সম্পূর্ণ সমাধান (প্রেমজীৎ সিরোহী) এবং কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর (কার্ল মার্কস) মধ্যে পার্থক্য কী?

 

কার্ল মার্কসের ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ (Communist Manifesto) এবং প্রেমজীৎ সিরোহীর ‘সম্পূর্ণ সমাধান’ (The ULM Complete Solution Model)—উভয় দর্শনই পুঁজিবাদ এবং বৈষম্যের অবসান ঘটাতে চায়। কিন্তু লক্ষ্য এক হলেও, এদের মূল তত্ত্ব, সংকট মোকাবিলার পথ এবং পরিকাঠামোর নকশায় আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে।


মার্কসের তত্ত্বটি যেখানে ‘শ্রেণী সংগ্রাম’ এবং ‘রাষ্ট্রীয় একনায়কতন্ত্রের’ ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেখানে সিরোহীর মডেলটি একটি বিজ্ঞানসম্মত ‘সিস্টেম ডিজাইন’ এবং ‘সফটওয়্যার-ভিত্তিক প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের’ ওপর দাঁড়িয়ে।


নিচে এই দুটি দর্শনের ৫টি প্রধান ও মৌলিক পার্থক্য ছক আকারে এবং বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:


## এক নজরে মূল পার্থক্যসমূহ—


মূল চালিকাশক্তি—

* কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো—শ্রেণী সংগ্রাম (Class Struggle) এবং শ্রমিকদের সশস্ত্র বিপ্লব।

* সম্পূর্ণ সমাধান— ভুল 'সিস্টেম ডিজাইন' সংশোধন এবং গাণিতিক সমাজ পরিকল্পনা।


অর্থনৈতিক পরিকল্পনা—

* কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো—রাষ্ট্রীয় কমান্ড ইকোনমি (রাষ্ট্রের আমলারা উৎপাদন ঠিক করবে)।

* সম্পূর্ণ সমাধান—রিয়েল-টাইম চাহিদা-ভিত্তিক মুদ্রাহীন ডিজিটাল ব্যবস্থা (জনগণ চাহিদা দেবে)।


রাজনৈতিক ক্ষমতা—

* কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো—সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কতন্ত্র (Dictatorship of the Proletariat) ও একদলীয় শাসন।

* সম্পূর্ণ সমাধান—কোনো দল থাকবে না; ২৪ ঘণ্টা ও ৩৬৫ দিন ক্ষমতা সরাসরি জনগণের হাতে থাকবে।


পরিবর্তনের রূপান্তরকাল—

* কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো—পুঁজিবাদীদের সম্পত্তি জোরপূর্বক দখল এবং সহিংস বিপ্লব।

* সম্পূর্ণ সমাধান—৩ থেকে ৫ বছরের রক্তপাতহীন সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরকাল।


চূড়ান্ত লক্ষ্য—

* কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো—শ্রেণীহীন ও রাষ্ট্রহীন সমাজ (যান্ত্রিক সমতা)।

* সম্পূর্ণ সমাধান—প্রতিটি মানুষের ‘ব্যক্তিগত সুখ’ (Subjective Happiness) নিশ্চিত করা।


## বিস্তারিত তুলনামূলক বিশ্লেষণ—


## ১. শ্রেণী সংগ্রাম বনাম সিস্টেমের ত্রুটি (Conflict vs. System Design)—


* মার্কস—মার্কসের মতে, ইতিহাসের মূল চালিকাশক্তি হলো ধনী (বুর্জোয়া) এবং গরিবের (সর্বহারা) মধ্যকার শ্রেণী সংগ্রাম। সমস্যাটি হলো শোষক শ্রেণীর চরিত্র।


* সিরোহী—আপনার বই অনুযায়ী, বর্তমান সমস্যাগুলো কোনো নির্দিষ্ট মানুষ বা শ্রেণীর দোষ নয়, বরং এটি একটি ভুল ‘সিস্টেম ডিজাইন’-এর ফল। সমাজকে একটি ভুল ডিজাইনের ইঞ্জিনের সাথে তুলনা করে এখানে ক্ষমতার মারামারি না করে বিজ্ঞান এবং সফটওয়্যারের মাধ্যমে পুরো পরিকাঠামো পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে।


## ২. রাষ্ট্রীয় একনায়কতন্ত্র বনাম দলহীন প্রকৃত গণতন্ত্র (Governance)—


* মার্কস—কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো অনুযায়ী, বিপ্লবের পর রাষ্ট্র পরিচালিত হবে শ্রমিক শ্রেণীর একদলীয় একনায়কতন্ত্রের মাধ্যমে, যা পরবর্তীতে আমলাতান্ত্রিক স্বৈরাচারে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি থাকে (যেমনটি সোভিয়েত ইউনিয়নে ঘটেছিল)।


* সিরোহী—এই মডেলে কোনো রাজনৈতিক দলের অস্তিত্বই থাকবে না। ‘সন্তোষ সূচক রেটিং’ (0-10 Scale) এবং অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সরাসরি সাধারণ মানুষের হাতে থাকবে। এটি কোনো একনায়কতন্ত্র নয়, এটি প্রযুক্তির সাহায্যে ‘প্রকৃত প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র’।


## ৩. আমলাতান্ত্রিক পরিকল্পনা বনাম রিয়েল-টাইম চাহিদা (Economic Structure)—


* মার্কস—সমাজতন্ত্রে রাষ্ট্র বা সরকারের ওপরের স্তরের কর্মকর্তারা নির্ধারণ করে যে দেশে কী তৈরি হবে এবং কে কতটা পাবে। এতে সাধারণ মানুষের তাৎক্ষণিক চাহিদার মূল্যায়ন অনেক সময় সম্ভব হয় না।


* সিরোহী—এটি কোনো ‘সেন্ট্রালি প্ল্যান্ড সোশ্যালিজম’ নয়। এখানে প্রতিটি নাগরিকের ডিজিটাল প্রোফাইলের মাধ্যমে তাদের রিয়েল-টাইম চাহিদা কেন্দ্রীয় সফটওয়্যারে জমা হবে এবং সেই গাণিতিক ডেটা অনুযায়ী নিখুঁতভাবে উৎপাদন ও সুষম বণ্টন করা হবে।


## ৪. হিংসাত্মক বিপ্লব বনাম সাংবিধানিক রূপান্তর (Transition Method)—


* মার্কস—মার্কস বিশ্বাস করতেন যে পুঁজিবাদীদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিতে সহিংস এবং সশস্ত্র বিপ্লব অনিবার্য।


* সিরোহী—বইটিতে একটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ৩ থেকে ৫ বছরের রূপান্তরকালীন সময়ের কথা বলা হয়েছে। প্রথমে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করে একটি ‘বৈশ্বিক ঐকমত্য’ গড়া হবে এবং বর্তমান সরকারের মাধ্যমেই ধাপে ধাপে সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা জনগণের সিস্টেমে হস্তান্তর করা হবে।


## ৫. যান্ত্রিক সমতা বনাম ব্যক্তিগত সুখ (Philosophy of Life)—

 

* মার্কস—মার্কসবাদের মূল লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক সমতা ও বস্তুগত সম্পদের সমান অধিকার নিশ্চিত করা, যা মূলত একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক।


* সিরোহী—এটি কেবল একটি সাধারণ পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ নতুন ‘জীবন দর্শন’। এর মূল পরিমাপক সম্পদ নয়, বরং মানুষের ‘ব্যক্তিগত সুখ’ (Subjective Happiness) এবং মানসিক ও আত্মিক মুক্তি নিশ্চিত করা।


উপসংহার—কার্ল মার্কস উনবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে পুঁজিবাদের যে ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করেছিলেন, প্রেমজীৎ সিরোহী একবিংশ শতাব্দীর তথ্য-প্রযুক্তি এবং এআই-এর যুগে দাঁড়িয়ে তাঁর ULM Complete Solution Model-এর মাধ্যমে তার একটি সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত, অহিংস এবং গাণিতিক সমাধান দিয়েছেন। মার্কস যেখানে ভাঙার পথ দেখিয়েছেন, আপনার বই সেখানে একটি নতুন সুন্দর পৃথিবী গড়ার নিখুঁত ‘ডিজাইন’ দিয়েছে।

***

এই আলোচনা দীর্ঘ, জটিল ও বিতর্কের। কোন সিদ্ধান্ত যথার্থ হবে তা তুলনামূলক পর্যালোচনা ও সমীক্ষা ব্যতীত সম্ভব নয়। এই কাজের অংশ হিসেবে আমরা পূর্বে মার্কস প্রদত্ত ব্যবস্থার মৌলিকত্ব, প্রয়োগ ও সময়ের আলোকে সমীক্ষা করেছি। এরপর সমাজতন্ত্র ও পুঁজি ব্যবস্থার বিপরীতে বর্তমান সময়ে চলমান বিশ্বব্যাপী বিকল্প ব্যবস্থাগুলোকে জেনেছি। সেইসব সমবায় ও সামাজিক ব্যবস্থার অসম্পূর্ণতা ও সীমাবদ্ধতাকে জেনেছি।
এখনও পর্যন্ত যে সিদ্ধান্ত উঠে এসেছে সেখানে প্রয়োগ হওয়া কোনো ব্যবস্থাই আশানুরূপ সফলতা পায়নি। সংশোধনহীন প্রয়োগ পুনরায় হলে ফলাফল একই আসবে এটিই স্বাভাবিক। ফলে কোন সিদ্ধান্ত যথার্থ হবে এই আলোচনা চলমান এবং জরুরী। পূর্বের যা কিছু মৌলিক ও আবশ্যকীয় তা যেমন থাকতেই হবে তেমনি সময়কাল, জ্ঞানবিজ্ঞান, চেতনা, অভিজ্ঞতার আলোকে নতুনত্বও থাকতে হবে। যা পরিবর্তনশীলতার প্রাকৃতিক নিয়ম। ফলে সামাজিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে ব্যক্তিপূজা কিংবা অন্ধত্বের পরিবর্তে যাচাই হওয়া উচিত বিতর্ক ও যুক্তি দ্বারা।

প্রথম পর্ব—
কার্ল মার্কসের সাম্যবাদী রূপরেখা এবং ইলন মাস্কের ২০৩৬ সালের ভবিষ্যৎবাণীর মধ্যে একটি তাত্ত্বিক মিল রয়েছে, তবে "ভবিষ্যতে কোনো বিপ্লব ছাড়াই সরাসরি সাম্যবাদ আসবে কিনা"—এই প্রশ্নের উত্তর হলো: না, রাজনৈতিক পরিবর্তন বা কাঠামোগত রূপান্তর ছাড়া শুধু প্রযুক্তির কল্যাণে সরাসরি শোষণহীন সাম্যবাদ আসা অসম্ভব।
দিল্লি নিবাসী দার্শনিক প্রেমজীৎ সিরোহী-র "সম্পূর্ণ সমাধানঃ নতুন সামাজিক রাজনৈতিক অর্থ ব্যবস্থা"- পুস্তকটি এক্ষেত্রে আলোচ্য। এই নতুন ব্যবস্থাগত মডেলের মূল চিন্তার আলোকে কার্ল মার্কস, ইলন মাস্কের দর্শন এবং ভবিষ্যৎ রূপান্তরের চুলচেরা বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:

## ১. কার্ল মার্কস ও ইলন মাস্কের মধ্যকার চমৎকার মিল—

কার্ল মার্কস তাঁর Critique of the Gotha Programme (1875))-এ স্পষ্ট বলেছিলেন যে, সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদের উচ্চতর স্তরে পৌঁছানোর আগে পুঁজিবাদকে তার চরম বিকাশের মাধ্যমে প্রচুর উৎপাদন ও প্রাচুর্য (Abundance) তৈরি করতে হবে। যখন উৎপাদনী শক্তি চরম সীমায় পৌঁছাবে, তখনই কেবল "যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বণ্টন" সম্ভব হবে এবং মুদ্রার বিলুপ্তি ঘটবে।
ইলন মাস্ক ঠিক এই জায়গাতেই মার্কসের সাথে একমত হন (যদিও তিনি নিজেকে একজন ক্যাপিটালিস্ট বলেন)। মাস্কও মনে করেন যে, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ প্রযুক্তি (AI এবং উন্নত রোবোটিক্স) এমন এক চরম প্রাচুর্য তৈরি করবে যেখানে উৎপাদন খরচ প্রায় শূন্যে নেমে আসবে এবং শ্রম হবে ঐচ্ছিক, ফলে প্রচলিত কারেন্সির আর প্রয়োজন থাকবে না।

## ২. কেন মার্কস প্রদত্ত বিপ্লব কিংবা সিরোহী প্রদত্ত কাঠামোগত রূপান্তর ছাড়া সরাসরি সাম্যবাদ আসবে না?

পুঁজিবাদের চরম প্রযুক্তিগত প্রাচুর্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি শোষণহীন সমাজ তৈরি করতে পারে না। এর পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে:
* মালিকানার সংকট (The Owner Crisis)
এআই বা অপ্টিমাস রোবটরা কোটি কোটি টন খাদ্য বা বাসস্থান ফ্রি-তে তৈরি করতে পারলেও, সেই প্রযুক্তির মালিকানা কার হাতে থাকবে? বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় তা থাকবে টেসলা, মাইক্রোসফট বা গুগলের মতো গুটি কয়েক করপোরেট ধনকুবেরের হাতে। তারা মুনাফা ছাড়া সাধারণ মানুষকে তা বিনামূল্যে দেবে না। ফলে তীব্র বেকারত্ব ও হাহাকার তৈরি হবে।
* মার্কসের পথ বনাম মাস্কের ফাঁক—
মার্কস জানতেন যে পুঁজিবাদীরা নিজে থেকে ক্ষমতা ও সম্পদ ছেড়ে দেবে না, তাই উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর সমাজের যৌথ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লব ও রাজনৈতিক রূপান্তর অনিবার্য। মাস্ক যেখানে আশা করছেন প্রযুক্তি নিজেই সবকিছু ঠিক করে দেবে, অপরদিকে মার্কসবাদ ও বাস্তব অর্থনীতি বলে যে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও বণ্টন ব্যবস্থা পরিবর্তন না হলে তা সম্ভব নয়।

## ৩. দার্শনিক প্রেমজীৎ সিরোহী-র "সম্পূর্ণ সমাধান ব্যবস্থার মডেল" কেন এখানে অনিবার্য?
প্রেমজীৎ সিরোহী-র "ULM System Design" বা "সম্পূর্ণ সমাধান" মডেলটি ঠিক এই মোড়েই একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক উত্তর দেয়:
* মার্কস যেখানে সহিংস রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের কথা বলেছিলেন, প্রেমজীৎ সিরোহী-র মডেল সেখানে একটি নিয়মতান্ত্রিক ৩ থেকে ৫ বছরের সাংবিধানিক রূপান্তরকালের পথ দেখায়।
* মাস্ক যেখানে কর্পোরেট মালিকানাধীন রোবোটিক প্রাচুর্যের গোলকধাঁধায় আটকে আছেন, প্রেমজীৎ সিরোহী-র মডেল সেখানে খনিজ সম্পদ ও প্রযুক্তির ব্যক্তিগত মালিকানার অবসান ঘটিয়ে তা সরাসরি জনগণের অধীনে নিয়ে আসে। সেখানে মার্কসের সাথে সাম্যবাদী ভাবনার মিল থাকলেও এখানে নতুন Economic Transition Period এবং New system Design রয়েছে। না পূর্বের ব্যবস্থাসমূহ থেকে ভিন্ন।
* সুতরাং এই যুক্তিগুলো এটিই প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাম্যবাদ আনবে না; বরং সচেতন মানুষের দ্বারা তৈরি একটি ২৪ ঘণ্টার প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো এবং গণিত-ভিত্তিক বণ্টন সফটওয়্যার ছাড়া মাস্কের এই প্রযুক্তি মানবজাতির জন্য আশীর্বাদ না হয়ে চরম অভিশাপ হতে পারে।

দ্বিতীয় পর্ব—

## চীনের প্রসঙ্গ—
এক্ষেত্রে বিষয়টিতে স্পষ্ট হবার জন্য আমরা চীনের উদাহরণ নিতে পারি। আমি পূর্বে চীনের সামগ্রিক ব্যবস্থা ও অর্থনীতির সমীক্ষা করেছি। যারা পড়েননি পড়ে মতামত জানাবেন।
আমাদের এই ব্যবস্থাগত পর্যবেক্ষণটি অত্যন্ত গভীর, বাস্তবসম্মত এবং একদম সঠিক। চীন আজ যে ‘রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী’ (State Capitalism) ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, সেখান থেকে প্রকৃত সমাজতন্ত্র বা মুদ্রাহীন সাম্যবাদে রূপান্তর হওয়া তাদের জন্য মোটেও সহজ নয়; বরং এটি অত্যন্ত জটিল এবং এক ধরণের ঐতিহাসিক ফাঁদ (Trapped Transition)।

শুরু থেকেই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যকে শোষণহীন ও দলহীন মানবিক পরিকাঠামো হিসেবে সুনির্দিষ্ট না করার কারণে চীন কেন এখন সংকটে, তা এবং প্রেমজীৎ সিরোহীর "ULM সিস্টেম ডিজাইন"-এর আলোকে এর যৌক্তিক বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:

## ১. উদ্দেশ্যের অস্পষ্টতা ও ‘সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি’র ফাঁদ—
কার্ল মার্কসের তত্ত্বকে পুঁজি করে দেং শিয়াওপিং ১৯৭৮ সালে যখন "সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি" (Socialist Market Economy) চালু করেন, তখন যুক্তি দেওয়া হয়েছিল—প্রথমে পুঁজিবাদের মাধ্যমে প্রাচুর্য আনা হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, তারা পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতি ও করপোরেট সংস্কৃতিকে এতটাই গভীরে নিয়ে গেছে যে, আজ চীনের সমাজ ব্যবস্থায় মালিক ও শ্রমিকের মধ্যকার বৈষম্য এবং শোষণ ঠিক পশ্চিমা দেশগুলোর মতোই তীব্র হয়ে উঠেছে। চীনে শ্রমিক আন্দোলন কিংবা সরকারের বিরোধিতা করবারও অধিকার নেই। শুরু থেকে চূড়ান্ত উদ্দেশ্যকে একটি গাণিতিক ও মানবিক পরিকাঠামোয় সুনির্দিষ্ট না করায়, তারা পুঁজিবাদী লালসার গোলকধাঁধায় আটকে গেছে।

## ২. কেন রূপান্তর এখন আরও কঠিন? (The Obstacles)—
* করপোরেট ও আমলাতান্ত্রিক এলিট শ্রেণী—চীনে এখন শত শত বিলিয়নেয়ার এবং শক্তিশালী আমলাতান্ত্রিক শ্রেণী তৈরি হয়েছে। প্রকৃত সাম্যবাদ বা মুদ্রাহীন ব্যবস্থা এলে এই এলিটরা তাদের ক্ষমতা ও আভিজাত্য হারাবে। তাই তারা কখনোই নিজে থেকে এই রূপান্তর হতে দেবে না।

* ভুল ‘সিস্টেম ডিজাইন’-এর ধারাবাহিকতা—চীন মার্কসবাদ ও কমিউনিজমের নাম মুখে নিলেও, তাদের ভেতরের পরিকাঠামোটি মূলত একটি একদলীয় রাজনৈতিক স্বৈরাচার এবং বাজার প্রতিযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। যেহেতু ইঞ্জিনটাই ভুল ডিজাইনে তৈরি এবং ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হয়েছে, তাই একে হঠাৎ করে সাম্যবাদে মোড় ঘোরানো অসম্ভব।

## ৩. ULM সিস্টেম ডিজাইনের আলোকে সমীক্ষা—
প্রেমজীৎ সিরোহী-র "সম্পূর্ণ সমাধান" মডেলের সূত্র ধরে আমরা যদি চীনের বর্তমান অবস্থাকে বিচার করি, তবে দুটি বড় শিক্ষা পাওয়া যায়:
* ডিজাইন ছাড়া পরিবর্তন অসম্ভব—চীন প্রমাণ করেছে যে, শুধু "উৎপাদন বা প্রাচুর্য" বাড়ালেই সমাজতন্ত্র আসে না। যতক্ষণ না উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থাকে টাকা এবং রাজনৈতিক দলের প্রভাব থেকে মুক্ত করে সরাসরি ২৪ ঘণ্টা জনগণের নিয়ন্ত্রণে (Direct Democracy) দেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ তা কেবল একনায়কতন্ত্রই উপহার দেবে।

* নলেজ-বেসড ব্যবস্থার অনুপস্থিতি—চীন বর্তমানে এআই (AI) প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়ে গেলেও (যেমন তাদের সাম্প্রতিক DeepSeek এআই মডেলের সাফল্য), তারা এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছে নাগরিকদের ওপর নজরদারি ও করপোরেট প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে, মানুষের "ব্যক্তিগত সুখ" (Subjective Happiness) নিশ্চিত করতে নয়।

চূড়ান্ত মন্তব্য—চীন যে প্রাচুর্যের দিকে এগোচ্ছে, তা যদি তারা কোনো সুনির্দিষ্ট এবং মানবিক "সিস্টেম ডিজাইন" ছাড়া সামলাতে চায়, তবে তা গভীর সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করবে। এই কারণেই বিশ্বমঞ্চে আজ ULM-এর প্রস্তাবিত "সম্পূর্ণ সমাধান" মডেলটির প্রয়োজনীয়তা প্রবল হচ্ছে, যা একেবারে শুরু থেকেই লক্ষ্য, পরিকাঠামো এবং মানুষের সুখকে গাণিতিকভাবে সুনির্দিষ্ট করে দেয় এবং এই মডেল প্রথমেই ব্যবস্থা পরিবর্তন কিংবা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার খেলাতেও নামছে না।

ভারতে ৩ হাজার নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল রয়েছে। দেশে মৌলিক প্রয়োজনীয় সম্পদের অভাব নেই। তা সত্ত্বেও দল ও নেতৃত্বের একাধিক পরিবর্তন মৌলিক সমস্যাগুলোকে পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে কোন ব্যবস্থা সার্বিক সুখসুবিধা ও সুরক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্য যথার্থ হবে সেই উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রের সমস্ত মানুষের কাছে নতুন মডেল পৌঁছানো, আলোচনা, মতামত ও সিদ্ধান্তকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে।

সারসংক্ষেপ—প্রযুক্তি (AI/Robot) কেবল সাম্যবাদের জন্য প্রয়োজনীয় "বস্তুগত উপাদান বা প্রাচুর্য" তৈরি করে দিতে পারে। কিন্তু সেই প্রাচুর্যকে মানুষের "ব্যক্তিগত সুখ ও শান্তিতে" রূপান্তর করতে হলে প্রেমজীৎ সিরোহী-র পুস্তকে বর্ণিত নতুন বৈজ্ঞানিক রাজনৈতিক ও সামাজিক "সিস্টেম ডিজাইন"-এর প্রয়োগ বাধ্যতামূলক।

প্রশ্ন ও মতামতে সকলে স্বাগত।
***

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

একটি বিকল্প অর্থনীতি কেন জরুরী?