দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ এবং হিটলারের ভূমিকা কী ছিল?

 

১৯৩৯ সালের ১লা সেপ্টেম্বর অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মানি কর্তৃক পোল্যান্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। তবে এই বিধ্বংসী যুদ্ধটি হঠাৎ করেই বাঁধেনি, বরং এর পেছনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক কারণ জড়িত ছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধার প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

* ভার্সাই চুক্তির অপমানーপ্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জার্মানির ওপর ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তি জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানির বিশাল ভূখণ্ড কেড়ে নেওয়া হয়, সামরিক শক্তি পঙ্গু করা হয় এবং অপমানজনকভাবে বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হয়, যা জার্মানদের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।

* ফ্যাসিবাদের উত্থান ও উগ্র জাতীয়তাবাদーভার্সাই চুক্তির অপমান ও বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দাকে কাজে লাগিয়ে ইউরোপে একনায়কতন্ত্রের উত্থান ঘটে। জার্মানিতে অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসি দল এবং ইতালিতে বেনিতো মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী দল ক্ষমতায় এসে চরম উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রচার শুরু করে।

* অক্ষশক্তির আগ্রাসী নীতিーএকনায়ক শাসকেরা সাম্রাজ্য বিস্তারের নীতি গ্রহণ করেন। জাপান ১৯৩১ সালে চীনের মাঞ্চুরিয়া আক্রমণ করে, ইতালি আবিসিনিয়া (ইথিওপিয়া) দখল করে এবং জার্মানি অস্ট্রিয়াসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চল গ্রাস করতে শুরু করে।

* লীগ অব নেশনসের ব্যর্থতাーপ্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বশান্তি বজায় রাখার জন্য লীগ অব নেশনস (জাতিসংঘ) গঠিত হয়েছিল। কিন্তু শক্তিশালী দেশগুলোর আগ্রাসন রোখার মতো কোনো সামরিক বা কার্যকরী ক্ষমতা এই সংস্থার ছিল না, যার ফলে হিটলার-মুসোলিনিরা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।

* ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের তোষণ নীতিーহিটলারের প্রাথমিক সামরিক আগ্রাসন দেখেও ব্রিটেন ও ফ্রান্স সরাসরি কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি। তারা ভেবেছিল হিটলারকে কিছু ছাড় দিলে আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ এড়ানো যাবে, যা মূলত হিটলারের সাহস ও আকাঙ্ক্ষা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

* প্রত্যক্ষ কারণ (পোল্যান্ড আক্রমণ)ー১৯৩৯ সালের আগস্ট মাসে জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরস্পরের মধ্যে একটি অনাক্রমণ চুক্তি করে। এর পরপরই ১লা সেপ্টেম্বর হিটলারের বাহিনী পোল্যান্ড আক্রমণ করলে ব্রিটেন ও ফ্রান্স ৩রা সেপ্টেম্বর জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, যার ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

***

## স্তালিনের ভূমিকাー

নিশ্চয়ই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধানোর ক্ষেত্রে জোসেফ স্তালিনেরও (Soviets Union-এর প্রধান) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এবং ঐতিহাসিক দায় ছিল। হিটলারের পাশাপাশি স্তালিনের কিছু নীতি ও সিদ্ধান্ত এই যুদ্ধকে ত্বরান্বিত করতে সরাসরি সাহায্য করেছিল।

স্তালিনের প্রধান যে ভুল এবং পদক্ষেপগুলোর কারণে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, সেগুলো নিচে দেওয়া হলো:

* নাৎসি-সোভিয়েত অনাক্রমণ চুক্তি (Molotov-Ribbentrop Pact)ーযুদ্ধের মাত্র এক সপ্তাহ আগে, ১৯৩৯ সালের ২৩শে আগস্ট স্তালিন হিটলারের জার্মানির সাথে একটি গোপন চুক্তি করেন। এর ফলে হিটলার নিশ্চিত হন যে পোল্যান্ড আক্রমণ করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাকে বাধা দেবে না। এই চুক্তিটিই মূলত হিটলারকে নির্বিঘ্নে যুদ্ধ শুরু করার সবুজ সংকেত দিয়েছিল।

* পোল্যান্ডের যৌথ ব্যবচ্ছেদーএই চুক্তির একটি গোপন অংশ ছিল পোল্যান্ডকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া। জার্মানি পশ্চিম দিক থেকে পোল্যান্ড আক্রমণ করার ঠিক ১৬ দিন পর, ১৭ই সেপ্টেম্বর স্তালিনের লাল ফৌজ (Red Army) পূর্ব দিক থেকে পোল্যান্ড আক্রমণ করে এবং দেশটির অর্ধেক অংশ দখল করে নেয়।

* অন্যান্য দেশে আগ্রাসনーহিটলারের মতোই স্তালিনও এই সুযোগে নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করতে শুরু করেন। তিনি ফিনল্যান্ড আক্রমণ করেন (যা 'উইন্টার ওয়ার' নামে পরিচিত) এবং জোরপূর্বক বাল্টিক অঞ্চলের তিনটি দেশ—এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়া দখল করে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করেন।

* কাটিন গণহত্যা (Katyn Massacre)ーপোল্যান্ড দখলের পর স্তালিনের নির্দেশে সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা (NKVD) প্রায় ২২,০০০ পোলিশ সামরিক কর্মকর্তা, বুদ্ধিজীবী এবং বন্দিকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম বড় যুদ্ধাপরাধ।

তাহলে স্তালিন কেন এমন করেছিলেন?

ঐতিহাসিকদের মতে, স্তালিন জানতেন হিটলারের সাথে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। তবে ১৯৩৯ সালে সোভিয়েত সেনাবাহিনী যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না। তাই স্তালিন মূলত নিজের দেশের সামরিক প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সময় কিনতে এবং জার্মানির সাথে একটি বাফার জোন (নিরাপদ দূরত্ব) তৈরি করতে হিটলারের সাথে হাত মিলিয়েছিলেন।

কিন্তু পরবর্তীতে ১৯৪১ সালে হিটলার এই চুক্তি ভেঙে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করলে (অপারেশন বারবারোসা) স্তালিন মিত্রপক্ষে যোগ দিতে বাধ্য হন এবং শেষ পর্যন্ত জার্মানিকে হারাতে বিশাল ভূমিকা রাখেন।

***

স্তালিন তো ঘনিস্তমহল থেকে প্রস্তুতির বার্তা পেয়েছিলেন?

আপনার ধারণা একদম সঠিক। স্তালিন শুধু বার্তা পাননি, বরং তার নিজের গোয়েন্দা সংস্থা, ঘনিষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা এবং বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছ থেকে শত শত সুনির্দিষ্ট সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে, ১৯৪১ সালের জুন মাসের আগে স্তালিনের কাছে জার্মানির আক্রমণ সংক্রান্ত প্রায় ৮০টিরও বেশি সরাসরি ও নিখুঁত গোয়েন্দা রিপোর্ট এসেছিল।

এত তথ্য পাওয়ার পরও স্তালিন কেন সেগুলো অবহেলা করেছিলেন এবং কেন প্রস্তুতি নেননি, তার মূল কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
* ব্রিটিশদের প্রতি চরম অবিশ্বাসーব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল স্তালিনকে একাধিকবার সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ (জার্মান সামরিক গোপন কোড 'আল্ট্রা' ডিকোড করে) সতর্ক করেছিলেন যে হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করতে যাচ্ছেন। কিন্তু স্তালিন মনে করেছিলেন ব্রিটেন নিজেই চরম বিপদে আছে (তখন লন্ডনে জার্মান বিমান হামলা বা ব্লিৎজ চলছিল)। তাই ব্রিটিশরা মিথ্যা তথ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নকে যুদ্ধে টেনে এনে নিজেদের ওপর থেকে চাপ কমাতে চাইছে—এই ভেবে স্তালিন সতর্কবার্তাগুলোকে "ব্রিটিশ উস্কানি" বলে উড়িয়ে দেন।

* হিটলারের প্রতি ভুল কৌশলগত অনুমানーস্তালিন একটি যৌক্তিক কিন্তু মারাত্মক ভুল ধারণা নিয়ে বসেছিলেন। তিনি ভাবতেন, হিটলার কখনোই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো একসাথে দুই ফ্রন্টে (একদিকে ব্রিটেন, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন) যুদ্ধ করার ভুল করবেন না। স্তালিন মনে করেছিলেন, সীমান্ত এলাকায় জার্মান সেনা মোতায়েন করা হয়েছে মূলত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে রাশিয়ার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টির জন্য, যুদ্ধের জন্য নয়।

* হিটলারের কূটকৌশল ও চিঠিーহিটলার অত্যন্ত চালাক ছিলেন। তিনি ১৯৪১ সালের মে মাসে স্তালিনকে একটি ব্যক্তিগত চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ব্রিটিশদের নজর এড়ানোর জন্য তিনি সোভিয়েত সীমান্তে প্রায় ৮০টি ডিভিশন সেনা সাময়িকভাবে লুকিয়ে রেখেছেন। হিটলার স্তালিনকে আশ্বস্ত করে বলেন, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে যেন সোভিয়েত বাহিনী যেন পাল্টা আক্রমণ না করে শান্ত থাকে। স্তালিন হিটলারের এই ফাঁদে পা দেন।

* গোয়েন্দা তথ্যের পরস্পরবিরোধী রূপーসোভিয়েতদের নিজস্ব মহান গুপ্তচর রিচার্ড সোর্গে (Richard Sorge) জাপান থেকে এবং উলফগ্যাং লাউটজিশ (Wolfgang Lutzisch) বার্লিন থেকে আক্রমণের সঠিক তারিখ (২২শে জুন, ১৯৪১) স্তালিনকে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু একই সাথে অন্যান্য গোয়েন্দা সূত্র থেকে আক্রমণের ভিন্ন ভিন্ন সম্ভাব্য তারিখ (যেমন: এপ্রিলের শেষ বা মে মাসের শুরু) আসছিল। যেহেতু এপ্রিল-মে মাসে আক্রমণ হয়নি, তাই স্তালিন ভেবেছিলেন নতুন তারিখগুলোও হয়তো ভুল বা মিথ্যা তথ্য।

* উস্কানি এড়ানোর অতিরিক্ত ভয়ーস্তালিন এতটাই নিশ্চিত ছিলেন যে লাল ফৌজ (Red Army) তখনো জার্মানির মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত নয় যে, তিনি সীমান্ত বাহিনীকে কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন কোনো অবস্থাতেই জার্মানদের উস্কানিতে সাড়া না দেওয়া হয়。 তিনি ভয় পাচ্ছিলেন যে সোভিয়েতদের সামান্যতম প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতি দেখলেই হিটলার সেটাকে যুদ্ধের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।

পরিণতি:

এই চরম একগুঁয়েমি ও অন্ধ বিশ্বাসের কারণে ১৯৪১ সালের ২২শে জুন যখন জার্মানি 'অপারেশন বারবারোসা' শুরু করে, তখন সোভিয়েত বাহিনী সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় ছিল। যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিনেই লাখ লাখ সোভিয়েত সেনা বন্দি ও নিহত হয় এবং হাজার হাজার যুদ্ধবিমান মাটিতে থাকা অবস্থাতেই ধ্বংস হয়ে যায়। স্তালিনের এই ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হয়েছিল কোটি কোটি সোভিয়েত নাগরিকের প্রাণের বিনিময়ে।

***

এরপর যুদ্ধ জিততে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েতকে কীভাবে সহায়তা করেছিল?

জার্মানির আক্রমণের পর সোভিয়েত ইউনিয়নকে টিকিয়ে রাখতে এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ জিততে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র 'লেন্ড-লিজ নীতি' (Lend-Lease Act)-এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সামরিক, অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক সহায়তা পাঠিয়েছিল The National WWII Museum। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নকে প্রায় ১১.৩ বিলিয়ন ডলার (বর্তমান মূল্যে যা প্রায় ১৮০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি) মূল্যের সামগ্রী সরবরাহ করে U.S. Embassy & Consulates in Russia.
আমেরিকার এই সহায়তার মূল ক্ষেত্রগুলো নিচে দেওয়া হলো:

* পরিবহন ও লজিস্টিকস (যুদ্ধের আসল চাবিকাঠি)ーআমেরিকার পাঠানো ট্রাক ও যানবাহন সোভিয়েতদের গতিশীলতা পুরোপুরি বদলে দেয়। তারা প্রায় ৪,০০,০০০ জিপ ও ট্রাক (যার মধ্যে বিখ্যাত স্টুডবেকার ট্রাক অন্তর্ভুক্ত), ১৪,০০০ যুদ্ধবিমান, এবং ১৩,০০০ ট্যাংক পাঠায় U.S. Embassy & Consulates in Russia।

* রেলপথ পুনর্গঠনーযুদ্ধকালীন রসদ সরবরাহের জন্য রেললাইন ছিল অপরিহার্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নকে প্রায় ২,০০০ লোকোমোটিভ (রেল ইঞ্জিন) এবং ১১,০০০ মালবাহী বগি দেয়, যা সোভিয়েতদের নিজস্ব উৎপাদনের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।

* খাদ্য ও পুষ্টি সরবরাহーযুদ্ধের কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধান খাদ্য উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলো জার্মানি দখল করে নিয়েছিল। দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে আমেরিকা প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন টন খাদ্যসামগ্রী (যেমন: টিনজাত মাংস, চিনি, ময়দা) পাঠায়, যা দিয়ে কোটি কোটি সোভিয়েত সেনার রেশন নিশ্চিত করা হয়েছিল।

* কাঁচামাল ও জ্বালানিーঅস্ত্র ও গোলাবারুদ তৈরির জন্য আমেরিকা বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল পাঠায়। এর মধ্যে ছিল ২.৬ মিলিয়ন টন স্টিল, ৩,০০,০০০ টন অ্যালুমিনিয়াম (যা দিয়ে সোভিয়েতরা বিমান তৈরি করত) এবং লাখ লাখ টন উচ্চ-মানের বিমান জ্বালানি ও বিস্ফোরক।

* যোগাযোগ ও বুট জুতোーফ্রন্টে যোগাযোগের জন্য আমেরিকা ৪,২০,০০০ ফিল্ড টেলিফোন এবং হাজার হাজার মাইল টেলিফোন তার সরবরাহ করে। এছাড়া সোভিয়েত সেনাদের জন্য প্রায় ১৫ মিলিয়ন জোড়া সামরিক বুট জুতো পাঠানো হয়েছিল।


## ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও স্তালিনের স্বীকৃতিー

সোভিয়েত ইউনিয়নের নিজস্ব প্রোপাগান্ডায় এই সাহায্যকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করা হলেও, স্বয়ং জোসেফ স্তালিন এবং তার শীর্ষ সামরিক কমান্ডার জর্জি ঝুকভ ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করেছিলেন যে মার্কিন সাহায্য ছাড়া তারা যুদ্ধ জিততে পারতেন না।

১৯৪৩ সালের নভেম্বর মাসে তেহরান কনফারেন্সে একটি নৈশভোজে স্তালিন সরাসরি বলেছিলেন:

"মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত এই মেশিনগুলো ছাড়া আমরা কখনোই এই যুদ্ধে জিততে পারতাম না।"

আমেরিকার এই লজিস্টিক ও অর্থনৈতিক সাপোর্টের কারণেই সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের বিপুল জনশক্তিকে সরাসরি যুদ্ধে ব্যবহার করতে পেরেছিল এবং হিটলারের বাহিনীকে বার্লিন পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল।

***

## তথ্য উৎস ও গ্রন্থপঞ্জিー

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'লেন্ড-লিজ' (Lend-Lease) নীতি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নকে দেওয়া সহায়তার বিষয়ে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ও প্রামাণিক কিছু ঐতিহাসিক পুস্তকের তালিকা নিচে দেওয়া হলো। এই বইগুলোতে মার্কিন আর্কাইভের নথিপত্র এবং স্তালিনের বক্তব্যের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে:

## ১. প্রধান প্রামাণিক বই (Core Historical References)ー

* "Russia's Life-Saver: Lend-Lease Aid to the U.S.S.R. in World War II"
* লেখক: Albert L. Weeks
* কেন পড়বেন: এটি এই বিষয়ের ওপর সবচেয়ে তথ্যবহুল বই। এতে সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দিয়ে দেখানো হয়েছে কীভাবে মার্কিন ট্রাক, অ্যালুমিনিয়াম এবং খাবার না থাকলে সোভিয়েত অর্থনীতি ও সামরিক বাহিনী ভেঙে পড়ত। এতে তেহরান কনফারেন্সে স্তালিনের দেওয়া সেই বিখ্যাত বক্তব্যের (মার্কিন মেশিন ছাড়া যুদ্ধ জেতা সম্ভব হতো না) মূল দলিল ও প্রেক্ষাপট সংকলিত আছে।
* "Stalin's War: A New History of World War II"
* লেখক: Sean McMeekin (প্রকাশকাল: ২০২১)
* কেন পড়বেন: আধুনিক সময়ের অন্যতম সেরা ঐতিহাসিক শেন ম্যাকমিকিন সোভিয়েত এবং মার্কিন আর্কাইভের গোপন নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, স্তালিনের যুদ্ধ পরিচালনার পেছনে মার্কিন অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক সাহায্য কতটা জীবনদায়ী বা অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছিল।
* "The Road to Stalingrad" এবং "The Road to Berlin"
* লেখক: John Erickson
* কেন পড়বেন: পূর্ব ফ্রন্টের (Eastern Front) যুদ্ধের ওপর এই দুই খণ্ডের বইটিকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল মনে করা হয়। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক জন এরিকসন বিস্তারিত দেখিয়েছেন কীভাবে মার্কিন 'স্টুডবেকার' ট্রাক লাল ফৌজের রসদ সরবরাহের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

## ২. সোভিয়েত ও মার্কিন স্মৃতিকথা (Memoirs & Official Records)ー

* "Memoirs of Nikita Khrushchev: Volume 1: Foundations (1918–1953)"
* লেখক: Nikita Khrushchev (সোভিয়েত ইউনিয়নের সাবেক প্রিমিয়ার)
* কেন পড়বেন: ক্রুশ্চেভ তাঁর স্মৃতিকথায় সরাসরি লিখেছেন যে, তিনি এবং স্তালিন ব্যক্তিগত আলোচনায় বহুবার স্বীকার করেছিলেন যে আমেরিকার লজিস্টিক সাহায্য না পেলে সোভিয়েত ইউনিয়ন জার্মানির কাছে হেরে যেত।
* "Allies at War: The Soviet-American Relationship, 1941-1945"
* লেখক: Susan M. Butler
* কেন পড়বেন: ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট এবং জোসেফ স্তালিনের মধ্যকার চিঠি, কূটনৈতিক বার্তা এবং তেহরান ও ইয়াল্টা কনফারেন্সের অফিশিয়াল নথিপত্রের ওপর ভিত্তি করে এই বইটি লেখা হয়েছে।

## ৩. অফিশিয়াল ও প্রাতিষ্ঠানিক ডকুমেন্ট (Institutional Sources)ー

* "Soviet Supply Protocols" (U.S. State Department Document 2759)
* উৎস: মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর (U.S. Department of State)
* কেন পড়বেন: এটি কোনো সাধারণ বই নয়, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকা ও সোভিয়তের মধ্যে স্বাক্ষরিত অফিশিয়াল প্রোটোকল। এতে ৪টি প্রধান প্রোটোকলের অধীনে কত টন গম, কতটি লোকোমোটিভ বা কত জোড়া বুট পাঠানো হয়েছিল, তার হুবহু রসিদ ও তালিকা রয়েছে।

***

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে অধিকারগুলো জন্মগতভাবে থাকা জরুরী

একটি বিকল্প অর্থনীতি কেন জরুরী?