সময়ের নিরিখে মার্কসবাদের যে সকল ত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধন হয়েছে

 

এই বিশেষ অধ্যায়টিকে আমরা তিনটি পর্বে পড়বো।

প্রথম পর্ব—বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী বা চিন্তাবিদের আধুনিক সমালোচনা এবং সংস্কার।
দ্বিতীয় পর্ব—মধ্যবিত্ত শ্রেণীর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা এবং সংশোধন।
তৃতীয় পর্ব—পেটি বুর্জোয়া নিয়ে মার্কসের সিদ্ধান্ত ও আধুনিক তাত্ত্বিকদের সংশোধন।
চতুর্থ পর্ব—তথ্য উৎস।

প্রথম পর্ব—

আমরা রাজনৈতিক দর্শনের এই আলোচনাটি পূর্বের অধ্যায়ে প্রারম্ভ করেছিলাম। মার্কসকে কোনো অন্ধ ঈশ্বর বা তাঁর তত্ত্বকে কোনো প্রশ্নাতীত ধর্মগ্রন্থ মনে না করে সময়ের নিরিখে এর সংস্কার করাটাই প্রকৃত মার্কসীয় দায়িত্ব। এও আলোচনা করেছিলাম যে, প্রশ্ন করা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সময়ের নিরিখে সমালোচনা ও সংস্কার করবার নীতি মার্কস স্বয়ং দিয়েছেন।

বিশ্বের এমন অনেক বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী, মনস্তাত্ত্বিক ও চিন্তাবিদ রয়েছেন, যাঁরা মার্কসীয় দর্শনকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করেও এর গোঁড়ামি ও ত্রুটিগুলোর আধুনিক সমালোচনা করেছেন এবং তত্ত্বটিকে যুগোপযোগী বা "আপডেট" করার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের মধ্যে প্রধান কয়েকজন চিন্তাবিদের নাম ও তাঁদের প্রামাণিক যুক্তি নিচে তুলে ধরা হলো:


##
১. ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল (The Frankfurt School)—

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী এই সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিক গোষ্ঠী (যেমন—থিওডোর আডর্নো, ম্যাক্স হর্কহাইমার এবং হার্বার্ট মার্কুজে মার্কসের তত্ত্বের একটি বড় রূপান্তর ঘটান।

*
তাঁদের সমালোচনা ও আপডেট:

তাঁরা দেখান যে মার্কস কেবল "অর্থনৈতিক শোষণ" নিয়ে ভেবেছিলেন, কিন্তু আধুনিক পুঁজিবাদ মানুষের মন, সংস্কৃতি, বিনোদন এবং গণমাধ্যমকে (Culture Industry) ব্যবহার করে মানুষকে মানসিকভাবে দাস বানিয়ে ফেলছে। তাঁরা মার্কসের অর্থনৈতিক তত্ত্বের সাথে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনস্তত্ত্বকে যুক্ত করেন, যা মার্কসীয় দর্শনকে মানুষের অবচেতন মন বুঝতে সাহায্য করে।


##
২. এরিখ ফ্রম (Erich Fromm) বিশিষ্ট সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক—

জার্মান-আমেরিকান এই চিন্তাবিদ মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞানের সাথে মানব মনস্তত্ত্বের মেলবন্ধন ঘটানোর জন্য বিখ্যাত।

*
তাঁর সমালোচনা ও আপডেট:

ফ্রম তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'Escape from Freedom'-এ দেখান যে, মানুষের কেবল অর্থনৈতিক মুক্তি হলেই চলে না, তার মনস্তাত্ত্বিক স্বাধীনতারও প্রয়োজন রয়েছে। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের কঠোর সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেন, সেখানে মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে হত্যা করা হয়েছে, যা মার্কসের আদি দর্শনের (হিউম্যানিজম) পরিপন্থী ছিল।


##
৩. আন্তোনিও গ্রামশি (Antonio Gramsci) ইতালীয় মার্কসীয় চিন্তাবিদ—

গ্রামশিকে আধুনিক মার্কসবাদের অন্যতম প্রধান সংস্কারক মনে করা হয়।

*
তাঁর সমালোচনা ও আপডেট:

মার্কস ভেবেছিলেন পুঁজিবাদ কেবল পুলিশ, মিলিটারি বা রাষ্ট্রশক্তির জোরে টিকে থাকে। গ্রামশি তাঁর 'সাংস্কৃতিক আধিপত্য' (Cultural Hegemony) তত্ত্বের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, পুঁজিবাদ আসলে টিকে থাকে মানুষের মগজধোলাইয়ের মাধ্যমে। স্কুল, কলেজ, মিডিয়া ও সংস্কৃতির মাধ্যমে শাসক শ্রেণী সাধারণ মানুষের মনে এই বিশ্বাস ঢুকিয়ে দেয় যে, পুঁজিবাদই একমাত্র স্বাভাবিক ব্যবস্থা। গ্রামশি মার্কসবাদকে স্রেফ অর্থনীতি থেকে বের করে সংস্কৃতির আঙিনায় আপডেট করেন।


##
৪. আর্নেস্তো লাকলাউ এবং শঁতাল মুফ (Ernesto Laclau & Chantal Mouffe) - পোস্ট-মার্কসবাদী—

১৯৮৫ সালে প্রকাশিত তাঁদের যুগান্তকারী গ্রন্থ 'Hegemony and Socialist Strategy'-এর মাধ্যমে তাঁরা 'পোস্ট-মার্কসবাদ' (Post-Marxism) ধারণার জন্ম দেন।

*
তাঁদের সমালোচনা ও আপডেট:

তাঁরা পরিষ্কার বলেন যে, বর্তমান ২১ শতকের সমাজকে কেবল "শ্রমিক বনাম মালিক" এই দুই ভাগে ভাগ করে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। বর্তমান যুগের সংগ্রাম বহুমাত্রিক। আজ কেবল অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলন নয়, বরং নারী অধিকার (Feminism), পরিবেশ আন্দোলন (Green Politics), বর্ণবাদ বিরোধী লড়াই এবং সমকামীদের অধিকারের মতো বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা মার্কসের "শ্রেণী-কেন্দ্রিক" ভাবনাকে আপডেট করে এক বহুমাত্রিক 'র‌্যাডিক্যাল ডেমোক্রেসি' (Radical Democracy)-র প্রস্তাব করেন।


##
৫. থমাস পিকেটি (Thomas Piketty) আধুনিক অর্থনীতিবিদ—

ফরাসি এই অর্থনীতিবিদ তাঁর বিখ্যাত 'Capital in the Twenty-First Century' বইয়ের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তাঁকে অনেকেই ২১ শতকের আধুনিক মার্কস হিসেবে দেখেন, যদিও তিনি মার্কসের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ধারণাকে সমর্থন করেন না।

*
তাঁর সমালোচনা ও আপডেট:

পিকেটি বিপুল পরিমাণ ঐতিহাসিক ডেটা ও তথ্য-প্রমাণ দিয়ে দেখিয়েছেন যে, কার্ল মার্কসের এই পূর্বাভাসটি সঠিক ছিল যে—পুঁজিবাদ সহজাতভাবেই তীব্র বৈষম্য তৈরি করে। তবে মার্কসের সমাধান (সশস্ত্র বিপ্লব ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির সম্পূর্ণ বিলুপ্তি) আধুনিক বিশ্বে কার্যকর নয়। পিকেটির মতে, পুঁজিবাদকে টিকিয়ে রেখেই বৈশ্বিক ধনীদের ওপর উচ্চহারে প্রগতিশীল কর (Progressive Wealth Tax) আরোপের মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান সম্ভব।


##
৬. এডুয়ার্ড বার্নস্টাইন (Eduard Bernstein)

অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংশোধনবাদ (Revisionism)

১৯ শতকের শেষের দিকে এডুয়ার্ড বার্নস্টাইন লক্ষ্য করেন যে, কার্ল মার্কসের করা অনেক ভবিষ্যদ্বাণী মেলেনি (যেমন—পুঁজিবাদের দ্রুত পতন এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটেনি, বরং মধ্যবিত্ত আরও শক্তিশালী হয়েছিল)।

*
মূল ত্রুটি চিহ্নিতকরণ—

মার্কসের অর্থনৈতিক নিয়তিবাদ (Economic Determinism) এবং রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের অনিবার্যতা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

*
আপডেট/প্রমাণ—

তিনি প্রমাণ করেন যে, পুঁজিবাদ নিজে থেকেই সংস্কার হচ্ছে এবং শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান বাড়ছে। তাই সহিংস বিপ্লবের বদলে আইনি ও গণতান্ত্রিক পন্থায় সমাজতন্ত্র আনা সম্ভব।


##
৭. ইমানুয়েল ওয়ালারস্টাইন (Immanuel Wallerstein)—

বিশ্ব-ব্যবস্থা তত্ত্ব (World-Systems Theory)—

মার্কস মূলত একটি নির্দিষ্ট দেশের ভেতরের শ্রেণী সংগ্রাম নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু পুঁজিবাদ যখন বৈশ্বিক রূপ নিল, তখন মার্কসবাদের আন্তর্জাতিক রূপ পরিবর্তনের প্রয়োজন তৈরি হলো।

* মূল ত্রুটি চিহ্নিতকরণ—

মার্কসবাদ বৈশ্বিক পুঁজিবাদের সামগ্রিক রূপ এবং কীভাবে উন্নত দেশগুলো অনুন্নত দেশকে শোষণ করে তা পুরোপুরি ধারণ করতে পারেনি।

*
আপডেট/প্রমাণ—

তিনি বিশ্বকে তিন ভাগে ভাগ করেন
—কোর (উন্নত দেশ), পেরিফেরি (দরিদ্র দেশ), এবং সেমি-পেরিফেরি। শোষণের মেকানিজম এখন আর একক কারখানার মালিক বনাম শ্রমিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন ধনী রাষ্ট্র বনাম গরীব রাষ্ট্রের সম্পর্কে রূপ নিয়েছে।


এই প্রখ্যাত চিন্তাবিদেরা প্রমাণ করেছেন যে, মার্কসকে অন্ধভাবে পূজা না করে তাঁর দর্শনের ভেতরের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিটিকে (সন্দেহ ও বিশ্লেষণ) গ্রহণ করতে হবে। এর মাধ্যমেই কেবল ১৯ শতকের একটি তত্ত্বকে ২১ শতকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বিশ্বায়নের যুগে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব।


##
৮. দার্শনিক স্লাভয় জিজেক (Slavoj Žižek) আধুনিক প্রযুক্তির নিরিখে কোন বিষয়টির ত্রুটি ধরেছেন এবং কী আপডেট করেছেন?

সমসাময়িক স্লোভেনীয় দার্শনিক স্লাভয় জিজেক (Slavoj Žižek) মার্কসীয় তত্ত্বকে অবমূল্যায়ন না করে, সেটিকে বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর জটিলতার আলোকেই মূলত ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে, ১৯ শতকের কারখানাকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক মডেল দিয়ে আজকের ডিজিটাল ও প্রযুক্তি-নির্ভর সমাজকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।


মার্কসের সনাতন ধারণার কোন কোন ত্রুটি তিনি ধরেছেন এবং সেগুলোকে কীভাবে আপডেট করেছেন, তা নিচে প্রধান কয়েকটি পয়েন্টে আলোচনা করা হলো:

##
ক. অর্থনৈতিক কাঠামোর ত্রুটি এবং 'ডিজিটাল সামন্তবাদ' (Digital Feudalism)
—

*
মার্কসের ত্রুটি:

মার্কস মনে করেছিলেন, উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি হলো কারখানার যন্ত্রপাতি এবং কাঁচামাল। যিনি এর মালিক, তিনিই বুর্জোয়া।

*
জিজেকের আপডেট:

জিজেক দেখিয়েছেন, আধুনিক যুগে ধনকুবেররা (যেমন ইলন মাস্ক বা বিল গেটস) সরাসরি কোনো পণ্য উৎপাদন করে ধনী হননি। তারা মূলত আমাদের যোগাযোগের মাধ্যম ও তথ্যের প্ল্যাটফর্মগুলো (যেমন এক্স, ফেসবুক বা উইন্ডোজ) নিয়ন্ত্রণ করেন। তারা উৎপাদনকারী নন, বরং 'ডিজিটাল রেন্ট-সিকার' বা ইজারাদার। একে তিনি 'ডিজিটাল সামন্তবাদ' হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে আমরা নিখরচায় ডেটা বা তথ্য দিয়ে আধুনিক দাস হিসেবে খাচ্ছি।

##
খ. মতাদর্শের সনাতন সংজ্ঞার পরিবর্তন (Ideology)
—

*
মার্কসের ত্রুটি:

মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে মতাদর্শ (Ideology) ছিল 'মিথ্যা চেতনা' (False Consciousness)। অর্থাৎ, "তারা জানে না তারা কী করছে, তবুও তারা তা করছে।" শ্রমিকরা বুঝত না যে তারা শোষিত হচ্ছে।

*
জিজেকের আপডেট:

জিজেক বলেন, আধুনিক মানুষ অত্যন্ত সচেতন ও চালাক। তারা খুব ভালো করেই জানে যে পুঁজিবাদ তাদের ক্ষতি করছে, প্রকৃতি ধ্বংস করছে এবং এআই তাদের চাকরি খাচ্ছে। তবুও তারা তা মেনে নিয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভেতরেই কাজ করে চলেছে। জিজেকের ভাষায় আধুনিক মতাদর্শ হলো
—"তারা খুব ভালো করেই জানে তারা কী করছে, তবুও তারা তা করে চলেছে।" একে তিনি 'সিনিক্যাল আইডিওলজি' বা উদাসীন মতাদর্শ বলেন।


##
গ. শ্রেণি সংগ্রামের নতুন রূপ ও 'উদ্বাস্তু' শ্রেণি
—

*
মার্কসের ত্রুটি:

মার্কসের তত্ত্বে সমাজ পরিবর্তনের একমাত্র চাবিকাঠি ছিল কারখানার সুসংগঠিত সর্বহারা বা প্রলেতারিয়েত (Proletariat) শ্রেণি।

*
জিজেকের আপডেট:

জিজেক মনে করেন, আজকের যুগে কারখানার শ্রমিকদের চেয়েও অনেক বেশি শোষিত এবং বিপজ্জনক শ্রেণি হলো তারা, যারা মূল সমাজ ব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি ছিটকে গেছে। যেমন—বাস্তুচ্যুত শরণার্থী, বস্তিবাসী, এআই-এর কারণে বেকার হওয়া মানুষ এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের শিকার হওয়া জনগোষ্ঠী। তিনি এদেরকে 'The Included and The Excluded' (অন্তর্ভুক্ত বনাম বহিষ্কৃত) দ্বন্দ্বে ভাগ করেছেন। বর্তমান যুগে এই 'বহিষ্কৃত' বা মার্জিনালাইজড মানুষরাই বিপ্লবী শক্তির মূল উৎস।

##
ঘ. মনস্তত্ত্বের অভাব (Lack of Psychoanalysis)
—

*
মার্কসের ত্রুটি:

মার্কস মানুষের মনস্তত্ত্বের চেয়ে বস্তুগত ও অর্থনৈতিক অবস্থাকেই সবকিছুর মূল চালিকাশক্তি মনে করেছিলেন। মানুষের অবচেতন মন বা অবদমিত ইচ্ছা কীভাবে তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, তা মার্কস এড়িয়ে গিয়েছিলেন।

*
জিজেকের আপডেট:

জিজেক মার্কসবাদের সাথে জ্যাক লাকাঁ (Jacques Lacan)-এর মনস্তত্ত্বকে (Psychoanalysis) যুক্ত করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, পুঁজিবাদ কেবল আমাদের পকেট মারে না, এটি আমাদের অবচেতন মনের 'কামনা' বা 'চাহিদা' (Desire)-কে নিয়ন্ত্রণ করে। বিজ্ঞাপন ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে পুঁজিবাদ আমাদের মনে কৃত্রিম আনন্দ ও চাহিদার জন্ম দেয়, যা মানুষকে আমৃত্যু উপভোক্তা (Consumer) বানিয়ে রাখে।

##
ঙ. প্রযুক্তি ও এআই (AI)-এর স্বায়ত্তশাসন
—

*
মার্কসের ত্রুটি: 

মার্কসের কাছে প্রযুক্তি ছিল কেবলই উৎপাদনের একটি হাতিয়ার, যা মানুষের অধীনে থাকবে।

*
জিজেকের আপডেট:

জিজেক সতর্ক করেছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং বায়ো-জেনেটিক্স মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এআই কেবল মানুষের শ্রম প্রতিস্থাপন করছে না, এটি মানুষের চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতাকেও নিজের দখলে নিয়ে নিচ্ছে। ফলে পুঁজিবাদের এই স্তরে পৌঁছে মানুষের অস্তিত্বই চরম সংকটের মুখে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, জিজেক মার্কসের 'অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদ' (Economic Determinism)-এর ত্রুটি দূর করে তাতে সংস্কৃতি, আধুনিক প্রযুক্তি এবং মানব মনস্তত্ত্বের উপাদান যুক্ত করে মার্কসবাদকে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী করে আপডেট করেছেন।


দ্বিতীয় পর্ব—

মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ত্রুটি কোন তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা করেছেন এবং কী সংশোধন করেছেন?

সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাসে মধ্যবিত্ত শ্রেণির (Middle Class) ভূমিকা, ত্রুটি এবং এর তাত্ত্বিক সংশোধন নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। কার্ল মার্কস মনে করেছিলেন যে পুঁজিবাদের বিকাশের সাথে সাথে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং সমাজ মূলত দুটি চরম শ্রেণিতে (মালিক ও শ্রমিক) বিভক্ত হবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি, বরং মধ্যবিত্ত শ্রেণি আরও শক্তিশালী ও জটিল আকার ধারণ করেছে।

মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাঠামোগত ও মনস্তাত্ত্বিক ত্রুটিগুলো যারা ধরেছেন এবং মার্কসীয় তত্ত্বের সংশোধন করেছেন, তাদের মধ্যে প্রধান কয়েকজন চিন্তাবিদের অবদান নিচে তুলে ধরা হলো:

##
১. মাক্স ভেবার (Max Weber): বহুমাত্রিক ত্রুটি সংশোধন
—

*
মার্কসের ত্রুটি:

মার্কস মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে কেবল একটি অস্থায়ী বা গুরুত্বহীন গোষ্ঠী (Petty Bourgeoisie) হিসেবে দেখেছিলেন।

*
ভেবারের সংশোধন:

ভেবার দেখান যে অর্থনৈতিক পরিবর্তন কেবল উৎপাদন যন্ত্রের মালিকানার ওপর নির্ভর করে না। তিনি মধ্যবিত্তের ধারণাকে 'বাজার পরিস্থিতি' (Market Situation) এবং 'জীবনযাত্রার সুযোগ' (Life Chances)-এর ভিত্তিতে সংশোধন করেন। তিনি বলেন, আধুনিক আমলাতন্ত্র (Bureaucracy) ও প্রযুক্তির প্রসারের কারণে ম্যানেজার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী ও বিশাল 'শ্বেতবস্ত্রধারী' বা হোয়াইট-কলার (White-collar) মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি হবে, যা সমাজকে স্থিতিশীলতা দেবে।

##
২. এরিক অলিন রাইট (Erik Olin Wright): 'পরস্পরবিরোধী শ্রেণি অবস্থান'
—

*
মধ্যবিত্তের ত্রুটি:

মধ্যবিত্তরা না পুরোপুরি শোষক (বুর্জোয়া), না পুরোপুরি শোষিত (প্রলেতারিয়েত)। তারা একদিকে শ্রমিকের মতো বেতন পায়, আবার অন্যদিকে কোম্পানির ম্যানেজার হিসেবে নিচের স্তরের শ্রমিকদের শাসন বা শোষণ করে।

*
রাইটের সংশোধন:

আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী এরিক অলিন রাইট মার্কসীয় তত্ত্বের এই বড় শূন্যতা পূরণ করেন। তিনি মধ্যবিত্তের এই ত্রুটিপূর্ণ অবস্থানকে 'Contradictory Class Locations' (পরস্পরবিরোধী শ্রেণি অবস্থান) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। তাঁর মতে, মধ্যবিত্তরা অর্থনৈতিকভাবে এক জায়গায় এবং রাজনৈতিক ও মতাদর্শগতভাবে অন্য জায়গায় অবস্থান করে, যা পুঁজিবাদের আয়ু বাড়িয়ে দেয়।

##
৩. সি. রাইট মিলস (C. Wright Mills): 'হোয়াইট কলার' ও মেকি চেতনা
—

*
মধ্যবিত্তের ত্রুটি:

আধুনিক মধ্যবিত্তরা এক ধরণের উদাসীনতা ও আত্মতুষ্টিতে ভোগে। তারা নিজেদের স্বাধীন মনে করলেও আসলে তারা বড় বড় কর্পোরেশনের অদৃশ্য দাস।

*
মিলসের সংশোধন:

তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ White Collar: The American Middle Classes এ তিনি দেখান যে বিশ শতকের মধ্যবিত্তরা রাজনৈতিকভাবে মেরুদণ্ডহীন ও নিষ্ক্রিয়। তারা শ্রমিকদের সাথেও যোগ দেয় না, আবার ধনকুবেরদের ক্লাবেও ঢুকতে পারে না। মিলস বলেন, এই নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি কোনো বিপ্লবী চেতনা তৈরি করতে পারে না, বরং তারা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ম্যানেজার বা রক্ষক হিসেবে কাজ করে।

##
৪. আন্তোনিও গ্রামসি (Antonio Gramsci): বুদ্ধিজীবী ও মতাদর্শের ত্রুটি

*
মধ্যবিত্তের ত্রুটি:

মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি বড় অংশ হলো শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক ও আমলা। তারা ভাবেন তারা নিরপেক্ষ, কিন্তু অজান্তেই তারা শাসকদলের সংস্কৃতি ও চিন্তাভাবনা সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়।

*
গ্রামসির সংশোধন:

গ্রামসি এদের 'অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল' (Organic Intellectuals) বা জৈব বুদ্ধিজীবী হিসেবে সংশোধন করেন। তিনি দেখান যে এই মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীরাই পুঁজিবাদের জন্য সমাজে 'সাংস্কৃতিক আধিপত্য' (Hegemony) তৈরি করে। অর্থাৎ, মধ্যবিত্তের বড় ত্রুটি হলো তারা বুর্জোয়াদের শোষণ নীতিকে সাধারণ মানুষের কাছে 'স্বাভাবিক' ও 'উচিত' বলে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

##
৫. পিয়ের বুর্দিউ (Pierre Bourdieu) 'সাংস্কৃতিক পুঁজি'র ব্যবধান
—

*
মার্কসের ত্রুটি:

মার্কস শ্রেণিকে কেবল ব্যাংক ব্যালেন্স বা টাকা-পয়সা (অর্থনৈতিক পুঁজি) দিয়ে মেপেছিলেন।

*
বুর্দিউ-এর সংশোধন:

ফরাসি এই সমাজবিজ্ঞানী দেখান যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে কেবল টাকা দিয়ে নয়, বরং 'সাংস্কৃতিক পুঁজি' (Cultural Capital) দিয়ে। উচ্চ-মধ্যবিত্তরা তাদের ভাষা, রুচি, শিক্ষা, এবং মার্জিত আচরণের মাধ্যমে সমাজে এক ধরণের কৃত্রিম আভিজাত্য বা ব্যবধান তৈরি করে, যা নিম্নবিত্তদের থেকে তাদের আলাদা রাখে এবং বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখে।

সংক্ষেপে, আধুনিক তাত্ত্বিকরা এটি স্পষ্ট করেছেন যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি কোনো বিলুপ্তপ্রায় গোষ্ঠী নয়। বরং এটি এমন এক জটিল রূপান্তরকারী শক্তি, যা তার শিক্ষা, রুচি ও পেশাগত অবস্থানের মাধ্যমে পুঁজিবাদকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য একটি বাফার বা ঢাল হিসেবে কাজ করে চলেছে।


তৃতীয় পর্ব—

পেটি বুর্জোয়া নিয়ে মার্কসের সিদ্ধান্ত কী ছিল? আধুনিক তাত্ত্বিকদের সংশোধন কী?

কার্ল মার্কস পেটি বুর্জোয়া (Petty Bourgeoisie) বা ক্ষুদ্র বুর্জোয়াদের একটি মধ্যবর্তী এবং সাময়িক শ্রেণি হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই শ্রেণির চরিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে, যা আধুনিক তাত্ত্বিকরা সংশোধন ও পরিমার্জন করেছেন।

নিচে মার্কসের মূল সিদ্ধান্ত এবং আধুনিক তাত্ত্বিকদের সংশোধনের একটি তুলনামূলক রূপরেখা দেওয়া হলো:


##
পেটি বুর্জোয়া নিয়ে কার্ল মার্কসের সিদ্ধান্ত
—

মার্কসের তত্ত্বে পেটি বুর্জোয়া বলতে মূলত ছোট ব্যবসায়ী, কারিগর, দোকানদার এবং স্বাধীন কৃষকদের বোঝানো হতো, যারা নিজেরা শ্রম দিতেন আবার ছোট পুঁজির মালিকও ছিলেন। তাঁদের নিয়ে মার্কসের মূল সিদ্ধান্তগুলো ছিল:

*
দ্বৈত সত্ত্বা ও দোদুল্যমানতা:

মার্কস মনে করতেন পেটি বুর্জোয়ারা এক জটিল মনস্তত্ত্বে ভোগে। একদিকে তারা বড় পুঁজির মালিক হতে চায় (বুর্জোয়া মানসিকতা), অন্যদিকে তারা বড় পুঁজির চাপে পিষ্ট হওয়ার ভয় পায় (প্রলেতারিয়েত ভয়)। ফলে রাজনৈতিক সংকটে তারা কোনো স্থায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারে না এবং চরম দোদুল্যমান থাকে।

*
শ্রেণি বিলুপ্তি (Polarization Thesis):

মার্কসের সবচেয়ে বড় অনুমান ছিল যে, পুঁজিবাদের চূড়ান্ত বিকাশের সাথে সাথে এই পেটি বুর্জোয়া শ্রেণিটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বড় বড় একচেটিয়া পুঁজিপতিদের (Monopoly Capital) প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে এরা দেউলিয়া হবে এবং সর্বহারা বা প্রলেতারিয়েত শ্রেণিতে পতিত হবে। সমাজ মূলত দুটি প্রধান মেরুতে বিভক্ত হবে।

*
প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র:

মার্কস ও এঙ্গেলস কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো-তে উল্লেখ করেছেন, পেটি বুর্জোয়ারা যখন বৈপ্লবিক পরিবর্তনকে বাধা দিতে চায়, তখন তারা প্রগতিশীল নয়, বরং 'প্রতিক্রিয়াশীল' (Reactionary)। কারণ তারা ইতিহাসের চাকা পেছনে ঘুরিয়ে তাদের পুরনো ছোট মালিকানার দিনগুলোতে ফিরে যেতে চায়।


##
আধুনিক তাত্ত্বিকদের সংশোধন
—

বাস্তব ইতিহাস মার্কসের অবধারিত বিলুপ্তির তত্ত্বকে সমর্থন করেনি। পেটি বুর্জোয়া বা ক্ষুদ্র পুঁজির মালিকরা হারিয়ে যায়নি, বরং আধুনিক পুঁজিবাদ ও প্রযুক্তির যুগে তারা নতুন রূপ ধারণ করেছে। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা এই ত্রুটিগুলো যেভাবে সংশোধন করেছেন:

##
১. 'নতুন পেটি বুর্জোয়া' (New Petty Bourgeoisie) ও নিকোস পুলাৎজাস
—

*
সংশোধন:

গ্রীক সমাজবিজ্ঞানী নিকোস পুলাৎজাস (Nicos Poulantzas) দেখান যে, সনাতন পেটি বুর্জোয়ারা (ছোট দোকানদার) কমলেও একটি বিশাল 'নতুন পেটি বুর্জোয়া' শ্রেণির জন্ম হয়েছে। এরা প্রথাগত ক্ষুদ্র পুঁজিপতি নয়, বরং আধুনিক কর্পোরেট জগতের উচ্চশিক্ষিত টেকনোক্র্যাট, ম্যানেজার, ইঞ্জিনিয়ার এবং অ্যাকাউন্ট্যান্ট। অর্থনৈতিকভাবে এরা বেতনভোগী শ্রমিক হলেও, মতাদর্শ ও সংস্কৃতির দিক থেকে এরা বুর্জোয়াদের অনুসারী।


##
২. গিগ ইকোনমি এবং 'ছদ্ম-উদ্যোক্তা' (Pseudo-Entrepreneurs)
—

*
সংশোধন:

সমসাময়িক চিন্তাবিদরা (যেমন গাই স্ট্যান্ডিং বা স্লাভয় জিজেক) দেখিয়েছেন যে এআই এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের যুগে পেটি বুর্জোয়া ধারণার এক অদ্ভুত রূপান্তর ঘটেছে। যেমন—উবার (Uber) চালক, ফ্রিল্যান্সার বা ফুড ডেলিভারি কর্মীরা টেকনিক্যালি নিজেদের "স্বাধীন ঠিকাদার" বা ছোট ব্যবসায়ী (পেটি বুর্জোয়া) মনে করে। কিন্তু বাস্তবে তারা কোনো পুঁজির মালিক নয়, বরং অলিখিতভাবে কর্পোরেশনের সবচেয়ে বেশি শোষিত শ্রমিক। আধুনিক পুঁজিবাদ এদেরকে "উদ্যোক্তা"র মেকি তকমা দিয়ে পেটি বুর্জোয়া মানসিকতায় আটকে রেখেছে যাতে তারা আন্দোলন না করতে পারে।


##
৩. এরিক অলিন রাইটের 'দক্ষতা ও কর্তৃত্বের' পরিমাপ
—

*
সংশোধন:

এরিক অলিন রাইট মার্কসের তত্ত্ব সংশোধন করে বলেন, আধুনিক সমাজে শ্রেণি শুধু 'উৎপাদন যন্ত্রের মালিকানা' দিয়ে মাপা ভুল। তিনি এর সাথে দুটি নতুন উপাদান যোগ করেন
—কর্তৃত্ব (Authority) এবং দক্ষতা (Skill/Credentials)। ছোট আইটি ফার্মের মালিক বা ফ্রিল্যান্স কনসালট্যান্টরা প্রথাগত সর্বহারা নয়। তাদের বিশেষ দক্ষতা ও বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ তাদের একচেটিয়া সুবিধা দেয়, যা তাদের পেটি বুর্জোয়া অবস্থানকে দীর্ঘস্থায়ী করে।


##
৪. ফ্যাসিবাদের সামাজিক ভিত্তি এবং উইলহেম রাইখ
—

*
সংশোধন:

মার্কস মনে করেছিলেন সংকটকালে পেটি বুর্জোয়ারা সর্বহারাদের সাথে যোগ দেবে। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক তাত্ত্বিক উইলহেম রাইখ (Wilhelm Reich) এবং ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের চিন্তাবিদরা দেখিয়েছেন যে অর্থনৈতিক সংকটের সময় পেটি বুর্জোয়ারা তাদের সামাজিক মর্যাদা হারানোর ভয়ে সর্বহারাদের দিকে না গিয়ে উগ্র ডানপন্থী বা ফ্যাসিবাদী শক্তির প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে। হিটলার বা মুসোলিনির উত্থানের পেছনে এই শ্রেণির অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভ সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

সংক্ষেপে:

মার্কস পেটি বুর্জোয়াকে পুঁজিবাদের একটি অন্তর্বর্তীকালীন ও ক্ষয়িষ্ণু অবশেষ মনে করেছিলেন। কিন্তু আধুনিক তাত্ত্বিকরা সংশোধন করে দেখিয়েছেন যে, পুঁজিবাদ টিকে থাকার স্বার্থেই এই শ্রেণিকে মরতে দেয়নি; বরং তথ্যপ্রযুক্তি, কর্পোরেট কালচার এবং স্টার্ট-আপ সংস্কৃতির মাধ্যমে একে একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ও জটিল স্তরে রূপান্তর করেছে।


চতুর্থ পর্ব—

##
তথ্য উৎস—

##
১. স্লাভয় জিজেক (Slavoj Žižek)—
* The Sublime Object of Ideology (
১৯৮৯) – এখানে তিনি মতাদর্শের নতুন সংজ্ঞা (Cynical Ideology) আলোচনা করেছেন।
* Like a Thief in Broad Daylight: Power in the Era of Post-Humanity (
২০১৮) – ডিজিটাল সামন্তবাদ এবং এআই-এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা।
*
স্লাভয় জিজেকের ওপর বিস্তারিত দার্শনিক রূপরেখা পাবেন Stanford Encyclopedia of Philosophy - Slavoj Žižek লিংকে।
##
২. এরিক অলিন রাইট (Erik Olin Wright)—
* Class, Crisis and the State (
১৯৭৮) – এখানে তিনি 'Contradictory Class Locations' (পরস্পরবিরোধী শ্রেণি অবস্থান) তত্ত্বটি প্রকাশ করেন।
* Classes (
১৯৮৫) – মধ্যবিত্ত শ্রেণির দক্ষতা ও কর্তৃত্বের বিশদ পরিমাপ।
*
তাঁর সমগ্র গবেষণামূলক কাজ এবং বইয়ের ডিজিটাল আর্কাইভ রয়েছে উইসকনসিন-ম্যাডিসন ইউনিভার্সিটির অফিশিয়াল পোর্টালে: Erik Olin Wright Departmental Page।
##
৩. মাক্স ভেবার (Max Weber)—
* Economy and Society (
১ম খণ্ড, মরণোত্তর প্রকাশ ১৯২২) – এখানে তিনি মার্কসের অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদের বাইরে গিয়ে 'Class, Status, Party' এবং আমলাতন্ত্রের তত্ত্ব দেন।
*
তাঁর সামাজিক স্তরবিন্যাস ও মধ্যবিত্ত তত্ত্বের সারসংক্ষেপ পড়তে পারেন Encyclopaedia Britannica - Max Weber লিংকে।
##
৪. সি. রাইট মিলস (C. Wright Mills)—
* White Collar: The American Middle Classes (
১৯৫১) – আধুনিক ২০ শতকের শ্বেতবস্ত্রধারী মধ্যবিত্ত শ্রেণির রাজনৈতিক মেরুদণ্ডহীনতা এবং মেকি চেতনার মূল আকর গ্রন্থ।
*
তাঁর কাজের ওপর টেক্সট আর্কাইভ ও পরিচিতি রয়েছে C. Wright Mills Official Homepage-এ।
##
৫. নিকোস পুলাৎজাস (Nicos Poulantzas)—
* Classes in Contemporary Capitalism (
১৯৭৫) – এখানে তিনি 'New Petty Bourgeoisie' (নতুন পেটি বুর্জোয়া) ধারণার মাধ্যমে মার্কসীয় তত্ত্বের আধুনিক সংশোধন করেন।
*
তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক তত্ত্বের ওপর গবেষণামূলক প্রবন্ধ পাবেন Marxists Internet Archive - Nicos Poulantzas লিংকে।
##
৬. পিয়ের বুর্দিউ (Pierre Bourdieu)—
* Distinction: A Social Critique of the Judgement of Taste (
১৯৭৯) – মধ্যবিত্ত শ্রেণির 'সাংস্কৃতিক পুঁজি' (Cultural Capital) এবং রুচির মাধ্যমে বৈষম্য টিকিয়ে রাখার তত্ত্ব।
*
তাঁর সমাজতাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্ক বুঝতে দেখতে পারেন Routledge Encyclopedia of Modernism - Pierre Bourdieu বা Harvard University - Cultural Capital Research।
##
৭. কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস (Karl Marx & Friedrich Engels)
—
* The Communist Manifesto (
১৮৪৮) – পেটি বুর্জোয়ার ক্ষয়িষ্ণু চরিত্র এবং শ্রেণি মেরুকরণের মূল অনুমান।
* Das Kapital (
১৮৬৭) – উদ্বৃত্ত জনসংখ্যা (Reserve Army of Labor) এবং শ্রমের শোষণ প্রক্রিয়া।
*
মার্কস ও এঙ্গেলসের সমস্ত মূল লেখার সম্পূর্ণ ডিজিটাল লাইব্রেরি: Marxists Internet Archive (MIA)।
##
৮. ইমানুয়েল ওয়ালারস্টাইন (Immanuel Wallerstein)—The Modern World-System" (1974)।
##
৯. এডুয়ার্ড বার্নস্টাইন (Eduard Bernstein)—"Evolutionary Socialism" (1899)।

***

মতামত জানাবেন।

***

লাইক কমেন্ট শেয়ার ফলো করতে ভুলবেন না।

***


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

একটি বিকল্প অর্থনীতি কেন জরুরী?