ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ও দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের অসম্পূর্ণতা ও সংশোধন



 কার্ল মার্কসের দর্শনের একেবারে মূল ভিত্তি হলো ঐতিহাসিক বস্তুবাদ (Historical Materialism) এবং দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ (Dialectical Materialism)। আধুনিক দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী এবং পদার্থবিজ্ঞানীরাও এই দুটি তত্ত্বের মধ্যে বেশ কিছু গুরুতর যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক ত্রুটি শনাক্ত করেছেন এবং সেগুলোকে সংশোধন করেছেন।


নিচে ঐতিহাসিক ও দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের সুনির্দিষ্ট ত্রুটি এবং আধুনিক সংশোধনগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

## ১. ঐতিহাসিক বস্তুবাদ (Historical Materialism) এর ত্রুটি ও সংশোধন—

মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ বলে—ইতিহাসের চালিকাশক্তি হলো বস্তুগত বা অর্থনৈতিক উৎপাদন পদ্ধতি। সমাজ আদিম সাম্যবাদ থেকে দাসপ্রথা, সামন্তবাদ, পুঁজিবাদ হয়ে অনিবার্যভাবে সমাজতন্ত্রে রূপ নেবে।

## শনাক্তকৃত ত্রুটি:

* টেলিলজি বা সরলরৈখিক ইতিহাস (Linear Teleology):

মার্কস ইতিহাসকে একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে ধাবমান সরলরেখা হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু বাস্তব ইতিহাস কোনো পূর্বনির্ধারিত ছক মেনে চলে না। অনেক সমাজ সামন্তবাদ ছাড়াই সরাসরি পুঁজিবাদে গেছে, আবার অনেক রাষ্ট্র সমাজতন্ত্র থেকে উল্টো পুঁজিপাদেই ফিরে এসেছে (যেমন: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন)।

* ইউরোপ-কেন্দ্রিকতা (Eurocentrism):

মার্কসের ইতিহাসের মডেলটি মূলত পশ্চিম ইউরোপের (বিশেষ করে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স) ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এশিয়া, আফ্রিকা বা আমেরিকার বৈচিত্র্যময় সমাজকাঠামো (যেমন ভারতের জাতিভেদ প্রথা বা এশিয়ার ‘এশীয় উৎপাদন পদ্ধতি’) এই তত্ত্বে খাপ খায় না।

## আধুনিক সংশোধন:

* লুই আলথুসার (Louis Althusser) ও 'ওভারডিটারমিনেশন':

ফরাসি মার্কসবাদী দার্শনিক আলথুসার মার্কসের অর্থনৈতিক নিয়তিবাদ সংশোধন করেন। তিনি বলেন, ইতিহাস কেবল অর্থনীতির একক টানে চলে না। রাজনীতি, সংস্কৃতি, মতাদর্শ এবং অর্থনীতি—সব কটি উপাদান মিলে কোনো একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি করে, যাকে তিনি "ওভারডিটারমিনেশন" (Overdetermination) বলেন। কোনো বিপ্লব কেবল অর্থনৈতিক কারণে ঘটে না, সেখানে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকট একবিন্দুতে মিলতে হয়।

* উত্তর-উপনিবেশবাদ (Post-colonialism):

ফ্রান্তজ ফানোঁ (Frantz Fanon) বা গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক-এর মতো চিন্তাবিদরা ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে সংশোধন করে দেখান যে, উপনিবেশের ইতিহাস কেবল শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস নয়, বরং তা বর্ণবাদ, জাতিগত শোষণ এবং ভৌগোলিক আধিপত্যের সাথে গভীরভাবে যুক্ত।

## ২. দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ (Dialectical Materialism) এর ত্রুটি ও সংশোধন—

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ প্রকৃতির নিয়ম ব্যাখ্যা করে। হেগেলের দ্বান্দ্বিকতা (থিসিস, অ্যান্টিথিসিস ও সিন্থেসিস) থেকে ঈশ্বর বা আত্মাকে বাদ দিয়ে মার্কস ও এঙ্গেলস সেখানে 'বস্তু' বসিয়েছিলেন। তাঁরা দাবি করেন, প্রকৃতির সবকিছুই বস্তুর ভেতরের দ্বন্দ্বের কারণে পরিবর্তিত হচ্ছে।

## শনাক্তকৃত ত্রুটি:

* বিজ্ঞানের অপব্যবহার ও অপবিজ্ঞান (Lysenkoism):

বিংশ শতাব্দীতে জোসেফ স্টালিনের আমলে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদকে প্রকৃতির একমাত্র বৈজ্ঞানিক নিয়ম হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নে মূলধারার জেনেটিক্স বা বংশগতিবিদ্যাকে "বুর্জোয়া বিজ্ঞান" আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করা হয় এবং ট্রফিম লিসেনকোর এক অবৈজ্ঞানিক কৃষি তত্ত্ব (Lysenkoism) চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা লাখ লাখ মানুষের দুর্ভিক্ষের কারণ হয়েছিল।

লিসেনকোবাদ (Lysenkoism) হলো সোভিয়েত বিজ্ঞানী ট্রফিম লিসেনকো কর্তৃক প্রচারিত একটি চরম বিতর্কিত এবং অবৈজ্ঞানিক কৃষি ও বংশগতিবিদ্যা তত্ত্ব, যা ১৯৩০ থেকে ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই তত্ত্বটি মেন্ডেলের জিনতত্ত্বকে পুরোপুরি অস্বীকার করে এবং এর ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নে তীব্র খাদ্য সংকট, দুর্ভিক্ষ এবং বিজ্ঞানের অপূরণীয় ক্ষতি হয়।

* কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সাথে সংঘাত:

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের সনাতন রূপটি ঊনবিংশ শতাব্দীর ক্ল্যাসিক্যাল মেকানিক্সের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে বস্তুকে চরম সত্য মনে করা হতো। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান (Quantum Physics) প্রমাণ করেছে যে, অতিপারমাণবিক স্তরে 'বস্তু' বা 'কণা' স্থায়ী কিছু নয়, তা শক্তির তরঙ্গের মতো আচরণ করে। ফলে "বস্তুই পরম সত্য"—এই সরল দাবি প্রশ্নের মুখে পড়ে।

## আধুনিক সংশোধন:

* ওয়েস্টার্ন মার্কসবাদ ও ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল:

জর্জ লুকাচ (György Lukács) এবং ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের চিন্তাবিদরা প্রকৃতির ওপর জোর দেওয়া বন্ধ করেন। তাঁরা বলেন, দ্বান্দ্বিকতা প্রকৃতির ওপর খাটানো ভুল; দ্বান্দ্বিকতা কেবল মানুষের সমাজ এবং ইতিহাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। প্রকৃতিকে মানুষের সমাজতাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের ছকে বাঁধা যাবে না।

* আল্যাঁ বাদিউ (Alain Badiou—জন্ম-১৯৩৭) ও 'ঘটনার দর্শন' (Philosophy of the Event):

সমসাময়িক ফরাসি দার্শনিক আলাঁ বাদিউ (Alain Badiou) তাঁর দর্শনে কার্ল মার্ক্সের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদকে প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে গণিত, বিশেষ করে সেট তত্ত্ব (Set Theory)-এর সাহায্যে নতুন রূপ দিয়েছেন।

তিনি মনে করেন, ইতিহাস বা প্রকৃতি কেবল ক্রমাগত দ্বন্দ্বের মাধ্যমে বিবর্তিত হয় না; বরং হঠাৎ করেই কোনো আমূল নতুন সত্যের উদ্ভব ঘটে, যাকে তিনি "দ্য ইভেন্ট" (The Event) বা ঐতিহাসিক ঘটনা বলেন (যেমন ফরাসি বিপ্লব বা কোয়ান্টাম বলবিদ্যার আবিষ্কার), যা পূর্বের সমস্ত নিয়মকে ভেঙে নতুন নিয়মের জন্ম দেয়।

তাঁর মূল কথাটি খুব সহজভাবে নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:

## ১. প্রচলিত দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ বনাম বাদিউ-এর ভাবনা—

* পুরোনো ধারণা:

প্রচলিত দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ মনে করে, ইতিহাস বা প্রকৃতি একটি নির্দিষ্ট নিয়মে চলে। সেখানে ক্রমাগত দুটি বিপরীত শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব (Thesis এবং Antithesis) হয়, এবং তার ফলে ধীরে ধীরে সমাজ বা প্রকৃতির বিবর্তন ঘটে। এটি যেন একটি চলমান ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।

* বাদিউ-এর সংশোধন:

বাদিউ বলছেন, ইতিহাস বা সমাজ কেবল এই ধারাবাহিক দ্বন্দ্ব বা নিয়মের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় না। নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে থেকে হঠাৎ করে সম্পূর্ণ নতুন, অচিন্তনীয় এবং আমূল পরিবর্তনকারী কিছুর আগমন ঘটে।

## ২. সেট তত্ত্বের (Set Theory) সংযোগ—

গণিতে 'সেট' বলতে একদল উপাদানের সমষ্টিকে বোঝায়, যা নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চলে। বাদিউ সমাজ বা রাষ্ট্রকে একটি 'সেট' বা কাঠামো হিসেবে দেখেন।

* সমাজে যা কিছু নিয়মের মধ্যে আছে, রাষ্ট্র সেগুলোকে গণনা করে এবং নিয়ন্ত্রণ করে।

* কিন্তু বাদিউ-এর মতে, প্রতিটা সেট বা সমাজ ব্যবস্থার ভেতরেই এমন কিছু উপাদান বা মানুষ থেকে যায়, যাদের কোনো স্বীকৃতি থাকে না (যেমন—কোনো সমাজের চরম সুবিধাবঞ্চিত মানুষ)। এদের তিনি বলেন "শূন্য" (Void) বা কাঠামোর বাইরের অংশ।

## ৩. "দ্য ইভেন্ট" (The Event) বা ঐতিহাসিক ঘটনা কী?

যখন এই চেনা কাঠামোর ভেতরের সমস্ত নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হঠাৎ করে সম্পূর্ণ নতুন এবং বৈপ্লবিক কিছুর উদয় হয়, বাদিউ তাকেই বলেন 'দ্য ইভেন্ট' বা ঘটনা।

* অপ্রত্যাশিত আগমন:

এটি আগে থেকে অনুমান করা যায় না। এটি পূর্বের চেনা নিয়ম বা দ্বন্দ্বের ধারাবাহিক ফল নয়, বরং এটি একটি আকস্মিক 'বিস্ফোরণ'।

* নিয়ম ভেঙে ফেলা:

ইভেন্ট ঘটার পর পূর্বের সমস্ত নিয়ম, কানুন ও চিন্তাধারা ভেঙে পড়ে। এটি সমাজ বা জ্ঞানজগৎকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যেখান থেকে আর পেছনে ফেরার পথ থাকে না।

## ৪. বাস্তব উদাহরণ—

বাদিউ এটিকে বোঝাতে মূলত দুটি ক্ষেত্রের উদাহরণ দেন:

* ঐতিহাসিক/রাজনৈতিক ইভেন্ট (যেমন- ফরাসি বিপ্লব):

১৭৮৯ সালের আগে ফ্রান্সে রাজা ও সামন্তবাদের নিয়ম ছিল। ফরাসি বিপ্লব কোনো সাধারণ সংস্কার ছিল না; এটি হঠাৎ এসে পুরো রাজতান্ত্রিক সেট বা কাঠামোটাকে চুরমার করে দেয় এবং 'সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা'র মতো সম্পূর্ণ নতুন নিয়মের জন্ম দেয়।

* বৈজ্ঞানিক ইভেন্ট (যেমন- কোয়ান্টাম বলবিদ্যা):

পদার্থবিজ্ঞানে আগে নিউটনের চিরচেনা নিয়ম কাজ করত। কিন্তু কোয়ান্টাম বলবিদ্যার (Quantum Mechanics) আবিষ্কার বিজ্ঞানজগতে একটি 'ইভেন্ট' হিসেবে আসে, যা পরমাণুর ভেতরের জগতের এমন এক সত্য উন্মোচন করে, যা নিউটনের সমস্ত চেনা নিয়মকে ওলটপালট করে দেয়।

আধুনিক চিন্তাবিদরা মার্কসের এই দুই মূল স্তম্ভ থেকে "অনিবার্যতার ভূত" এবং "অর্থনৈতিক অন্ধত্ব" দূর করেছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন যে, ইতিহাস কোনো কম্পিউটারের প্রোগ্রাম নয় যা সমাজতন্ত্রে গিয়েই থামবে, বরং মানুষের সচেতন সংগ্রাম, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং প্রকৃতির আকস্মিক পরিবর্তনের ওপরই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে।

## সংক্ষেপে মূল কথা

বাদিউ-এর মতে, সত্য কোনো ধীরগতির ধারাবাহিক বিবর্তন নয়। সত্য হলো এক আকস্মিক বিপ্লব বা ঘটনা (Event), যা জরাজীর্ণ পুরোনো নিয়মকে ভেঙে দিয়ে এক নতুন যুগের সূচনা করে। আর এই নতুন সত্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য মানুষের প্রয়োজন অবিচল আনুগত্য বা 'নিষ্ঠা' (Fidelity)।

দ্বিতীয় পর্ব—

বাদিউ-এর 'হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক ঘটনা' (The Event) তত্ত্বের আলোকে আজকের যুগের কোনো সমসাময়িক ঘটনার সাথে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?

আলাঁ বাদিউ-এর 'দ্য ইভেন্ট' (The Event) তত্ত্বটি একজন ভারতীয় হিসেবে এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে গভীরভাবে অনুধাবন করার জন্য সাম্প্রতিক ইতিহাসের কিছু যুগান্তকারী ঘটনাকে বিশ্লেষণ করা যাক।
বাদিউ-এর মতে, 'ইভেন্ট' হলো এমন এক আকস্মিক রাজনৈতিক বা সামাজিক বিস্ফোরণ, যা প্রচলিত ব্যবস্থার সমস্ত হিসাব-নিকাশ এবং ক্ষমতার ছককে এক ঝটকায় ভেঙে দেয় এবং সম্পূর্ণ নতুন এক সত্য ও চেতনার জন্ম দেয়।

## ১. ভারতীয় নিরিখে 'ইভেন্ট'—২০২০-২০২১ সালের ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন—

ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২০-২০২১ সালের কৃষক আন্দোলন (Indian Farmers' Protest)-কে বাদিউ-এর 'দ্য ইভেন্ট' তত্ত্বের একটি নিখুঁত উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়।

* কাঠামোর ভেতরের অবস্থা (The Set):

২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের তৎকালীন রাজনৈতিক কাঠামো বা রাষ্ট্রব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। সরকার যখন তিনটি নতুন কৃষি আইন পাস করল, তখন প্রচলিত রাজনৈতিক ছক অনুযায়ী ধরে নেওয়া হয়েছিল যে, তীব্র ক্ষমতার সামনে এই আইন প্রত্যাহার অসম্ভব। মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোও এর বিরুদ্ধে বড় কোনো প্রতিরোধ গড়তে পারছিল না।

* আকস্মিক বিস্ফোরণ (The Event):

পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং উত্তর প্রদেশের কৃষকেরা যখন সমস্ত প্রথাগত রাজনৈতিক দলের ছাতার বাইরে গিয়ে, সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে দিল্লির সীমানা অবরুদ্ধ করে বসলেন, তখন সেটি একটি 'ইভেন্ট'-এ রূপান্তরিত হলো। এটি কোনো ধীর গতির রাজনৈতিক বিবর্তন ছিল না; এটি ছিল এক আকস্মিক ও অভূতপূর্ব গণবিক্ষোভ। জাত-পাত, ধর্ম এবং প্রথাগত রাজনৈতিক বিভাজনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে লাখ লাখ কৃষক মাসের পর মাস তীব্র শীত-গ্রীষ্ম উপেক্ষা করে রাস্তায় কাটিয়ে দিলেন।

* নতুন সত্য ও চেনা ছক ভেঙে যাওয়া:

এই আন্দোলন ভারতের শক্তিশালী রাষ্ট্রকাঠামোকে পিছু হটতে বাধ্য করে এবং শেষ পর্যন্ত সরকার আইন তিনটি প্রত্যাহার করে নেয়। বাদিউ-এর ভাষায়, এটি এমন এক 'ইভেন্ট' যা প্রমাণ করেছে যে, সংসদের ভেতরের সংখ্যাগরিষ্ঠতাই শেষ কথা নয়, আসল ক্ষমতার উৎস অন্য কোথাও।

* বাদিউ-এর "নিষ্ঠা" (Fidelity):

কৃষকদের এই দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ এবং নিজেদের দাবিতে অবিচল থাকাটাই হলো বাদিউ-এর 'ফাইডেলিটি' বা নিষ্ঠা। এই ইভেন্টটি ভারতীয় নাগরিক সমাজের মধ্যে এক নতুন রাজনৈতিক সচেতনতার জন্ম দিয়েছে, যার প্রভাব এখনো ভারতীয় রাজনীতিতে স্পষ্ট।

## ২. আন্তর্জাতিক নিরিখে 'ইভেন্ট'—কৃষ্ণাঙ্গদের 'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার' (Black Lives Matter / BLM) আন্দোলন—

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে বড় 'ইভেন্ট' হলো ২০২০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া 'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার' আন্দোলন।

* কাঠামোর ভেতরের অবস্থা (The Set):

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ (Systemic Racism) এবং কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর পুলিশের নির্যাতন বহু দশক ধরে একটি নিয়মিত ও চেনা কাঠামোর অংশ ছিল। সমাজ ও প্রশাসন এই নিষ্ঠুরতাকে এক প্রকার মেনে নিয়েই চলছিল।

* আকস্মিক বিস্ফোরণ (The Event):

২০২০ সালের মে মাসে জর্জ ফ্লয়েডের ওপর পুলিশি নির্যাতনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে বিশ্বজুড়ে যে বিস্ফোরণ ঘটে, তা কেউ আগে থেকে অনুমান করতে পারেনি। এটি কেবল আমেরিকার গণ্ডি ছাড়িয়ে ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ সারা বিশ্বে এক শতাব্দীর সবচেয়ে বড় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।

* পুরোনো নিয়ম ভেঙে ফেলা:

বাদিউ-এর তত্ত্ব অনুযায়ী, এই ইভেন্টটি ঘটার পর বিশ্বজুড়ে সংস্কৃতির পুরোনো নিয়মগুলো ওলটপালট হয়ে যায়। শত বছরের পুরনো ঔপনিবেশিক ও দাসব্যবসায়ীদের মূর্তি সাধারণ মানুষ ভেঙে ফেলে। বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ক্রীড়া জগত (যেমন হাঁটু গেড়ে বসা বা Taking the knee) এবং বিনোদন দুনিয়া বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ নতুন অবস্থান নিতে বাধ্য হয়। এটি এমন এক নতুন আন্তর্জাতিক সত্যের জন্ম দেয়, যা বর্ণবাদকে দেখার চোখ চিরতরে বদলে দিয়েছে।

## ৩. ইন্টারনেটের আবির্ভাব ও ডিজিটাল বিপ্লব (প্রযুক্তিগত আন্তর্জাতিক ইভেন্ট)—২০২৪ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI Revolution) এবং কর্মক্ষেত্রের রূপান্তর—

প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে ChatGPT ও জেনারেটিভ এআই (Generative AI)-এর বিস্ফোরণকে বাদিউ-এর একটি অ-রাজনৈতিক কিন্তু খাঁটি 'ইভেন্ট' হিসেবে দেখা যায়, যা আন্তর্জাতিক এবং ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি (IT) খাতকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।

* কেন এটি 'ইভেন্ট':

তথ্যপ্রযুক্তি খাত এতদিন একটি নির্দিষ্ট নিয়মে (ধীরে ধীরে সফটওয়্যার আপডেট বা কোডিং-এর বিবর্তন) চলছিল। কিন্তু ২০২২-২০২৪ সালের মধ্যে জেনারেটিভ এআই-এর এই আকস্মিক আগমন কোনো সাধারণ বিবর্তন নয়। এটি মানুষের সৃজনশীলতা, কোডিং, লিখন এবং কর্মসংস্থানের চেনা সেট বা কাঠামোকে এক ধাক্কায় ভেঙে দিয়েছে।

* নতুন সত্যের জন্ম:

ইন্টারনেটের পর "সোশ্যাল মিডিয়া", "আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স" বা "গ্লোবাল ভিলেজ"-এর মতো সম্পূর্ণ নতুন নিয়মের জন্ম হয়েছে, যা ২০-৩০ বছর আগের মানুষ কল্পনাও করতে পারত না। বাদিউ-এর ভাষায়, ইন্টারনেট পুরো মানবজাতিকে এমন এক নতুন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, যেখান থেকে আর পেছনে ফেরার কোনো পথ নেই।

* প্রভাব:

ভারতের মতো দেশ, যা মূলত আন্তর্জাতিক আইটি সার্ভিস এবং আউটসোর্সিং-এর ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল, সেখানে এই ইভেন্টটি তীব্র আলোড়ন তৈরি করেছে। রাতারাতি পুরনো স্কিল বা কাজের নিয়মগুলো অকেজো হয়ে পড়ছে এবং বিশ্বব্যাপী চাকুরিজীবী ও ছাত্র সমাজকে এক সম্পূর্ণ নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

## ৪. ২০২৪ সালের বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান (রাজনৈতিক ইভেন্ট)—

একেবারে সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে বাদিউ-এর তত্ত্ব দিয়ে নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

* কাঠামোর ভেতরের অবস্থা (The Set):

২০২৪ সালের জুনের আগে বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থা একটি নির্দিষ্ট ছকে বা নিয়মে চলছিল। সেখানে একদল ক্ষমতাশীল শাসক ছিল, আর সাধারণ মানুষের ক্ষোভ থাকলেও তা কাঠামোর ভেতরেই চাপা ছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রথাগত দ্বান্দ্বিক নিয়মে ভাবছিলেন যে, ক্ষমতার পরিবর্তন হয়তো কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে বা প্রথাগত বিরোধী দলের আন্দোলনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে হবে।

* আকস্মিক বিস্ফোরণ (The Event):

কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে হঠাৎ করেই জুলাই-আগস্টে এমন এক অভূতপূর্ব গণজোয়ার তৈরি হলো, যা কোনো রাজনৈতিক দল বা রাষ্ট্রনায়ক আগে থেকে অনুমান করতে পারেননি। এটি প্রথাগত রাজনীতির সমস্ত হিসাব-নিকাশ, দমন-পীড়ন এবং চেনা ছককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পুরো শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাল।

## সংক্ষেপে সারাংশ—

বাদিউ-এর তত্ত্ব আমাদের চারপাশের এই ঘটনাগুলোকে দেখতে সাহায্য করে। ভারতের কৃষক আন্দোলন বা বৈশ্বিক ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলন—কোনোটিই প্রথাগত নিয়মের ধারাবাহিক ফল ছিল না। এগুলো ছিল আকস্মিক ধাক্কা বা 'ইভেন্ট', যা মানবজাতিকে পুরোনো চিন্তার বৃত্ত থেকে বের করে এক নতুন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

তৃতীয় পর্ব—

## ঐতিহাসিক বস্তুবাদের এই সংশোধনীগুলোর মধ্যে আলথুসারের 'ওভারডিটারমিনেশন' (একধিক উপাদানের যৌথ প্রভাব) তত্ত্ব কী?

ফরাসি মার্ক্সবাদী দার্শনিক লুই আলথুসার (Louis Althusser) তাঁর 'ওভারডিটারমিনেশন' (Overdetermination) বা "আধিক্য-নির্ধারণ" তত্ত্বের মাধ্যমে মার্ক্সবাদের সমাজ পরিবর্তনের ধারণায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন।

সহজ কথায়, ওভারডিটারমিনেশন হলো এমন একটি ধারণা যা বলে—সমাজে কোনো বড় ঘটনা বা বিপ্লব কেবল একটিমাত্র একক কারণে (যেমন শুধু অর্থনৈতিক কারণে) ঘটে না; বরং রাজনীতি, সংস্কৃতি, আদর্শ এবং অর্থনীতি—এই সমস্ত উপাদানের যৌথ ও জটিল প্রভাবেই কেবল একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন সম্ভব হয়।

নিচে বিষয়টি সংক্ষেপে এবং সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:

## ১. প্রচলিত মার্ক্সবাদের সীমাবদ্ধতা ও আলথুসারের আপত্তি—

প্রথাগত বা সরল মার্ক্সবাদে সমাজকে দুটি ভাগে ভাগ করা হতো:

* ভিত্তি (Base)—অর্থনীতি বা উৎপাদন ব্যবস্থা।

* উপরি কাঠামো (Superstructure)—রাজনীতি, আইন, ধর্ম, সংস্কৃতি, মতাদর্শ ইত্যাদি।

সরল মার্ক্সবাদীরা মনে করতেন, অর্থনীতিই হলো সমাজের একমাত্র চালিকাশক্তি (Economic Determinism)। অর্থনীতি বদলে গেলেই উপরি কাঠামো বা সমাজ রাতারাতি বদলে যাবে। আলথুসার এই সরল ধারণার তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, সমাজ এত সহজ সরল ছকে চলে না।

## ২. 'ওভারডিটারমিনেশন' আসলে কী?

আলথুসার এই শব্দটি মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের স্বপ্ন বিশ্লেষণ তত্ত্ব থেকে ধার করেছিলেন। ফ্রয়েড দেখিয়েছিলেন, মানুষের একটি স্বপ্নের পেছনে অবচেতন মনের কেবল একটি কারণ থাকে না, অনেকগুলো স্মৃতির টুকরো ও ইচ্ছা একসাথে মিলে একটি স্বপ্ন তৈরি করে।

আলথুসার এটিকে সমাজে প্রয়োগ করে বলেন:

* সমাজে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, আইনি এবং অর্থনৈতিক—প্রতিটি উপাদানের নিজস্ব শক্তি এবং আপেক্ষিক স্বাধীনতা (Relative Autonomy) আছে।

* এরা কেউ কারো দাস নয়। বরং, এই সমস্ত ভিন্ন ভিন্ন উপাদান বা দ্বন্দ্বগুলো যখন একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক মুহূর্তে এসে একসাথে জট পাকায় এবং একে অপরকে প্রভাবিত করে, তখনই কেবল সমাজে একটি বড় বিস্ফোরণ বা বিপ্লব ঘটে।

* কোনো ঘটনা যখন একাধিক উপাদানের এই যৌথ প্রভাবে নির্ধারিত হয়, আলথুসারের ভাষায় সেটাই হলো 'ওভারডিটারমিনড' (Overdetermined)।

## ৩. একটি বাস্তব উদাহরণ—১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব—

আলথুসার নিজেই তাঁর তত্ত্ব বোঝাতে ১৯১৭ সালের রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লবের উদাহরণ দিয়েছেন। কার্ল মার্ক্সের তত্ত্ব অনুযায়ী, বিপ্লব হওয়ার কথা ছিল ইংল্যান্ড বা জার্মানির মতো উন্নত শিল্পোন্নত দেশে, যেখানে শ্রমিক শ্রেণি অনেক শক্তিশালী। কিন্তু বিপ্লব হলো অনগ্রসর ও কৃষিপ্রধান রাশিয়ায়। কেন?

আলথুসারের মতে, রাশিয়ার এই বিপ্লব শুধু অর্থনৈতিক কারণে হয়নি, এটি ছিল অনেকগুলো উপাদানের ওভারডিটারমিনেশন:

* রাশিয়ার তৎকালীন জরাজীর্ণ ও শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।

* প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে রাশিয়ার চরম সামরিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়।

* জারের (রাজা) স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের তীব্র রাজনৈতিক ক্ষোভ।

* লেলিনের মতো একজন দূরদর্শী নেতার রাজনৈতিক কৌশল ও মতাদর্শের সঠিক প্রয়োগ।

এই সমস্ত ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক, সামরিক, মতাদর্শিক এবং অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব যখন ১৯১৭ সালে এসে এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছিল, তখনই কেবল রাশিয়ার বুকে বিপ্লবটি সফল হতে পেরেছিল। এর যেকোনো একটি উপাদান কম থাকলে হয়তো ইতিহাস অন্যরকম হতো।

## সংক্ষেপে মূল কথা—

আলথুসারের 'ওভারডিটারমিনেশন' তত্ত্ব আমাদের শেখায় যে, সমাজের কোনো ঘটনাকে কেবল "টাকার খেলা" বা "অর্থনৈতিক কারণ" দিয়ে ব্যাখ্যা করা ভুল। রাজনীতি, সংস্কৃতি, মানুষের চিন্তাভাবনা বা মতাদর্শ—সবকিছুরই সমাজকে বদলে দেওয়ার পেছনে সমপরিমাণ বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যা চলমান সময়ের সংসদীয় রাজনীতিতেও ব্যপকভাবে লক্ষণীয়।

## চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সংক্ষিপ্তসার—

* মার্কসের মূল দাবি—সমাজ একটি নির্দিষ্ট রেললাইনের মতো চলে। আদিম যুগ থেকে শুরু করে দাসপ্রথা, সামন্তবাদ (রাজা-জমিদার), পুঁজিবাদ (শিল্পপতি-শ্রমিক) হয়ে সমাজ শেষ পর্যন্ত "সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদে" পৌঁছাবেই। এর মূল চালিকাশক্তি হলো টাকা-পয়সা এবং উৎপাদন ব্যবস্থা (অর্থনীতি)।

* ত্রুটি ১ (ইতিহাস সরলরেখায় চলে না)—বাস্তব পৃথিবী মার্কসের এই নির্দিষ্ট ছক মানেনি। যেমন—রাশিয়া বা চীন পুরোপুরি পুঁজিবাদী শিল্পোন্নত দেশ না হয়েও সরাসরি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করেছিল। আবার ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তারা সমাজতন্ত্র থেকে উল্টো পুঁজিপাদেই ফিরে গেছে।

* ত্রুটি ২ (ইউরোপ-কেন্দ্রিকতা)—মার্কস মূলত ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের ইতিহাস দেখে এই তত্ত্ব বানিয়েছিলেন। কিন্তু ভারতের মতো দেশে কেবল অর্থনৈতিক শ্রেণী নয়, বরং হাজার বছর ধরে 'জাতিভেদ প্রথা' (Caste System) সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, যা মার্কসের তত্ত্বে উপেক্ষিত ছিল।

## পরবর্তীতে আধুনিক চিন্তাবিদরা অর্থনীতির একক আধিপত্যের এই ত্রুটি দূর দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন এনেছেন:

* লুই আলথুসার-এর 'ওভারডিটারমিনেশন' (রাজনীতি ও সংস্কৃতির গুরুত্ব)—সমাজ পরিবর্তনের জন্য কেবল অর্থনৈতিক সংকটই যথেষ্ট নয়। রান্না করতে যেমন আগুন, জল, চাল—সব লাগে, তেমনি একটি বিপ্লব বা পরিবর্তনের জন্য অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের চিন্তাভাবনা (মতাদর্শ)—সব উপাদানকে একবিন্দুতে মিলতে হবে। কোনো সমাজ কেবল পেটের দায়ে বদলায় না, সেখানে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষোভের প্রকাশও জরুরি।

* উত্তর-উপনিবেশবাদ (বর্ণবাদ ও ভৌগোলিক শোষণের গুরুত্ব)—ফ্রান্তজ ফানোঁ বা গায়ত্রী স্পিভাকের মতো চিন্তাবিদরা দেখান যে, এশিয়া, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকার মতো শোষিত অঞ্চলে কেবল "ধনী বনাম গরীবের" লড়াই ছিল না। সেখানে আসল লড়াই ছিল "সাদা চামড়ার বিদেশী শোষক বনাম স্থানীয় কালো/বাদামী চামড়ার মানুষের"। অর্থাৎ, ইতিহাস কেবল শ্রেণী সংগ্রামের নয়, বরং বর্ণবাদ, জাতিগত বৈষম্য এবং ঔপনিবেশিক আধিপত্যের ইতিহাস।

সংক্ষেপে, আধুনিক সংশোধনীর পর ঐতিহাসিক বস্তুবাদ এখন আর কেবল "অর্থনীতির" সংকীর্ণ চোখে ইতিহাসকে দেখে না; বরং এটি অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং বর্ণবাদের একটি সম্মিলিত রূপ হিসেবে সমাজকে ব্যাখ্যা করে।

## দার্শনিক বাদিউ মার্ক্সবাদকে বাতিল করেননি বরং আধুনিক যুগের উপযোগী করে এর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ করেছেন। দর্শনের ইতিহাসে কোনো নতুন তত্ত্ব পূর্ববর্তী তত্ত্বকে সবসময় "ভুল" প্রমাণ করে না; বরং তার সীমাবদ্ধতা দূর করে। তিনি বলেছেন, "এটি 'ভুল প্রমাণ' নয়, বরং 'তাত্ত্বিক উন্নয়ন' (Update)"। তিনি শুধু পরিবর্তনের গতি ও প্রকৃতি (ধীরে ধীরে দ্বন্দ্ব বনাম আকস্মিক ঐতিহাসিক ঘটনা বা Event) নিয়ে নতুন কোণ থেকে আলো ফেলেছেন।

বাদিউ-এর তত্ত্ব এটি দেখায় যে সমাজ ও প্রকৃতিতে কেবল চেনা ছকের "দ্বন্দ্ব"ই শেষ কথা নয়; মাঝে মাঝে এমন অলৌকিক সদৃশ আকস্মিক বিপ্লব বা ইভেন্ট ঘটে, যা পুরো চেনা ছকটাই বদলে দেয়।

বিবর্তনের নতুন তত্ত্ব (Punctuated Equilibrium) অনুযায়ী জীববিজ্ঞানেও এখন বিজ্ঞানীরা মনে করেন বিবর্তন সবসময় খুব ধীর গতিতে মসৃণভাবে চলে না। কোটি কোটি বছর প্রকৃতি শান্ত থাকে, তারপর হঠাৎ কোনো ভৌগোলিক বা পরিবেশগত মহাবিপর্যয়ে দ্রুত নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটে।

***

লাইক কমেন্ট শেয়ার ফলো করতে ভুলবেন না।

***

#karlmarx #FriedrichEngels #marxism #DialecticalMaterialism #HistoricalMaterialism #MarxistTheory #PoliticalPhilosophy #louisalthusser #overdetermination #structuralmarxism #baseandsuperstructure #ideologicalstateapparatus #AlainBadiou #fidelitytotheevent #radicalchange #PoliticalEvents #TrofimLysenko #lysenkoism #pseudoscience #politicizedscience #ScientificHistory #FarmersProtestIndia #blacklivesmatter #AIRevolution #ContemporaryPhilosophy #SocialMovements

***

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

একটি বিকল্প অর্থনীতি কেন জরুরী?