেক্যুলার জার হিসেবে উপস্থাপন করে। শহরের মোড়ে মোড়ে স্তালিনের বিশালাকার মূর্তিগুলো আসলে জারের আমলের ধর্মীয় আইকন বা যীশুর মূর্তিরই একটি সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর ছিল, যা মানুষের স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সামনে মাথা নত করতে বাধ্য করত।

## ৩. আন্তোনিও গ্রামশি ও 'সাংস্কৃতিক আধিপত্য' (Cultural Hegemony)—

ইতালীয় মার্ক্সবাদী দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামশির 'হেজেমনি' বা আধিপত্যের তত্ত্ব দিয়ে অনেক সমাজবিজ্ঞানী স্তালিনের মূর্তি সংস্কৃতিকে বিশ্লেষণ করেছেন:

* বন্দুকের বাইরে সম্মতি তৈরি:
একটি সর্বাত্মকবাদী (Totalitarian) রাষ্ট্র কেবল বন্দুকের নলে বা ভয়ের জোরে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না; তার জন্য জনগণের একধরণের "স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি" (Consent) তৈরি করতে হয়।

* মূর্তির মাধ্যমে হেজেমনি:
দেশজুড়ে স্তালিনের কোটি কোটি মূর্তি, কবিতা, গান ও প্রোপাগান্ডা ছিল এমন এক সাংস্কৃতিক আধিপত্য তৈরির হাতিয়ার, যা সাধারণ মানুষের অবচেতন মনে এই ধারণা গেঁথে দিয়েছিল যে—স্তালিনই রাষ্ট্র, স্তালিনই সমাজতন্ত্র এবং স্তালিনের বিরোধিতা করার অর্থ হলো নিজের দেশের এবং বিপ্লবের বিরোধিতা করা।

## ৪. লুই আলথুসার ও 'রাষ্ট্রীয় আদর্শিক যন্ত্রপাতি' (Ideological State Apparatus)—

ফরাসি মার্ক্সবাদী সমাজতাত্ত্বিক লুই আলথুসারের তত্ত্ব অনুযায়ী, স্তালিনের ব্যক্তিপূজা ছিল সোভিয়েত রাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত "আদর্শিক যন্ত্রপাতি":

* আলথুসারীয় বিশ্লেষণে, স্তালিনের মূর্তিগুলো কেবল পাথর বা ব্রোঞ্জের টুকরো ছিল না; সেগুলো ছিল একেকটি ভিজ্যুয়াল টেক্সট বা দৃশ্যমান ইশতেহার। স্কুল, কলেজ, কারখানা এবং ঘরে ঘরে স্তালিনের ছবি বা মূর্তি রাখার মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিককে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিত যে তারা একজন পরম পিতার নজরদারির মধ্যে রয়েছে। এটি নাগরিকদের অবাধ্য হওয়া থেকে বিরত রাখার একটি কাঠামোগত কৌশল ছিল।

## ৫. উত্তর-স্তালিনীয় ও আধুনিক মার্ক্সবাদীদের মূল্যায়ন—

আধুনিক মার্ক্সীয় সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, স্তালিনের এই ব্যক্তিপূজা মার্ক্সবাদের 'ঐতিহাসিক বস্তুবাদ' (Historical Materialism)-এর সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল। মার্ক্সবাদ বিশ্বাস করে যে "জনগণই ইতিহাসের চালিকাশক্তি, কোনো একক ব্যক্তি নয়"। কিন্তু স্তালিনের মূর্তি সংস্কৃতি ইতিহাসকে উল্টে দিয়ে প্রচার করেছিল যে একজন ব্যক্তিই পুরো সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাগ্যবিধাতা। এই আদর্শিক বিচ্যুতির কারণেই সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের ভেতরে একটি বিশাল গণতান্ত্রিক শূন্যতা তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে পুরো ব্যবস্থার পতনের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

#### কার্ল মার্ক্স বা ভ্লাদিমির লেনিন নিজেদের জীবদ্দশায় তাঁদের নিজেদের মূর্তি বা ব্যক্তিপূজা নিয়ে কী ধরণের সতর্কতা দিয়েছিলেন?

কার্ল মার্ক্স এবং ভ্লাদিমির লেনিন—উভয় নেতাই তাঁদের জীবদ্দশায় নিজেদের পরম বা ঈশ্বরতুল্য নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা এবং নিজেদের নামে মূর্তি বানানোর চরম বিরোধী ছিলেন। মার্ক্সীয় দর্শনে "ব্যক্তিপূজা" (Cult of Personality)-কে বুর্জোয়া ও রাজতান্ত্রিক মানসিকতার অবশেষ হিসেবে দেখা হয়, কারণ মার্ক্সবাদ বিশ্বাস করে যে ইতিহাসের চালিকাশক্তি হলো সাধারণ জনগণ ও তাদের শ্রেণীসংগ্রাম, কোনো একক ব্যক্তি বা অতিমানব নয়।

নিজেদের ব্যক্তিপূজা ও মূর্তি সংস্কৃতি নিয়ে কার্ল মার্ক্স ও ভ্লাদিমির লেনিন জীবদ্দশায় যে ধরণের তীব্র সতর্কতা ও আপত্তি জানিয়েছিলেন, তা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

## ১. কার্ল মার্ক্স-এর কঠোর সতর্কতা—

কার্ল মার্ক্স তাঁর পুরো জীবন জুড়েই ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্তুতি বা চাটুকারিতার ঘোর বিরোধী ছিলেন।

* ব্যক্তিপূজা উচ্ছেদের শর্ত:
১৮৭৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জার্মান সমাজবিজ্ঞানী উইলহেম ব্লসকে লেখা একটি চিঠিতে কার্ল মার্ক্স স্পষ্ট ভাষায় তাঁর মনোভাব ব্যক্ত করেছিলেন:

"আমার প্রচণ্ড অপছন্দের কারণে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল (First International) গঠনের সময় আমি বা এঙ্গেলস কখনোই কোনো ধরনের জনসমক্ষে সম্মান বা প্রশংসা প্রদর্শনের অনুমতি দিইনি। আমরা ইন্টারন্যাশনাল-এ যোগ দেওয়ার প্রধান শর্তই রেখেছিলাম যে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক অন্ধ পূজার (Cult of Person) উদ্রেক করে এমন সমস্ত উপাদান নিয়মকানুন থেকে সমূলে উৎপাটন করতে হবে।"

* উপহার ও মেডেল প্রত্যাখ্যান:
বিভিন্ন দেশের সমাজতান্ত্রিক দলগুলো যখন মার্ক্সকে সম্মান জানাতে বিভিন্ন পদক, স্মারক বা তাঁর নামে প্রশংসামূলক কমিটি গঠন করতে চেয়েছিল, মার্ক্স ও তাঁর সহযোদ্ধা ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস সবসময় তা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁরা মনে করতেন, এতে আন্দোলনের মূল লক্ষ্য বিচ্যুত হয়ে ব্যক্তির দিকে চলে যায়।

## ২. ভ্লাদিমির লেনিনের তীব্র আপত্তি ও সতর্কতা—

ভ্লাদিমির লেনিন ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত বিনয়ী ও সাধারণ জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত ছিলেন। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর যখন বলশেভিক পার্টির অতি-উৎসাহী কর্মীরা তাঁর ছবি ও মূর্তি তৈরি শুরু করেন, তখন লেনিন চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।

* মূর্তি ও ছবি বানানোর ওপর ক্ষোভ:
১৯২০ সালে লেনিনের ৫০তম জন্মদিনে তাঁর অজান্তেই পার্টি কর্মীরা একটি বড় সংবর্ধনা সভার আয়োজন করে এবং তাঁর ছবি দিয়ে চারদিক সাজায়। লেনিন সেই সভায় এসে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং মঞ্চে দাঁড়িয়েই কমরেডদের তিরস্কার করে বলেন:

"আপনাদের এই আয়োজন আমাকে অত্যন্ত লজ্জিত ও বিরক্ত করেছে। দয়া করে এই ধরণের বুর্জোয়া চাটুকারিতা ও ব্যক্তিপূজা বন্ধ করুন। আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত অর্থনীতির পুনর্গঠনে, আমার ছবি টাঙানো বা প্রশংসা গীতি গাওয়ার পেছনে সময় নষ্ট করা বন্ধ করা উচিত।"

* স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের বিরোধিতা:
বলশেভিক নেতা ভ্লাদিমির বোনচ-ব্রুয়েভিচের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, একবার মস্কোর রাস্তায় লেনিনের একটি আবক্ষ মূর্তি (Bust) বসানোর পরিকল্পনা শুনে লেনিন সরাসরি সিক্রেট পুলিশ প্রধানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন এই কাজ অবিলম্বে বন্ধ করা হয়। তিনি বলেছিলেন,

"একজন জীবিত মানুষের মূর্তি বানানো কেবল হাস্যকরই নয়, এটি মার্ক্সবাদের চেতনার সাথে এক ধরণের বড় প্রতারণা।"

* ভবিষ্যদ্বাণী ও সতর্কতা (রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক রূপ):
লেনিন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'The State and Revolution' (১৯১৭)-এ একটি অত্যন্ত দূরদর্শী সতর্কতা দিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে স্তালিনের আমলের ক্ষেত্রে হুবহু মিলে গিয়েছিল। তিনি লিখেছিলেন:

"ইতিহাসে দেখা গেছে, মহান বিপ্লবীদের জীবদ্দশায় শোষক শ্রেণী তাঁদের ওপর তীব্র নির্যাতন চালায় এবং তাঁদের তত্ত্বকে কুৎসা দিয়ে দমন করে। কিন্তু তাঁদের মৃত্যুর পর, শোষক বা সুবিধাবাদী শ্রেণী সেই বিপ্লবীদের 'ক্ষতিহীন আইকন' বা 'দেবতায়' রূপান্তর করার চেষ্টা করে। তাঁরা বিপ্লবীদের মূর্তি বানিয়ে পূজা করে যাতে সাধারণ মানুষকে শান্ত রাখা যায়, অথচ একই সাথে তাঁরা সেই বিপ্লবীদের বিপ্লবী তত্ত্বের মূল চেতনাকে পুরোপুরি ধুয়েমুছে সাফ করে দেয়।"

## স্তালিন কীভাবে এই সতর্কতা অমান্য করেছিলেন?

১৯২৪ সালে লেনিনের মৃত্যুর পর জোসেফ স্তালিন লেনিনের এই সমস্ত সতর্কতা সম্পূর্ণ অমান্য করেন। স্তালিন নিজের ক্ষমতাকে বৈধ করতে মৃত লেনিনকে এক ধরণের "সেক্যুলার গড" বা দেবতায় রূপান্তর করেন। তিনি লেনিনের দেহ মমি করে রাজকীয় সমাধিসৌধে (Mausoleum) রাখেন এবং দেশজুড়ে লেনিনের হাজার হাজার মূর্তি বানান। এই 'লেনিন-পূজা'-র আড়ালে স্তালিন মূলত নিজের জন্য এক বিশাল ব্যক্তিপূজার সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন, যা লেনিন বেঁচে থাকলে হয়তো কঠোর শাস্তি দিয়ে বন্ধ করতেন।

*** এইস্থানে এসে অনেক পাঠক বন্ধু ভুল বুঝে লেনিনের পক্ষ অবলম্বন করছি বলে অভিযোগ করতে পারেন। আমি ইতিহাসে যা ঘটেছে তা উপস্থাপন করছি মাত্র। সে কারণে লেনিনের পক্ষটিও স্পষ্ট করবার দায়িত্ব বোধ করছি। প্রশ্ন, লেনিন কি মার্কসের মাপকাঠিতে সঠিক? লেনিনের সামগ্রিক ইতিহাস, কার্যকলাপ, ইতিবাচক-নেতিবাচক দিক সহ তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু মারতভের সাথে মতবিরোধ, বলশেভিক ও মেনশেভিক দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে যাওয়া সহ বিস্তারিত পোস্ট কিছুকাল পূর্বে করেছি। অবশ্যই পড়ে নেবেন। লিংক কমেন্ট বক্সে থাকবে।

#### লেনিন মার্কসের কোন কোন আদর্শ লঙ্ঘন করেছিলেন?

ভ্লাদিমির লেনিন কার্ল মার্ক্সের মূল তত্ত্ব ও সমাজতান্ত্রিক দর্শনের বেশ কিছু মৌলিক আদর্শ লঙ্ঘন বা পরিবর্তন করেছিলেন।

মার্ক্সীয় তত্ত্বের এই পরিবর্তনকে লেনিনের সমর্থকেরা বাস্তব পরিস্থিতির আলোকে "উন্নয়ন বা বিকাশ" (যা 'মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ' নামে পরিচিত) বলে দাবি করেন। তবে খাঁটি মার্ক্সবাদী এবং সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, লেনিনের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত ছিল মার্ক্সের মূল দর্শনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
লেনিন কার্ল মার্ক্সের যে সমস্ত প্রধান আদর্শ লঙ্ঘন করেছিলেন, তা নিচে দেওয়া হলো:

## ১. বিপ্লবের পূর্বশর্ত লঙ্ঘন (অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট)—

* মার্ক্সের তত্ত্ব:
কার্ল মার্ক্স স্পষ্ট বলেছিলেন যে, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কেবল সেখানেই সম্ভব যেখানে পুঁজিবাদ (Capitalism) তার চরম শিখরে পৌঁছেছে এবং একটি বিশাল, শিক্ষিত ও সচেতন শ্রমিক শ্রেণী (Proletariat) তৈরি হয়েছে। মার্ক্সের দৃষ্টিতে ইংল্যান্ড, জার্মানি বা আমেরিকা ছিল বিপ্লবের জন্য উপযুক্ত দেশ। রাশিয়া ছিল একটি অনুন্নত, চার্চ-নিয়ন্ত্রিত কৃষিপ্রধান দেশ, যা বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত ছিল না।

* লেনিনের বিচ্যুতি:
লেনিন মার্ক্সের এই অর্থনৈতিক পূর্বশর্ত পুরোপুরি অমান্য করেন। তিনি দাবি করেন, পুঁজিবাদের সবচেয়ে দুর্বল শিকলটি (Weakest Link) রাশিয়াতেই রয়েছে এবং বুর্জোয়া পুঁজিপতি শ্রেণী শক্তিশালী হওয়ার আগেই সেখানে সমাজতন্ত্র কায়েম করা সম্ভব।

## ২. 'শ্রমিক শ্রেণীর শাসন' বনাম 'পার্টির শাসন'—

* মার্ক্সের তত্ত্ব:
মার্ক্স 'শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কতন্ত্র' (Dictatorship of the Proletariat) বলতে বুঝিয়েছিলেন পুরো মেহনতি মানুষের সামগ্রিক ও গণতান্ত্রিক শাসন, যেখানে মেজরিটি বা সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক শ্রেণী রাষ্ট্র পরিচালনা করবে।

* লেনিনের বিচ্যুতি:
লেনিন তাঁর 'ভ্যানগার্ড পার্টি' (Vanguard Party) তত্ত্বের মাধ্যমে এই আদর্শ বদলে ফেলেন। তিনি মনে করতেন, সাধারণ শ্রমিকেরা নিজেরা কখনো বিপ্লব করতে পারবে না, বড়জোর তারা বেতনের দাবি নিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারবে। তাই বিপ্লব পরিচালনার জন্য একদল পেশাদার এবং সুশৃঙ্খল বিপ্লবী পার্টি দরকার। এর ফলে ক্ষমতা শ্রমিকদের হাত থেকে চলে গিয়ে বলশেভিক পার্টির শীর্ষ আমলাদের মুঠোয় চলে যায়।

## ৩. ব্যক্তিস্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ভিন্নমত দমন—

* মার্ক্সের তত্ত্ব:
মার্ক্স রাষ্ট্রকে একটি শোষণের যন্ত্র মনে করতেন এবং সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের বিলুপ্তি (Withering away of the State) ঘটানো, যেখানে মানুষের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা থাকবে।

* লেনিনের বিচ্যুতি:
১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের পর লেনিন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং কঠোর কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র কাঠামো তৈরি করেন। তিনি বলশেভিক পার্টি ছাড়া অন্য সব সমাজতান্ত্রিক ও বামপন্থী রাজনৈতিক দল (যেমন: মেনশেভিক ও সোশ্যালিস্ট রেভোলিউশনারি) নিষিদ্ধ করেন। তিনি 'চেকা' (Cheka) নামক কুখ্যাত সিক্রেট পুলিশ গঠন করে হাজার হাজার রাজনৈতিক ভিন্নমতালম্বীকে দমন করেন, যা মার্ক্সের মানবিক ও মুক্ত সাম্যবাদী সমাজের দর্শনের পরিপন্থী ছিল।

## ৪. যুদ্ধকালীন সাম্যবাদ বনাম নতুন অর্থনৈতিক নীতি (NEP)—

* পুঁজিবাদের সাময়িক পুনর্বাসন:
১৯২১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকাতে লেনিন 'নিউ ইকোনমিক পলিসি' (NEP) চালু করেন। এই নীতির মাধ্যমে তিনি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আবার সীমিত আকারে ব্যক্তিমালিকানা, ছোট ব্যবসা, মুক্তবাজার এবং মুনাফা অর্জনের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনেন। এটি ছিল খাঁটি মার্ক্সীয় সমাজতন্ত্রের নীতি থেকে একটি বড় সাময়িক পিছু হঠা বা আদর্শিক আপস।

সংক্ষেপে:
কার্ল মার্ক্স সমাজতন্ত্রের যে রূপরেখা দিয়েছিলেন তা ছিল প্রধানত অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক। লেনিন বাস্তব রাজনীতি ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে টিকে থাকার জন্য একে একটি কঠোর প্রশাসনিক ও একদলীয় শাসন কাঠামোয় রূপান্তর করেন। লেনিনের তৈরি এই অতি-কেন্দ্রীভূত পার্টি ব্যবস্থার ওপর ভর করেই পরবর্তীতে জোসেফ স্তালিন তাঁর কুখ্যাত সর্বাত্মকবাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক ব্যক্তিপূজার সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে পেরেছিলেন।
***
লাইক কমেন্ট শেয়ার ফলো করতে ভুলবেন না।
***

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

বিকল্প অর্থনীতি দ্বারা সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রের নির্মাণ কীভাবে সম্ভব?